সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বাংলার কৃষি ও কৃষক: গত এক দশকের বিপন্নতা (প্রথম পর্ব)
সোহম ভট্টাচার্য
প্রলেতারিয়-করণ দুইভাবে দেখা যায়। এক গ্রামীণ মানুষের থেকে জমি সরিয়ে নিয়ে শুধুমাত্র শ্রমের বিনিময়ে আয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া। ঐতিহাসিক ভাবে (রামচন্দ্রন ২০১১), ইউরোপে এবং কিছু উপনিবেশেও হয়তো এটিই প্রাথমিক লক্ষণ। ভূমিহীনতা বৃদ্ধি। মুশকিল হল এই লক্ষণের একটি ব্যতিরেক আছে। ভূমিহীনতার বৃদ্ধি না-হয়ে কিংবা ‘ভূমিহীনতার হার’টি প্রায় এক থেকেও, প্রান্তিক কৃষক ধীরে ধীরে শ্রম-জাত আয়ের উপর তাঁর বেঁচে থাকার দিকে এগিয়ে গেলেন। এটিও প্রলেতারিয়করণ। এই জন্যেই পশ্চিমবঙ্গের শ্রেণি-রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস-স্টাডি।

নয়া-উদারবাদ এবং বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিক্ষেত্র
ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে সমাজ ও অর্থনীতির আলোচনায় ‘নয়া-উদারবাদ’ শব্দবন্ধটি (কিংবা ‘১৯৯১’ সালটি) এলেই রাজনৈতিক অর্থনীতির পাঠকদের মনে কিছু ধন্দ দেখা দেয়। বহুল ব্যবহৃত শব্দবন্ধ এবং এর অর্থ বা তাৎপর্য বহুধা বিভক্ত। এই দুই পর্বের লেখার শুরুতে আমি দেখার চেষ্টা করব এই লেখায় নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির কোন তাৎপর্য বা ‘অর্থ’গুলি লেখার এবং সম্ভবত পাঠের জন্য প্রাসঙ্গিক।
বাংলার কৃষিক্ষেত্রের এই আলোচনায় বৃহত্তর নয়া-উদারবাদী নীতির তিনটি আলোচ্য দিক রয়েছে।
প্রথমত, নয়া-উদারবাদী রাজনৈতিক প্রকল্পে সরকারি পুঁজি বিনিয়োগ (কৃষিতে) ক্রমহ্রাসমান। অধ্যাপক ভি.কে. রামচন্দ্রন এবং রামকুমার (২০১০) তাঁদের আলোচনায় দেখিয়েছেন, ১৯৬০-৬১ সালে সামগ্রিক জাতীয় পুঁজি বিনিয়োগের (গ্রস ক্যাপিটাল ফর্মেশন) ১১-১২ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত ছিল। ১৯৯১ এবং তার পরবর্তী দশকে এই পরিসংখ্যান এসে দাঁড়াল ৭-৮ শতাংশে। এর ভুক্তভোগী কারা? বাংলার কৃষকদের কোন অংশ সরকারি পুঁজি বিনিয়োগের মুখাপেক্ষী? এইটি আমার লেখায় নয়া উদারবাদের প্রথম অর্থ বা তাৎপর্য।
নয়া-উদারবাদের দ্বিতীয় অর্থটি বহু আলোচিত। খোলা বাজার এবং বাজার নির্ধারিত দামের উপর অগাধ ভরসা। সাম্প্রতিক সময়ে অধ্যাপক অশোক গুলাটি কিংবা অধ্যাপক রমেশ চন্দ-এর মতো কৃষি অর্থনীতিবিদেরা বারংবার এই কথাই তুলেছেন। ন্যূনতম দামের প্রশ্নে উত্তর ভারতের কৃষক আন্দোলনকে কটাক্ষ করেই তাঁরা লিখছেন, দাম যেন বাজারে নির্ধারিত হয় (গুলাটি এবং অন্যান্য ২০২৪)। স্বামীনাথন কমিশনের (২০০৫) নির্ধারিত ন্যূনতম কৃষিজাত দ্রব্যের দামের সপক্ষে কৃষক সভা এবং অন্যান্য কৃষিজীবী সংগঠনের সর্বভারতীয় লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলায় কিন্তু আমরা এই ‘এম-এস-পি’ (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস) নিয়ে খুব বেশি সচল আন্দোলন দেখতে পাইনি। এই লেখায় এই বাজারমুখীনতার অনুষঙ্গটি-ই, নয়া-উদারবাদের দ্বিতীয় তাৎপর্য এবং তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।
তৃতীয়ত, নয়া-উদারবাদ ভারতবর্ষের গ্রামীণ মানুষকে মুখ্যত দুটি অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অধ্যাপক ভামসি ভকুলাভারনম (২০১০) দেখাচ্ছেন, ১৯৯১ থেকে ২০০৯-এর মধ্যে, শ্রেণি-বৈষম্য বেড়েছে, এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে সেই বৃদ্ধি সম্ভবত ‘ঐতিহাসিক বৃদ্ধি’। এই বৈষম্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে কৃষিজীবী পরিবারের (মূলত ছোটো জোতের কৃষক পরিবারের) কৃষি থেকে প্রাপ্ত আয় যা এতই নগণ্য যে তাদের একটি বড়ো অংশকে শ্রমজীবী হয়ে দারিদ্র্য ভোগ করতে হয়। এই শেষ অনুষঙ্গটি, অধ্যাপক মধুরা স্বামীনাথন এবং ফাউন্ডেশন ফর এগ্রেরিয়ান স্টাডিজ (২০০৫-২০২৩) তাঁদের বিভিন্ন লেখায় তুলে এনেছেন।
এই তিনটি অর্থের দিকে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য অবশ্যই দ্বি-মুখী। বর্তমান রাজ্য সরকার (অন্তত দেড় দশক আগে) ক্ষমতাসীন হয়েছেন (বৃহৎ অর্থে) একটি ‘ভূমি আন্দোলন’কে ঘিরে। যে-আন্দোলন তাঁদের ‘মা-মাটি-মানুষ’ স্লোগানের দ্বিতীয় শব্দের সাথে জড়িত। সেই প্রেক্ষিতে, গত এক দশকে বাংলার কৃষি এবং কৃষিজীবীদের অবস্থার একটি আলোচনা প্রয়োজন। প্রথম অংশে এইটুকুই আলোচনা। লেখার দ্বিতীয় অংশে দুটি অন্যদিকের আলোচনার চেষ্টা করব। নয়া-উদারবাদ এবং দক্ষিণপন্থী-বুর্জোয়া অর্থনীতির একটি প্রবণতা থাকে সামাজিক সমস্যাকে ব্যক্তিগত করে তোলার। তাই কেন্দ্রের ‘পি.এম. কিসান’-এর বদলে রাজ্যের ‘কৃষক বন্ধু’ স্কিমগুলিকে এই প্রেক্ষিতে একটি পর্যালোচনায় আনার চেষ্টাও থাকবে। ইংরেজিতে, নি-জার্ক (হঠাৎ আঘাতে হাঁটু কেপে ওঠা) শব্দটির দুটি রাজনৈতিক ব্যবহার হয়। প্রাথমিকভাবে, অজানা বিষয়ে সরকারের ভ্রান্ত নীতি এইভাবে দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, যা পশ্চিমবঙ্গে চলছে ভ্রান্ত কৃষি-নীতির ফলে একটি বিপন্ন কৃষক সমাজকে, ’নি-জার্ক’ সমাধানে পৌঁছে দেওয়া।
এই লেখাটি দুটি অংশে প্রকাশিতব্য। তাই লেখার দ্বিতীয় অংশটি সম্পূর্ণভাবেই এই বিপন্নতার স্থায়ীকরণের একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। এবং নিশ্চিতভাবেই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের (জেলাভিত্তিক) ক্ষেত্রে এই ধরনের আলোচনা আরও স্বচ্ছ এবং সম্যকভাবে রাজনৈতিক দিকনির্দেশ দিতে পারবে এই আশা রেখে এই লেখার নির্মাণ, চলন এবং যাপন।
বাংলার কৃষিজীবী: ক্ষুদ্র-জোত, বিনিয়োগ, এবং কৃষিজাত আয়ের বিপন্নতা
পশ্চিমবঙ্গের কৃষিক্ষেত্রে এই নয়া-উদারবাদের আগের ইতিহাস একটু ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। পশ্চিমবঙ্গে ভূমি-সংস্কার নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। অধ্যাপক বিকাশ রওয়াল এবং কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্রের লেখায় (২০০৭) এবং ড. রঞ্জিনী বসুর গবেষণায় (২০২০) আমরা লক্ষ করি, পাট্টা প্রদান ও ভাগচাষিদের অধিকার রক্ষায় যতদূর রাজ্য এগিয়েছে, ততদূর হয়তো জোত সম্প্রসারণে অথবা ভূমিভিত্তিক সমবায় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এগোনো যায়নি। তাই পশ্চিমবঙ্গের কৃষক (অর্থাৎ কৃষি জোত) অতি প্রান্তিক, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষক রূপে থেকে গিয়েছে। গত এক দশকেও সেই চিত্রটি এই ছোটো জোতের আরও ছোটো হয়ে যাওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে (সারণী ১)।
সারণী ১: কৃষি-জোতের আয়তনের ভিত্তিতে সামগ্রিক কৃষি জোতের বণ্টন, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১২-২০১৯
|
জোতের শ্রেণিবিভাগ (বিঘায়) |
২০১২-১৩ (%) |
২০১৮-১৯ (%) |
|
অতি প্রান্তিক (০- ৩.৭ বিঘা) |
৮২.৮ |
৮০.৪ |
|
প্রান্তিক (৩.৭ - ৭.৫ বিঘা) |
১২.২ |
১৪.৭ |
|
ক্ষুদ্র (৭.৫- ১৫ বিঘা) |
৪.১ |
৪.১ |
|
প্রায়/আধা-মধ্যম (১৫-৩০ বিঘা) |
০.৭ |
০.৭ |
|
মধ্যম এবং বৃহৎ (৩০ বিঘার বেশি) |
০.১ |
০.১ |
|
সামগ্রিক |
১০০.০ |
১০০.০ |
সূত্র: লেখককৃত শ্রেণিবিভাগ। অল ইন্ডিয়া ল্যান্ড এন্ড লাইভস্টক হোল্ডিং সার্ভে, ন্যাশানাল স্যাম্পেল সার্ভে অফিস (NSSO)।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সমীক্ষায় (২০১৮-১৯) আমরা দেখি, ৯৫ শতাংশের বেশি কৃষি-জোত সাড়ে সাত বিঘার (কিংবা এক হেক্টর) নীচে কৃষিকাজে নিয়োজিত। কৃষিক্ষেত্রের অর্থনৈতিক আলোচনায়, মূলত নয়া-উদারবাদী সময়ে এই জোতের ক্ষুদ্রকরণ দুটি মূল সমস্যা নিয়ে হাজির হয়। প্রাথমিকভাবে, এই ছোটো জোত থেকে প্রাপ্ত উৎপন্নের পরিমাণ সীমিত (এবং যেহেতু ১৯৭০-৮০ দশকের পর বিঘা প্রতি উৎপাদনশীলতায় দারুণভাবে কোনও বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়নি)। সহজ ভাবে, উৎপাদনশীলতা যদি না-পাল্টায়, তাহলে অতি-প্রান্তিক এবং প্রান্তিক কৃষকের জোতের আয়তন যেহেতু সীমিত তাই সামগ্রিক উৎপাদনের পরিমাণও স্বাভাবিকভাবেই কম। উৎপাদনের এই সীমিত দিকটি কৃষিজাত পণ্য-জাত সামগ্রিক আয়ের বিপন্নতার প্রথম নির্দেশক। দ্বিতীয় বিপন্নতার দিকটি বিনিয়োগের। অতি-প্রান্তিক এবং প্রান্তিক কৃষকের (কৃষিজাত) আয় এবং সেই আয় থেকে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ যদি কমে যায়, তাহলে একটি চক্রের সৃষ্টি হয়। সীমিত আয়--> সীমিত বিনিয়োগ--> সীমিত উৎপাদনশীলতা--> আবার সীমিত আয়। এই দুটি সংকটের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ‘রাজ্যের’ ভূমিকা এসে পড়ে। রাজ্য কি বিনিয়োগে সাহায্য করতে পারে? সেচ, বিদ্যুৎ, সার এবং কীটনাশকে? এই অংশে, প্রথমে এই কৃষিজাত আয়ের (Average Net Income from Crop Cultivation) বিপন্নতাকে আমি চিত্র ১-এ তুলে রাখলাম। এটি কৃষিজাত পণ্য থেকে মাসিক গড় আয়ের একটি তুলনা। যেহেতু রাজ্যের ৯৫% জোত প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র তাই আয়ের তুলনামূলক বিপন্নতা তাদের আরও ভয়াবহ (দেখুন পরিশিষ্ট ১)।
চিত্র ১ : কৃষিজাত পণ্য থেকে কৃষিজীবী পরিবারের আয় (২০১২-২০১৯) 
সূত্র- লেখক কৃত। কুণাল মুঞ্জাল (২০২১) এবং সিচুয়েশন অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে থেকে গৃহীত।
সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এই গড় আয় যেমন হ্রাস পেয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কৃষিজাত আয়ের বৃদ্ধি নগণ্য। এই ক্ষেত্রে একটি কথার উল্লেখ প্রয়োজন, ভারতে এই প্রান্তিক কৃষকদের আয় দুর্বলতা একটি জাতীয় প্রবণতা। এই প্রবণতার নিরিখেই তাই রাজ্যের এবং ‘রাষ্ট্রের’ কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগের চিত্রটি দেখা প্রয়োজন। এই দ্বিতীয় প্রসঙ্গেই, গত ২০১৬-২০১, এই বছরের রাজ্য বাজেটে (মূলধন খাতে) কৃষি বিনিয়োগের একটি চিত্র পাশাপাশি তুলে রাখলাম আর সাথে রইল ২০১৮-১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের কৃষিতে ব্যক্তিগত পুঁজি বিনিয়োগের অপারগতার দিকটি। বাজেটের মূলধন খাতে (ক্যাপিটল এক্সপেন্ডিচার), আমি কৃষি পণ্যের বাজারে (এগ্রিকালচারাল মারকেটিং) মূলধন ব্যয়টি বাইরে রাখলাম। কারণ, আলোচনার এই অংশে আমি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ছোটো জোতের বিপন্নতাটিই প্রাথমিকভাবে সামনে আনতে চাইছি। মূলধন খাতের স্বার্থে চারটি খাতে মূলত বাজেট নির্ধারিত হয়। সাধারণ (জেনারেল) খাত, অর্থনৈতিক (ইকনমিক) খাত, সামাজিক (সোশ্যাল),এবং অনুদান মূলক (গ্রান্ট-ইন এইড)। শুধুমাত্র পুঁজি বিনিয়োগের অর্থনৈতিক খাতে কৃষিক্ষেত্রে, রাজ্য সরকারি মূলধন বিনিয়োগ কিন্তু যথেষ্টর চেয়ে বেশ কম। এর সাথেই ২০১৮-১৯ সালের অল-ইন্ডিয়া ডেবট-ইনভেস্টমেন্ট সার্ভে কৃত সংখ্যাগুলি জুড়ে নিই।
চিত্র ২ : অর্থনৈতিক খাতের মূলধন বিনিয়োগ: কৃষি এবং সেচ (%), ২০১৬-২০২০

সূত্র- লেখককৃত, পশ্চিমবঙ্গ বাজেট। ২০১৬-২০২২ এর বাজেট সারণী পরিশিষ্ট দুই অংশে।
২০১৮-১৯ সালে, সর্বভারতীয় গ্রামীণ অঞ্চলে, ১০০ জনে তিনটি গ্রামীণ পরিবার কৃষিতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে সেই সংখ্যাটি ১০০ জনে ১.৬। এই ৩টি পরিবারের ষাণ্মাসিক গড় বিনিয়োগ ৪৬৩ টাকা। আমাদের রাজ্যে মাত্র ১৮০ টাকা।
লেখার পরবর্তী অংশে যাওয়ার আগে একটি সামান্য রাজনৈতিক নিবেদন এখানে প্রয়োজন। বহু বামপন্থী আলোচক, প্রান্তিক কৃষকের এই অর্থনৈতিক দুরূহতা ভুলে, ‘ক্ষুদ্রকেই এগিয়ে নিতে হবে’ এরকম ভাবনা পোষণ করেছেন। ক্ষুদ্র কৃষক, অন্তত অর্থনৈতিকভাবে আর কৃষিজীবী থেকে দিনযাপন করতে পারছেন না। নয়া-উদারবাদের অর্থনৈতিক মোকাবিলায় এই অংশটি পরিস্ফুট থাকা প্রয়োজন।
প্রলেতারিয়-করণ: পশ্চিমবঙ্গ এবং গ্রামীণ প্রান্তিক কৃষিজীবী
এই নিবন্ধের, প্রথম অংশের শেষে একটি রাজনৈতিক প্রস্তাবনা রেখে যাওয়া প্রয়োজন। [তাহলে] দ্বিতীয় অংশে হয়তো এই প্রস্তাবনাকে এবং প্রস্তাবনার পদ্ধতিকে আরেকটু বিস্তৃত করে আলোচনার পরিসরে রাখা সম্ভব।
আমি সর্বহারা-করণ এই ধরনের শব্দবন্ধ ব্যবহার না-করে ‘প্রলেতারিয়-করণ’ (Proletarianisation) ব্যবহার করছি, কারণ তাতে এই পদ্ধতিটির আলোচনার সুবিধা আছে। মার্কসীয় অর্থনীতির আলোচনায় এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র [সিপিআই(এম)] কর্মসূচীতেও গ্রামীণ ক্ষেত্রে কৃষক-মজুর আন্দোলনকে একসাথে যুক্ত করে দেখার একটি প্রকল্প আছে। এই প্রকল্পের সামনে পশ্চিমবঙ্গ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কেস স্টাডি’। কারণ ‘সামগ্রিক অর্থে সর্বহারা’ এবং আঞ্চলিক (Locale/Concrete) অর্থে ‘সর্বহারা’ হয়ে ওঠার পদ্ধতিটি হয়তো সব সময় এক রকম নয়। কেন?
এখানেও দুটি তথ্য এবং তথ্য নির্দেশে, দুটি প্রবণতা দেখা যাক।
প্রলেতারিয়-করণ দুইভাবে দেখা যায়। এক গ্রামীণ মানুষের থেকে জমি সরিয়ে নিয়ে শুধুমাত্র শ্রমের বিনিময়ে আয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া। ঐতিহাসিক ভাবে (রামচন্দ্রন ২০১১), ইউরোপে এবং কিছু উপনিবেশেও হয়তো এটিই প্রাথমিক লক্ষণ। ভূমিহীনতা বৃদ্ধি। মুশকিল হল এই লক্ষণের একটি ব্যতিরেক আছে। ভূমিহীনতার বৃদ্ধি না-হয়ে কিংবা ‘ভূমিহীনতার হার’টি প্রায় এক থেকেও, প্রান্তিক কৃষক ধীরে ধীরে শ্রম-জাত আয়ের উপর তাঁর বেঁচে থাকার দিকে এগিয়ে গেলেন। এটিও প্রলেতারিয়করণ। এই জন্যেই পশ্চিমবঙ্গের শ্রেণি-রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস-স্টাডি।
অধ্যাপক টেরেনস বায়ারস (২০০৫) এই পদ্ধতিকে লিখছেন, ‘ভূমিজীবী প্রলেতারিয়-করণ’ (‘Proletarianisation without Depeasantisation’). এর উল্টো দিক তাহলে? “Proletarianisation with Depeasantisation”। গত এক দশকে এই প্রথম পদ্ধতিটির একটি ইঙ্গিত রেখেই লেখাটি শেষ করার চেষ্টা করব। একটি প্রাথমিক এবং উল্লেখ্য বিষয়, পশ্চিমবঙ্গে ২০১১-১২ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে, কৃষিতে স্বনিযুক্তি বেড়েছে এবং উলটো দিকে, মজুরিভিত্তিক শ্রমিক কমেছে। এই হ্রাস এবং বৃদ্ধি প্রায় একই হারে হয়েছে। সারণী ২, সামনে রাখা থাক।
প্রাথমিকভাবে এই, সারণীটি দেখলে, স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চেতনায় মনে হতেই পারে, প্রলেতারিয়-করণ তাহলে কমেছে? কিন্তু কৃষি স্বনিযুক্তির এই অংশ বাড়ল কীভাবে?
সারণী ২: স্বনিযুক্তি এবং মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক, গ্রামীণ কৃষিক্ষেত্রে, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১১-২০২৪
|
সাল |
স্বনিযুক্তি (ক) |
মজুরি-ভিত্তিক (খ) |
অনুপাত (খ/ক) |
|
২০১১-১২ |
৩৫.৪ |
৬৬.০ |
১.৮ |
|
২০১৮-১৯ |
৬২.২ |
৩০.২ |
০.৫ |
সূত্র: লেখক কৃত। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (২০১৮-১৯) এবং এন-এস-এস-ও এমপ্লয়েমেণ্ট সার্ভে (২০১১-১২)। স্ব-নিযুক্তি এবং মজুরির সামগ্রিক যোগ ‘১০০’ না-হওয়ার কারণ কৃষিতে সামান্য অংশ ‘নিয়মিত বা স্যালারি-এম্প্লয়েড’ একটি অংশ।
এই দ্বিধার মাঝখানেই আমার এই লেখার প্রথম অংশের শেষ সারণীটি রাখব। পশ্চিমবঙ্গে কৃষিজীবী পরিবারের প্রলেতারিয়করণ লুকিয়ে আছে তাঁদের শ্রম-জাত আয়ের উপর প্রাথমিকভাবে নির্ভরশীলতায়, কৃষিজাত পণ্যের আয় থেকে নয়। তাঁদের আপাত- ভূমিহীনতার যে সমাধান বামফ্রন্ট সরকারের আমলে এসেছিল, সেই প্রকল্পটির একটি সামাজিক এবং বৈজ্ঞানিক উত্থানের সম্ভবত প্রয়োজন।
বাংলার প্রান্তিক কৃষিজীবীদের গড় মাসিক আয়ের ৫২% এবং ক্ষুদ্র কৃষিজীবীদের গড় মাসিক আয়ের ৪৪% আসে শ্রমজাত আয় থেকে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ভূমির অধিকার; যা একসময় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কৃষিজীবী পরিবারের আর্থিক-ন্যায়ের সুযোগ এনে দিয়েছে, বর্তমান দশকে অন্তত সেই আয়ের সম্পন্নতায় নির্ভরশীল থাকা আর যথেষ্ট নয়।
সারণী ৩: বাংলার প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষিজীবী পরিবারের মাসিক গড় আয়ের উৎস এবং বন্টন
(টাকায় ও সামগ্রিক মাসিক আয়ের অংশে, %), ২০১৮-১৯
|
শ্রেণি বিন্যাস |
শ্রমজাত আয় (টাকা) |
কৃষিজাত আয় (টাকা) |
মাসিক আয় |
|
প্রান্তিক |
৩৮২৯ (৫২%) |
৯২৮ (১৫%) |
৬১১০ |
|
ক্ষুদ্র |
৩২৮৯ (৪৪%) |
২২৩০ (৩১%) |
৭০৪৬ |
|
সামগ্রিক কৃষিজীবী |
৩৭২১ (৫৫%) |
১৫৪৭ (২৩%) |
৬৭৬২ |
সূত্র: লেখককৃত। সিচুয়েশন অ্যাাসেসমেন্ট সার্ভে ২০১৮-১৯। NSSO।
কীভাবে কৃষিতে এই আর্থিক বিপন্নতার পরেও স্বনিযুক্তির বৃদ্ধি? এর একটি কারণ শুধু রাজ্যের ক্ষেত্রে নয়, সার্বিকভাবে দেশের ক্ষেত্রেই হয়তো সত্যি। কৃষি ব্যতিরেকে আর্থিকভাবে সম্পন্নতা আনে এরকম কাজের সুযোগ সীমিত।
এর বাইরে, মূলত পূর্বভারতের ক্ষেত্রে গ্রামীণ অর্থব্যবস্থায় দুটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক কারণও দায়ী—
প্রথমত, এই কৃষিজাত পণ্যের একটি বড়ো অংশ পরিবারের খাদ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন। যেহেতু মূল কৃষিক্ষেত্র (কিছু অঞ্চল ব্যতিরেকে) ধান এবং সব্জির উৎপাদনে নিয়োজিত, তাই কৃষি স্ব-নিযুক্তির একটি দিক খাদ্য পণ্যের স্ব-উৎপাদনের সাথে যুক্ত।
দ্বিতীয়ত, গ্রাম বাংলায় একটি বড়ো অংশের নারী-শ্রম (বিনামূল্যের এবং পারিবারিক পিতৃতান্ত্রিকতার সাথে যুক্ত) প্রায় সর্বক্ষণের জন্য মজুত। এই অংশটি জমিতে শ্রমের উপাদান জোগানটি চালিয়ে যেতে থাকেন এবং বাংলার প্রান্তিকতম অংশের মানুষ আরও প্রান্তিকতর কাজের খোঁজে অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল, কিংবা ব্যাঙ্গালোরে, ‘পরিযায়ী’।
প্রান্তিক কৃষকের কর্মহীনতার এবং প্রান্তিকতর শ্রমের (এমনকি পরিযানের) দিকে এগিয়ে যাওয়ার দুর্ভাগ্য-ই এই ‘বিপন্নতা’র এবং ‘ভূমিজীবী প্রলেতারিয়করণের’ উপজীব্য ।
এই ইঙ্গিতটুকু সামনে রেখেই লেখার দ্বিতীয় পর্বে, কৃষিজীবী পরিবারের এই অর্থনৈতিক বিপন্নতার উৎসের দ্বিতীয় চরিত্রের অবতারণা করার চেষ্টা করব। এই শ্রম-নির্ভরশীল এবং আধা-প্রলেতারিয়েত কৃষিজীবী পরিবারের সঙ্গে পণ্য বাজারের সম্পর্ক কীরকম? মূলত গ্রামীণ কৃষিজীবী পরিবারের কাছে ‘বাজার অর্থনীতির’ এবং নয়া-উদারবাদজনিত ‘বাজারি সমাধান’ এই জাতীয় আর্থিক নীতির সামনে বর্তমান রাজ্য সরকারের (থাকার বা না-থাকার) ভূমিকাটি কীরকম? সর্বোপরি, যে স্লোগানের সূত্রে লেখার শুরুটি করেছিলাম, ‘মা-মাটি-মানুষ’, কৃষিতে জড়িত পরিবারের নারী-শ্রমের চরিত্রটিকে কীভাবে রাজ্যের বর্তমান নীতিগুলি একটি ‘বশ্যতা’মূলক দারিদ্র্যের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে, তার-কিছু আভাস দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।
আশা করি, সেই আলোচনায় গত এক দশকে বাংলার কৃষিক্ষেত্রে শ্রেণি-অভিমুখের এবং শ্রেণি-বিরোধের কিছু দিকনির্দেশ সম্ভব হবে। [পরবর্তী অংশে সমাপ্য।]
টীকা
১ রাজ্য বাজেটে পেশে একটি নব্য কায়দা বা ধান্দাবাজি শুরু করেছেন তৃণমূল সরকার। ২০২০-২১ এর পরবর্তী বাজেট গুলিতে কৃষি এবং গ্রামীণ উন্নয়নকে একসাথে জুড়ে দেওয়া। তাই শুধুমাত্র কৃষিক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ“ বাজেট অ্যাট আ গ্লান্স (২০২১) আর দেখা সম্ভব হচ্ছে না, পরিশিষ্ট ১। এই সরকারী ডেটা প্রকাশের, অ-প্রকাশের, এবং ইচ্ছাকৃত পরিবর্তিত প্রকাশের ক্ষেত্রে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অনিচ্ছা নতুন কিছু নয়। পাঠক আশা করি বুঝবেন।
পরিশিষ্ট
১। রাজ্য বাজেটের পরিবর্তনঃ 2024_bp9-1.pdf
তথ্যসূত্র
১। রামচন্দ্রন এবং রামকুমার, ২০১০। The Impact of Liberalization and Globalization on India's Agrarian Economy | Global Labour Journal
২। অশোক গুলাটি এবং প্রমুখ, ২০২৪। Rationalising Public Distribution System in India - ICRIER
৩। ভামসি ভকুলাভারনাম (২০১০)। Vakulabharanam, V. (2010). Does class matter? Class structure and worsening inequality in India. Economic and Political Weekly, 67-76.
৪। ভি।কে। রামচন্দ্রন (২০১১)। Ramachandran, V. K. (2011). The state of agrarian relations in India today. The Marxist, 27(1-2), 51-89.
৫। সুর্যকান্ত মিশ্র (অধ্যাপক ভি.কে. রাওয়াল) (২০০৭) Mishra, Surjya Kanta. "On agrarian transition in West Bengal." The Marxist 23.2 (2007): 1-22.
৬। ড. রঞ্জিনী বসু। (২০২০)। Shodhganga@INFLIBNET: Land Reforms in West Bengal
৭। ফাউন্ডেশন ফর এগ্রেরিয়ান স্টাডিস। FAS | The Foundation for Agrarian Studies
প্রকাশের তারিখ: ১৪-ডিসেম্বর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
