|
বাপ গেছে, ডালাটা নিয়ে আমি বেঁচেছি এতকালকমলা রানী দাস, হকার |
আমরা তো রেলের নিজের লোক। প্যাসেঞ্জার-এর এক্সিডেন্ট হলে আমি নিজে স্টেচারে করে গাড়িতে তুলে দিছি, অসুস্থ লোককে বাড়ি পৌঁছে দিছি। স্টেশনে গোল বাঁধলে আরপিএফ আসার আগে আমরা থামিয়েছি। আর আজ আমরা পর হলাম! এই স্টেশনে হকার উঠে গেলে শ্মশান হবে, চুরি ছিনতাই বাড়বে। আর আমরা না খেয়ে মরব। সুদে টাকা তুলে ছেলেকে টোটো কিনে দিয়েছি। তিরিশ হাজার টাকা। দুবছর হয়ে গেল, সপ্তাহে ছ'শ টাকা করে সুদ। ডালা গেলে মেটাবো কেমন করে? এখনও পর্যন্ত মিটিয়ে যাচ্ছি। যারা মেটাতে পারে না, তাদের বাড়ি এসে হুজ্জুৎ করে লোনের লোকেরা। ঘর তো আমার নেই এবার তো মানুষ নিয়ে টানাটানি পড়বে টাকা না মেটালে। |
ঘর নেই, দোর নেই শুধু ডালা আছে। বাপের কাল থেকে এই ডালা এক মুঠ করে ভাত জুগিয়েছে। বাপ গেছে, ডালাটা নিয়ে আমি বেঁচেছি এতকাল। ৪২ বছর ধরে স্টেশনে ডালা করে ফল বেচি। এই স্টেশন আমার বাপকে ঠাঁই দিয়েছে। পাঁচ ভাই বোন ছিলাম আমরা। একবেলা করে ভাত জুটত, ইস্কুল যেতে পারিনি; তেরো বছরে বিয়ে হয়েছে। বর অত্যাচার করত, সেসব সইব কেন? আমি কমলী দাস, গতর খাটিয়ে খাব, নিজের মতো করে থাকব। তাই বাপের থেকে ডালা নিলাম। বড় ছেলে প্রতিবন্ধী। ছোট ছেলে রুগ্ন। ছোট ছেলের বউ দুই মেয়ে রেখে চলে গেছে, ওই মেয়ে দুটো আমায় মা ডাকে। বাপের বাড়ির সাত ফুটের সিঁড়ির ঘরে আমরা সবাই মিলে থাকি। আমি সকালের ট্রেনে কোলে মার্কেট থেকে ফল নিয়ে এসে ডালা নিয়ে বসি। তাপ, জল বাড়লে বিক্রি কমে, নাহলে দিনে দুশো টাকার বিক্রি হয়। রাত এগারোটায় ঘরে ফিরি। কে জানে আরেকটু কাস্টমার হলে হয়তো ৫০০/৬০০ টাকার বিক্রি হতো। তাহলে হয়তো ঠিক করে নাতনিগুলাকে জলখাবার দিতে পারতাম। আমি ছোটকালে খেতে চাইলে বাবা বলত “এবেলা জল খা, রাতে ভাত খাবি।” নাতনিগুলো ভাগ্যিস ইস্কুলে যায়, ওখানে ভাতের জোগান হয়। নাহলে বাড়িতে পাঁচটা পেট চালাতে পারতাম না। একটু হাঁকাহাঁকি করলে বিক্রি বেশি হয় কিন্তু রেলের বাবুরা রাগারাগি করে। বলে, আমরা নাকি প্যাসেঞ্জার-দের ডিসটাব করছি। আগে ইউনিয়নের শক্তি ছিল রেল-পুলিশ ধমকাতো কম। ভোটের আগে থেকে শুরু করেছে আবার, বলছে, ডালা তুলে রেল লাইনে গিয়ে বসতে। প্যাসঞ্জাররা নাকি যেতে পারছে না। কিন্তু আমরা তো এক কোণায় বসে থাকি, চিৎকার করি না। কত ডেলি-প্যাসেঞ্জার আমাদের থেকে ফল কেনে, গল্প করে, বাড়ির খোঁজ নেয়। ওরা কেন আমাদের নামে লাগাবে? আমি বিশ্বাস করি না। স্টেশনের মধ্যে রেলের যে ধুমসো দোকান হয়েছে তাতে চলতে অসুবিধা হয় না? আর আমার তো ডালা! ডালা উঠে গেলে খাব কী? বাড়িতে রোগ লেগেই আছে। প্রতি মাসে হয় ছেলের জন্য, নয় নাতনিদের নিয়ে সাগর দত্ত হাসপাতালে ছুটতে হয়। ওষুধ তো সব বাইরে থেকে কিনতে হয়। হাসপাতালে ওষুধ নেই। একবার ছেলের জন্য ৭৫০০০ টাকা গেছে রক্তপরীক্ষা আর ওষুধে। হাসপাতালে সব হয় না। রোগী ফেলে রাখে। সরকারি কার্ড আছে কিন্তু তাতে সময় লাগে। রোগীকে তো আর ফেলে রাখা যায় না। একদিন ডালা নিয়ে না বসলে শুধু ভাত, ডাল খেতে হয়। নাতনিগুলাকে মাছ দিতে পারি না। স্টেশনে এখন তো মাঝে মধ্যেই নোটিশ পড়ছে, সব ভেঙে কী দেবে? শিয়ালদা, দমদম গুঁড়িয়ে দিয়েছে। রোজ রাতে ভয় করে। খালি কখন আসে, কখন আসে মনে হয়! মাঝে মধ্যে স্টেশন ঘুরে যাই। লাইট গেলে ভয়ে করে। আমরা সবাই সজাগ থাকি। আমাদের একবার তারিখ দিয়েছিল, আমরা রাত জেগেছিলাম। এইটুকুই আশা— সেদিন সোদপুর স্টেশন ভাঙ্গতে পারেনি, পরেও হয়তো পারবে না। এবারও আমরা রাত জাগব। কিন্তু এভাবে কতদিন? যখন তখন নোটিশ দিচ্ছে, তাতে ডেট দিচ্ছে না। আমাদের খালি ভয় দেখাচ্ছে। মার্কেটে যখন যাই তখন শিয়ালদাতে দেখি বড় বড় দোকান। এসব তো ছিল না, হালে হয়েছে। তাদের তো ভাঙেনি। আর আমার তো বাপের আমলা থেকে ডালা, ষাট বছরের উপর হয়ে গেছে। ওদের মতো অত জায়গা তো আমরা চাইছি না। রেল তো আমাদের ঘরবাড়ি, এক হাত জায়গার হক নেই আমাদের? এ কেমন বিচার? আমার নাতনি বলে "তোমরা মুদি(মোদী)-কে বুঝিয়ে বলো না, আমরা কী খাবো? ইস্কুলে যাবো কী করে?" এটুকু মেয়ে কষ্টটা বোঝে আর দেশের মুরুব্বিরা বোঝে না। অনেকবছর আগে সিটুর থেকে বলেছিল, লাইন্সেস দেওয়া হবে। লাইন্সেস পেলে আমাদের হক বাড়বে, হুটহাট কেউ তুলে দিতে পারবে না। কিন্তু তারপর বছর সতেরো হয়ে গেল, কোনও সরকার লাইন্সেস দিল না। আমরা মাগনায় চাইছি না, লাইন্সেস-এর ন্যায্য টাকা দেব। রেলও তো জানে আমাদের ইনকাম কত, সেই অনুযায়ী টাকা নেবে। আমরা তো রেলের নিজের লোক। প্যাসেঞ্জার-এর এক্সিডেন্ট হলে আমি নিজে স্টেচারে করে গাড়িতে তুলে দিছি, অসুস্থ লোককে বাড়ি পৌঁছে দিছি। স্টেশনে গোল বাঁধলে আরপিএফ আসার আগে আমরা থামিয়েছি। আর আজ আমরা পর হলাম! এই স্টেশনে হকার উঠে গেলে শ্মশান হবে, চুরি ছিনতাই বাড়বে। আর আমরা না খেয়ে মরব। সুদে টাকা তুলে ছেলেকে টোটো কিনে দিয়েছি। তিরিশ হাজার টাকা। দুবছর হয়ে গেল, সপ্তাহে ছ'শ টাকা করে সুদ। ডালা গেলে মেটাবো কেমন করে? এখনও পর্যন্ত মিটিয়ে যাচ্ছি। যারা মেটাতে পারে না, তাদের বাড়ি এসে হুজ্জুৎ করে লোনের লোকেরা। ঘর তো আমার নেই এবার তো মানুষ নিয়ে টানাটানি পড়বে টাকা না মেটালে। ভাবলে বুক শুকিয়ে যায়, চোখের জল তো কবে শুক্কেছে। সরকার এত পাষাণ হয় গো? টাকা থাকলে তবেই গলে, আমাদের চোখের জলে গলে না? সরকার আর মহাজনে ফারাক রইল কী? তাই আর চোখের জল ফেলছি না, লাইন্সেস-এর জন্য আবার লড়াই শুরু হয়েছে সেই আগের মতো। কলকাতার মিটিং মিছিলে স্টেশনের সবার সাথে আমিও যাচ্ছি। সব হকাররা খবর দেয় কখন কোথায় মিটিং আছে, বলে "মাসি মিটিং-এ চলো"। আমি ডালা বন্ধ রেখেই যাই। সারা জীবন বন্ধ হওয়ার থেকে, দুদিন ডালা বন্ধ থাক। কষ্ট হলে সইব, কিন্তু এর একটা বিহিত করতে হবে। মামলা, মক্কোদমা, মিছিল, লড়াই সব করব আমরা— স্টেশনে হকার তুলতে দেব না। আমার মতো জীবন নাতনিগুলাকে দেব না। তিপ্পান্ন বছর বয়স আমার, জন্ম থেকে বুঝেছি লেখাপড়া না করলে সব অন্ধকার। নাতনিগুলা লেখাপড়া করবে, চাকরি করবে, তাই আমাকে হকারি করতে হবে। প্রতিবন্ধী ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে তার জন্যও আমাকে লড়তে হবে। নাহ্, লড়াই থামাব না। [কমলা রানী দাস উত্তর চব্বিশ পরগণার সোদপুরের বাসিন্দা। বয়স তিপান্ন বছর। সোদপুর স্টেশনে হকারি করেন ৪২ বছর ধরে। পাঁচজনের পরিবারের মূলতঃ তিনিই রোজগারের সূত্র। মাসিক আয় দশ হাজার টাকার কম তাই ব্যয় সংকুলান করতে মাইক্রোফিন্সাস পরিবারটির মধ্যে প্রবেশ করেছে। এমতাবস্থায় হকার উচ্ছেদের নোটিশ পেয়েছেন। অমৃতভারত নাম নিয়ে আসলে বেসরকারিকরণের দিকে হাঁটছে কেন্দ্রীয় সরকার। রেল বাজেট-কে সাধারণ বাজেট-এর মধ্যে মিশিয়ে দেওয়াও এই পরিকল্পনারই অন্তর্গত। রেলের জায়গা বেচে দিচ্ছে কর্পোরেট-এর কাছে। অথচ ভারতীয় রেল-কে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ হকার-পরিবার বেঁচে আছে বিট্রিশ আমল থেকে। তাঁদের এখনও লাইসেন্স দিতে পারেনি কোনও কেন্দ্রীয় সরকার। তাই হকারদের সম্মিলিত দাবী পুর্নবাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয় একই সঙ্গে দাবী যে, লাইসেন্স দিতে হবে। কারণ স্টেশন যেমন রেলের, তেমন হকারেরও।] অনুলিখন: প্রিয়াঙ্কা কাঞ্জিলাল ⮕ আমাদের কথা বিভাগের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে ক্লিক করুন প্রকাশের তারিখ: ২২-জুন-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |