পুদুচেরি-সহ নির্বাচনে চার রাজ্য। কেরালা, তামিলনাডু, আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গ। চার রাজ্যে চার সরকার। ইতিহাসে নজির তৈরি করে কেরালায় গত দশবছর বামপন্থীরা, এলডিএফ সরকার। তামিলনাডুতে পাঁচবছর ধরে বামপন্থীদের সমর্থনে ডিএমকে সরকার। আসামে দশবছর ‘ডাবল ইঞ্জিন’, বিজেপি সরকার। আর পশ্চিমবঙ্গে, দেড়দশক ধরে তৃণমূল সরকার।
বাংলায় প্রথম দফার ভোটের সাতদিন-ও বাকি নেই। প্রচারে প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা ছোটাচ্ছে তৃণমূল, বিজেপি। একবারও বলছে না কোথায় কতটা তারা কাজ করেছে? মানব উন্নয়ন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষায় কে কোথায় দাঁড়িয়ে? রিপোর্ট কার্ড কী? যদিও, স্কোর-কার্ডে স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গের লড়াই পিছিয়ে থাকা আসামের সঙ্গে। আর একেবারে সামনে কেরালার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তামিলনাডু।
মানব উন্নয়ন সূচক
কেমন চেহারা কেরালার? ২০২৩, রাষ্ট্রসঙ্ঘের উন্নয়ন কর্মসূচীর সংজ্ঞা মেনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনধারণের মাপকাঠিতে তৈরি মানব উন্নয়ন সূচকে ২৯টি রাজ্যের মধ্যে দ্বিতীয় কেরালা। সূচকে কেরালায় জীবনযাত্রার মান ০.৮৬০। যেখানে জাতীয় গড় ০.৭৩২। প্রথম গোয়া (০.৮৬২)। দশে তামিলনাডু (০.৭৮৭)। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ আসামের স্থান চব্বিশে। জীবনযাত্রার মান জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক নিচে (০.৬৯৯)। পশ্চিমবঙ্গেরও তাই (০.৭১৯), স্থান একুশে (গ্লোবাল ডাটা ল্যাব)।
 মাথাপিছু আয়
গত দশক ধরেই শক্ত অর্থনৈতিক বিকাশের ওপর দাঁড়িয়ে কেরালা। স্টেট ফিনান্সেস: এ স্টাডি অব বাজেটস অব ইন্ডিয়ান স্টেটস শীর্ষক রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিকতম তথ্যে কেরালায় গত একদশকে মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ! ২০২৪-২৫, রাজ্যে মাথাপিছু আয় এখন ৩,০৮,৩৩৮ টাকা। যেখানে জাতীয় গড় ২,০৫,৩২৪ টাকা। ২৩টি রাজ্যের মধ্যে কেরালা এখন উঠে এসেছে সাতে। যেখানে ২০২১ সালেও ছিল এগারো-তে। তামিলনাডুর স্থান চারে, মাথাপিছু আয় ৩,৬১,৬১৯ টাকা। আসামের স্থান ১৮। মাথাপিছু আয় ১,৫৯,১৮৫ টাকা, কেরালার প্রায় অর্ধেক, জাতীয় গড়ের অনেক নিচে। প্রায় একইরকম অবস্থা পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যে মাথাপিছু আয় ১,৬৩,৪৬৭ টাকা। আসামের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও, জাতীয় গড়ের অনেক নিচে। পশ্চিমবঙ্গের স্থান ১৬। ওড়িশা, ত্রিপুরা পর্যন্ত বাংলার চেয়ে ওপরে (রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হ্যান্ড বুক অব স্ট্যাটিসটিক্স অন ইন্ডিয়ান স্টেটস, ২০২৪-২৫, পৃষ্ঠা: ৬৪)। ওড়িশায় ১,৬৮,৯৬৬ টাকা। ত্রিপুরায় ১,৯২,৮৪২ টাকা।
 গ্রামে দৈনিক মজুরি
গ্রামীণ অর্থনীতি-ও যথেষ্ট চাঙ্গা কেরালায়। গ্রামে গড় দৈনিক মজুরি ৮৬৮ টাকা ৭০ পয়সা। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। জাতীয় গড়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি! ১৮টি রাজ্যের মধ্যে এক-নম্বরে। যেখানে জাতীয় গড় ৩৯৮ টাকা। দ্বিতীয় তামিলনাডু, দৈনিক মজুরি ৫৭৩ টাকা ২০ পয়সা। আর আসাম? ৯-নম্বরে। গড় দৈনিক মজুরি ৩৮৪ টাকা ৮০ পয়সা, জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেকটা কম। পশ্চিমবঙ্গে আরও কম, ৩৪৭ টাকা ২০ পয়সা। স্থান ১৪-নম্বরে। এমনকি ওড়িশা, ত্রিপুরার মতো রাজ্যে পর্যন্ত খেতমজুরদের গড় দৈনিক মজুরি বাংলার চেয়ে বেশি (রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হ্যান্ড বুক অব স্ট্যাটিসটিক্স অন ইন্ডিয়ান স্টেটস, ২০২৪-২৫, পৃষ্ঠা: ২৫০)। ওড়িশায় ৩৬৮ টাকা ৭০ পয়সা। ত্রিপুরায় ৩৭৯ টাকা ৮০ পয়সা।
📌 বিধানসভা নির্বাচন সংক্রান্ত অন্যান্য লেখাগুলি পড়তে ক্লিক করুন
বাংলায় নেই রেগা-র কাজ। বেবাক উধাও। তিনবছরের ওপর রেগার কাজ বন্ধ। বকেয়া রেগার আগের টাকা। কাজের খোঁজে তাই গ্রাম উজাড় করে দক্ষিণে যাওয়ার স্রোত। স্বাভাবিক। অর্থনীতিবিদ জাঁ দ্রেজ দেখিয়েছেন, রেগার সফল রূপায়ণে কীভাবে বাড়ে গ্রামের প্রকৃত মজুরি। আর রেগা না থাকলে, কীভাবে শ্রম আরও সস্তা হয়, তার জ্বলন্ত প্রমান বাংলা। পুরুষ-শূন্য গ্রামে থেকে যেতে হয় ঘরের মেয়েদের। সংসার তাদেরকেই টানতে হয়। বাইরে থেকে কখনও টাকা আসে। কখনও আসে না। পেটের জ্বালায়, হাড়ি চড়াতে তাঁরা পড়েন বেআইনি মাইক্রোফিনান্সের মৃত্যুফাঁদে। গ্রামের ভাষায়, বৌ-বন্ধকী ঋণ
 শিশু মৃত্যুর হার
প্রথম জন্মদিন পেরনোর আগেই শিশু-মৃত্যুর হার (ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট, আইএমআর) গোটা দেশে সবচেয়ে কম কেরালায়! জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (২০২১-২২)-র তথ্যে, প্রতি ১০০০ সদ্যোজাতের মধ্যে মৃত্যু হার পাঁচেরও নিচে, ৪.৪! এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও চেয়েও কম। যেখানে ভারতে জাতীয় গড় ৩৫.২, কেরালার আট-গুণ! সবচেয়ে বেশি যোগীর রাজ্য উত্তরপ্রদেশে, ৫০.৪, কেরালার প্রায় বারো-গুণ! বিপরীতে, তামিলনাডু পাঁচ-নম্বরে, আইএমআর ১৮.৬। অন্যদিকে আসামে ৩১.৯। ২৯টি রাজ্যের মধ্যে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার রাজ্যের স্থান ১৯। পশ্চিমবঙ্গে এক হাজার সদ্যোজাতের মধ্যে মৃত্যু হার ২২। রাজ্যের স্থান সাতে।
শিশুদের চরম অপুষ্টি
চরম অপুষ্টির অন্যতম লক্ষণ— ৫-বছর পর্যন্ত বয়সের নিরিখে উচ্চতা কম হওয়া শিশুর হার কেরালায় ২৩ শতাংশ। ২৯টি রাজ্যের মধ্যে কেরালা ২-নম্বরে। একে সিকিম। জাতীয় গড় ৩৬ শতাংশ। চার-নম্বরে তামিলনাডু (২৫ শতাংশ)। আসামে ৩৫ শতাংশ। রাজ্যের স্থান ২০-তে। প্রায় একই অবস্থা পশ্চিমবঙ্গে, ৩৪ শতাংশ। রাজ্যের স্থান আসামের ঠিক একধাপ ওপরে, ১৯-নম্বরে।
 নিকাশির সুযোগ
উন্নত নিকাশি ব্যবস্থার সুযোগ থেকে বঞ্চিত পরিবারের হার কেরালায় ১ শতাংশেরও কম। মাত্র ০.২ শতাংশ। দেশের মধ্যে ২-নম্বরে। একে মিজোরাম। যেখানে জাতীয় হার ১৯.৩ শতাংশ। তামিলনাডুতে এই হার ২১.৭ শতাংশ, স্থান ২৩-ন্বরে। আসামে ১২ শতাংশ, স্থান ১৮-নম্বরে। পশ্চিমবঙ্গে ১১.৯ শতাংশ, স্থান আসামের ঠিক একধাপ ওপরে, ১৭-নম্বরে।
প্রসূতি মৃত্যুর হার
প্রসূতি মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম কেরালায়। প্রতি এক লক্ষ জীবিত সন্তান প্রসবে প্রসূতির মৃত্যুর গড় হার ১৯। যেখানে জাতীয় গড় পাঁচগুণের বেশি, ৯৭। তামিলনাডুতে এই হার ৫৪। রাজ্যের স্থান পাঁছ-নম্বরে। আসামে এই হার আবার জাতীয় গড়ের দ্বিগুণের বেশি, আর কেরালার চেয়ে দশগুণেরও বেশি, ১৯৫। উনিশটি রাজ্যের মধ্যে আসামের স্থান সবার নিচে, ১৯-তম। পশ্চিমবঙ্গে ১০৩, জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি, আর কেরালার চেয়ে পাঁচগুণেরও বেশি। রাজ্যের স্থান ৯-নম্বরে।
স্কুলের বাইরে
কখনও স্কুলে যায়নি, ১৫-৪৯ বছরের এমন মহিলাদের হার কেরালায় ১ শতাংশেরও কম, ০.৮ শতাংশ। ২৯টি রাজ্যের মধ্যে কেরালা এক-নম্বরে। এক্ষেত্রে জাতীয় হার ২২.৬ শতাংশ। আসামে এই হার জাতীয় গড়ের চেয়ে কম, ১৮.৬ শতাংশ। আসামের স্থান ১৭-তে। পশ্চিমবঙ্গে ১৮.৫ শতাংশ, স্থান ১৬-নম্বরে।
পাশাপাশি, কখনও স্কুলে যায়নি, ১৫-৪৯ বছরের এমন পুরুষদের হার কেরালায় ২.৩ শতাংশ। এই প্রশ্নেও, ২৯টি রাজ্যের মধ্যে কেরালা এক-নম্বরে। এক্ষেত্রে জাতীয় হার ১০.৭ শতাংশ। আসামে এই হারও জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি, ১২.৫ শতাংশ। আসামের স্থান ২১-নম্বরে। পশ্চিমবঙ্গে আরও বেশি, ১৩ শতাংশ। স্থান ২৩-নম্বরে।
স্কুলছুটের হার
নবম-দশম শ্রেণিতে গড় বার্ষিক স্কুলছুটের হার কেরালায় ৫.৫ শতাংশ। ২৯টি রাজ্যের মধ্যে কেরালার স্থান ছ’-নম্বরে। তিন-নম্বরে তামিলনাডু, স্কুলছুটের হার ৪.৫ শতাংশ। যেখানে জাতীয় গড় ১২.৬ শতাংশ। আসামে এই হার ২০.৩ শতাংশ। স্থান ২৬-নম্বরে। পশ্চিমবঙ্গে এই হার কেরালার তিনগুণেরও বেশি, ১৮ শতাংশ। রাজ্যের স্থান আসামের ঠিক ওপরে, ২৫-নম্বরে।
উচ্চশিক্ষায় লিঙ্গ-সমতা
উচ্চশিক্ষায় লিঙ্গ-সমতার প্রশ্নে এক-নম্বরে কেরালা। সূচকে কেরালার মান ১.৪৪। ২৯টি রাজ্যের মধ্যে তামিলনাডুর মান ১.০১, স্থান ১৬-নম্বরে। আসামের মান ১.০৯, স্থান ন’-নম্বরে। পশ্চিমবঙ্গের মান ১.০৩।
ঋণ: দ্য হিন্দু
প্রকাশের তারিখ: ১৬-এপ্রিল-২০২৬ |