সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
একটি অপরাধ, একটি কলঙ্ক, একটি ষড়যন্ত্র
শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
৬ ডিসেম্বর শুধুমাত্র একটি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা হয়ে থাকেনি। সেদিনের ৬ ডিসেম্বরের আগেকার ভারত আর তার পরের সময়পর্বে এক পরিবর্তিত সমাজ ও রাষ্ট্রের ভারত অধঃপতিত হতে হতে আজ কার্যত ভারতের সাংবিধানিক সাধারণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোয় ঘা মারছে। যে ভারত সংবিধানে সংজ্ঞায়িত আর ভারতের বর্তমান শাসক দল যে ভারতকে মানুষের ধারণায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তা সম্পূর্ণ বিপরীত। ১৯৯২ সালে বিজেপি ও আরএসএস বলেছিল অযোধ্যার বিষয়টি ‘প্রতীকী’। অযোধ্যায় মসজিদ ভেঙে মন্দির তৈরি করতে দিলেই ভারতের অন্য জায়গায় অন্য ধর্মাবলম্বীদের অন্যান্য উপাসনাস্থলগুলি নিয়ে তাদের যে দাবি রয়েছে তা তারা প্রত্যাহার করে নেবে।

স্বাধীন ভারতের নিকৃষ্টতম অপরাধের দিন ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। মহাত্মা গান্ধীর হত্যার চেয়েও এই অপরাধ নিকৃষ্টতর কারণ গান্ধীহত্যা ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণ উন্মোচিত না হলেও এর বিচার ও হত্যাকারীর শাস্তি হয়। দিবালোকে সারা পৃথিবীর চোখের সামনে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যে জঘন্যতম অপরাধের ঘটনা ঘটে সেটার বিচার তো হলই না উল্টে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছে। একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনাস্থল জোরপূর্বক ধ্বংস করে দখল করার অপরাধকে মার্জনা করা হয়েছে বিতর্কিত জমির একপক্ষের হাতে জমি তুলে দিয়ে। অপরাধীদের বিচার বাতিল হয়েছে তারপর। এভাবেই রাষ্ট্রের উদ্যোগে একটি কলঙ্ক পরিবর্তিত হয়েছে গৌরবে। আজ যারা গৌরব কীর্তনে চারধার ভরিয়ে রেখেছে, কী বলেছিল তারা সেদিনের ঘটনার পর? বাজপেয়ীর মন্তব্য ছিল, আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনার দিন। গোটা অধ্যায় যার নেতৃত্বে সংগঠিত হয় এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে মসজিদের ভেঙে পড়াকে হাসিমুখে উপভোগ করেছেন যিনি সেই আদবানি থেকে শুরু করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উমা ভারতীকে জড়িয়ে ধরা পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক মুরলী মনোহর যোশী- প্রত্যেকেরই বক্তব্য ছিল, যা হয়েছে সেটি একটি অনভিপ্রেত দুর্ঘটনা। ‘অত্যুৎসাহী’ করসেবকদের তাৎক্ষণিক আবেগের পরিণাম। একমাত্র বাল থ্যাকারের তখনকার শিবসেনা, বিনয় কাটিহারের বজরং দল আর অশোক সিংহলের বিশ্ব হিন্দু পরিষদ একে শৌর্যের ঘটনা বলে অভিহিত করেছিল। বিজেপি ও আরএসএস-এর কেন্দ্রীয় নেতত্বের এই ঘটনার দায় গ্রহণ থেকে দূরে সরে এসে একে দুর্ঘটনা বলে অভিহিত করা এবং একইসঙ্গে বিনয় কাটিহার, অশোক সিংহল, উমা ভারতীদের উচ্ছ্বাস- সমান্তরালে একই রাজনৈতিক পক্ষের দুই বিপরীত মুখ দেখে সেদিনের ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বলেছিল, বিজেপি লিডার্স স্পিকস ইন ফর্কড টাঙ অর্থাৎ বিজেপি নেতারা কথা বলছেন দ্বিখণ্ডিত জিহ্বায়। মহাত্মা গান্ধীকে নিয়েও এই দ্বিমুখী ভাষণ আরএসএস-এর বরাবরের। মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর আনন্দে মিষ্টি বিতরণের পর জনগনের মধ্যে তৈরি হওয়া তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে কয়েকদিন পর আরএসএস-এর তরফে এক দীর্ঘ শোকপ্রস্তাব প্রচার করা হয়েছিল। বিজেপি দলের গঠনের সময়ে সংবিধানে গান্ধীবাদকে যখন স্থান দেওয়া থেকে শুরু করে মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে স্বচ্ছভারত অভিযান ঘোষণা আর পাশাপাশি নাথুরাম গডসের নামে জয়ধ্বনি দেওয়া এই দ্বিখন্ডিত জিহ্বার কূটকৌশলেরই নমুনা।সাম্প্রতিক সময়ে কেরল ও মেঘালয়ের নির্বাচনী ইস্তেহারে গোমাংসের স্বপক্ষে প্রতিশ্রুতি আর উত্তর ভারত জুড়ে গোমাংসের বিরোধিতার আওয়াজ তুলে সাধারণ মুসলিমের হত্যাও দ্বিখণ্ডিত জিহ্বার নিকৃষ্ট সুবিধাবাদ।
বাবরি মসজিদ ভাঙার ৩৩ বছর পর এই মূহুর্তে দিল্লির ঝান্ডেওয়ালা অঞ্চলের হিন্দু ধর্মানুরাগীদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ- যারা সেদিন মসজিদ ভেঙেছিল তারাই এখন ১৪০০ বছরের পুরোনো একটি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করছে, কারণ তাদের সদর দপ্তরে গাড়ি রাখার জন্য আরেকটু বেশি জায়গা প্রয়োজন।অমিত মালব্যের বাঁদর বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছে নেটদুনিয়ায়।বলছে, সব গুজব, সব মিথ্যাপ্রচার। অথচ বিজেপি নিয়ন্ত্রিত পুর কর্তৃপক্ষ একবারও বলছে না, মন্দির ভাঙা হয় নি। তাদের যুক্তি, সবটাই বেআইনি দখলদারি উচ্ছেদ অভিযানের অংশ। বিজেপি পুরসভার এমন মন্তব্যে ওয়াটসআপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মানুভূতি আহত হয় নি। শাসক-অনুগত ভারতের বৃহৎ সংবাদমাধ্যম এই খবর হয় এড়িয়ে গেছে অথবা মৃদু উল্লেখে সত্য মিথ্যার পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেছে। এদিকে নির্বাচনমুখী পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের শাসকদলের এক খুচরো নেতা মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ বানানোর হুঙ্কার দিয়ে দল থেকে আরেকবার বহিষ্কৃত। দুর্জনে বলে এখানেও আরএসএসের খেলা আছে। ওদিকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজস্থান সরকারের শিক্ষা দপ্তর এবারের ৬ ডিসেম্বরকে সমস্ত বিদ্যালয়গুলিতে ‘শৌর্য দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। চারধারে হৈচৈ পড়তেই সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহৃত হয়েছে। ২০২৫ এর ৬ ডিসেম্বর এলো এমন আবহেই।
১৯৯২ সাল থেকে ২০২৫ এক দীর্ঘ পথ। ৬ ডিসেম্বর শুধুমাত্র একটি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা হয়ে থাকে নি। সেদিনের ৬ ডিসেম্বরের আগেকার ভারত আর তার পরের সময়পর্বে এক পরিবর্তিত সমাজ ও রাষ্ট্রের ভারত অধঃপতিত হতে হতে আজ কার্যত ভারতের সাংবিধানিক সাধারণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোয় ঘা মারছে। যে ভারত সংবিধানে সংজ্ঞায়িত আর ভারতের বর্তমান শাসক দল যে ভারতকে মানুষের ধারণায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তা সম্পূর্ণ বিপরীত। ১৯৯২ সালে বিজেপি ও আরএসএস বলেছিল অযোধ্যার বিষয়টি ‘প্রতীকী’। অযোধ্যায় মসজিদ ভেঙে মন্দির তৈরি করতে দিলেই ভারতের অন্য জায়গায় অন্য ধর্মাবলম্বীদের অন্যান্য উপাসনাস্থলগুলি নিয়ে তাদের যে দাবি রয়েছে তা তারা প্রত্যাহার করে নেবে। অন্যান্য জায়গায় তারা স্থিতাবস্থার বদল চায় না। এটাও যে ফর্কড টাঙেরই ভাষণ সেটা প্রাণের বিনিময়ে জেনেছে উত্তর প্রদেশের সম্ভলের পাঁচ যুবক, নুমান, নাঈম, আয়ান, কাইফ ও বিলাল যারা সেখানকার শাহী মসজিদকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টাকে রুখতে গিয়ে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর পুলিসের গুলিতে প্রাণ দিয়েছে। কেন প্রাণ দিতে হল তাদের? কোনো এক হিন্দু সংগঠন দাবি করেছিল, সেখানকার শাহী মসজিদ মন্দিরে ভেঙে তৈরি হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই জেলা আদালত পুরাতত্ত্ব বিভাগকে নির্দেশ দিল, মসজিদ চত্বরে খননের মাধ্যমে দাবির যথার্থতা যাচাই করতে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ দিল ওই পাঁচ যুবক। তপন সিংহের ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ ছবিতে দেখানো হয়েছিল ধর্ষণের পরও তদন্ত ও বিচারের নামে কীভাবে বারবার ধর্ষিতা হয় একটি মেয়ে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়। তেমনি বাবরি মসজিদও একবার মাত্র ভাঙা হয় নি ১৯৯২ সালে। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত রায়দানের মধ্য দিয়ে যখন মসজিদের জমিতে একতরফাভাবে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দিয়ে দূরবর্তী স্থানে পুরোনো মসজিদের পুনর্নির্মাণের আদেশ দেয় সেদিন করসেবক নয়, ভারতের বিচার ব্যবস্থার হাতে আরো একবার ধ্বংস হয় বাবরি মসজিদ। রায়টি ছিল অদ্ভুত। সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদ ধ্বংস করাকে ‘বেআইনি’ কাজ বলে অভিহিত করেছে, অথচ সেই বিধ্বংসের উদ্দেশ্যকে মান্যতা দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদ ভাঙাকে বেআইনি অভিহিত করার এক বছরে মধ্যেই ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর লখনউয়ের সিবিআই বিশেষ আদালত এক রায়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অপরাধে অভিযুক্ত ৩২ জন জীবিত অপরাধীদের প্রত্যেককে বেকসুর খালাস করে দেয়। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট যে কাজকে ‘বেআইনি’ বলেছিল আগের বছরের নভেম্বরে সেটা বছর ঘোরার আগেই সিবিআই আদালতে বৈধতা পেয়ে গেল। বাবরি মসজিদ এদিন আরো একবার ধ্বংস হয়। এই ধ্বংসকার্য হয় আদালতের বৈধতা পেয়ে। পরের ঘটনা ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ঠিক তিন বছর পর যেদিন প্রধানমন্ত্রীর হাত দিয়ে রামলালার অভিষেকের মধ্য দিয়ে বাবরি ধ্বংস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্জন করে।
এ বছর আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ হল। একদিকে, এই ১০০ বছরের ইতিহাসে আরএসএস প্রায় গিরিগিটির মতেই রঙ বদল করেছে বারবার। অন্যদিকে, তাদের মূল চিন্তাভাবনার জায়গায় তারা এখনও ১৯২৫-এই বিরাজ করছে। গত আগস্ট মাসে দিল্লির বিজ্ঞান ভবনের একটি অনুষ্ঠানে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আরএসএস কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিজেদের মতের পরিবর্তন করে? যদি করেও তাদের কোন কোন বিষয়গুলি অপরিবর্তনীয়? স্মরণ করা যেতে পারে সাত বছর আগে ভাগবত বলেছিলেন, গোলওয়ালকার ভারতের সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের সম্পর্কে যে কথাগুলি বলেছিলেন আরএসএস সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা গোলওয়ালকারের ‘বাঞ্চ অব থট’-এর নতুন সংস্করণে অতীতের সেই লেখাগুলিকে বাদ দিয়েছে। সাত বছর আগে ভাগবত যদি নিজেদেরকে পরিবর্তন-বান্ধব দাবি করে থাকেন, তবে আগস্টে তাকে করা প্রশ্নের উত্তরে নিজেদের অনমনীয়তার জায়গাটিকে তুলে ধরেছেন এবং সেখানেই নিহিত রয়েছে এই দেশ নিয়ে তাদের ভয়ঙ্কর নীলনকশাটি। ভাগবত তিনটি বিষয়কে আরএসএস ‘চিরন্তন আদর্শ’ বলে অভিহিত করেছেন। এক, মানুষের মনের বদল ঘটিয়ে সমাজের বদল ঘটাতে পারা সম্পর্কে বিশ্বাস। দুই, ‘হিন্দু সমাজকে’ ঐক্যবদ্ধ করা এবং তিন, ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বাস করা। বলা বাহুল্য, দ্বিতীয় এবং তৃতীয়টি আলাদা কথা না। একটি আরেকটির উপসংহার। প্রথম কথাটিও বিপজ্জনক। তাদের উদ্দেশ্য ব্যক্তির মনে দখল সম্প্রসারিত করতে করতে সমাজকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার। আরএসএস প্রতিষ্ঠালগ্নের সময়েই ইতালির ফ্যাসিস্টদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলও ইতালির সমাজে দখল নিয়েছিল ব্যক্তির মননশীলতা যুক্তিবোধ সংবেদন সবকিছুর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে এক বিকৃত পাশবিকতার দিকে চালিত করে। গণতন্ত্র যুক্তিবোধ সংবেদশীলতা নাগরিক অধিকার, এই সমস্ত কিছুকেই এক গোষ্ঠীবদ্ধ সংকীর্ণতার দাসত্বে বেঁধে রেখেছিল তারা। আরএসএস -এর প্রতিষ্ঠাতা বলেছিলেন, বাইরের বিপ্লব নয়, আমরা চাই মনোজগতে বিপ্লব। মনোজগতে বিপ্লবের এই ধারণাটি হল দেশ সমাজ ও তার ইতিহাস নিয়ে একটি কল্পিত ধারণাকে মানুষের মধ্যে প্রোথিত করে দেওয়া। আরএসএস-এর প্রভাবের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষেরা জগৎ ও জীবন সম্পর্কে যে শিক্ষা নিয়ে বড় হয়, আরএসএস-এর অধীনে থাকা সংগঠন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা এক সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা নিয়ে সমাজে বাঁচে। এই মুহূর্তে ভারতে অন্তত ৬০ লক্ষ সদস্য আরএসএস-এর। সারা দেশে কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। এরা যে ইতিহাস জানে, বিজ্ঞানের যে ব্যাখ্যা জেনে এদের জ্ঞানবৃক্ষ পত্রেপুষ্পে ভরে ওঠে তার সাথে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস বা বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের কাছে ভারত মানে শুধুমাত্র হিন্দুদের দেশ। বাকিরা সবাই বহিরাগত এবং অবাঞ্ছিত। শুধু অবাঞ্ছিতই নয়, এরা দেশের শত্রু। সুতরাং তাদের সম অধিকার থাকতে পারে না। তারা হয় দেশ ছেড়ে চলে যাবে। অথবা দেশে হিন্দুদের অধীনস্থ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বাঁচবে। হিন্দুদের প্রতি সংগঠিত অপরাধের বিচার এবং অ-হিন্দুদের প্রতি সংগঠিত অপরাধের বিচার এক মাপকাঠিতে হতে পারে না। হিন্দুরা এই দেশের আদত অধিবাসী হিসেবে বৈষম্যমূলক সুবিধার দাবিদার। আরএসএস-এর পরিসরে সংসদীয় গণতন্ত্র একটি পশ্চিমী ধারণা, যা দাসত্বের নামান্তর। বাবাসাহেব আম্বেদকারের নেতৃত্বে সংবিধান গণপরিষদে তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়ে যে সাধারণতন্ত্রের সংবিধান ভারত গ্রহণ করেছে সেটা তাদের মতে পশ্চিমী ধারণার দ্বারা প্রভাবিত এবং পরিত্যাজ্য। ভারতের সংবিধান রচিত হতে হবে মনুসংহিতার আদলে। অর্থাৎ মুখে বর্ণবাদ বিরোধিতার কথা বা নারীশক্তির কথা বললেও আরএসএস মনুসংহিতার আদর্শেই সমাজে অন্ত্যজ শ্রেণি এবং নারীর স্থান নির্ণয় করতে চায়। আর এই গোটা প্রকল্পটি তারা বাস্তবায়িত করতে চায় দেশের কোণে কোণে হাজার হাজার প্রচারক ও স্বয়ংসেবকদের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যক্তি মানুষের মনোজগতে দখলদারি কায়েম করার মাধ্যমে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে তারা বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলির সাথে আঁতাত তৈরি করে দেশের সংবাদ মাধ্যম ও বিনোদনের জগতে দখল কায়েম করে। দখলকৃত সেই সংবাদ মাধ্যম এবং বিনোদন মাধ্যমগুলি এখন আরএসএস-এর রঙে মানুষের মনোজগতকে রাঙানোর দায়িত্ব নিয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের স্তর থেকে সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিমদের দৃশ্যমানতার বাইরে নিয়ে যাবার জন্যে একটু একটু করে তাদেরকে দেশের সংখ্যাগুরু মানুষের ধারণায় ‘অপরত্বে’ অভিষিক্ত করা হয়েছে। বাবরি মসজিদ ভাঙার মুহূর্তটি একটি জলবিভাজন রেখা। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরপরই ভারতের নানা স্থানে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনাবলী ঘটে। ১৯৪৭ এর পরবর্তী ভারতে সাম্প্রদায়িক হিংসা সীমাবদ্ধ ছিল স্থানিক স্তরে। সাম্প্রদায়িক মুসলিম বিদ্বেষকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী সময়ের ভারত। বিনোদন জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টিভি সিরিয়ালে রামায়ণ মহাভারত এবং সামন্ত্রতান্ত্রিক মূল্যবোধের গল্প দিয়ে ভরিয়ে দেওয়া হয়। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরবর্তী সময়ে হিন্দুত্ববাদীরা মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগৎকে ফরমান জারি করে বলে গৈরিক পোষাক পরিহিত খলনায়ক দেখানো যাবে না, হিন্দু মুসলিম বিবাহ বা প্রেম দেখানো নিষেধ, মুসলিম খলনায়ক চরিত্রের প্রাধান্য, পাকিস্তান বিরোধী ভাবাবেগ উস্কে সংখ্যাগুরুবাদী হিংস্র দেশপ্রেমের চলচ্চিত্র নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে মুম্বাই চলচ্চিত্র যে ভ্রাতৃত্ব ও সাম্প্রদায়িক সদ্ভাবের ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়বস্তুর চলচ্চিত্র নির্মাণের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিল তা হিন্দুত্ববাদী ভারতে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই মুহূর্তে নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের নামে মুসলিম ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী নিয়ে মিথ্যা গল্প ছড়িয়ে মানুষকে বিভাজনের রাজনীতিকে উত্তপ্ত করা হচ্ছে।
অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনাস্থল ভাঙা, স্থাননাম পরিবর্তন করা- এই সমস্ত কিছুই ইতিহাসের নির্দিষ্ট কিছু সত্যকে দৃশ্যমানতার বাইরে নিয়ে গিয়ে বিস্মৃতির গর্ভে ডুবিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত। স্মরণ করা যেতে পারে, প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলী আগ্রাসনে গোড়া থেকেই মানুষকে উৎখাত করে বিভিন্ন স্থাপনাকেও ধূলিস্যাৎ করে দিয়ে নতুন করে স্থাপনা নির্মিত হয়ে আসছে। উদ্দেশ্য দৃশ্যমানতা থেকে প্যালেস্তানীয়দের উপস্থিতির ইতিহাসকে মুছে দেওয়া। মসজিদ ভাঙা বা স্থাননাম পরিবর্তন করাও দেশের ইতিহাস থেকে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের জীবন্ত উপস্থিতিকে মুছে ফেলা যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতেই পারে না সেই স্থান ভিন্ন সম্প্রদায়েরও নিজস্ব বাসভূমি ছিল।
৬ ডিসেম্বর ভারত রাষ্ট্র ও ভারতীয় সমাজের অন্ধকারের পথে অধঃপতনের সূচনাবিন্দু। এই অন্ধকার এখন সরকারী নীতিমালায় মান্যতা পেয়েছে। সমন্বয়বাদী ইতিহাস এবং আধুনিক সময়ের গণতান্ত্রিক অর্জন এদের চোখে মিথ্যা। এই অন্ধকার একইসাথে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। এর অপসারণেও চাই এক ব্যাপকতর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। আজকর দিনটি সেই যুদ্ধেরই শপথ নেওয়ার দিন।
প্রকাশের তারিখ: ০৬-ডিসেম্বর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
