সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা পূরণের লড়াই চলবে
জ্যোতি বসু
খবর পেলাম, চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার দখল করেছেন। সশস্ত্র ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে অসীম সাহসী লড়াই চালাচ্ছেন সহায়-সম্বলহীন দেশপ্রেমিক বিপ্লবীরা। আমি তখন সেন্ট জেভিয়ার্সে এইটথ্ স্ট্যান্ডার্ডের ছাত্র। মনে নাড়া দিয়েছিল এই ঘটনা। আমাদের স্কুলে তো কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি যে বাঙালি যুবকরা একাজ করেছে। পরে নিঃসংশয় হওয়া গেল যে এটা তাঁদেরই কাজ। সেন্ট জেভিয়ার্সের ফাদাররা এই ঘটনার নিন্দা করে তখন লিফলেট দেন। লিফলেট বিলির সময় আমি প্রতিবাদ করি। আমি বললাম, ওঁরা দেশের জন্য কাজ করছেন। স্কুল কেন ওঁদের বিরুদ্ধে লিফলেট দেবে?

আজ স্বাধীন ভারতের ষাট বছর পূর্ণ হল।* একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে আজ আমাদের আনন্দের দিন, গর্বের দিন। অসংখ্য মানুষের রক্ত, আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অসংখ্য মানুষ স্বাধীনতার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন, তার অনেকটাই এখনও অপূর্ণ থেকে গেছে। ষাট বছর পেরিয়ে এসে আমাদের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে, কেন আকাঙ্ক্ষাগুলি অপূর্ণ থেকে গেল। তা পূরণ করার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
স্বাধীনতার আগেই সেই উত্তাল দিনগুলির কথা মনে ভাবি, তখন অনেক ঘটনার কথাই মনে পড়ে যায়। আমার জন্ম হয়েছিল একটি অরাজনৈতিক পরিবারে। রাজনীতির সঙ্গে কোনও যোগ ছিল না বললেই চলে। তবে বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা ছিল, কিন্তু সেটা উচ্চস্বরে ঘোষিত হত না। মার কাছেই শুনেছি, দ্বিতীয় বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিপ্লবী মদনমোহন ভৌমিক আমাদের বারদির বাড়িতে অস্ত্রসহ বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করে ছিলেন।
১৯৩০-৩১ সালে গোটা বাংলা জুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈপ্লবিক জোয়ার। খবর পেলাম, চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার দখল করেছেন। সশস্ত্র ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে অসীম সাহসী লড়াই চালাচ্ছেন সহায়-সম্বলহীন দেশপ্রেমিক বিপ্লবীরা। আমি তখন সেন্ট জেভিয়ার্সে এইটথ্ স্ট্যান্ডার্ডের ছাত্র। মনে নাড়া দিয়েছিল এই ঘটনা। আমাদের স্কুলে তো কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি যে বাঙালি যুবকরা একাজ করেছে। পরে নিঃসংশয় হওয়া গেল যে এটা তাঁদেরই কাজ। সেন্ট জেভিয়ার্সের ফাদাররা এই ঘটনার নিন্দা করে তখন লিফলেট দেন। লিফলেট বিলির সময় আমি প্রতিবাদ করি। আমি বললাম, ওঁরা দেশের জন্য কাজ করছেন। স্কুল কেন ওঁদের বিরুদ্ধে লিফলেট দেবে? কিন্তু আমার অবাঙালি, বিশেষ করে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বন্ধুদের একথা পছন্দ হল না। তাদের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি-বচসা হল। এই ঘটনার কথা আমার বেশ মনে আছে।
আরও কিছু টুকরো ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ১৯৩০ সালের শুরুতে হবে, একদিন শুনলাম গান্ধীজী অনশন শুরু করেছেন। মনটা কেমন ভার লাগল। বাবাকে বললাম, আজ স্কুলে যাবো না। বাবা আপত্তি করলেন না। বাবার সঙ্গে চলে গেলাম তাঁর চেম্বারে। ওই সময়েই একদিন শুনলাম সুভাষচন্দ্র বসু অক্টারলোনি মনুমেন্টের (এখনকার শহিদ মিনার) সামনে ভাষণ দেবেন। আমি আর আমার এক জ্যেঠতুতো ভাই ঠিক করলাম, আমরাও যাবো। তখন খদ্দর পরতাম না। কিন্তু সেদিন একটা আবেগ পেয়ে বসল। দু’ভাই খদ্দর পরে গিয়ে দেখি সে এক যেন রণক্ষেত্র। চারিদিকে ঘোড়সওয়ার, লাঠিধারী পুলিস, সার্জেন্ট। কিছুক্ষণের মধ্যেই সার্জেন্টরা লাঠি চালাতে শুরু করল, চারিদিকে দৌড়াদৌড়ি, আমরা দু’ভাই ঠিক করলাম— পালাবো না। পালাবো কেন? পালানো মানে ভয় পেয়েছি। আমাদের গায়েও লাঠির ঘা পড়ল। আমরা দ্রুত হেঁটে বাবার চেম্বারে চলে এলাম। কিন্তু কাউকে কিছু বললাম না। বাড়িতে এসে শুধু মাকে বলতে মা চুন-হলুদ গরম করে লাগিয়ে দিলেন। সেটাই ছিল ব্রিটিশ রাজশক্তি বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ।
আরও একটা ঘটনা মনে আছে। আমার জ্যাঠামশাই নলিনীকান্ত বসু তখন হাইকোর্টের বিচারপতি পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। মেছুয়াবাজার বোমা মামলার বিচারের জন্য ব্রিটিশ সরকার স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল ওই সময়। জ্যাঠামশাইকে ওই ট্রাইব্যুনালের জজ করা হল। পুলিস রাজদ্রোহমূলক সাহিত্য অভিযোগে গাদা গাদা বাজেয়াপ্ত বই জ্যাঠামশাই-এর কাছে তখন পাঠাত। তখনই জ্যাঠামশাইয়ের টেবিল থেকে নিয়ে গোপনে শরৎচন্দ্রের পথের দাবী আমি পড়েছিলাম। তবে জ্যাঠামশাই যে স্বদেশীদের বিচার করতে বসেছেন, এটা আমাদের বাড়ির কারও সায় ছিল না। আমি আর আমার এক জ্যেঠতুতো দাদা দেবপ্রিয় বসু একটা ফন্দি আঁটলাম। দু’জনে বাড়ির বাইরে একটা জায়গায় গিয়ে ইংরাজিতে চিঠি টাইপ করালাম। তাতে লেখা হল, ‘আপনি অন্যায় করেছেন। আপনি বাঙালি হয়ে যারা দেশভক্ত তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এটা গুরুতর অন্যায়। আপনার জীবন বিপন্ন হবে।’ জ্যাঠামশাই যেদিন চিঠিটা পেলেন সেদিন রাতে খেতে বসার সময় দেখলাম বড়োদের মুখ গম্ভীর। বাবা-মা খুবই চিন্তিত। বাবা মাকে নিচুগলায় বলছেন, দাদাকে বারণ করেছিলাম, শুনলেন না। এদিকে আজ চিঠি পেয়েছেন, ওর জীবন বিপন্ন। বাড়িতে গার্ড বেড়ে গেল, মর্নিংওয়াক বন্ধ। বাবা এবং জ্যাঠামশাইয়ের বাজার করার খুব সখ, একসঙ্গেই যেতেন। তাও বন্ধ হয়ে গেল।
যাইহোক, ছোটোবেলায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া স্বাধীনতা আন্দোলনে সরাসরি কোনও যোগসূত্র স্থাপিত হয়নি। তবে নিশ্চয়ই এর কিছু প্রভাব আমার চিন্তা-ভাবনায় পড়েছিল। তাই বিলেতে পড়তে গিয়ে যখন ইন্ডিয়া লিগ, লন্ডন মজলিস ও স্টুডেন্ট ফেডারেশনের মতো সংগঠনগুলিকে ভারতের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজ করতে দেখলাম তখন সহজেই মিশে গিয়েছিলাম তাঁদের মধ্যে। তখন ১৯৩৫ সাল। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ফাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। লন্ডন, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে কমিউনিস্ট গ্রুপ গড়ে উঠছে। আমিও মার্কসবাদী পাঠচক্রে যেতে শুরু করলাম। অল্পদিনের মধ্যে লন্ডন মজলিসের সম্পাদক নির্বাচিত করা হলে আমাকে। তখন ভারত থেকে জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা লন্ডনে এলে ইন্ডিয়া লিগ, লন্ডন মজলিস, স্টুডেন্ট ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আমরা তাঁদের সংবর্ধনা দিতাম। জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, ভুলাভাই দেশাই, ইউসুফ মেহের আলি প্রমুখকে লন্ডন মজলিসের তরফে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম। ইন্ডিয়া লিগের নেতা কৃষ্ণ মেনন নেহরুর সঙ্গে তখন আমার পরিচয় করিয়ে দেন। আমি নেহরুকে বলি: আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। নেহরু বলেন: আমাদের সামনে এখন প্রধান কাজ ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। এবিষয়ে তোমরা আমার সঙ্গে একমত কি? আমি স্পষ্টই বলি: আমরা একমত। তারপরে দেশে ফিরেও স্বাধীনতার আগে এবং পরে নেহরুর সঙ্গে আমার বহুবার দেখা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। সুভাষচন্দ্র বসুকে যখন সংবর্ধনা জানালাম, তখন আমার দেশে ফেরার সময় হয়ে এসেছে। তাঁর সঙ্গে আমার যখন সেখানে কথা হল আমি বললাম: ঠিক করেছি, দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হবো। সুভাষচন্দ্র বসু বললেন: খুব ভালো কথা। তবে মনে রেখো Politics is not a bed of roses। পরে বুঝেছি, কথাটা খুবই সত্যি।
১৯৪০ সালে আমি বিলেত থেকে ফিরে আসি। এখানে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করলাম। ‘দত্ত-ব্রাডলে থিসিস’ অনুসারে তখন পার্টি ভারতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী গণফ্রন্ট গড়ে তোলার লক্ষ্যে বামপন্থী শক্তিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি পালনে জোর দিয়েছে। ফ্যাসিবাদকেই প্রধান বিপদ বলে পার্টি চিহ্নিত করেছে। যদিও জাতীয় কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বলেছিল ব্রিটিশের পরাধীন থেকে আমরা ব্রিটেনকে যুদ্ধে সাহায্য করব না। ব্রিটেন আগে স্বাধীনতা দিক। নেহরু অবশ্য ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথাই বলেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য ছিল ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করতে পারলে ভারতের স্বাধীনতা কেউ আটকাতে পারবে না। সেই সময় মূলস্রোত থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য সঠিক বলে পরে প্রমাণিত হয়েছিল।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধীজীর নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলনের একটা বড়ো ভূমিকা ছিল। কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রামের অবদান কোনও অংশেই কম নয়। তাঁদের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। রজনী পাম দত্ত অবশ্য গান্ধীজীর নেতৃত্বের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গান্ধীর আন্দোলন ভারতে বিপ্লবের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু এই বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই। গান্ধীজীর বিরাট অবদানের কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলনে দেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্র, কৃষক-সমাজ উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। অন্যদিকে, সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনী (আইএনএ), নৌ-বিদ্রোহ, তেভাগা-তেলেঙ্গানার সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম দেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ব্যারাকে সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি টাঙাতে শুরু করেছিলেন ভারতীয় সেনারা। ব্রিটিশরাও বুঝেছিল যে বেশিদিন ক্ষমতা ধরে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। আর কংগ্রেস দলও বুঝেছিল যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম যদি বিদ্রোহে পরিণত হয় তবে তাদের পক্ষে নেতৃত্ব রক্ষা সম্ভব হবে না। তাই ব্রিটিশ শাসক, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে মীমাংসা করে দেশভাগের মধ্যে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এল। দেশভাগের মারাত্মক কুফল পশ্চিমবঙ্গ ও পাঞ্জাবের ওপর পড়ল। শুধু আমাদের রাজ্যেই ৬০ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে এলেন। কেন্দ্রীয় সরকার আজও পর্যন্ত এই সমস্যার পূর্ণ সমাধানে উদ্যোগী হয়নি।
যাইহোক, দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বাধীনতা এল। কিন্তু উপনিবেশবাদের ফলে দুশো বছর ধরে আমাদের দেশের সম্পদের শোষণ, মানুষের অধিকার হরণ ও সার্বিক পরাধীনতা চলেছে। স্বাধীনতা লাভের পর দেশের মানুষের মনে অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল। কিন্তু সেসব আশা ও স্বপ্নের অনেকটাই এখনও সফল রূপ নিতে পারেনি। দেশে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়ন অবশ্যই ঘটেছে। কিন্তু বহু কাজ এখনও বাকি। ক্ষুধা দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মোকাবিলায় সঠিক কার্যক্রম রূপায়ণে জাতীয় ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দেওয়া দরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, আবাসন ও গ্রামীণ বৈদ্যুতিকীকরণের মতো জনসাধারণের মৌলিক চাহিদাগুলি অপূর্ণ থাকলে, আগামীদিনে ভারত কীভাবে এগোতে পারবে? এসব বিষয়ে নজর দেওয়া ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাদের দেশে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, আছে যথেষ্ট সংখ্যক মেধাবী মানুষ ও কর্মক্ষম বিপুল জনগোষ্ঠী। এসব কিছুকে ঠিক মতো ব্যবহার করতে পারলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ সফল হবে। জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিষয়গুলিতে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হলে দেশ আরও এগিয়ে যেতে পারত। অতিকেন্দ্রীকতা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে হানিকর প্রভাব ফেলেছে। বিকেন্দ্রীকরণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষে একান্তভাবে প্রয়োজনীয় বলে আমরা মনে করি। দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলিতে উদ্দেশ্য ও অগ্রাধিকারের ত্রুটি থাকার জন্য জাতীয় উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে। বিশেষত অন্য অঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যের তুলনায় পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি নানান অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস আজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কেন্দ্র থেকে রাজ্যের হাতে আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টিকে জোর দেওয়ার জন্য আমরা বলে চলেছি। গ্রামস্তর পর্যন্ত প্রশাসন ব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণে আমি বিশ্বাসী। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সম্পর্কের সুষ্ঠু ও সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাস ঘটাতে পারলে জাতীয় ভিত্তি আরও বলিষ্ঠ হবে। জাত-পাত, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, ধর্মভিত্তিক ভোট ব্যাঙ্ক তৈরি, টাকার খেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, পেশীশক্তির ব্যবহার, অপরাধ জগতের সঙ্গে রাজনীতির আঁতাত ইত্যাদি অশুভ প্রবণতা সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কলুষিত করছে, এগুলি থেকে আমাদের মুক্তি পেতেই হবে। সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর জনসাধারণের সজাগ প্রহরা সর্বদা দরকার, মানুষও অনেক সময় ভুল করেন। তাঁরাই আবার ভুল সংশোধন করে সঠিক পথে অগ্রসর হন। ইতিহাসেও তাঁরাই প্রকৃত নিয়ন্তা।
স্বাধীনতার পর ভারতের শাসকদল যে ধনতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন সে পথেও দেশের জনসাধারণের অনেক প্রয়োজন মেটানো যেত, যদি সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে সমঝোতা করার নীতি থেকে তারা বিরত থাকতেন, যদি ভূমি-সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কিছুটা চেষ্টা করতেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের শিল্পসংস্থাগুলি পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে পরিচালিত হলে অনেকটাই সুফল পাওয়া যেত। এ পর্যন্ত সারা দেশে দশ থেকে পনেরো শতাংশ মানুষের কেবল উন্নতি হয়েছে। বাকি আশি থেকে পঁচাশি শতাংশ মানুষ উপেক্ষিত থেকে গেছেন। জাতীয়স্তরে স্বনির্ভরতার নীতি পরিহার করে দেশীয় একচেটিয়া পুঁজির ও বহুজাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতা এবং বিশ্বব্যাঙ্ক ও আইএমএফের মতো সংগঠনের নির্দেশাবলীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেশের অর্থনীতিকে সঙ্কটগ্রস্ত করে তুলেছে। বিশ্বের মধ্যে জনসংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ভারতের অভ্যন্তরীণ অনেক শক্তি আছে, সেগুলি ঠিকমতো ব্যবহারের কোনও চেষ্টা নেওয়া হয়নি বলে বর্তমান অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের অর্থনীতিতে সরকারি ক্ষেত্র, যৌথক্ষেত্র এবং বেসরকারি ক্ষেত্রের ভূমিকা আছে, সবক্ষেত্রে সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের ভিত্তিতে কাজ করলে অবস্থার উন্নতি হবে। অনেক ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত দুর্বলতা আছে। সেই দুর্বলতাকে কীভাবে কাটানো যায় তার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্যোগী হতে হবে। প্রত্যেক পক্ষকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ হতে হবে। রুগণ ও বন্ধ শিল্পসংস্থাগুলির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, আধুনিকীকরণ ও সামগ্রিক পুনরুজ্জীবনের কর্মসূচি গ্রহণ করা আবশ্যক। এই বিষয়টিতে আমরা বারবার কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিচালনায় তিরিশ বছর ধরে আমরা নিযুক্ত আছি। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটা একটা অভূতপূর্ব ঘটনা। পরপর সাতবার এরাজ্যের মানুষ বিপুলভাবে আমাদের জয়ী করেছেন। মানুষকে সঙ্গে নিয়েই সীমাবদ্ধ ক্ষমতা, নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য এবং সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত অংশের মানুষের অবস্থার উন্নতিকল্পে বিভিন্ন কর্মসূচির রূপায়ণে আমরা জোর দিয়ে চলেছি। তফসিলী জাতি, উপজাতি ও অন্যান্য অনুন্নত সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য সবকিছু বন্দোবস্ত করা যায়নি। তাঁদের বিষয়ে অধিকতর নজর দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাঁদের শ্রেণীচেতনায় বেশি করে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। তা না-হলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সম্ভব হবে না। পশ্চিমবঙ্গে, কেরালা এবং ত্রিপুরায় বামফ্রন্ট সরকার সীমিত ক্ষমতা সত্ত্বেও বিকল্প পথের অনুসরণ করার চেষ্টা করে চলেছে। ত্রিপুরায় উপজাতি ও অ-উপজাতি মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার অনন্য উদাহরণ গড়ে তুলেছে বামফ্রন্ট।
পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কারের যে কর্মসূচি নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম তার সুফল পাওয়া গেছে। উদ্বৃত্ত জমির উদ্ধার ও বণ্টনে আমাদের রাজ্য যথেষ্ট অগ্রগতি দেখিয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পৌরসভা ও পঞ্চায়তের নির্বাচন হচ্ছে। এইসব সংগঠনের মাধ্যমে আমরা প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়েছি। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে গণউদ্যোগ ও স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যের গ্রামীণ ক্ষেত্রে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এরফলে যে সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা শিল্পের বিনিয়োগে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিচ্ছে। শহরাঞ্চলে যেসব অসুবিধা এখনও আছে সেগুলি কাটিয়ে উঠতে আমরা বদ্ধপরিকর। পরিকল্পনা মতোই অগ্রসর হতে চাইছি। আর্থিক ও অন্যান্য সমস্যার তীব্রতা সত্ত্বেও সেগুলির মোকাবিলায় আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে চলেছি। কিছু কিছু ব্যাপারে উন্নতি হয়েছে। নেতিবাচক দিকও আছে। দুটো দিকই অতিক্রম করতে হবে। আত্মসমীক্ষা ও আত্মসমালোচনার মধ্যে দিয়ে আমাদের সরকার কাজ চালিয়ে যেতে চায়। সারা ভারতে বেকারি সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও এই সমস্যা আমাদের চিন্তার বিশেষ কারণ। এ ব্যাপারটি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে আমরা দেখছি। বর্তমানে রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রে পুনরুজ্জীবন নিশ্চিতভাবে ঘটছে। শিল্পের ক্ষেত্রে মাসুল সমীকরণ নীতি, লাইসেন্স প্রথার কারণে তীব্র বৈষম্যের শিকার আমরা হয়েছি। কেন্দ্রে শিল্পনীতিতে গত কয়েক বছরে কিছু পরিবর্তন হওয়াতে রাজ্যের শিল্পবিকাশের সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে চলেছি। বড়ো বড়ো কয়েকটি শিল্প প্রকল্প হয় নির্মীয়মান, নয় প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শেষ করেছে। পরিকাঠামোর উন্নতিতে আমরা সব থেকে বেশি নজর দিয়েছি। এ কাজে সকলের সহযোগিতা ও সমর্থন পাওয়া উচিত। কিন্তু এরাজ্যের বিরোধী দলগুলি উন্নয়নের কাজে বাধা দিচ্ছে। রাজ্যের সচেতন মানুষই এদের বিচ্ছিন্ন করবেন।
একটি স্বাধীন দেশের উন্নতি ও প্রগতির পক্ষে ৬০টি বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সংবিধান অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের দেশে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করেই দেশ চালিয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকারগুলি, বিশেষত কংগ্রেস দল। কারণ এরমধ্যে ৪৫ বছর এই দলই দেশ শাসন করেছে। দেশের সংবিধানে দেওয়া অধিকারগুলিও অনেক সময় সংশোধন করে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এসমা, নাসা, টাডার মতো ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণকারী আইন তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবার। ১৯৫৯ সালে কেরালায় প্রথম কমিউনিস্ট সরকারের ৩৫৬ ধারা জারি করে ফেলে দেওয়া হয়। নেহরু তখন প্রধানমন্ত্রী এবং ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেস সভানেত্রী ছিলেন। অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারি করেও ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। এরাজ্যে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমলে সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস জারি করা হয়েছিল। আমরা বামপন্থীরা, বরাবরই এইসব স্বৈরতান্ত্রিক ঝোঁকের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলেছি।
তবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীনতার পর থেকে একটা রাজনৈতিক সহমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৫২ সালে নেহরুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আমায় তাঁর বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে মতামত জানতে চান। আমি বলি, আমাদের পার্টি জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতি সমর্থন করে। পি এন হাকসার একসময় কমিউনিস্ট পার্টিতে ছিলেন। পরে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত সচিব হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করেন। আমি হাকসারকে বিলেত থেকেই চিনতাম। ওঁকে আমি জিজ্ঞাসা করি: তুমি কংগ্রেসে গেলে কেন? কী লাভ হল? হাকসার বললো: আমেরিকার টেকওভার আটকাতে পেরেছি। পরে জরুরি অবস্থার সময় অবশ্য ইন্দিরা গান্ধী হাকসারের বাড়ি সার্চ করিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে বইয়ের মলাট খুলেও দেখা হয়েছিল। যাই হোক, ভারতের বিদেশনীতিকে আমরা বরাবর সমর্থন করে এসেছি। তবে বিজেপি জোট-সরকারের সময়ে এই বিদেশনীতি থেকে চ্যুত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। বিজেপি চেয়েছিল ভারতকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জুনিয়র পার্টনার বানাতে। বামপন্থীরা এর বিরোধিতা করেছিল। বর্তমানে ইউপিএ সরকারও মার্কিন-ঘেঁষা নীতি নিয়ে চলছে। এর বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করতে হবে।
স্বাধীনতার ৬০ বছর পরে ভারতের রাজনীতির এটাও একটা আশ্চর্য ঘটনা, যে কংগ্রেস দলের বিরুদ্ধে ৪৫ বছর ধরে আমরা লড়াই করেছি, আজ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে সেই কংগ্রেস দলকেই আমাদের সমর্থন করতে হচ্ছে। তবে এই দলের অর্থনৈতিক নীতির আমরা বিরোধী। তার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলছে। এটাও মনে রাখতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আমরা কংগ্রেসকে সমর্থন করলেও কংগ্রেস এক্ষেত্রে যথেষ্ট নীতিনিষ্ঠ নয়। বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গেও আপস করেছে। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার সপক্ষে আমাদের লড়াই অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ভারতের সংবিধানে ‘সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র’ (Socialist Republic) কথাটা পরে ঢোকানো হলেও এটা আদতে বৃহৎ বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বুর্জোয়া-ভূমিস্বামী রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন করে আমরা জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, শ্রেণিহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চাই। কিন্তু সেটা অনেক দীর্ঘ লড়াই।বর্তমানে এই ব্যবস্থায় যে সমস্ত অধিকার দেওয়া আছে, তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে আমাদের আগামীদিনের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। দেশের মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে স্বাধীনতার সুফল কুক্ষিগত রয়েছে। ব্যাপক সংখ্যক সাধারণ মানুষের কাছে এই সুফলকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাদের তীব্র লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। মানুষের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে হবে।
* লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৫ আগস্ট, গণশক্তি পত্রিকায়
প্রকাশের তারিখ: ১৫-আগস্ট-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
