সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
গোথা কর্মসূচির সমালোচনা: কমিউনিজম প্রসঙ্গে মার্কসের পাল্টা দলিল
সৌভিক ঘোষ
বহু বিতর্ক, বহু লড়াই সংগ্রামের ফসল হিসাবে কমিউনিস্ট ইশতেহার লেখা হয়েছিল। দর্শন প্রসঙ্গে অতীতের প্রায় সমস্ত ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই মার্কস-এঙ্গেলস’কে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দার্শনিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী নির্মাণ করতে হয়েছিল। এর পরে মার্কস পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল ভিত্তিটুকু উন্মোচিত করার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন, ক্যাপিটাল (পুঁজি) তারই ফলাফল। এর পাশাপাশি বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদী মতবাদকে পরাস্ত করার জন্য তখনও লড়াই চালাতে হচ্ছিল।

১
মার্কস-এঙ্গেলস’র জীবনকালেই জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে দুটি বিবদমান গোষ্ঠী ছিল। প্রথমটি ‘আদাভ’ বা আলজেমিইনের ডয়েটসার আর্বেইতেভেরেইন; বাংলা করলে ‘জার্মান শ্রমিকদের সাধারণ সংঘ’ গোছের কিছু একটা হয়। ১৮৬৩ সালে ফার্দিনান্দ লাসাল্লে এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করেন। আরেক দিকে ছিলেন আইজেনাখ’রা, (জার্মান ভাষায় সোজিয়াল দেমোক্র্যাতিচ আর্বেইতেরপার্তিই, সংক্ষেপে এসডিএপি), এরা কার্ল মার্কস’র অনুসারী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। ১৮৬৯ নাগাদ উইলহেল্ম লিবনেখট ও অগাস্ট বেবেল’র যৌথ উদ্যোগে এসডিএপি’ বা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক ওয়ার্কার্স পার্টির কাজ শুরু হয়। সমাজতন্ত্র কি, কমিউনিজম বলতে কি বোঝায় এ সমস্ত প্রসঙ্গে ঐ দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তর মতান্তর চলে, শেষে রফাসূত্র হিসাবে ‘আদাভ’ গোষ্ঠী জনসাধারণের উদ্দেশ্যে একটি সাধারণ ঘোষণাপত্র প্রকাশের প্রস্তাব জানায়। সে ঘোষণাপত্রটিই ‘গোথা কর্মসুচি’। প্রকাশিত হওয়ার পরে দেখা গেল দলিলের ছত্রে ছত্রে সমাজতন্ত্রের নামে লাসাল্লের কথাবার্তা’কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে!
মার্কস তখন লন্ডনে, রীতিমত অসুস্থ। চিকিৎসকের নির্দেশ এড়িয়েই ‘ক্যাপিটাল’-র ১ম খন্ডের ফরাসী সংস্করণের প্রুফ দেখতে ব্যস্ত। লাসাল্লে ও তার কাজকর্ম সম্পর্কে অনেক আগে থেকেই এঙ্গেলসের সুস্পষ্ট বীতরাগ ছিল, সে কথা সকলেই জানতেন। ঘোষণাপত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বেবেল, লিবনেকখট’রা মার্কস’কে অনুরোধ করলেন ‘গোথা কর্মসূচি’র বয়ান সম্পর্কে দ্রুত মতামত জানান।
অসহ্য ক্লান্তি, তীব্র অনিচ্ছা সত্বেও ‘পার্টির কাজ’ হিসাবে মার্কস পড়ায় মনোযোগী হলেন, শেষ করেই প্রতিক্রিয়া জানালেন। সে প্রতিক্রিয়ার ভাষা এমনই তীব্র ছিল যে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস অবধি (টিপ্পনী, মস্করা ও শ্লেষযোগে বিভিন্ন মন্তব্য করার জন্য মার্কসের চাইতেও তার খ্যাতি ছিল বেশি, আগ্রহীরা ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ মনে রাখবেন) সম্ভবত ঐ একবারই মার্কসের লেখার উপরে কলম চালালেন, যতটা বলা চলে সেটুকুই প্রকাশ করলেন। মার্কসের লেখা সে প্রতিক্রিয়াই ‘গোথা কর্মসূচির সমালোচনা’- কার্যত লাসাল্লের বক্তব্যের পাল্টা দলিল। ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত, অর্থাৎ ২০২৬-এ দেড়শ বছর হল।
২
তৎকালীন জার্মানির পণ্ডিত মহল থেকে শুরু করে শ্রমিক মহল্লা অবধি ফার্দিনান্দ জোহান গোত্তিলেব লাসাল্লে’র যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। ধ্রুপদী সাহিত্য ও দর্শনে পণ্ডিত, তুখোড় বক্তা, আগুনে মেজাজ- জনমানসে কিছুটা নায়কের মতোই বিবেচিত হতেন। এমন পরিচিতির চাপেই সম্ভবত কমিউনিজমের তাত্ত্বিক নির্মাণ’কে যেনতেনপ্রকারেণ সর্বজনগ্রাহ্য, সহজপাঠ্য করার বিষয়ে তার বিশেষ ঝোঁক জন্মায়। ১৮৪০ নাগাদ, কিশোর বয়সে লিপজিগে বসবাসের সময় নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও আমি মানুষের মুক্তির বাণী ঘোষণা করব; ঈশ্বর ও তারায় ভরা আকাশকে সাক্ষী রেখে এই আমার শপথ’। কলেজে পড়ার সময়ই হেগেলের দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন, প্রমিনেন্ট হেগেলিয়ান হিসাবে ফয়েরবাখ ও আর্নল্ড রুগের বিশেষ পছন্দের একজনও হয়ে ওঠেন। ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন শ্রমিক রাজনীতিতে। এমন মানুষকে এঙ্গেলস অপছন্দ করতেন কেন? কাউন্টেস সোফি ভন হ্যাজফেল্ট’র বিবাহবিচ্ছিন্ন হওয়ার মামলায় ‘ব্যক্তির পবিত্র অধিকার ও স্বাধীনতা’ প্রসঙ্গে সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিলেন লাসাল্লে। রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উপযাজক হয়ে জড়িয়ে পড়েন, আইনি জটিলতা বাড়লে গ্রেফতার হন, আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের পক্ষে এক অসাধারণ বক্তৃতাও করেন। দু মাস জেল খাটার পরে মামলা শেষে কাউন্টেস অবশ্য জয়ী হন, পরে জানা যায় সহায়তার কর্তব্যপালনে অভূতপূর্ব ‘সার্ভিস’ যোগানের প্রতিদান হিসাবে লাসাল্লে বেশ গুছিয়েই নিয়েছেন, আর্থিক মূল্যে প্রায় সারা জীবন বসে খাওয়ার বন্দোবস্ত তার পাকা! ঐ মামলা চলাকালীনই তার সঙ্গে মার্কস-এঙ্গেলস’র পরিচয় ঘটে। মার্কস তখন ‘ন্যইয়া রাইনিশে জাইতুং’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে। জনসাধারণের সামনে নিজেকে মুক্তির বিপ্লবী বার্তাবাহক হিসাবে জাহির করতে লাসাল্লের ‘অনর্গল বাচালতা, আড়ম্বর এবং আত্মম্ভরিতা’ ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের চোখ এড়ায়নি, সে তুলনায় মার্কস কিছুটা হলেও নরম ছিলেন।
ঐতিহাসিক পরিহাস প্রসঙ্গে ইতিহাসের চক্রাকার প্রবণতার ব্যাখ্যায় মার্কসের মন্তব্যটি আজও দুনিয়া কাঁপিয়ে দেয়। সেদিন যে কার্ল মার্কস তার প্রতি কিছুটা হলেও সহৃদয় ছিলেন পরে তারই কলমের খোঁচায় লাসাল্লের বাগ্মিতা, পাণ্ডিত্য ও খ্যাতির ধ্বংসপ্রাপ্তি হল। কমিউনিস্ট বিপ্লবের কাজে নাটুকে কায়দায় এগিয়ে চলা ও তার সুবাদে প্রাপ্ত জনপ্রিয়তায় মাথা ঘুরে যাওয়ার আরও একটি ঐতিহাসিক উদাহরণের উল্লেখ সম্ভবত অপ্রাসঙ্গিক হবে না, বরং ইতিহাসের দ্বিতীয়বার ফিরে আসার প্রসঙ্গে মার্কস যেভাবে প্রহসনের উল্লেখ করেছিলেন তাকেই প্রমাণ করবে। লাসাল্লের মতোই জনমোহিতকারী বক্তৃতা দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন লিওঁ ত্রৎস্কি, বহু বিশেষ যোগ্যতা সত্বেও তার মধ্যে সবিশেষ ‘অহংবোধ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও দুর্বার বাচালতা’র মনোভাবটি আরেকজন চিনতে পেরেছিলেন, তার নাম ভি আই লেনিন।
১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কমিউনিস্ট ইশতেহার। লিখেছিলেন মার্কস-এঙ্গেলস দুজনে মিলে। সে দলিলটি সত্বেও আরেকবার ‘গোথা কর্মসূচি’র মতো কিছুর দরকার হল কেন? যাতে সমাজতান্ত্রিকদের মধ্যেকার মতবিরোধ মিটিয়ে নেওয়া যায়, শ্রমিক-মেহনতি জনগণের জন্য সমাজতন্ত্র প্রসঙ্গে কমিউনিস্টদের সাধারণ বক্তব্যকে স্পষ্ট কথায় তুলে ধরা যায়। ১৮৬৪ সালের ২৮ অগাস্ট ড্যুয়েল লড়তে গিয়ে লাসাল্লের পেটে বুলেট লাগে, ৩১ অগাস্ট মৃত্যু হয়। গোথা কর্মসূচির আড়ালে তাকেই পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন ততদিনে ইউরোপের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া লাসাল্লেপন্থীরা। ১৮৭৫-এর এপ্রিলের শেষ অথবা মে মাসের শুরুর দিকে (নথি অনুসারে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না) মার্কস নিজের মতামত লেখার কাজ শেষ করলেও তার বেঁচে থাকাকালীন সেসব প্রকাশিত হয়নি। ১৮৯১ সালে ‘দ্য নিউ জিয়েত’ পত্রিকায় এঙ্গেলসের সম্পাদনা ও ভূমিকা সহ ঐ দলিল প্রথম ছাপা হয়।
৩
মার্কসের উস্মার কারণ ছিল। লাসাল্লের বক্তব্য সাধারণভাবে আকর্ষণীয় হলেও তাতে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে বস্তুবাদী উপলব্ধির ক্ষেত্রে বুনিয়াদী স্তরেই যথেষ্ট ফাঁকি ছিল। একদিকে জার্মান উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ আরেকদিকে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে শুনতে ভালো লাগে এমন কয়েকটি মনগড়া ধারণা, কার্যত এদুয়েরই মিশ্রণ ছিল লাসাল্লের মতবাদ।
বহু বিতর্ক, বহু লড়াই সংগ্রামের ফসল হিসাবে কমিউনিস্ট ইশতেহার লেখা হয়েছিল। দর্শন প্রসঙ্গে অতীতের প্রায় সমস্ত ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই মার্কস-এঙ্গেলস’কে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দার্শনিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী নির্মাণ করতে হয়েছিল। এর পরে মার্কস পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল ভিত্তিটুকু উন্মোচিত করার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন, ক্যাপিটাল (পুঁজি) তারই ফলাফল। এর পাশাপাশি বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদী মতবাদকে পরাস্ত করার জন্য তখনও লড়াই চালাতে হচ্ছিল।
এসবের মধ্যেই লাসাল্লের আড়বোঝা, প্রায় ভ্রান্ত সব কথাবার্তাকে সমাজতন্ত্রের নামে নতুন করে সামনে আনার চেষ্টায় মার্কসের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল। গোথা কর্মসূচির সমালোচনায় তার যাবতীয় বক্তব্যের থেকে মূল পাঁচটি প্রসঙ্গেই আমরা এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি।
ক) শ্রম ও ন্যায্য বণ্টনঃ গোথা কর্মসুচিতে শ্রমকেই যাবতীয় সম্পদের উৎস বলা হয়, সমাজতন্ত্রে সকলের জন্য শ্রমজাত উৎপাদনের সবটুকুই ন্যায্য বণ্টনের অন্তর্ভুক্ত হবে বলেও উল্লেখ ছিল। মার্কস এমন যুক্তিকে ‘সমানাধিকার সম্পর্কে বুর্জোয়া ধ্যানধারণা’ থেকে ধার করা চিন্তাভাবনা বলে চিহ্নিত করেন। স্পষ্ট করেন, শ্রম ছাড়াও প্রকৃতি হল সম্পদ সৃষ্টির (ব্যবহার মুল্যের) আরেক উৎস, মজুরি শ্রমিকের মত প্রকৃতিকেও পুঁজিবাদের জাঁতাকলে লুট হতে হয়। যে কোনও সমাজব্যবস্থায় উৎপাদনের সবটুকু কখনো বণ্টন করা যেতে পারে না, উৎপাদনের কাজে খরচ, সরাসরি শ্রমজাত ক্ষেত্র না যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক কাজে নিযুক্তদের জন্য এবং আপৎকালীন মজুতের জন্য যে কিছুটা রেখে দিতেই হয়। শ্রমের মূল্যকে পণ্যের দামের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছিল, বুর্জোয়ারা মজুরিকে যে কায়দায় ন্যায্য প্রমাণ করতে চায় তারই প্রভাব ছিল। লাসাল্লে শ্রমিক শ্রেণিকে একজোট হতে বলে অন্য সকলকে প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিপন্ন করেছিলেন, এ বিষয়ে মার্কস সতর্ক করে দেন। নভেম্বর বিপ্লবের সময় রাশিয়ায় শ্রমিক-কৃষকদের জোটকে জয়ের অন্যতম শর্ত চিহ্নিত করার সময় মনে রাখা দরকার বিষয়টি মার্কসের নজরের বাইরে ছিল না।
খ) মজুরি সম্পর্কে ধারণাঃ কর্মসূচি রচয়িতারা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যে সমাজে সঠিক মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে লৌহদৃঢ় আইনের উল্লেখ করেছিলেন। মার্কসের বক্তব্য এমন বিধি কার্যত পুঁজিবাদী বন্দোবস্তের সংস্কার মাত্র, শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য সংগ্রামের লক্ষ্য সঠিক মজুরিকে সমাধান হিসাবে চিহ্নিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মজুরি-শ্রমিক ব্যবস্থাটিকেই বাতিল করে দেওয়াই হল উদ্দেশ্য। এখানেই কমিউনিস্টদের বিপ্লবী কর্মসুচির সঙ্গে লাসাল্লের ধারণার মূল পার্থক্য। লাসাল্লের ধারণায় রয়েছে চলতি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে আইনানুগ পদ্ধতি প্রয়োগে অন্যায়ের সুবিচার আদায়ের প্রচেষ্টা, মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে চলতি ব্যবস্থাটাই অন্যায্য, তার সংস্কার না, চাই আমূল বদল- সমাজ বিপ্লবের অর্থ সেটিই।
গ) মুক্ত রাষ্ট্র (ফ্রি স্টেট) সম্পর্কে ধারণাঃ জীবনের শেষদিকে লাসাল্লে জার্মান রাজপরিবার ও শাসকবর্গের রাজনীতির আঙিনায় ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। সম্ভবত সে কারণেই তার চিন্তাভাবনায় রাষ্ট্র বিষয়টি শ্রেণি পরিচিতির ঊর্ধ্বে বিমূর্ত ও স্থায়ী কোনও কিছুতে পর্যবসিত হয়। গোথা কর্মসূচিতে তার অনুগামীরা অমন ধারণার বশবর্তী হয়েই মুক্ত রাষ্ট নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে ফেলেন। ঐ আহ্বান এমন ছিল যাতে বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোকে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী সংস্কার করে নিলে সমাজতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়া যায় বলে ইঙ্গিত ছিল। এমন উৎকট ভাবনার বিরুদ্ধে মার্কস প্রতিবাদ জানান। পুরানো রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করা চলে না বলেও মনে করিয়ে দেন। শ্রেণি শাসনের নিজস্ব প্রয়োজনে এক বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ে রাষ্ট্রের উদ্ভব, এ ব্যবস্থা নিছক কোনও মধ্যস্থতাকারী নয় যাকে ইচ্ছা হলেই সংস্কার করে নেওয়া চলে। এখানেই মার্কসবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর অনন্যতা। মার্কস জোর দিয়ে বলেন পুঁজিবাদ থেকে সমাজ বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে কমিউনিজম অবধি যাত্রাপথে একটি বিপ্লবী কালপর্ব চলবে। কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করার পরেও বিদ্যমান সমাজের মধ্যে পুরানো ব্যবস্থার চিহ্নসমূহ (মার্কসের ভাষায় জন্মদাগ, জরুলের মতো) রয়ে যাবে যা অত সহজে মুছে যাবে না। সমাজ বদলের সেই কালপর্বে সর্বহারাদের নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রয়োজন হবে যার প্রয়োগে তারা এবার সমাজ বদলাবে, একইসাথে নিজেদেরও বদলে ফেলবে। শুধু নতুন সমাজ না, নতুন মানুষও নির্মিত হবে। কমিউনিস্ট সমাজ নির্মাণের প্রশ্নে এটিই মার্কসবাদের বুনিয়াদী বৈশিষ্ট্য যা এড়িয়ে যাওয়া চলে না।
ঘ) সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমঃ লাসাল্লে অনুপ্রাণিত ভাবনার গোড়ায় গলদ ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতির পর পর কয়েকটি আইনানুগ সংস্কার ও সাধারণ সদিচ্ছা নির্ভর অনুমানের ভিত্তিতে তারা দেখাতে চেয়েছিলেন সমাজতন্ত্র এল বলে এবং একবার এলেই সব সমস্যার সমাধান। মার্কস এ সমস্ত ছাইপাঁশ ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমকে গোথা কর্মসূচি একই বিষয় হিসাবে বিবেচনা করেছিল। ঐ দুয়ের মধ্যে মার্কস দুটি স্তর চিহ্নিত করেন। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ বিপ্লবী পরিস্থিতির সূত্রধর অবশ্যই, কিন্তু সমাজ বদলের বিষয়ীগত শর্তটিও ভুলে গেলে চলে না। এখানেই নতুন মানুষের আবশ্যকতা। মার্কসের প্রস্তাবে সমাজতন্ত্র হল এমন ব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেকে যা কাজ করবে তার নিরিখে সম্পদের অধিকারী হবে। কমিউনিজম এর চাইতে উন্নত স্তর, সেখানে সকলে নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে পাবে। এ দুয়ের মাঝে যে ফারাক রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষ্যে তাকেই আর্থিক উন্নতিসাধন বলে, নিছক পরিমাণে না, গুণেও। মার্কস ওখানেই থেমে থাকেননি, দ্বিতীয় পর্যায়ে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট সামাজিক শ্রমশক্তির বিকাশও সমানতালে ঘটবে বলে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ কী? কমিউনিস্ট সমাজে উৎপাদন সম্পর্ক এমন উচ্চতায় উন্নীত হবে যার সুবাদে সমাজে আত্মকেন্দ্রিক সংকীর্ণতার অবসান ঘটবে। এমন অবস্থায় পৌঁছান গেলে বুর্জোয়া সমাজে প্রচলিত সমানাধিকারের ধারণাটিও অহেতুক হয়ে যাবে, সভ্যতার কাঠামো বুর্জোয়া আইনের পরিসীমা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে।
ঙ) সংস্কারবাদ বনাম আন্তর্জাতিকতাবাদঃ মার্কসের সমালোচনায় সর্বশেষ প্রসঙ্গ সমাজবদলের লক্ষ্যে সংস্কার ও আপসভিত্তিক পরিকল্পনার মুখোমুখি বিপ্লবী কর্মসূচির বস্তুনিষ্ঠ রূপরেখা নির্মাণ। গোথা কর্মসূচি জার্মান জাতীয়তাবাদকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছিল, ব্যাপারটা ভুল করে হয়নি, কৌশলে শ্রমজীবীদের আন্তর্জাতিক সত্ত্বাকে এড়িয়ে যাওয়াই ছিল লক্ষ্য। কমিউনিস্ট ইশতেহারের বয়ান শেষ হয়েছিল ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ বলে। একে নিছক স্লোগান ভাবা ভুল, শ্রমজীবীদের উপরে যে লুটেরা বন্দোবস্তটি চেপে বসে রয়েছে তার মূল চরিত্র কোনও দেশের সীমানায় আটকে নেই, এর উচ্ছেদে তাদেরও দুনিয়াজোড়া সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে এই ছিল ইশতেহারের শিক্ষা। একে এড়িয়ে জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতায় আটকে গেলে পুঁজির বিশ্বজনীন সক্রিয়তাকেই অস্বীকার করা হয়। মার্কস ঐ ভ্রান্তি শুধরে দেন, জাতীয়তাবাদ নির্দিষ্ট ভূগোলে লড়াই–সংগ্রামের জন্য গৃহীত রণকৌশল, শ্রমজীবী আন্তর্জাতিকতাবাদই হল রণনীতি। যোসেফ স্তালিন’কে অন্য কিছু প্রমানে আজও অনেকে পাতা ভরিয়ে চলেন, তারা সম্ভবত ভুলে যান জাতিসত্তার প্রশ্নে সঠিক সমাধানের জন্য তৎকালীন মার্কসবাদীদের মধ্যে লেনিনই তাকে নির্ভুল চিহ্নিত করেছিলেন।
মার্কস শুধু সমালোচনা লিখে যাননি, ভবিষ্যৎকালে যারাই সমাজতন্ত্র নির্মাণে ব্রতী হবে তাদের জন্য ন্যূনতম বোঝাপড়া সমৃদ্ধ একটি খসড়া নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক পরবর্তীকালে যে সকল প্রবণতা উদারবাদী বিচ্যুতি বলে চিহ্নিত হয় সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাও মার্কসের ঐ সমালোচনায় ছিল। ঐক্যের অজুহাতে যে কোনভাবেই ভ্রান্তির সঙ্গে আপস চলে না, পার্টি গড়ার কাজে লেনিন নিজের জীবনে বারংবার সে প্রমাণ দিয়েছেন। লেনিনের যুগের মত করে পার্টি না থাকলেও, গোথা কর্মসূচির সমালোচনার মাধ্যমে মার্কস ঠিক সেটাই করেছিলেন।
প্রকাশের তারিখ: ০৫-মে-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
