সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বাংলার অর্থনীতি (শেষ পর্ব)
রতন খাসনবিশ
নিয়োগের স্থিতিস্থাপকতা মাপা হয়েছে উৎপাদনের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচার করে। অর্থাৎ নিয়োগ বৃদ্ধি বা হ্রাসের শতকরা হার/উৎপাদন বৃদ্ধির শতকরা হার। বাড়তি উৎপাদনের জন্য সাধারণভাবে প্রয়োজন হয় বাড়তি নিয়োগের। তথ্য অনুসারে, এ-রাজ্যের পরিস্থিতি ভিন্নতর। উৎপাদন বাড়লে কৃষি ও শিল্প উভয়ক্ষেত্রেই নিয়োগ কমছে। এর অর্থ হল, যে-পরিমাণে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে নিয়োগ সেই পরিমাণে বাড়ছে না কিংবা পিছিয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা শুধু বড়ো উদ্যোক্ষেত্রগুলিতেই দেখা দিয়েছে এমন নয়, কৃষির মতো শ্রমঘন উৎপাদন ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তির বিকাশ এ-ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে সেটা আমরা জানি। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশ একই সঙ্গে নতুন নতু্ন কাজের সম্ভাবনাও বাড়ায়। পশ্চিমবঙ্গে এই জিনিসটা ঘটছে না। নতুন নতুন নিয়োগ ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। এর অবশ্যম্ভাবী ফল কর্মহানি। এ-রাজ্যে সেটাই ঘটছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎকৃষ্ট কাজের বিকাশ নেই। পড়ে রয়েছে কিছু অপকৃষ্ট কাজ। যারা একটু স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজ করেন তাঁদেরকে এই রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র জীবিকার সন্ধান করতে হচ্ছে। এই সমস্যা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের কাঠামোগত সমস্যা। এ-সমস্যা মোকাবিলার কোনো দিশা দেখা যাচ্ছে না রাজ্য সরকারের তরফ থেকে।

কাজের জগৎ
নীতি আয়োগের হিসাবে এ-রাজ্যের জনসংখ্যা আনুমানিক ৯ কোটি ৯১ লক্ষ। কর্মক্ষম মানুষ, নীতি আয়োগের হিসাবে, ৬ কোটি থেকে ৬ কোটি ৩০ লক্ষ। কর্মক্ষম মানুষের একটা বড়ো অংশ (যথা গৃহবধূ) কাজ খোঁজেন না। তাঁদের বাদ দিলে যাঁরা কাজ খোঁজেন নীতি আয়োগের হিসাবে তার সংখ্যা ৪ কোটি ৩০ লক্ষ থেকে ৪ কোটি ৬০ লক্ষের মতো। কাজ পাচ্ছেন অথবা কাজে যুক্ত অর্থাৎ নিজে থেকে একটা কাজ করছেন, এই ধরনের মানুষ রাজ্যে রয়েছেন ৪ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ৪ কোটি ৫০ লক্ষ। কাজ খুঁজছেন কিন্তু কাজ পাচ্ছেন না এমন মানুষের সংখ্যা, নীতি আয়োগের হিসাবে, ১০ থেকে ১৫ লক্ষ। কাজ পাচ্ছেন না কথাটার অর্থ হবে বছরের অধিকাংশ সময় তাঁরা বেকার থাকেন (usual status unemployment)। হিসেবে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে বেকারির হার মোটামুটি ২.১ শতাংশ, অনুপাতটি সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। পশ্চিমবঙ্গে বেকার কম থাকে অথচ এই রাজ্যটি একটি গরিব রাজ্য, এই দুটি তথ্যকে মেলাবার যোগসূত্র হল কাজের মান। এ-রাজ্যে কাজের অভাব নেই। কিন্তু কাজগুলি হল অপকৃষ্ট ধরনের কাজ যাতে বেতন বা মজুরি কম থাকে। বেতন বা মজুরি কম। গড়পড়তা বঙ্গবাসীর ভোগব্যয় করার ক্ষমতাও সেকারণে কম। যারা কিছুটা ভালো থাকার চেষ্টা করছেন তারা এই রাজ্য থেকে অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ রাজ্যে চলে যাবার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, দীর্ঘ আলোচনা করা যায় বিষয়টি নিয়ে। এ-প্রবন্ধে এটি নিয়ে আমরা একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করব।
প্রথমে দেখা যাক এ-রাজ্যে যেসব কাজ পাওয়া যায় তার চেহারা কেমন। আলোচনাটি আমরা করতে পারি সদ্য প্রকাশিত ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট অনুসরণ করে। ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট রচনা করা হয়েছে আইএলও-র মদতে। রিপোর্টটি তৈরি করেছে ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট, দিল্লি। এই রিপোর্টে কাজের মান এবং কাজের শর্ত সংক্রান্ত একটি সূচক তৈরি করা হয়েছে। সূচকটি তৈরি করা হয়েছে দেশের ২২টি প্রধান রাজ্যের নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য আহরণ করে। কোন্ রাজ্যে কাজের মান কতটা উৎকৃষ্ট বা অপকৃষ্ট তা বোঝার জন্য রাজ্য সংক্রান্ত তথ্যে আইএলও যে-বিষয়গুলিকে হিসেবে এনেছে, সেগুলি হল ক) সংগঠিত ক্ষেত্রে নিয়মিত যারা কাজ পান তাদের শতাংশ, খ) রাজ্যের মোট জনসংখ্যার মধ্যে যারা কাজ পান (labour force participation) তাদের শতাংশ, গ) ঠিকা কর্মীর শতাংশ, ঘ) স্বনিযুক্ত কর্মীদের মধ্যে যাদের আয় দারিদ্র্য সীমার নিচে তাদের অনুপাত, ঙ) ঠিকা কাজ যারা করেন তাদের মাসিক গড় আয়, চ) মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ যুবক যুবতীদের মধ্যে বেকারির অনুপাত, ছ) যে-সব যুবক-যুবতী কাজ করেন না, শিক্ষা অর্জন করেন না, অথবা কোনো প্রশিক্ষণে যুক্ত নন তাদের অনুপাত। ২২টি প্রধান রাজ্যে এ-সংক্রান্ত যে তথ্য এনএসও থেকে পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে ২০২৪-এ প্রকাশিত ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্টে একটি সূচক নির্মাণ করা হয়েছে যার নাম Employment Condition Index। ওপরে উল্লেখিত ৭টি সূচক ব্যবহার করে একটি যৌগিক সূচক তৈরি করা হয়েছে এই সংক্রান্ত তথ্যগুলিকে এক জায়গায় আনার জন্য। রাজ্যে সার্বিক কর্ম পরিস্থিতি কতটা উৎকৃষ্ট এই সূচকের মানে তা ধরা পড়ে। যদি কর্ম পরিস্থিতি উৎকৃষ্ট হয়, যত উৎকৃষ্ট হবে সূচকের মান ততই ১-এর দিকে যাবে। কর্ম পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর হয়ে ওই যৌগিক সূচকের মানকে শূন্যের দিকে নামিয়ে দিতে পারে। যে-রাজ্যে নিয়মিত কাজ বেশি, যে-রাজ্যে ঠিকা শ্রমিকের শতাংশ কম, যে-রাজ্যে স্বনিযুক্ত কর্মীদের মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থিত কর্মীর সংখ্যা কম, যে-রাজ্যে ঠিকা কাজ যারা করেন তাদের মাসিক গড় আয় অন্যদের তুলনায় বেশি, যে-রাজ্যে শিক্ষিত বেকার কম, যে-রাজ্যে কর্মহীন যুবক-যুবতী কম, সেই রাজ্য এই Employment Condition Index অনুসারে সূচকের মান ওপরে রাখতে পারবে। যে-রাজ্যে কর্মহীন, প্রশিক্ষণহীন, শিক্ষাহীন তরুণের অনুপাত বেশি, ঠিকা কাজ যাঁরা করেন তাদের মাসিক গড় আয় কম, সংগঠিত ক্ষেত্রে নিয়মিত যারা কাজ পান তাদের শতাংশ কম, ঠিকা কর্মীর শতাংশ বেশি, সূচকে সেই রাজ্যের মান কম থাকবে। অর্থাৎ যৌগিক সূচকটি তৈরি করা হয়েছে ওপরে উল্লেখিত ৭টি মৌলিক সূচকের মানকে কাজে লাগিয়ে একটা গড় সূচক তৈরি করে। এই যৌগিক সূচক, আইএলও যাকে বলছে Employment Condition Index, যে-সূচক দিয়ে রাজ্যগত কাজের মান কতটা উৎকৃষ্ট বা অপকৃষ্ট বিচার করা যায়, সেটির পরিমাণ মাপা হবে ১ থেকে শূন্যের মধ্যে কোনো একটা সংখ্যায়। মান যত ১-এর দিকে যাবে ধরতে হবে রাজ্যে অপকৃষ্ট কাজ তুলনামূলকভাবে কম।
ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্টে এই সূচক নির্মাণ করে রাজ্যওয়াড়ি কর্ম পরিস্থিতি কী রকম তার একটা আন্দাজ দেওয়া হয়েছে। সারণি ৪-এ এই সংক্রান্ত তথ্য বর্ণনা করা হয়েছে।
সারণি ৪: কর্মপরিস্থিতি সূচক ২০২২, রাজ্যগত বিন্যাস: রাজ্যের নাম ও সূচকের মানের ক্রমাঙ্ক
[তথ্যসূত্র : ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট, সারণি ২.১৫, পৃষ্ঠা ৪৯]
|
রাজ্য |
মান |
|
দিল্লি |
০.৭৯১ |
|
হিমাচল প্রদেশ |
০.৬৭২ |
|
উত্তরাখণ্ড |
০.৫৯৪ |
|
জম্মু ও কাশ্মীর |
০.৫৫৮ |
|
তেলেঙ্গানা |
০.৬০৩ |
|
রাজস্থান |
০.৫৫৯ |
|
গুজরাট |
০.৫৭৫ |
|
হরিয়ানা |
০.৫৪১২ |
|
তামিলনাড়ু |
০.৫৬৭০ |
|
মহারাষ্ট্র |
০.৫৫১০ |
|
কর্ণাটক |
০.৫৪১২ |
|
মধ্যপ্রদেশ |
০.৪৯১৮ |
|
পাঞ্জাব |
০.৫৩১৬ |
|
ছত্তিশগড় |
০.৫৪১৫ |
|
অন্ধ্রপ্রদেশে |
০.৫৪১১ |
|
ঝাড়খণ্ড |
০.৪৯২০ |
|
উত্তরপ্রদেশে |
০.৪৯১৯ |
|
আসাম |
০.৫৪১২ |
|
পশ্চিমবঙ্গ |
০.৫১১৭ |
|
কেরল |
০.৫৬৬০ |
|
বিহার |
০.৪১২২ |
|
ওড়িশা |
০.৪১২১ |
ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্টের তথ্য অনুসারে এ-রাজ্যের কর্মপরিস্থিতি মাঝারি মানের। বলা যায় যে, ঝাড়খণ্ড, বিহার অথবা ওড়িশায় কর্ম পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় খারাপ। বাকি সব রাজ্যে সূচক অনুসারে কর্ম পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় ভালো। কর্ম পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো হওয়ার জন্যই তেলেঙ্গানা, গুজরাট অথবা কর্ণাটকে বা কেরলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে জীবিকার সন্ধানে বহু শ্রমজীবী অভিবাসন ঘটাচ্ছেন। রাজ্যটিতে গড় আয়ের পরিস্থিতি ভালো নয়। কাজ হয়তো পাওয়া যায়। কিন্তু সে-কাজে মজুরি কম। কাজ হয়তো পাওয়া যায় কিন্তু সে-কাজ অপকৃষ্ট ধরনের। জীবিকার সন্ধানে এ-রাজ্য থেকে বহু মানুষ যে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন তার কারণ এটাই।
পরিয়ায়ী শ্রমিক
পশ্চিমবঙ্গের শ্রমমন্ত্রী শ্রী মলয় ঘটক সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, কাজের সন্ধানে যত মানুষ এই রাজ্য থেকে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেন, তার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ কাজের সন্ধানে ভিন রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসন ঘটিয়ে থাকেন। কথাটি নির্জলা মিথ্যা। এটা ঘটনা যে, একটা সময় পর্যন্ত এ-রাজ্য থেকে যত মানুষ কাজের সন্ধানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতেন তার থেকে বেশি মানুষ এ-রাজ্যে এসে জুটতেন কাজের সন্ধানে। সেই ছবিটি বদলে গেছে বামফ্রন্ট শাসনের শেষ দিকেই। রাজ্যের অভিবাসন চিত্রটি কী রকম। সেন্সাস তথ্য অনুয়ায়ী ১৯৫১ থেকে ১৯৯১ সালের সময়সীমায় এই রাজ্যে দশকওয়াড়ি হিসাবে নিট অভিবাসন ছিল ধনাত্মক— যত মানুষ ও রাজ্য ছেড়ে চলে গেছেন তার চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ এই রাজ্যে অভিবাসন ঘটিয়েছেন। এই প্রবণতায় ছেদ ঘটে বামফ্রন্ট শাসনের শেষ দশকে। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে এই রাজ্যের অভিবাসন ছবিটি বদলে গেছে। সেন্সাস তথ্য অনুযায়ী, এই দশকে এই রাজ্যে অন্য রাজ্য থেকে অভিবাসন করতে আসা মানুষের সংখ্যা ছিল ৭,২৯,৭০২ জন। অন্য দেশ থেকে এই রাজ্যে অভিবাসন হয় ১,৮৩,৩১০ জনের। এই দশকে এ-রাজ্য ছেড়ে ভিন রাজ্যে বা ভিন্ন দেশে পাড়ি দেন ১০,১১,৩৪০ জন। হিসেবে দেখা যাচ্ছে এই রাজ্যে ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে নিট অভিবাসন ছিল ঋণাত্মক (— মাইনাস) ৯৮৩২৮ জন। রাজ্যটি অন্য রাজ্য থেকে বেশি মানুষ টেনে নেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছিল, এ-রাজ্য থেকে বেশি মানুষ চলে যাচ্ছিল অন্য রাজ্য বা অন্য দেশে।
এ-রাজ্যে তৃণমূল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে। ২০২১-এর সেন্সাস তথ্য থেকে এক দশকের তৃণমূল শাসনে এই রাজ্যের অভিবাসন চিত্রটিতে কতটা বদল এসেছে সে সংক্রান্ত সেন্সাস তথ্য পাওয়ার কথা ছিল। সেই তথ্য নেই। কারণ ২০২১ সালের নির্ধারিত সেন্সাস এখনও করা হয়নি। সুতরাং করা যেতে পারে কিছু অনুমানসিদ্ধ ধারণা। ২০১৮ সালে এই রাজ্যের জনসংখ্যার আনুমানিক অঙ্ক থেকে এই রাজ্যের নিট অভিবাসনের সাম্প্রতিক ছবিটি কেমন, সেটা আন্দাজ করা হয়েছে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে। গবেষণাপত্রটির নাম ‘Migrants Workers from West Bengal since 1991: From the Left to TMC Government’। লেখক অভিজিৎ মিস্ত্রি। গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ইকনমিক ও পলিটিক্যাল উইকলি-তে (জুলাই ১৭,২০২১)। লেখকের হিসাবে ২০১৮ সালে এ-রাজ্যের আনুমানিক জনসংখ্যা ছিল ৯৬২৯৭০০০ জন। ২০১১-র সেন্সাস অনুযায়ী সে-সময় পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ছিল ৮০১৭৬১৯৭ জন। মধ্যবর্তী সময়ে এ-রাজ্যে যত জন্ম হয়েছে এবং মৃত্যু ঘটেছে, সেটার হিসাবে নিয়ে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যটির স্বাভাবিক জনসংখ্যা যা হওয়ার কথা ছিল বাস্তবে হয়েছে তার চেয়ে কম। কম হওয়ার কারণ ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যত মানুষ ভিন রাজ্য বা ভিন দেশ থেকে এই রাজ্যে বসবাস করতে এসেছেন তার থেকে বেশি সংখ্যার মানুষ রাজ্যটি ত্যাগ করেছেন। নিট অভিবাসন মাইনাস (-) ১১০৭০৬৮। আগেই দেখেছি ২০০১ থেকে ২০১১র সময়সীমায় অর্থাৎ এই শতাব্দির প্রথম দশকে রাজ্যে নিট অভিবাসন ছিল মাইনাস (-) ৯৮৩২৮ জন। শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের প্রথম সাত বছরে অর্থাৎ তৃণমূল শাসনের প্রথম সাত বছরে এই সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক মাইনাস (-) ১১০৭০৬৮ জন। যে-প্রবণতা দেখা দিয়েছিল বাম শাসনের শেষ দশকে সেই প্রবণতা তীব্রতর হয়েছে তৃণমূল শাসনে। শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক কথাটি অস্বীকার করছেন। কিন্তু তাঁর এই অস্বীকৃতির পিছনে তথ্য কোথায়, সে-প্রশ্ন থেকেই যায়। উল্টোদিকে, প্রকাশিত সব তথ্যই এ-কথা প্রমাণ করে যে, বাম শাসনের শেষ দিক থেকেই এ-রাজ্যে নিট অভিবাসন হয়ে পড়ছিল ঋণাত্মক।
অন্য রাজ্য বা অন্য দেশে পাড়ি দিলেই অভিবাসী পরিবারটি জীবিকার জন্য স্থানান্তরিত হয়েছেন একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবে সেন্সাস তথ্য বলছে, দশকওয়াড়ি অভিবাসনে এ-রাজ্য ত্যাগ করে যাওয়ার যে-প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ জীবিকা। জীবিকা নেই বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে, পরিচ্ছন্ন জীবিকা নেই। শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হচ্ছেন রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে। এই বাধ্যতা কতটা তীব্র সেন্সাসে তা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। সেন্সাস তথ্যে সেই হিসেব থাকে না যা থেকে সেই মানুষদের খোঁজ পাওয়া যায় যারা কয়েক মাস কাজ করতে যান হরিয়ানা বা কর্ণাটকে। আর বাকি মাসগুলি পশ্চিমবঙ্গেই থাকেন। এরা পরিযায়ী শ্রমিক। এদের সংখ্যা কত কেউ জানে না। অনুমান করা হয়, পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ২০ লক্ষ শ্রমজীবী কাজের সন্ধানে দেশান্তরে যেতে বাধ্য হন।
নিয়োগ সৃষ্টির ক্ষমতা কমছে পশ্চিমবঙ্গে। কেন এটা ঘটছে অভিজিৎ মিস্ত্রি লিখিত পূর্বোল্লেখিত প্রবন্ধে তার একটা কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। এ-রাজ্যে কাজের ক্ষেত্রগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট কাজ, শিল্প (ম্যানুফ্যাকচারিং এবং নির্মাণ), এবং সেবামূলক কাজ। পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র সেবাপণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে নিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। কৃষি ও শিল্পে এই প্রবণতা ঋণাত্মক। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রগুলিতে আয়বৃদ্ধি আর নিয়োগবৃদ্ধি ঘটাতে পারছে না। বরং, আয়বৃদ্ধি নিয়োগ সংকোচন ঘটাচ্ছে। এই প্রবণতা এই শতকের দ্বিতীয় দশকেই অর্থাৎ তৃণমূল শাসনকালেই দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য বর্ণনা করা হয়েছে এই প্রবন্ধের সারণি ৫-এ।
নিয়োগের স্থিতিস্থাপকতা মাপা হয়েছে উৎপাদনের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচার করে। অর্থাৎ নিয়োগ বৃদ্ধি বা হ্রাসের শতকরা হার/উৎপাদন বৃদ্ধির শতকরা হার। বাড়তি উৎপাদনের জন্য সাধারণভাবে প্রয়োজন হয় বাড়তি নিয়োগের। তথ্য অনুসারে, এ-রাজ্যের পরিস্থিতি ভিন্নতর। উৎপাদন বাড়লে কৃষি ও শিল্প উভয়ক্ষেত্রেই নিয়োগ কমছে। এর অর্থ হল, যে-পরিমাণে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে নিয়োগ সেই পরিমাণে বাড়ছে না কিংবা পিছিয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা শুধু বড়ো উদ্যোক্ষেত্রগুলিতেই দেখা দিয়েছে এমন নয়, কৃষির মতো শ্রমঘন উৎপাদন ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তির বিকাশ এ-ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে সেটা আমরা জানি। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশ একই সঙ্গে নতুন নতু্ন কাজের সম্ভাবনাও বাড়ায়। পশ্চিমবঙ্গে এই জিনিসটা ঘটছে না। নতুন নতুন নিয়োগ ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। এর অবশ্যম্ভাবী ফল কর্মহানি। এ-রাজ্যে সেটাই ঘটছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎকৃষ্ট কাজের বিকাশ নেই। পড়ে রয়েছে কিছু অপকৃষ্ট কাজ। যারা একটু স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজ করেন তাঁদেরকে এই রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র জীবিকার সন্ধান করতে হচ্ছে। এই সমস্যা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের কাঠামোগত সমস্যা। এ-সমস্যা মোকাবিলার কোনো দিশা দেখা যাচ্ছে না রাজ্য সরকারের তরফ থেকে।
পশ্চিমবঙ্গের কৃষি
এ-রাজ্যে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি ছিল কৃষি বাম আমলে যেটিকে আরও মজবুত করা হয়েছিল। তৃণমূল শাসনে এই রাজ্যের কৃষি অর্থনীতি নড়বড়ে হয়ে গেছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা বড়ো অংশ গ্রাম বাংলার কৃষি মজুর, গ্রামে যাদের জীবিকার অভাব দেখা দিয়েছে তীব্রভাবে। রাজ্য সরকার এই বাস্তবতা স্বীকার করতে চান না। এ-রাজ্যে আর কৃষক আত্মহত্যা নেই। কারণ দিদি ওটা চান না। নরেন্দ্র মোদি পাঁচ বছরে কৃষকের আয় দ্বিগুণ করেন। মমতা ব্যানার্জি সেটা করে ফেলেন চার বছরে। দাদার কাছে তথ্য চাওয়া যায় না। কারণ তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করেন না। দিদির কাছে তথ্য চাইলে তিনি অসংলগ্ন প্রলাপ বকেন।
প্রলাপ বকলে যাদের চলে না সেরকম এক সংস্থা হল নাবার্ড। সম্প্রতি প্রকাশিত নাবার্ডের তথ্য অনুসারে এ-রাজ্যের কৃষিজীবী পরিবারের মাসিক গড় আয় ৭৭৫৬ টাকা। অর্থাৎ বছরে পারিবারিক গড় আয় ৯৩,০৭২ টাকা। ২০১৮ সালের জুন মাসে মমতা ব্যানার্জি লিখিতভাবে দাবি করেছিলেন যে, তখনই এ-রাজ্যের কৃষিজীবী পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ছিল ২,৯২,০০০ টাকা। এখন অর্থাৎ নাবার্ডের রিপোর্ট যখন প্রকাশ পাচ্ছে তখন রাজ্য সরকারের মতে, এ-রাজ্যে কৃষিজীবি পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ৩ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ মাসে ২৫ হাজার টাকা। নাবার্ডের তথ্য ক্ষেত্রসমীক্ষা ভিত্তিক। তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ নেই। তৃণমূল সরকারের বক্তব্যের তথ্যভিত্তি কী, কেন তাদের তথ্যের সঙ্গে নাবার্ডের তথ্যের এত ফারাক, তার উত্তর নেই। নাবার্ডের রিপোর্টটির নাম হল ‘Framers’ Welfare :An Analysis Across States’। রিপোর্ট অনুসারে কৃষিজীবি পরিবারের মাসিক আয়ের নিরিখে দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ২২ তম। শীর্ষস্থানে থাকা পাঞ্জাবের কৃষিজীবি পরিবারের মাসিক আয় গড়ে ২৩ হাজার ১৩৩ টাকা। পাঞ্জাবের একজন গড় কৃষিজীবি পরিবার পশ্চিমবঙ্গের গড় কৃষিজীবি পরিবারের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি সমৃদ্ধ। ‘এগিয়ে বাংলা’ সম্ভবত এ-সব-তথ্যের ধার ধারে না। গ্রামে যারা বাস করেন, কৃষি যাদের আয়ের মূল উৎস নয়, কেমন আয় করেন সেই সব পরিবারেরা? নাবার্ডের তথ্য অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গে অকৃষিজীবি পরিবারের মাসিক গড় আয় ৬৩৮৩ টাকা। কেরলে এই ধরনের পরিবারের গড় মাসিক আয় ১৪,৮৬৩ টাকা। কোনো নিরিখেই গ্রাম বাংলা এগিয়ে নেই। বস্তুত নাবার্ডের ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে আন্দাজ করা যায়, কেন এই রাজ্য ছেড়ে এত বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। প্রত্যাশিত আয় বেশি। ভিন দেশে যাওয়ার যাবতীয় ঝুঁকি নিয়েও তাই এ-রাজ্যের শ্রমজীবী মানুষ অন্য রাজ্যে জীবিকা খুঁজছেন। রাজ্য সরকার শোনাচ্ছেন ৩ লক্ষ টাকা আয়ের গল্প। সে-গল্পে কর্ণপাত করার সময় নেই রাজ্যবাসীর।
উপসংহার
এ-রাজ্যে কৃষি সংকট জর্জর। মাইক্রোফিনান্সের নামে একদল সংগঠিত কুসিদজীবী গ্রাম বাংলাকে লুঠ করতে নেমেছে। গড়পড়তা কৃষকের আছে বিপুল কৃষি ঋণ। এই কৃষি ঋণ যতটা না প্রাতিষ্ঠানিক, তার চেয়ে অনেক বেশি সেটা অপ্রাতিষ্ঠানিক। বাম আমলে গ্রামীণ সমবায়সহ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ বণ্টনের জন্য যে সব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল এই রাজ্যে, সেগুলির অস্তিত্ব বিপন্ন। গ্রামাঞ্চলে বেড়ে চলেছে মহাজনী ঋণের দাপট। এর পরেও উৎপাদনের যা কিছু উপকরণ সেচ, সার, বীজ, কীটনাশক— সবকিছুরই খরচ ঊর্ধ্বমুখী। চাষ করার জন্য ক্ষুদ্র কৃষককে (তারাই সুবিপুল সংখ্যাগুরু) নিতে হবে মহাজনী ঋণ যেখানে সুদের হার চড়া। অন্যদিকে ফসল বিক্রি করে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। ফলত, দারিদ্র্যের তীব্রতা বাড়ছে গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এই রকম যে, শিল্পক্ষেত্রে নিয়োগের স্থিতিস্থাপকতা ইতিমধ্যেই ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে— নতুন কাজ জোটাবার ক্ষমতা হারিয়েছে শিল্প, পুরোনো কাজকেও তা ধরে রাখতে পারছে না। কিছু কাজ আসছে পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে। সেগুলিতে মজুরি কম। কাজের সুযোগও কম। তৃণমূল সরকার বিষয়টির গভীরে গিয়ে অনুসন্ধানের তাগিদ অনুভব করে না। বরং তথ্যে কারচুপি করে ‘এগিয়ে বাংলা’র ড্রাম বাজিয়ে সমস্যাটি চাপা দিতে চেষ্টা করছে। কবে এদের বোধোদয় হবে, এই ভরসায় বসে থাকলে রাজ্যটি আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনীতির পরিসরে এ-বিষয়টিকে আলোচনায় আনার দরকার আছে। এই আলোচনা আসলে পশ্চিমবঙ্গের কর্মসংস্থানের সমস্যা নিয়ে প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য উত্থাপিত প্রশ্নগুলির মোকাবিলা করা দরকার। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রণীত উন্নয়নের মডেলটিকে একটি সুস্থ বিতর্কের মধ্যে আনা দরকার। সেটা করার মতো সৎসাহস তৃণমূল নেত্রীর কখনও ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিরোধী এক রাজনীতির পালে হাওয়া তুলে নয়া-উদারবাদ বিরোধিতার ভগীরথ হিসাবে ক্ষমতায় আসবেন। ক্ষমতায় তিনি এসেছেন। কিন্তু যে-সমস্যাগুলির নিরসন চেয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সেগুলি পাশ কাটিয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার হাতে নিজেকে সমর্পণ করে তিনি ক্ষমতার স্বাদ অনুভবের চেষ্টা করছেন। এই স্বতঃস্ফূর্ততা অর্থনীতিকে যেখানে নিয়ে যেতে পারে সেটাই ঘটেছে। আর সে-কারণেই রাজ্যটির এই চেহারা দাঁড়িয়েছে। এ-শাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা ছিল না। তবুও যে তা হয়েছে তার কারণ তৃণমূল রাজত্বে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা অর্থনীতিটি এমন কিছু সামাজিক উপাদানকে শক্তিশালী করেছে যা শাসক দল হিসাবে তৃণমূল কংগ্রসকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা অর্থনীতি মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ঘটিয়েছে। সুতরাং বেড়েছে সরকার মুখাপেক্ষী ডোল রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা। তৃণমূল এটিকে সযত্নে কাজে লাগিয়েছে। রাজ্যের অর্থনীতিকে রিলিফ নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করেছে এই সরকার। স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা আবার একই সঙ্গে এনে দিয়েছে অতিরিক্ত আয়ের এমন কিছু উৎস যেগুলি সমাজনিন্দিত, আইনের চোখে যা গর্হিত, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে সব কাজ স্বচ্ছন্দে করা যায়। তৃণমূল শাসন টিকে থাকতে চায় এই ক্ষমতাচক্রে সামাজিক ন্যায্যতা নির্মাণ করে এবং রিলিফের রাজনীতিকে সর্বজনীন রাজনীতি করে তুলে।
প্রকাশের তারিখ: ২১-মার্চ-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay







