সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়— সূচনা থেকে আজকের দিন
বিজয়া গোস্বামী
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আজকের রূপ তা গড়ে উঠেছে বহুদিন ধরে, এবং তার সূচনা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গ হিসেবে— স্বদেশী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার আজীবনের যোগ— বলতে গেলে আমার জন্মের আগে থেকে।... আজ এই সময় প্রবল আক্রমণ নেমে আসছে আমাদের উপরে। কিন্তু তাতে ভয় পেলে তো চলবে না! এর আগেও দুর্দিন এসেছে। সবাই জানেন রক্তাক্ত এক সময় এসেছিল এই প্রতিষ্ঠানে। সেদিন আমরা মনোবলে এই দুর্দিন কাটিয়ে উঠেছিলাম— আজও পারব— নিশ্চয় পারব!

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আজকের রূপ তা গড়ে উঠেছে বহুদিন ধরে, এবং তার সূচনা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গ হিসেবে— স্বদেশী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার আজীবনের যোগ— বলতে গেলে আমার জন্মের আগে থেকে। আজ মনে হচ্ছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্বন্ধে আজকের প্রজন্ম শুধু নয়, আমাদের প্রজন্মেরও সম্যক জ্ঞান নেই। তার জন্য অবশ্য আমরাই দায়ী। তাই মনে করছি, যেটুকু পারি, সে সম্বন্ধে সাধারণকে অবহিত করার চেষ্টা করছি।
আগেই বলেছি, জন্মসূত্রেই আমার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ। আমার পরিবারের সঙ্গে গত তিন পুরুষ ধরে এই প্রতিষ্ঠানের যোগ— বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের উদ্ভবের সময় থেকে। বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ বা The National Council of Education, Bengal, নামক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল বিশেষ এক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে। ব্রিটিশ শাসকের দীর্ঘকালের নানা অত্যাচার অবিচার উৎপীড়নে সারা দেশ যেন একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল। স্বাধীন চিন্তা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, শুধু নিজের নয়, সমগ্রভাবে দেশবাসীর মঙ্গলামঙ্গল বিবেচনা করা— এসবের যে কোন স্থান আছে, সেটা এই দেশবাসীর সুপ্ত চেতনায় পরিস্ফুট হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ছিল। মানুষ জেগেই ছিল, কিন্তু মুক্তির পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই একদিন দেখা গেল, দেশ যেন হঠাৎ জেগে উঠল— কিন্তু এই জাগরণ কিছু আকস্মিক ব্যাপার ছিল না। এই নতুন যুগের উন্মেষ ঘটিয়েছিল পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতার সংযোগ, যুক্তিবাদ, চিন্তার মুক্তি, নিজস্বতা বজায় রাখার আন্তরিক কামনা— এই ভাবধারাই নতুন যুগের উন্মেষ ঘটিয়েছিল। চিন্তার মুক্তি থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে ছিল রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এই সব ভাবনার পরিণতি ঘটল শিক্ষার মুক্তির বাসনায়। শুধুমাত্র ব্রিটিশ সরকারের অন্নদাস সেবক তৈরি করা নয়, শিক্ষার যে ব্যাপকতর ভূমিকা আছে, তা দেশনেতারা অন্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন, এবং দেশবাসীদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যের কথা, মুক্তির বাণী তাঁরা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তারই ফলে সারা দেশে গড়ে উঠেছিল একতাবদ্ধ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক আন্দোলন। তার পরের কথা সকলেরই জানা। 
১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে এরই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় শিক্ষার ভাবনা দানা বেঁধে উঠছিল। জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৬৫-১৯৪৮) উদ্যোগে গড়ে ওঠে The Dawn Society— তাঁরই সম্পাদনায়। এই প্রতিষ্ঠান থেকে একদিকে জাতীয় ঐতিহ্য, জাতীয় স্বার্থ, শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধ, নিঃস্বার্থ জনসেবা— এই সব ছাত্রদের মধ্যে নিবেশিত করা, এবং তার সঙ্গে বিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রযুক্তি, এই সব শিক্ষায় তাদের দীক্ষিত করা— এই ছিল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভাঙন ধরেছে, তখন ভাইসরয় লর্ড কার্জন অকস্মাৎ ‘প্রশাসনিক প্রয়োজনে’ বাংলাকে দু’ভাগ করলেন— হিন্দু ও মুসলমান! সারা দেশ গর্জে উঠল— এই আঘাতে স্বদেশী আন্দোলন দ্বিগুণ ভাবে ছড়িয়ে গেল সারা দেশে, এমনকি বিদেশেও! শুরু হল ‘বয়কট’— বিদেশী সব পণ্য বস্তু বর্জন করা! সেই সঙ্গে বিদেশী শিক্ষাও বর্জন করা হল! The Dawn Society মিলিয়ে গেল জাতীয় শিক্ষা পরিষদে! ছাত্রেরা দলে দলে বেরিয়ে এলেন বিদেশী শিক্ষালয়গুলি থেকে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যারিস্টার স্যার আশুতোষ চৌধুরী বাংলার সব চিন্তাশীল মানুষকে আহ্বান করলেন একটি সভায়, ১৬ই নভেম্বর, ১৯৫০, Bengal Landholders’ Association-এর সভাভবনে (পার্ক স্ট্রীট)। বাংলার বহু জ্ঞানীগুণী ও সমাজ সচেতন মানুষই সভায় যোগ দেন। এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে একটি জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, যার পরিচালনায় সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, এবং বিশেষ করে প্রযুক্তির বিষয়ে পাঠক্রম প্রস্তুত করতে হবে। এই কাজের জন্য একটি প্রভিশনাল কমিটি তৈরি হয়, যেখানে সেই যুগের উজ্জ্বল তারকামণ্ডলী সেইসভা উজ্জ্বল করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডাঃ রাসবিহারী ঘোষ, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, তারকনাথ পালিত, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী, রাজা পিয়ারীমোহন মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধচন্দ্র মল্লিক, হেরম্ব চন্দ্র মৈত্র, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সতীশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ডাঃ আর জি কর, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ। এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে আরও ছিলেন ব্যারিস্টার ব্যোমকেশ চক্রবর্তী— আমার বাবার মাতামহ। এই কমিটিতে ট্রাস্টি হিসেবে নাম ছিল রাজা পিয়ারীমোহন মুখোপাধ্যায়, তারকনাথ পালিত, সুবোধচন্দ্র মল্লিক, গণেশচন্দ্র চন্দ্র এবং কালীনাথ মিত্রের।
এই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ৯ নভেম্বর একটি বিশাল জনসভা— অন্তত ১৫০০০ মানুষের এক সমষ্টি— অনুষ্ঠিত হল কর্নওয়ালিস স্ট্রীটে, ফীল্ড এণ্ড একাডেমি ক্লাবের মাঠে (পান্তির মাঠ)— যেখানে পরে বিদ্যাসাগর কলেজের হস্টেল হয়েছিল। এখানে উপস্থিত অধিকাংশই ছাত্র। এই সভায় পূর্ব সভার প্রস্তাব সাদরে গৃহীত হয়। এখানে সুবোধচন্দ্র মল্লিক ঘোষণা করেন, তিনি জাতীয় শিক্ষা পরিষদকে নতুন করে গড়ার জন্য এক লাখ টাকা দান করবেন! এই ঘোষণায় ছাত্রেরা প্রবল আনন্দে ফেটে পড়ে। তারা সেখানেই শ্রীমল্লিককে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করে। মনে রাখতে হবে, সেযুগে এক লাখ টাকার মূল্য আজকে হয়তো কয়েক কোটিতে দাঁড়াতে পারে। দেশবাসীর এই ‘রাজা’ উপাধি আজীবন তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে। সভার শেষে ছাত্রগণ তাঁর গাড়ির ঘোড়াগুলি খুলে নিজেরাই সেই জায়গায় তাঁর গাড়ি টেনে তাঁকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। তাঁর এই বদন্যতায় অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও মহারাজা সূর্য্যকান্ত আচার্য্য যথাক্রমে ৫ লাখ ও আড়াই লাখ টাকা এই উদ্দেশ্যে দান করেন। এই সব আলোচনার ভিত্তিতে National Council of Education বা জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গড়ে ওঠে। একে পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত করা হয়।

পরবর্তী সময় একাধিক স্কুল ও কলেজ এই পরিষদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে। তারও পরে এখান থেকেই গড়ে ওঠে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট এবং আরো পরে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ও স্কুল— ফলে প্রযুক্তি ও অন্যান্য সব বিষয়েরই চর্চা হত। এই দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ, এবং সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। অর্থাভাবের কারণে শিক্ষকেরা কেউ বিনা পারিশ্রমিকে এবং কেউ সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ করতেন। শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন অরবিন্দ স্বয়ং, সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সখারাম গণেশ দেউস্কর, ভিক্ষু পূর্ণানন্দ, বিনয়কুমার সরকার প্রমুখ। এক্সটেনসন লেকচার দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আনন্দ কে কুমারস্বামী, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখ।
আরও পড়ুন—যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও নয়া জাতীয়তাবাদীগণ
এর দীর্ঘদিন পরে পূর্বের মনীষী ও ছাত্রগণের স্বপ্ন সফল হল। ২২ ডিসেম্বর ১৯৫৫ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হল। তিনটি অনুষদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা— কারিগরী, বিজ্ঞান ও কলা। এই সব শাখায় কি পাঠ্যবস্তু থাকবে, কারা কি পড়াবেন, ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ দিতে অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের প্রভূত উৎসাহে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। প্রথম উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ত্রিগুণা সেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি অপূর্ব প্রতীক সৃষ্টি করেছিলেন শিল্পগুরু নন্দলাল বসু। শ্রীঅরবিন্দের নামে প্রশাসনিক ভবনের নাম দেওয়া হয়েচিল, ‘অরবিন্দ ভবন’। এই ভবনে ঢুকেই সামনে সিঁড়ির উপরে অরবিন্দের আবক্ষ মূর্তি। একতলায় কমিটি রুম নং ১। তার দেওয়াল জুড়ে আগে ছিল বড় বড় অয়েল পেন্টিং-এ তাঁদের ছবি, যাঁদের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের অন্যতাম সেরা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। এখানে শ্রী অরবিন্দ তো আছেনই, আছেন রবীন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং আরও অনেকে। আমার পূর্বপুরুষ সূর্য্যকান্তও আছেন। এঁদের আবক্ষ মূর্তিগুলি সমাবর্তন মণ্ডপে আগে সাজানো হত— আজকাল অবশ্য হয় না!
আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী, গবেষিকা, অধ্যাপিকা— তিনটি ভূমিকাতেই কাটিয়েছি, ১৯৭১ থেকে ২০১৫ অবধি। শুরু থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি এবং দিতে চেষ্টা করেছি, তা হল, শুধু নিজের জন্য নয়, সবার জন্য বাঁচা, শুধু নিজে ভালো থাকা নয়, সবাইকে ভালো রাখার চেষ্টা করা। দেশের সকলে ভালো না থাকলে আমরা কেউই ভালো থাকতে পারব না, আবার সারা পৃথিবীতে জনসাধারণ ভালো না থাকলে কেই বা ভালো থাকতে পারে! যাঁরা সেযুগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁরা তো এ নিয়ে মাথা না ঘামালেও পারতেন! আরামে ইংরেজের পদদাস হয়ে থাকতেন! আজ যে যাদবপুর লক্ষ লক্ষ তরুণ জীবনকে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের নিয়ে ভাবনার কি দরকার ছিল!
আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে আছে সারা দুনিয়ায়। আজ এই সময় প্রবল আক্রমণ নেমে আসছে আমাদের উপরে। কিন্তু তাতে ভয় পেলে তো চলবে না! এর আগেও দুর্দিন এসেছে। সবাই জানেন রক্তাক্ত এক সময় এসেছিল এই প্রতিষ্ঠানে। সেদিন আমরা মনোবলে এই দুর্দিন কাটিয়ে উঠেছিলাম— আজও পারব— নিশ্চয় পারব!
প্রকাশের তারিখ: ২৭-আগস্ট-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
