১৯১৭-এর বিপ্লবে আবার ফেরা

বিজয় প্রসাদ
পরিকল্পনাকে কর্মপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র পরিচালকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সীমিত সম্পদকে দ্রুত শিল্প বিকাশের কাজে সদ্ব্যবহার করা এর ফলেই সম্ভব হয়েছিল।  প্রকৃতপক্ষে শিল্প কারখানাগুলিই গড়ে তুলেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্গকে। এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহই নেই, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাক্রমের ফলেই পাশ্চাত্যের উদারবাদকে রক্ষা পেয়েছে। যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ বা ওয়ার কমিউনিজম, নয়া অর্থনৈতিক নীতি, স্তালিনের শিল্পনীতি ইত্যাদির ফলে যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ত, তবে ফ্যাসিবাদ পশ্চিম ইউরোপকেও গুঁড়িয়ে দিত। 

৭ নভেম্বর রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবের বার্ষিকী। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, শ্রমিক কৃষকেরা, সৈনিকদের পাশে নিয়ে জারের রাজত্বকে উৎখাত করেছিল।  সেই অক্টোবরে (আমাদের এখনকার ক্যালেন্ডারের নভেম্বরে), বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে  শ্রমিক এবং কৃষকেরা আরেকজান্ডার কেরেনস্কির নেতৃত্বাধীন বুর্জোয়াদের অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করে তাদের সমাজ বিপ্লবের কর্তব্য সম্পূর্ণ করে। নির্বাসন থেকে ফিরে আসা লেনিনের চোখে কেরেনস্কির সরকার ছিল ‘ক্ষমতায় থাকা প্রতিবিপ্লবী শিক্ষানবীশ সেনা ও সামরিক চক্র’ ও বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের একটা আচ্ছাদন মাত্র। এদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই হবে। পেট্রোগ্রাডের সোভিয়েত ঠিক এই কাজটিই করেছিল।

কিন্তু সোভিয়েত শতাব্দী খণ্ডিত হয়ে গেল। এটা টিঁকে ছিল মাত্র সাতটি দশক। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ল। এই পশ্চাৎগমন বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের ওপর প্রবল আঘাত হানল।

এখন, যখন আমরা ১৯১৭-র দিকে ফিরে তাকাব, তখন আমরা কীসের উদযাপন করব?

অভ্যুত্থান একটি শিল্প

আমরা কি সেই ছোট্ট বামপন্থী দলটির কর্মকাণ্ডে বিস্মিত হব না যারা রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষক সমাজের সাথে মহাযুদ্ধের দুঃসহ দিনগুলিতে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল? ১৯১৪ সালে যুদ্ধের সম্ভাবনা দানা বাঁধতেই প্রধানতম মার্কসবাদী দল জার্মানির পার্টির নেতৃত্বে  আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠিত দল যুদ্ধের স্বপক্ষে ভোটদান করে মুখ থুবড়ে পড়ল। একটি ছোট্ট সংখ্যালঘু অংশ বলল, এটা জনগনের যুদ্ধ নয়, জনগনের বিরুদ্ধে চালিত যুদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। সুইজারল্যাণ্ডের জিমেরওয়াল্ডে ১৯১৫ সালে সাম্রাজ্যবাদী বিরোধী বামপন্থীরা মিলিত হলো আবার ঘুরে দাঁড়াতে।  রাশিয়া থেকে এক ঝাঁক নেতারা এলেন। লেনিন থেকে মার্তভ, ট্রটস্কি থেকে রাদেক। শান্তিবাদ তাঁদের পথ ছিল না। ‘শান্তির ডাক মোটেই বিপ্লবী শ্লোগান নয়। এটা তখনই বিপ্লবী চরিত্র অর্জন করবে যখন তাকে বিপ্লবী কৌশলের যুক্তিধারার সাথে যুক্ত করা হবে। যখন এটা বিপ্লবের ডাকের সঙ্গী হবে।’ ১৯০২ সালের লেনিনের বই ‘কী করিতে হইবে’ অনেক সমাজতন্ত্রীকেই পথ দেখালো। এতে বলা হয়েছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রস্তুত হওয়ার জন্যে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। ১৮৯৬ সালে সেন্ট পিটার্সবুর্গে যখন স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়ল, তখন লেনিন যুক্তি রেখেছিলেন, ‘তত্ত্ব ও কর্মকাণ্ড দু’টির নিরিখেই বিপ্লবীরা এই অভ্যুত্থান থেকে পিছিয়ে আছে। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম একটি সুস্থির এবং লাগাতর সংগঠন গড়ে তুলতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।’ এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। 

রাশিয়ার বিপ্লবীরা যে শেষ পর্যন্ত শ্রমিক কৃষকদের মধ্যে যোগাযোগ বিস্তৃত করার পথটি খুঁজে পেলো সেটা কম বড় সাফল্য নয়। ১৯১৭ সালে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই শ্রমিক কৃষকেরা তাদের সোভিয়েতগুলি গঠন করে নিজেদের সরকার গঠনের লক্ষ্যে একের পর এক প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। জন রিড তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’-এ শ্রমিক কৃষকদের প্রাণশক্তির বর্ণনা দিয়েছেন। ‘নাট্যমঞ্চ, সার্কাস অঙ্গন, স্কুলগৃহ, সেনা ছাউনি জুড়ে শুধু ভাষণ, বিতর্ক, বক্তব্য….যুদ্ধ ময়দানের পরিখা, গ্রামের মুক্তাঙ্গন, কারখানায় সভা… এ অপূর্ব এক দৃশ্য, পুতিলোভস্কি কারখানা থেকে চল্লিশ হাজার শ্রমিক বেরিয়ে এসে সোস্যাল ডেমোক্রাট, সোস্যাল রিভোলিউশনারি, অ্যানার্কিস্ট ইত্যাদি যে যাই বলছে তাদের বক্তৃতা শুনছে।’ কিন্তু এটাও বোঝা যাচ্ছে, ওদের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। যা হল একটি সোভিয়েত সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। এই সুস্পষ্ট দাবিই অক্টোবর বিপ্লবের পথ সুগম করেছে। সৈনিকদের প্রতিনিধিত্বকারী কংগ্রেস ২য় নিখিল রুশ সোভিয়েতসমূহের কংগ্রেসকে লিখে বলেছিল,‘এই দেশের প্রয়োজন জনগনের দ্বারা এবং জনগনের প্রতি দায়বদ্ধ একটি স্থায়ী ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা।  কথাবার্তা, বাকচাতুরি, সংসদীয় ছলচাতুরী আমাদের অনেক দেখা হয়ে গেছে‘। তারা একটি দ্বিতীয় বিপ্লব চাইছিল। তারই নেতৃত্ব দিয়েছিল অক্টোবরে লেনিনের রাজনৈতিক দল, বলশেভিকরা। বলশেভিকরা কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের ছক করে নি। তারা শুধু গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গী হয়ে এর দাবি পূরণে নেতৃত্ব দিয়েছিল।

সমাজতন্ত্র গঠন

আমরা কি ১৯১৭ থেকে ১৯৮৯ অবধি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্ময়কর ও একইসঙ্গে সুকঠিন সাফল্যগুলির উদযাপন করব?

১৯১৮ সালে লেনিন লিখেছেন, ‘সোভিয়েতের আদলের নতুন একটি রাষ্ট্র গঠন করে আমরা সুকঠিন সমস্যার একটি ছোট্ট অংশের মাত্র সমাধা করতে পেরেছি। সমস্যার মূল অংশটি নিহিত রয়েছে অর্থনীতির পরিসরে’। উৎপাদনের সামাজিকীকরণ কোনোভাবেই সহজ কাজ ছিল না। পশ্চিমী শক্তিসহ অক্টোবর বিপ্লবের শত্রুরা সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে দিয়েছিল। নতুন রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্যে তখন লাল ফৌজ গড়ে তুলতে হয় যার অর্থ সামাজিক ব্যবহারের খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে আনা। সাত দশকের পথচলার কোনো মূহূর্তেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্হিশত্রুর বিপদ থেকে মুক্ত ছিল না। সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার সামগ্রিক ব্যবস্থাটি প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

লাল ফৌজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনগনের জীবনমানের উন্নতির জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়নের পথ গ্রহণ করতে হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে এই উৎকন্ঠাও ছিল যে শিল্প-সক্ষমতা এবং গ্রামীণ উৎপাদনশীলতা দ্রুত বৃদ্ধির নীতি অতি-কেন্দ্রীকৃত রাষ্ট্রের জন্ম হতে পারে। ১৯১৮ সালে তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা গ্রিগোরি সোকোলনিকভকে লেখা চিঠিতে লেনিন বলেছিলেন, ‘কমিউনিস্টরা আমলায় পরিণত হয়েছে। আমাদের যদি কখনও ধ্বংস হয়, তবে এর জন্যেই হবে’। উন্নয়নের পরীক্ষা নিরীক্ষার শত্রুদের চাপ ও অবরোধের ঘেরাটোপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেশের কলকারখানা ও মানব সম্পদের দ্রুত বিকাশ ঘটানোর তাড়নায়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি দুর্বল করার পথে হাঁটল সোভিয়েতগুলি। তাদের সামনে খুব বেশি বিকল্পও প্রস্তুত ছিল না। বিকল্পের এই স্বল্পতার জন্যেই  প্রতিষ্ঠানগত ত্রুটিগুলি সোভিয়েত ইউনিয়নকে গ্রাস করে।

ছোট্ট বলশেভিক পার্টি থেকে নাম পরিবর্তিত হয়ে ১৯৩৩ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ত্রিশ লক্ষে।  পার্টি এতটাই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে যে সংস্কৃতি, শিল্প, দর্শন, প্রযুক্তিগত বিজ্ঞান সহ নানা ক্ষেত্রে জনগনের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নতুন কর্মোন্মাদনা জাগাতে সমর্থ হয়। নতুন নতুন এই ভাবনার উদ্ভাবন এসেছে আর কিছু থেকে নয়, এসেছে বিপ্লবী আদর্শ এবং এর বাহক দল থেকে। পার্টির তরফে বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পর্বে সোভিয়েত রাজনীতির ঐশ্বর্যময় দিকগুলির ওপর আসা আঘাতের ফলে আদর্শগত প্রেরণার অবর্তমানে আনুষ্ঠানিকতা প্রবল হয়ে উঠল। পার্টির সদস্যরা হয়ে ওঠে আমলাতন্ত্রের কর্মকর্তা।  পার্টির রাজনৈতিক জীবনে শূন্যতা এনে করে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজে চলে যায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা।  জারের প্রশাসন যন্ত্রের লোকেরা ইউরোপে নির্বাসন নেওয়ার ফলে প্রয়োজন দেখা দেয় যোগ্য লোকদের এনে আমলাতন্ত্রের শূন্যতা পূরণের। এতেও অবস্থার পরিবর্তন হল না যার ফলে পার্টির সোকোলনিকভ সহ অসংখ্য প্রাণবান পার্টি সদস্য, ভাষাবিদ ভোলোশনিকভ, জ্ঞানসাধক মেডভেদেভ, নাট্য পরিচালক মেয়েরহোল্ড, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ভাভলিভ, পিয়ানো বাদক গায়িভোবাকে শুদ্ধিকরণের পর্বে খুন হতে হল। রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত হয়ে অথবা প্রাণদণ্ডের মাধ্যমে, পার্টিই সবচেয়ে বেশি মেধাবী সদস্যদের হারালো।

এই সমস্ত বিপর্যয়ের মধ্যেও সাফল্য যা এসেছিল তা ছিল অবিশ্বাস্য। পরিকল্পনাকে কর্মপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র পরিচালকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সীমিত সম্পদকে দ্রুত শিল্প বিকাশের কাজে সদ্ব্যবহার করা এর ফলেই সম্ভব হয়েছিল।  প্রকৃতপক্ষে শিল্প কারখানাগুলিই গড়ে তুলেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্গকে। এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহই নেই, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাক্রমের ফলেই পাশ্চাত্যের উদারবাদকে রক্ষা পেয়েছে। যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ বা ওয়ার কমিউনিজম, নয়া অর্থনৈতিক নীতি, স্তালিনের শিল্পনীতি ইত্যাদির ফলে যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ত, তবে ফ্যাসিবাদ পশ্চিম ইউরোপকেও গুঁড়িয়ে দিত। প্রকৃতপক্ষে, সোভিয়েত ইউনিয়নের কারখানা শহরগুলি যেখানে জার্মান সেনাকে খতম করার জন্যে ইস্পাত ও মর্টার তৈরি হয়েছিল, সেখানে এসেই হিটলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইন্তেকাল হল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সোভিয়েত ইউনিয়নকে এতটাই বিধ্বস্ত করে যার জন্যে তাদেরকে আরেকবার যুদ্ধকালীন সাম্যবাদের পথে যেতে হয়। পশ্চিমীদের অবরোধ শুরু হয় আবার। মহাযুদ্ধে দু'কোটি মানুষের মৃত্যুর পরও সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্যে কোনো বিরামের অবকাশ ছিল না। সোভিয়েত জনগনের সুমহান আত্মত্যাগ নিয়ে যতই বলা হোক সেটা কমই বলা হবে। দুর্ভাগ্যবশত এর সুফল আত্মস্যাৎ করেছে উদারবাদ, কমিউনিজম নয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানতম দুর্বলতা ছিল, জনগনের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বিকাশ সেখানে ঘটানো হয় নি। প্রকৃতপক্ষে, সেখানে গণতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত হওয়ায়, আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব পশ্চিমী দেশগুলি গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীর দাবিদার হয়েছে। ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস লিখেছিলেন, ‘আমাদের এই গণতন্ত্রের যুগে এখন ভাঙন এসেছে’। ফরাসী চেম্বার অব ডেপুটিতে পিস্তল হাতে এক মজুরের চকিতে ঢুকে পড়ার প্রসঙ্গে তিনি একথা বলেছিলেন। সেই মজুর উচ্চকন্ঠে বলেছিল, ‘আর কোনো ডেপুটির প্রয়োজন নেই। এখন আমরাই প্রভু’। ১৮৪৮ সালে সেটা ঘটার ছিল না। কিন্তু এই অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব প্রদানের ইচ্ছা, এটাই সাম্যবাদের দুর্দমনীয় সন্ধিমুখ। ১৯১৭ সালের অক্টোবরে লেনিন সরাসরি ঠিক এই ইচ্ছারই রূপায়ন করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমরা কল্পজগতের অধিবাসী নই। আমরা খুব ভালো করেই জানি যে একজন অদক্ষ শ্রমিক বা একজন রন্ধনকর্মী এক্ষুনি প্রশাসন পরিচালক হয়ে উঠবেন না। এখানে সূচক শব্দটি হচ্ছে ‘এক্ষুনি’। প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আছে। একবার প্রশিক্ষণ পেলে প্রতিজন রন্ধনকর্মী প্রশাসক হতে সক্ষম হবেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বিপ্লব অজেয় হয়ে উঠবে যদি নিজেকে ভয় না পায়, যদি সর্বহারার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারে’। যদিও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের তুলনায় সুপ্রিম সোভিয়েত শ্রমিক কৃষকের প্রতিনিধিত্ব ছিল অনেক বেশি এবং এর নেতৃত্ব শ্রমিকশ্রেণি (ব্রেজনেভ) বা কৃষক সমাজের (ক্রুশ্চেভ) অভ্যন্তর থেকে উঠে এসেছে, তবু সর্বহারার হাতে ক্ষমতার হস্তান্তর কার্যকরীভাবে ঘটে নি। সাম্যবাদের সামগ্রিক প্রতিশ্রুতি সোভিয়েত ইউনিয়নের বাধ্যবাধকতার জন্যে পূরণ হয় নি।

কার্যকরী গণতন্ত্রের অভাব মানে সেখানে আমলাতন্ত্র ও অচলাবস্থার দিকে একটি ঝোঁক দেখা গিয়েছিল, যা সামাজিক উদ্বৃত্তগুলির গতিপথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার  দিকে পরিবর্তিত করার জন্যেই আস্কারা পেয়েছিল। কোসিগিনের ১৯৬৫, ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের উদ্যোগের মত ব্যবস্থাগত সংস্কারের প্রচেষ্টাগুলি অকৃতকার্য হয়েছে। এগুলো সবই ছিল ওপর থেকে নেমে আসা উদ্যোগ। জনসাধারণ বা পার্টির অভ্যন্তর থেকে উঠে আসে নি। এগুলো সমাজতন্ত্রের অবলুপ্তিতে শেষ হওয়া বিগত শতকের আটের দশকে গর্বাচেভের নেতৃত্বে উপর থেকে নিচে নিয়ে আসা উদ্যোগের মতই। গর্বাচেভ খোলা হাওয়া (গ্লাসনস্ত) ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন (পেরেস্ত্রোইকা) আমদানি করেছিলেন যার ফলে ইংরেজি শব্দভাণ্ডারে এই রুশ শব্দগুলির প্রবেশ ঘটেছিল। ওই সময়ে চিনেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উনি যা যা করার প্রচেষ্টা করেছিলেন তার অধিকাংশ কোসিগিনের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের আদলে তৈরি হয়েছিল। গর্বাচেভ যে কাজটা নাটকীয়ভাবে করেছিলেন এবং  পটপরিবর্তনের চিহ্ণায়ক হিসেবে যে শব্দটি ঘোষিত হয়নি, তার অর্থ ছিল বহুদলীয় নির্বাচনের জন্যে তদ্বির করে কার্যত কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার উপর কেন্দ্রীভূত আক্রমণ নামিয়ে আনা। সেই শব্দ ডিমোক্রেটিজাটসিয়া বা গণতন্ত্রীকরণ সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ভেঙে দিয়ে সেগুলোকে সুবিধাবাদী দলীয় আজ্ঞাদাস এবং বেসরকারি ব্যবসায়ীদের সামনে ভক্ষ্য হিসেবে এগিয়ে দেয়। এরাই রাশিয়ার প্রথম ধনকুবের যারা সোভিয়েত জনগনের সামাজিক সম্পদের দ্বারা পুষ্ট হয়েছিল। রাষ্ট্রের এমন আচমকা ভাঙনের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে খাদের তলায় ঠেলে ফেলতে বোরিস ইয়েলৎসিনের (আনাতোলি চুবাইস  ও ইয়েগর গাইদারের মত বুদ্ধিবৃত্তিক স্যাঙাৎ সহ) মত অশুভ রাজনীতিকের অভ্যুদয় হয়। এমনকী, যে কথাটি প্রায় বলাই হয় না, ইয়েলৎসিন জেনারেল পাভেল গ্রাচেভের সমর্থন নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালের অক্টোবর একটি প্রতিবিপ্লব সংগঠিঊ করেছিল। এটা ছিল অক্টোবর প্রতিবিপ্লব।

কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ

পঁচিশ বছর হয়ে গেল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের। শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষক সমাজের আন্তর্জাতিক স্তরে রাজনৈতিক শক্তিক্ষয়ের মত যে সমস্যাগুলির সম্মুখীন হয়েছে বামপন্থীরা সেগুলি ঘটেছে সোভিয়েতের পতনের আগেই। তৃতীয় বিশ্বের ঋণ সংকট, মালবাহী জাহাজ, উপগ্রহ প্রযুক্তি ও কম্পিউটারের মত প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, অপেক্ষাকৃত স্বল্প জ্বালানি মূল্য এবং মেধাসম্পদ সম্পর্কিত নতুন জমানা- এই সমস্ত কিছুর মিলিত ফলাফলে একটি বিশ্বব্যাপী পণ্যচক্র তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌম সীমানার পরিধিকে এড়িয়েই এখন পণ্য চলাচল করে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, শুধু যে রাষ্ট্রগুলির তাদের অর্থনীতির উপর কর্তৃত্ব থাকছে না তাই নয়, কলকারখানা বা খামারে সংগঠন গড়ে তোলাও কঠিনতর হয়ে উঠেছে। ১৯৮০-র সময়পর্ব থেকেই কমিউনিজমের মূল ভিত্তি যে শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষক সমাজ তারা অনেকটাই শক্তিহীন হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পুঁজির এই নতুন পর্বে সাম্রাজ্যবাদীদের অধিষ্ঠানকে শক্তি জুগিয়েছে।

পুঁজিবাদের গতিকে প্রতিহত করার মত বিকল্প কোনো শিবির রইল না। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সেই অমলিন পংক্তিগুলি এখনও সত্য যেখানে বলা হয়েছিল, ‘পণ্যের সুলভ মূল্য হচ্ছে সেই গোলা যা চিনের প্রাচীরকে ধূলিসাৎ করে, যা বিদেশিদের প্রতি বর্বর জাতিদের নাছোড়বান্দা ঘৃণাকে বশ্যতায় নিয়ে আসে। এরই কারণে নির্মূল হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা বহন করেও সমস্ত জাতি বাধ্য হয় বুর্জোয়া উৎপাদন ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে’। ‘নির্মূল হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা’ অংশটি এই প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত হিংস্রতার অনুরণন বহন করে। এমনকী বুর্জোয়া উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণ করার ব্যাপারটাও একটা ভাঁওতা। এতে শুধু পুঁজির ভয়াল খিদে মেটানোর খাদ্যতালিকায় যুক্ত হওয়াই হয়, শ্রমশক্তির অধিকারের বলে পুরোনো সামাজিক সম্পর্ক নিঃশেষিত হয় না (দাসত্ব ও ঋণ বেড়ি এখনও মেক্সিকোর মাকুইলাডোরাস ও বাংলাদেশের বস্তি এলাকার কারখানায় চালু রয়েছে)। আত্মরক্ষার দুর্গ সোভিয়েত ইউনিয়ন আর নেই। ব্রেজনেভ জমানায় দক্ষিণ আফ্রিকা বা মধ্য আমেরিকার গেরিলা সংগ্রামের জন্যে সমর্থনহীন সময়টিও নেই। পাশ্চাত্যের একমেরুতা (মার্কিন নেতৃত্বে) বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে।

স্মৃতিমেদুরতা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ফিরে যাওয়ার পন্থা হতে পারে না। মানুষের ইতিহাসে কী অবদান রেখে গেছে সেটাই অবলোকন করতে হবে। পুঁজিবাদের বিকল্প। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা। ব্যর্থতাকে সঙ্গী করেই সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র গড়ার পরীক্ষা নিরীক্ষা। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শিক্ষা গ্রহণের অনেক বিষয় রয়েছে। অসংখ্য প্রশংসনীয় সাফল্য। রয়েছে সমালোচনার যোগ্যও বহুদিক। কমিউনিজম আজকের সময়ের বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে সহজেই আত্মপ্রকাশ করার মত একটি ব্যবস্থা নয়। মানব ইতিহাসের যাবতীয় অসুস্থতা নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষায় অনুপ্রবেশ ঘটাবে। সৃজনশীলতার পাশাপাশি সতর্কতাও জরুরি। পেরুর মার্কসবাদী জোস কার্লোস মারিয়াতেগুই (১৮৯৪-১৯৩০) লিখেছেন, কমিউনিজমকে ‘অবশ্যই একটি বীরোচিত সৃজন হয়ে উঠতে হবে’। পূর্ণ বিকশিত চেহারায় এটা কখনও উদিত হয় না। একে লড়ে পেতে হয়। ভুলত্রুটিকে অনুধাবন করতে হয়। এর সাফল্যকে অন্তস্থ করতে হয়। মারিয়াতেগুই লিখেছেন, কমিউনিজম ‘বীরোচিত মেজাজ ও আবেগদীপ্ত আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত শ্রেণি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়’। আমরা সকলেই মানুষ। কিছুই খুঁতহীন নয়। কমিউনিজমের মর্মবাণী হচ্ছে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে নতুন প্রত্যাহ্বানের যুগান্তরে যাত্রার অভীপ্সা।

ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার 

আরও পড়ুন: একুশ শতকের পৃথিবীতে সমাজবাদের বাস্তবতা প্রসঙ্গে


প্রকাশের তারিখ: ০৮-নভেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org