বাংলার নির্বাচন— দান থেকে অধিকারের দিকে যাত্রা

অনিতা অগ্নিহোত্রী

এবার আসন্ন নির্বাচনে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে হয়। বামেদের তরুণ ব্রিগেড, তাদের সংবেদী অভিজ্ঞ নেতাদের পক্ষে আছে শিক্ষা, সততা, রুজি রোজগারের জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, মেয়েদের রোজগার ও সুরক্ষার ভাবনা। বামদলগুলি এবার সর্বপ্রথম প্রকাশ করেছে বিকল্প ইশতেহার। অর্থ নেই, ঐশ্বর্যের প্রশ্নই নেই, তবু আছে দুরন্ত উৎসাহ আর মানুষের সঙ্গে যুক্ত হবার প্রাণশক্তি। ভোটাররা— ভাবুন, দেখুন। এবার সরকার গড়ার জন্য ভোট না-দিয়ে দুর্নীতি মুক্ত অসাম্প্রদায়িক অধিকার আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ানো বাম প্রার্থীদের ভোট দিন। আপনাদের ভাতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে, কিন্তু প্রজা থেকে নাগরিকে উত্তীর্ণ হবার সুযোগ হারানো যাবে না।

পশ্চিমবঙ্গ নামের রাজ‍্যটি কীভাবে চলে, তা যে কোনও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বিস্ময়। চলে, কারণ খেটে রোজকার করা সাধারণ মানুষ জীবিকার ন‍্যূনতম সম্বলটুকু আঁকড়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন। পথে বাজার নিয়ে বসেন, সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করেন বড়ো টাওয়ারে বা শপিং মলে, পথ-ঘাট পরিষ্কার করেন, চাষ-আবাদের ফসলের লাভের বড়ো ভাগটা ফড়েদের কাছে সঁপে ভেণ্ডার কামরায় ঠাসাঠাসি করে শহরে আসেন। আইসিডিএস কর্মী, আশা দিদি, মিড ডে মিলের দিদি হয়ে বেতন নয়, সামান্য ভাতায় সামলান শিশু প্রসূতি গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য আর পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পঁচানব্বই শতাংশই নির্বিরোধী, শান্তিপ্রিয়, কিছু কম শিক্ষিত দরিদ্র ও নিম্ন মধ‍্যবিত্ত। এছাড়াও আছেন উচ্চশিক্ষিত, কারিগরি দক্ষতা বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞরা, ব‍্যবসায়ী শিল্পপতি সমাজ, যাঁদের কাজ ও দৃশ্যমানতা বাংলাকে একসময় বহু রাজ‍্যের থেকে এগিয়ে রেখেছিল। দক্ষ পরিযায়ী কারিগরদের সুনাম আছে রাজ‍্যের বাইরেও।

কিন্তু গত পনেরো বছরে পশ্চিমবঙ্গের ক্রমাগত অবনমনের কারণ, তার পরজীবী তোলাবাজ শ্রেণি ও শাসকপোষিত ক্রিমিনাল বাহিনী, যারা উপরিউক্ত দুই শ্রেণির ঘাড়ে মাথায় পা দিয়ে লুঠের মুনাফার ভাগ বাঁটোয়ারা করতে থাকেন নিজেদের মধ‍্যে। তৃণমূল নামের রাজনৈতিক দলটির কোনও কাঠামো নেই এবং মূল চালিকা শক্তি হল দুর্নীতি। নানা দলের টুকরো স্প্লিনটারে ভরা মতাদর্শের কোনও বালাই না-রেখে কেবল শীর্ষ নেত্রীর প্রতি আনুগত্যের নিরিখে তৈরি হওয়া দলের সদস্যরা ধীরে ধীরে আনুগত‍্যের স্পষ্টতম পরিভাষাটি রপ্ত করে নেয়— তা হল ভিন্ন রাজনৈতিক মতের দমন, সিন্ডিকেট-বিরোধীদের নাশ এবং যথেচ্ছ লুঠতরাজ ও গুণ্ডামি। এতে সবারই সুবিধা। কেবল রাজনৈতিক কর্মী নয়, দুর্নীতিপরায়ণ পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের ও বাড়-বাড়ন্ত হয়েছে এই সময় কালে। যে যত সমঝোতা করতে পারে, তার পিঠেই সরকারের হাত। দুর্নীতি ও লু্ণ্ঠন সৃষ্ট বৈষম‍্যের একটা বড়ো সুবিধা হল, যারা পার্টির জন্য টাকা তোলে সেই সব ব‍্যক্তি আর সংস্থা যদি নিজেদের মতো করে লুটেপুটে খাবার স্বাধীনতা পায়, তাহলে বাকি মানুষদের রুজি অধিকার জীবিকা এই সব কঠিন আর জটিল বিষয় নিয়ে মাথা না-ঘামালেই শাসকের চলে যায়। পশ্চিম বাংলার ক্ষেত্রেও সেই স্বাভাবিক পরিণতি হয়েছে। কিছু মানুষকে নানা ধরণের ভাতা দেওয়া বাদ দিলে বাকি রাজ‍্য চলে গেছে অটো পাইলটে।

নাগরিক স্বাধীনতার জন্য গণতান্ত্রিক ব‍্যবস্থা যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব‍্যবস্থা, যার মধ‍্যে আইনশৃঙ্খলা একটি জরুরি অঙ্গ। রাজ‍্যে আমরা যাকে বলি গভর্নেন্স, বা ল অ্যান্ড অর্ডার, তা না-থাকলে উচ্চবিত্ত বা শাসক ঘনিষ্ঠদের কিছু আসে যায় না, ক্ষতি হয় সাধারণ দরিদ্র মানুষের, কারণ তাদের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়ে। বাংলায় যে আইনের শাসন নেই তার প্রমাণ আমরা বেশ কয়েক বছর ধরেই দেখছি। বগটুই-এর হত‍্যা ও প্রতিহত‍্যা, সিউড়ির জননেতার শোষণতন্ত্র, সন্দেশখালিতে মহিলাদের উপর সন্ত্রাস এবং শেষ পর্যন্ত কোনও শাস্তিবিধান না-হওয়া। মেয়েদের উপর আক্রমণের নানা ভয়াবহ ও লজ্জাজনক ঘটনা— পার্কস্ট্রীট, কামদুনি, তেহট্ট— এবং সর্বত্র আক্রান্তকে আক্রমণ, আরজি করের তরুণী ডাক্তারের প্রাতিষ্ঠানিক হত‍্যার পরও ঘটেছে প্রকাশ্য দিবালোকে ল কলেজে ধর্ষণ। আরজি করে প্রশাসনের প্রত‍্যক্ষ হস্তক্ষেপের ফলে সাক্ষ‍্যপ্রমাণের লোপ হয়েছে এবং তারপরেও প্রকৃত আরও কিছু অপরাধীকে বাঁচানোর অভিপ্রায়ে একমাত্র অভিযুক্তকে ফাঁসি দিয়ে পৃথিবী থেকে উধাও করে দেবার নিরন্তর চেষ্টাও আমরা ভুলে যাইনি। বাংলার সরকার যে অর্থনৈতিক ও মানবিক অধিকারের পুরোপুরি বিরোধিতা করে চলেছে তার প্রমাণ, কোন প্রশাসনিক ব‍্যবস্থার ফলে নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কোর্টের আদেশে এবং কোণঠাসা না-হওয়া পর্যন্ত সরকার উচ্চতর ন্যায়ালয়ে যেতেই থাকে। কোটি কোটি টাকা আইনজীবীদের ফীস-এ ব‍্যয় করে।

ছোটো একটা উদাহরণ। চিংড়িঘাটার মোড়ের কাছে মেট্রো রেলের ব্রিজের মাত্র চারটে থামের ব‍্যবধান বাকি রয়ে গেছে। মাস দিন নয়, আড়াই বছর। রাজ‍্য সরকারের কাছে রেলবিভাগের আবেদন মঞ্জুর হয়নি। ওখানে ট্রাফিক বন্ধ রাখা যাবে না। রেলকে যেতে হয়েছে হাইকোর্টের কাছে। হাইকোর্টের একাধিক নির্দেশকে মানা হয়নি, কখনও পরীক্ষা, কখনও পুজো, তারপর খেলা ইত্যাদি কারণে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট রাজ‍্যকে তিরস্কার করে এই বলে যে সাধারণ মানুষের আয়ত্তের মধ‍্যে যে-গণপরিবহন, তার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকার নিজেই। দেবীর প্রকল্পের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। কাজ থেমে আছে। এবং চারদিন কেন ট্রাফিক বন্ধ করা যাবে না, তার যুক্তি দিতে অজস্র টাকা খরচ হয়েছে আইনজীবীদের ফীসের জন্য।

এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে মানুষের অধিকার খর্ব করার জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগ নিয়েছে রাজ‍্য সরকার নিজেই। রাজ‍্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ-র বকেয়া যা তাঁদের অধিকার হিসেবে মান্যতা পেয়েছে কোর্টের আদেশে, তাও দিতে বিলম্ব ও কম দেওয়ার খেলায় সরকার আবার আদালতের অবমাননার দায়ে পড়তে পারে। এই মনোভাব নির্বাচিত সরকারের কাছে কেউ প্রত‍্যাশা করতে পারে না। সরকারের বাজেট যদি কোনও বিবেচনার বিষয় হত, তাহলে ভোটের জন্য যুবকদের ভাতা যা আগস্ট থেকে প্রদেয় ছিল, তা এপ্রিলে এগিয়ে আনা হল কেন? পুরো প্রজা সমাজ আজ নানা ভাতার লাইনে, অথচ শূন্যপদ ভরা হচ্ছে না, শিল্প নেই, জীবিকা উপার্জনের সম্মানজনক ব‍্যবস্থা নেই। এভাবে কতদূর যাবো আমরা?

হতভাগ্য বাংলা এখন কেন্দ্রীয় শাসকদলেরও পাখির চোখ। নির্বাচনে জেতার জন্য মরিয়া বিজেপি কেন্দ্রীয় সমর্থন ও নির্বাচন কমিশনের বিশেষ হস্তক্ষেপ থেকে লাভবান হতে চাইছে। আমাদের রাজ্য নির্বাচনে চলেছে ভোটার তালিকার এক দ্রুত, আত্মবিধবংসী বিশেষ নিবিড় সংশোধন পদ্ধতির মধ‍্যে দিয়ে। শুনেছি এত দ্রুত সংশোধন করা সম্ভব নয় বলে ঠিক হয়েছিল ত্রিশটি নির্বাচিত বিধানসভা কেন্দ্রে এই প্রক্রিয়া চালু হবে। কিন্তু এ-সিদ্ধান্ত বদলাল। গত চার পাঁচ মাসে ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে মিল রেখে ভোটার তালিকা সংশোধন করতে গিয়ে বিরাট বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষকে। প্রয়োজনীয় নথির তালিকা বদলেছে, বদলে গেছে সফটওয়্যার, লজিকাল ডিসক্রেপানসির ঘেরে পড়ে বাদ গেছে লক্ষ লক্ষ নাম। রাজ‍্য সরকারের কৌশলী অসহযোগিতার ফলে উচ্চতম ন্যায়ালয়ের নির্দেশে বিচারবিভাগের হাতে চলে গেছে পুরো সংশোধন। ৬০ লক্ষের মতো বিচারাধীন কেসের ২৭ লক্ষ যাবে ট্রাইবুনালে নিষ্পত্তির জন্য। তাদের মধ‍্যে কতজন ভোট দিতে পারবেন তা অনিশ্চিত। এবং ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে না-গেলে তাদের ভবিষ্যৎ কি তা নিয়েও অনিশ্চয়তা। মানুষের ভয় আর চিন্তার সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে বিজেপি। যদিও বিচারাধীন বাতিল কেসগুলির মধ্যে হিন্দু নাগরিকদের সংখ্যাই বেশি, তবু মুর্শিদাবাদ মালদহের বহু বুথে অসংখ্য মহিলা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার বাদ যাবার ফলে মনে হওয়া স্বাভাবিক, যে ভোটার লিস্টকে নাগরিকত্বের প্রমাণ তৈরি করার পদক্ষেপ করা হচ্ছে। বিজেপি যে সাম্প্রদায়িক এবং সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত বিচার্য বিষয়গুলির শীর্ষে নেই, তা অনেক বিজেপি শাসিত রাজ্যেই পরিষ্কার। মেয়েদের শিক্ষা স্বাস্থ্য নয়, তাদের নিয়ন্ত্রণ, কাজের ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে ঘরে বন্দি করে রাখা, দলিত ও আদিবাসীদের শোষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন তাদের শাসন নীতির পতাকা হয়ে উড়ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের কাছের জেলাগুলি জামাতের প্রতি সমর্থন দেখিয়েছে। কিন্তু তার জন্য যদি বাংলা মুসলিমদের সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চোখে দেখে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়, তা এ-রাজ‍্যের গণতান্ত্রিক ব‍্যবস্থাকে নষ্ট করে দেবে।

📌 বিধানসভা নির্বাচন সংক্রান্ত অন্যান্য লেখাগুলি পড়তে ক্লিক করুন

গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি বাংলার কিছু কিছু অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণাপূর্ণ বিস্তার, স্থানীয় লোকাচারে হিন্দু রাষ্ট্রের চিহ্নগুলি মাথা তুলছে। আগেও রামনবমীতে অস্ত্র নিয়ে শোভাযাত্রা হয়েছে। মুর্শিদাবাদে রামনবমীর সময় দুই সম্প্রদায়ের ভিতর হিংসা উৎসবের ভাবনাকে আঘাত করেছে। রাজ‍্যের শাসক দলও এই সাম্প্রদায়িক প্রবণতাকে ইন্ধন দিচ্ছে সরকারের অর্থে একের পর উপাসনা স্থল তৈরি করে, রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে দায়িত্বহীনভাবে মিশিয়ে। বিজেপির এই প্রভাব ২০১৬ থেকে বেড়ে চলার পিছনে কি শাসক দলের নৈতিক দুর্নীতির কোনও সম্পর্ক নেই?

তবু এবার আসন্ন নির্বাচনে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে হয়। বামেদের তরুণ ব্রিগেড, তাদের সংবেদী অভিজ্ঞ নেতাদের পক্ষে আছে শিক্ষা, সততা, রুজি রোজগারের জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, মেয়েদের রোজগার ও সুরক্ষার ভাবনা। বামদলগুলি এবার সর্বপ্রথম প্রকাশ করেছে বিকল্প ইশতেহার। অর্থ নেই, ঐশ্বর্যের প্রশ্নই নেই, তবু আছে দুরন্ত উৎসাহ আর মানুষের সঙ্গে যুক্ত হবার প্রাণশক্তি। ভোটাররা— ভাবুন, দেখুন। এবার সরকার গড়ার জন্য ভোট না-দিয়ে দুর্নীতি মুক্ত অসাম্প্রদায়িক অধিকার আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ানো বাম প্রার্থীদের ভোট দিন। আপনাদের ভাতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে, কিন্তু প্রজা থেকে নাগরিকে উত্তীর্ণ হবার সুযোগ হারানো যাবে না।

বাংলায় অব‍্যবহিত বাম শাসনের চেয়েও জরুরি হল একটি সজীব, অধিকারপন্থী বিধানসভার দিকে সচেতনভাবে এগোনো। কেবল মাত্র ভোটাধিকার প্রয়োগে নয়, নিরন্তর প্রতিরোধ ও জনসংগঠন হল গণতান্ত্রিকতার জিয়নকাঠি। এ-কাজ সারা বছর ধরে করতে পারে বামপন্থী দলগুলিই। তাদের শিক্ষা আছে, অভিজ্ঞতা আছে, গণ-আন্দোলনে জড়িয়ে থাকার ইতিহাস রয়েছে। তা এবার রাজ‍্যে চেতনার বদল আনুক।


প্রকাশের তারিখ: ১৯-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org