সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বাংলায় ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনীতি (প্রথম পর্ব)
দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য
যা এই পরিসরে প্রভাব ফেলেছিল, তা হল ১৯৭৭ সালের পর বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিসংস্কার। এই সংস্কারের আগেই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা এই পরিসরে প্রভাব ফেলেছিল, তা হল এই সংস্কারের আগেই ভাগচাষি, কৃষক ও বামপন্থী দলগুলির নেতৃত্বে জমি-আন্দোলনের ধারা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। জমির উপর প্রজাস্বত্ব সুরক্ষা এবং বিতরণ-সংক্রান্ত আইন দুর্বল শাসনব্যবস্থার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপন করে। তবে, এই আইনগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধ এবং গ্রামীণ সম্পদশালী শ্রেণির সঙ্গে তাদের আঁতাত একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কমিউনিস্ট পার্টি পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে এই প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করে। ফলে, ভূমিসংস্কার কার্যকর হয় এবং এর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের মধ্যে বাম নেতৃত্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

ভারতীয় রাজনীতির যে কোনও পর্যবেক্ষককে যদি পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে বলতে বলা হয়, তাহলে বেশ কিছু বিষয় অবশ্যিকভাবে উঠে আসে, যেমন— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনতুষ্টিমূলক আকর্ষণ, সরকারের ব্যাপক জনকল্যাণকামী কর্মসূচি, প্রাতিষ্ঠানিক ও দলীয় দুর্নীতি, রাজনৈতিক হিংসা, বিজেপির উত্থান ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, বাম ও কংগ্রেসের তুলনামূলক পতন; বিনিয়োগহীনতায় শিল্পহ্রাস, জাতপাত-ভিত্তিক রাজনীতির উত্থান; শ্রেণি-রাজনীতির সংকোচন, মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংকে রূপান্তর এবং তৃণমূলের প্রতি মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ— এই প্রতিটি ঘটনাই রাজ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গভীরভাবে উপস্থিত। এই সমস্ত বিষয় ও ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে একটা মূল প্রশ্ন থেকেই যায়— আমরা কি এই বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এক বৃহত্তর ব্যাখ্যার সুরে গাঁথতে পারি?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দল ও সরকারের প্রধান ব্যক্তি— দিক্নির্দেশ ও কৌশল নির্ধারণে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এবং প্রায় একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটনাবহুল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় রাজ্যের বিরোধী নেতা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন এবং বাজপেয়ী ও মনমোহন সিং সরকারের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী রাজনীতির মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস তিনি গড়ে তুলেছেন একেবারে শূন্য থেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার এমন একজন মহিলা রাজনীতিবিদ, যাঁর উত্থানের পেছনে নেই কোনও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সুবিধা, কিংবা কোনও পুরুষ রাজনীতিবিদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা। পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরের প্রেক্ষাপটে এটি এক ব্যতিক্রমী সাফল্য।
তৃণমূল কংগ্রেসের বিস্তার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনভিত্তির তুলনায় দলের আদর্শগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি বরং অনেকটাই দুর্বল। দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে সর্বোচ্চ নেত্রীর মতামতের উপর। এই সাংগঠনিক নমনীয়তা আদর্শগত অনির্দিষ্টতার প্রতিফলন। উদাহরণস্বরূপ, গুজরাট দাঙ্গার পর এনডিএ-র মন্ত্রিসভায় অংশ নিতে তৃণমূল দ্বিধা করেনি। তবু পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সংখ্যালঘুদের কাছে আজও সবচেয়ে বিশ্বস্ত দল তৃণমূল। এই দ্বৈতসত্তা একদিকে যেমন দ্রুত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় সহায়ক, তেমনই অন্যদিকে সাংগঠনিক এই শিথিলতা দলটিকে ক্রমশ ব্যক্তিনির্ভর করে তুলেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক। যদিও উত্তরসূরি হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রাতুষ্পুত্র দলকে কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছেন, এতে দলের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা বরং আরও জটিল হয়েছে। এটিই তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পশ্চিমবঙ্গের সাংগঠনিক রাজনীতিতে ‘দল’ বা রাজনৈতিক দল একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। ভারতের বড়ো রাজ্যে রাজনৈতিক দলগুলি প্রায়শই জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, যার ফলে তারা প্রধানত সেই গোষ্ঠীগুলির স্বার্থ রক্ষার দিকেই মনোযোগী হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস এক্ষেত্রে কিছুটা আলাদা। এখানে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি ঐতিহাসিকভাবে ‘ক্যাচ-অল’ ধরনের সংগঠন— যারা সংকীর্ণ কৌম স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর শ্রেণিগত বা জাতীয় পরিসরে প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছে এবং বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক রাজনীতিকে ধারণ করেছে। এর বিপরীতে, বিজেপি ও বহু আঞ্চলিক দল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা পরিচয়-ভিত্তিক সমর্থন তৈরি করার দিকেই জোর দিয়েছে। প্রশ্ন হল, পশ্চিমবঙ্গের এই ভিন্ন চরিত্রের উৎস কোথায়?
আমরা অন্তত দু’টি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলতে পারি, যা বাংলার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিনিধিত্বে বহুত্ববাদের বিস্তার ঘটিয়েছে— একটি দেশভাগ, আরেকটি ভূমিসংস্কার। দেশভাগ এক অনন্য ও জটিল ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করেছিল। মুসলিম লিগ ও তফসিলি জাতি ফেডারেশনের মতো সংগঠনগুলির বিলুপ্তি এবং গান্ধি হত্যাকাণ্ডের পর হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারানোর ফলে এপার বাংলার রাজনৈতিক পরিসর খানিকটা শূন্য হয়ে পড়ে। শরণার্থীদের পুনর্বাসন এবং গভীর খাদ্যসংকটের আবহে ধর্ম বা জাতিভিত্তিক দলগুলির পক্ষে জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে উচ্চবর্ণ মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূলধন কাজে লাগিয়ে রাজনীতিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এবং আদর্শদতভাবে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে দেশভাগ-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে দলিত, মুসলমান এবং কৃষকদের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি, যদিও এই শ্রেণি ও গোষ্ঠীগুলি সংখ্যাগত দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই কারণে বর্ণ ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলি পশ্চিমবঙ্গে তেমন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এমনকি জাতিভিত্তিক দলগুলিও ধীরে ধীরে বৃহত্তর দলীয় রাজনীতির সঙ্গে মিশে গেছে। রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি একদিকে বিস্তৃত ও পরিবর্তনশীল রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে তারা কোনো নির্দিষ্ট গণগোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রতিনিধিত্ব করেনি। বরং, এই দলগুলি একাধিক সম্প্রদায়ের স্বার্থকে সামঞ্জস্য করে, এমন এক ধরনের মধ্যস্থতাকারী কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। এই রাজনৈতিক বাস্তবতা এক বিশেষ সাংগঠনিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততাই হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয়ের একটি মৌলিক ভিত্তি। বাংলায় প্রবাদ আছে— ‘যার দল নেই, তার বল নেই’— যা জনমানসে সংঘবদ্ধতার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে তোলে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা এই পরিসরে প্রভাব ফেলেছিল, তা হল ১৯৭৭ সালের পর বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিসংস্কার। এই সংস্কারের আগেই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা এই পরিসরে প্রভাব ফেলেছিল, তা হল এই সংস্কারের আগেই ভাগচাষি, কৃষক ও বামপন্থী দলগুলির নেতৃত্বে জমি-আন্দোলনের ধারা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। জমির উপর প্রজাস্বত্ব সুরক্ষা এবং বিতরণ-সংক্রান্ত আইন দুর্বল শাসনব্যবস্থার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপন করে। তবে, এই আইনগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধ এবং গ্রামীণ সম্পদশালী শ্রেণির সঙ্গে তাদের আঁতাত একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কমিউনিস্ট পার্টি পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে এই প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করে। ফলে, ভূমিসংস্কার কার্যকর হয় এবং এর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের মধ্যে বাম নেতৃত্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
সুতরাং, দেশভাগ-পরবর্তী অস্থিরতা ও ভূমিসংস্কার— এই দুটি পর্ব পশ্চিমবঙ্গের সাংগঠনিক রাজনীতিকে এমনভাবে রূপান্তরিত করে, যা জনসমাজের চরিত্র নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনকালে বিভিন্ন গণসংগঠন সমাজের নানা স্তরে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। প্রথম পর্যায়ে তারা প্রগতিশীল রাজনৈতিক আবহে এক ধরনের সংগ্রামী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর মধ্য দিয়ে এক বিশেষ ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা ‘পার্টি-সমাজ’ বলা যেতে পারে— এমন এক কাঠামো, যেখানে রাজনৈতিক সংগঠন জনগণের জীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেয়। শাসনের সূচনালগ্নে এই মধ্যস্থতা গ্রাম, শহর ও পাড়ায় স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে কার্যকর হয়। গ্রামাঞ্চলে এদের মধ্যে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন প্রধানত স্কুলশিক্ষকেরা। অ-কৃষি খাতে আয়ের উৎস সাক্ষরতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁদের সরকারি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম করে তোলে।
তবে সময়ের সঙ্গে এই কাঠামোও বদলাতে থাকে। বেতনভোগী শ্রেণির মধ্যে ভোগবাদী আকাঙ্ক্ষা বেড়ে ওঠে, যা তাদের আদর্শগত অবস্থানকে দুর্বল করে তোলে। এই শূন্যতা পূরণে এক নতুন নেতৃত্বশ্রেণির আবির্ভাব ঘটে, যার সামাজিক কর্তৃত্ব বা সাংস্কৃতিক পুঁজির উপর নয়, বরং ছোটো ব্যবসা ও লেনদেন-ভিত্তিক কারবারে নিয়োজিত অর্থনৈতিক পুঁজির উপর নির্ভরশীল— যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, মহাজন, সুদের কারবারি ইত্যাদি। এই শ্রেণি রাজনৈতিক ক্ষমতার হাত ধরে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করে এবং বামফ্রন্টের পতনের সময় নির্বিঘ্নে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়। এ থেকে বোঝা যায়, দল ও সমাজের সংযুক্তি এতটাই ঘনিষ্ট ছিল যে রাজনৈতিক, সামাজিক কাঠামো আমূল না-বদলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্গঠন সম্ভব হয়েছে। এই দলনির্ভর সামাজিক বিন্যাসের উপর দাঁড়ানো পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের সঙ্গে তুলনা করা যায়— যে অরণ্য দৃঢ় শিকড়ে ক্ষয় প্রতিরোধ করে, জোয়ারের ধাক্কা সামলে নেয়, এবং ক্রমাগত নিজেকে পুনর্গঠিত করে চলে। এই ‘পার্টি-সমাজ’ কাঠামো শুধু একমুখী পরিবর্তন ঠেকায় না, বরং বড়োসড় নির্বাচনী ধাক্কাও সামলে নিতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে প্রোথিত শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনকে সহজে উৎখাত করা এখানে কঠিন, যদি না কোনও বড়ো ঢেউ এসে তীব্র আঘাত হানে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি বামফ্রন্টের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এই বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতা লাভ করেন। তৃণমূল কংগ্রেসে সিপিআই(এম)-এর মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্যাডার-ভিত্তিক বা শ্রেণিবদ্ধ সংগঠন কাঠামো না-থাকলেও, সমাজে প্রভাব বিস্তার এবং দ্রুত ক্ষমতা সংহত করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব একাধিক উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর ফলে এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক শৃঙ্খলার ভিত্তি গড়ে ওঠে।
প্রথমত, তিনি জাতিভিত্তিক ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কৌশলগত জোট গড়ে তোলেন এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে মন্ত্রী করে প্রশাসনের অংশ করেন— ফলে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর সমর্থনের ভিত্তি বিস্তৃত হয়।
দ্বিতীয়ত, জনমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি কেবল দলীয় কাঠামোর উপর নির্ভর না-করে আমলাতন্ত্রকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগান। এর ফলে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক দুর্বলতা সত্ত্বেও বহু নীতির বাস্তবায়ন দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়।
তৃতীয়ত, তৃণমূল দলের প্রচার ও সরকারি বিজ্ঞাপনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বহুমাত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয়, যাতে বিভিন্ন স্তরের জনমানসে নেত্রীর প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তিনি বামফ্রন্টের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ‘আপাষহীন সংগ্রামী’, দুর্নীতিমুক্ত ‘সততার প্রতীক’, এবং শিক্ষার্থী, যুবক ও নারীদের ক্ষমতায়নের পক্ষে একাধিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের ‘রূপকার’ বা ‘অনুপ্রেরণা’ হিসেবে প্রচারিত হন। সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী শক্তির মেরুকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে ‘হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষতার’ এক সমন্বয়বাদী ‘ব্রাহ্মণ কন্যা’ হিসেবে তুলে ধরেন। এছাড়া, শ্রীমতি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনিক কাজের এক ভিন্ন ধারা স্থাপন করেন— তিনি মন্ত্রিসভার সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলার পর জেলা সফর করেন, গণশুনানির আয়োজন করে স্থানীয় সমস্যা সরাসরি শুনে সমাধানের প্রদর্শনীমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতা সংহত করতে এক নতুন ধরনের শাসনপ্রণালী ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলার ভিত্তি নির্মিত হয়।
এই পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল দু’টি প্রধান উদ্দেশ্য সাধন করা। একদিকে, জনসমক্ষে মমতা বন্দ্যোপধ্যায়ের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে তাঁর মানবিক সহানুভূতির এক বিশ্বাসযোগ্য ভাবমূর্তি গড়ে তোলা। একইসঙ্গে, বাম শাসনকালে সরকারি বেতনভোগী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, যাঁরা রাজনৈতিক অভিজাত হিসেবে বিবেচিত ছিলেন, তাঁদের পরিবর্তে তৃণমূল কংগ্রেসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক নতুন ধনী অভিজাত শ্রেণির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। ফলে দলটির সামাজিক ভিত্তি ও শাসন-রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে, আজ শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি মহার্ঘ ভাতা না-পাওয়া কিংবা উচ্চশিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে যতই অসন্তোষ প্রকাশ করুক না কেন, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক স্থায়িত্ব তাঁদের ভোটের উপর নির্ভরশীল নয়। নেত্রীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কল্যাণমূলক প্রকল্পের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত এলাকাভিত্তিক বিত্তশালীদের নেতৃত্ব— এই তিনটি উপাদান মিলেই দলের জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা ধরে রাখার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে, এই কৌশল রাজ্য রাজনীতিকে এক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
রাজনীতির এই নতুন প্রক্রিয়াটিকে আমরা ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। এখানে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ক্ষমতার বণ্টন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক দলীয় কাঠামোর মধ্য দিয়ে নয়, বরং ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের আদানপ্রদানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এই ধরনের ক্ষমতা-বিন্যাস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায়— দলের মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক দুর্বলতা সত্ত্বেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ করে দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীবাহিনীর কাছে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন না, বরং অর্থনৈতিক সুরক্ষার একটি প্রধান উৎস।
‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ শব্দটি সাধারণত এমন এক কাঠামোকে বোঝায়, যেখানে একটি বৃহত্তর সংস্থা বা ফ্র্যাঞ্চাইজার-এর নাম, ব্র্যান্ডিং, প্রয়োগযোগ্য মডেল এবং ব্যবসায়িক কৌশল একটি ছোটো সংস্থা বা ফ্র্যাঞ্চাইজি নির্দিষ্ট চুক্তির শর্তে ব্যবহার করার অধিকার পায়। এই ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিষ্ঠানটি মূল সংস্থার পণ্য, পরিষেবা ও কৌশল ব্যবহার করে লাভ অর্জন করে, আবার একইসঙ্গে দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনায় সীমিত পরিসরে কিছু নিজস্ব অধিকার বা স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখে। যদিও এই স্বায়ত্তশাসন প্রকৃত অর্থে সীমিত, কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজার-এর ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তার উপর নির্ভর না-করলে ফ্র্যাঞ্চাইজির টিকে থাকার উপায় থাকে না। এই পারস্পরিক লেনদেনের সম্পর্ক ছাড়া একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি কাঠামো কার্যকর হতে পারে না। এই মডেলটি তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দলটি এতটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক যে, তাঁকে কেন্দ্র করে গঠিত এই ফ্র্যাঞ্চাইজিকৃত কাঠামো ছাড়া দলটির অস্তিত্ব বা বিকাশ কল্পনা করা কঠিন।
শেষ পর্ব আগামীকাল
— এই লেখাটি মূল ইংরেজিতে পঠিত হয়েছিল হাশিম আব্দুল হালিম ফাউন্ডেশন আয়োজিত দ্য স্টেট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল শীর্ষক সেমিনারে (১৪ অক্টোবর, ২০২৪), প্রারম্ভিক ভাষণ হিসেবে। মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব।
প্রকাশের তারিখ: ০১-এপ্রিল-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay






