বাংলার কৃষি ও কৃষক:  গত এক দশকের বিপন্নতা (দ্বিতীয় পর্ব)

সোহম ভট্টাচার্য
গত দশকের একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য গণ-আন্দোলনের কথা যদি মনে রাখা যায়, তাহলে দুটি ছবি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। প্রথমটি, মহারাষ্ট্রের লক্ষাধিক কৃষক হেঁটে চলেছেন রাজপথে (Kisan Long March, Dhawale 2018)। দ্বিতীয়টি অবশ্যই কৃষিবিরোধী বিলের দাবিতে দিল্লির সীমান্তে কৃষকদের বিক্ষোভ। এই দুটি বিরোধের মাঝে একটি অবিচ্ছিন্ন সংযোগ রয়েছে। নয়া-উদারবাদী সময়ে কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য দাম কৃষক পাচ্ছেন না। এর সামনে দাঁড়িয়ে, অন্তত নীতির ভিত্তিতে, মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের নীতিটি সরিয়ে নেওয়ার কু-যুক্তির প্রতিরোধ।

১ম পর্বটি পড়ুন 

কৃষিজাত আয়ের বিপন্নতার সাথে গ্রামীণ প্রান্তিক পরিবারের প্রলেতারিয়করণ যেরকম ওতপ্রোতভাবে জড়িত (প্রথম পর্বের আলোচনার মূল উপজীব্য) তার সাথেই স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন উঠে আসে—

এই প্রলেতারিয়করণের পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক (concrete conditions) বিশিষ্ট উপাদানগুলি (কিংবা উপকরণ) কী? এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন এই উপাদানগুলির সাথে অবশ্যই ভারতীয় উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতিগুলি সম্পৃক্ত। তাই দ্বিতীয় একটি সংযোজিত প্রশ্ন থেকে যায়— গত এক দশকে রাজ্য সরকার কৃষিক্ষেত্রের এই বিপন্নতার ক্ষেত্রে কি এই উদারবাদ-জনিত বিপন্নতাকে প্রতিরোধ করার কোনও চেষ্টা করেছেন? এই দুটি দিকই আলোচনার মূল অংশ।

লেখাটি তিনটি অংশে ভাগ করে নিচ্ছি। প্রথম অংশে, আয়ের বিপন্নতার একটি মূল উপাদান রূপে কৃষি উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারি দাম-নীতির (সাপোর্ট প্রাইস) একটি আলোচনা সামনে রাখব। দ্বিতীয় অংশে, পশ্চিমবঙ্গের কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে এই দাম-নীতির এবং বাজারের প্রভাবের একটি আলোচনা। এই দুটি অংশ-ই মূলত সংকটের ব্যবহারিক উপাদান। 

এর বাইরে একটি বৃহত্তর সামাজিক উপাদান আছে, লেখার শেষ অংশে সেটি তুলে ধরার চেষ্টা করব। সেই উপাদানটি নিহিত বর্তমান রাজ্য শাসক-দলের আপাত জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটি সামাজিক-পিতৃতান্ত্রিকতার ব্যবহারে। কৃষি ক্ষেত্রে প্রান্তিকতম শ্রেণির কাছে এই লিঙ্গভিত্তিক শ্রমের (মূলত বিনা পারিশ্রমিকের নারী-শ্রম) একটি সুচতুর ব্যবহার করে চলেছে বর্তমান রাজ্য সরকার। এই শেষ ইঙ্গিতের মধ্যেই সম্ভবত সবকটি মার্কসবাদী রাজনৈতিক বিরোধের একটি আভাস লুকিয়ে আছে।              

আয়ের বিপন্নতার উৎস: কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় এবং উদারবাদী দামের রাজনীতি

গত দশকের একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য গণ-আন্দোলনের কথা যদি মনে রাখা যায়, তাহলে দুটি ছবি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। প্রথমটি, মহারাষ্ট্রের লক্ষাধিক কৃষক হেঁটে চলেছেন রাজপথে (Kisan Long March, Dhawale 2018)। দ্বিতীয়টি অবশ্যই কৃষিবিরোধী বিলের দাবিতে দিল্লির সীমান্তে কৃষকদের বিক্ষোভ। এই দুটি বিরোধের মাঝে একটি অবিচ্ছিন্ন সংযোগ রয়েছে। নয়া-উদারবাদী সময়ে কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য দাম কৃষক পাচ্ছেন না। এর সামনে দাঁড়িয়ে, অন্তত নীতির ভিত্তিতে, মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের নীতিটি সরিয়ে নেওয়ার কু-যুক্তির প্রতিরোধ। 

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি, এই উপাদানটি উপস্থিত (চিত্র ৩)। ২০১১-১২ থেকে ২০২১-২২ সালে পশ্চিমবঙ্গের মূল কৃষিজাত পণ্য, ধানের ক্ষেত্রে, সামগ্রিক কৃষি ব্যয় (প্রতি ক্যুইন্টাল বা ১০০ কেজিতে) বৃদ্ধি পেয়েছে  ১০৮০ টাকা থেকে ১৯৪২ টাকায়। ২০০৫-০৬ সালে স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশকে যদি সামনে রাখি, তাহলে ২০২১-২২ সালে, ঘোষিত মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস হওয়া উচিত ২৯১৩ টাকা (প্রতি ক্যুইন্টালে)। এইখানেই কেন্দ্রীয় নীতির অবহেলাটি লুকিয়ে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের একজন ধান-উৎপাদকের ঘোষিত দামের উপরেও প্রতি কেজিতে প্রায় ১০টাকা বেশি প্রাপ্য। রাজ্য সরকার এই সাপোর্ট প্রাইসের সপক্ষে নীতিমূলক ভাবে কিছু আইন প্রনয়ন করেছেন (২০১৪, ২০২০), কিন্তু আইন অব্দিই এই নীতির দৌড়।   

      
সূত্র- ডিরেক্টোরেট অফ ইকনোমিক এন্ড স্টাাটিস্টিক্স। লেখককৃত।

এর পাশাপাশিই কিছু প্রশ্ন আসে, যে প্রশ্নের সাথে একজন প্রান্তিক কৃষকের দৈনন্দিন কৃষি-ব্যয় জড়িত। গত এক দশকের গবেষণা থেকে অধ্যাপক অপরাজিতা বক্সী (২০০৬), ড. তাপস মোদক (২০১৭), এবং বক্সী এবং অন্যান্য (২০২২) উৎপাদনের ক্ষেত্রে দুটি পরিবর্তন নিরীক্ষণ করছেন।       

এক, পশ্চিমবঙ্গের বোরো ধান (যা সবুজ বিপ্লব এবং তিন-ফসলী জমির অন্যতম একটি দিক) চাষের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ কৃষক সেচের জলের উপর নির্ভরশীল। এই সেচের জল ভূমি-নিহিত (গ্রাউন্ড-ওয়াটার) সেচের মাধ্যমেই আসে। ২০০৫-০৬ সালে এই সেচের জলকে মাটির উপরে তোলার ক্ষেত্রে মূল যান্ত্রিক উপাদান ছিল ডিজেল চালিত পাম্প, কিন্তু এক দশকের মধ্যেই (যেহেতু বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের ক্ষেত্রে প্রাথমিক একটি ঋণ এবং ভর্তুকি দেওয়া শুরু হয় ), ২০১৫-১৬ সালের মধ্যে গ্রামের একটি বড়ো অংশের অতি প্রান্তিক কৃষক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, বিদ্যুৎচালিত পাম্পে তোলা জলের উপর। এর একটি মূল কারণ অবশ্যই ডিজেলের দাম বৃদ্ধি। এই ‘submersible’ বিদ্যুৎচালিত পাম্প মুলত গ্রামের স্বচ্ছল কৃষিজীবিদের কাছেই থাকে, ফলে, প্রতি বিঘায়, জল কিনে সেচে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রান্তিক কৃষকের যে ব্যয়, তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে (মেরি বুইসন এবং অন্যান্য ২০২১, তাপস মোদক ২০২২)। কৃষি ব্যয় বৃদ্ধির একটি দিক এই ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক যান্ত্রিকতার মধ্যে নিহিত। রাজ্যের প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে ব্যয় সংকোচনের কোনও সুরাহার অন্তত চেষ্টা দেখা যায়নি।            

ব্যয় বৃদ্ধির একটি দ্বিতীয় উপাদান, কৃষি- শ্রমের প্রকৃতি এবং বণ্টনের মধ্যেও নিহিত। যে মুহূর্তে, ধানের রোপন কিংবা বপণের (Sowing and Transplanting) ক্ষেত্রে ঠিকা-মজুরি শুরু হয়ে যায়। সেই ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে মূলত আগে যে-শ্রমটি বাড়ির-নারী-শ্রমের মধ্য দিয়ে হত, তা বাজারজাত হয়ে ওঠে। ড. নিয়তি, তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, গৃহজাত নারী-শ্রমের কৃষিক্ষেত্র থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার দুটি কারণ। প্রাথমিকভাবে, ট্র্যাক্টর কিংবা কম্বাইন্ড হারভেস্টরের মতো যন্ত্র-চালনার ক্ষেত্রে নারী-শ্রমিকের একটি সামাজিক বাধা-বিরোধ তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, ঠিকা-মজুরির শ্রমে ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষক পরিবারের নারীকে শ্রমিক রূপে (piece-labour gang) হয়তো যোগ দিতে দেখা যেতেও পারে, কিন্তু যেহেতু ধানের মতো শস্যের ক্ষেত্রে (বর্ষা এবং অন্যান্য কারণে) সঠিক-সময়ে বপণ-রোপন একটি গুরুত্বের বিষয়। তাই বাজারজাত শ্রমের সামনে গৃহ-শ্রম ধীরে ধীরে কমে আসে (সারণী ৪)।          

সারণী ৪: হেক্টর-প্রতি মানবিক শ্রমের ব্যবহার প্রতি হেক্টরে, ধান উৎপাদন, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১১-২০২২

শ্রমের প্রকৃতি (হেক্টর প্রতি)

২০১১-১২ (ক)

২০২১-২২ (খ)

পরিবর্তন (খ-ক)

গৃহ-শ্রম (ঘণ্টা)

৫০৯

২৯৩

-২১৬

মজুরি-শ্রম (ঘণ্টা)

৬৭৫

৩৪৬

-৩২৯

সামগ্রিক (ঘণ্টা)

১১৮৪

৬৩৯

-৫৪৫ (৬৮ দিন)

সূত্র- ডিরেক্টোরেট অফ ইকনোমিক এন্ড স্টাাটিস্টিক্স। লেখককৃত।

এইক্ষেত্রে সারণী ৪ থেকে একটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। যান্ত্রিক উপাদানের (যদিও শুধুমাত্র এই কারণে নয়) ব্যবহারের ফলে, পশ্চিমবঙ্গে অন্তত বার্ষিকভাবে অন্তত ৬৮ দিনের (৮ ঘণ্টার দিনের হিসেবে) মানবিক শ্রমের হ্রাস ঘটেছে। এইক্ষেত্রে যান্ত্রিক শ্রম বিরোধিতার কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ থাকা উচিৎ নয়। এতে প্রতি বিঘা উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হল এই যান্ত্রিকতাটির মালিকানা কার হাতে? কী দামে সেই সেচের পাম্পের জল, কোন দামে জোত প্রতি ভাড়া নেওয়া ট্র্যাক্টরের ব্যবহার সম্ভব? দ্বিতীয়ত, এই যে হেক্টর প্রতি বার্ষিক ৬৮ দিনের শ্রমের প্রয়োজন রইল না। এর ফলে যে শ্রম- বিশোষণ (Labour Absorption) সম্ভব ছিল, সেই শ্রমিক পরিবারের এখন কাজের সুযোগ কী? অর্থাৎ, ভর্তুকি-ভিত্তিকভাবে ব্যক্তিগত মালিকানায় যদি কৃষিতে ব্যবহারের যান্ত্রিক উপাদান ঘটে, এর দুটি বাজার-জাত দিক রয়েছে। এক, কৃষি ব্যয়ের বৃদ্ধি। দুই, শ্রম-বিশোষন হ্রাস।

প্রলেতারিয়করণের ক্ষেত্রে, ব্যবহারিকভাবে উৎপাদনের উপাদানে এই ব্যক্তিগত মালিকানার দিকটি গত এক দশকে বাংলার ক্ষেত্রে একটি বিশিষ্ট উপাদান (Concrete Condition)। এক্ষেত্রে, একটি রাজনৈতিক ইঙ্গিতের প্রয়োজন। মার্কসবাদী আলোচনায়, এই উপাদানটি শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের অন্যতম একটি বিরোধাভাসের সূত্র।

কেন বাজার সমাধান নয়?  ফড়ে, দালাল, এবং বাংলায় কৃষিজাত পণ্যের বাজার

দ্বিতীয় অংশের আলোচনাটি সংক্ষিপ্ত। এইক্ষেত্রে দুটিই আলোচ্য দিক। এক, বাংলায় রাজ্য সরকারের কৃষি-বিরোধী বিলের প্রচুর বিরোধিতা (ইত্যাদি) খাতায় কলমে দেখা গেলেও, মূল ক্ষেত্রের চিত্রটি সামান্য আলাদা (চিত্র ৪)। 

প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের ৯৪ শতাংশ ধান উৎপাদক কৃষিজীবী ন্যূনতম দামের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রয় করেছেন। মনে করিয়ে দিই, ন্যুনতম দামটি ইতিমধ্যেই স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশের চেয়ে অনেক কম।  


সূত্র- সিচুয়েসশন অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে, ২০১৮-১৯।

দ্বিতীয়ত, যে ৯৪ শতাংশ কৃষিজীবী সাপোর্ট প্রাইসের সাহায্যটুকু পেয়ে ওঠেননি, তাঁদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ ধান উৎপাদনকারী কৃষিজীবী-ই বেসরকারি (খোলা বাজারে) ধান বিক্রি করেছেন।

সারণী ৫- বাজারের প্রকৃতি এবং ন্যায্য মূল্য লব্ধি, ২০১৮-১৯, ধান, পশ্চিমবঙ্গ

বাজারের প্রকৃতি

সাপোর্ট প্রাইস রহিত (%)

সাপোর্ট প্রাইস পেয়েছেন (%)

সামগ্রিক (%)

বেসরকারি (ফড়ে ও অন্যান্য)

৯৭.০

৩.০

১০০

সরকারি/ নিয়ন্ত্রিত

৫২.৭

৪৭.৩

১০০

অন্যান্য বাজার

৮০.০

২০.০

১০০

সামগ্রিক

৯৩.৭

৬.৩

১০০

সূত্র- সিচুয়েসশন অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে, ২০১৮-১৯। লেখককৃত।

এইক্ষেত্রে বাংলার কৃষি বিপণনের ক্ষেত্রে ফড়ে- দালাল এবং মধ্য-উপজীবীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কৃষি বিরোধী দিক রয়েছে। 

প্রান্তিক-শ্রেণি এবং লিঙ্গের রাজনীতি: বাংলার কৃষি বিপন্নতা এবং কিছু শেষ কথা

যে কোনও জনপ্রিয়তার, মূলত রাষ্ট্র (এক্ষেত্রে) চালনায়, একটি শ্রেণি-ভিত্তি থাকে। ১৯৭৭ সালের পর থেকে অন্তত পরবর্তী ২০ বছরের রাজ্যের নীতিতে এবং মার্কসবাদী পরিসরে এই শ্রেণি-ভিত্তির একটি দিক ছিল ভাগচাষের অধিকার দেওয়া, কৃষিজীবী এবং শ্রমজীবী পরিবারের জন্য, ভালো মজুরির বেতন তৈরি করে তোলা। এক দশকের (প্রায় বিরোধীশূন্য) তৃণমূল রাজ্য-শাসনের ক্ষেত্রে শ্রেণির আলোচনার সম্ভাব্য সুযোগ উপস্থিত। অধ্যাপক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (২০২৩) তাঁর একটি সাম্প্রতিক লেখায়, ‘ফ্র্যাঞ্চাইজ-তৃণমূলের’ একটি দিক নির্দেশ করছেন। এই লেখার মূল উপজীব্যে তিনি লিখছেন, প্রাথমিকভাবে, তৃণমূলের নেত্রীর ছবিকে সামনে রেখে একটি নব্য রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বের উদ্ভব। যেমন ‘কে-এফ-সি’ কিংবা ‘প্যান্টালুন্স’ এর আউটলেট তৈরি হয়। প্রতিটি আউটলেট, ধরা যাক বীরভূম কিংবা কুলতলি, তাঁদের স্থান-ভিত্তিক রাজনৈতিক ক্ষমতাকে এই ব্র্যান্ডের ভিত্তিতে জিইয়ে রাখে। অধ্যাপক ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত এবং আমার (২০২৩) এর একটি লেখায়, গ্রামীণ বাংলায় ‘আউটলেট’-কে আমরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি এবং একটি “নব্য উৎকোচ-জীবী” (Nouveau-Rich) শ্রেণির ইঙ্গিত রেখেছি। দুটি লেখার মধ্যেই যে-সম্ভাবনার ইঙ্গিত আছে, লেখার এই অংশে বাংলার কৃষি-ক্ষেত্রে এই শ্রেণিটির ‘জনপ্রিয়তার’ ভিত্তি রূপে লিঙ্গভিত্তিক-রাজনীতির একটি ধনতান্ত্রিক ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়ে আপাত লেখাটি শেষ করি। এই দিকটি স্বল্প আলোচিত এবং সম্ভবত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।

সারণী ৬- মূলত কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্ত শ্রম-যোগ্য বয়সী পরিবারের নারীশ্রমের প্রকৃতি, ২০১১-১২-২০২২-২৩, শতাংশে, পশ্চিমবঙ্গ                   

শ্রমের প্রকৃতি

২০১১-১২

২০২২-২৩

স্বনিযুক্ত

৪.৩

১৮.

বিনা-পরিশ্রমের শ্রমে স্বনিযুক্ত (ক)

৮.৫

১৬

নিয়মিত মজুরির কর্মী

৫.৪

দৈনিক মজুরির/ অনিয়মিত মজুরির কর্মী

৪৪.

২৫

লেখা-পড়া

০.৩

০.২

সামাজিক শ্রম পুনরুৎপাদন (খ)

৩৭.৫

৩৭.৮

সামগ্রিক

১০০.

১০০.

সূত্র: এমপ্লয়মেন্ট সার্ভে (২০১২) এবং পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে। লেখককৃত। শ্রমযোগ্য বয়সের অর্থ- ১৫-৬৫ বছর।

গত এক-দশকে বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় তৃণমূলের জনপ্রিয়তার ভিত্তি রূপে নারী-ভিত্তিক প্রকল্পকে তুলে ধরা হয়েছে। সারণী ৬-এর তিনটি মূল আলোচ্য বিষয় আছে। শ্রেণি এবং লিঙ্গের বিভাজন-মূলক রাজনীতিকে এই ক্ষেত্রে সম্ভবত সর্বাধিক পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে। 

প্রথমত, বাংলায় এক দশকে কৃষিজীবী পরিবারের মধ্যে ১৫-৬৫ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে দৈনিক মজুরির শ্রমিকের অংশটি (লাল কালিতে) ৪৪ শতাংশ থেকে কমে এসেছে ২৫ শতাংশে। এই আপাত শ্রম হ্রাসের সাথে এই পর্বের প্রথম এবং দ্বিতীয় অংশকে জুড়ে নিলে, তাহলে ব্যক্তিগত মালিকানার যন্ত্রীকরণের সামনে নারী-শ্রম বিশেষণের হ্রাসটি পরিষ্কার। 

দ্বিতীয়ত, স্বনিযুক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু স্বনিযুক্তির একটি বড়ো অংশ বিনা-আয়ের স্বনিযুক্ত কর্মী। এই অংশটি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে (সারণীতে-ক)। 

তৃতীয়ত, সামাজিক শ্রম পুনরুৎপাদন (সোশ্যাল রিপ্রোডাক্টিভ লেবার) এর অর্থ সেই শ্রম যা পরিবারের শ্রম-যোগ্য মানুষের শ্রম-ক্ষমতাকে তৈরি করে। সহজ অর্থে, রান্না করা কিংবা বাড়ির পানীয় জল সংগ্রহে যে-শ্রম, সেই শ্রমটি না-থাকলে, বাজারে মজুরি ভিত্তিক শ্রম-বিক্রি করছেন এমন শ্রমিকের শ্রম-শক্তির পুনরুৎপাদন সম্ভব নয়। ভারতীয় পিতৃতন্ত্রের একটি মূল দিক, গ্রামাঞ্চলে এই সামাজিক শ্রম পুনরুৎপাদনের একটি বড়ো অংশই বাড়ির মহিলাদের উপর ন্যস্ত। এই শ্রমটি যেভাবে নগরে বাজারজাত বাজারজাত রূপ নিয়েছে (বাড়ির পরিচারিকা কিংবা ঠিকা-মজুরিতে পরিচারকের কাজ) তেমনভাবে গ্রামাঞ্চলে নেই (সারণী ৬- খ)।

এর সাথে অবশ্যই জাতির রাজনীতি সংযুক্ত। সেদিকে সম্পূর্ণ আলোকপাতের চেষ্টা অন্য কোনও লেখায় করা সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে নারীদের এই অংশটি প্রায় একই আছে। অধ্যাপিকা স্মৃতি রাও (২০১৮), মধুরা স্বামীনাথন এবং অন্যান্য (২০২০) বারংবার দেখিয়েছেন যে এই সামাজিক শ্রম পুনরুৎপাদনের জন্য বাজারভিত্তিক শ্রমিক (পরিচারক) নিয়ে আসা একটি শ্রেণির প্রশ্ন। সেই প্রশ্নে অন্তত প্রান্তিক কৃষিজীবী পরিবারের নারীদের কাছে কোনও সদুত্তর নেই।

অর্থাৎ, যে বিপন্ন কৃষি-আয়-ভিত্তিক পরিবারে বিপন্নতার উৎস ছিল যন্ত্রের ব্যক্তি মালিকানা, ব্যয় বৃদ্ধি, এবং অন্যায্য দাম। তাঁর সাথে জুড়ে গেল স্ব-নিযুক্ত নারীশ্রম, যার মজুরি নেই। এই মুহূর্তটি স্বাভাবিকভাবেই উদারবাদী ধনতন্ত্রের সংকটের একটি লক্ষণ। সেই লক্ষণের সামনে দাঁড়িয়ে, তাহলে রাজ্যের সমাধান কী? 

কৃষক-বন্ধু। লক্ষীর ভান্ডার। গৃহ-শ্রী। রূপ-শ্রী। 

অর্থাৎ, জ্বরের মূল কারণের জন্য প্রয়োজন অ্যান্টি-বায়োটিকের। আমি জল-পটি দিতে থাকলাম। আর জল-পটির বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেল নগর এবং বন্দর। এবং সেই আপ্তকালীন জলপটির কাপড় রোগীর চোখ অব্দি টেনে দেওয়া গেল, যাতে ব্যক্তি মালিকানা কিংবা ন্যায্য দামের আন্দোলন না-গড়ে ওঠে। 

এইক্ষেত্রেই সম্ভবত, বাম বিকল্পটি লুকিয়ে। প্রান্তিক কৃষকের ব্যয় হ্রাস করতে পারে এমন সমবায়, কৃষকের ন্যায্য দামের জন্য সরকারি বিপণন কেন্দ্র, এবং সর্বোপরি, নারীশ্রমকে ৫০০ বা ১০০০ টাকার হাতছানির অপমান নয়, শ্রম পুনরুৎপাদনের প্রতিটি শ্রমিককে ন্যূনতম মজুরির কাছে পৌঁছে দেওয়া।

এবং শেষ প্রশ্নে, ব্যক্তি মালিকানার সেচ, কর্পোরেট মালিকানার সারের কিংবা বীজের দাম নিয়ন্ত্রন। বিপন্নতা সব-সময়ই শ্রেণি প্রশ্ন। শ্রেণি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই লিঙ্গের প্রশ্ন। এগুলিকে বিচ্ছিন্নরূপে না-দেখে একটি বিকল্প কৃষিনীতির আশু প্রয়োজন।


তথ্যসূত্র 
১। The Kisan Long March in Maharashtra (P. Sainath, Sudhanva Deshpande, Ashok Dhawale)। ২০১৮। লিঙ্ক- The Kisan Long March in Maharashtra 
২। পশ্চিমবঙ্গ সরকার (২০১৭)। কৃষি বিভাগ  লিঙ্ক- 24.pdf 
৩। ড. তাপস মোদক। Modak, T. S. (2018). From public to private irrigation: Implications for equity in access to water. Review of Agrarian Studies, 8(1). 
৪। ড. তাপস মোদক এবং ড. অপরাজিতা বক্সী। Modak, Tapas Singh, and Bakshi, Aparajita (2017),“Changes in Groundwater Markets: A Case Study of Amarsinghi Village, 2005 to 2015,” Review of Agrarian Studies, vol. 7, no. 2, available at-  https://ras.org.in/changes_in_groundwater_markets 
৫। ড. রঞ্জিনী বসু, তাপস মোদক এবং অপরাজিতা বক্সী। Socio-economic Surveys of Three Villages in West Bengal। A Study of Agrarian Relations, No. 5 (Edited by Aparajita Bakshi and Tapas Singh Modak)। লিঙ্ক- Socio-economic Surveys of Three Villages in West Bengal | Columbia University Press 
৬। অধ্যাপিকা স্মৃতি রাও (২০১৮)। Rao, S. (2020). Gender and class relations in rural India. In Agrarian Marxism (pp. 98-116). Routledge. 
৭। অধ্যাপিক মধুরা স্বামীনাথন এবং অন্যান্য (২০২০)। লিঙ্ক-  Women and Work in Rural India।     
৮। অধ্যাপক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। “Of Conflict and Collaboration”. লিঙ্ক- Dwaipayan Bhattacharyya | Economic and Political Weekly 
৯। ড. সোহম ভট্টাচার্য এবং অধ্যাপক ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত। লিঙ্ক- "Economics and Politics of Some Emerging Fault Lines in Rural West Beng" by Soham Bhattacharya and Indraneel Dasgupta 
১০। মেরি ব্যুইসন এবং অন্যান্য (২০২১)। লিঙ্ক- https://doi.org/10.1080/00220388.2021.1906862  

Whatsapp Logo PNGs for Free Downloadপড়ুন মার্কসবাদী পথ, ফলো করুন আমাদের Whatsapp Channel








প্রকাশের তারিখ: ১৫-ডিসেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org