সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদ ২

প্রকাশ কারাত
ভারত এখন ধীরে ধীরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে উঠেছে। কিন্তু তবুও ভারত পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের শিবিরে অবস্থান করতে পারেনি। বর্তমানে বিশ্বের ক্রমবর্ধমান বহুমেরুত্বের  প্রবণতাই এর প্রধান কারণ। ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশনের মতো বিভিন্ন বহুমেরু সংস্থা ও জোট গড়ে উঠেছে। এই সংস্থাগুলির সঙ্গে ভারত যদি সম্পর্ক না রাখে, তাহলে ‍‌ ভারতের স্বার্থ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই দেশে আমাদের গণ-আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই আন্দোলনগুলির রাজনৈতিক লক্ষ্য হবে— ভারত যেন আবার নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বাধিকার ফিরে পায়।

[একুশে: ভাষা দিবস। একুশে: কমিউনিস্ট পার্টির ইশ্‌তেহারের প্রথম প্রকাশ। এই দুই মিলিয়ে একুশেরেড বুকস ডে বিশ্বের বামপন্থী প্রকাশনা সংস্থাগুলি প্রতি বছরই দিনটি পালন করে আসছে। এবারেও করবে। এবারের বিষয়সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা অক্টোবরের শেষে সিপিআই(এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সদস্যদের শিক্ষা-শিবিরেসমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদনিয়ে একটি ক্লাস নিয়েছিলেন প্রকাশ কারাত। তারই নির্যাস ছিল এই নোটে। আজ শেষ পর্ব। ভাষান্তর করেছেন শঙ্কর মুখার্জি।] 

প্রথম পর্বের পর...

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন এবং আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি

ঠান্ডা যুদ্ধের পর্ব বিস্তৃত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী থেকে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের সময় পর্যন্ত। ১৯৮০-র দশকে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি একটা শক্তিতে পরিণত হয়। এটাই ‘বিশ্বায়ন’ নামে আজ পরিচিত আমাদের কাছে, তার পূর্বাভাস। এটা প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদ পরিচালিত বিশ্বায়ন। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির চরিত্রই হল— সে চায় বিশ্বজুড়ে অবাধ চলাচল এবং তার পুঁজিকে সে বিশ্বের যেকোনো জায়গায় রাখতে সক্ষম হবে। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে যেকোনো শেয়ার মার্কেটে যখন খুশি প্রবেশ করবে। একইভাবে দ্রুত মুনাফার প্রয়োজনে অন্য কোনো ক্ষেত্রে বা স্থানে পুঁজিকে স্থানান্তরিত করতে পারবে।

এই পুঁজির ফাটকা চরিত্র ও গরম পুঁজির প্রবাহের জন্য জরুরি হলো সমস্ত জাতীয় সীমারেখা ও বাধাগুলোকে ভেঙে ফেলা। এবং বিশ্বায়নও এই একই জিনিস নিয়ে এসেছে। নয়া-উদারনীতির যুগে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির কর্তৃত্বের কারণেই এটা হয়। ১৯৮০-র দশকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান ও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের নেতৃত্বে নয়া-উদারবাদী নীতিসমূহ গৃহীত হয় এবং রূপায়ণ হয়।

আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির কর্তৃত্ব, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন চালু করার উদ্যোগ এবং এই সমগ্র কাঠামোর মাথার ওপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিষ্ঠিত হওয়ার মতো বড়ো সাফল্য অর্জিত হলো তখনই যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় ঘটল। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইয়োরোপের দেশগুলিকে নিজের আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে এলো।

মার্কিন আধিপত্য এবং সামরিক হস্তক্ষেপ

একমেরু বিশ্ব এবং সেখানে একমাত্র মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র— এই ধারণা সেসময় গড়ে উঠল এবং চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এটাকে সাম্রাজ্যবাদের বিজয় এবং চূড়ান্তভাবে লগ্নিপুঁজির বিজয় হিসেবে সেসময়ে দেখা হতো। এই পর্যায়ে যখন সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিচালিত বিশ্বায়ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তখনই এই নয়া-পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আরোপিত করা হলো। এই সময়েই দেখা গেছে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী জোটের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর টানা হস্তক্ষেপ। প্রথম হস্তক্ষেপ ঘটে যুগোস্লাভিয়ায় এবং সেই দেশকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর আক্রমণ সংগঠিত হয় সার্বিয়ায়। বুশের রাষ্ট্রপতিত্বের সময় ইরাকের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ আগ্রাসন হয়। এরপরে সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটে লিবিয়া ও সিরিয়ায়। এবং সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার এজেন্ট ইজরায়েল, এই মার্কিন-ইজরায়েল অক্ষ, সামরিক হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসন ঘটিয়েছে গাজা ও প্যালেস্তাইনে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির যুগে কিংবা ঠান্ডাযুদ্ধের অবসানেও যুদ্ধ বন্ধ হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে যুদ্ধ ও সামরিক হস্তক্ষেপ দুইই ধারাবাহিকভাবে হয়েছে। লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকায় বারবার হস্তক্ষেপ করতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা নানা সামরিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। এই সমস্ত অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বে সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটেছে এবং আজকের দিনেও তারা এ কাজ করে চলেছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ ব্যতিরেকেও আমরা দেখেছি, বর্তমান সময়েও সাম্রাজ্যবাদ তার পুরনো উপনিবেশগুলো এবং অন্য দেশগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। এই দেশগুলি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে পড়ে এবং এখন এই দেশগুলি ‘গ্লোবাল সাউথ’ (দক্ষিণ গোলার্ধ) নামেই পরিচিত। এই হস্তক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি চালাচ্ছে অথবা ইজরায়েলের মতো তার এজেন্টদের দিয়ে চালাচ্ছে। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী চরিত্র এখনো বজায় রয়েছে, কারণ সাম্রাজ্যবাদ হলো একটা লুন্ঠনকারী ব্যবস্থা।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অস্ত্রসম্ভারই মার্কিন আধিপত্য ও নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে ৮০টি দেশে। একটা হিসেবে দেখা যাচ্ছে— এই সামরিক ঘাঁটিগুলিতে ১,৭০,০০০ থেকে ২,৫০,০০০ সৈন্য ও মার্কিন নাগরিক মজুত রয়েছে।

অর্থনৈতিক দমনমূল ব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞা

সাম্রাজ্যবাদ সমস্ত উপায়কেই ব্যবহার করে। সমসাময়িক পুঁজিবাদ অর্থনৈতিক দমন-নিপীড়নকারী ও যুদ্ধবাজ হিসেবেই চিহ্নিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমী জোটসঙ্গীরা সেই দেশগুলির ওপরই আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চাপায়, যাদের তারা তাদের আধিপত্যবাদের সামনে বিপদ হিসেবে মনে করে অথবা যারা মার্কিন নির্দেশ গ্রহণ করতে রাজি থাকে না। সাম্রাজ্যবাদ ওই দেশগুলিকে সন্ত্রাসবাদের মদতদাতা কিংবা বেআইনি দেশ হিসেবে ঘোষণা করে। এমনকী আজও বহু দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমী জোটসঙ্গীদের জারি করা নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে। এইসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো অবশ্যই কিউবা। এই দেশ সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ভেনেজুয়েলা, ইরান, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধেও। এর লক্ষ্য হলো ওইসব দেশে আর্থিক সুস্থিরতা ধ্বংস করে শাসক পরিবর্তন করা। এই পদ্ধতি যদি সফল না হয়, তাহলে ওই দেশগুলির কঠিন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়, যেমন ইরাকে ব্যবহার করা হয়েছিল শাসন পরিবর্তন করতে। বিশ্বায়নের সময়ে সাম্রাজ্যবাদের এই বৈশিষ্ট্যের প্রতি যেন আমাদের নজর সরে না যায়। এই বিশ্বায়নের সময়েই আমরা দেখেছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কুৎসিত আক্রমণ। যে দেশটি নয়া-উদারবাদী শাসনের বিরোধিতা করবে কিংবা আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির নির্দেশ ও চুক্তিসমূহ গ্রহণ করতে অস্বীকার করবে তারাই মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির আক্রমণের মুখে পড়বে।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

তাই সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদের এই বৈশিষ্ট্যগুলি— আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির কর্তৃত্ব, পুঁজিবাদী দুনিয়ার সমস্তটাতেই নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থার বিস্তার, গ্লোবাল সাউথের ওপর ধারাবাহিক শোষণ— সম্বন্ধে বোঝাপড়া থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। এই নয়া-উপনিবেশিক ব্যবস্থা— ‘অধিকার বঞ্চিত করে সঞ্চয়’ বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের বেসরকারিকরণ, উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রাকৃতিক সম্পদের লুঠ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার ও  তার ওপর একচেটিয়া অধিকার কায়েম করতে মেধাস্বত্ব ও পেটেন্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যাচ্ছে।

সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদের নতুন বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে অন্যতম হলো— কীভাবে প্রযুক্তির বিকাশ হচ্ছে, কীভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন স্তর— সাইবারনেটিকস বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কমপিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রভৃতির ব্যবহার মুষ্টিমেয় একচেটিয়া প্রযুক্তি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। এইরকম সাতটি প্রযুক্তি, চিপ ও সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি রয়েছে যাদের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বিরাট এবং নতুন প্রজন্মের বিলিওনেয়ারের জন্ম দিয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে এলন মাস্ক যিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। এছাড়াও জুকেরবার্গ, বেজোসের মতো আরও বিলিওনেয়ার রয়েছে। এইভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগ্রগামী প্রযুক্তি এবং অর্থনীতি ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে তার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ওপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বজায় রাখে।

এইভাবেই প্রযুক্তিচালিত পুঁজিবাদ বা সাইবারনেটিকস পুঁজিবাদ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবস্থায় বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তির ওপর নিজের নেতৃত্ব ও একচেটিয়া অধিকার বজায় রাখতে চাইছে এবং অন্যদের এই প্রযুক্তিগুলির ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। বিশেষকরে চীনের বিরুদ্ধে এটা করা হচ্ছে কারণ চীন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি।

চীনের উত্থান: মার্কিন আধিপত্যবাদের সামনে চ্যালেঞ্জ

চীনের অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ, প্রযুক্তিগত শৌর্য ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা চমকপ্রদভাবে তার রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সামনে কৌশলগত বিপদ হিসেবে চীনকে চিহ্নিত করেছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমপিউটার, কৃত্রিম মেধা, কোয়ান্টাম কমপিউটার, রোবোটিক্সের মতো প্রযুক্তির নতুন নতুন ক্ষেত্রগুলিতে চীন দ্রুত এগোচ্ছে, এবং এই বিশেষ ক্ষেত্রগুলিতে চীন নেতৃত্বে এসে যাবে। তার জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্পের এই কাণ্ডকারখানা আমরা দেখছি। ট্রাম্প কিন্তু পাগল নয়। অর্থনৈতিভাবে নেতৃত্ব এবং বিশ্বের নেতৃত্বের জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরানো অবস্থা বজায় রাখার সে চেষ্টা করছে। যখন ট্রাম্প বলে আমেরিকা প্রথম অথবা আমেরিকাকে আবার মহান করা হবে,— এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বর্তমান বাস্তবতাকে অতিক্রম অর্থাৎ নয়া-উদারবাদের সংকটকে অতিক্রমের চেষ্টা করা হয়। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নয়া-উদারবাদ সংকটের মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে, ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে।

নয়া-উদারবাদ তার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। সে নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থার মধ্যে এই যে টালমাটাল অবস্থা তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রেও।

সমসাময়িক পুঁজিবাদে আরেকটি দিক হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের দিনগুলিতে যেমন প্রধান দ্বন্দ্ব ছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্লকের সঙ্গে সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লকের মধ্যে— ঠিক একইভাবে আজকের দিনেও কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে।

এই দ্বন্দ্বই যা বিশ্বের বিকাশ ও ভূরাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে নির্ধারণ করে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালে প্রথম দফার রাষ্ট্রপতিত্বের সময় ট্রাম্প যা করেছিল সেটা হলো, তিনি আমেরিকায় চীনা পণ্যের আমদানির ওপর উচ্চ শুল্ক চাপিয়ে ছিলেন। সেমিকন্ডাক্টরের মতো আধুনিক প্রযুক্তি চীনে সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ আনতে তৎপর হয়েছিলেন। ট্রাম্পের পর রাষ্ট্রপতি বাইডেনও একই নীতি চালিয়ে যান এবং একটা আইন আনেন এবং চীনে উচ্চ প্রযুক্তির চিপ সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ করেন অথবা নিষেধাজ্ঞা চাপান। এখন ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় দফার রাষ্ট্রপতিত্বে চীনের ওপর আবার চাপ বাড়িয়েছেন, এসবের মধ্য দিয়ে দেখছেন, কীভাবে চীনের কাছ থেকে কিছু সুবিধা আদায় করা যায়। চীনের বিরাট উৎপাদন ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি বিশ্বঅর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে এতোটাই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে যে, সেই পরিস্থিতিতে আমেরিকা ও পশ্চিমের দেশগুলির পক্ষে চীনের থেকে বিযুক্ত থাকা সম্ভব নয়। কীভাবে একটু বেশি সুবিধা আদায় করা যায়, কীভাবে চীনকে বিভিন্ন সেক্টরে ঠেকিয়ে রাখা যায় — টানাটানিটা এখন সেখানে। নয়া-উদারবাদের সংকট, বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান এবং বহুমেরুত্বের বিকাশকে আটকাতে সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তা আমরা দেখতে থাকব। এই সংঘাত আগামীদিনেও চলবে। বিশ্ব ক্রমশ বহুমেরুর দিকে এগোচ্ছে। এটা ঘটনা যে, মার্কিন আধিপত্যবাদ, যা মার্কিন শক্তির পরিচায়ক তা আগামীদিনে কমবে— তার সঙ্গে এই বিকাশমান ঘটনাগুলি সম্পর্কিত।

আগামীদিনে মার্কিন অর্থনীতি এবং তার আন্তর্জাতিক প্রভাবের হ্রাস প্রতিবিম্বিত হবে চীনের উত্থানের মধ্য দিয়ে। এটা মানে এই নয় যে, আমেরিকা দুর্বল অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এখনো পর্যন্ত বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ আমেরিকা। কিন্তু এর বিকাশ, এর শক্তি ক্রমশ কমছে। তাই সমস্ত ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির জন্য এবং তার সাম্রাজ্যবাদী জোটের জন্য যে প্রভাব তা দুর্বল হচ্ছে।

বহুমেরুত্ব

বেশ কয়েকটি পুঁজিবাদী দেশ, যারা ওই তথাকথিত দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত এবং এদের অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থেকেও যখন তাদের স্বার্থের বিষয় আসে, তারাও ক্রমশ স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। সে ‘ব্রিকস’-ই হোক কিংবা প্রসারিত ব্রিকসই হোক, যেখানে কিছু দেশ আছে যারা আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী, কিন্তু তারা অর্থনৈতিকভাবে  শক্তিশালী এবং তারা চায় নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং তাই যখন প্রয়োজন পড়ে কিংবা সম্ভব হয় তখন ওই দেশগুলি স্বাধীন অবস্থান নেয়।

আবার চীন ও রাশিয়ার মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক বোঝাপড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাশিয়া একটা বড়ো পুঁজিবাদী শক্তি, যদিও এই দেশ এখন আর সমাজতান্ত্রিক শক্তি নয়; রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকা ও পশ্চিমের দেশগুলির একটা সংঘাত রয়েছে। এই চীন ও রাশিয়ার মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক বোঝাপড়া, বহুমেরুত্বের বিষয়টাকে উজ্জীবিত করেছে। তাই সাংহাই কো-অপারেশন হোক, কিংবা ব্রিকসই হোক বা গ্লোবাল সাউথের কিছু আঞ্চলিক সহযোগিতার চেষ্টাই হোক— এসবই আসলে বর্তমান বিশ্ব যে আরও বেশি করে বহুমেরুত্বের দিকে এগোচ্ছে, তাকেই চিহ্নিত করছে। এটা নয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রবণতাকে আটকানোর চেষ্টা করবে না অথবা নিজেদের কর্তৃত্বকে জাহির করার চেষ্টা চালাবে না। এখন পশ্চিম এশিয়ায় যা ঘটছে, সেটা এর একটা ভালো  উদাহরণ। কীভাবে ইজরায়েলকে ব্যবহার করা হচ্ছে, শুধু ট্রাম্পের সময়েই নয়, বাইডেনের সময়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, জর্ডন, মরোক্কো— এইসব আরব দেশকে ইজরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও সহযোগিতা করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছে। আর এখন শুধুমাত্র গাজায় গণহত্যা চালানোর জন্য ইজরায়েলকে সম্পূর্ণ মদত দেওয়া হচ্ছে না, পরন্তু লেবানন, সিরিয়ায় আক্রমণেও সমর্থন জানানো হচ্ছে, এবং সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনেও ইজরায়েলকে সমর্থন করেছে আমেরিকা, যেখানে ট্রাম্পও ইরানের পরমাণুকেন্দ্রে বোমা ফেলে।

অর্থাৎ এটা থেকে কী প্রমাণ হয়? আমরা কখনই আজকের দিনেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শক্তি ও ক্ষমতাকে খাটো করে দেখবো না। স্ট্র্যাটেজিকভাবে তারা দুর্বল হচ্ছে, কিন্তু কৌশলগত দিক থেকে তাদের ক্ষমতা এখনও রয়েছে এবং বর্তমান সময়ে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন ও সংগ্রামকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ট্রাম্পের আমলে লাতিন আমেরিকায় আমরা দেখছি একটা নতুন আগ্রাসী অভিযান। ভেনেজুয়েলাও মার্কিন আক্রমণের মুখে। ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরকারকে উচ্ছেদ কিংবা সিআইএ-র গোপন কৌশলে অস্থিরতা সৃষ্টি সহ সেখানে যে-কোনো ধরনের সামরিক অভিযানের গভীর সম্ভাবনা রয়েছে। বলিভিয়ায় ‘সমাজতন্ত্রের জন্য আন্দোলন’-এর শক্তি হেরে যাওয়ার সঙ্গেই সেদেশও দক্ষিণপন্থার দিকে  ঝুঁকছে।

ইকুয়েডর আগে বামদিকে মোড় নিয়েছিল, কিন্তু এখন এই দেশটি দৃঢ়ভাবেই দক্ষিণপন্থী শিবিরে। এই লাতিন আমেরিকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর উঠোন হিসেবে পরিচিত। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরোনো প্রভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা  চালাচ্ছে। একদিকে আমরা দেখছি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে, চীন মার্কিনীদের হঠিয়ে দিয়ে বিশ্বজুড়ে তার প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। তবে একইসঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লড়াই ছাড়া কোনো কিছুই ছেড়ে দেবে না।

তাই আগামীদিনে আমাদের দেখতে হবে কীভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। তবে অবশ্যই সেইসব দেশের জনগণ, যারা সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও আগ্রাসনের শিকার, তারাই এই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে প্রধান শক্তি। একইসঙ্গে চীনের শক্তি বৃদ্ধি ও তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি করবে।

ভারতের মতো দেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদ তার প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ভারতে সাম্রাজ্যবাদ এটা করতে সক্ষম হয়েছে মোদি সরকারের মার্কিনীপন্থী নীতি গ্রহণের বদান্যতায়। যদিও আগের মনমোহন সিংয়ের সরকারের এবং বাজপেয়ী সরকারের সময় ভারত মার্কিন দেশের স্ট্র্যাটেজিক সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল। ভারতের শাসকশ্রে‍ণির স্বার্থেই এটা হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন জোট থেকে ভারতকে বিযুক্ত করার লক্ষ্যেই আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। এই লক্ষ্যে লড়াই-সংগ্রাম খুবই জরুরি, কেননা, ভারত দক্ষিণ গোলার্ধের বৃহৎ ও প্রধান দেশ।

ভারতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী কাজ

ভারত এখন ধীরে ধীরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে উঠেছে। কিন্তু তবুও ভারত পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের শিবিরে অবস্থান করতে পারেনি। বর্তমানে বিশ্বের ক্রমবর্ধমান বহুমেরুত্বের  প্রবণতাই এর প্রধান কারণ। ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশনের মতো বিভিন্ন বহুমেরু সংস্থা ও জোট গড়ে উঠেছে। এই সংস্থাগুলির সঙ্গে ভারত যদি সম্পর্ক না রাখে, তাহলে ‍‌ ভারতের স্বার্থ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই দেশে আমাদের গণ-আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই আন্দোলনগুলির রাজনৈতিক লক্ষ্য হবে— ভারত যেন আবার নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বাধিকার ফিরে পায়।

তবে অবশ্যই এর জন্য জরুরি হলো দেশের বর্তমান সরকার এবং তার পুরো শাসন কাঠামোকে উৎখাত করা। অর্থাৎ ভারতে হিন্দুত্ববাদী স্বৈরাচারী শাসনকে পরাস্ত করা এবং এই হিন্দুত্ব ও করপোরেটের আঁতাতের অবসানের জন্য এই সংগ্রামও সাম্রাজ্যবাদী-বিরোধী সংগ্রামের অংশ। কারণ আরএসএস, বিজেপি, বৃহৎ কর্পোরেট এবং আমাদের দেশের নয়া-উদারবাদের সমর্থক-শক্তিরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির কাছ থেকে সমর্থন ও সাহায্য পায়।

তাই যখন আমরা দেশের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, নয়া-উদারবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, সেই সংগ্রাম অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামেরই অংশ।

 


প্রকাশের তারিখ: ২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org