Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

পিপলস মার্কস (পর্ব ৬)

জুলিয়ান বোরচার্ডট
উৎপাদনের সেই গোটা সময়কালকে বিবেচনা করলে যে সময়ে শ্রমের কোনও যন্ত্র কারখানায় ব্যবহারের প্রথম দিন থেকে গুদামঘরে যাওয়ার দিন পর্যন্ত সেবা যুগিয়ে চলে। এ সময়ে তাদের ব্যবহার-মূল্য সম্পূর্ণরূপে শ্রমের দ্বারা ব্যবহৃত হয়। সেসবের বিনিময়-মূল্য সম্পূর্ণভাবে উৎপাদিত পণ্যে স্থানান্তরিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, সুতো-কাটার একটি যন্ত্র যদি দশ বছরে ক্ষয়ে যায় তাহলে দশ ফলস্বরূপ বছরের শ্রম-প্রক্রিয়ায় তার মোট মূল্য সেই উৎপাদিত পণ্যগুলিতে সময়কালে স্থানান্তরিত হয়।
Peoples Marx Part VI

মুখবন্ধ
সাধারণ অর্থে যাকে পাঠকমহল বলে সেখানে তো বটেই, এমনকি মার্কসবাদীদের মধ্যেও মার্কসের লেখা ‘পুঁজি’-র কদর যতটা, সচেতন চর্চা তার তুলনায় কিছুটা কমই। রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনায় মার্কসের কলমে মানবসমাজের ইতিহাস, চিরায়ত সাহিত্য, সমকালীন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং আইনের বহুবিধ প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব যেমন ঐ বইটিকে যত্ন করে ঘরের তাকে সাজিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি, তেমন না পড়ে ফেলে রাখার অজুহাতও। অনেকেই সে বাধা পেরিয়ে সকলের সুবিধার্থে মার্কসের লেখা’কে সহজ করে লিখতে চেয়েছেন। কার্ল কাউটস্কি’র মতো মার্কসবাদী পণ্ডিত’ও সে কাজে হাত দিয়েছিলেন, পুঁজির প্রথম খণ্ডের সরল সংস্করণ (পিপল’স এডিশন অফ মার্কস’স ক্যাপিটাল) করতে গিয়ে তিনি এবং এক্সটাইন জার্মান ভাষায় ৭০০ পৃষ্ঠার একটি বইও লিখে ফেলেন। ‘পুঁজি’র তিনটি খণ্ডকে একত্রে সরল ভাষায় করার কাজে তাদের দু হাজার পৃষ্ঠা প্রয়োজন বলে স্বীকার করে নেন। সেই ইতিহাস মাথায় রেখেই জার্মান লেখক জুলিয়ান বোরচার্ডট নিজেকে কুড়ি বছর সময় দিয়েছিলেন, তারই ফলশ্রুতি পিপল’স মার্কস। মূল বইটি ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বইটি, ১৯২১ সালে তারই ইংরেজি অনুবাদ প্রকশিত হয় লন্ডন থেকে, অনুবাদ করেন স্টিফেন এল ট্রাস্ক। বাংলা ভাষান্তরের জন্য আমরা সেই ইংরেজি সংস্করণটিকেই ব্যবহার করছি।

পঞ্চম পর্বের পর...

ষষ্ঠ অধ্যায়

স্থির পুঁজি ও পরিবর্তনশীল পুঁজি

স্থায়ী পুঁজি ও আবর্তনশীল পুঁজি

ইতিমধ্যে জানা হয়েছে যে উদ্বৃত্ত-মূল্য গড়ে ওঠে পণ্য উৎপাদনের সময়। কীভাবে তা ঘটে তাও আগের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিটি পৃথক উৎপাদন উদ্যোগে (অর্থাৎ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে) প্রাপ্ত উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণ বিনিয়োগকৃত পুঁজির পরিমাণ থেকে স্বাধীনভাবে পরিবর্তিত হবে। কারণ উদ্বৃত্ত-মূল্য একচেটিয়া কায়দায় জীবন্ত ও নতুনভাবে সম্পাদিত শ্রমের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে, উৎপাদনের নিছক উপকরণ থেকে তা আসে না।

আরেকবার তুলো কাটা শ্রমিকের উদাহরণে ফেরা যাক। সুতো তৈরির জন্য সমস্ত উৎপাদনের উপকরণ (তুলো ও শ্রমের যন্ত্রপাতি) বাবদ পুঁজিপতি ২৪ শিলিং এবং মজুরি বাবদ ৩ শিলিং পরিশোধ করেছিল। সুতো কাটার শ্রম ২৪ শিলিংয়ের অর্থাৎ উৎপাদনের উপকরণের কোনও মূল্য পরিবর্তন করেনি। সেই শ্রম সুতোয় ঐ একই মূল্য স্থানান্তর করেছে। উল্টোদিকে মজুরি বাবদ প্রদত্ত ৩ শিলিং-এর পরিবর্তে ৬ শিলিংয়ের এক নতুন মূল্য পাওয়া গেছে। সুতরাং উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহের জন্য অর্থাৎ কাঁচামাল, সহায়ক বিভিন্ন উপকরণ ও শ্রমের যন্ত্রপাতির জন্য  পুঁজিপতি তার পুঁজির যে অংশটুকু ব্যয় করে, উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় তার মূল্য পরিবর্তিত হয় না। তাই একে স্থির পুঁজি (কনস্ট্যান্ট ক্যাপিটাল) বলব।

অন্যদিকে, শ্রমশক্তি কেনার জন্য ব্যয় হওয়া পুঁজির অংশের মূল্য উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়। ঐ অংশ তার নিজের মূল্যকে পুনরুৎপাদন করার পাশপাশি একটি উদ্বৃত্ত-মূল্যও দেয়। সেই উদ্বৃত্ত-মূল্য বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কম বা বেশি হতে পারে। পুঁজির ঐ অংশ ক্রমাগত এক স্থির (অপরিবর্তনীয়) মাত্রা থেকে এক পরিবর্তনশীল (পরিবর্তনযোগ্য) মাত্রায় রূপান্তরিত হতে থাকে। একেই পরিবর্তনশীল পুঁজি (ভ্যারিয়েবল ক্যাপিটাল) বলা হবে।

পণ্য উৎপাদনের বিভিন্ন শাখায় উৎপাদনের উপকরণ (স্থির পুঁজি) এবং একই পরিমাণ মজুরি (পরিবর্তনশীল পুঁজি)-র অনুপাত ভিন্ন হতে পারে। একটি ইঞ্জিন কারখানায় শ্রমশক্তি দ্বারা ব্যবহৃত ও রূপান্তরিত যন্ত্রপাতির পরিমাণ একটি সুতোর কলে বা কয়লার খনিতে যেমনটি থাকে তার চাইতে আলাদা হবে। বলব। স্থির পুঁজি ও পরিবর্তনশীল পুঁজির পারস্পরিক ঐ অনুপাতকেই আমরা পুঁজির সক্রিয় গঠন কাঠামো (অর্গানিক কম্পোজিশন) বলব, ঐ অনুপাত উৎপাদনের একেকটি শাখায় একেকভাবে পরিবর্তিত হয়।

উৎপাদনের তিনটি ভিন্ন শাখায় বিনিয়োগ হওয়া তিন ভিন্ন পুঁজির সক্রিয় গঠন কাঠামো ধরা যাক এরকম-

  • পুঁজি ১ = ৮০ সি (স্থির) + ২০ ভি (পরিবর্তনশীল)
  • পুঁজি ২ = ৫০ সি (স্থির) + ৫০ ভি (পরিবর্তনশীল)
  • পুঁজি ৩ = ২০ সি (স্থির) + ৮০ ভি (পরিবর্তনশীল)

প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুঁজির মোট পরিমাণ ১০০

সি- কনস্ট্যান্ট ক্যাপিটাল, ভি – ভ্যারিয়েবল ক্যাপিটাল

তিনটি শাখাতেই শ্রমশক্তির শোষণকে অভিন্ন ধরা হল। উদাহরণ হিসাবে যদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই শ্রমশক্তি মজুরি হিসাবে যা পায় তার ঠিক দ্বিগুণ পরিমাণ মূল্য ফেরত দেয় তবে নিম্নলিখিত ফলাফল পাওয়া যাবেঃ

  • পুঁজি ১ পাবে ২০ শিলিং উদ্বৃত্ত-মূল্য
  • পুঁজি ২ পাবে ৫০ শিলিং উদ্বৃত্ত-মূল্য
  • পুঁজি ৩ পাবে ৮০ শিলিং উদ্বৃত্ত-মূল্য

শতাংশ হিসাবে মুনাফার গণনা করলে এর অর্থ তিন ক্ষেত্রে যথাক্রমে ২০%, ৫০% এবং ৮০% মুনাফা হবে। মনে রাখতে হবে শ্রমিকদের শোষণ সবজায়গায় একইরকম নয়। কিছু ক্ষেত্রে বেশি, অন্যত্র কম। উৎপাদনের বিভিন্ন শাখায় এমনকি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগেও উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণ নির্ধারণে আরও কিছু বিষয়েরও ভূমিকা থাকে যেমন পুঁজি আবর্তনের গতি, এ সম্পর্কে আমরা পরে আলোচনা করব।

এতে নিশ্চিত হয় যে দুটি ভিন্ন উৎপাদন উদ্যোগে বা আরও ছোট ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হলে দুটি ভিন্ন শাখায় প্রকৃত অর্থে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণ এক হতে পারে না। তা স্বত্বেও মুনাফার হারের ক্ষেত্রে বাস্তবে যে সমতা দেখা যায় তা কীভাবে ঘটে?

পাঁচটি ভিন্ন উৎপাদন শাখাকে উদাহরণ হিসাবে নেওয়া যাক। প্রতিটিতে বিনিয়োগকৃত পুঁজির সক্রিয় গঠন কাঠামো আলাদা। এও ধরে নেওয়া হল যে প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শ্রমশক্তি নিজের মূল্যের ১০০%ই উদ্বৃত্ত-মূল্য হিসাবে যোগান দেয়ঃ

পুঁজি

উদ্বৃত্ত

পণ্যের মূল্য

মুনাফার হার

১ = ৮০ সি + ২০ ভি

২০

১২০

২০%

২ = ৭০ সি + ৩০ ভি

৩০

১৩০

৩০%

৩ = ৬০ সি + ৪০ ভি

৪০

১৪০

৪০%

৪ = ৮৫ সি + ১৫ ভি

১৫

১১৫

১৫%

৫ = ৯৫ সি + ৫ ভি

১০৫

৫%

উপরের উদাহরণে শ্রমের শোষণ সবকটি ক্ষেত্রে একই থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি শাখায় মুনাফার হার রীতিমত আলাদা। পাঁচটি শাখায় বিনিয়োগ করা মোট পুঁজির পরিমাণ ৫০০; এর দ্বারা উৎপাদিত উদ্বৃত্ত-মূল্যের মোট পরিমাণ ১১০, উৎপাদিত পণ্যের মোট মূল্য ৬১০।

যদি ধরেও নেওয়া হয় যে ৫০০ সংখ্যা কোনও একক পুঁজিরই প্রতিনিধিত্ব করছে, ১ থেকে ৫ আসলে বিভিন্ন বিভাগ (যেমন তুলো কারখানায় কার্ডিং, রোভিং, সুতো কাটা ও বোনার জন্য বিভিন্ন বিভাগে স্থির ও পরিবর্তনশীল পুঁজির বিভিন্ন অনুপাত মেলে। সেক্ষেত্রে প্রথমে পুরো কারখানার গড় অনুপাতটিকে গণনা করতে হয়), তাহলেও দেখা যাবে 

৫০০ পরিমাণ পুঁজির গড় গঠন = ৩৯০ সি + ১১০ ভি 

বা 

প্রতি একশো হিসাবে =  ৭৮ সি + ২২ ভি

যদি ১০০-র পরিমাপে আলাদা করে প্রত্যেক পুঁজিকে মোট মূলধনের এক-পঞ্চমাংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তাহলেও তার গঠন হবে ঐ গড় অর্থাৎ ৭৮ সি + ২২ ভি। একইভাবে প্রতি ১০০-এর প্রতিটি ভগ্নাংশ দ্বারা নির্ধারিত গড় উদ্বৃত্ত-মূল্য হিসাবে ঐ ২২-কেই পাওয়া যাবে। তাই গড় মুনাফার হার ২২ শতাংশেরই সমান হবে, অতএব শেষপর্যন্ত মোট পণ্যের প্রতিটি পঞ্চমাংশের মূল্য হবে ১২২। সুতরাং অগ্রিম মোট মূলধনের প্রতিটি পঞ্চমাংশের পণ্যকে ১২২-মূল্যেই বিক্রি করতে হবে।

এসবের থেকে কোনওরকম ভুল সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর জন্য আরেকটি পরিস্থিতিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। স্থির পুঁজি অর্থাৎ উৎপাদনের উপকরণ মূলত দুটি ভিন্ন অংশ নিয়ে গঠিত হয়। স্থির পুঁজি গঠনকারী উৎপাদনের উপকরণ নানা ধরনের। উৎপাদনের প্রধান উপকরণ হলো কারখানার বাড়িঘর, যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম, কাঁচামাল ও সহায়ক উপকরণ অর্থাৎ যে সমস্ত যন্ত্রের সাহায্যে শ্রম সম্পাদিত হয় এবং যে সকল বস্তুতে শ্রমের প্রয়োগ করা হয়।

উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় প্রথমের উপাদানগুলি পরের উপাদানগুলির থেকে ভিন্ন ভূমিকা পালন করে। গরম করার কাজে ব্যবহৃত কয়লা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। যে অক্ষ বরাবর চাকা ঘোরে তাকে গ্রিজ করার জন্য ব্যবহৃত তেলেরও তাই হয়। রং এবং অন্যান্য সহায়ক উপকরণও ক্রমশ অদৃশ্য হয়, তবে সেসব পণ্যের গুণাবলীতে প্রকাশিত হয়। কাঁচামাল পণ্যের সারটুকু গঠন করে, কিন্তু সে কাজে নিজের রূপটি পরিবর্তন করে। সংক্ষেপে, কাঁচামাল ও সহায়ক উপকরণ উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণরূপে ব্যবহৃত হয়ে যায়। প্রক্রিয়ার শুরুতে তাদের যে চেহারা ছিল তার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।

উৎপাদনের যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে অবশ্য পরিস্থিতিটি কিছুটা ভিন্ন। সরঞ্জাম, যন্ত্র, কারখানা, এমনকি উতয়াদনের কাজে লাগে এমন একটি পাত্র অবধি ততক্ষণই উপযোগী যতক্ষণ তারা নিজেদের মূল চেহারাটুকু ধরে রাখে। যতক্ষণ তারা আজকের মতো একই চেহারায় আগামীকালের জন্য নির্দিষ্ট শ্রম-প্রক্রিয়াতেও ব্যবহারযোগ্য থাকে। সমগ্র শ্রম-প্রক্রিয়ায় পণ্যের সাপেক্ষে তারা যেমন নিজস্ব মূল চেহারা ধরে রাখে, তেমনি ক্ষয়ও চলতে থাকে। যন্ত্র, সরঞ্জাম, কারখানার চেহারা যে পণ্য তৈরিতে সহায়তা করেছে তার থেকে স্বাধীনভাবেই বিদ্যমান থাকে।

উৎপাদনের সেই গোটা সময়কালকে বিবেচনা করলে যে সময়ে শ্রমের কোনও যন্ত্র কারখানায় ব্যবহারের প্রথম দিন থেকে গুদামঘরে যাওয়ার দিন পর্যন্ত সেবা যুগিয়ে চলে। এ সময়ে তাদের ব্যবহার-মূল্য সম্পূর্ণরূপে শ্রমের দ্বারা ব্যবহৃত হয়। ফলস্বরূপ সেসবের বিনিময়-মূল্য সম্পূর্ণভাবে উৎপাদিত পণ্যে স্থানান্তরিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, সুতো-কাটার একটি যন্ত্র যদি দশ বছরে ক্ষয়ে যায় তাহলে দশ বছরের শ্রম-প্রক্রিয়ায় তার মোট মূল্য সেই সময়কালে উৎপাদিত পণ্যগুলিতে স্থানান্তরিত হয়।

শ্রমের কাজে ব্যবহৃত যেকোনও যন্ত্রের জীবনকাল এভাবেই বারংবার পুনরাবৃত্ত অনেকগুলি শ্রম-প্রক্রিয়ার সমষ্টি নিয়ে গঠিত হয়। সেই নিরিখে শ্রমের যন্ত্র ও মানুষের মধ্যে একটি সাদৃশ্য রয়েছে। প্রতিটি অতিবাহিত দিন তাকেও মৃত্যুর দিকে ২৪ ঘণ্টা কাছে নিয়ে আসে, যদিও একজন মানুষকে দেখে তার উপলব্ধি করা অসম্ভব যে সে ইতিমধ্যে ঐ চূড়ান্ত লক্ষ্যের কতটা কাছে চলে গেছে। অবশ্য এর জন্য জীবন বিমা কোম্পানিগুলি মানুষের গড় আয়ু নিয়ে গবেষণা থেকে অত্যন্ত নির্ভুল ও অত্যন্ত লাভজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কোনও বাধা পায় না। শ্রমের যন্ত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা চলে।

অভিজ্ঞতাই শেখায় একটি নির্দিষ্ট শ্রমের যন্ত্র যেমন কোনও মেশিন গড়ে কতদিন টেকে। যদি ধরে নেওয়া যায় শ্রম-প্রক্রিয়ায় তার ব্যবহার-মূল্য কেবল ছয় দিন স্থায়ী তবে তার অর্থ হবে ঐ মেশিন গড়ে প্রতিদিন তার ব্যবহার-মূল্যের / অংশ হারাচ্ছে। এক্ষেত্রে যন্ত্রটি দৈনিক পণ্যে নিজের মূল্যের / অংশই স্থানান্তরিত করবে। প্রতিটি শ্রমের যন্ত্রের ক্ষয়কে এভাবেই গণনা করা হয়।

একটি উৎপাদনের যন্ত্র নিজের ব্যবহার-মূল্যের ধ্বংসের মাধ্যমে যতটা হারায় কখনো উৎপাদিত পণ্যে তার চাইতে বেশি মূল্য স্থানান্তরিত করে না। হারানোর মতো আর কোনো মূল্য না থাকলে, অর্থাৎ সেটি যদি নিজে মানুষের শ্রমের পণ্য না হয় তাহলে পণ্যে কোনো মূল্যই স্থানান্তরিত হত না। তখন সেটি ব্যবহার-মূল্য নির্মাণে কাজ করলেও বিনিময়ের জন্য কোনও মূল্য সৃষ্টি করত না। মানুষের শ্রমের থেকে স্বাধীনভাবে বিদ্যমান যেমন মাটি, বায়ু, জল, খনির কয়লা, বনের কাঠ ইত্যাদি, অর্থাৎ উৎপাদনের সেই সমস্ত উপকরণের ক্ষেত্রেই এ যুক্তি প্রযোজ্য।

উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় শ্রমের যন্ত্রকে সর্বদাই নিজের সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার্য শক্তি নিয়ে সহযোগিতা করতে হবে, এমনকি তার বিনিময়-মূল্য কম হলেও। ধরা যাক কোনও একটি যন্ত্রের মূল্য ১০০০ শিলিং এবং সে ১০০০ দিনে ক্ষয়ে যায়। এক্ষেত্রে যন্ত্রের মূল্যের /১০০০ অংশ প্রতিদিন দৈনিক পণ্যে স্থানান্তরিত হবে। এর পরেও যন্ত্রটি শ্রম-প্রক্রিয়ায় কাজ করে চলে, যদিও তা চলে ক্রমহ্রাসমান কার্যক্ষমতা সহ।

স্থির মূলধন সংক্রান্ত এ অংশের, অর্থাৎ শ্রমের যন্ত্রের বিশেষত্ব হল এই যে সক্রিয় হওয়া এবং ক্ষয়ের সাথে সাথেই তার মূল্যের একটি অংশ পণ্যে স্থানান্তরিত হয়। অন্যদিকে আরেকটি অংশ শ্রমের যন্ত্রেই আটকে থেকে, ফলত উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় আবদ্ধ রয়ে যায়। এভাবে আবদ্ধ থাকা মূল্য ক্রমাগত হ্রাস পায়, যতক্ষণ না শ্রমের যন্ত্র ক্ষয়ে যায়। এভাবে যন্ত্রের মূল্য একাধিক বারবার পুনরাবৃত্ত শ্রম-প্রক্রিয়ার ফলে উৎপাদিত বহু পণ্যের মধ্যে বিতরণ হয়ে যায়। কিন্তু যতক্ষণ তা শ্রমের যন্ত্র হিসাবে কাজ করে চলে অর্থাৎ যতক্ষণ একই ধরনের অন্য যন্ত্র দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন না হয় ততক্ষণ অবধি স্থির পুঁজি তাতে আবদ্ধই থাকে। এতে আবদ্ধ মূল্যের অন্য অংশটুকুই পণ্যে স্থানান্তরিত হয় যার ফলে পণ্যের মূল্যের একটি উপাদান হিসাবে আবর্তিত হয়ে চলে।

পুঁজির যে অংশ শ্রমের যন্ত্রে আবদ্ধ থাকে সেটি অন্য যেকোনও পুঁজির মতোই আবর্তিত হতে থাকে। সম্পূর্ণ পুঁজির মূল্য ক্রমাগত আবর্তনে ব্যস্ত থাকে এবং সে অর্থে সমস্ত পুঁজিকেই আবর্তনশীল পুঁজি বলা যায়। কিন্তু আমরা যে অংশটিকে বিবেচনা করেছি তার আবর্তন বিশেষ ধরনের। এটি তার ব্যবহার-রূপে আবর্তিত হয় না, কেবল তার মূল্যটিই আবর্তিত হয়। সেই আবর্তন চলে ধীরে, খণ্ডে খণ্ডে এবং সেভাবে ততটুকুই পণ্যে স্থানান্তরিত হয় যতটুকু পণ্য হিসাবে আবর্তনের প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে।

যন্ত্রের সক্রিয়তার সম্পূর্ণ সময়কালে তার মূল্যের একটি অংশ অপরিবর্তিতভাবে নিজের মধ্যে আবদ্ধ থাকে এবং এটি যে পণ্য উৎপাদনে সহায়তা করে তার উপরে নির্ভর করেই স্বাধীন থাকে। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে স্থির পুঁজির ঐ অংশ স্থায়ী পুঁজির রূপ নেয়। এর বিপরীতে অগ্রিম হিসাবে প্রদত্ত পুঁজির অন্যান্য সমস্ত উপাদান আবর্তনশীল পুঁজি গঠন করে। এটুকু বুঝতে আর অসুবিধা নেই যে পুঁজির বিভিন্ন উপাদান যেভাবে উৎপাদিত পণ্যে নিজের নিজের মূল্যকে স্থানান্তরিত করে তাদের পার্থক্য প্রতিটি আলাদা পুঁজির দ্বারা উৎপাদিত উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণকেও প্রভাবিত করবে। উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎস আড়াল করার প্রবণতাও ঐ বৈশিষ্টে থাকে।

সম্পূর্ণ পণ্যের দিকে নজর দেওয়ার সময় স্থির পুঁজি (উৎপাদনের উপকরণ) এবং পরিবর্তনশীল পুঁজি (মজুরি)-র মধ্যে পার্থক্য পুঁজিপতির চোখে পড়ে না। সে জানে উৎপাদন খরচের (পণ্যের খরচ) একটি অংশ উৎপাদনের যন্ত্রে এবং আরেকটি অংশ মজুরিতে ব্যয় হয়েছে। এও জানে যে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হলে পণ্য বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থকে একইভাবে ব্যবহার করে পুনরায় উৎপাদনের যন্ত্র ও শ্রমশক্তি কেনার কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু মূল্য ও উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎস সম্পর্কে এর থেকে কিছুই জানা যায় না। সে খালি দেখে যে উৎপাদনের উপকরণের মূল্য উৎপাদন-প্রক্রিয়া শুরুর আগে যেমনটি ছিল সেভাবেই পণ্যের খরচ মূল্যে পুনরাবির্ভূত হচ্ছে কিনা, মজুরির ক্ষেত্রেও তার মনোযোগের বিষয় সেটাই। স্থির ও পরিবর্তনশীল পুঁজির মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য এভাবেই বাহ্যিক চেহারার সুবাদে আড়াল হয়েই থেকে যায়। এর ফলে উৎপাদন-প্রক্রিয়ার শেষে পাওয়া উদ্বৃত্ত-মূল্য পুঁজির সমস্ত উপাদান থেকে সমানভাবে উদ্ভূত বলেই মনে হয়।

স্থায়ী ও আবর্তনশীল পুঁজির পার্থক্য কিন্তু এর তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট। ধরা যাক কাঁচামাল বাদ রেখে শ্রমের যন্ত্রের মূল্য ১২০০ শিলিং, কাঁচামালের মূল্য ৩৮০ শিলিং এবং মজুরির জন্য ১০০ শিলিং খরচ হল। আরও ধরা হল উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় শ্রমের যন্ত্রের ক্ষয়প্রাপ্তি হয় ২০ শিলিং মূল্যের। 

এক্ষেত্রে পণ্যের খরচ বাবদ মূল্য = ক্ষয়-ক্ষতির জন্য ২০ শিলিং + কাঁচামাল ও সহায়ক উপকরণের জন্য ৩৮০ শিলিং + মজুরির জন্য ১০০ শিলিং = মোট ৫০০ শিলিং

উদ্বৃত্ত-মূল্য থেকে স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণ পণ্যের রূপে পুঁজিপতি ঐ ৫০০ শিলিং হাতে পায়। কিন্তু এর সঙ্গে যন্ত্র, কারখানা ইত্যাদিও রয়েছে যাদের মোট মূল্য ১১৮০ শিলিং। সেসব তো আর উপেক্ষা করা যায় না, তাই পুঁজিপতির কাছে বিষয়টি এরকম দাঁড়ায়- পণ্যের মূল্যের ২০ শিলিং এসেছে শ্রমের যন্ত্রের ক্ষয় থেকে (স্থায়ী পুঁজি), ৪৮০ শিলিং এসেছে কাঁচামালের ক্ষয় ও মজুরি বাবদ (আবর্তনশীল পুঁজি)। অন্যভাবে কাঁচামাল ও মজুরির আকারে আমি (অর্থাৎ পুঁজিপতি) উৎপাদনে যা বিনিয়োগ করছি তা একটি মাত্র উৎপাদন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমার কাছেই পুনরায় ফিরে আসছে। শ্রমের যন্ত্রে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয় তা প্রক্রিয়ার মধ্যেই দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে এবং ধীরে ধীরে ফেরত আসে। তাই একে ধীরে ধীরেই পুনরায় সঞ্চয় করতে হবে যাতে যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত হলে সেগুলি প্রতিস্থাপনের জন্য সমতুল্য মূল্য পাওয়া যাবে।

এভাবেই পুঁজিপতির মাথায় স্থায়ী ও আবর্তনশীল পুনির পার্থক্য গেঁথে বসে। কিন্তু এমন বিবেচনায় মজুরিকেও বিনা প্রশ্নেই আবর্তনশীল পুঁজি হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। কাঁচামালের খরচের মতো উৎপাদন-প্রক্রিয়া থেকেই মজুরিকেও  পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং পুনরায় নতুন শ্রমশক্তি কেনার জন্য তৈরি থাকতে হবে।

এভাবে মজুরি (অর্থাৎ পরিবর্তনশীল পুঁজি) নিজের বাহ্যিক রূপের কারণে কাঁচামালের (অর্থাৎ স্থির পুঁজির একটি অংশের) সঙ্গে গুলিয়ে যায় এবং এদুটিকেই একসাথে শ্রমের যন্ত্রের (অর্থাৎ স্থির পুঁজির অন্য অংশের) বিপরীতে বসিয়ে বিবেচনা করা হয়।

গোটা উৎপাদনক্রিয়াকে উপর থেকে দেখা যেকোনও পর্যবেক্ষকের জন্য কারখানার বাড়িঘর, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি হয়ে  ওঠে স্থায়ী পুঁজি, অন্যদিকে কাঁচামাল, সহায়ক উপকরণ ও মজুরি হয়ে পড়ে আবর্তনশীল পুঁজি। এভাবেই একদিকে মজুরি আর অন্যদিকে আবর্তনশীল পুঁজির অন্যান্য অংশের মধ্যে যে মূলগত পার্থক্য রয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে আড়ালে চলে যায়।

(চলবে)

পুঁজি, ১ম খণ্ড, অষ্টম ও নবম অধ্যায়; 
তৃতীয় খণ্ড, প্রথম ভাগ, অষ্টম–দশম অধ্যায়; 
দ্বিতীয় খণ্ড, অষ্টম অধ্যায় (জার্মান সংস্করণ) থেকে সংকলিত
মূল ইংরেজি, জুলিয়ান বোরচার্ডট
বাংলা ভাষান্তর – সৌভিক ঘোষ

 


প্রকাশের তারিখ: ২০-জুলাই-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay