সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
তিন দশকের সান্নিধ্যে
জ্যোতি বসু
১৯৫২ সালে এল প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এরকম একটা দুর্যোগের অবস্থা থেকে সবে পার্টি বেরিয়েছে। কিন্তু নির্বাচন ঘোষিত হতেই কাকাবাবু সমস্ত শক্তি নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা বললেন। একটা বড়ো রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে নির্বাচনকে নিতে তিনি বললেন। আমাকে প্রার্থী করার যখন কথা হল, তখন আমি কাকাবাবুকে বলেছিলাম, '৪৬ সাল থেকে এমএলএ আছি। এবার পার্টির কাজেই বেশি সময় দিই, আমাকে আর এমএলএ না করাই ভাল। কাকাবাবু শুনলেন না। আমাকে বললেন, আপনাকে এমএলএ হতে হবে। দেখলাম, কাকাবাবু এতকাল কঠিন অবস্থার মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনায় যেমন পারদর্শী, তেমনই নির্বাচনে পার্টির দায়িত্বপালনেও সমান পারদর্শী। নিখুঁতভাবে তিনি নির্বাচন পরিচালনা করতেন।

কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৪০ সালে। সবে আমি লন্ডন থেকে এসেছি। এর আগে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। লন্ডনে থাকতে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের খবর পেতাম। মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলার খবরও তখন জেনেছি। সেই সূত্রে কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের নাম শুনেছি। গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি বাইরে থেকে আসা ছাত্র ও অন্যান্যদের দিয়ে একটা গ্রুপ তৈরি করেছিল। তাতে ভারতীয় ছাড়া অন্যান্য দেশেরও অনেকে ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার জন্য লন্ডনে যাঁরা সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সংস্কারপন্থীও ছিলেন, কমিউনিস্ট মতাবলম্বীও ছিলেন। কমিউনিস্টদের সেখানেও কাজ করতে হতো অত্যন্ত সাবধানে। গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি একবার আমাদের খবর দিল, আমাদের নাম করে মুজফ্ফর আহ্মদের কাছ থেকে বার্তা এসেছে।
১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় আসি। তখন পার্টি এখানে বেআইনী। গোপনে সবাইকে কাজ করতে হচ্ছে। কলকাতায় এক গোপন আস্তানায় মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে দেখা করি। সোমনাথ লাহিড়ী এবং সরোজ মুখার্জিও ছিলেন। উনি স্বাগত জানালেন। প্রাথমিক কথাবার্তার পর বললেন, ‘পার্টিতো এখন বেআইনী, গোপনে সব কাজ করতে হচ্ছে। প্রকাশ্যে কাজ করার কোন সুযোগ নেই। আপনি যখন ব্যারিস্টারী পাশ করে এসেছেন, তখন আপনি বরং বাইরে থাকুন। প্রকাশ্যে কাজ করে সাহায্য করুন। ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের ক্লাস নিন।’ তখনও এখানে কমিউনিস্ট বই-পুস্তক নিষিদ্ধ। লন্ডন থেকে জাহাজে করে আসার সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির (বলশেভিক) সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে এসেছিলাম। বোম্বাইতে নামার আগে বইটি আরেকজনের কাছে রাখি, যাতে ধরা না পড়ে। সেই বইটি কাকাবাবুর হাতে দিয়েছিলাম।
এরপর বার লাইব্রেরিতে নাম লেখালাম। লোক দেখানোর জন্য লাইব্রেরিতেও যেতাম। এ-বছরই পার্টি সদস্যপদ পাই। এভাবে কাজ করার সময় সবসময় যোগাযোগ থাকতো কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে। প্রথমদিন কথা বলে তাঁকে খুব ভাল লাগল।
একবার খবর পাওয়া গেল কাকাবাবুরা গোপন অবস্থায় যেখানে আছেন, সেখানে পুলিস খানাতল্লাশি করবে। উনি আমার বাড়িতে এসে হাজির। সঙ্গে সরোজ মুখার্জি ও পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী। আমি তখন ডোভার লেনে আমার এক বন্ধু গোপাল কুমারমঙ্গলমের কাছে নিয়ে যাই। উনি মোহন কুমারমঙ্গলমের দাদা। রাজনীতির সঙ্গে গোপাল কুমারমঙ্গলমের তেমন কোন যোগাযোগ ছিল না। তবে অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। উনি সঙ্গে সঙ্গে সমাদরে তাঁদের থাকতে দিলেন। বাইরে কাজে থাকলেও তাঁর খেয়াল থাকতো বাড়িতে অতিথিরা রয়েছেন। দু'দিন পর তাঁদের অবশ্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলো।
লন্ডনে থাকতেও নাবিকদের সংগঠনে কাজ করতাম। ওঁদের অফিসেও যাতায়াত ছিল। এখানে সেই সময় বিভিন্ন যোগাযোগ রক্ষণ, ছাত্রদের মধ্যে পার্টি ক্লাস নেওয়া ইত্যাদি ছাড়াও নাবিকদের মধ্যে সংগঠন করার জন্য যোগাযোগ করতাম। সেটা অবশ্য খুব অল্পদিনই স্থায়ী ছিল। দু'বছর এভাবে কাজ করার পর অন্য পরিস্থিতি এল। লন্ডনে থাকতেই ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। ১৯৪১ সালে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে যুদ্ধের গোটা পরিস্থিতিটাই বদলে গেল। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে বৈধ বলে ঘোষণা করে। কমিউনিস্ট বন্দীরা জেল থেকে মুক্তি পেতে শুরু করলেন। গোপন কাজকর্ম থেকে পার্টির প্রকাশ্য কাজকর্মের সুযোগ এল। পার্টির ট্রেড ইউনিয়ন ও বিভিন্ন গণসংগঠন গড়ে উঠতে থাকল। ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টে কাজ করার দায়িত্ব এল আমার ওপর। রেলেই ট্রেড ইউনিয়ন করি। ২৪৯ নম্বর বৌবাজার স্ট্রীটে অফিস। প্রায় রোজই যেতাম। ১৯৪৩ সালে তৈরি হয় পার্টির রাজ্য কমিটি। ট্রেড ইউনিয়নে কাজ করার জন্য আমাকেও রাজ্য কমিটির সংগঠক করা হল। এ সময়ে কাকাবাবুর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ আসে। এরপর থেকে একটানা তাঁর জীবনাবসান পর্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবেই একসঙ্গে কাজ করেছি। কাকাবাবুকে দেখেছি, উনি পার্টির সকলের খবর রাখতেন। ব্যক্তিগতভাবে অনেককেই চিনতেন। তাঁদের পরিবারেরও খবর রাখতেন, কার কী সুবিধা-অসুবিধা খোঁজখবর করতেন। মার্কসবাদী পত্রিকা, বই, পুস্তিকা, প্রচারপত্র বের করার দিকে বরাবরই তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ।
যখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ এল, কাকাবাবু সেই ব্যাপারেও দেখেছি খুব যত্নবান। ১৯৪৬ সালে পার্টির সিদ্ধান্তে বিধানসভায় আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। আমার বিরুদ্ধে প্রার্থী ছিলেন কংগ্রেসের হুমায়ূন কবীর। সেই নির্বাচনেও কাকাবাবু খুব আগ্রহ ও দায়িত্ব নিয়ে নির্বাচনের কাজ দেখাশোনা করেছেন। সেবার আমি জয়লাভ করি।
কাকাবাবু পার্টির নীতির প্রতি এত নিষ্ঠাবান ও অনুগত ছিলেন এবং এত শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন যে, মনেপ্রাণে কোন সিদ্ধান্ত হয়তো তিনি পছন্দ করতে পারছিলেন না কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলতেন এবং নির্দ্বিধায় কার্যকর করতেন। ১৯৪৮-৫০ সালের ঘটনায় তা দেখেছি। ১৯৪৮ সালে প্রথমে তিনমাস আমি জেলে ছিলাম। বেরিয়ে এসে আত্মগোপন অবস্থায় কাজ শুরু করি। ১৯৫০ সালের গোড়ায় আত্মগোপন অবস্থায় সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সামনে রাস্তা থেকে আমি ও কমরেড নিরঞ্জন সেনগুপ্ত ধরা পড়ি। ১৯৫০ সালের শেষে কোর্টের আদেশে আমি মুক্তি পেলাম। কাকাবাবু মুক্তি পান অনেক পরে, ১৯৫১ সালে। এ সময়ে বন্দী অবস্থায় কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে ডাঃ বিধান রায়ের এক চুক্তি হয় জেল কোড নিয়ে। হাইকোর্টের একজন ব্যারিস্টার জেল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বন্দীদের মর্যাদাদানের বিষয় এখনও তা জেল কোড-এ আছে।
১৯৫১ সাল থেকে পার্টির মুখপত্র দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকা আবার বেরুতে শুরু করে। আমি তখন সম্পাদক। কয়েকবছর মাত্র ছিলাম। কাকাবাবু পত্রিকার বিভিন্ন ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করতেন।
১৯৫১ সালে আত্মগোপন অবস্থায় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হয়। অজয় ঘোষ তখন পার্টির সাধারণ সম্পাদক। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয় কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ এবং আমি তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে যাবো। নাগপুর হয়ে আমরা হায়দরাবাদ গেলাম। তখন সরকার সেখানে জেলে কমিউনিস্ট বন্দীদের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের অনুমতি দিল। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত তাঁদের আমরা জানালাম ও বোঝালাম। ওখান থেকে দিল্লিতে জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। সঙ্গে মৃদুলা সারাভাইকে নিয়ে গেলাম। তেলেঙ্গানা কৃষক আন্দোলনের বন্দীদের মুক্তির প্রসঙ্গে কথা হল। নেহরু বললেন, সবটা খোঁজ করে ব্যবস্থা উনি নেবেন। সেইসময় নেহরু বিদেশ নীতি নিয়ে আমাদের বক্তব্য আমার কাছ থেকে জানতে চাইলেন।
১৯৪৮-৫১ সালে অর্থাৎ কংগ্রেস আমলেও কমিউনিস্ট পার্টিকে অবৈধ করা হয়েছিল। প্রচন্ড অত্যাচার তখন পার্টির ওপর। কাকাবাবু সেইসময়ে এত কঠিন অবস্থার মধ্যেও পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলাপরায়ণ রাখতে যথেষ্ট অবদান রেখেছিলেন।
বিরাট বিরাট আন্দোলন-সংগ্রামও সেই পর্যায়ে হয়েছে। আমাদের এখানে তেভাগা আন্দোলন বিরাট সাড়া জাগায়। কাকাবাবু এসব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৪২ সালে গঠিত সোভিয়েত সুহৃদ সমিতির হয়ে যেমন বিভিন্ন জায়গায় যাবার সুযোগ হয়েছিল, পরে এম এল এ হিসেবেও গেছি। তেভাগা আন্দোলনের সময় কৃষকদের ওপর অত্যাচারের খবর পেলে সেখানে ছুটতাম। সুরাবর্দী তখন মুখ্যমন্ত্রী। আমার মনে আছে একটা ঘটনা। খুলনায় কৃষক আন্দোলন প্রায় মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলেছে। সেখানে আমি গিয়েছিলাম। আমাকে দেখে ওঁরা খুব খুশি হয়েছিলেন। বিধানসভায়ও কৃষক আন্দোলনের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছি।
১৯৫২ সালে এল প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এরকম একটা দুর্যোগের অবস্থা থেকে সবে পার্টি বেরিয়েছে। কিন্তু নির্বাচন ঘোষিত হতেই কাকাবাবু সমস্ত শক্তি নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা বললেন। একটা বড়ো রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে নির্বাচনকে নিতে তিনি বললেন। আমাকে প্রার্থী করার যখন কথা হল, তখন আমি কাকাবাবুকে বলেছিলাম, '৪৬ সাল থেকে এমএলএ আছি। এবার পার্টির কাজেই বেশি সময় দিই, আমাকে আর এমএলএ না করাই ভাল। কাকাবাবু শুনলেন না। আমাকে বললেন, আপনাকে এমএলএ হতে হবে। দেখলাম, কাকাবাবু এতকাল কঠিন অবস্থার মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনায় যেমন পারদর্শী, তেমনই নির্বাচনে পার্টির দায়িত্বপালনেও সমান পারদর্শী। নিখুঁতভাবে তিনি নির্বাচন পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন নির্বাচনী কেন্দ্রে তিনি গেছেন, বক্তব্য রেখেছেন। বরানগরে পার্টির নির্বাচনী অফিসে গিয়েও সব খুঁটিনাটি খোঁজখবর নিয়েছেন। আমিও ছিলাম। কমিউনিস্ট প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় লিখেছেন। লিফলেটে উনি নিজেই সব লিখতেন। আমার ব্যাপারেও কাকাবাবুই লিখেছেন।
নির্বাচনের সময় কাকাবাবু সবাইকে বলতেন বড় বড় মিটিং যেমন আমাদের করতে হবে, মানুষের সঙ্গে ঘরে ঘরে যোগাযোগ করতে হবে। কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে, তাঁদের বোঝাতে হবে। তা না হলে কংগ্রেস ভুলপথে মানুষকে নিয়ে যাবে। ১৯৫২ সালে আমরা ২৪টি আসনে বিজয়ী হলাম। বিধানসভায় যিনি পার্টির নেতৃত্ব করবেন, তিনিই বিরোধীদলের নেতা হবেন। কাকাবাবুর পরামর্শে ও পার্টির সিদ্ধান্তে আমাকেই সেই দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। কাকাবাবু তখন পার্টি সম্পাদক।
১৯৫৪ সালে আমাকে পার্টির সম্পাদক করা হল। তার আগে এই সিদ্ধান্ত জেনে কাকাবাবুকে বলেছিলাম, এদিকে বিরোধীদলে নেতা হিসাবে কাজ, অন্যদিকে পার্টির সম্পাদকের দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করা খুব কঠিন কাজ। কাকাবাবু বললেন, দুটো কাজই আপনি একসঙ্গে করতে পারবেন, অসুবিধা হবে না।
সেই সময় কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের প্রতি পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে সেটা নিয়ে পার্টির মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। একটা মত ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে জাতীয় ফ্রন্ট করা, অন্য মতটি হলো কংগ্রেস-বিরোধী গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। কাকাবাবু দ্বিতীয় মতের পক্ষে দাঁড়িয়ে মতাদর্শগত সংগ্রাম করেছেন। এই মতপার্থক্য বেড়ে গেল ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। কাকাবাবু সেই সময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন। সংশোধনবাদী লাইন বর্জন করে পার্টির জাতীয় পরিষদ থেকে যে ৩২ জন বেরিয়ে আসেন, কাকাবাবু তার অন্যতম। এটা বিরাট ব্যাপার। কাকাবাবু থাকতে নতুন পার্টি গঠনের কাজ ও নতুন পার্টি লাইন চূড়ান্ত করার কাজ অনেক সহজ হল।
ছয়ের দশকের মাঝামাঝির পর চীনের পার্টি হঠকারী লাইন নেয়। পিকিঙ রেডিও থেকে যখন আমাদের পার্টিকে কদর্যভাবে আক্রমণ করা হয়, আমার বিরুদ্ধে এবং ইএমএসের বিরুদ্ধে গালমন্দ করা হয়, তখন কাকাবাবুর কাছে তা অবিশ্বাসের মতো মনে হতো। চীনের পার্টি এরকম করতে পারে, কাকাবাবুর প্রথমদিকে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আমরা তখন মাথা ঠান্ডা রেখে আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। পরে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, পিকিঙ রেডিও-র এসব গালমন্দ চীন সমর্থন করে। আমাদের এখানেও অন্ধভাবে চীনের পার্টিকে সেই সময় সমর্থন করে উগ্র হঠকারী রাজনীতি দেখা দেয়। কাকাবাবু দৃঢ়তার সঙ্গে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
মতাদর্শগত সংগ্রামে এই বলিষ্ঠ অবদান ছাড়াও সংগঠনের ক্ষেত্রেও কাকাবাবু দৃঢ়তার পরিচয় রেখেছেন। পার্টির নিয়মশৃঙ্খলার পদ্ধতি নিয়েও তিনি ছিলেন কঠোর। কাকাবাবু বলতেন, যদি কোন বিষয়ে পার্টির মধ্যে দুটো মত থাকে, দুটো মত নিয়েই বিতর্ক হোক। তার জন্য যদি ভোট নিতে হয়, তা-ও করতে হবে। ভোটের ভয় করলে চলবে না। তবে তার আগে একমত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যে মতটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে সিদ্ধান্ত হবে, একসঙ্গে সেই মত কার্যকর করতে সবাইকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। ভিন্নমত থাকলেও গৃহীত সিদ্ধান্তই সকলকে মেনে চলতে হবে। এভাবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি সংগঠন পরিচালনা করতেন।
সারাজীবন কঠিন অবস্থা ও প্রচন্ড দুঃখকষ্টের মধ্যে তাঁকে পার্টি গড়ে তোলার কাজ করতে হয়েছে। এতে তাঁর স্বাস্থ্যও প্রায় খারাপ থাকতো। জীবনের শেষ ক'বছর অসুস্থতার মধ্যেই তিনি কাটিয়েছেন। তখন লেক প্লেসে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অফিস। কাকাবাবু সেখানেই থাকতেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে ঘনঘন দেখা হতো, কথাবার্তা হতো। নানা পরামর্শ তিনি দিতেন। বিভিন্ন সময়ে চিঠি লিখে তিনি তাঁর মতামত জানাতেন। এত কষ্ট উনি করেছেন, অথচ বিপদের সময় কখনও তাঁকে বিচলিত হতে দেখিনি, কোন ইতঃস্ততভাব তাঁর মধ্যে কখনোই ছিল না। অত্যন্ত ধীর স্থির শান্ত সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তিনি। নিজে যেটা সঠিক বলে মনে করতেন, নির্দ্বিধায় বলতেন। তাঁর কাজকর্মও ছিল নিখুঁত। কমিউনিস্ট আন্দোলনে আজকের এত বড়ো অগ্রগতির ভিত তৈরিতে যাঁর অবদান, আত্মত্যাগ ও ভূমিকা প্রথমেই মনে আসে তিনি হলেন কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ ।
লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে গণশক্তি পত্রিকার মুজফ্ফর আহ্মদ জন্মশতবর্ষ সংখ্যায়।
প্রকাশের তারিখ: ০৪-আগস্ট-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
