|
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব- ৬)আর বি মোরে |
আমাদের স্কুলে আমি সবরকম পড়াশোনাই করতে পারতাম, সকলের চেয়ে খানিক দূরে বসে, স্বচ্ছন্দে। কিন্তু আঁকা ও শারীরশিক্ষার ক্লাসে সকলকে একসঙ্গেই বসতে হত। এটাকে এড়াতে, শিক্ষকেরা আমাকে এই ক্লাসগুলো করবার অনুমতি দিত না। স্বাভাবিকভাবেই, এই পিরিয়ডগুলি চলবার সময়ে কিম্বা মধ্যাহ্নের বিরতিতে আমি শহরের দিকে চলে যেতাম ঘুরতে ঘুরতে, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় মজে যেতাম, চেনাজানা কেউ বেরিয়ে যায় কি-না তা খুঁজে দেখবার আগ্রহ ছিল পরম। |
[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ। ব্রাহ্মণ, গুজর আর কায়স্থ ছাড়া অন্য কোনও জাতের ছাত্র ওই স্কুলে পড়তে যেত না যখন আমি যাওয়া শুরু করি। হিন্দুদের মধ্যে মারাঠা বা অন্য জাতের একখানা ছাত্রও ছিল না। কোনও মুসলিমও ছিল না। আমার পরে দুই মুসলিম ছাত্র ভর্তি হয়, তারও পরে এক মারাঠি ছাত্র। এ থেকে কেউ সহজেই আন্দাজ করতে পারবে পড়াশোনার উপর ব্রাহ্মণ, গুজর আর কায়স্থদের কেমন একচেটিয়া আধিপত্য ছিল! স্কুলের মধ্যেও অস্পৃশ্যতার অনুশীলন হত পুরোদস্তুর। শিক্ষকেরাও আমাকে ছুঁত না, তাদের দেখাদেখি অন্য কোনও ছাত্রও ছুঁত না আমায়। ধারাপ নামের এক শিক্ষক প্রায়শই বলত, “আমি বেঁচে থাকতে কোনও দিন তোকে ছোঁব না।” আমার পোশাক বাকিদের তুলনায় বেশি ভালো না-হলেও, মন্দও ছিল না। সত্যি বলতে, আমার মধ্যে হীনতার কোনও ভাবই ছিল না। আমি বাকিদের তুলনায় কোনও ভাবেই এমন নিকৃষ্টতর ছিলাম না যে আমাকে কেউ দূরে সরিয়ে রাখবে বা অসম্মান করবে। তা সত্ত্বেও, চূড়ান্ত ঘৃণাই ছিল আমার একমাত্র প্রাপ্তি। উঁচু শ্রেণি আর জাতের মানুষদের প্রতি স্বভাবতই আমার ঘৃণাবোধ জন্ম নেয়। আমার আসা-যাওয়ার পথে কেউ যদি আমায় খেঁকিয়ে বলত ‘দূর হ আমার থেকে’, আমি পালটা জবাব দিতাম, ‘নিজে দূর হও।’ মাহাদের স্কুলে ভর্তি হবার আগে অবধি আমি লাডাওয়ালির বাসিন্দা ছিলাম। স্কুলে ভর্তির পরেও আমি সেখানেই থেকে গেলাম। রোজ যাতায়াত করতাম লাডাওয়ালি থেকে। পায়ে হাঁটা পথে স্কুল ছিল মাত্র এক দুই মাইল দূরে। মাহার সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য উঁচু জাতের ছলাকলার নানান কৌশলের গল্পকথা প্রচারিত ছিল। সব মাহারই তাই সন্ত্রস্ত আর সন্দিহান থাকত। মাহাদের স্কুলে যখন আমি ভর্তি হই, মা গোড়াতেই আমাকে সতর্ক করে দেয়। “কারো দেওয়া কুটোটি অবধি খাবি না। ওদের জলস্পর্শ-ও করবি না।” এমনকি মা এ-ও বলে, “পান দিলেও মুখে পুরবি না। ওর মধ্যেও কিছু মিশিয়ে খুন করে দিতে পারে ওরা তোকে।” আমাদের ক্লাস শুরু হত সকাল দশটা বা এগারোটায়। শেষ হতে হতে সেই সন্ধ্যে পাঁচটা। সকালে নাস্তা করে ঘর থেকে বেরিয়ে ফের বাড়ি ফেরা ইস্তক, আমি বাইরে কণামাত্র খাবারও ছুঁতাম না। মাহাদের বাজারে যে মাহারেরা লকড়ি নিয়ে আসত, আমি এক দঙ্গল ব্রাহ্মণের সঙ্গে একই স্কুলে পড়ি জেনে অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে পড়ে। আমার কিছু আত্মীয় বাজারে এলে রাস্তায় আমায় থামিয়ে আমার কুশল জানত, কখনও সখনও আমায় গালে মাথায় চুমো খেয়ে আদরও করত। এইসব দেখে পথচলতি বাকি মধ্যবিত্তরা নাক সিঁটকোত। আমার সদাশয় আত্মীয়দের এ জাতীয় আচরণ নিয়ে, ওদের কাঠখোট্টা চেহারা নিয়ে তারা তামাশা করত। আমি যখন দেখতাম আমার সরলমতি নিকটাত্মীয়দের এরূপ অভদ্রতা আর ঘৃণার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, আমার মন ভীষণ ভেঙে যেত। যারপরনাই রাগ হত। ছাম্ভার দুর্গের পাশে রায়গড় উপত্যকার এক ছোট্ট শহর হল মাহাদ। দুটো নদী শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সাবিত্রী আর গান্ধারী। জোয়ারের সময় দুই নদীতেই সমুদ্রের নোনা জল ঢোকে। ফলে, পানের যোগ্য জল কোনও নদীতেই ছিল না। নানান উঁচু জাতের বেশ কিছু ধনী পরিবারের মালিকানায় কয়েকখানা কুয়ো ছিল শহরে। সেই কুয়োর জলই ব্যবহার করত তারা। এই কুয়োর জল যারা পেত না, সেই নগরবাসী আর বহিরাগতদের ছাভদার হ্রদের জল ব্যবহার করতে হত। শ্যাওলাপচা গাঢ় সবুজ দুর্গন্ধময় সেই জল পরিস্রুত না-করে পানের উপায় ছিল না। পুরসভা ছাভদার বাঁধের জল এক হান্ডা পিছু এক পয়সা দামে বিক্রি করত শহরের দোকানদারদের। তাই বাজারের দোকানিদের পানীয় জলের সমস্যাটা মিটে যেত। মূল সমস্যার ভুক্তভোগী ছিল সেই গরিব মানুষগুলো যারা দূরদূরান্ত থেকে আসত বাজারে কোনও কাজে। তাদের মধ্যে মাহার ছাড়া বাকি সকলেই নিজেদের তেষ্টা মেটাতে পারত হয় দোকানদারদের কাছে জল চেয়ে খেয়ে কিম্বা মাহাদ হ্রদ থেকে। মাহারদের এ প্রশ্নে অবস্থা ছিল করুণাজনক। আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত সঙ্গতিশীল পথিকেরাও যখন মাহারদের অচ্ছুৎ বলে জলটুকু দিত না তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে। রায়গড় উপত্যকাবাসী যখন মাহাদে আসত, তেষ্টায় ছাতি ফেটে গেলেও সেই দূরের লাডাওয়ালি বা কিঞ্জোলির নদী ছাড়া মাহাদে কোথাও পানীয় জল পেত না। পিঠভর্তি জ্বালানি কাঠ চাপিয়ে আসা এই মানুষগুলি ছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত সেনারাও মাহাদে আসত। কড়া রোদে অফিসের বাইরে তাদের লাইনে দাঁড়াতে হত পেনসনের জন্য। তাদের মধ্যে জমাদার আর হাবলদার গোছের পদস্থ লোকেও ছিল। এরা শিক্ষিত। পোশাকও গুছিয়ে পরত। তবু বাজারের কোথাও পানীয় জলটুকুও তাদের নাগালের মধ্যে ছিল না। আমাদের স্কুলে আমি সবরকম পড়াশোনাই করতে পারতাম, সকলের চেয়ে খানিক দূরে বসে, স্বচ্ছন্দে। কিন্তু আঁকা ও শারীরশিক্ষার ক্লাসে সকলকে একসঙ্গেই বসতে হত। এটাকে এড়াতে, শিক্ষকেরা আমাকে এই ক্লাসগুলো করবার অনুমতি দিত না। স্বাভাবিকভাবেই, এই পিরিয়ডগুলি চলবার সময়ে কিম্বা মধ্যাহ্নের বিরতিতে আমি শহরের দিকে চলে যেতাম ঘুরতে ঘুরতে, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় মজে যেতাম, চেনাজানা কেউ বেরিয়ে যায় কি-না তা খুঁজে দেখবার আগ্রহ ছিল পরম। গো-শকট রাখা থাকত যেখানে, সেখানে একখানা চায়ের দোকান খুলবার ভাবনা এই থেকেই মাথায় এল। যাতে পানীয় জলের অভাবের সমস্যাটিও একই সঙ্গে মিটিয়ে ফেলা যায়। যেমন ভাবা তেমন কাজ। মাহাদের মাহার পাড়ায় (ওয়াদা)তে এক বৈঠকের ইন্তেজাম করলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের মাথায় এই ভাবনাটা ঢোকাতে। মাহাদ প্রদেশের বিবিধ গ্রামের মাহার জনগণ সেদিনের আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত হল ওয়াগন ইয়ার্ডের কাছের মাঠে একটা চা-দোকান খোলা হবে। শর্ত চাপানো হল যে চা-দোকানিকে মুফতে আমাদের জল খেতে দিতে হবে। সেই মতনই, মোহোপ্রেকার নামের এক অবসরপ্রাপ্ত ভদ্রলোক প্রথম চা-দোকানটি খোলেন। দোকানে দু-খানা বড়ো বড়ো জলের কলসি লাগানো ছিল। এক পয়সায় এক কাপ চা পাওয়া যেত। আর সঙ্গে ছিল জলের বন্দোবস্ত। মানুষ সেখানে জলতেষ্টাও মেটাতে পারত আর দোকানদারও দু- পয়সা কামাতে পারত। আমি যদিও যতবার ইচ্ছে চা খেতে পারতাম, পয়সা ছাড়াই। যেন আমিই ছিলাম দোকানের মালিক! দোকানদারকে জল কিনে রাখতে হত। যদিও অনেক বেশি খরিদ্দার জড়ো হবার দরুণ খরচা ওর পুষিয়ে যাচ্ছিল। যখন লোকে জানতে পারল সবার পানীয় জলের সংকট মেটাতে একখানা খাবার হোটেল চালুর উদ্যোগের পিছনে আমার অগ্রণী ভূমিকা বর্তমান, তখন সকলে আমায় শ্রদ্ধার নজরে দেখতে আরম্ভ করে। হোটেলে বসে আমি অন্যের জন্যে খুচখাচ নানান কাজে মেতে থাকতাম: কারো চিঠি লিখে দেওয়া, কারো জামিনের আবেদন লিখে দেওয়া, অন্যান্য নানান সরকারি চিঠিচাপাটি লেখা ইত্যাদি। যখন আমি স্কুলে আসি প্রথম আমাদের জন্যে বাজারে দাঁড়াবার জায়গাটুকু ছিল না; হোটেলটা হয়ে এখন সকলের বসবার জায়গা হয়েছে, নিত্যনতুন সংযোগ স্থাপন বা রোজনামচার সমস্যাদি নিয়ে আলাপ আলোচনা চালাবার সুযোগ ঘটছে। বকলমে এই যেন আমাদের অফিস। বর্ষা এলে পরে, ওয়াগন ইয়ার্ডের সব দোকান, স্টল বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের ছোট্ট চা-দোকানটিও বন্ধ পড়ে রইল। বর্ষাকাল ফুরালে, মোহোপ্রেকার জোশী ব্রিজের গা ঘেঁষে পুরোনো বাজারের মধ্যে পুরসভার বাজারের কাছেই একটা জায়গা ভাড়া নিয়ে সেখানে চা দোকান খোলে। যেহেতু জায়গাটা বাজারের ঠিক মাঝেই, কিছু গোঁড়া বর্ণহিন্দু ঝামেলা-ফ্যাসাদ বাঁধাতে চাইল। কিন্তু ইতিমধ্যেই, ওয়াগন ইয়ার্ডের হোটেলের কারণে আমাদের লোকজনও সংগঠিত হয়ে গিয়েছে। অন্যান্য দোকানদার ঝঞ্ঝাট চালু করতে চাইলেও তা ধোপে টিকল না। আমাদের প্রতিপক্ষরা এখন কেবল বিলাপ করতে লাগল, ‘ঘোর কলি! ঘোর কলি!’, ‘মাহারদের বড্ড বাড় বেড়েছে!’ ধীরে ধীরে তাদের কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে গেল। এটা কোনও ছোটখাটো ব্যাপার না। আমি স্কুলে ভর্তি হবার এক বচ্ছরকালের মধ্যে আমাদের লোকেদের জন্যে ভরা বাজারে একখানা হোটেল চালু করা গিয়েছিল। আমার মাহাদের স্কুলে ভর্তি হওয়া ও মাহাদে একটা হোটেল চালুর মাধ্যমে সীমিত আকারে পানীয় জলের সংকুলান করতে পারবার এক স্থায়ী বন্দোবস্ত করতে পারা- দুইখানা বিষয়ই ছিল অস্পৃশ্যতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উভয়ক্ষেত্রেই, মাহাদের ঐতিহ্যপ্রিয় অতি-রক্ষণশীলদের দেমাকে চোট লেগেছে। সাধারণ বর্ণহিন্দুদের মান্ধাতার আমলের কুসংস্কারের প্রতিও খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া গিয়েছে। মাহাদে আমার স্কুলে যাওয়াটা অন্তত মাহাদের মধ্যে অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনে এক যুগান্তকারী সাফল্য ছিল। মাহাদে আমার কিছু সহপাঠী, দু-একজন শিক্ষক আমার ছোঁয়াছুঁয়িকে ঘৃণার চোখে দেখতেন না। বাজারেও এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা মনে করতেন না যে আমি অপবিত্র কেউ। অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ প্রকাশের তারিখ: ৩০-মার্চ-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |