সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদ ১
প্রকাশ কারাত
এই বোঝাপড়াটা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির যুগে রয়েছি যেখানে বিভিন্ন দেশের লগ্নিপুঁজিগুলি একসঙ্গে মিশে গেছে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে চলমান রয়েছে। এই সমস্ত দেশের লগ্নিপুঁজিগুলির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা এখন আর সম্ভব নয়।

[একুশে: ভাষা দিবস। একুশে: কমিউনিস্ট পার্টির ইশ্তেহারের প্রথম প্রকাশ। এই দুই মিলিয়ে একুশে ‘রেড বুকস ডে’। বিশ্বের বামপন্থী প্রকাশনা সংস্থাগুলি প্রতি বছর দিনটি পালন করে আসছে। এবারেও করবে। এবারের বিষয় ‘সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা’। অক্টোবরের শেষে সিপিআই(এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সদস্যদের শিক্ষা-শিবিরে ‘সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদ’ নিয়ে একটি ক্লাস নিয়েছিলেন প্রকাশ কারাত। তারই নির্যাস ছিল এই নোটে। আজ প্রথম পর্ব। ভাষান্তর করেছেন শঙ্কর মুখার্জি।]
সাম্রাজ্যবাদ কী? লেনিন তাঁর বিখ্যাত ‘সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়াকে উন্নত করেন। লেনিন সাম্রাজ্যবাদকে একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্তর বলে সংজ্ঞায়িত করলেন।
লেনিন সাম্রাজ্যবাদের পাঁচটি লক্ষণকে নির্দিষ্ট করেছিলেন। এইগুলি হলো: প্রথমত, উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন, যা এমন একটা উচ্চস্তরে পৌঁছিয়েছে যে তা থেকে সৃষ্টি হয়েছে একচেটিয়া কারবারের। দ্বিতীয়ত, ব্যাঙ্ক-পুঁজি ও শিল্প-পুঁজির সম্মিলনে লগ্নিপুঁজির সৃষ্টি। তৃতীয়ত, পুঁজির রপ্তানি, এটাই কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হওয়া। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদীদের একচেটিয়া সঙ্ঘগুলির দ্বারা বিশ্বকে বাটোয়ারা। এবং শেষত, বৃহৎ পুঁজিবাদী শক্তিসমূহের মধ্যে বিশ্বের আঞ্চলিক বাটোয়ারার পরিসমাপ্তি। লেনিন বলেন, পুঁজিবাদী শক্তিসমূহের নতুন বাজারের, সম্পদের সন্ধান ও পুঁজি রপ্তানির গন্তব্যের প্রয়োজনই সাম্রাজ্যবাদকে চালিত করে। এটাই বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও শোষণ তৈরি করে।
একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্তর
ঊনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে একচেটিয়া পঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। কার্ল মার্কস পুঁজিবাদের কাঠামো, কীভাবে পুঁজিবাদের বিকাশ হয় এবং পুঁজিবাদের অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্যগুলির ব্যাখ্যা করেছিলেন। মার্কস মূলত পুঁজিবাদের সেই পর্যায়ের কথা বলেছেন, যখন সরকারি হস্তক্ষেপ হতো না, সেসময়ে পুঁজিবাদীদের মধ্যে বাজার নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো।
মার্কস দেখতে পেয়েছিলেন যে, এখানে একটা পুঁজির কেন্দ্রীভবনের প্রক্রিয়া থাকবে। যদিও মার্কসের মৃত্যুর পরই উনিশ শতকের শেষ দশকে পুঁজি এবং উৎপাদনব্যবস্থার কেন্দ্রীভবন ঘটে যা একচেটিয়ার জন্ম দেয়। এবং এইখানেই লেনিন পুঁজিবাদের একচেটিয়া পর্যায়ের বিকাশের ব্যাখ্যা করেন। পুঁজিবাদের এই স্তরের ভিত্তিগত বোঝাপড়ায় লেনিনের অবদান গুরুত্বপূর্ণ যা সাম্রাজ্যবাদকে বুঝতে সাহায্য করে এবং বিপ্লবী রণকৌশলের সূত্রায়ণেও লেনিনের এই তত্ত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্রাজ্যবাদ এবং অগ্রবর্তী পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে কীভাবে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় যা যুদ্ধের দিকে বিশ্বকে নিয়ে গিয়েছিল সে সম্পর্কে লেনিনের বোঝাপড়া তাঁকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রকৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি দিয়েছিল। এই যুদ্ধ শুরু হয় ১৯১৪ সালে। এবং তিনি সরাসরি চিহ্নিত করেন যে, পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদের বিকাশ ঘটাবে এবং জর্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে দেশ, সম্পদ দখল ও পুঁজির রপ্তানি নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়াবে।
Lenin sweeping the globe clean of capitalists and the monarchy, Soviet propaganda poster, c1920.
লেনিনের এই বোঝাপড়াতেই রাশিয়ার বলশেভিক পার্টির জন্য তিনি একটা নতুন বৈপ্লবিক রণনীতি তৈরি করেন, যেখানে তিনি বললেন, এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, যাতে রাশিয়ার জার যুক্ত, শুধু তার বিরোধিতা করলেই হবে না, একইসঙ্গে তিনি আহ্বান জানালেন গৃহযুদ্ধের, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিবর্তিত করে জারকে উচ্ছেদ করার।
আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব এবং যুদ্ধ
বিশ শতকের প্রথম দশকের শেষের দিকে বিশ্বের মানচিত্র বিভিন্ন উপনিবেশে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এই উপনিবেশগুলি ছিল ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স এবং পরে জাপান ও এরকম কিছু দেশের। অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবীই বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির উপনিবেশে ভাগ হয়ে যায়। এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে সংঘাত বিশ্বকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায় এবং এর পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও হয়।
আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব যা বিশ্বকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়— এপ্রসঙ্গে লেনিনের যে বোঝাপড়া তার যথার্থতা দু’টি বিশ্বযুদ্ধে ভীষণভাবে প্রমাণ হয়েছে, এই দুটি বিশ্বযুদ্ধই বিশ শতকে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জারের রাশিয়া যুক্ত ছিল, সেই প্রেক্ষিতে আমাদের এটা বলতেই হবে যে, এই আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের একটা ফল হলো রুশ বিপ্লব। জারের রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সঙ্গে ছিল। এই যুদ্ধে জারের সামরিক বাহিনীর সেনাদের এবং জনগণকে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়তে হয়— যা তাদের মধ্যে, বিশেষকরে কৃষকদের মধ্যে জারের বিরোধিতা ও জারের সঙ্গে সংঘাতকে তীব্র করে। জারের সেনারাও সাধারণভাবে কৃষক পরিবার থেকেই এসেছিল। লেনিন রাশিয়ার জন্য যে বিপ্লবী রণনীতি ঠিক করেছিলেন তা জারের শাসনকে উচ্ছেদ করে। প্রথমে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব, যা ছিল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং পরে অক্টোবর বিপ্লব যা ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব।
এই সময়কালে দু’টি অগ্রগতি সূচিত হয়। প্রথমটি, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃষ্টি, পরে যা সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়— আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একদিকে সাম্রাজ্যবাদ এবং অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের মধ্যে এক নতুন সামাজিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। রুশ বিপ্লব সফল হওয়ার মধ্যদিয়ে প্রথমবারের জন্য সমাজতন্ত্রের বাস্তব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা হয়।
সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিপ্লবসমূহ
দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ দিকটিকে আমাদের মনে রাখতে হবে তা হলো, বিশ শতকে বিপ্লবগুলি চরিত্রের দিক দিয়ে ছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিপ্লব। রুশ বিপ্লব দিয়ে শুরু হয়ে এই বিপ্লবগুলি ছিল পরবর্তীতে চীনা বিপ্লব, ভিয়েতনাম বিপ্লব, কোরিয়া বিপ্লব এবং শেষে কিউবার বিপ্লব। এই বিপ্লবগুলিকে লড়তে হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অথবা সেই দেশের শাসকশ্রেণিগুলির বিরুদ্ধে, যারা সাম্রাজ্যবাদের অধস্তন হিসেবে কিংবা তাদের সঙ্গী হিসেবে ছিল।
লেনিন সঠিকভাবেই বলেছিলেন, প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের যুগে সাম্রাজ্যবাদ। বিংশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধে সমাজতান্ত্রিক ব্লক গড়ে ওঠার সাথে সাথে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব আমাদের সময়ের প্রধান দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থিত হয়। যদিও সাম্রাজ্যবাদও পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। প্রথম যে বিষয়টা উল্লেখ করতে হয় তা হলো, সাম্রাজ্যবাদকে সমাজতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। অগ্রবর্তী পুঁজিবাদী দেশগুলি, বিশেষকরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়ে সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী দেশ এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের অবিসংবাদী নেতা হিসেবে উদ্ভূত হয়। এই দেশের কাছেই রয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী।
আমরা লক্ষ্য করেছি, সমাজতন্ত্রের সঙ্গে এই সংঘাত ও প্রতিযোগিতায় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবকে ব্যবহার করে এই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। এই সময়ে ব্যাপকভাবে উৎপাদশীলতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০— এই সময়কালকে পুঁজিবাদের ‘সুবর্ণ যুগ’ হিসেবে দেখা হয়, কারণ এই সময়ে অগ্রবর্তী পুঁজিবাদী দেশগুলিতে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ঘটে, কল্যাণকর পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়, জনগণকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার সুযোগগুলো দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
এই সব করা হয় এই কারণে যে, যাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতন্ত্রের চ্যালেঞ্জের সামনে পুঁজিবাদী দেশগুলি নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পর্বে সমাজতন্ত্রের এই পর্যায়েই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য প্রত্যক্ষ হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা তার অবস্থান এবং বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বজায় রাখার পক্ষে সচেষ্ট হয়। এইসব এমন পরিস্থিতিতে ঘটল যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়ে উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনসমূহ এবং জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলো ব্যাপকভাবে বিকাশ লাভ করেছিল।
সাম্রাজ্যবাদ এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যে শক্তিসমূহের ভারসাম্য জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলিকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা পালন করে এবং আমরা দেখি বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দখলে থাকা বেশিরভাগ উপনিবেশগুলো এই সময়ে মুক্ত হলো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো উপনিবেশ ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হলো। চীন বিপ্লব ঘটে ১৯৪৯ সালে। এশিয়া ও আফ্রিকার বেশিরভাগ উপনিবেশগুলো ১৯৬০ সালের মধ্যে পরপর স্বাধীন হলো অথবা সরাসরি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হলো। এই পরিস্থিতিতে নানারকম নয়া-উপনিবেশিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ তার আধিপত্য বজায় রাখতে এবং পুরনো ঔপনিবেশগুলোর বাজার ও সম্পদকে শোষণ করতে সচেষ্ট হলো। বেশিরভাগ দেশই রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন থাকলেও, স্বাধীনতা অর্জনের পর ওইসব দেশের শাসকশ্রেণিগুলি পুঁজিবাদী পরিকাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে থাকে, অ-পুঁজিবাদী সমাজতান্ত্রিক পথ তারা গ্রহণ করতে পারেনি।
এই পরিস্থিতি সাম্রাজ্যবাদের কাছে এবং লগ্নিপুঁজির স্বার্থে শর্ত আরোপ করা, প্রাকৃতিক সম্পদের লুঠকে বজায় রাখা, অসম বাণিজ্য শর্ত প্রতিষ্ঠা করার প্রভৃতি সুযোগ এনে দেয়। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলি সফল হওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় বিশ্বের নতুন স্বাধীন দেশগুলির ওপর সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েম রাখতে, যাতে ওই দেশগুলির বাজার ও সম্পদের লুঠকে অব্যাহত রাখা যায় সেইজন্য সাম্রাজ্যবাদ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করল।
এই সময় জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলি সফল হওয়ার পর, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ জনগণ সমাজতন্ত্রের অধীনে এলো কিংবা দেশগুলি সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হলো। সেই সময়ে মনে করা হতো স্ট্র্যাটেজিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের অবনমন ঘটছে এবং সমাজতন্ত্র হলো এগিয়ে চলার শক্তি। সেই সময়কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক স্তরে শক্তিসমূহের ভারসাম্যের বাস্তবোচিত ও যুক্তিযুক্ত মূল্যায়নেও সাহায্য করেছিল।
সাম্রাজ্যবাদের নতুন বৈশিষ্ট্য: আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি
সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, নতুন বৈশিষ্ট্যগুলি কীভাবে বিকাশলাভ করেছে— সেগুলিকে আমাদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই পরিবর্তনকে বোঝার মূল বিষয়টি হলো লগ্নিপুঁজির চরিত্রকে ভালোভাবে উপলব্ধিতে আনা। লেনিন লগ্নিপুঁজির সৃষ্টির প্রসঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। এটা ছিল প্রাক্-একচেটিয়া পর্যায়, যেখানে শিল্প পুঁজি ও ব্যাঙ্ক পুঁজির মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন কিংবা সীমারেখা ছিল।
একচেটিয়া পর্যায়ে এই দুই পুঁজির মিশ্রণে লগ্নিপুঁজির সৃষ্টি হয় যা পুঁজির কর্তৃত্বকারী রূপ হয়ে ওঠে। এই লগ্নিপুঁজির অর্থ হলো পুঁজির বিশালায়তনে কেন্দ্রীভবন। এই পুঁজির কেন্দ্রীভবনের ফলে জার্মান লগ্নিপুঁজি, ব্রিটিশ লগ্নিপুঁজি, মার্কিন লগ্নিপুঁজি প্রভৃতি গড়ে উঠল। নতুন নতুন অঞ্চলে পুঁজির রপ্তানি এবং উপনিবেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদের শোষণ-লুঠের জন্য ওই লগ্নিপুঁজিগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াই চলল।
এই সংঘাতই আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের মতো বিগত সময়ে— যুদ্ধ ও সংঘাতের উৎসই ছিল এই আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব, যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও এই দ্বন্দ্বে কিছুটা বিরতি থেকেছে। কারণ, প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকের উপস্থিতি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির ব্লকে একটা ঐক্য নিয়ে এসেছিল।
এই সময়ে আমেরিকাও সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের স্বীকৃত নেতায় পরিণত হয়। সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রাজনৈতিকভাবে অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে এবং তাদের লগ্নিপুঁজির স্বার্থে এই দেশগুলি নিজেদের মধ্যে একটা পর্যায়ের সহযোগিতা তৈরি করে ও নিজেদের মধ্যে সংঘাতগুলোকেও স্তিমিত রেখেছিল।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটা দেশে লগ্নিপুঁজির বিরাট ঘনীভবন এবং পুঁজির কেন্দ্রীভবনের মধ্য দিয়ে লগ্নিপুঁজির চরিত্রেও পরিবর্তন ঘটেছে। দেশে বিনিয়োগ করতে সক্ষম থাকা জাতীয় লগ্নিপুঁজিগুলির জন্য আর সম্ভব হলো না। এবং বিদেশে বিনিয়োগকে প্রসারিত করতে তাদের অগ্রবর্তী পুঁজিবাদী দেশগুলির লগ্নিপুঁজির সহযোগিতা দরকার হয়ে পড়ল। সমস্ত জাতীয় লগ্নিপুঁজি কেন্দ্রীভূত এবং একীভূত হলো বৃহৎ গোষ্ঠীতে এবং বিশ্বজুড়ে চলমান পুঁজি হিসেবে ঘুরতে লাগল। এই পুঁজিকেই আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি (ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স ক্যাপিটাল) বলে।
এই বোঝাপড়াটা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির যুগে রয়েছি যেখানে বিভিন্ন দেশের লগ্নিপুঁজিগুলি একসঙ্গে মিশে গেছে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে চলমান রয়েছে। এই সমস্ত দেশের লগ্নিপুঁজিগুলির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা এখন আর সম্ভব নয়।
লগ্নিপুঁজির এই ঘনীভবন ও কেন্দ্রীভবনের মধ্য দিয়ে তা আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজিতে পরিণত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের কার্যক্রম ও কাঠামোয় এই আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
প্রথমত, আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব যা এমনকী আজও বিরাজ করছে, তা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে সংঘাত ও যুদ্ধ ঘটাইনি। এর পিছনে দুটি কারণ আছে। প্রথমত, সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির দ্বারা একসঙ্গে হয়েছে এবং এই অবস্থা বজায় থাকলেই মুনাফাকে সর্বোচ্চ এবং বিশ্বের বাজারগুলির ও সম্পদসমূহের যৌথভাবে তারা শোষণ করতে পারবে। এটা একটা সাধারণ স্বার্থ এবং এই জন্য এখানে জাতীয় লগ্নিপুঁজিগুলির মধ্যে সংঘাত ও বিরোধের কোনো জায়গা নেই। এই কারণে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব যা এই শক্তিগুলির মধ্যে যুদ্ধ ঘটায়, তাতে বিরতি রয়েছে। দ্বিতীয় দিকটি হলো— এই আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি যখন বিকাশ লাভ করেছে তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতন্ত্রের মোকাবিলায় সমস্ত অগ্রবর্তী পুঁজিবাদী দেশগুলিকে সেসময়ে একটি ব্লকে ঐক্যবদ্ধ থাকাটা জরুরি ছিল। সেটাও আর একটা কারণ।
দু’পক্ষের হাতে পরমাণু অস্ত্রসম্ভার থাকার কারণে সাম্রাজ্যবাদী ব্লক ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকের মধ্যে যুদ্ধের বিপদ বাস্তবে ঘটেনি। এই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ যার মধ্য দিয়ে ঘটেছিল, সেটাই ঠান্ডা যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই কারণেই তখন এই দুই ব্লকের মধ্যে কোনো সরাসরি সশস্ত্র সংঘর্ষ বা শত্রুতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। যদিও এই দুই ব্লকের মধ্যে অন্যভাবে রাজনৈতিক, মতাদর্শগত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুদ্ধ জারি ছিল।
(শেষ পর্ব আগামীকাল)
প্রকাশের তারিখ: ২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay









