Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মার্কসের চিন্তায় স্বাস্থ্য: স্বাস্থ্য, শ্রম, পুঁজি ও মানবমুক্তির সম্পর্ক

কুমার রাণা
মার্কসের চিন্তায় স্বাস্থ্যের কোনো হাতে-গরম, স্বয়ংসম্পূর্ণ তত্ত্ব পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর রচনার বিভিন্ন স্তর একত্রে  পড়লে স্বাস্থ্যকে বোঝার একটি শক্তিশালী পদ্ধতি পাওয়া যায়। সেই পদ্ধতি আমাদের রোগের দৃশ্যমান লক্ষণ থেকে তার সামাজিক উৎপত্তির দিকে নিয়ে যায়; ব্যক্তির দেহ থেকে কর্মস্থল, পরিবার, বাসস্থান, পরিবেশ ও রাষ্ট্রনীতির দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে; এবং চিকিৎসার প্রাপ্যতার প্রশ্নকে সম্পদ ও ক্ষমতার বণ্টনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে।
Marx's thoughts on Healthcare

সূচনা

স্বাস্থ্যকে আমরা প্রায়ই রোগ, চিকিৎসা ও হাসপাতালের একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে দেখি। কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্য কেবল তার শরীরের জৈবিক অবস্থার ফল নয়; সে কী কাজ করে, কতক্ষণ কাজ করে, কী মজুরি পায়, কী খায়, কোথায় থাকে, কেমন জল ও বাতাস পায়, এবং নিজের ও পরিবারের পরিচর্যার জন্য তার হাতে কতটা সময় থাকে— এসবের সম্মিলিত ফলেই স্বাস্থ্যের বাস্তব রূপ গড়ে ওঠে। এই অর্থে স্বাস্থ্য একই সঙ্গে জৈবিক, সামাজিক, আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক। কার্ল মার্কস স্বাস্থ্যবিষয়ক কোনো স্বতন্ত্র বই লেখেননি; কিন্তু, তাঁর চিন্তার কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলি— শ্রম, দেহ, প্রকৃতি, বিচ্ছিন্নতা, শোষণ, সামাজিক পুনরুৎপাদন এবং মানবমুক্তি— স্বাস্থ্যের একটি গভীর বস্তুবাদী ব্যাখ্যার ভিত্তি তৈরি করে। 

মার্কসের বিভিন্ন রচনা, বিশেষত ১৮৬০-এর দশকে রচিত ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ড এবং কিছু পরিমাণে তৃতীয় খণ্ডকে যদি ১৮৪০-এর দশকের ‘প্যারিস পাণ্ডুলিপি’ ও ‘দ্য জার্মান ইডিয়োলজি’-র মতো রচনার সঙ্গে মিলিয়ে পড়া যায়, তবে বোঝা যায় স্বাস্থ্য তাঁর চিন্তায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে স্বাস্থ্য নিছক রোগমুক্তি নয়; বরং মানুষের জীবনধারণ, কর্মক্ষমতা, ইন্দ্রিয়ের বিকাশ, সামাজিক সম্পর্ক এবং পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। এই গুরুত্বের আর একটি প্রতিফলন দেখা যায় স্বাস্থ্যবিষয়ক আধুনিক গবেষণায় মার্কসের চিন্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে। বর্তমান লেখায় সেই বিদ্যাচর্চার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও রচনা নিয়ে আলোচনা করা হবে। একটি পুরোনো ও পথিকৃৎ প্রবন্ধ ছাড়া আলোচিত রচনাগুলির অধিকাংশই সাম্প্রতিক।

সাধারণভাবে বর্তমান শতাব্দীতে মার্কসের রচনা নিয়ে যে নতুন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও তার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। এই পুনর্পাঠের তাৎপর্য এই যে, তা স্বাস্থ্যকে চিকিৎসাব্যবস্থার সীমানা ছাড়িয়ে উৎপাদনব্যবস্থা, শ্রেণিসম্পর্ক, পরিবেশ, রাষ্ট্র ও সামাজিক ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে।

স্বাস্থ্যের সামাজিক ও পরিবেশগত ইতিহাস

শুরু করা যাক জন বেলামি ফস্টার, ব্রেট ক্লার্ক ও হানা হোলম্যানের দীর্ঘ সমীক্ষা দিয়ে। তাঁদের আলোচনায় পুঁজিবাদ, স্বাস্থ্য-অসাম্য এবং অসুখের বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক সংযোগ উঠে এসেছে। তাঁরা গ্রিক চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক চিন্তা, বিশেষত হিপোক্রাটিসের রচনায় স্বাস্থ্যকে বায়ু, জল ও স্থানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার ঐতিহ্য থেকে আলোচনা শুরু করেন। মানুষের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির সম্পর্ক যে স্বাস্থ্যের পক্ষে অপরিহার্য, এই দৃষ্টিভঙ্গি তারই প্রাচীন প্রকাশ। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিসে নাগরিকদের জন্য নাগরিক চিকিৎসক এবং দাসদের জন্য দাস চিকিৎসক ছিল; হিপোক্রেটিস প্রধানত নাগরিক চিকিৎসকদের উদ্দেশেই লিখেছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক সাধারণ প্রয়োগযোগ্যতা ছিল। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত চিকিৎসকদের প্রতি তাঁর পরামর্শ: রোগী পেশাগতভাবে কী কাজ করেন, তা জানতে হবে। অর্থাৎ রোগকে বুঝতে হলে দেহের পাশাপাশি জীবিকা ও পরিবেশকেও বুঝতে হবে।

এঙ্গেলস প্রাচীন গ্রিসের চিন্তকদের গভীর মূল্য দিয়েছিলেন; তাঁর মতে, তাঁরা ছিলেন জন্মগত দ্বান্দ্বিক। ফস্টার ও তাঁর সহলেখকেরা এই ঐতিহাসিক সূত্র ধরে দেখিয়েছেন, সপ্তদশ শতকের ইতালীয় চিকিৎসক বার্নার্দিনো রামাজ্জিনির ‘দ্য ডিজিজেস অব ওয়ার্কার্স’ কীভাবে পেশাগত স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে তোলে  এবং পরবর্তী কালে মার্কসের শ্রমিক-স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ডে, বিশেষত দশম অধ্যায় (দ্য ওয়ার্কিং ডে)-তে,  কারখানা-পরিদর্শকদের প্রতিবেদন, চিকিৎসকদের সাক্ষ্য এবং শ্রমিকদের দেহগত ক্ষয়ের বিবরণ ব্যবহারের মধ্যে এই ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট উপস্থিতি রয়েছে।

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় রোগবিজ্ঞানের বিকাশ একটি সাধারণ সূচনা-বিন্দু থেকে ক্রমে দুটি পৃথক পথ নেয়। প্রথম ধারায় রুডলফ ভারখো, ই. রে ল্যাঙ্কেস্টার প্রমুখ জনস্বাস্থ্যকে সামাজিক ও প্রাকৃতিক অবস্থার অনুসন্ধানের সঙ্গে নববিকশিত জীবাণুবিজ্ঞানের অন্তর্দৃষ্টি মিলিয়ে দেখেছিলেন। ল্যাঙ্কেস্টার ছিলেন মার্কসের ঘনিষ্ঠ পরিচিত ও বুদ্ধিচর্চাগত সহচরদের একজন। দ্বিতীয় ধারাটি ক্রমে রোগ ও চিকিৎসাকে প্রধানত জৈবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিসরে সীমাবদ্ধ করে ফেলে; পুঁজিবাদী স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকাশ এই সংকোচনকে শক্তিশালী করে। প্রথম ধারার বিকাশে এঙ্গেলসের ‘দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড’-এর বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৮৬০-এর দশকে মার্কস নিজেও বইটির অনুসন্ধান ও সিদ্ধান্তকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। 

ফ্লোরেন্স কেলি, ডব্লিউ. ই. বি. ডু বোয়েস, অ্যালিস হ্যামিল্টন, নর্মান বেথুন, সালভাদোর আয়েন্দে এবং কিছুটা চে গেভারা সামাজিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের এই বিস্তৃত ধারাকে খোলা রাখার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছেন। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ও বাজারকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আধিপত্য দৃঢ় হয়। বৃহৎ হাসপাতাল, ওষুধ কোম্পানি এবং বিমা সংস্থা ক্রমে স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে ওঠে। এর মধ্যেও রিচার্ড লেভিনস ও রিচার্ড লিওন্টিন জীববিজ্ঞানের সঙ্গে স্বাস্থ্যের সামাজিক ও পরিবেশগত সম্পর্ক নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। তাঁদের কাজের ভিত্তিতে একবিংশ শতাব্দীতে রব ওয়ালেস, রিকার্ডো বেলোফিওরে এবং অন্য মার্কসবাদী গবেষকেরা রোগ, কৃষি-উৎপাদন, পরিবেশ, বিশ্বায়িত পুঁজি ও রাষ্ট্রনীতির সংযোগ নিয়ে আলোচনার বিস্তৃত ক্ষেত্র গড়ে তুলেছেন।

চিকিৎসার রাজনৈতিক অর্থনীতি ও কাঠামোগত হিংসা

১৯৭০-এর দশকে স্বাস্থ্য যখন দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছিল, তখন ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও দ্বান্দ্বিকতার আলোকে চিকিৎসা পরিষেবার একটি প্রভাবশালী মার্কসবাদী বিশ্লেষণ নির্মাণ করেন হাওয়ার্ড ওয়েটজকিন। আলমা-আটা ঘোষণার কিছুদিন পর, ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে ‘সায়েন্স ফর দ্য পিপল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর পথপ্রদর্শক প্রবন্ধ ‘আ মার্কসিস্ট ভিউ অব মেডিক্যাল কেয়ার’। সেখানে তিনি দেখান, মৌলিক সামাজিক পরিবর্তন ছাড়া চিকিৎসা পরিষেবার প্রকৃত ও স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। কারণ চিকিৎসাব্যবস্থা যে সমাজে কাজ করে, সেই সমাজের শ্রেণিসম্পর্ক, সম্পদের বণ্টন এবং ক্ষমতার কাঠামো তার চরিত্র ও সীমা নির্ধারণ করে।

বিশেষত ১৯৯০-এর দশক থেকে বহু অ-মার্কসবাদী গবেষণাতেও এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব দেখা যায়। দারিদ্র্য, অসাম্য, অশিক্ষা, সামাজিক বিভাজন এবং ক্ষমতাহীনতার মতো স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ধারকগুলি আলোচনার কেন্দ্রে আসে। এই ধারা একদিকে পল ফার্মার এবং অন্যদিকে মাইকেল মার্মটের কাজে পরিণত রূপ পায়। ১৯৬০-এর দশকে জোহান গালতুং ‘কাঠামোগত হিংসা (স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স)’-র ধারণা নির্মাণ করেছিলেন। সেই সূত্রকে আরও বিস্তৃত করে ফার্মার গড়ে তোলেন ‘ক্ষমতার বিকারতত্ত্ব (প্যাথলজিজ অব পাওয়ার)’। ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব ও অর্থনীতিকে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের আলোচনায় যুক্ত করে তিনি দেখান, স্বাস্থ্যকে স্থানীয় বা জাতীয় ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ রেখে বোঝা যায় না; তাকে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতা ও বঞ্চনার সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ‘জৈব-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী (বায়োসোশ্যাল অ্যাপ্রোচ)’ নামে পরিচিতি পায়।  

ফার্মারের লেখায় সালভাদোর আয়েন্দের স্বাস্থ্য ও সামাজিক বাস্তবতা-বিষয়ক ভাবনার পুনর্বিকাশ লক্ষ করা যায়। ওয়েটজকিন যে কথাটি স্পষ্ট মার্কসবাদী ভাষায় বলেছিলেন, ফার্মার সেটিকে ভিন্ন প্রকাশভঙ্গিতে সামনে আনেন। ফার্মারের রচনায় মার্কসের প্রত্যক্ষ না থাকলেও তাঁর বিশ্লেষণের বহু দিক মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে মেলে। একইভাবে, ‘স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ধারক (সোস্যাল ডিটারমিনেন্টস অব হেলথ)’ – কমিশনের চেয়ারম্যান ও এই বিষয়ের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা মাইকেল মার্মট তাঁর ‘দ্য হেলথ গ্যাপ’ এবং অন্যান্য রচনায় যে ফলাফল হাজির করেছেন, সেখানে মার্কসীয় প্রভাবের প্রত্যক্ষ স্বীকৃতি না থাকলেও শ্রেণি, মর্যাদা, নিয়ন্ত্রণ ও অসাম্যের সঙ্গে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক সহজেই মার্কসবাদী বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।

সমকালীন মার্কসবাদী স্বাস্থ্যচর্চা

স্বাস্থ্যবিষয়ক বিদ্যাচর্চায় ঘোষিতভাবে মার্কসবাদী বিশ্লেষণের পরিসরও ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘দ্য প্যালগ্রেভ হ্যান্ডবুক অব সোশ্যাল থিয়োরি ইন হেলথ, ইলনেস অ্যান্ড মেডিসিন’-এর দ্বিতীয় অধ্যায় ফ্রান কোলিয়ারের লেখা ‘কার্ল মার্কস অ্যান্ড ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস: ক্যাপিটালিজম, হেলথ অ্যান্ড দ্য হেলথকেয়ার ইন্ডাস্ট্রি’। কোলিয়ার দেখিয়েছেন, মার্কসের সময়ের তুলনায় বর্তমান স্বাস্থ্য-পরিদৃশ্য ও চিকিৎসা পরিষেবায় বিপুল পরিবর্তন ঘটলেও মার্কস ও এঙ্গেলসের স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত চিন্তা এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁদের ধারণা ব্যবহার করে সমকালীন সমাজতাত্ত্বিকেরা স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও ওষুধের সঙ্গে পুঁজির সম্পর্ক এবং সমাজে উৎপন্ন নতুন বিভাজন ও বিপন্নতাকে বিশ্লেষণ করছেন।

স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে একটি আদর্শগত ও বাস্তব সংঘাত চলছে। একদিকে মানুষের দাবি ও আন্দোলনের চাপে স্বাস্থ্যের উন্নতির লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন দেশের সরকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পুঁজি সেইসব উদ্যোগকে দুর্বল করে স্বাস্থ্যের মতো একটি সর্বজনীন মানবিক কল্যাণকে অন্য পণ্যের মতো কেনাবেচার বস্তুতে পরিণত করছে। এই সংঘাতে অসাম্য, দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং ভৌগোলিক ও সামাজিক বিভাজনের ভূমিকা বুঝতে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ কার্যকর। স্বাস্থ্য-অধিকার ও স্বাস্থ্য-পণ্যের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বই সমকালীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

একইভাবে মাইকেল হার্ভে ‘আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথ’-এ তাঁর প্রবন্ধের শিরোনাম দিয়েছেন ‘দ্য পলিটিক্যাল ইকনমি অব হেলথ: রিভিজিটিং ইটস মার্ক্সিয়ান অরিজিন্স টু অ্যাড্রেস টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি হেলথ ইনইকোয়ালিটিজ’। তিনি দেখান, রাজনীতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন শক্তির সংযোগ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কীভাবে ব্যক্তি ও জনসমষ্টির স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এবং তার গড়ন নির্ধারণ করে। ‘স্বাস্থ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ ধারণাটি প্রায়ই অস্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়; তাই হার্ভে এর উৎস ও বিবর্তনের পথ চিহ্নিত করে মার্কসের তাত্ত্বিক উত্তরাধিকারের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেছেন। মার্কসের সূত্রকে প্রসারিত করে তিনি বর্ণভিত্তিক রোগবিন্যাস, বিভাজন, শোষণ ও নিপীড়নের স্বাস্থ্যগত পরিণতিও বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করেন।

স্টেফান বেংটসন মার্কসের রচনা থেকে প্রতিবন্ধকতা-বিষয়ক সূত্রগুলি সংগ্রহ করেছেন। ‘স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জার্নাল অব ডিজ্যাবিলিটি রিসার্চ’-এ প্রকাশিত তাঁর ‘আউট অব দ্য ফ্রেম: ডিজ্যাবিলিটি অ্যান্ড দ্য বডি ইন মার্কস’স রাইটিংস’ প্রবন্ধটি সমকালীন স্বাস্থ্য ও সমাজচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। বেংটসন দেখান, মার্কসের লেখায় শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার উল্লেখ থাকলেও তাঁর বৃহত্তর তত্ত্বে এই প্রশ্নটি স্বতন্ত্রভাবে সংহত হয়নি। তবে মার্কসের সামগ্রিক তাত্ত্বিক ভিত্তি— বিশেষত দেহ, শ্রম, সক্ষমতা ও সামাজিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ— থেকে সূত্র নিয়ে প্রতিবন্ধকতা ও মানবদেহের আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ মার্কসের লেখা এখানে সমাপ্ত তত্ত্ব নয়, বরং নতুন অনুসন্ধানের সূচনা। দেহ ও তার রাজনীতি নিয়ে ডেভিড হার্ভেও তাঁর ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘স্পেসেস অব হোপ’ বইয়ের দ্বিতীয় ভাগে সমৃদ্ধ আলোচনা করেছেন।

পুঁজি, শ্রমিকের দেহ ও জীবনের ক্ষয়

সাম্প্রতিক কালে মার্কসের চিন্তায় স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে শ্রমসাধ্য অনুসন্ধানগুলির একটি করেছেন রাজু দাস। ২০২৩ সালে ‘ক্রিটিক্যাল সোসিয়োলজি’-তে প্রকাশিত ‘ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড হেলথ’ প্রবন্ধে তিনি মার্কসের রচনা— বিশেষত ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ড, তবে অন্যান্য রচনা থেকে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ভাবনাগুলি একত্র করেছেন। উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা কীভাবে শ্রমিকের জীবনকে নানাভাবে খর্ব করে এবং তাকে পূর্ণ মানবিক অস্তিত্ব থেকে বঞ্চিত করে, মার্কসের লেখায় তার বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। দীর্ঘ শ্রমদিবস, কম মজুরি, কর্মস্থলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পুষ্টির অভাব, বিশ্রামের ঘাটতি এবং সন্তানদের পরিচর্যা করতে না পারার ফলে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার কীভাবে অসুস্থতার জীবন্ত প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠেন, ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ডে মার্কস তার ক্রুদ্ধ ও সাক্ষ্যনির্ভর বর্ণনা দিয়েছেন।

রাজু দাসের মতে, স্বাস্থ্য বিষয়ে মার্কসের লেখায় যা পাওয়া যায়, তা তাঁর বৃহত্তর প্রকল্পের অংশমাত্র; ফলে এর তাত্ত্বিক পরিসর আপাতদৃষ্টিতে সীমিত। কিন্তু মার্কসের সামগ্রিক দার্শনিক অবয়ব বিবেচনা করলে স্বাস্থ্যকে নিছক কিছু সাক্ষ্য ও উদাহরণের সমষ্টি বলে দেখা যায় না। শ্রমশক্তি পুঁজির কাছে উৎপাদনের উপকরণ হলেও শ্রমিকের কাছে তা তার জীবন্ত দেহ ও অস্তিত্ব। অতএব শ্রমশক্তির ব্যবহার মানে মানুষের স্নায়ু, পেশি, মস্তিষ্ক, সময় এবং আয়ুষ্কালের ব্যবহার। পুঁজির সঞ্চয় ও শ্রমিকের দেহক্ষয়ের এই সম্পর্ক স্বাস্থ্যকে মার্কসের পুঁজিবাদ-বিশ্লেষণের একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে ব্যক্তি-উৎক্রমণ ও সামাজিক উৎক্রমণের মধ্যে মার্কস নাকি স্ববিরোধে পড়েছিলেন— এই অভিযোগও খণ্ডিত হয়।  মার্কসের কাছে ব্যক্তির মুক্ত বিকাশ এবং সকলের মুক্ত বিকাশ পরস্পরের শর্ত; সুস্বাস্থ্য সেই মুক্ত বিকাশের অন্যতম মৌল সক্ষমতা।

স্বাস্থ্য, প্রয়োজন ও মানব-সক্ষমতা

ব্যক্তি ও সামাজিক মানুষের অন্যতম মৌল সক্ষমতা হিসেবে স্বাস্থ্যকে বুঝতে ‘সক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গি’ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অমর্ত্য সেন যথার্থভাবেই মানব-সক্ষমতার আলোচনায় স্বাস্থ্যকে কেন্দ্রীয় স্থান দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে ডেভিড লিওপোল্ডের ‘কার্ল মার্কস অ্যান্ড দ্য কেপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ প্রবন্ধটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘দ্য কেম্ব্রিজ হ্যান্ডবুক অব দ্য কেপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে লিওপোল্ড দেখিয়েছেন, মার্কস খাদ্য, পুষ্টি, বাসস্থান, আলো, বাতাস, জল ও শিক্ষার মতো যে মানবীয় প্রয়োজনগুলির কথা বলেছেন, সেগুলি সক্ষমতার ভাষায় মানুষের বাস্তব স্বাধীনতার শর্ত হিসেবে পাঠ করা যায়। এই পাঠ স্বাস্থ্যকে সংকীর্ণ চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক সংজ্ঞার বাইরে তার পূর্ণতর সামাজিক অর্থে দেখতে সাহায্য করে।

এখানে একটি মৌল পার্থক্য মনে রাখা দরকার। শ্রমিককে কেবল উৎপাদনক্ষম রাখার জন্য যতটুকু স্বাস্থ্য প্রয়োজন, পুঁজির আগ্রহ সাধারণত ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্য তার উৎপাদনশীলতার চেয়ে অনেক বড় বিষয়। সুস্থ থাকা মানে নিজের ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সম্পর্ক বিকশিত করার সুযোগ পাওয়া; বিশ্রাম, আনন্দ, যত্ন ও মর্যাদার অধিকার ভোগ করা; নিজের জীবনের গতিপথ নির্ধারণে সক্ষম হওয়া। এই বৃহত্তর অর্থে স্বাস্থ্য মানবমুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

যবনিকা

মার্কসের চিন্তায় স্বাস্থ্যের কোনো হাতে-গরম, স্বয়ংসম্পূর্ণ তত্ত্ব পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর রচনার বিভিন্ন স্তর একত্রে  পড়লে স্বাস্থ্যকে বোঝার একটি শক্তিশালী পদ্ধতি পাওয়া যায়। সেই পদ্ধতি আমাদের রোগের দৃশ্যমান লক্ষণ থেকে তার সামাজিক উৎপত্তির দিকে নিয়ে যায়; ব্যক্তির দেহ থেকে কর্মস্থল, পরিবার, বাসস্থান, পরিবেশ ও রাষ্ট্রনীতির দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে; এবং চিকিৎসার প্রাপ্যতার প্রশ্নকে সম্পদ ও ক্ষমতার বণ্টনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে। মার্কসের প্রধান অবদান এখানেই— তিনি দৃষ্টিপথ বদলে দেন। অসুস্থতা তখন আর নিছক ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য বা  জৈবিক দুর্ঘটনা থাকে না; বহু ক্ষেত্রে তা একটি নির্দিষ্ট উৎপাদন ও সমাজব্যবস্থার নিয়মিত ফল হিসেবে ধরা পড়ে।

আলোচিত গবেষণাগুলি এই পদ্ধতিকেই নানা দিকে প্রসারিত করেছে। ফস্টার, ক্লার্ক ও হোলম্যান স্বাস্থ্যকে প্রকৃতি ও পুঁজিবাদের পরিবেশগত সংকটের সঙ্গে যুক্ত করেছেন; ওয়েটজকিন চিকিৎসা পরিষেবার শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন; ফার্মার কাঠামোগত হিংসা ও বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার সম্পর্ককে রোগের ইতিহাসের মধ্যে এনেছেন; মার্মট সামাজিক মর্যাদা ও নিয়ন্ত্রণের স্বাস্থ্যগত অভিঘাত দেখিয়েছেন; কোলিয়ার ও মাইকেল হার্ভে স্বাস্থ্যশিল্প, পণ্যায়ন, জাতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির সমকালীন রূপ ব্যাখ্যা করেছেন; বেংটসন প্রতিবন্ধকতার প্রশ্নে মার্কসীয় বিশ্লেষণের অসম্পূর্ণতা ও সম্ভাবনা দুটিই চিহ্নিত করেছেন; আর রাজু দাস শ্রমিকের দেহ ও জীবনের ক্ষয়কে উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছেন। লিওপোল্ডের সক্ষমতা-বিষয়ক পাঠ এই আলোচনাকে মানুষের পূর্ণ বিকাশের প্রশ্নে পৌঁছে দেয়।

আজকের পৃথিবীতে এই চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। একদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান পণ্যায়ন; একদিকে আয়ু বৃদ্ধির সম্ভাবনা, অন্যদিকে শ্রমের অনিশ্চয়তা, দূষণ, অপুষ্টি, মহামারি ও গভীর স্বাস্থ্য-অসাম্য— এই বৈপরীত্যগুলি কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। কেন একই রোগ ভিন্ন শ্রেণি, জাতি, লিঙ্গ বা অঞ্চলের মানুষের ওপর ভিন্ন ভার চাপায়, কেন প্রতিরোধযোগ্য অসুখও দরিদ্রের মৃত্যুর কারণ হয়, এবং কেন স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রসার সত্ত্বেও অসাম্য টিকে থাকে— এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে উৎপাদন, সম্পত্তি ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা জরুরি।

অতএব মার্কসের চিন্তায় স্বাস্থ্যকে খোঁজার অর্থ তাঁর রচনায় বিচ্ছিন্ন কয়েকটি চিকিৎসাসংক্রান্ত মন্তব্য সংগ্রহ করা নয়। বরং তা হল এমন একটি সমাজতত্ত্ব ও রাজনৈতিক অর্থনীতি নির্মাণ করা, যেখানে মানুষের দেহকে পুঁজির সম্পদ নয়, মানুষের নিজস্ব জীবন হিসেবে দেখা হয়; যেখানে স্বাস্থ্য বাজারে কেনার সামর্থ্য নয়, সর্বজনীন অধিকার; এবং যেখানে সুস্থতার লক্ষ্য কেবল শ্রমক্ষমতার পুনরুৎপাদন নয়, প্রত্যেক মানুষের স্বাধীন ও পূর্ণ বিকাশ। এই জায়গাতেই মার্কসীয় স্বাস্থ্যচিন্তা অতীতের ব্যাখ্যা থেকে বর্তমানের সমালোচনা এবং ভবিষ্যতের দাবি হয়ে ওঠে।


প্রকাশের তারিখ: ০৩-সেপ্টেম্বর-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস ও দর্শন বিভাগে প্রকাশিত ১৬৮ টি নিবন্ধ
০৩-সেপ্টেম্বর-২০২৬

০২-সেপ্টেম্বর-২০২৬

২৭-আগস্ট-২০২৬

১৫-আগস্ট-২০২৬

০৭-আগস্ট-২০২৬

০৬-আগস্ট-২০২৬

০৫-আগস্ট-২০২৬

০৪-আগস্ট-২০২৬

০৩-আগস্ট-২০২৬

২০-জুলাই-২০২৬