|
আফ্রিকা শুধু অতীতের উপনিবেশ নয়, ভবিষ্যতের সংগ্রামওঅচিন্ত্য নারায়ণ চৌধুরী |
ভারতীয় মধ্যবিত্ত ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমি প্রযুক্তির ভাষা বুঝি, উৎপাদনের অঙ্ক বুঝি, কর্পোরেট অর্থনীতির নিষ্ঠুর যুক্তিও বুঝি। কিন্তু নাইজারের ধুলোভরা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আবার উপলব্ধি করলাম— মানুষের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মুনাফার নয়, প্রতিরোধের ইতিহাস। |
আফ্রিকা নিয়ে ছোটোবেলা থেকেই আমার এক ধরনের অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। স্কুলের ভূগোল বইয়ে সাহারা মরুভূমির ছবি, নীল নদের সভ্যতা, কঙ্গোর জঙ্গল, কিংবা চে গুয়েভারার আফ্রিকা অভিযান নিয়ে পড়তে পড়তেই মনে হয়েছিল— এই মহাদেশ শুধু ভূগোল নয়, ইতিহাসের গভীরতম ক্ষত আর মানুষের সবচেয়ে কঠিন সংগ্রামের আরেক নাম। কাজের সূত্রে গত কয়েক মাসে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য আফ্রিকা ঘুরে অবশেষে পৌঁছেছিলাম পশ্চিম আফ্রিকার এক বিস্মৃত অথচ বিস্ফোরক ভূখণ্ডে— Niger। নাইজার। পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর তালিকায় যার নাম প্রায় প্রতি বছরই উঠে আসে। অথচ সেই দেশের মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে ইউরেনিয়ামের বিপুল ভাণ্ডার, যা দিয়ে ইউরোপের বহু শহর আলোকিত হয়। প্রথম দিন নাইয়ামে শহরে পৌঁছে আমার মনে হয়েছিল, এ যেন একই সঙ্গে ক্লান্ত এবং ক্রুদ্ধ এক দেশ। রোদ এখানে শুধু গরম নয়, যেন দগ্ধ করে। সাহারার বাতাস শহরের রাস্তায় উড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় ধুলো, ক্ষুধা আর দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের গোপন দীর্ঘশ্বাস। মানবসভ্যতার প্রাচীন ইতিহাসেও নাইজারের ভূমিকা গভীর। সাহারা আজ মরুভূমি হলেও হাজার হাজার বছর আগে এই অঞ্চল ছিল সবুজ তৃণভূমি। প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র, পাথরের সরঞ্জাম এবং প্রাচীন বসতির নিদর্শন আজও বলে দেয়— মানুষ বহু সহস্র বছর ধরে এই ভূখণ্ডে বেঁচে ছিল, লড়েছিল, স্বপ্ন দেখেছিল। পরে তুয়ারেগ, হাউসা, জার্মা ও ফুলানি জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলের সমাজজীবন গড়ে তোলে। মধ্যযুগে ট্রান্স-সাহারান বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই অঞ্চল। লবণ, সোনা, দাস এবং হাতির দাঁতের ব্যবসার পথ ধরে আরব ও ইউরোপীয় বণিকদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আসে ফরাসি উপনিবেশবাদ। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি আফ্রিকার মানচিত্রকে টেবিলের উপর ছুরি দিয়ে কাটা রুটির মতো ভাগ করে নিচ্ছিল। নাইজারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ফরাসিরা এই অঞ্চলে নিজেদের শাসন কায়েম করে এবং স্থানীয় জনগণকে পরিণত করে সস্তা শ্রমশক্তিতে। কৃষিজমি, খনিজ সম্পদ, নদীপথ— সবকিছু ধীরে ধীরে চলে যায় ইউরোপীয় পুঁজির নিয়ন্ত্রণে। তবু প্রতিরোধ থেমে থাকেনি। তুয়ারেগ বিদ্রোহ, গ্রামীণ কৃষকদের আন্দোলন এবং উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দাবিকে জোরালো করে তোলে। অবশেষে ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে নাইজার। কিন্তু স্বাধীনতা সবসময় মুক্তি আনে না। রাজনৈতিক পতাকা বদলালেও অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে গেল ইউরোপীয় কর্পোরেট শক্তির হাতে। বিশেষত ফরাসি কোম্পানি Areva— বর্তমানে Orano— নাইজারের ইউরেনিয়াম সম্পদের উপর কার্যত আধিপত্য বিস্তার করে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ইউরেনিয়াম উৎপাদক দেশ হওয়া সত্ত্বেও নাইজারের অধিকাংশ মানুষ আজও বিদ্যুৎহীন, অপুষ্টিতে ভোগে, বিশুদ্ধ পানীয় জল পায় না। আমি একদিন আরলিত অঞ্চলের কাছাকাছি এক শ্রমিক মহল্লায় গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকজন তরুণ শ্রমিকের সঙ্গে দীর্ঘ কথা হয়। তারা বলছিল, “আমাদের মাটির ইউরেনিয়াম দিয়ে প্যারিস জ্বলে, কিন্তু আমাদের গ্রামে আজও রাত নামলে অন্ধকার নামে।” ওদের কথা শুনে আমার হঠাৎ ঝাড়খণ্ডের খনি অঞ্চলগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। উন্নয়নের ভাষা পৃথিবীর সর্বত্র একই— সম্পদ যাবে রাজধানীতে, মুনাফা যাবে বিদেশে, আর ধুলো, রোগ আর দারিদ্র্য পড়ে থাকবে শ্রমিকের ঘরে। গত কয়েক বছরে নাইজারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থান, বিদেশি হস্তক্ষেপ, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের উত্থান এবং ফরাসি সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বিস্ফোরিত হয়েছে। ২০২৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরে নাইজারের রাস্তায় আমি এক অদ্ভুত আবেগ লক্ষ করেছি। বহু সাধারণ মানুষ ফরাসি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলছে। কেউ কেউ রাশিয়ার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে, কেউ প্যান-আফ্রিকান ঐক্যের কথা বলছে, আবার অনেকে সরাসরি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দাবি তুলছে। তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। সামরিক শাসন কখনও প্রকৃত গণমুক্তির বিকল্প হতে পারে না— এই বোধও দেশের অনেক প্রগতিশীল মানুষের মধ্যে স্পষ্ট। নাইজারে সুসংগঠিত কমিউনিস্ট পার্টি খুব শক্তিশালী না-হলেও বিভিন্ন বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন এবং প্যান-আফ্রিকান সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক সংগঠন, খনি শ্রমিক সংগঠন এবং ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রভাব চোখে পড়ার মতো। নাইয়ামে শহরে এক সন্ধ্যায় কয়েকজন তরুণ বামপন্থী কর্মীর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিল। তারা ফরাসি নব্য উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছিল, আবার একই সঙ্গে নিজেদের দেশের সামরিক শাসনের সমালোচনাও করছিল। তাদের একজন বলেছিল, “আমরা শুধু ফ্রান্সের বিরোধিতা করতে চাই না, আমরা এমন একটা আফ্রিকা চাই যেখানে খনিজ সম্পদ মানুষের কাজে লাগবে, বিদেশি কোম্পানির মুনাফায় নয়।” ওদের কথার মধ্যে আমি যেন ষাটের দশকের লাতিন আমেরিকার ছাত্র আন্দোলনের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। নাইজারের শিক্ষাব্যবস্থা ভীষণ সংকটের মধ্যে দিয়ে চললেও University Abdou Moumouni of Niamey এখনও দেশের প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কারও হাতে মার্কসের অনুবাদ, কেউ আবার টমাস সাঙ্কারা নিয়ে আলোচনা করছে। কেউ বলছিল আফ্রিকান সমাজতন্ত্রের কথা, কেউ বলছিল প্যান-আফ্রিকান ফেডারেশনের স্বপ্ন। তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা আছে— কিন্তু সেই অস্থিরতা ধ্বংসের নয়, পরিবর্তনের। তারা জানে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ডিগ্রি শেষ করেও কাজ নেই। ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন আর মরুভূমি পেরিয়ে মৃত্যুর ভয় একই সঙ্গে তাদের প্রজন্মকে তাড়া করে বেড়ায়। তবু তারা রাজনীতি নিয়ে ভাবে। ভারতের বহু মধ্যবিত্ত ছাত্র যেমন শুধুই চাকরির পরীক্ষার সিলেবাসে বন্দি হয়ে পড়ছে, নাইজারের বহু ছাত্র এখনও রাষ্ট্র, সমাজ, সাম্রাজ্যবাদ আর মুক্তির প্রশ্ন নিয়ে তর্ক করে। সেটা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। একদিন সন্ধ্যায় নাইয়ামে শহরের বাইরে নাইজার নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসছিল। কাঁচা রাস্তা ধরে কয়েকজন শিশু ফুটবল খেলতে খেলতে বাড়ি ফিরছিল। সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল— আফ্রিকা আসলে শুধু দারিদ্র্যের গল্প নয়। আফ্রিকা মানে লুটের বিরুদ্ধে মানুষের শতাব্দী প্রাচীন প্রতিরোধ। এই মহাদেশকে ইউরোপ বারবার শোষণ করেছে, আমেরিকা ব্যবহার করেছে, নতুন বিশ্বশক্তিরা বাজার হিসেবে দেখেছে; তবু আফ্রিকার মানুষ এখনও মাথা নত করেনি। ভারতীয় মধ্যবিত্ত ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমি প্রযুক্তির ভাষা বুঝি, উৎপাদনের অঙ্ক বুঝি, কর্পোরেট অর্থনীতির নিষ্ঠুর যুক্তিও বুঝি। কিন্তু নাইজারের ধুলোভরা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আবার উপলব্ধি করলাম— মানুষের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মুনাফার নয়, প্রতিরোধের ইতিহাস। শ্রমিকের ঘাম, ছাত্রের স্বপ্ন, কৃষকের জমি আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা— এগুলোই পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নাইজার আমাকে শিখিয়েছে, পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সচেতন হতে পারে। আর সেই কারণেই হয়তো আফ্রিকার এই ক্লান্ত মরুভূমির দেশটা আমার মনে সবচেয়ে গভীর দাগ কেটে গেছে। আজও চোখ বন্ধ করলে আমি দেখতে পাই— নাইজার নদীর ধারে দাঁড়িয়ে কয়েকজন তরুণ কমরেড ধীরে ধীরে বলছে, “আফ্রিকা শুধু অতীতের উপনিবেশ নয়, ভবিষ্যতের সংগ্রামও।” আর তখন আমার নিজের মনেও অনিবার্যভাবে ভেসে ওঠে সেই পুরোনো আন্তর্জাতিক স্লোগান— “সারা পৃথিবীর শ্রমিক, আমরা এক।” 🔍 আফ্রিকা বিষয়ক অন্যান্য লেখাগুলি পড়ুন: প্রকাশের তারিখ: ১৮-জুলাই-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |