Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ঋত্বিক ঘটক: দর্শনের সংকট 

বাসব দাশগুপ্ত
দেশটা যে দু’ টুকরো হল, তা ঋত্বিকের গোটা অস্তিত্ব ধরে টান মেরেছিল; তাঁকে নিক্ষেপ করেছিল। নিরতীত নিরালম্বে। এ কথা ঠিক আধুনিক ভারতের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি দেশের সাম্রাজ্যবাদী বিভাজন। আমরা সাদা চোখে দেখি তার অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ফলাফল। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ তার বহু পুরুষের স্বদেশ থেকে উৎখাত হয়ে গেল, সেই মনস্তাত্ত্বিক সংকট বোঝবার চেষ্টা করি না। অথচ এ ব্যাপারটাই ঋত্বিকের হৃদয়ে সব চেয়ে বড় বেজেছিল। তিনি নিজে পূর্ববঙ্গের বলে তার দাহ একটা চিরস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছিল।
Ritwik Ghatak-The Crisis of Philosophy

[ঋত্বিক ঘটকের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে গতবছর মার্কসবাদী পথের ইউটিউব চ্যানেলে দুটি সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হয়েছিল। কথা বলেছিলেন চলচ্চিত্র বিদ্যার দুই অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ও মানস ঘোষ। এ-বছরে আমরা তিনটি লেখা পুনর্মুদ্রিত করছি। প্রথম লেখাটি বিজন ভট্টাচার্যের। দ্বিতীয় লেখাটি রণেশ দাশগুপ্তের। এ-দুটি লেখাকে পরিপূরক বলা চলে এক অর্থে। একদা সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন ঋত্বিকের মধ্যে হলিউডের প্রভাব নেই, এবং তিনি প্রকৃত অর্থে বাঙালি। আর ঋত্বিকও আজীবন রত থেকেছেন ভারতীয় চলচ্চিত্র-ভাষা সৃষ্টিতে। যদিও তাঁর আরেক কমরেড মৃণাল সেন এ-প্রসঙ্গে ভিন্ন মতই পোষণ করতেন; তাঁর কাছে চলচ্চিত্রের ভাষা আন্তর্জাতিক। ঋত্বিকের মতো বিজন ভট্টাচার্যও ভারতীয় নাটকের ফর্ম খুঁজে বেরিয়েছেন। ফলে তাঁদের শিল্প-ভাবনার মধ্যে সখ্য রয়েছে। রণেশ দাশগুপ্ত তাঁদের সৃষ্টিতে ‘গ্রেট মাদার আর্কেটাইপ’-র ব্যবহার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। রণেশ দাশগুপ্তের অভিমত নিয়ে কেউ ভিন্ন মত পোষণ করতে-ই পারেন; সে-বিষয়ে বিতর্ক ঋত্বিক ও বিজন চর্চাকেই সমৃদ্ধ করবে। ঋত্বিক বিষয়ে কতকগুলো কথা ভেসে বেড়ায়, সেগুলিকে ছানবিন করেছেন বাসব দাশগুপ্ত, এবং তাঁর অ-জনপ্রিয় অভিমত স্বাভাবিকভাবেই উসকে দেবে বিতর্কের সম্ভাবনা। পরের অংশে বাসব দাশগুপ্ত অভিনিবেশ দিয়েছেন মার্কস এবং ইয়ুং বিষয়ে ঋত্বিকের অভিমত নিয়ে। সত্যি-ই কি ইয়ুং এবং মার্কসকে মেলানো যায়? এ-নিয়েও বাসব দাশগুপ্ত তাঁর অভিমত জানিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে ঋত্বিককে তাঁরা কীভাবে দেখেছেন, পড়েছেন, তর্ক করেছেন সেটিকেই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। –মার্কসবাদী পথ]

একদা অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক পূরণচাঁদ যোশী বলেছিলেন, ঋত্বিকই ভারতের একমাত্র জনগণের শিল্পী; এবং আজও কমিউনিস্টরা শ্রদ্ধায় স্মরণ করে শিল্প এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যোশীর মত নেতা প্রায় দুর্লভ। যোশীর এই অকুণ্ঠ স্বীকারোক্তিকে যিনি জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার বলে মেনে নিয়েছেন, তিনি মৃত্যুকে প্রায় আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। কেন? এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া বড় জটিল।

ঋত্বিক একজন আপসহীন শিল্পী—এই পৌনঃপুনিক উচ্চারণের কোন প্রয়োজন নেই। তর্কাতীত সত্য। বাণিজ্যের সঙ্গে সামান্যতম সহাবস্থানে তিনি রাজি ছিলেন না, এ কথাও বড় করে বলার প্রয়োজন নেই। তাঁর ছবি আগামীকালের ছবি। তা সবচেয়ে ভাল করে জানতেন ঋত্বিক। তবে হতাশা কেন? আত্মহত্যার এই অনিবার্য আয়োজন কেন?

মার্কসবাদকে ঋত্বিক প্রায় আকৈশোর গ্রহণ করেছিলেন। প্রথমে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘে, তারপর পায়ে পায়ে কমিউনিস্ট পার্টির দিকে। পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় তেলেঙ্গানা অধ্যায় শেষে পার্টি নতুন লাইনের যাত্রী। ঋত্বিক তখন বিভ্ৰান্ত ৷ নিরুচ্চার সন্দেহ অনেকের মনে—ঋত্বিক ট্রটস্কিপন্থী। এরপর পার্টির সঙ্গে ছিন্ন হল তার শারীরিক সম্পর্ক। ছবি করছেন আর মার খাচ্ছেন। আবার ছবি করছেন। পার্টি এক কোমল গান্ধার ছাড়া তাঁর সব ছবিকে অভিনন্দন জানিয়েছে। কোমল গান্ধার নিয়ে বিতর্কের অবকাশ ছিল। যাটের দশকে ধীরে অতি ধীরে নতুন দর্শক তৈরি হচ্ছে। ঋত্বিকের চিত্রভাষা ও তাঁর বক্তব্য বুঝতে চেষ্টা করছে। সত্তরের দশকের গোড়ায় তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠল এক নতুন দর্শকমণ্ডলী, যাঁরা সত্যজিৎকে মনে করেন দূরের, মৃণালকে ভাবেন পার্টিজান। ৭৬-এ ঋত্বিক মরলেন। না কি আত্মহত্যা করলেন! 

অনেকে হয়ত ভাবেন প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতা এবং অর্থসংকট ঋত্বিকের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছিল। আসলে এ ধরনের ধারণা তাঁর মর্যাদাকে লঘু করে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বারবার তিনি পেয়েছেন। ফিল্ম ফিনান্স করপোরেশন ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার বেশ কয়েকবার তাঁর ছবিতে টাকা দিয়েছে। বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পরে যেদিন শেখ মুজিবর রহমান কলকাতায় ভাষণ দিতে এলেন সেদিন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একই বিমানে ঋত্বিক কলকাতায় পৌঁছলেন। প্রাতিষ্ঠানিক মনোনয়ন ছাড়া পুনা ফিল্ম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রিন্সিপাল হওয়া সম্ভব ছিল না। আসলে সমস্যা ছিল অন্য রকম। প্রাতিষ্ঠানিক দাক্ষিণ্যে আত্মতৃপ্তির পথ তাঁর নয়। 

পৃথিবীর মহৎ শিল্পী, সাহিত্যিক, ছবি আঁকিয়েদের জনগণ তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি দিতে পারে নি। জনসাধারণের চিন্তা এবং চেতনার মান যদি পিছিয়ে থাকে, তবে তাদের সময় দিতে হবে বৈকি! ঋত্বিক হয়ত যাকে প্রত্যাখ্যান ভেবেছিলেন তা প্রত্যাখ্যান নয়, অক্ষমতা ছিল গ্রহণে। সত্যজিৎকেও এই অভিজ্ঞতা পেতে হয়েছে। ঋত্বিকের মত বড় মাপের মানুষ কি একথা বোঝেন নি? ঋত্বিক ঘটকের শত্রু ছিলেন স্বয়ং ঋত্বিক ঘটক। এক ঋত্বিক যখন সব গুছিয়ে ভাবার চেষ্টা করছেন, তখন আরেক নৈরাজ্যবাদী ঋত্বিক তাঁর পথরোধ করে দাঁড়তেন। আবার বলি তাঁর সমস্যাটা ছিল দৈনন্দিন জীবনধারণের নয়, অন্য কোথাও । 

এখন পাঠক ভাবতে পারেন, “সমস্যাটা অন্য কোথাও”-এ কথা দিয়ে আমি কোথায় পৌঁছে দিতে চাই। আমি বলতে চাই ঋত্বিকের সমস্যা স্বীকৃতির সমস্যা নয় । বেঁচে থাকার জন্য চাল নুন লকড়ির সমস্যাও নয়। প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার সমস্যাও নয়। পণ্ডিত জওহরলাল ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণিকে শিল্প সম্পর্কে সহিষ্ণুতার শিক্ষা কিছু পরিমাণে দিয়ে গেছেন। তাই দেখি, শ্রীমতী গান্ধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে পর্যুদস্ত করার জন্য ফন্দি আঁটেন। আবার তিনিই ঘাসিরাম কোতয়াল-এর মত নাটককে বিদেশে যাবার ছাড়পত্র দেন। শ্রীমতী গান্ধী ঋত্বিককে নিয়োজিত করেছিলেন তাঁর সম্পর্কে দলিলচিত্র বানাতে। শিল্প বিষয়ক সহিষ্ণুতা বস্তুত তাঁদের রাজনৈতিক দর্শনের এক মাত্রা। প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছি। মোদ্দা কথা, এসব যদি ঋত্বিকের সমস্যা না হয়, তবে সমস্যা কোটা ? 

সমস্যা / এক

“আচ্ছা নিজের জমির উপর না দাঁড়িয়ে কিছু করা যায় কি? কিছু সত্যিকারের গভীরতাকে ছোঁয়া সম্ভব? আমি জানি না।.... 

“আমি বলছি দেশ ভাগের কথা। আমি পূর্ব বাঙলার ছেলে।..... 

“অতীতহীন নিরালম্ব বায়ুভূত কাজ কাজই নয়। কিন্তু আমার অতীতকে কে 

এনে দেবে? ....আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা এইটে। ” 

[ছবি করা/ঋত্বিক ঘটক; চিত্রবীক্ষণ জানুয়ারি ১৯৭৬] 

বুঝতে পারছেন ঋত্বিক দেশ বিভাগের কথা বলছেন। দেশটা যে দু’ টুকরো হল, তা ঋত্বিকের গোটা অস্তিত্ব ধরে টান মেরেছিল; তাঁকে নিক্ষেপ করেছিল। নিরতীত নিরালম্বে। এ কথা ঠিক আধুনিক ভারতের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি দেশের সাম্রাজ্যবাদী বিভাজন। আমরা সাদা চোখে দেখি তার অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ফলাফল। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ তার বহু পুরুষের স্বদেশ থেকে উৎখাত হয়ে গেল, সেই মনস্তাত্ত্বিক সংকট বোঝবার চেষ্টা করি না। অথচ এ ব্যাপারটাই ঋত্বিকের হৃদয়ে সব চেয়ে বড় বেজেছিল। তিনি নিজে পূর্ববঙ্গের বলে তার দাহ একটা চিরস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। সমস্যাটা ব্যক্তিগতভাবে হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে। ১৯৬৩-তে আমার বাবার স্ট্রোক হয়। মস্তিষ্কে চলে অবিরাম রক্তক্ষরণ। যে কদিন বেঁচে ছিলেন, শেষ রাতে আমাকে ডাকতেন। ঘুম ভেঙে উঠে দেখতাম জামা-কাপড় গোছগাছ করে হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তখন অন্ধকার আস্তে আস্তে তরল হচ্ছে।

কানে বাজে এখনও বাবার কথা : “ঐ দ্যাখ, ঘাটে নৌকা। যাবি না ফরিদপুরে ?”

ঋত্বিকের ছবি আমি যখন দেখি, অবিরাম বর্ষণের মত স্তব্ধ রাত্রির সেই কথাগুলি ধাক্কা দেয় : “যাবি না ফরিদপুরে ?”

ভেবে দেখুন কোমল গান্ধার-র সেই সিকোয়েন্স। ভৃগু এবং অনসূয়া দাঁড়িয়ে আছে পদ্মার এপারে। ওপারে স্বপ্নের মত পূর্ব বাংলা। নিরবধি নদীতে বয়ে চলে নৌকা। ওদের প্রেমের সংলাপে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে এপার ওপার বাংলার কথা। ওদের মুখ স্বপ্ন এবং যন্ত্রণার মানচিত্র। ভৃগু বলতে থাকে। যে মুহূর্তে এসে পড়ে দেশ বিভাজনের চূড়ান্ত মুহূর্ত, ওদের গলা ছাপিয়ে ওঠে নৌকোর মাঝিদের পাঁচপীরের বন্দনা। নিশ্চিত কোন বিপদ। শব্দটা উঠতে থাকে, তারপর হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। সেই স্তব্ধতার ভিতর আমি আমার হৃদয়ের ভিতরের সঙ্গোপনে, অতি সঙ্গোপনে শুনতে পাই গৃহকাতর বালকের বিষণ্ণ ক্রন্দন। মেঘে ঢাকা তারাও সেই বেদনার সাক্ষ্য। 

তথাপি ছিন্নমূল মানুষ নতুন আশায় ঘর বাঁধে নবজীবন কলোনিতে। জমিদারের লেঠেলদের সঙ্গে তারা লড়াই করে। বাসা বাঁধে। আবার পালাতে হয়। ঈশ্বর চলে যায়। জীবনসংগ্রামে পরাজিত হরপ্রসাদ ঈশ্বরের কাছে ফিরে আসে। আদর্শ, মূল্যবোধ সব তার কাছে নেতিবাচক। কেননা একদিকে নতুন ইহুদিদের সঙ্কট, আরেক দিকে “ কোলকাতায় এখন মজা দোকানে, হোটেলে, রেসের মাঠে—সে কি বীভৎস মজা? তুমি দাঁড়ায়ে দেখবা আর অবাক হয়ে যাবা। মাইনষে কেমন স্রোতে গা এলাইয়া দেয়—গড্ডালিকা প্রবাহই সত্য। ওটাই খাঁটি। ভোগই মুক্তির পথ।” সুবর্ণরেখা-র হরপ্রসাদ এক পরাজিত মানুষ। “সে আসল কথা কি জান ভাইডি, ও প্রতিবাদই করো আর লেজ গুটাইয়া পলাইয়া যাও, কিছুতেই কিছু আসে যায় না। সব লোপাট, আমরা সব নিরালম্ব বায়ুভূত, আমরা মিটা গেছি। রাত কত হইল।” তাই সুবর্ণরেখায় আমরা আরো শুনতে পাই: “লড়াই করারে মনে করি মাইর খাওয়া, আর শহীদ হওয়ারে মনে করি পথ কুক্কুরের ন্যায় মৃত্যুবরণ।” 

ঋত্বিকের ছবিসমূহে রাত্রি চরিত্রের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। রাত্রির অন্ধকারে ঈশ্বর এবং হরপ্রসাদের পলায়ন সম্পূর্ণ হল। রাত্রির সূচনায় কলকাতার মদ্যশালায় মত্ত হরপ্রসাদের চশমা গুঁড়িয়ে যায়। মধ্যযামে ঈশ্বরের পরাভব সম্পূর্ণ হয় সীতার আত্মহত্যায় । অভিরামের মৃত্যু, সীতার আত্মহত্যা! এর পরে মার্কসবাদী ঋত্বিক চমকে ওঠেন। একি হেরে যাওয়ার উপাখ্যান? তাই বিনুকে নিয়ে নতুন বাড়ির সন্ধান শুরু হয়। কিন্তু আদর্শবাদী হরপ্রসাদের নৈতিক মৃত্যু, ঈশ্বরের ধ্বস্ত চেতনা, অভিরামের মৃত্যু, সীতার আত্মহত্যা—এর পরে নতুন বাড়ির জন্য অভিযাত্রা, মনে হয়, চেষ্টাকৃত আশাবাদ।

যুক্তি তক্কো আর গপ্পোয় নীলকণ্ঠ-রূপী ঋত্বিক বলেন, “সমাধান একটা বের করতেই হবে। এ চলতে পারে না। আমাদের.... সমস্ত জেনারেশনটার কোন ভবিষ্যৎ নেই.... এই যে ৪৭ সালের বিশাল বিশ্বাসঘাতকতা, জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, ন্যাশনাল লিবারেশন মুভমেন্ট, এই পিঠে ছুরি মেরে বুর্জোয়াদের ১৫ই আগস্টের বিরাট গ্রেট বিট্রেয়াল। স্বাধীনতা ইনডিপেনডেনস ফুঃ।” এই সংলাপ তাঁর সমস্ত যন্ত্রণাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করেছে। 

কিন্তু উপসংহার কোথায়? নীলকণ্ঠ বাগচী মারা গেলে ঋত্বিকও বেঁচে থাকতে পারেন না। তাই যুক্তি তক্কো আর গপ্পো-র প্রায় পরে পরেই তিনি চলে যান। 

সমস্যা/দুই

“ইয়ুং-এর তত্ত্ব যদি তোমরা পড়াশোনা করে থাকো.....তাহলে দেখবে ইয়ুং-এর তত্ত্বের সঙ্গে মার্কসবাদের কোন গণ্ডগোল নেই। মার্কস একটা জগৎ নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন, ইয়ুং অন্য জগৎ নিয়ে। দুটোর মধ্যে কোন inner contradiction নেই, আমি বলছি কোন inner contradiction নেই। Collective unconscious মানুষের unconscious behaviour-কে determine করে। ইয়ুং-এর সঙ্গে মার্কসের কোন বিরোধ নেই, দুজনে জগৎ নিয়ে কারবার করেছেন। দুটো প্রচণ্ডভাবে পরস্পরের পরিপুরক। (চিত্রবীক্ষণ জানুয়ারি ১৯৭৬)

ঋত্বিক ঘটকের মূল সমস্যা দার্শনিক সমস্যা। মার্কসের সঙ্গে ইয়ুং-এর মেলবন্ধন হয় কি? মার্কসীয় দার্শনিকেরা মনে করেন, হয় না। বিষয়টি খুব জটিল। আসুন আমরা শ্রুতকীর্তি মার্কসীয় তাত্ত্বিকদের শরণাপন্ন হই। 

ইয়ুং সাইকোলজির দ্বন্দ্ব সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। কিন্তু যে দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গ তিনি স্বয়ং উত্থাপন করেছেন, তার সমাধান করেন নি। সাইকোলজির আস্তরণের নিচে যে সমাজ লুকিয়ে আছে, আসলে এই দ্বন্দ্বের সমাধান খুঁজতে গেলে, সেই সমাজকে বিশ্লেষণ করতে হবে। ক্রিস্টোফার কডওয়েল এই প্রসঙ্গে Illusion and Reality-তে মন্তব্য করেছেন: Instead he passes in the opposite direction, from psychology to the epistemology evolved by psyche, and gets lost in the old familiar metaphysical difficulties of subject and object. Thus by a more philosophical and less empirical path, Jung arrives at the same dilemma as Freud... Jung justifies himself in the betrayal of science by the belief that back of all mythology are primeval structures inherent in the mind (the archetypes) which interact with the patients' ideology and so generate myths. These, although they are not truly true, are yet psychologically true. (Birth of the Hero). Thus Jung also chooses the subject from a fundamentally idealistic approach...Nor do Freud or Jung see that, in so far as religion is brought in by man to plaster up a decaying culture, man will have no difficulty in giving birth to new mythologies without the need of archetypes or psychoanalyst's midwifery. Dying bourgeois culture has in fact evolved the vigorous religion of fascism, complete with mythology and choreagus, as seen in Germany and Italy.

ইয়ুং-এর সাইকো অ্যানালিসিস সম্পর্কে ফাস্ট-এর মন্তব্য আরো নির্দয়। তিনি বলেছেন ফ্রয়েড-এর তত্ত্বকে ইয়ুং উচ্চজাতি এবং নিম্নজাতির উপসংহারে টেনে নিয়ে গেছেন এবং ফ্রয়েড-এর এই লজিকাল উপসংহারের জন্যই ইয়ুং নাজিদের কাছে সরকারী মর্যাদা লাভ করেছেন। এই আলোচনা শেষ করা যাক কোলাকোয়াস্কির মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে। Main Currents of Marxism বইতে তিনি লেখেন :more or less faithful disciples, the unconscious derives from accumulations But in all versions of psychoanalysis, whether Freud or those of his of the past and contains nothing new. This backward orientation is even more evident in Jung, "the psychoanalytical fascist", who interprets the whole human psyche in terms of collective pre-history and proclaims hatred of intelligence" as the only remedy for the ill of modern life. 

মার্কস এবং ইয়ুং-এর মধ্যে নিপাতনে সন্ধি হওয়ারও কোন সুযোগ নেই। ঋত্বিকের চিন্তায় এই অসম সন্ধির কথা কেমন করে এল, তা গবেষণার বিষয়। তবে স্তালিনোত্তর যুগে দার্শনিক সহাবস্থানের সময় এর সূত্রপাত। ফিশার যে বিভ্রান্তির শিকার।

রবার্টসন স্মিথের পিতৃদ্রোহিতার তত্ত্ব ভ্রান্ত জেনেও ফ্রয়েড তা ত্যাগ করেন নি। নইলে তাঁর লিবিডো থিয়োরি ধ্বসে যেত । আর ইয়ুং তাকে নির্ভর করে সাইকো অ্যানালিসিসের ভাষ্য খাড়া করেছিলেন। 

এদের শিষ্য হলেন মার্কুইস। এরিক ফ্রম এবং মার্কুইস, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় নয়, মানুষের চেতনার বিকারে দেখেছিলেন মুক্তির প্রতিবন্ধকতা ।

জঁ জেনের অক্ষম পাতি বুর্জোয়া নপুংসকতা বোঝা যায় কিন্তু ঋত্বিকের এই চিন্তায় সুতো কোথায়, সেটাই প্রশ্ন। স্তালিনকে সাড়ম্বরে বিদায় করা হল। ফ্রয়েড-ইয়ুং-এর সাইকো অ্যানালিসিস, কিয়ের্কগার্ড-কামুর অস্তিবাদ জলচল হয়ে গেল। কৌতুকের কথা, মার্কসীয় তত্ত্বের ব্যাখ্যায় ফ্রয়েডীয় বিজ্ঞান বা হাইডেগারের অস্তিবাদকে টেনে আনা হল। এক ট্রটস্কি ছাড়া আর কেউ ফ্রয়েডকে জাতে ওঠাবার চেষ্টা করেন নি। 

এই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো-র নীলকণ্ঠ বাগচী তথা ঋত্বিক ঘটকের জবানী : “তারপর এলেন কমরেড স্ট্যালিন। যাকগে ফেনিয়ে ফেনিয়ে তোমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। আমার মতে Bureaucratic Socialism জন্ম নিল। এরপর এলেন Com. Mao-যিনি কৃষক শ্রেণিকে সংগঠিত করে বিপ্লবের পথে এগিয়ে এলেন। ব্যাপারটা কিন্তু সেখানেই থামলো না, এলেন ক্যাস্ট্রো—তাঁরা নির্ভর করলেন বুদ্ধিজীবী এবং ছাত্র সম্প্রদায়ের উপর। তারপর এদের সবার নাম করে কি যে সব হতে আরম্ভ করলো আমার তো সব গুলিয়ে গেছে। কেমন করে নিহিলিজম টেররিজম অ্যাডভেনচারিজম, লেনিনের ভাষায় Infantile disorder, বালখিল্য সুলভ বদহজম, এই সব কথা মনে হতে আরম্ভ করল।”

স্তালিন সম্পর্কে ঋত্বিকের মূল্যায়নে ট্রটস্কির প্রভাব আছে। আবার ফ্রয়েড সম্পর্কে ট্রটস্কির দুর্বলতা সুবিদিত। সুতরাং পাতি বুর্জোয়া বিপ্লববাদীদের সম্পর্কে কডওয়েলকে স্মরণ করা যাক। বায়রনের সিনিসিজম এবং রোমান্টিসিজম সম্পর্কে, কডওয়েল বলছেন, বিপ্লবের মুহূর্তে এরা প্রয়োজনীয়, একই সঙ্গে বিপজ্জনক মিত্র। ঐতিহাসিক সংগ্রাম সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা নিয়ে তারা নিজ শ্রেণিকে ত্যাগ করে না। নিজেদের শ্রেণি তাদের বিরুদ্ধে যে বাধ্যবাধকতা অর্পণ করে, সেই অনুশাসনে শাসিত হওয়ার বিরুদ্ধে, এই বিদ্রোহ অহংবোধের প্রবল নৈরাজ্য থেকেই তাদের ব্যক্তিগত সংগ্রামের হিসাবনিকাশ বিপ্লবী শ্রেণির সঙ্গে তাদের মেলবন্ধন ঘটায়। এরা প্রখর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, রোমান্টিক এবং ভঙ্গিবিশ্বাসী। তারা নিজের শ্রেণির ধ্বংস কামনা করে কিন্তু অন্য শ্রেণির উত্থানে বিবমিষা বোধ করে। অথচ সত্য হয়ে ওঠে নতুন শ্রেণির আবির্ভাব। মৃতপ্রায় শ্রেণির বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক মনোভাবের বদলে তখন দাবি করা হয় নতুন শ্রেণির প্রতি গঠনাত্মক আনুগত্য। এরা চলে যায় প্রতিবিপ্লবের দিকে ... দাঁতো এবং ট্রটস্কি এই শ্রেণির।

বায়রনের সঙ্গে ঋত্বিকের কি সাদৃশ্য। এই রকম কোন পূর্ণায়ত বিবর্তনের আগেই বায়রনের মৃত্যু হল। কিন্তু ইংল্যান্ডে সংগ্রাম করার থেকে গ্রীসের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে বেশি আগ্রহী তিনি। তাঁর মধ্যে আমরা দেখেছি যুক্তির বদলে হৃদয়ের বিদ্রোহ। পারিপার্শ্বিক ঘটনার বিরুদ্ধে তিনি অনন্য বীর। তাঁর সংগ্রাম ছিল তথাকথিত নীতিবোধের বিরুদ্ধে, ক্ষুদ্রতার বিরুদ্ধে, প্রথার বিরুদ্ধে। এই বায়রনিজম একট বিশেষ ঝোঁক। কড়ওয়েল তাই লেখেন : And it is also symptomatic that it goes with a complete selfishness and for the sensibilities of others, Milton's Satan has taken on a new guise one far less noble, petulant even. আমি কোন সিদ্ধান্তে যাচ্ছি না। এই চিন্তা স্বগতোক্তি। এ শুধু গবেষকদের হাতে ঋত্বিকের এক অনুগামীর কিছু ভিন্ন ভাবনার ফসল তুলে দেওয়া। 

সমস্যা/তিন

No individual can be right without party—কথাটা উচ্চারণ করেছিলেন ট্রটস্কি। পরবর্তী জীবনে তাঁকে নিজস্ব উচ্চারিত এই সত্য হয়ত বারংবার বিড়ম্বিত করেছিল। ঋত্বিক একক বিপ্লব করতে চেয়েছিলেন, অথচ পার্টিকে বাদ দিয়ে কেউ অভ্রান্ত হতে পারেন না, স্বয়ং ট্রটস্কিও নয়। ঋত্বিকের সমস্ত সমস্যার মূল ছিল হয়ত তাঁর ব্যক্তিগত মার্কসবাদ। তিনি মনেপ্রাণে বিপ্লবী উত্তরণ চেয়েছিলেন। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির উপর আদ্যন্ত আস্থা তাঁর ছিল না। নিজের মত করে মার্কসবাদ বুঝতে চেয়েছিলেন। Marxism আর Collective Unconscious-এর সমীকরণ ঘটাতে গিয়ে Collective Leadership-কে উপেক্ষা করলেন। ইয়ুং-এর সঙ্গে মেলানোর প্রক্রিয়ায় তিনি ভাববাদের দিকে চলে যেতে পারেন, এ প্রশ্ন করায় তিনি স্বীকার করেছিলেন সে সম্ভাবনা। অথচ তাকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন। ছিন্নবাধা পলাতকের জীবনে প্রয়োজন ছিল একটা নোঙর। একমাত্র পার্টির গণসংগ্রাম তাকে ধরে রাখতে পারত। বিপ্লবী কর্মসূচী হয়ে উঠত আলোকস্তম্ভ। দর্শনের তরঙ্গমুখর প্রতিঘাতী সমুদ্রে যথার্থ মার্কসবাদই তাকে পৌঁছে দিত পোতাশ্রয়ে। 

প্রথম প্রকাশ- চিত্রভাবনা
সূত্র- বাসব দাশগুপ্ত,পুনশ্চ স্তালিন এবং অন্যান্য প্রবন্ধ, আনৃণ্য আকাদমিআ, ২০০৫

ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কিত মার্কসবাদী পথে প্রকাশিত অন্যান্য লেখা পড়ুন:
১। ঋত্বিক ঘটক বিজন ভট্টচার্য ও মাতৃতত্ত্ব
২। গান শেষের গান
৩। মেঘে ঢাকা তারা (প্রথম পর্ব)
৪। মেঘে ঢাকা তারা (দ্বিতীয় পর্ব)


প্রকাশের তারিখ: ০৪-নভেম্বর-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Thought provoking article
- KANCHAN MONDAL, ০৬-নভেম্বর-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৩ টি নিবন্ধ
০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫

১১-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৩-নভেম্বর-২০২৫