প্রথম পর্বের পর
দলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই ফ্র্যাঞ্চাইজার হিসেবে কাজ করেন। তিনি নিজের ‘ব্র্যান্ড’-এর বিনিময়ে দলীয় কর্মী ও স্থানীয় নেতাদের আনুগত্য, নির্বাচনী সংগঠন, অর্থ ও সম্পদ সংগ্রহ এবং তার সরবরাহ বজায় রাখেন। দলের মধ্যে তাঁর নেতৃত্ব চূড়ান্ত ও নিরঙ্কুশ, তাঁর ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব ছাড়া দলীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখা কঠিন। এই মডেল যেমন দলীয় ঐক্য ও নির্বাচনী সাফল্যকে উৎসাহিত করে, তেমনি এটিও নিশ্চিত করে যে ফ্র্যাঞ্চাইজি নেতারা মমতার ক্যারিশমা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকেন। এই ব্যবস্থার ভিতরে বহু পরস্পরবিরোধী স্রোত রয়েছে— কিছু অভ্যন্তরীণ, কিছু বাহ্যিক— যা মাঝে মাঝেই ফ্র্যাঞ্চাইজি কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়ার মতো টানাপড়েন তৈরি করে। সেই প্রসঙ্গে পরে ফিরে আসব।
এই ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ নেতার কারা? আগেই উল্লেখ করেছি, বাম শাসনের শেষ পর্ব এবং তৃণমূল শাসনের প্রায় দুই দশকে বাংলায় এক নতুন রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির উত্থান ঘটেছে। এঁরাই তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতাকাঠামোকে ফ্র্যাঞ্চাইজির মতো কার্যকর রাখছেন। তাঁদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা প্রায়শই ব্যবসায়িক উদ্যোগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই নেতৃত্ব নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত— যেমন কাঁচামাল সরবরাহ, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, পরিবহণ নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ, চালকল মালিকানা, তেলজাতীয় খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও কটন, ট্রেডিং নেটওয়ার্কের দখল এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে মহাজনী কারবার। জ়াদ মাহমুদ ও সোহম ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার ফলে তৃণমূল ও বিজেপি উভয় দলের রাজ্য ও সংসদীয় প্রার্থীদের ঘোষিত সম্পদে নাটকীয় বৃদ্ধি ঘটেছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হল তাঁদের পেশাগত পরিচয়ে পরিবর্তন। আগে যেখানে ‘চাকরিজীবী’ পরিচয় ছিল প্রধান, এখন সেখানে ‘ব্যবসায়ী’ ও ‘সমাজকর্মী’ পরিচয় ক্রমশ বাড়ছে।
ব্যবসা ও আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই নতুন এলিট শ্রেণি এক ভিন্ন মাত্রা পায়, যখন রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়া হয়। বর্তমানে রাজ্যের উৎপাদন খাত চরম সংকটে, কৃষিক্ষেত্রেও নেই বিশেষ অগ্রগতি বা সরকারি উৎসাহ। এই প্রেক্ষিতে মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি পরিসরের সেবা ও উৎপাদন ইউনিটগুলিরই কিছুটা বিকাশ ঘটেছে, যারা এখন রাজ্যের অ-কৃষি অর্থনীতির প্রধান ভরকেন্দ্রে। এই ইউনিটগুলির সংখ্যা এবং সেখানে নিয়োজিত শ্রমশক্তির নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ সারাদেশে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এই ইউনিটগুলির অনানুষ্ঠানিক চরিত্র এবং দ্বৈত ভূমিকা— একদিকে মুনাফার উৎস, অন্যদিকে বহু মানুষের জীবিকার অবলম্বন— তাদের রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এই কার্যক্রম অব্যাহত ও নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজন হয় আমলাতান্ত্রিক সহায়তা, পুলিশের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিযেগিতাকে নির্মূল করে এলাকাভিত্তিক একচ্ছত্র অধিপত্য কায়েম করা। এর ফলেই পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসা ও আর্থিক দুর্নীতি একধরনের প্রতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেছে বলা যায়।
রাজনৈতিক হিংসার প্রধান লক্ষ্যই হল ভূমিস্তর থেকে এলাকা দখল। সে-কারণেই পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীশূন্য ভোট হয়, এবং একই সঙ্গে চলে দলীয় কোন্দল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা— একদিকে বিরোধীদের দমন, অন্যদিকে শাসক দলের অভ্যন্তরেই সংঘর্ষ। একই কারণে বেআইনি ব্যবসার পরিসর-ও ক্রমবর্ধমান— যেমন কয়লা ও বালি উত্তোলন, সীমান্ত পেরিয়ে গরু পাচার, জঙ্গল ধ্বংস করে কাঠের কারবার, জলাজমি ভরাট করে বহুতল নির্মাণ, সরকারি পরিষেবার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন ইত্যাদি। কিন্তু এই সব বেআইনি কার্যক্রম যে কোনোরকম সামাজিক মান্যতা বা জনসমর্থন পায় না, তা নয়। আইন বহির্ভূত বটে, কিন্তু এর ফলে কতিপয় কিছু মানুষের মুনাফার পাশাপাশি প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়, যা রাজ্যের আর্থিক অধোগতির কারণে গরিব মানুষের আরও বেশি নির্ভরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কাজেই, একদিকে দুর্নীতির পাকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, অন্যদিকে রাজনীতি আর অর্থনীতির ক্ষমতা-বলয়ের পারস্পরিক সম্মিলন— এর মধ্য দিয়েই যে-প্রক্রিয়ার জন্ম হয়, তাকে আমরা অসংগঠিত ক্ষেত্রের স্বজনপোষণ-ভিত্তিক ধনতন্ত্র বা কর্পোরেট-বহির্ভূত ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বলে চিহ্নিত করতে পারি।
রাজনৈতিক হিংসা আর এলাকা দখলের রাজনীতি সবচেয়ে প্রকট হয় পঞ্চায়েত কিংবা পৌরসভা নির্বাচনের সময়। ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচন রক্তাক্ত সংঘর্ষের জন্য মানুষের স্মরণে থাকবে। ওই নির্বাচনে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং তৃণমূল দল ৩৪.২৪ শতাংশ পঞ্চায়েত আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে নেয়। তৃণমূলের স্থানীয় স্তরের সংগঠন ও দখলদারির ক্ষমতা প্রদর্শন এমন উচ্চতায় পৌঁছয় যে বাম ও কংগ্রেস কার্যত প্রতিযোগিতা থেকেই মুছে যায়। এই দুই দলের অনুগামীরা সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়েন, প্রত্যন্ত গ্রামে-শহরে তৃণমূলের হিংস্রতার শিকার। পার্টি অফিস দখল হয়ে যায়, বাম বা কংগ্রেস নিজেদের কর্মীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল-বিরোধী ভোটাররা এই দুই দলের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস হারান, এবং তাঁদের চোখে তৃণমূল কংগ্রেসের একমাত্র বিকল্প হয়ে ওঠে বিজেপি, যারা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন। এর ফলে রাজ্যে ভোটের প্যাটার্নে এক নাটকীয় রদবদল ঘটে যায়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি-র ভোট ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, বামেদের ভোট ২২ শতাংশ হ্রাস পায়।
তবে এই পরিবর্তন ভোটারদের শুধুমাত্র স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল ভাবলে ভুল হবে। বরং বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সংঘ পরিবার যে সামজিক ভিত্তি গড়ে তুলছে, তা নিশ্চিতভাবেই রাজ্যে বিজেপির উত্থানকে সহায়তা করেছে। সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য ও নৃতত্ত্ববিদ সুমন নাথ যেমন দেখিয়েছেন, কালিয়াচক, ইলামবাজার, চন্দ্রকোনা, হাজীনগর, বাদুড়িয়ার মতো এলাকায় রামনবমী ও ঈদকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আরএসএস বাংলায় তাদের শাখার সংখ্যা ৭৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০০ করেছে, যার মধ্যে দক্ষিণবঙ্গেই রয়েছে প্রায় ৯০০। এছাড়া, সংঘ পরিবার প্রায় ৩৩০টি বিদ্যালয় স্থাপন করেছে, যেখানে ৬৫,০০০-এর বেশি ছাত্র পড়ছে। অয়ন গুহ এবং প্রস্কন্ন সিংহ রায় তাঁদের লেখায় দেখিয়েছেন, দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দুত্বের সঙ্গে আত্মপরিচয় ভিত্তিক রাজনীতির নতুন সংযোগ গড়ে উঠেছে। সংঘ পরিবার দেশভাগ এবং হিন্দু নির্যাতনের আখ্যানকে ব্যবহার করে এক বিশেষ মেরুকরণ ঘটাতে অনেকটাই সফল হয়েছে।
প্রশ্ন হল, বিজেপি ও সংঘ পরিবারের এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, ২০১৯ পরবর্তী যতগুলো নির্বাচন রজ্যে সংঘটিত হয়েছে, তার প্রায় সবকটিতেই তাদের পক্ষে সমর্থনের ধারা কেন নিম্নমুখী। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির গদি দখলের প্রধান অন্তরায় দুটি। তার একটি হল, নরেন্দ্র মোদির জনমোহিনী বা ‘পপুলিস্ট’ রাজনীতির বিকল্প হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা-কেন্দ্রিক জনমোহিনী রাজনীতি। দ্বিতীয়ত, ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক যে রাজনৈতিক-অর্থনীতি বাংলায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তাতে জীবিকার স্বার্থে কৌমভিত্তিক বিভাজনের বদলে হিন্দু-মুসলমানের সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা আবশ্যিক— যা ধর্মীয় মেরুকরণের পথে বিজেপি-র জন্য বড়ো বাধা হয়ে উঠেছে।
‘পপুলিজম’ এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল, যা কিছু নির্দিষ্ট যুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। একজন পপুলিস্ট নেতা বা একটি দল নিজেকে ‘প্রকৃত জনগণ’-এর একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে এবং বিরোধী শক্তিকে ‘অবৈধ’ বা ‘সংখ্যালঘু স্বার্থরক্ষাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। একবার তারা ক্ষমতায় এলে, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না-করে ‘জনগণের নামে’ নিজের ইচ্ছামতো শাসন চালায়। নয়া উদারনৈতিক সংস্কারের ফলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্রমশ কমেছে। পপুলিস্ট নেতারা এই অসন্তোষকে পুঁজি করে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনের পরিবর্তে, তারা বিদ্যমান শোষণমূলক কাঠামোই টিকিয়ে রাখেন সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থে।
এই রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার একটি উত্তেজনাপূর্ণ ভাষ্য, যেখানে জনসংখ্যার একাংশকে ‘শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বিজেপির ক্ষেত্রে এই ‘শত্রু’ হলেন বামপন্থী ও উদারপন্থীরা, যাদের ‘শহুরে নকশাল’, ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘তোষণবাদী’ বলে দাগানো হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে ‘শত্রু’ হল ‘৩৪ বছরের বাম শাসন’ এবং ‘বহিরাগত’ বিজেপি। গরিব মানুষের স্বার্থ রক্ষার নামে রাজ্য সরকার একের পর এক প্রশাসনিক নীতি লঙ্ঘন করেছে। এর সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত সরকারি অর্থে মন্দির নির্মাণ। এরই পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের উৎসবগুলিকে এক কৌশলগত রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছেন, যার মাধ্যমে স্থানীয় ক্লাবগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিনোদন জগতের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করে তিনি এই পপুলিজমে এক ধরনের গ্ল্যামারও যোগ করেছেন— এমনকি সেই জগতের বহু ব্যক্তিকে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা নরেন্দ্র মোদির জনমোহিনী ভাবমূর্তি নির্মাণের জন্য প্রয়োজন একগুচ্ছ কল্যাণমূলক প্রকল্প, যা সরাসরি গরিব মানুষের কাছে খাদ্যদ্রব্য, ব্যবহার্য পণ্য, ন্যূনতম মজুরি বা আর্থিক অনুদান পৌঁছে দেয়। এই সবই আয় বা জীবিকার আংশিক চাহিদা মেটানোর জন্য জরুরি। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই নাগরিকের অধিকার হিসেবে নয়, নেতার ব্যক্তিগত অনুগ্রহ হিসেবেই আসে। ফলে নেতার জনহিতৈষী ভাবমূর্তি আরও শক্ত হয় এবং তাঁর প্রতি আনুগত্যও বাড়ে। সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে লক্ষ করে বিশেষ বিশেষ প্রকল্প গড়ে তোলা হয় এই অনুগত্য বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে। ডিজিটাল অর্থনীতির মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ভরসায় নেতা ও জনতার মধ্যে একধরনের ‘রাজা ও প্রজা’র মতো সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা প্রতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের পরিপন্থী। পপুলিজম, মিডিয়া এবং কল্যাণমূলক প্রকল্পের এই মেলবন্ধন নিঃসন্দেহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তিকে তাঁর ভোটারদের মধ্যে আরও মজবুত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র নির্বাচনী সাফল্যের পথে আরেকটি বড়ো বাধা হল রাজ্যের ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনৈতিক অর্থনীতি, যা জনসংখ্যার বিন্যাস ও জীবিকার উপর নির্ভরশীল। নির্বাচনে ফ্র্যাঞ্চাইজির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে এখানে বিভিন্ন সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে সহযোগিতা অপরিহার্য। প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান জনসংখ্যা এবং হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে— বিশেষত গ্রামাঞ্চলে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ধর্মীয় মেরুকরণের পথে একটি স্বাভাবিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এই ঘনিষ্ঠতাই গ্রামীণ সমাজে ধর্মভিত্তিক বিভাজনের প্রবণতাকে রুদ্ধ করে রাখে। বিজেপি যতই ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করেছে, মুসলিম ভোট ততই তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে একত্রিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সহযোগিতামূলক সামাজিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র মেরুকরণের মাধ্যমে হিন্দু ভোট সংহত ও একত্রিত করা সহজ নয়।
যদিও বিজেপি সমাজের একটি অংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি এখনও কৌশলগত অনিশ্চয়তায় ভুগছে। নেতৃত্বের স্তরে উগ্র ও মধ্যপন্থী অবস্থানের মধ্যে টানাপোড়েন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বাঙালি সমাজচেতনার পরিপন্থী পুরুষতান্ত্রিক হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির উদ্যাপন— সব মিলিয়ে বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে একটি স্থায়ী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক অভিমুখ গড়ে তুলতে বাধা দিচ্ছে।
তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী লড়াইয়ে যে মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে তৃণমূলের পক্ষেই জনসমর্থনকে ঠেলে দেবে— যেমন এক সময় তা বামফ্রন্টের দিকে ছিল? একথা অস্বীকার করা যায় না যে আজ মাঠঘাটে লোকবল হোক বা বুথভিত্তিক সংগঠন— তৃণমূলের কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তবে অন্যদিকে, দলের জনবিচ্ছিন্নতার বীজ লুকিয়ে রয়েছে তার ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই, যাকে আমরা ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনীতি’ নামে চিহ্নিত করেছি। এই রাজনীতি দলনেতাদের এলাকাভিত্তিক আধিপত্যের উপর নির্ভরশীল, যেখানে দুর্নীতি ও হিংসাই ক্ষমতার অলিন্দে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা হয়ে উঠেছে। এই ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল, আদর্শগত ভিত্তি-ও প্রায় অনুপস্থিত— ‘বাংলা আঞ্চলিকতা’ ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। ফলে এই ব্যবস্থায় জনসমর্থন মূলত চাওয়া-পাওয়ার হিসাবেই টিকে থাকে। এই হিসাবে যদি মানুষের চাহিদা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড়ো ধরনের গরমিল দেখা দেয়, কিংবা হিংসার মাত্রা লাগামছাড়া হয়ে পড়ে, তবে নিঃসন্দেহে তা জনসমর্থনের ভিত্তি নড়িয়ে দিতে পারে। আবার, যদি রাজ্যে বাম ও কংগ্রেস মিলে বিজেপিকে সরিয়ে দ্বিতীয় শক্তি হয়ে উঠতে পারে, তাহলেও এই রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। ফলে বলা যায়, আজকের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি যেন এক সরু সুতোর উপর দাঁড়িয়ে— যার ভারসাম্য যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
সুতরাং, বাংলার রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতটি ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনীতি, সামাজিক সহযোগিতা এবং কৌম সংহতির এক জটিল মিশ্রণ। তৃণমূলের রাজনৈতিক বিস্তার এমন এক কাঠামো নির্মাণ করেছে, যেখানে স্থানীয় নেতারা ব্যবসায়িক স্বার্থ ও প্রশ্নাতীত অনুগত্যের বিনিময়ে ক্ষমতা সংহত করেন। এই রাজনৈতিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে হিংসা ও দুর্নীতির নিরবচ্ছিন্ন চর্চা। তবু এর মধ্যেই গড়ে উঠেছে এলাকা দখল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এক সূক্ষ ভারসাম্য। বিজেপি যতই হিন্দু ভোটের মেরুকরণ ঘটানোর চেষ্টা করুক না কেন, স্থানীয় স্তরে তারা বারবার সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। এখনও পশ্চিমবঙ্গে কোনো সুসংহত ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী চেতনা বা বৃহৎ আদর্শগত দ্বন্দ্ব নির্বাচনের নিয়ামক হয়ে ওঠেনি। বরং নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হচ্ছে স্থানীয় ক্ষমতার বিন্যাসের উপর— যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমোহিনী রাজনীতি এখনও তার জনপ্রিয়তা বজায় রেখেছে।
এই বাস্তবতায় রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি ও প্রাকৃতিক সম্পদের যৌথভাবে অপব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার আয়োজন, অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগের উপর শাসক দলের নিয়ন্ত্রণ, এবং আনুগত্যের বিনিময়নীতি। এমন এক পরিপ্রেক্ষিতে বামপন্থীদের সামনে জরুরি হয়ে উঠেছে নতুন করে ভাবা— কীভাবে রাজনৈতিক আদর্শবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশগত ভারসাম্য ও বণ্টনের ন্যায্যতা নতুনভাবে ও সময়োপযোগীভাবে পুনর্নির্মিত করা যেতে পারে। তবে সেটি এক পৃথক আলোচনার বিষয়।
— এই লেখাটি মূল ইংরেজিতে পঠিত হয়েছিল হাশিম আব্দুল হালিম ফাউন্ডেশন আয়োজিত দ্য স্টেট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল শীর্ষক সেমিনারে (১৪ অক্টোবর, ২০২৪), প্রারম্ভিক ভাষণ হিসেবে। মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব।
প্রকাশের তারিখ: ০২-এপ্রিল-২০২৬ |