বাংলার অর্থনীতি (প্রথম পর্ব)

রতন খাসনবিশ
তেলেঙ্গানার মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বছরে প্রায় আড়াই গুণ বেশি। কর্ণাটক, হরিয়ানা, তামিলনাড়ু— এই তিন রাজ্যে মাথাপিছু বার্ষিক আয় পশ্চিমবঙ্গের দ্বিগুণেরও বেশি। কেরল, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড এবং অন্ধ্রপ্রদেশ হল সেইরকম রাজ্য যেখানে মাথাপিছু বার্ষিক আয় পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় দেড় গুণেরও বেশি। যে-রাজ্যের উন্নয়নের পাঁচালি নিয়ে তৃণমূলের অর্থী, প্রার্থীরা নৃত্য শুরু করে দিয়েছেন, সেই রাজ্যটির মাথাপিছু আয়ের নিরিখে এটাই শুধু বলার আছে যে, এখানকার গড়পড়তা মানুষ ছত্তিশগড় বা মধ্যপ্রদেশের চেয়ে বেশি আয় করেন। উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের তুলনায় বঙ্গবাসী বেশি খরচ করার সামর্থ্য রাখেন— এই দাবি নিয়ে যথেষ্ট গৌরব করার কারণ নেই। মেনে নেওয়া ভালো যে মমতার পশ্চিমবঙ্গ একটি গরিব রাজ্য। সম্ভবত মুখ্যমন্ত্রী এটি সবচেয়ে ভালো জানেন। জানেন বলেই এ-রাজ্যে তিনি রাজকোষ থেকে জনগণকে অর্থ সাহায্য করার নানাবিধ প্রকরণ উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। এ-কথাগুলি কিছুটা তিক্ত কথা। কিন্তু উন্নয়নের পাঁচালি শোনার আগে পশ্চিমবঙ্গবাসীকে এই তথ্যটিও হৃদয়ঙ্গম করতে হবে।

ভূমিকা

রাজ্য সরকারের তরফ থেকে তৃণমূল শাসনের ১৫ বছর উপলক্ষ্যে একটি পাঁচালি প্রকাশিত হয়েছে। পাঁচালির মূল কথা, মমতা শাসনের ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকেরা এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির সন্ধান পেয়েছেন। এই সমৃদ্ধি শ্রীমতী মমতা ব্যানার্জির জাদুস্পর্শে রচিত। রাজ্যবাসী যদি এই সমৃদ্ধি ধরে রাখতে চান তবে তাঁদের উচিত হবে শ্রীমতী ব্যানার্জির শাসনকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া। পাঁচালিতে অবশ্য এটা স্পষ্ট হয় না যে শ্রীমতী ব্যানার্জিকে যাবতীয় সমৃদ্ধির রূপকার হিসেবে গ্রহণ করলে একটির সঙ্গে আরেকটি ফাউ হিসেবে শ্রী অভিষেক ব্যানার্জিকে একই সঙ্গে রাজ্যের যুবরাজ হিসেবে কেন বরণ করতে হবে? কিন্তু সে-সব প্রশ্নকে অবান্তর করেই মঞ্চজুড়ে নেচে বেড়াচ্ছেন শ্রীযুক্ত ব্যানার্জি আর মাঝে মাঝে রোড শো করে নাটক জমাবার দায়িত্ব নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। অর্থী, প্রার্থী, উচ্ছিষ্টভোগী বঙ্গবাসীর দল শ্রীমতী ব্যানার্জির এই উন্নয়ন যজ্ঞের চারপাশে গোল হয়ে নৃত্য পরিবেশনে মগ্ন আছেন। রাজ্যবাসীকে এই কুনাট্য দেখতে হচ্ছে এবং তৃণমূলী উন্নয়নকে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করতে হচ্ছে। 

এই ঢক্কা নিনাদিত উন্নয়ন সম্ভবত কোনো এক এজেন্সি মারফৎ রচনা করা হয়েছে। পাঁচালি তথ্যের কোনো অভাব রাখেনি।  উন্নয়নের পাঁচালি নির্মাণে পেশাদার হাতের ছাপ আছে। প্রচার ক্রমশ তুঙ্গে তোলার প্রকরণগুলিকেও পেশাদারি কায়দায় ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু গভীরে ঢুকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এই প্রচার কতটা অন্তঃসারশূন্য, কী পরিমাণে মিথ্যা এবং অর্দ্ধসত্যের সুচারু মিশ্রণে রচিত হয়েছে এই উন্নয়নের পাঁচালি। এই পাঁচালি যে বঙ্গবাসীর কথা বলতে চায় তৃণমূলী শাসনে যে মানুষ সমৃদ্ধির সন্ধান পেয়েছে, উচ্ছিষ্টভোগী কিছু তোলাবাজ ছাড়া সেই কাতারে সাধারণ বঙ্গবাসীকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেন এই কথা বলছি এই প্রবন্ধে সেটিই হবে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। 

মাথাপিছু নিট আয়: পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্যান্য রাজ্য

উন্নয়নের পাঁচালিতে সমৃদ্ধির যে-রূপরেখা নির্মাণ করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু বার্ষিক আয় (উৎপাদন)-এর হিসেবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। ভারত সরকারের অর্থ দপ্তর প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাপেন্ডিক্সে (জানুয়ারি, ২০২৬) একটি তথ্য আছে। তথ্যটি ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের বাসিন্দাদের গড় আয় সংক্রান্ত (NSDP)। রাজ্যবাসীর মাথাপিছু নিট আয় মাপা হয়েছে টাকার অঙ্কে চলতি মূল্যে। তাতে সর্বশেষ যে-বছরের তথ্য পাওয়া যায় সেই হিসাবটি খেয়াল করলে দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গ আসলে একটি দরিদ্র রাজ্য। এমনকি পাশের রাজ্য ওড়িশাতেও মাথাপিছু গড় আয় পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্ট তথ্য সারণি ১-এ বর্ণনা করা হয়েছে। 

সারণি ১: রাজ্যওয়ারি মাথাপিছু নিট আয় (এনএসডিপি, ২০২৩-২৪) 
[তথ্যসূত্র: Ministry of Finance, Govt. Of India, January 2026]
                            

রাজ্য

মাথাপিছু নিট আয় 
(চলতি মূল্যে, টাকায়)

তেলেঙ্গানা

৩৫৬৪৬৪

কর্ণাটক

৩৩২৯২৬

হরিয়ানা

৩২৫৭৫৯

তামিলনাড়ু

৩১৫২২০

গুজরাট

তথ্য পাওয়া যায়নি 

কেরল

২৮১০০১

মহারাষ্ট্র

২৭৭৬০৩

উত্তরাখণ্ড

২৬০২০১

অন্ধ্রপ্রদেশ

২৪২৪৭৯

হিমাচল প্রদেশ

২৩৫১৯৯

পাঞ্জাব

১৯৬৫০৫

ত্রিপুরা

১৭৭৭২৩

রাজস্থান

১৬৭৯৬৪

ওড়িশা

১৬৩১০১

পশ্চিমবঙ্গ

১৫৪১১৯

ছত্তিশগড়

১৪৭৩৬১

মধ্যপ্রদেশ

১৪২৫৬৫

আসাম

১৩৫৭৮৭

ঝাড়খণ্ড

১১৫৯৬০

উত্তরপ্রদেশ

১০৪১২৬

বিহার

৬৮৮২৮


একজন গড়পড়তা নাগরিক কী ধরনের সমৃদ্ধির মুখ দেখেন, তার সবচেয়ে জোরালো ছবিটি পাওয়া যায় মাথাপিছু নিট রাজ্যগত আয়ে। সেই ছবিটি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে একেবারেই আশাপ্রদ নয়। ভারতবর্ষে ছোটোবড়ো মিলিয়ে ৩৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আছে। তার মধ্যে আয়তনের দিক থেকে বড়ো এরকম ২১টি রাজ্যে নিট রাজ্যগত মাথাপিছু উৎপাদনের যে হিসেব সারণি ১-এ বর্ণনা করা হয়েছে, সেটা বিচার করলে দেখা যায় তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গ মাথাপিছু আয়ের বিচারে আছে তলার দিক থেকে সপ্তম স্থানে। বাকি সব রাজ্য এমনকি ত্রিপুরা পর্যন্ত মাথাপিছু আয়ে পশ্চিমবঙ্গের থেকে এগিয়ে আছে। তেলেঙ্গানার মাথাপিছু আয় বছরে ৩ লক্ষ ৫৬ হাজার ৫৬৪ টাকা। পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় বছরে ১ লক্ষ ৫৪ হাজার ১১৯ টাকা। অর্থাৎ তেলেঙ্গানার মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বছরে প্রায় আড়াই গুণ বেশি। কর্ণাটক, হরিয়ানা, তামিলনাড়ু— এই তিন রাজ্যে মাথাপিছু বার্ষিক আয় পশ্চিমবঙ্গের দ্বিগুণেরও বেশি। কেরল, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড এবং অন্ধ্রপ্রদেশ হল সেইরকম রাজ্য যেখানে মাথাপিছু বার্ষিক আয় পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় দেড় গুণেরও বেশি। যে-রাজ্যের উন্নয়নের পাঁচালি নিয়ে তৃণমূলের অর্থী, প্রার্থীরা নৃত্য শুরু করে দিয়েছেন, সেই রাজ্যটির মাথাপিছু আয়ের নিরিখে এটাই শুধু বলার আছে যে, এখানকার গড়পড়তা মানুষ ছত্তিশগড় বা মধ্যপ্রদেশের চেয়ে বেশি আয় করেন। উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের তুলনায় বঙ্গবাসী বেশি খরচ করার সামর্থ্য রাখেন— এই দাবি নিয়ে যথেষ্ট গৌরব করার কারণ নেই। মেনে নেওয়া ভালো যে মমতার পশ্চিমবঙ্গ একটি গরিব রাজ্য। সম্ভবত মুখ্যমন্ত্রী এটি সবচেয়ে ভালো জানেন। জানেন বলেই এ-রাজ্যে তিনি রাজকোষ থেকে জনগণকে অর্থ সাহায্য করার নানাবিধ প্রকরণ উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। এ-কথাগুলি কিছুটা তিক্ত কথা। কিন্তু উন্নয়নের পাঁচালি শোনার আগে পশ্চিমবঙ্গবাসীকে এই তথ্যটিও হৃদয়ঙ্গম করতে হবে।

সারণি ২: দশটি প্রধান রাজ্যে গত ১৩ বছরে মাথাপিছু বার্ষিক আয়ের বৃদ্ধির হার (২০১০-১১ থেকে ২০২৩-২৪, টাকার অঙ্কে)
 (তথ্যসূত্র- পূর্ববৎ)

রাজ্যের নাম

২০১০-১১

২০২৩-২৪

বৃদ্ধির হার (%)

তেলেঙ্গানা

৬৬৯৫১

৩৫৬৫৬৪

৪৩২.৫৭

কর্ণাটক

৬২২৫১

৩৩২৯২৬

৪৩৪.৮১

মহারাষ্ট্র

৮৪৮৫৮

২৭৭৬০৩

২২৭.১৩

তামিলনাড়ু

৭৮৪৭৩

৩১৫২২০

৩০১.৭০

কেরল

৬৯৯৪৩

২৮১০০১

৩০১.৭৬

পশ্চিমবঙ্গ

৪৭২৪৩

১৫৪১১৯

২২৬.২৩

ওড়িশা

৩৯৫৩৭

১৬৩১০১

৩১২.৫৩

আসাম

৩৩০৮৭

১৩৫৭৮৭

৩১০.৩৯

উত্তরপ্রদেশ

৩৬৬৯৮

১০৪১২৬

১৮৩.৭৪

বিহার

১৯১১১

৬৮৮২৮

২৬০.১৫


২০১০-১১ সাল ছিল বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের শেষ বছর। অর্থাৎ এই সালের পরে রাজ্যটির দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর। আমরা মাথাপিছু আয়ের হিসেব নিয়েছি ২০১০-১১ এবং ২০২৩-২৪ সালের। অর্থাৎ এমন একটা সময়ের যখন শ্রীমতী ব্যানার্জি এই রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন আছেন। এই সময়সীমায় রাজ্যটিতে মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি অবশ্যই হয়েছে। সংখ্যার হিসেবে অঙ্কটি দাঁড়ায় ২২৬.২৩%। একই সময়সীমায় তামিলনাড়ু, কেরল কিংবা ওড়িশায় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৩০১.৭০%, ৩০১.৭৬%, ৩১২.৫৩%। অর্থাৎ এই সমস্ত অর্থনীতিগুলি গত ১৩ বছরে ৩ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি ঘটিয়েছে মাথাপিছু আয়ের। সে তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে বৃদ্ধির হার কম। যদি আমরা উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং আসামের সঙ্গে তুলনা করি তাহলেও দেখা যাবে পশ্চিমবঙ্গে মাথাপিছু নিট আয়ের বৃদ্ধির হার কম থেকেছে। রাজ্যটির আয়বৃদ্ধির হার একমাত্র উত্তরপ্রদেশের তুলনায় বেশি, এমনকি বিহারেও গত ১৩ বছরে মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি ঘটেছে ২৬০.৭৩%। হিসাব মত সেটিও পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি। রাজ্যটিতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে মা-মাটি-মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, সংশ্লিষ্ট তথ্যে তার স্বীকৃতি নেই। যখন এই দাবি করা হয় যে তৃণমূল শাসনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আয়বৃদ্ধির সন্ধান পেয়েছেন, তখন এটাও বলতে হবে যে তুলনামূলকভাবে বেশি সমৃদ্ধি এসেছে আসাম এবং ওড়িশার মতো দুটি পিছিয়ে পড়া রাজ্যেও। তথ্য যেহেতু অস্বীকার করার সুযোগ নেই তাই এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, আয়ের পরিমাণ অথবা আয় বৃদ্ধির হার কোনো বিচারেই ‘এগিয়ে বাংলা’ দাবি করার কোনো কারণ নেই।

গড়পড়তা মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয় : ২০২৩-২৪

অতি সম্প্রতি ভারত সরকারের তরফ থেকে আরেকটি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই তথ্য হল মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয় সংক্রান্ত তথ্য। এই তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এই তথ্য থেকে বোঝা যায় গড়পড়তা রাজ্যবাসীর খরচ করার সামর্থ্য কেমন। আয় সংক্রান্ত তথ্যে কিছু অসঙ্গতি থাকা অসম্ভব নয়, তুলনামূলকভাবে কম অসঙ্গতি থাকে ব্যয় সংক্রান্ত তথ্যে। আমাদের দেশের জাতীয় নমুনা সমীক্ষা সংস্থা যথেষ্ট সতর্কতার সাথে এই তথ্য সংগ্রহ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই তথ্যে ভুল থাকার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম। 

২০২৩-২৪ সালে ক্ষেত্র সমীক্ষায় গড়পড়তা মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয় কোন্‌ রাজ্যে কীরকম, সে-সংক্রান্ত সরকারি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যে দেখা যাচ্ছে গ্রাম ভারতে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কম, শহর অঞ্চলে ক্রয় ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৩-২৪ সালের হিসাবে মাথাপিছু মাসিক ব্যয়ের যে গড়পড়তা হিসেব পাওয়া যায় সারা ভারতের সমীক্ষাভুক্ত সব পরিবারকে হিসেবে নিলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় মাথাপিছু মাসিক ৪,১২২ টাকা। শহরে এই খরচ করার সামর্থ্য অনেক বেশি, তুলনীয় অঙ্কটি হল মাসিক মাথাপিছু ৬৯৯৬ টাকা। কিছু কিছু রাজ্য আছে যেখানে গড়পড়তা খরচ করার সামর্থ্য সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। কোনো কোনো রাজ্যে এই ক্ষমতা বেশ কম। সামর্থ্য বেশি থাকলে বুঝতে হবে রাজ্যটি তুলনামূলকভাবে বেশি সমৃদ্ধ। ব্যয়ের সামর্থ্য কম থাকলে উল্টো সিদ্ধান্ত করতে হবে। বুঝতে হবে রাজ্যটিতে খরচ করার সামর্থ্য কম, রাজ্যের গড়পড়তা মানুষ বেশি গরিব।  এই প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার প্রদত্ত মাসিক মাথাপিছু ভোগ ব্যয় সংক্রান্ত তথ্যগুলো সাজিয়ে নিলে যা পাওয়া যায় সেটি এইরকম— গ্রামীণ কেরলে মাথাপিছু ভোগব্যয় করার সামর্থ্য হল মাসিক ৬৬১১ টাকা, পাঞ্জাবে তুলনীয় অঙ্কটি ৫৮১৭ টাকা, গ্রামীণ তামিলনাড়ুতে মাসিক মাথাপিছু ভোগ ব্যয় ৫৭০১ টাকা। এই অঙ্কগুলির প্রতিটি সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। সর্বভারতীয় গড় হিসাবটি হল মাসিক মাথাপিছু ৪১২২ টাকা। সরকারি তথ্যে এটাও জানা যাচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গে গড়পড়তা ভোগব্যয়ের সামর্থ্য কেরল বা তামিলনাড়ুর মতো তো নয়ই, এমনকি সেটি সর্বভারতীয় গড় অর্থাৎ ৪১২২ টাকারও কম। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি হিসাব অনুযায়ী গ্রামে গড়পড়তা মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয় মাত্র ৩৬২০ টাকা। অর্থাৎ গড়পড়তা গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গবাসী মাত্র ৩৬২০ টাকা খরচ করার সামর্থ্য রাখেন। অঙ্কটি ওড়িশা (৩৩৫৭ টাকা), মধ্যপ্রদেশ (৩৪৪১ টাকা), ঝাড়খণ্ড (২৯৪৬ টাকা) কিম্বা ছত্তিশগড় (২৭৩৯ টাকা)-এর চেয়ে বেশি। কিন্তু ভোগব্যয় সংক্রান্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী গ্রামীণ বিহারে গড়পড়তা মাসিক ভোগ ব্যয় ৩৬৭০ টাকা। অঙ্কটি পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি। গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গ যতটুকু প্রাচুর্যের মুখ দেখে, কঠিন সত্য হল সে প্রাচুর্য বিহারের তুলনায় কম।  

 সারণি  ৩:  রাজ্যওয়ারি মাথাপিছু নিট মাসিক ভোগব্যয়
 [তথ্যসূত্র: রিপোর্ট নম্বর ৫৯২, ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে,পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক, ২০২৩-২৪]

রাজ্য

গ্রামীণ ভোগব্যয় (টাকা)

শহরাঞ্চলের ভোগব্যয় (টাকা)

 

মাসিক মাথাপিছু, ২০২৩-২৪ (টাকার অঙ্কে, চলতি মূল্যে)

মাসিক মাথাপিছু, ২০২৩-২৪ (টাকার অঙ্কে, চলতি মূল্যে)

কেরল

৬৬১১

৭৭৮৩

পাঞ্জাব

৫৮১৭

৭৩৫৯

তামিলনাড়ু

৫৭০১

৮১৬৫

তেলেঙ্গানা

৫৭৩৫

৮৯৭৮

হরিয়ানা

৫৩৭৭

৮৪২৭

অন্ধ্রপ্রদেশ

৫৩২৭

৭১৮২

কর্ণাটক

৪৯০৩

৮৬৭৬

রাজস্থান

৪৫১০

৬৫৭৪

মহারাষ্ট্র

৪১৪৫

৭৩৬৩

সর্বভারতীয় গড়

৪১২২

৬৯৯৬

গুজরাট

৪১১৬

৭১৭৫

আসাম

৩৭৯৩

৬৭৯৪

বিহার

৩৬৭০

৫০৮০

পশ্চিমবঙ্গ

৩৬২০

৫৭৭৫

উত্তরপ্রদেশ

৩৪৮১

৫৩৯৫

মধ্যপ্রদেশ

৩৪৪১

৫৫৩৮

ওড়িশা

৩৩৫৭

৫৮২৫

ঝাড়খণ্ড

২৯৪৬

৫৩৯৩

ছত্তিশগড়

২৭৩৯

৪৯২৭


মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয় সংক্রান্ত এই তথ্য কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশিত তথ্য। এই তথ্যে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় যে, শহর কিংবা গ্রাম, পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্রই গড়পড়তা পশ্চিমবঙ্গবাসীর ব্যয় করার ক্ষমতা সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। ‘এগিয়ে বাংলা’ নয়, তথ্য অনুসারে বাংলা আসলে ভারতবর্ষের মাপকাঠিতেও একটি পিছিয়ে পড়া রাজ্য। তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, হরিয়ানা, এমনকী কর্ণাটকও পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় সমৃদ্ধতর রাজ্য। যেখানে উন্নয়নের পাঁচালি পরিবেশন করার জন্য বিপুল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেই পশ্চিমবঙ্গ আসলে একটি গরিব রাজ্য, গড়পড়তা মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয় এ-রাজ্যে কম। কারণ কর্মক্ষম মানুষের ব্যয় করার সামর্থ্য এখানে কম। সামর্থ্য কম কারণ রোজগার কম। রোজগার কম বলেই আবার রাজ্য সরকার বঙ্গবাসীর জন্য অক্লেশে দরিদ্র ভাণ্ডার খোলার কর্মসূচি রূপায়নে নামে।

👉 বাংলার অর্থনীতি (শেষ পর্ব) পড়ুন।  


প্রকাশের তারিখ: ২০-মার্চ-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org