Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

একুশ শতকের পৃথিবীতে সমাজবাদের বাস্তবতা প্রসঙ্গে

সাত্যকি রায়
এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে পুঁজিবাদ থেকে উত্তরণের এই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে সমাজবাদী চিন্তার বাস্তবিক প্রয়োগ সাময়িকভাবে পরাস্ত হয়েছে। কিন্তু একথাও সত্য যে পুঁজিবাদী সমাজের মধ্যেই উৎপাদন প্রক্রিয়া ও মানুষের সমন্বয়ের যে বাস্তব উপাদানগুলি জন্ম নিচ্ছে, তা সর্বতোভাবে ভবিষ্যতের উন্নত সমাজবাদ নির্মাণের পক্ষে উপযোগী পরিপ্রেক্ষিতকে শক্তিশালী করছে। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এরকম তিনটি বিশেষ প্রবণতার ওপরই দৃষ্টি আরোপ করা হয়েছে।
ekush shotoker prithibite somajbader bastobota

সমাজের রূপান্তর প্রসঙ্গে মার্কস দুটি মূল পর্যায়ের অবতারণা করেছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়টি হল নতুন সমাজের আবির্ভাব, যা পুরনো সমাজের জন্মচিহ্ন নিয়ে উপস্থিত হয় এবং নতুন সমাজের নিয়মগুলি পুরনো ব্যবস্থার ওপর আরোপ করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন সমাজ তার আঙ্গিক স্বাতন্ত্র্য বা স্বাভাবিকত্ব অর্জন করে। জার্মান ইডিওলজি-তে এই পর্যায়ের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কস বলেন, একটি অর্গানিক সিস্টেম তৈরি হয় যখন সমাজের উৎপাদন ও অন্যান্য ক্ষেত্র এতটাই পরস্পরের উপর স্বাভাবিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে যে একটির বাস্তবতা অপরটির পূর্বশর্ত রচনা করে। এই দ্বিতীয় পর্যায়ে উত্তরণের আগে যে কোনও সমাজের রূপান্তরের প্রথম পর্যায়টি সবসময়ই একটি দীর্ঘ সংঘাতের প্রক্রিয়া, যেখানে পুরনো সমাজের পিছুটানকে ক্রমাগত অবদমিত ও পরাজিত করতে করতে এগোতে হয়। এই লড়াইয়ের মূল বিষয়বস্তু হল নতুন সামাজিক প্রবণতাগুলির প্রতি মানুষের আকর্ষণকে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। 

কোনও সমাজের রূপান্তরই অনিবার্য ঘটনা নয়। তার সম্ভাবনা নির্ভর করে একদিকে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার বিকাশের উপরে। এবং সেই সমাজের উপযোগী পরিবর্তিত মানুষের সচেতন অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ একথাই শেখায় যে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সম্পর্কগুলি সমাজের গতি প্রকৃতির সম্ভাবনার সীমা রচনা করে মাত্র। সমাজের কোনও অভিমুখই পূর্ব নির্ধারিত বা অনিবার্য নয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর্যায়ে জয় ও পরাজয়ই ঠিক করে দেয় ইতিহাসের অভিমুখ। সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণের ক্ষেত্রেও অজস্র প্রত্যাবর্তনের নজির পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ বিচারে উৎপাদনের প্রকৃতির পরিবর্তন ও তার সঙ্গে মানুষের যে পরিবর্তন ঘটতে থাকে তা পিছিয়ে পড়া সমাজের প্রবণতাগুলিকে ক্রমাগত অপ্রাসঙ্গিক ও অকেজো করে তোলে। মনে রাখা দরকার উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। মানুষ তার চারধারের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে পরিবর্তিত করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও ক্রমাগত পরিবর্তিত করতে থাকে। প্রশ্ন হল ভবিষ্যতের লক্ষ্যে শ্রমজীবী মানুষের পূর্ণাঙ্গ স্বেচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক শক্তিগুলি রূপান্তরকালে বিকশিত হওয়া প্রয়োজন, তা যথাযথ ভাবে গড়ে উঠতে পারছে কী না। 

এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে পুঁজিবাদ থেকে উত্তরণের এই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে সমাজবাদী চিন্তার বাস্তবিক প্রয়োগ সাময়িকভাবে পরাস্ত হয়েছে। কিন্তু একথাও সত্য যে পুঁজিবাদী সমাজের মধ্যেই উৎপাদন প্রক্রিয়া ও মানুষের সমন্বয়ের যে বাস্তব উপাদানগুলি জন্ম নিচ্ছে, তা সর্বতোভাবে ভবিষ্যতের উন্নত সমাজবাদ নির্মাণের পক্ষে উপযোগী পরিপ্রেক্ষিতকে শক্তিশালী করছে। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আমরা এরকম তিনটি বিশেষ প্রবণতার ওপর দৃষ্টি আরোপ করব।

পুঁজিবাদী চিন্তা বাজার সম্পর্কে এক অদ্ভুত অবজেক্টিভিটি-র ধারণা উপস্থিত করে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং বন্টন প্রক্রিয়া যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনও শক্তির দ্বারা নির্ধারিত হয়। চাহিদা ও যোগানের নিরিখে পুঁজিবাদী বাস্তবতাকে এক অমোঘ, নিরপেক্ষ সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। বাজারের মাধ্যমে বন্টনের প্রক্রিয়াটাই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তাকে অতিক্রম করার কোনও সম্ভাবনা নেই এরকম একটি ধারণা শত শত বছর ধরে মানুষের মনের মধ্যে প্রোথিত রয়েছে। অথচ, বাজারের স্বতঃস্ফূর্ততা সমাজে যে বিপুল পরিমাণ রসদের অপচয় ঘটিয়ে চলেছে প্রতিদিন, তা আমাদের নজরে পড়ে না। ব্যক্তিগত পুঁজিপতি উৎপাদনের আগে জানতেই পারে না সে যে জিনিস উৎপাদন করছে সমাজে তার প্রয়োজনীয়তা কতটা অথবা তার মত কতজন ওই একই জিনিস উৎপাদনের কাজে লিপ্ত রয়েছে। উৎপাদিত পণ্য দ্রব্য নিয়ে সবাই বাজারে হাজির হওয়ার পর তারা বুঝতে পারে কতটা জিনিস বিক্রি হল আর কতটা অবিক্রীত থেকে গেল। অর্থাৎ যা বিক্রি হল না তার পিছনে নিয়োজিত রসদ আসলে অপচয় হল। মূল্যের নিয়ম ও লাভক্ষতির হিসাব পুঁজিপতিকে শিখিয়ে দেয় পরবর্তী উৎপাদন চক্রে কতটা পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু পৃথক পৃথক উৎপাদকের মধ্যে যদি সমন্বয় সৃষ্টি করা যায় সমাজের বিভিন্ন জিনিসের প্রয়োজনীয়তা কত এবং তা যদি পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন করা যায় তবে রসদের বিপুল অপচয় রোধ করা সম্ভব। পুঁজিবাদ আসলে বাজারের কথা বলে বাজারের স্বতঃস্ফূর্ততার সমস্যার সমাধান খুঁজতে চায় পুঁজির কেন্দ্রীভবনের মধ্যে দিয়ে। সেই মর্মে বিপুল পরিমাণ পুঁজির কর্তৃত্ব ও পরিকল্পিত উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী প্রসারিত একচেটিয়া পুঁজির নিয়ন্ত্রণে সংগঠিত করার ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠছে। আসলে গোটা সমাজটাই একটি কারখানায় রূপান্তরিত হচ্ছে এবং বিস্তৃত ভ্যালু-চেইনের মাধ্যমে একচেটিয়া পুঁজির নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রক্রিয়া শক্তিশালী হচ্ছে। এই গোটা উৎপাদন সংগঠন প্রক্রিয়ায় বাজারের স্থান অত্যন্ত সীমিত। 

মার্কস বলেছিলেন যে পুঁজিবাদে বাজার আসলে ফ্যাক্টরি গেটে এসে থেমে যায়। ফ্যাক্টরির ভেতরে মালিকের নির্দেশ সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের নজরদারির মতই কার্যকরী করা হয়, এখানে বাজারের কোনও স্থান নেই। পুঁজির সুতীব্র কেন্দ্রীভবনের মধ্যে দিয়ে আজকের সমাজের উৎপাদনের বেশিরভাগ অংশটাই হাতেগোনা বহুজাতিক সংস্থার নিয়ন্ত্রনে। সমাজবাদের প্রাথমিক প্রতিজ্ঞা হল উৎপাদনের সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা। এবং তা সবচেয়ে ভালোভাবে করা সম্ভব যখন উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী মানুষ সমবেতভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপরে মালিকানা স্থাপন করতে পারে। উৎপাদনের যে বিপুল সামাজিকীকরণ আজকের সময় ঘটে চলেছে তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তা হল উৎপাদন ব্যবস্থার উপরে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। আজকের পৃথিবীতে ইন্টারনেট ও যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমের ব্যবহার ও বিগ ডেটা এনালিসিস-এর সাহায্যে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নানা ধরনের প্রয়োজনীয়তা ও তার পরিবর্তনের রিয়েল টাইম পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিমাপ করা সম্ভব। এই কাজ বিশ্ব জুড়ে সমস্ত প্ল্যাটফর্মগুলি প্রতিদিন করে চলেছে। ফলে সামাজিক মালিকানার ভিত্তিতে স্তরে স্তরে পরিকল্পনার এই গতিশীল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা আজকে যতটা সহজ, বিংশ শতাব্দীতে তত সহজ ছিল না। কিন্তু একথা খেয়ালে রাখা দরকার যে সমস্যাটার সমাধান কখনই শুধু প্রযুক্তির উন্নতি নয়। উন্নত প্রযুক্তি কেবলমাত্র রূপান্তরের বাস্তবতা তৈরি করছে। একে কার্যকরী করতে গেলে উৎপাদকদের বিভিন্ন স্তরে পরিকল্পনা ও উৎপাদনে অংশ গ্রহণ করার রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করা দরকার। সমাজের জন্য কোনটা উপযুক্ত এটা নির্ধারণের কোনও একমাত্রিক মাপকাঠি নেই। অনেকগুলি উপযুক্ত সমাধানই তৈরি হতে পারে। বরং কোনটা কোন সময় সবচেয়ে উপযোগী তা নির্ধারণের জন্য নানা স্তরে আলোচনা, বিতর্ক, গণনা ও পুনর্গণনা এবং বিভিন্ন ধরনের দরকষাকষির মাধ্যমেই কেবল মাত্র স্থির হতে পারে। 

মানসিক ও কায়িক শ্রমের বিভাজন দূর করে উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী মানুষ একদিকে পরিকল্পনাও করবে অন্যদিকে উৎপাদনে সরাসরি অংশগ্রহণ করবে এটাই সমাজবাদের অঙ্গীকার এবং তার উপযোগী প্রবণতাগুলি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট স্পষ্ট হচ্ছে।

দ্বিতীয়তঃ দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ব্যক্তিভিত্তিক পরিমাপ উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। ধরা যাক, সাতজন লোকের কাজ কোনও একটি রোবট একটি মানুষের তত্ত্বাবধানে করে দিতে সক্ষম। ওই একজন মানুষের উৎপাদনশীলতা সে ক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় সাত গুণ বৃদ্ধি পেল এই কথাটির বিশেষ কোনও তাৎপর্য নেই। তার কারণ ওই মানুষটি সাত গুণ উৎপাদনশীল হয়েছে শুধু তার নিজের দক্ষতা বা যোগ্যতা বৃদ্ধির কারণে নয়, বরং যে সামাজিক শ্রম, বুদ্ধি ও মেধা রোবটটি তৈরি করতে নিহিত হয়েছে সেই সামাজিক শ্রম আসলে একটি যৌথ সত্তা। যে ব্যক্তি রোবটটির সাথে এখন কাজ করছে তার দক্ষতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল সামাজিক শ্রমের দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি, যা ব্যক্তি মানুষের উৎপাদনশীলতার সাপেক্ষে মূল্যায়ন করা অর্থহীন। এই কারণেই দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা উৎপাদনের একটা পর্যায় পর্যন্ত ব্যক্তি মানুষের শ্রমের নিরিখে পরিমাপ করা সম্ভব হলেও প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে, ব্যক্তি মানুষের দক্ষতা আসলে অনেক বেশি অংশে যৌথ শ্রমের ফসল হয়ে উঠছে। এই যৌথ শ্রম ও বুদ্ধিমত্তার মূল্যায়ন সে কারণেই ব্যক্তির সাপেক্ষে আর বেশি দিন প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে না। এছাড়াও আজকের দিনের প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন অনেক বেশি জ্ঞানকেন্দ্রিক। উৎপাদনে বৌদ্ধিক সংযোজনের মাত্রা কায়িক শ্রমের তুলনায় অনেক বেশি। এবং সে কারণেই উৎপাদন ও ব্যবহারের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী মানুষদের মধ্যে আদান-প্রদান ও সমন্বয় আজকের দিনে অনেক বেশি জরুরি। পুঁজিবাদ বিপুল পরিমাণ তথ্য সম্ভার ও জ্ঞানের উপরে কেন্দ্রীভূত মালিকানা স্থাপন করে সামাজিক শ্রমের ফসলকে ব্যক্তিগত মুনাফায় রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করছে। পৃথিবী জুড়ে মানুষের পছন্দ-অপছন্দের বিস্তৃত তথ্য ব্যবহার করে হাতে গোনা কয়েকটি সংস্থা বাজারের উপর এবং মানুষের পছন্দের উপর দীর্ঘমেয়াদী উপনিবেশ স্থাপন করতে চাইছে। অথচ এই বিস্তৃত তথ্য ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপরে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলে উৎপাদন প্রক্রিয়া অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণ মূলক হওয়া সম্ভব। 

সমাজবাদের অঙ্গীকার এ কারণেই আজকের দিনে অনেক বেশি বাস্তবোচিত।

তৃতীয়ত, পরিবেশ ও ক্লাইমেট সম্পর্কিত যে সংকট আজকের পৃথিবীর মানুষের উপরে আশু বিপদ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে তাকে সমাধান করার রাস্তা পুঁজিবাদ খুঁজে পাচ্ছে না। পরিবেশ ও প্রকৃতি পুঁজির চোখে কাঁচামাল ও শক্তি সরবরাহের উৎস যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিনামূল্যে পাওয়া যায়। অন্যদিকে উৎপাদন ইত্যাদির কারণে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের যে ক্ষতি হয়ে থাকে তা যেহেতু দামের মধ্যে প্রতিফলিত হয় না, তাই বাজারের সম্পর্ক পরিবেশ সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কিন্তু পরিবেশ ও প্রকৃতির আসন্ন সংকট যে মানব সভ্যতার অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে চলেছে তাকে স্বীকার করেই পুঁজিবাদ বাজারের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে চায়। এর অন্যতম পথ হল উৎপাদনে যে সামাজিক ক্ষতি তৈরি হচ্ছে তাকে উৎপাদকের দামের মধ্যে যুক্ত করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মুশকিল হল প্রতিযোগিতা যেহেতু উৎপাদন খরচের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাই পুঁজিবাদের নিয়ম আসলে এই বাড়তি উৎপাদন খরচকে প্রতিযোগিতার অন্তরায় হিসেবেই দেখে থাকে। মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কাঁচামাল ও শক্তির পেছনে খরচ কমানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা করে চলেছে উৎপাদকরা। এটা আপেক্ষিক উদ্বৃত্তমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম একটি উপায়। তাই পুঁজিবাদের নিয়ম আসলে পরিবেশ সুরক্ষার উপযোগী উৎপাদন প্রকরণ ও রসদ ব্যবহারের জন্য আদৌ অনুকূল নয়। 

মার্কস বলেছিলেন সম্পদ ও ব্যবহার মূল্য সৃষ্টির দুটি উৎস: প্রকৃতি ও শ্রম। প্রকৃতি আসলে হল মানুষের বিস্তৃত অস্তিত্ব। আর পুঁজিবাদ মুনাফার স্বার্থে প্রকৃতিকে দেখেছে মানুষের অস্তিত্বের বাইরের অবজেক্ট হিসেবে, যার উপর উপনিবেশ স্থাপন করে মুনাফা বৃদ্ধি করাটাই মানুষের কাঙ্খিত অগ্রগতির পথ। একথা ঠিক অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় মানুষ অনেক এগোতে পেরেছে তার প্রধান কারণ হল সে তার চারপাশের পরিবেশকে নিজের জীবন ও জীবিকার অনুকূলে পরিবর্তিত করতে পেরেছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেও পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদের স্বল্পমেয়াদী মুনাফার লক্ষ্য মানুষ ও প্রকৃতির দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতাকেই সংকটগ্রস্ত করে তুলছে। পৃথিবীর অস্তিত্ব সম্পর্কিত এই সমস্যা আজকে মানুষের প্রতিদিনের জীবন জীবিকাকে আঘাত করছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের জলের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা আক্রান্ত হচ্ছে। পৃথিবীর বেশ কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে চাষাবাদ ও জীববৈচিত্র‍্য গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কিছুর থেকে মুক্তির উপায় হল প্রকৃতি ও মানুষের অস্তিত্ব ও বিকাশের সমন্বয় সাধন। বাজারের মধ্যে দিয়ে এই সমন্বয় যে অসম্ভব তা প্রতিদিন পরিবেশ দূষণ ও কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার মধ্যে দিয়েই বোঝা সম্ভব। হাজার আলোচনা ও চুক্তি করেও কাঙ্খিত মাত্রায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণ ব্যক্তিগত সম্পত্তি, মুনাফা ও বাজার কোনও মতেই এই সার্বিক স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে পারছে না। 

সমাজবাদই একমাত্র মানুষের যৌথ অস্তিত্ব ও অগ্রগতিকে ব্যক্তিগত মুনাফার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারবে। উৎপাদনের প্রকৃতি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ধারণা এমন ভাবে পরিবর্তিত করা সম্ভব যা প্রকৃতিকে সুরক্ষিত করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী হিসেবে এই পৃথিবীকে  বাসযোগ্য করে তুলতে পারবে।


প্রকাশের তারিখ: ০৭-নভেম্বর-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শ্রমিক কৃষক বিভাগে প্রকাশিত ৫৬ টি নিবন্ধ
২০-মে-২০২৬

১৭-মে-২০২৬

১৫-মে-২০২৬

০৭-মার্চ-২০২৬

০১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৯-ডিসেম্বর-২০২৫

০২-ডিসেম্বর-২০২৫

০১-ডিসেম্বর-২০২৫

৩০-নভেম্বর-২০২৫

২৬-অক্টোবর-২০২৫