মেয়েদের প্রকৃত ক্ষমতায়নের ইশতেহার

দীধিতি রায়

কেবল ভাতার প্রতি নির্ভরশীলতা নয়- মহিলাদের ক্ষমতায়নের জন্য, সমতার জন্য দরকার আর্থিক স্বনির্ভরতা। তার জন্য কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মহিলাদের কাজের জায়গায় সকল নিরাপত্তা দিতে হবে। মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে শুরু করে যৌন হেনস্থা প্রতিরোধক আইন কার্যকরী করতে হবে। তার ফলেই মহিলারা গ্রামে ও শহরে সকল কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারবে।আর তার দিশা দিচ্ছে একমাত্র বামেদের ইশতেহার।

বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। চলছে দেওয়াল লেখা,প্রার্থী প্রচার,বাড়ি বাড়ি যাওয়া আরও কত কীই! খবরের চ্যানেল থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে মোদী-দিদির দল। তারা কী করেছে আর কী করবে-এই সংক্রান্ত। ঘটনাচক্রে এই দুটি দলই রাজ্য ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন গত দেড় দশক ধরে -তাও বদলাচ্ছে না মানুষের জীবনযাপন।বিজ্ঞাপনের কথার সাথে বাস্তবের মিল পাওয়া বেশ দুষ্কর! 

পশ্চিমবাংলার ভোটে মহিলারা কেবল গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়, বরং নির্ণায়ক অংশ। বাকি দেশের অনেক রাজ্যের তুলনায় এখানে মহিলাদের অংশগ্রহণ বেশি। এই রাজ্যে প্রতি ১০০০ জন পুরুষ ভোটার পিছু মহিলা ভোটার প্রায় ৯৬৮ জন। এবং ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকেই আমরা লক্ষ্য করছি পুরুষ ভোটারের সমান সমান মহিলা ভোটার ভোট দিতে যাচ্ছেন কখনো পুরুষ ভোটারের চেয়ে টার্ন ওভার মহিলাদের বেশি।ফলে এই রাজ্যের ক্ষেত্রে মহিলাদের মতামত খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু কেমন আছে বাংলার মহিলারা, মেয়েরা?

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো ,ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে ৫-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলেই মহিলাদের অবস্থা এ রাজ্যে কেমন তা বোঝা যাবে। মেয়েদের ওপর সংগঠিত হিংসায় পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে প্রথম পাঁচে! যেখানে মেয়েদের ওপর হিংসার জাতীয় গড় প্রতি এক লক্ষ মহিলা পিছু ৬৬.৪ শতাংশ সেখানে বাংলার ক্ষেত্রে তা ৭১.৮।অর্থাৎ এ রাজ্যের মেয়েদের অবস্থা ভয়ানক।

এন‌এফ‌এইচ‌এস-৫-এর তথ্য অনুসারে ৪২ শতাংশ মহিলার ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে হয়ে যায় যা ভারতের অনেক রাজ্যের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের খারাপ অবস্থাকে চিহ্নিত করে। এবং এই নাবালিকা বিবাহের ফলাফল অপুষ্ট অবস্থাতে মা হওয়া, এতেও পশ্চিমবঙ্গ এখন ওপরের দিকে! প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৭০ জন মেয়েই রক্তাল্পতায় ভোগে। ক্যালশিয়াম অভাবজনিত রোগে ভুগছে বহু মহিলা।

Women’s Empowerment Index যা মহিলাদের শিক্ষা,স্বাস্থ্য,কর্মসংস্থান-এর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় মহিলাদের সমাজে কেমন অবস্থা- তাতে পশ্চিমবঙ্গ সবচেয়ে পিছিয়ে। 
বেকারত্ব বেড়েছে এই রাজ্যে। স্থায়ী সরকারি কাজে নিয়োগ যেমন কমেছে তেমনই বেড়েছে চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী কাজের পরিমাণ। গ্রাম বাংলায় চার বছর ধরে বন্ধ ১০০ দিনের কাজ। ফলাফল - মহিলাদের কর্মহীনতা।  শহরেও মহিলাদের কাজের নিরাপত্তা কমছে। এসকল কিছুর প্রভাবে মেয়েদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার -তা আজ একেবারে মুখ থুবরে পরেছে।

মেয়েদের ঘরের অবৈতনিক শ্রমে পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি সময় দিতে হয়-তার কোনো মজুরিই নেই। তার পাশাপাশি তাদের কোনোরকম কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র নেই বলেই তাদের সমস্ত কাজ হয়ে উঠছে ঘর কেন্দ্রিক। বেশিরভাগ পুরুষই এখন কাজের জন্য অন্য রাজ্যে, এবং মহিলাদের বাইরে কাজের সুযোগ কমায় ,মহিলাদের সামাজিক শ্রম রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে পারিবারিক শ্রমে। শ্রমের সামাজিক মর্যাদা লুপ্ত হচ্ছে এবং তার চরিত্র হচ্ছে ব্যক্তিগত শ্রম। পারিবারিক শ্রমেও পুরুষদের অংশগ্রহণ কমার কারণে মহিলাদের ওপর  একঘেয়ামী ঘরের কাজের বিপুল চাপ আসছে।মহিলাদের জীবন পরিবারের মধ্যে,কেয়ার ওয়ার্কের মধ্যেই কাটছে-যে কাজকে রাষ্ট্র “শ্রম” হিসাবে চিহ্নিত করেই না। ফলে মহিলারা "শ্রমিক" এর মর্যাদাও পায়না।

লেখাপড়ার সুযোগ কমেছে ,স্কুল স্তর থেকেই ছাত্রীরা লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। এবং তার সাথে সাথে বাল্য বিবাহ,কম বয়সে মা হওয়া যুক্ত হচ্ছে। যার ফলে একজন নারীর নিজস্ব জীবনযাপনের জন্য যে সুযোগ ছিল তা সবই সংকুচিত হচ্ছে। এর সাথেই পরিবারে খরচ চালানোর জন্য ঘাড়ের ওপর চাপছে মাইক্রোফিনান্সের বিপুল বোঝা। মাইক্রফিনান্সের কোম্পানি গুলো ২৫% চড়া সুদে মহিলাদের ঋণ দিচ্ছে। এবং সেই ঋণ মহিলারা কোনো রকম ব্যবসার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার আগেই ঘরের প্রয়োজনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে ঋনের কিস্তি শোধ না করতে পারলে বাড়িতে আসছে বাউন্সার, হেনস্থা করছে মেয়েদের।

২০২৩-২৪ সালে দৈনিক ৫০ টাকা মজুরিকে দারিদ্রসীমা হিসাবে ধরা হলে দেখা গেল, গ্রামের কর্মরত মহিলার ৪৮% এবং শহরের কর্মরত মহিলার ৩৭% ই এর চেয়ে কম দৈনিক মজুরি পান। অর্থাৎ গ্রাম ও শহরের প্রায় অর্ধেক কর্মরত মহিলাই দারিদ্রসীমার নীচে। সুতরাং একদিকে মহিলাদের স্বল্প আয় এবং অন্যদিকে সামাজিক পুনরুৎপাদনের জন্য অবৈতনিক ঘরের কাজ -এই দুইই মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।এবং তাকে বাকিদের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলছে।

এই সমস্যার সয়ামধান কী?

বামফ্রন্ট সরকারের আমলে মহিলাদের উন্নতির জন্য কোনো একমাত্রিক প্রকল্প গ্রহণ হয়নি বরং প্রকল্পের ধরণ ছিল বহুমাত্রিক। একদিকে স্কুল শিক্ষা ,কলেজ শিক্ষাতে মেয়েদের যুক্ত করার জন্য ছিল সচেতনতার প্রসার অন্যদিকে আর্থিক ক্ষমতায়নের জন্য মহিলাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ছিল। তাই কুটীর শিল্প ,রেগা থেকে শুরু করে এস এস সি, টেট মহিলারা এগিয়ে এসেছিল সামনের সারিতে। কেবল পরিবারে নয়,সমাজেও মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদ্বারত্ব ছিল।

এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই ফেরাতে হবে। “মহিলারা কেবলই ভোটব্যাংক”-এই ক্ষুদ্র ধারণা থেকে তৃণমূল সরকার বেরোতে পারেনি । 

দরকার আর্থিক নিরাপত্তা। তাই ভাতার পাশাপাশি সকল মহিলাদের প্রশিক্ষিত করে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে তাদের স্থায়ী আয় দেবে এবং আয় বৃদ্ধি করবে বাম সরকার। 

ইশতেহারের সহজ ছন্দে সেই বিকল্পই তুলে ধরা হয়েছে। এবং এই কারণেই ৫ বছরে ২০ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরী হবে। 

মাইক্রোফিনান্সের জটিল ও চড়া সুদে ঋণ না- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক,সমবায় ব্যাংক ও গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋনদান করা হবে। মাইক্রফিনান্সের দাদাগিরি আর বরদাস্ত করা হবেনা। 

📌 বিধানসভা নির্বাচন সংক্রান্ত অন্যান্য লেখাগুলি পড়তে ক্লিক করুন

শিল্পাঞ্চলে কর্মরত মায়েদের ও শিশুদের জন্য এবং সকল নারী শ্রমিক ও কর্মচারীর জন্য শিশুসেবা কেন্দ্র তৈরী হবে। স্কুলছুট কমানোর জন্য একজন ছাত্রের স্কুলস্তর থেকে স্নাতক স্তর অব্ধি লেখাপড়ার দায়িত্ব সরকারের। ফলে বাবা মা আর কোনোভাবেই মেয়েদের লেখাপড়া খরচের অজুহাতে বন্ধ করতে পারবেনা। প্রতি পরিবারের অন্তত একজনের স্থায়ী চাকরি এবং যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে ন্যূনতম দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরি এক বিপুল অংশের মহিলাকে সামাজিক শ্রমশক্তির সাথে যুক্ত করবে। এবং গ্রাম -শহরের  যে মহিলারা দারিদ্রসীমার নীচে তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বদল হবে।

লিঙ্গভিত্তিক বেতনবৈষম্য নয়,বরং সম কাজে সম মজুরির মাধ্যমে মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করার দীর্ঘদিনের পিতৃতান্ত্রিক প্রবণতা, তা রোখা যাবে। একইসাথে আশা কর্মী,মিড ডে মিলের মত প্রকল্প কর্মীদের বারো মাস ন্যায্য বেতন দেওয়া হবে, নির্ধারিত ছুটি,মেডিকেল লিভ দেওয়া হবে।

পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের ওপর সংগঠিত হিংসার ঘটনা মাথায় রেখেই পুলিশের নিজস্ব কিন্তু স্বশাসিত অভয়া বাহিনী তৈরী হবে, যারা কঠোর হাতে নারী নির্যাতন দমন করবে। সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলাদের জন্য আইসিসি (Internal complaints committee)  গঠন করা হবে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলারা নানাপ্রকার নির্যাতনের শিকার হন, কাজ হারানোর ভয়ে তাদের সকল হেনস্থা চুপ করে সহ্য করে যেতে হয়। বামেরা সরকার গঠন করলে, সেই সরকার অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। 

বিজেপি-আর এস এস মনুবাদের ধারক ও বাহক। তারা মেয়েদের "দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক" মনে করে এবং মেয়েদের যত রকম ভাবে অবমূল্যায়িত করা যায় তারা সেটাই করে। তাই ধর্ষকদের পক্ষ নেয় তারা। মনুবাদ মহিলাদের স্বনির্ভর হতে দেয়না বরং একজন মহিলা তার বাবা, স্বামী ও ছেলের অধীনে থাকার বিধানই দেয়। ফলতঃ বিজেপি মহিলাদের ক্ষমতায়নের কথা বলবে, তা আশা করাও অনুচিত।

আর তৃণমূল মহিলাদের কাজের সুযোগ কেড়ে নিয়ে তাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা কমিয়ে কেবলমাত্র "ভাতা"-র ওপর নির্ভরতা তৈরি করতে চাইছে। বামফ্রন্ট মনে করে এই দেশে মহিলাদের জন্য ভাতা খুবই প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেটা সমস্যার সমাধান না। কেবল ভাতার প্রতি নির্ভরশীলতা নয়- মহিলাদের ক্ষমতায়নের জন্য, সমতার জন্য দরকার আর্থিক স্বনির্ভরতা। তার জন্য কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মহিলাদের কাজের জায়গায় সকল নিরাপত্তা দিতে হবে। মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে শুরু করে যৌন হেনস্থা প্রতিরোধক আইন কার্যকরী করতে হবে। তার ফলেই মহিলারা গ্রামে ও শহরে সকল কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারবে।আর তার দিশা দিচ্ছে একমাত্র বামেদের ইশতেহার।

তাই মেয়েদের দরকার- বাম সরকার।


প্রকাশের তারিখ: ১৩-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org