সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব- ৫)
আর বি মোরে
পরে জানতে পারি ওঁদের একজন ছিলেন মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত নাট্যকার যশবন্ত নারায়ণ টিপনিস। আরেকজন ঠিক কে ছিলেন আমি বহু সন্ধানেও জেনে উঠতে পারিনি। উনি সম্ভবত ছিলেন গোবিন্দ গোপাল টিপনিস বা অনন্ত বিনায়ক চিত্রে। যে ভিকোবাকে আমি গোন্ডালেরে বাগানে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, তিনিই ছিলেন কৃষিবিশেষজ্ঞ আর প্রখ্যাত শিল্পী ভিকোবা যিনি মাহাদের প্রথম ঐতিহাসিক কৃষি সম্মেলন সংগঠিত করেন। আমি যখন জানতে পারি, তখন ওঁর মহত্বের খানিক নাগাল পাই। আমার জানাবোঝায় উনি মহারাষ্ট্রের প্রথম সমাজসংস্কারক যিনি নিজের জাতের বাইরে অন্য কাউকে বিয়ে করেন।

[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ।
প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে।
কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ]
চতুর্থ পর্বের পর...
বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেছে। বর্ষাকালে, ইরলা বা ঝুড়িমাথা কোট মেয়েদের জন্যে বোনা হত আর ছেলেরা পড়ত টোপা বা টুপি।৫ আমার মামা আমার জন্যে একটা টুপি বানিয়ে দেয়। আমি সেটা মাথায় পরে গরু চড়াতে মাঠে যাওয়া শুরু করি। বৃষ্টির তোড়ে ডোবা খানাখন্দ ভরে উঠত। জলের নিম্নগামী ধারা নদী ছুঁত। খাঁড়িগুলোও ভরে উঠত টইটম্বুর। নদী উপচে পড়ত যখন, মাছেরা উজানে এসে মাঠের ভিতরে ছড়িয়ে গিয়ে ডিম পাড়ত। ওয়ালগানের মাছ হিসাবে এরা পরিচিত ছিল। গাঁয়ের ছেলে-ছোকড়ারা ওয়ালগানের মাছ ধরতে জান বাজি রাখত। এই মাছগুলি আসলে অত্যন্ত সুস্বাদু ও বিরল। মানুষ যখন খেয়াল করত ওয়ালগান শুরু হয়ে গিয়েছে, মাছ ধরতে রাতবিরেতেও তারা বেরিয়ে পড়ত লাঠিসোঁটা, রড, জাল নিয়ে। লাডাওয়ালিতে ফি বচ্ছর দেখা মিলত এদের। আমার মামা আগে ওয়ালগানের রান্না করা মাছ আর ভাকারি বাজরা নিয়ে আসত দাশগাঁওতে। সে-বছর আমরা নিজেরা যেহেতু লাডাওয়ালিতে ছিলাম তাই ওয়ালগানের মাছ ভরপেট খাবার সুযোগ হয়েছিল ইচ্ছেমতন। মামাতো ভাইবোনেদের সঙ্গে সেই বর্ষায় জলে ঢাকা মাঠেঘাটে কাঁকড়া, ঝিনুক, মাছ ধরতাম অবিরাম। খামারবাড়ির কাছাকাছি ছোটখাটো ফরমায়েশও আমি খাটতাম।
নাগপঞ্চমী উৎসব শুরু হবার আগে ধানের বীজ বণ্টন আর নাগলি আর ওয়ারি বপনের কাজ সম্পন্ন হয়ে যেত। তারপর থেকে প্রতি রাতে গৌরীর খাতিরে নাচ-গানের পরব চলত। আমি নিজে নাচে গানে মত্ত থাকতাম পুরোদস্তুর। আমি গল্প বলা আর আমাদের নিজস্ব লোকপুরাণের বই থেকে পড়ে শোনাতে ওস্তাদ ছিলাম। লাডাওয়ালিবাসীরা আমায় মাথায় করে রাখত তাই। আমার মামাবাড়ির পাড়ার লোকেদের বাড়ি বাড়ি আমার নেমতন্ন থাকত রোজ। সব বাড়িতেই আমার জ্যাঠা, মাসি, ঠাকুমা ছিল কোনও-না-কোনও। আদরে-সোহাগে বর্ষাকাল কীভাবে যে কেটে গেল বুঝেই উঠতে পারলাম না।
তারপর এল গরম কাল। গরমের সময়ে নদীতে স্নান করতে যেতাম দল বেঁধে। নদীর পাশেই ছিল ভিকোবা-র৬ কুয়ো আর জমিজিরাৎ। আমি অন্যান্য বাচ্চাকাচ্চার সঙ্গে ওখানে মাঝেমধ্যে যেতাম লুকিয়ে আম পাড়তে আর ফুল কুড়োতে। ভিকোবাকে সব্বাই ভয় পেত। স্বভাবে কড়াপ্রকৃতির ভিকোবা এমনিতে স্নেহপরায়ণ ছিলেন। একদিন, আমি যখন বালিতে ভেজা কাপড় মেলে শুকোচ্ছিলাম রোদে বসে, উনি আমায় ডেকে জানতে চান আমি কেন স্কুলে যাচ্ছি না। আমি ওঁকে মাহাদের ইংরেজি স্কুল সম্বন্ধে জানাই। বলি যে হেডমাস্টার কী বলেছেন আমায়। ধৈর্যভরে আমার কথা শুনে উনি আমায় যেতে বলেন। এইভাবেই আরও কিছু মাস কেটে গেল খেলেকুঁদে।
পরে একদিন আমায় উনি ডেকে পাঠান। ওঁর ওয়াদাতে তার পরের রোববার যেতে বলেন। সেই মতোই, ওনার নির্দেশ করা সময়ে আমি যাই মাকে সঙ্গে নিয়ে। ওয়াদার বাইরে বসার জায়গায় একখানা পাটিতে বোম্বে থেকে আগত দুই অতিথি বসেছিল। মা আমায় ওয়াদাতে নিয়ে যাবার পরে রেখে দিয়ে ফিরে যায়। আমি সামনেটায় দাঁড়িয়ে থাকি। ভদ্রলোক দুইজন আমায় সামনে ডাকে, এসে পাটিতে বসতে বলে। আমি সেখানে যাই। বসি। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে।
ওঁরা আমায় নানান প্রশ্ন করেন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে। বহু তথ্য জানতে চায়। আমি সবেরই উত্তর দিই পরিপাটি করে। ওঁরা জানান যেহেতু আমি সরকারি বৃত্তি জিতেছি, মাহাদের স্কুল আমায় ভর্তি নিতে বাধ্য। তারপরে ওঁরা আমায় একটুকরো কাগজে কিছু কথা লিখে নিতে বলেন। তা লিখে নিই আমি চট করে। বাড়ি ফিরে সেই লেখাটাই একটা পোস্টকার্ডে পুনরায় পরিচ্ছন্ন করে লিখে ওঁদের দেওয়া এক ঠিকানায় চিঠিটা পাঠিয়ে দিই। একমাসের মধ্যে স্কুল আমাকে ডেকে পাঠায়; পোস্টকার্ডে আমি যে-কথাগুলো লিখি তা এক সংবাদপত্র আমার নামে ছেপে প্রকাশ করেছিল। আমাকে কাগজটা দেখিয়ে প্রশ্ন করা হয়, “এটা তুই লিখেছিস?” আমি বলি, “হ্যাঁ।” স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে হট্টগোল বেঁধে যায়। একজন বলে ওঠে, “কচি ছেলের ফুটানি দেখেছ! স্কুলের গ্রান্ট বন্ধ করার দাবি তুলেছে!” আরেকজন চিল্লিয়ে ওঠে, “একদম একারণেই এদের অচ্ছুৎ করে রাখা দরকার।” কিছু ছাত্র-শিক্ষক আমার দিকে কটমট করে চেয়েছিল। সব কিছুর শেষে, হেডমাস্টার আমায় সোমবার থেকে স্কুলে যেতে বলেন- “আমরা সিদ্ধান্ত করেছি স্কুলের খাতায় তোর নাম ঢুকিয়ে নেব।”
আমি দাশগাঁও ফিরে যাই। একান্তে ভাবি কী কী ঘটল। দাশগাঁওতে আমার শিক্ষক ও অন্যান্যরা এই খবরে পুলকিতচিত্তে আমায় অভিনন্দিত করে। লাডাওয়ালিতে ফিরে আমি ভিকোবাকে ঐকান্তিক ধন্যবাদ জানাই। কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করি ওই দুই ভদ্রলোক কারা ছিলেন। উনি বলেন, “ওঁরা আমার ভাই।” পরে জানতে পারি ওঁদের একজন ছিলেন মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত নাট্যকার যশবন্ত নারায়ণ টিপনিস। আরেকজন ঠিক কে ছিলেন আমি বহু সন্ধানেও জেনে উঠতে পারিনি। উনি সম্ভবত ছিলেন গোবিন্দ গোপাল টিপনিস বা অনন্ত বিনায়ক চিত্রে। যে ভিকোবাকে আমি গোন্ডালেরে বাগানে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, তিনিই ছিলেন কৃষিবিশেষজ্ঞ আর প্রখ্যাত শিল্পী ভিকোবা যিনি মাহাদের প্রথম ঐতিহাসিক কৃষি সম্মেলন সংগঠিত করেন। আমি যখন জানতে পারি, তখন ওঁর মহত্বের খানিক নাগাল পাই। আমার জানাবোঝায় উনি মহারাষ্ট্রের প্রথম সমাজসংস্কারক যিনি নিজের জাতের বাইরে অন্য কাউকে বিয়ে করেন। ১৯০৫ সালে উনি যখন অনুলোম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, চান্দ্রসেনীয় কায়স্থ প্রভু গোষ্ঠীভুক্ত ওঁর জ্ঞাতিরা ওঁকে সমাজচ্যুত করেন। যে-ব্যক্তি আমার স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে এত বিরাট অবদান রাখলেন নিজের জীবনেও উনি ছিলেন আমার আগের প্রজন্মের অন্যতম অগ্রণী সংগ্রামী এক সমাজসংস্কারক। আমার স্কুলে ভর্তিপ্রক্রিয়া ছিল মাহাদের রক্ষণশীল ধর্মান্ধ সমাজের প্রতি প্রথম ছোঁড়া চ্যালেঞ্জ। উল্লেখ করতেই হবে, যে ধারাপ পরিবার আমার স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে চরম আপত্তি তোলে, সেই একই ধারাপ পরিবার আদালতে কেস দায়ের করে চাভদার হ্রদের জল যাতে অচ্ছুৎ জাতের লোকেরা ব্যবহার না-করতে পারে তার দাবি তুলে (এই চাভদার হ্রদেই ১৯২৭ সালে ড. আম্বেদকর সত্যাগ্রহ করেন)।
টীকা-
৫. মাহাদের স্কুলে মোরে’র ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়; ওঁর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তবু বর্ষার অভিজ্ঞতা ওনাকে আপ্লুত করে, অভিভূত করে।
৬. রামচন্দ্র ‘ভিকোবা’ ধোদাপকার ছিলেন স্বনামধন্য লেখক ও জাতপাতবিরোধী সমাজসংস্কারক কেশব সীতারাম ওরফে প্রবোধঙ্কর ঠাকরে’র দাদু। একইসঙ্গে রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট বাল ঠাকরে’র প্রপিতামহও উনি। বাল ঠাকরে ১৯৬৬ সালে শিব সেনা প্রতিষ্ঠা করে তীব্র আঞ্চলিকতাবাদে পুষ্ট এই রাজনীতির মডেল আবার তীব্রভাবেই দলিত, মুসলিম ও দক্ষিণ ভারতীয়দের বিরুদ্ধতা করত।
অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ
প্রকাশের তারিখ: ০৯-মার্চ-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
