Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

জরুরি অবস্থার সেদিন আর এদিন

অলকেশ দাস
এ'কথাও আজ প্রমাণিত সত্য যে জরুরি অবস্থার সময় আরএসএস সরসঙ্ঘচালক মধুকর দত্তাত্রয় দেওরাস ক্ষমা চেয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি লিখেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা কেন জরুরি ছিল সেই নিয়ে বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন জাতির উদ্দেশ্যে। ২২ আগস্ট, '৭৫ তারিখে চিঠি লিখেছিলেন দেওরাস ইন্দিরা গান্ধীকে। প্রশংসা করেছিলেন ভাষণকে। বলেছিলেন, ‘সময়োপযোগী এবং ভারসাম্যপূর্ণ'। আর তার পরেই মুচলেকার মত লিখেছিলেন যার মানে দাঁড়ায়— দয়া করে আরএসএস-এর উপর নিষেধাজ্ঞাটা তুলে নিন।
Emergency Today

খবরের কাগজ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার বোম্বাই সংস্করণ। শোকের কলামে লেখা হলো— Democracy, beloved husband of truth, loving father of liberty, brother of faith, hope and justice expired on June 25। গণতন্ত্র যা সত্যের স্বামী, স্বাধীনতার ভালোবাসার পিতা, বিশ্বাস,আশা ও ন্যায়ের ভ্রাতা— তার মৃত্যু ঘটেছে গত ২৫ জুন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সম্পাদকীয়র জায়গা ফাঁকা! ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদকীয়তে শুধু লেখা রবীন্দ্রনাথের কবিতা। 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য'। এগুলো কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। ১৯৭৫ সালে ২৫ জুন জারি হওয়া জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। প্রেস সেন্সারশিপ, প্রেসের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ।

জুন ১৯৭৫ থেকে মার্চ ১৯৭৭। এদেশের রাজনীতির ২১ মাসের কালো অধ্যায়। পোশাকি নাম 'জরুরি অবস্থা'। প্রয়োগকত্রী তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। পরিনাম নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত, কঠোর সংবাদপত্র সেন্সরশিপ, নিজের মত অনুযায়ী দেশ চালাতে সংবিধানের সংশোধন, বিতর্কিত নীতি ইত্যাদির প্রয়োগ।

১৯৭১ সালের নির্বাচনে জয় হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর। 'গরিবী হঠাও' ছিল তার স্লোগান। সদ্য বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। মানুষ মনে করেছে ইন্দিরা গান্ধীর তাতে বড় অবদান। ধীরে ধীরে মানুষ মনে করতে শুরু করেছে গরিবী হঠছে না, বরং গরিব হঠে যাচ্ছে। সুখ স্থায়ী হলো না বেশি দিন। ১৯৭৪ সালে সরকারের বিরুদ্ধে রেল ধর্মঘট। স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল হয়ে তা ছড়িয়ে পড়লো সারাদেশে। কেঁপে গেল সরকার। তীব্র দমনপীড়ন থামাতে পারলো না তাকে। গুজরাটে ছিল কংগ্রেসের সরকার। সরকারের বিরুদ্ধে ছিল জনগণের তীব্র ক্ষোভ। নির্বাচনের দিন ঘোষণা করতে চাইছিল না সরকার। অনশনে বসে পড়েছিলেন মোরারজি দেশাই। জনমত এত প্রবল ছিল শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধীকে গুজরাটে নির্বাচনের দিন ঘোষণা করতেই হলো। গুজরাট নির্বাচনের রায় এবং এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় একই দিনে ঘোষণা হয়েছিল। ১২ জুন, ১৯৭৫। তা ছিল ইন্দিরা ও কংগ্রেসের চরম বিড়ম্বনা। আদালত বলেছিল নির্বাচনে সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ঘটিয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী। দোষী তিনি। ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত পদে থাকতে পারবেন না। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও পারবেন না। ক্ষমতা ধরে রাখতে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া ছাড়া মিসেস গান্ধীর আর কোন উপায় ছিল না। সেখানে ছিলেন বিচারপতি কৃষ্ণা আইয়ার। রায়ে বললেন ইন্দিরা প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। লোকসভায় যেতেও পারবেন। কিন্তু ভোট দিতে পারবেন না। এমনকি লোকসভার বিবরণীতেও তার নাম থাকবে না। রায় নয়, যেন মুখের উপর থাপ্পর। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী তখন সিদ্ধার্থশংকর রায়। অঘোষিত জরুরি অবস্থা চালাচ্ছিলেন বঙ্গে। তিনিই চিঠির খসড়া করে দেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারির সেই চিঠি পৌঁছে যায় রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের কাছে। ২৫ জুন ১৯৭৫ জরুরি অবস্থা জারি হয়ে যায়। এই বিষয়ে মন্ত্রিসভা ব্রাত্য হয়ে থাকে। গণতন্ত্রের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে স্বৈরাচার, কর্তৃত্ববাদ। এক লক্ষ দশ হাজার আটশো ছয় জন গ্রেফতার হয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নামে নির্বিচারে জোর করে বন্ধ্যাকরণ পর্ব চলতে থাকে সঞ্জয় গান্ধীর নেতৃত্বে। প্রতিবাদ যেখানে ন্যায্যতা পেতে পারতো তার জায়গা করে নিল স্তুতি আর চাটুকারিতা। এরকমই পর্বে জন্ম নেয় স্লোগান— ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা। ইন্দিরা গান্ধী খুশি হতে থাকেন 'এশিয়ার মুক্তিসূর্য' নামে। গণতন্ত্র হরণের প্রতিষ্ঠানিকতাকে স্বীকৃতি দিতে সংবিধান সংশোধনের পর্ব চলতে থাকে। আদালতের আর্তনাদ শোনা যায়— সংসদে সংবিধান সংশোধন করা যায় না এমনভাবে যাতে তার মৌলিক কাঠামো ক্ষুন্ন হয়। মানুষের অধিকারকে রোধের জন্য মিসা, ডিসির, কফেপোসা ইত্যাদি আইনের প্রয়োগ হতে শুরু করে। রাজনৈতিক নেতারা একের পর এক গ্রেপ্তার হয়। এইসব অত্যাচার 'কিসসা কুর্সি কা' সিনেমায় প্রতিফলিত হয়। ইন্দিরা গান্ধী তনয় সঞ্জয় গান্ধী গুরুগাঁওয়ে তার নিজের মারুতি ফ্যাক্টরিতে তার রিল (সিনেমার মাস্টার প্রিন্ট) জ্বালিয়ে দেয়। গণতন্ত্র আর অধিকার হরণের এক রুদ্ধশ্বাসকর, লোমহর্ষক অধ্যায়— জরুরি অবস্থা।

কে না জানে আরএসএস ও বিজেপি'র সম্পর্ক। এ'কথাও আজ প্রমাণিত সত্য যে জরুরি অবস্থার সময় আরএসএস সরসঙ্ঘচালক মধুকর দত্তাত্রয় দেওরাস ক্ষমা চেয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি লিখেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা কেন জরুরি ছিল সেই নিয়ে বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন। জাতির উদ্দেশ্যে। ২২ আগস্ট, '৭৫ তারিখে চিঠি লিখেছিলেন দেওরাস ইন্দিরা গান্ধীকে। প্রশংসা করেছিলেন ভাষণকে। বলেছিলেন, ‘সময়োপযোগী এবং ভারসাম্যপূর্ণ'। আর তার পরেই মুচলেকার মত লিখেছিলেন যার মানে দাঁড়ায়— দয়া করে আরএসএস-এর উপর নিষেধাজ্ঞাটা তুলে নিন। কিছু সময়ের পর দেওরাস আর একটা চিঠিতে লিখছেন: ‘জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সাথে সঙ্ঘের কোন সম্পর্ক নেই... বরং তারা (আর এস এস) সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচিকে সাহায্য করবে ...।’ সরকার-বিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবো না-কার্যত চিঠিগুলোতে পাতাজুড়ে তারই আর্তি ছিল। আজকের দিনে সঞ্জয় গান্ধীর নাসবন্দী নিয়ে আরএসএস ক্রমশঃ বিষোদগার বাড়াচ্ছে। অথচ দেওরাস সে'সময় সেই অভিযানের প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে এর প্রয়োগ জরুরি ছিল! ইন্দিরা গান্ধী যাচ্ছিলেন বিনোবা ভাবের আশ্রমে। খবর পেয়েই  সরসঙ্ঘচালক চিঠি লিখলেন বিনোবা ভাবেকে। ইন্দিরা গান্ধীর বরফ গলানোর জন্য। ‘দয়া করে ওঁকে বোঝান যে আরএসএস তাকে, তার সরকারকে সাহায্য করবেন’। মহারাষ্ট্রের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী এস বি চ্যবন এক পাঁজা চিঠি বিধানসভায় এনে ফেলেছিলেন। সব দেওরসের লেখা। দেওরস লিখেছেন— ‘আরএসএস সদস্যরা সরকারের কাছে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে রাজি আছে'। বিজেপির মস্তক আরএসএস-এর মাথার ভঙ্গী ছিল এই রকম। সাভারকর যে মুচলেকার পথ দেখিয়েছিলেন সেই পথে হেঁটেছেন দেওরস। অটলবিহারী বাজপেয়ীও। ওদের দলেরই সুব্রহ্মণিয়াম স্বামী, তার বইয়ে লিখেছেন— জরুরি অবস্থার সময় জয়প্রকাশ নারায়ণ জেলে, মোরারজি জেলে, কিন্তু বাজপেয়ি বাইরে। বাড়িতে। কেন? অসুস্থতার নামে প্যারোলে! আসলে বাজপেয়ী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বোঝাপড়ায় পৌঁছেছিলেন। মুক্তি পেলে তিনি কোনো সরকার বিরোধী কার্যকলাপে জড়িত হবেন না। এর ঠিক উল্টোদিকে সিপিআই(এম) নেতা এ কে গোপালন। ২১ জুলাই ১৯৭৫ লোকসভায় তার ঐতিহাসিক বক্তব্য। ‘আমি যখন বলছি তখন আমার সঙ্গী ৩৪ জন এম পি সংসদে নেই। এই জন্য নয় যে তারা আসতে পারেনি।  আসলে তাদের জেলের মধ্যে পোরা হয়েছে।’ এই হলো সমর্পন আর সংগ্রামের বৈপরীত্য। বিজেপি, আরএসএস আজ সাধু সেজে সেই জরুরি অবস্থাকে স্মরণ করে আসলে কংগ্রেসকে আক্রমণ করতে চায়। জনগণের কাছে বীর সাজতে চায়। কংগ্রেস যদি স্বৈর শাসনের দোষে দুষ্ট হয় তাহলে তাকে সমর্থনের দায়ে সংঘ পরিবারও সমান দুষ্ট। 

জরুরি অবস্থার ৫০ বছরের পুর্তিতে বিজেপি নেতৃত্বের ভারত সরকার ২৫শে জুনকে 'সংবিধান হত্যা দিবস' হিসাবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সত্যিই কি মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার নৈতিক অধিকার আছে? এই সরকারের যিনি নায়ক ২০০২ সালে তার নেতৃত্বে গুজরাটে মুসলিম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। জার্নালিস্ট ইন্দ্রজিৎ হাজরা লিখেছিলেন— ‘আর এস এস এর ফ্যাক্টরি থেকে উদ্ভূত আর এক স্বৈরনায়ক’। জরুরি অবস্থার চল্লিশ বছর পূর্তিতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এক সাক্ষাৎকারে লালকৃষ্ণ আদবানি বলেছিলেন— যে শক্তি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারে, সেই শক্তি আজ শক্তিশালী হচ্ছে। ইশারাই যথেষ্ট ছিল। কারুরই বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ইঙ্গিত কার দিকে। মোদি ছাড়া আর কেউ না। আরএসএস আর বিজেপির মুখ আর মুখোশের খেলায় এ কথা অন্তত মুখনিঃসৃত ছিল। ঘোষিত জরুরি অবস্থাকে ছাপিয়ে গেছে আজকের অঘোষিত জরুরি অবস্থা। সেদিন মিসা ছিল, আজ ইউ এ পি এ জাঁকিয়ে বসেছে। প্রতিবাদ করলেই দেশদ্রোহী দাগিয়ে দাও। আর কুখ্যাত ইউ এ পি এ কানুনে বিনা বিচারে জেলের পেছনে ঠেলে দাও। স্বাধীন, স্বতন্ত্র থাকার কথা ইডি আর সিবিআই এর। সরকারি ক্ষমতায় ওগুলোকে পুরোপুরি দলীয় সুবিধায় ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতা, তাদের কোনো দুর্বলতা থাকুক বা না থাকুক, ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগ ইত্যাদিকে ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে, লোভ দেখিয়ে তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। তথাকথিত বিরোধীদের এইভাবে অনুগত বিরোধীতে রূপান্তরিত করা, আজকের আরএসএস-এর কৌশল। সহনশীলতা বলে কোন বিষয় থাকছে না। যুক্তিও আপেক্ষিক। যেমন রেড রোডে কয়েক ঘন্টার জন্য মুসলমানদের নামাজ পড়া যাবে না। বলা হবে রাস্তা তোমার বাপের নয়। আর প্রধানমন্ত্রী আসবেন বলে যোগ দিবসের নামে সাত দিন সেই রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। ভ্রাতৃত্ব কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতা যতই সংবিধানে থাকুক না কেন ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া হবে। ধর্মীয় স্থানে মাইকের ব্যবহার শব্দ বিধির নিয়ম মেনে চলবে তার অর্থ করা হবে মসজিদের মাইক খুলে ফেলতে হবে। সরকারের শাসন চলার অর্থ হবে সংখ্যালঘুর প্রান্তিকিকরণ। ভালো না লাগলে মন্ত্রীর নিদান হবে—পাকিস্তানে চলে যাও। বিচার ব্যবস্থাকে একেবারে হাতের মুঠোর মধ্যে করা হবে। হচ্ছেও। সিএএ আবহে দিল্লি দাঙ্গার সময় দিল্লি হাইকোর্টে বিচারপতি ছিলেন মুরলীধরন। তখন দিল্লিতে বেপরোয়া চলছে— দেশকো গাদ্দারকো, গুলি মারো শালোকো। এরই প্রেক্ষিতে তিনি রায় দিলেন— ২৪ ঘন্টার মধ্যে দিল্লির পুলিশকে সেই বিজেপি রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। যারা মুসলিম সিএ এ প্রতিবাদীদের দেশদ্রোহী বলেছিল। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার করার কথা বলেছিলেন । ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারই বদলি হয়ে গেল, তাও মাঝরাতে। দিল্লি থেকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে। এর নাম যদি স্বৈরাচার না হয় তাহলে স্বৈরাচার কোনটা? বিচারপতি রঞ্জন গগৈ যখন বাদী, বিবাদীর মীমাংসা করতেন তখন সবার থেকে খোলা কাগজে মতামত গ্রহণ করতেন। কিন্তু মোদি সরকারের মতামত নিতেন সিল করা বন্ধ খামে। এতে অন্যরা সরকারের মতামত জানতে পারত না, তার ওপর মন্তব্যও করতে পারত না। সবাই চোখ কপালে তুলত আর বলতো— আনফেয়ার প্লে ইন দা জুডিশিয়ারি। ২০১৯ এর ৯ই নভেম্বর অযোধ্যার রায়ের ঘোষণা হয়েছিল। যুক্তির ওপর নয়, বিশ্বাসে ভর করে। আইনের ছাত্র থেকে শুরু করে, প্রগতির পথে হাঁটা সুস্থ শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ আইনের উপর ভরসা হারিয়েছিল। রায় দেওয়া প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবসরের চার মাসের মধ্যে রাজ্যসভার আসন উপহার পেয়েছিলেন। অভূতপূর্বভাবে চারজন উচ্চ আদালতের বিচারপতি রীতিনীতি ভেঙ্গে প্রধান বিচারপতি, সরকারের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন কেন— এসব থেকেই বোঝা যায়। ফ্যাসিবাদী প্রবণতার ঘটনা প্রবাহকে আড়াল করতে বিচার ব্যবস্থার এই কলঙ্ক পাঁক আজ সুবিস্তৃত।

বাক স্বাধীনতা ও ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকার মোদি সরকারের আমলে আজ বিপদাপন্ন। সোশ্যাল মিডিয়া যারা ব্যবহার করছে তাদের প্লাটফর্মের প্রতিবাদী বিষয়বস্তু দ্রুত মুছে ফেলার জন্য ২০২১ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন তৈরি করা হয়েছে। টুইটার বা এক্স-এ সরকারবিরোধী কথা বললেই তার অ্যাকাউন্ট ব্লক হবে কিংবা তাকে তলব করা হবে। একবার ছত্রিশগড়ে মোদি গিয়েছিলেন। দেখানো হয় যে তিনি সেখানকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলছেন। যখন জিজ্ঞাসা করছেন তখন কৃষকরা বলছে যে তাদের আয় দ্বিগুণ হয়েছে। পূন্য প্রসুন বাজপেয়ী তার সংবাদ সংস্থার টিম নিয়ে চলে গিয়েছিলেন সেই গ্রামে। কৃষকদের যখন জিজ্ঞাসা করলেন তখন তারা বললেন সেটা আসল কথা নয়। তাদের ওই কথা বলতে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল । এই ঘটনা সম্প্রচারের পর থেকেই সেই নির্দিষ্ট প্রোগ্রামটির সিগনালে সমস্যা আসতে শুরু করল। কালো দাগ। ব্রডকাস্টার বা সার্ভিস প্রোভাইডার বলল তাদের কোন সমস্যা নেই। ঠিক আছে। কিন্তু আসলে তো ওয়েবসাইটগুলোর মাইক্রো ব্লকিং। সরকার করছে। ক্যাচ দ্য ওয়েব ইন দা এয়ার। মিনিস্ট্রি অফ ইনফরমেশন আড়াইশো জনের টিমকে ঠিক করে রেখেছে যারা সব টিভি চ্যানেলের কন্টেন্ট পরীক্ষা করছে। অন্ধভক্ত মানে দেশপ্রেমী। গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ মতামত প্রদানে বিশ্বাসী? দেশদ্রোহী। ঘটনা বেশি দূর এগোলে রাষ্ট্রদ্রোহ আইন প্রয়োগ হবে। ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স, মিথ্যা মামলা ... এসব দিয়ে সংবাদমাধ্যম এখন মোদিদের মুঠোয়। তিনি নিজের মনের কথা জানানোর জন্য 'মন কি বাত' কে ব্যবহার করেন। অন্যের মনের কথা তিনি শোনেন না। এ পর্যন্ত তার সাংবাদিক সম্মেলন সংখ্যা শূন্য। সমগ্র পৃথিবীতে যা বিরল থেকে বিরলতম ঘটনা। সাংবাদিক থেকে সাধারণ মানুষ যারা তাকে কিছু বলতে চান তাদের মনে হয়তো রবীন্দ্র সংগীত বাজে- আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল-শুধাইল না কেহ। 

গণতন্ত্রে সরকার বা সরকারি সংস্থা বা তথাকথিত নিরপেক্ষ সংস্থাগুলিই বা তাহলে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে কেন? নির্বাচন কমিশন ২৭ লক্ষ মানুষকে কারণ, যুক্তি, আলাপ আলোচনা ছাড়াই বাদ দিয়ে রেখে নির্বাচন করে-কেউ জবাব দেয় না। লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি কেন শুধু বাংলায়, অন্য রাজ্যে কেন হলো না? জবাব পাওয়া যায় না। সিএএ-তে মুসলমানেরা নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবে না। কোন কারণে? সংবিধানে কোথায় লেখা আছে? লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড ছেড়ে ব্যবস্থার উঁচু- নীচুতে ছেড়ে দেওয়া হয় শ্রেণী, ধর্ম, জাত ইত্যাদিকে। গণতন্ত্রের বিপরীতে কোন সংস্থাকে আর স্বাধীন থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। ইতিহাস কিংবা ফিল্ম সেন্সার ইত্যাদি সব সংস্থার মাথায় গেরুয়াকরণের ব্যক্তিকে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাকে কুক্ষিগত করার জন্য। যাতে তার কাজকর্মে প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দুত্বের ধ্বজা।

সারা পৃথিবীর সূচকে অঘোষিত জরুরি অবস্থার মাত্রা ধরা পড়ছে। গণতন্ত্রের সূচক, মাধ্যমের স্বাধীনতার সূচক, দারিদ্র্যের সূচক, ক্ষুধার সূচক... ক্রমশ: নিচের দিকে নামছে দেশ। এইসব অবস্থা জানার জন্য যে তথ্য, সংবাদ, সমীক্ষা, পরিসংখ্যান জানার উপায় ছিল তাতে সরকার তালা দিয়েছে। এগুলো জানলে যে মানুষই 'আচ্ছে দিন' কিম্বা 'বিকশিত ভারত' এর পর্দা ফাঁস করে দেবে! সত্যি কথা নয় কিন্তু মিথ্যা কথা বলে সরকারকে মহিমান্বিত করবার জন্য 'পেইড নিউজ' এর পিছনেও সরকার আছে।

নির্বাচন কমিশনের মাথায় পর্যন্ত- ম্যান অফ অমিত শাহ। নিরপেক্ষতা তলানিতে। বিজেপিকে জেতানোর জন্য সংবিধানের পাতা ধরে নয় আরএসএসের ছকে এগোচ্ছে তারা। সংবিধানের বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্য আরএসএস বিজেপি কোনদিনই মানতে চায়নি। সবকিছুকে এক ঢালা করার জন্যই ওদের আকাঙ্ক্ষার— হিন্দি- হিন্দু- হিন্দুস্তান। বাংলায় ভোটে জেতার জন্য আমিষটা আসলে লোক দেখানো, তাদের মর্মে আছে নিরামিষ। সেটাকে সবার উপর চাপাতে চায়। পছন্দের স্বাধীনতা ওরা মানে না। সেই জন্যই এক দেশ, এক সংস্কৃতি, এক ভাষা ইত্যাদি। শেষে এসেছে এক দেশ, এক ভোট। সংবিধানের এক নম্বর ধারায় লেখা আছে— India, that is Bharat, shall be a union of States. ইউনিয়ন। এককের বৈশিষ্ট্য আছে, আবার একক গুলি মিলে যুক্ত হয়ে এক হওয়ার বৈশিষ্ট্যও আছে। তা নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপরে। এক দেশ, এক ভোট, সি এ এ, এন আর সি সব এক সূত্রে গাঁথা। এখানে ধর্মীয়, আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদী প্রবণতা প্রবলভাবে বিরাজ করছে। তা যদি না করে তাহলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে রাজনীতিকদের উপরে নজর পরে কি করে? তারা কোথায় যায়, কি খায়, কি পোশাক পরে, কার সঙ্গে কি বলে-নজরে রাখে কেন? কেন সরকারকে ইজরাইলের থেকে রাহুল গান্ধী সহ ৩০০ জন রাজনীতিকের উপর নজরদাড়ির জন্য পেগাসাস প্রযুক্তি কিনতে হয়? নজরদারি রাষ্ট্রও ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যের একটা উদাহরণ। ২০১৪ থেকে ১৯ সংসদে আনীত বিলগুলোর কেবলমাত্র ২৬ শতাংশের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছিল। বাকিগুলো কোন স্ট্যান্ডিং কমিটি ইত্যাদির মধ্যে না দিয়ে সরাসরি আইনে রূপান্তরিত হতো। ক্ষমতার জোরে। জোর করে। যখন স্পিকার ছিলেন সুমিত্রা মহাজন। তখন তো ৯০ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট বার করে এনেছিলেন গিলোটিনে। কেবলমাত্র আধ ঘণ্টায়। মতামত হরণ শুধু বিরোধীদের নয়, নিজেদের লোকেরাও বলার সুযোগ পাচ্ছে না। কর্তৃত্ববাদের কোন বাছাই থাকে না। 'সব এক' এর নতুন লব্জ হচ্ছে— এক দেশ, এক কোম্পানি। কোম্পানিটা যে আদানীর, সে ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই। এইদিকেই দেশ এগিয়ে চলেছে। কর্নাটকের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গে। ক্ষমতা পেয়েই বোমা পাঠিয়েছেন। চ্যালেঞ্জ করেছেন আরএসএস কে। কেন তোমার সংগঠন রেজিস্টার্ড নয়? তোমার সাংগঠনিক বিবরণী কোথায়? তুমি সংস্কৃতিক সংগঠন হও, বা যাই হও, তোমাকে ট্যাক্স দিতে হবে। আরএসএসের কোন জবাব নেই। শুধু বলেছে আমরা কোন বৈদেশিক টাকা পাই না। ফেসবুক থেকে সুধীর বাঙ্গেরার হুমকি পেয়েছেন গাড়িতে। ‘সময় এসেছে তোমাকে হত্যা করার’। অসহিষ্ণুতার আর এক পর্যায়। আরএসএস এক প্যারামিলিটারি গ্রুপ ‌। জঙ্গি হিন্দু জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠন। সংস্কৃতি সামনে থাকে, আর গোটা সরকারের মাগদর্শন হয়ে থাকে। এরা সেনাবাহিনীকে পর্যন্ত কাজে লাগায়। সবচেয়ে বড় উদাহরণ- পুলওয়ামা। নির্বাচনী বৈতরুণী পার হওয়ার জন্য কি কুৎসিত বিকৃতির প্রয়োগ! শহীদ সেনার বিনিময়ে। গোহত্যা, লাভ জিহাদ, অনার কিলিং, পুরুষতন্ত্র, ব্রাহ্মণ্যবাদ, মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো -আরএসএসের একের পর এক প্রকল্প। ইন্দিরা গান্ধীর পরিচালিত জরুরি অবস্থাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস হিসাবে। আজকের ঘোষণাহীন জরুরি অবস্থা অর্ধেক ছাড়িয়ে গিয়ে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার অনেক বেশি সন্ত্রাসের ডালপালা মেলেছে। বৈচিত্র্যের প্রকরণ আজ  অনেক বেশি।

অনেক দীর্ঘমেয়াদী, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সঙ্ঘ পরিবার ও তার রাজনৈতিক দল— বিজেপির। যে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করেছিল তা ছিল তাৎক্ষণিক। সেখানে কোন সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া ছিল না। আরএসএস, বিজেপি তাদের সরকারের মাধ্যমে যে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি করে রেখেছে তার প্রতিটি পর্ব সুচিন্তিত ষড়যন্ত্রের গাথা। এখানে কর্তৃত্বের প্রতিযোগিতা চলে। আগের চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র, যার পোশাকি নাম— কর্পোরেট কম্যুনাল নেক্সাস। মানুষের ওপর দমনপীড়ন হয় অংক করে। সে অংকে ধর্ম, জাতি, ব্যক্তি, প্রদেশ ইত্যাদি কাজ করলেও শেষ অবধি— সবার উপর পুঁজি সত্য, তাহার উপরে নাই। এই হল ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। নিয়ম ভেঙ্গে সব বাধা টপকানো। নিজের পছন্দের লোককে বসানো। সব মিলিয়ে ধান্দার ধনতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করা। ফ্যাসিবাদী প্রবণতার পূর্ব ধাপ। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থায় মনুবাদের প্রয়োগ ছিল না। সংরক্ষণের উপর নজর, তাকে ভাগ করে দেওয়া, জনগণনায় জাতকে যুক্ত না করার প্রবণতা, জাতভিত্তিক অত্যাচার সংক্রান্ত আইন লঘু করে দেওয়ার প্রয়াস, তফসিলি ,আদিবাসী, ওবিসি জনসংখ্যা অনুযায়ী উন্নয়নের অর্থ বরাদ্দ না হওয়া, অভূতপূর্ব ভাবে এই পশ্চাৎপদ অংশের উপর অত্যাচার বেড়ে যাওয়া— আজকের অঘোষিত জরুরি অবস্থার বৈশিষ্ট্য। মনিপুর থেকে শুরু করে আজকের বুলডোজার সংস্কৃতি এ কথা প্রমাণ করছে ৫ দশক আগেকার জরুরি অবস্থার চেয়ে এই শব্দহীন জরুরি অবস্থার অভিঘাত অনেক বেশি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে অঘোষিত জরুরি অবস্থাকে মোকাবিলা করতে ৫ দশক আগের ঘোষিত জরুরি অবস্থার শিক্ষা কি? এক কথায় অত্যাচার শেষ কথা বলে না। কিংবা ষড়যন্ত্র শেষ কথা বলে না। তাহলে কে বলে? জনগণ। হ্যাঁ, অত্যাচার চলে একটা সময়, কিছু সময় বা বেশ সময় ধরে। কিন্তু একটা সময় মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। আলোর সন্ধানে। সূর্য অভিযানে। এই আশাবাদ শাশ্বত।


প্রকাশের তারিখ: ২৫-জুন-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৫৭ টি নিবন্ধ
২৫-জুন-২০২৬

২১-জুন-২০২৬

১১-জুন-২০২৬

৩০-মে-২০২৬

২৭-মে-২০২৬

২৬-মে-২০২৬

২৫-মে-২০২৬

২২-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

০৫-মে-২০২৬