Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

স্মিথকে পুনরুদ্ধার, মার্কসকে পুনঃপাঠ

অভিজিৎ ঘোষ
২৫০ বছরে ‘ওয়েলথ অব নেশনস’: অ্যাডাম স্মিথ থেকে কার্ল মার্কস— পুঁজিবাদের জন্ম, বিকাশ ও আত্মসমালোচনার রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা।
Recovering Smith Rereading Marx

ভূমিকা

১৭৭৬ সালে অ্যাডাম স্মিথের অ্যান এনকোয়ারি ইনটু দি নেচার অ্যান্ড কসেস অব দ্য ওয়েলথ অব নেশনস প্রকাশ আধুনিক সামাজিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। ফরাসি বিপ্লবের পূর্বমুহূর্তে, শিল্পবিপ্লবের পূর্ণ বিকাশের আগেই এবং আধুনিক কর্পোরেট পুঁজিবাদের উত্থানের বহু পূর্বে রচিত এই গ্রন্থ এমন এক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল, যা পরবর্তী আড়াই শতাব্দীর রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে ওঠে— সমাজে সম্পদ কোথা থেকে আসে এবং কীভাবে তার বৃদ্ধি ঘটে? এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্ম। ২০২৬ সালে এই গ্রন্থের প্রকাশের ২৫০ বছর পূর্তি তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মরণোৎসব নয়; আধুনিক পুঁজিবাদের বৌদ্ধিক ভিত্তিকে পুনর্বিবেচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

সমকালীন মূলধারার অর্থনীতিতে অ্যাডাম স্মিথকে প্রায়শই ‘মুক্তবাজারের জনক’ বা ‘অদৃশ্য হাত’-এর প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই পাঠ আংশিক এবং ঐতিহাসিকভাবে বিভ্রান্তিকর। দ্য ওয়েলথ অব নেশনস কেবল বাজার, মূল্য বা বাণিজ্যের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নয়; এটি শ্রম, উৎপাদন, রাষ্ট্র, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সম্পদ সৃষ্টির ঐতিহাসিক শর্ত নিয়ে রচিত ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রথম সুসংবদ্ধ গ্রন্থ। স্মিথের কাছে বাজার কোনও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিমূর্ত ব্যবস্থা নয়; বরং নৈতিকতা, আইন, রাষ্ট্র এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক বিন্যাস। ফলে তাঁকে নিছক বাজারমৌলবাদের তাত্ত্বিক মুখপাত্রে পরিণত করা যেমন অপপাঠ, তেমনি তাঁকে কেবল পুঁজিবাদের মতাদর্শিক রক্ষাকবচ হিসেবে চিহ্নিত করাও তাঁর চিন্তার প্রতি অবিচার।

অন্যদিকে, কার্ল মার্কসকেও প্রায়শই স্মিথের বিপরীত মেরুর চিন্তাবিদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু Capital, Grundrisse এবং Theories of Surplus Value-এর নিবিড় পাঠ সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। মার্কস ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং তার সর্বোচ্চ তাত্ত্বিক অর্জনকে আত্মস্থ করে তার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য, সীমাবদ্ধতা এবং মতাদর্শগত চরিত্র উন্মোচন করেছেন। তাঁর সমালোচনা বহিরাগত (external) নয়; অন্তর্গত (immanent)। অর্থাৎ, স্মিথ ও রিকার্ডোর উত্থাপিত প্রশ্নগুলিকেই তিনি আরও গভীর ঐতিহাসিক, সামাজিক ও শ্রেণিগত বিশ্লেষণের স্তরে উন্নীত করেন।

এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় যুক্তি হলো, অ্যাডাম স্মিথ ও কার্ল মার্কসকে পরস্পরের বিকল্প বা পরস্পরবিরোধী চিন্তাবিদ হিসেবে নয়, বরং একই বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের দুই ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে পাঠ করা উচিত। স্মিথ রাজনৈতিক অর্থনীতির মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন— সমাজে সম্পদ কীভাবে সৃষ্টি হয়? মার্কস সেই প্রশ্নকে পুনর্গঠন করে জানতে চাইলেন— সৃষ্ট সম্পদের উপর কার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, কোন সামাজিক সম্পর্ক সেই অধিকারকে বৈধতা দেয়, এবং কেন পুঁজিবাদে সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য, শ্রেণিবিভাজন ও সংকটও পুনরুৎপাদিত হয়? এই অর্থে Capital কেবল দ্য ওয়েলথ অব নেশনস-এর উত্তর নয়; তার দ্বান্দ্বিক সমালোচনা।

দ্য ওয়েলথ অব নেশনস-এর দ্বিশতপঞ্চাশবর্ষ সেই পুনর্বিবেচনার এক ঐতিহাসিক আহ্বান। এই পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অমর্ত্য সেনের পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, আধুনিক অর্থনীতিতে অ্যাডাম স্মিথের চিন্তার সবচেয়ে বড় অপপ্রয়োগ ঘটেছে তাঁকে কেবল ব্যক্তিস্বার্থ ও বাজারস্বাধীনতার তাত্ত্বিক হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে। ফলে স্মিথের নৈতিক দর্শন, ন্যায়বিচারবোধ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণ আড়ালে চলে গেছে। স্মিথকে পুনরুদ্ধার করার অর্থ তাই তাঁর প্রকৃত রাজনৈতিক অর্থনীতিকে পুনরায় আবিষ্কার করা। 

ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির নির্মাণ: অ্যাডাম স্মিথ, শ্রম, বাজার ও সমাজ

অ্যাডাম স্মিথকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো তাঁকে তাঁর নিজস্ব ঐতিহাসিক ও বৌদ্ধিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে পড়া। অমর্ত্য সেন যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে আধুনিক অর্থনীতিতে স্মিথের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য তাঁর চিন্তার নির্বাচিত ব্যবহার। বিশেষত ‘অদৃশ্য হাত’ এবং ব্যক্তিস্বার্থের ধারণাকে অতিরঞ্জিত করে এমন এক স্মিথ-চিত্র নির্মিত হয়েছে, যা তাঁর নৈতিক দর্শন, ন্যায়বিচারবোধ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণকে প্রায় সম্পূর্ণ আড়াল করে দিয়েছে। সেনের মতে, এই অপপাঠ কেবল স্মিথের প্রতি অবিচার নয়; সমকালীন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণকেও সংকুচিত করেছে। ফলে স্মিথকে পুনরুদ্ধার করার অর্থ কেবল তাঁর প্রকৃত মতামত পুনঃস্থাপন করা নয়; বরং তাঁর রাজনৈতিক অর্থনীতির নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।

বিংশ শতাব্দীর নবউদারবাদী ব্যাখ্যায় স্মিথকে প্রায়শই অবাধ বাজার, ব্যক্তিস্বার্থ এবং রাষ্ট্রের সর্বনিম্ন ভূমিকার প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু স্কটিশ আলোকায়নের (Scottish Enlightenment) বৌদ্ধিক পরিসরে গড়ে ওঠা স্মিথ প্রথমত ছিলেন একজন নৈতিক দার্শনিক, তারপর অর্থনীতিবিদ। তাঁর The Theory of Moral Sentiments (১৭৫৯) এবং দ্য ওয়েলথ অব নেশনস (১৭৭৬) পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একই বৌদ্ধিক প্রকল্পের দুই পরস্পর-সম্পূরক দিক। প্রথম গ্রন্থে তিনি সামাজিক সহাবস্থান ও নৈতিকতার ভিত্তি অনুসন্ধান করেছেন; দ্বিতীয় গ্রন্থে সেই সমাজে শ্রম, সম্পদ, বাজার ও প্রতিষ্ঠানের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, স্মিথের অর্থনীতি নৈতিক দর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তারই সম্প্রসারণ।

এই বৌদ্ধিক অবস্থান থেকেই স্মিথ বণিকবাদ (mercantilism)-এর মৌলিক সমালোচনা করেন। তাঁর সময়ে জাতীয় সমৃদ্ধির মানদণ্ড ছিল সোনা-রূপার সঞ্চয়; স্মিথ দেখান, একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ মূল্যবান ধাতুর ভাণ্ডারে নয়, বরং তার মানুষের উৎপাদনশীল শ্রমে নিহিত। তিনি লিখেছিলেন—

“The annual labour of every nation is the fund which originally supplies it with all the necessaries and conveniences of life.”

(দ্য ওয়েলথ অব নেশনস, Book I, Introduction)

এই বক্তব্যের মধ্যেই ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির মৌলিক তাত্ত্বিক স্থানান্তর নিহিত—সম্পদের উৎস বাণিজ্য নয়, সামাজিক শ্রম; রাষ্ট্রের ঐশ্বর্য নয়, উৎপাদনক্ষমতা।

এই প্রেক্ষাপটেই স্মিথ শ্রমবিভাগের (division of labour) বিশ্লেষণ করেন। পিন-কারখানার সুপরিচিত উদাহরণের মাধ্যমে তিনি দেখান যে বিশেষায়িত শ্রম উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তবে তাঁর বিশ্লেষণ কেবল প্রযুক্তিগত নয়; সামাজিকও। শ্রমবিভাগ ব্যক্তি-শ্রমকে সামাজিক শ্রমে রূপান্তরিত করে এবং বাজার সেই বিচ্ছিন্ন শ্রমকে একটি সমন্বিত সামাজিক ব্যবস্থায় সংযুক্ত করে। ফলে বাজার কেবল বিনিময়ের ক্ষেত্র নয়; এটি সামাজিক শ্রমের একটি ঐতিহাসিক সংগঠন।

তবে শ্রমবিভাগের এই উৎপাদনশীল শক্তির পাশাপাশি স্মিথ তার মানবিক সীমাবদ্ধতার কথাও স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন। দীর্ঘকাল একঘেয়ে যান্ত্রিক শ্রম শ্রমিকের বৌদ্ধিক ও নাগরিক সক্ষমতাকে ক্ষয় করতে পারে। তাঁর ভাষায়, শ্রমিক এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে সে “as stupid and ignorant as it is possible for a human creature to become” (দ্য ওয়েলথ অব নেশনস, Book V, Chapter I)। এই কারণেই তিনি সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে যুক্তি দেন। এখানেই স্পষ্ট হয় যে স্মিথের রাষ্ট্রচিন্তা নবউদারবাদী ‘ন্যূনতম রাষ্ট্র’-এর ধারণার সঙ্গে অভিন্ন নয়। প্রতিরক্ষা, বিচারব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং শিক্ষার মতো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তিনি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছিলেন।

স্মিথের রাজনৈতিক অর্থনীতির আরেকটি বহুল আলোচিত কিন্তু প্রায়শই ভুল ব্যাখ্যাত ধারণা হলো ‘অদৃশ্য হাত’। সমকালীন অর্থনৈতিক আলোচনায় এই রূপকটিকে স্মিথের সমগ্র অর্থনৈতিক দর্শনের সারাংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও ঐতিহাসিকভাবে এই ব্যাখ্যা টেকসই নয়। দ্য ওয়েলথ অব নেশনস-এ এই রূপকটি মাত্র একবার এবং The Theory of Moral Sentiments-এও একবার ব্যবহৃত হয়েছে। অমর্ত্য সেনের ভাষায়, ‘অদৃশ্য হাত’-কে স্মিথের সার্বজনীন অর্থনৈতিক নীতিতে রূপান্তরিত করা তাঁর চিন্তার অপপ্রয়োগ। একইভাবে গ্যাভিন কেনেডি দেখিয়েছেন যে বিংশ শতাব্দীতে নবউদারবাদী অর্থনীতির উত্থানের সঙ্গে এই রূপককে এমন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ বাজারতত্ত্বে পরিণত করা হয়েছে, যা স্মিথের প্রকৃত রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বরং স্মিথ নিজেই প্রতিযোগিতার অবক্ষয় এবং একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য—

“People of the same trade seldom meet together... but the conversation ends in a conspiracy against the public, or in some contrivance to raise prices.”

(দ্য ওয়েলথ অব নেশনস, Book I, Chapter X)

এই পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে যে স্মিথ বাজারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল্যাণকর বলে মনে করেননি; বরং উপলব্ধি করেছিলেন যে প্রতিযোগিতা ধ্বংস হলে বাজার সহজেই একচেটিয়া পুঁজির নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, প্রযুক্তি-কর্পোরেশন এবং বহুজাতিক একচেটিয়া পুঁজির বর্তমান যুগে তাঁর এই সতর্কবাণী নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে।

অবশেষে, মূল্য ও শ্রমের সম্পর্ক নিয়ে স্মিথের অনুসন্ধান ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির পরবর্তী বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে। তিনি শ্রমকে মূল্যসৃষ্টির মৌলিক উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও উন্নত পুঁজিবাদী সমাজের বিশ্লেষণে কখনও শ্রমকে মূল্যের উৎস, কখনও আবার মূল্য পরিমাপের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেন। এই তাত্ত্বিক দ্বৈততাই পরবর্তীকালে ডেভিড রিকার্ডোর শ্রমমূল্য-তত্ত্ব এবং কার্ল মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্য-বিশ্লেষণের সূচনাবিন্দু হয়ে ওঠে। এই অর্থে স্মিথের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনও নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মতবাদের প্রবক্তা হিসেবে নয়; বরং রাজনৈতিক অর্থনীতিকে শ্রম, উৎপাদন এবং সমাজের বাস্তব ইতিহাসের উপর প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই নিহিত। তাঁর নির্মিত বৌদ্ধিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই রিকার্ডো ধ্রুপদী মূল্যতত্ত্বকে পরিশীলিত করেন এবং মার্কস সেই ঐতিহ্যের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য উন্মোচন করে রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনাকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেন।

ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিণতি

অ্যাডাম স্মিথ যে ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, ডেভিড রিকার্ডো তাকে আরও বিমূর্ত ও তাত্ত্বিক উচ্চতায় উন্নীত করেন। স্মিথ অর্থনৈতিক জীবনকে ইতিহাস, নৈতিক দর্শন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছিলেন; রিকার্ডো সেই ঐতিহাসিক জটিলতাকে অনেকাংশে সরিয়ে রেখে মূল্য, বণ্টন এবং শ্রেণির পারস্পরিক সম্পর্কের অন্তর্নিহিত নিয়মাবলি অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করেন। তাঁর কাছে রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল জাতীয় আয় কীভাবে মজুরি, মুনাফা এবং ভূমিখাজনার মধ্যে বণ্টিত হয়।

শ্রমকে মূল্যসৃষ্টির মৌলিক উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও স্মিথের বিশ্লেষণে একটি তাত্ত্বিক দ্বৈততা রয়ে গিয়েছিল। কখনও তিনি পণ্যে নিহিত শ্রম (labour embodied)-কে, আবার কখনও একটি পণ্যের বিনিময়ে অর্জনযোগ্য শ্রমের পরিমাণ (labour commanded)-কে মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। রিকার্ডো এই অসঙ্গতিকে অতিক্রম করে শ্রমসময়কে আপেক্ষিক মূল্যের প্রধান নির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং আয়বণ্টনকে ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় করে তোলেন। কিন্তু এই তাত্ত্বিক পরিশীলনের একটি সীমাও ছিল। তাঁর বিশ্লেষণ ক্রমশ এমন এক বিমূর্ত কাঠামোয় রূপ নেয়, যেখানে স্মিথের নৈতিকতা, প্রতিষ্ঠান ও ইতিহাসবোধ অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। পরবর্তী নব্যধ্রুপদী অর্থনীতির বিমূর্ত বাজারবিশ্লেষণের বৌদ্ধিক ভিত্তিও আংশিকভাবে এখানেই নির্মিত হয়।

কার্ল মার্কস এই ধ্রুপদী ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং তার অন্তর্গত সমালোচক (immanent critic) হিসেবে তাকে পুনর্গঠন করেন। Capital-এর উপশিরোনাম— A Critique of Political Economy— এই প্রকল্পেরই ঘোষণা। প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন—

“It is the ultimate aim of this work to lay bare the economic law of motion of modern society.”

(Capital, Vol. I, Preface to the First German Edition, 1867)

মার্কসের উদ্দেশ্য কোনও বিকল্প অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক রচনা করা ছিল না; তাঁর লক্ষ্য ছিল আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের অন্তর্নিহিত গতিসূত্র উন্মোচন করা। অর্থনীতি তাঁর কাছে কেবল সম্পদ সৃষ্টির বিজ্ঞান নয়; বরং ইতিহাসনির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ।

মার্কসের মতে, ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির সর্ববৃহৎ শক্তি ছিল শ্রমকে সম্পদের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা; আবার তার মৌলিক সীমাবদ্ধতাও ছিল এখানেই যে, শ্রমকে তারা একটি ঐতিহাসিক সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে বিশ্লেষণ করতে পারেনি। স্মিথ ও রিকার্ডো শ্রমের উৎপাদনশীল শক্তিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, কিন্তু শ্রমশক্তি (labour-power) নামক বিশেষ পণ্যটির ঐতিহাসিক চরিত্র তাঁদের বিশ্লেষণে অনুপস্থিত ছিল।

মার্কস দেখান যে বাজারে শ্রম বিক্রি হয় না; বিক্রি হয় শ্রমশক্তি— অর্থাৎ শ্রম করার সক্ষমতা। শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারিত হয় তার পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিকভাবে আবশ্যক শ্রমসময়ের দ্বারা; কিন্তু উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সেই শ্রমশক্তি নিজের মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্য সৃষ্টি করে। তিনি লিখেছিলেন—

“The specific use-value of labour-power is that it creates value, and moreover more value than it itself possesses.”

(Capital, Vol. I, Chapter 7)

এই অতিরিক্ত মূল্যই উদ্বৃত্ত মূল্য (surplus value)। ফলে পুঁজিবাদী শোষণ বাজারে অসম বিনিময়ের ফল নয়; বরং সমমূল্যের বিনিময় বজায় রেখেই উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে সংঘটিত হয়। মুনাফা তাই বাজারের দক্ষতার ফল নয়; উদ্বৃত্ত শ্রমের সামাজিক আত্মসাতের রূপান্তরিত প্রকাশ। এখানেই ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে মার্কসের গুণগত অতিক্রম।

মার্কসের সমালোচনা অবশ্য উদ্বৃত্ত মূল্যেই সীমাবদ্ধ নয়। Capital-এর প্রথম খণ্ডে তিনি ‘Commodity Fetishism’-এর ধারণার মাধ্যমে দেখান যে পুঁজিবাদে মানুষের পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক পণ্যের সম্পর্ক হিসেবে প্রতিভাত হয়। বাজারে মনে হয় যেন পণ্যই স্বয়ং মূল্য বহন করছে; অথচ সেই মূল্যের উৎস সামাজিক শ্রম। এই ‘পণ্য-পূজা’ (commodity fetishism) কেবল চেতনার বিভ্রম নয়; এটি পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের বাস্তব সামাজিক রূপ।

একইভাবে প্রতিযোগিতা সম্পর্কেও স্মিথ ও মার্কসের মধ্যে ধারাবাহিকতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। স্মিথ প্রতিযোগিতাকে উৎপাদনশীলতার উৎস হিসেবে দেখেছিলেন এবং একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। মার্কস এই বিশ্লেষণকে আরও এগিয়ে দেখান যে প্রতিযোগিতার অন্তর্নিহিত যুক্তিই শেষ পর্যন্ত পুঁজির কেন্দ্রীভবন, একচেটিয়া আধিপত্য এবং পর্যায়ক্রমিক সংকটের জন্ম দেয়। বাজারের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা তাই বাস্তবে শ্রেণিগত ক্ষমতার অসম সম্পর্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

শ্রমবিভাগ সম্পর্কেও মার্কস স্মিথের পর্যবেক্ষণকে গভীরতর করেন। স্মিথ দেখেছিলেন যে চরম শ্রমবিভাগ শ্রমিকের বৌদ্ধিক বিকাশকে সংকুচিত করতে পারে; মার্কস এই পর্যবেক্ষণকে বিচ্ছিন্নতা (alienation)-র তত্ত্বে উন্নীত করেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদে শ্রমিক কেবল উৎপাদিত বস্তু থেকেই নয়, নিজের শ্রম, সহমানুষ এবং সৃজনশীল মানবিক সত্তা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছিন্নতা কোনও নৈতিক ব্যতিক্রম নয়; বরং পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের অন্তর্নিহিত ফল।

এই কারণেই মার্কস ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং তথাকথিত ‘ভালগার অর্থনীতি’ (vulgar economics)-র মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করেন। তাঁর মতে, স্মিথ ও রিকার্ডো অন্তত উৎপাদনের বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু জঁ-বাতিস্ত সে, ফ্রেদেরিক বাস্তিয়া প্রমুখ বাজারে দৃশ্যমান বিনিময়-সম্পর্ককেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং শ্রেণি, শোষণ ও উদ্বৃত্তের প্রশ্নকে আড়াল করেন। এই কারণেই মার্কস তাঁদের ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির উত্তরসূরি নয়, বরং তার অবক্ষয়ের প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অতএব, স্মিথ, রিকার্ডো এবং মার্কসকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন চিন্তাবিদ হিসেবে দেখা ইতিহাসসম্মত নয়। স্মিথ রাজনৈতিক অর্থনীতির মৌলিক প্রশ্ন— শ্রম, উৎপাদন ও সম্পদের প্রশ্ন— উত্থাপন করেছিলেন; রিকার্ডো সেই প্রশ্নকে অধিকতর তাত্ত্বিক পরিশীলন দিয়েছিলেন; আর মার্কস সেই ঐতিহ্যের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য উন্মোচন করে উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ক, শ্রেণিশক্তি, উদ্বৃত্ত মূল্য এবং পুঁজির পুনরুৎপাদনকে রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করেন। এই অর্থে মার্কস স্মিথের অস্বীকার নন; তিনি ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির দ্বান্দ্বিক পরিণতি।

২৫০ বছর পরে: স্মিথ, মার্কস এবং বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি

দ্য ওয়েলথ অব নেশনস প্রকাশের আড়াই শতাব্দী পরে পুঁজিবাদ এমন এক ঐতিহাসিক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যা যেমন অ্যাডাম স্মিথের যুগের বাণিজ্য ও শিল্পপুঁজির জগৎ থেকে ভিন্ন, তেমনি কার্ল মার্কসের বিশ্লেষিত উনিশ শতকের প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদেরও গুণগত রূপান্তর ঘটিয়েছে। আজ উৎপাদন এখনও পুঁজিবাদের ভিত্তি হলেও পুঁজির সঞ্চয় ক্রমবর্ধমানভাবে আর্থিকীকরণ (financialisation), ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, তথ্য (data), মেধাস্বত্ব (intellectual property), অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক মূল্য-শৃঙ্খলের (global value chains) মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও পুঁজিবাদের মৌলিক সামাজিক সম্পর্ক অপরিবর্তিত—সামাজিক শ্রমের উপর নির্ভর করেই পুঁজি উদ্বৃত্ত আহরণ ও পুনরুৎপাদন করে। এই কারণেই স্মিথ ও মার্কস আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁরা সমকালীন অর্থনীতির জন্য কোনও প্রস্তুত নীতিপুস্তক রেখে যাননি; বরং এমন এক বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো নির্মাণ করেছেন, যার সাহায্যে পুঁজিবাদের পরিবর্তিত রূপ ও অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যকে বোঝা সম্ভব।

মার্কসের রাজনৈতিক অর্থনীতির স্থায়ী শক্তি এখানেই যে তিনি পুঁজিবাদকে কোনও স্থির অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং আত্মবিস্তারশীল একটি ঐতিহাসিক সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। Capital-এ তিনি দেখিয়েছিলেন যে প্রতিযোগিতা নিজস্ব যুক্তিতেই পুঁজির কেন্দ্রীভবন (concentration) ও কেন্দ্রীকরণের (centralisation) দিকে অগ্রসর হয় এবং সম্পদের সঞ্চয় ক্রমশ সীমিত সংখ্যক মালিকের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। এই প্রসঙ্গে তাঁর বহুল উদ্ধৃত মন্তব্য—

“Accumulation of wealth at one pole is, therefore, at the same time accumulation of misery, agony of toil... at the opposite pole.”

(Capital, Vol. I, Chapter 25)

এই পর্যবেক্ষণ কেবল শিল্পবিপ্লবের যুগের বর্ণনা নয়; পুঁজিবাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার বিশ্লেষণ। সম্পদের সঞ্চয় এবং বৈষম্যের সম্প্রসারণ একই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার দুটি অবিচ্ছেদ্য দিক।

বিশ শতকে মার্কসের এই বিশ্লেষণ নতুন ঐতিহাসিক বাস্তবতায় সম্প্রসারিত হয়। ভ্লাদিমির লেনিন দেখান যে প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদ ক্রমে একচেটিয়া পুঁজি, ব্যাংকপুঁজি ও শিল্পপুঁজির সংমিশ্রণে অর্থপুঁজির (finance capital) আধিপত্যে রূপান্তরিত হয় এবং সাম্রাজ্যবাদ তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হয়ে ওঠে। রোজা লুক্সেমবার্গ যুক্তি দেন, পুঁজিবাদ তার পুনরুৎপাদনের জন্য ক্রমাগত নতুন অঞ্চল, নতুন বাজার এবং নতুন সামাজিক ক্ষেত্রকে পণ্যে রূপান্তরিত করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে কার্ল পলান্যি দেখিয়েছিলেন যে শ্রম, ভূমি এবং অর্থকে ‘কাল্পনিক পণ্য’ (fictitious commodities) হিসেবে বাজারের অধীনস্থ করার মধ্যেই আধুনিক পুঁজিবাদের গভীর সামাজিক সংকট নিহিত।

সমকালীন বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে এই ঐতিহ্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন ডেভিড হার্ভে। তাঁর accumulation by dispossession ধারণা দেখায় যে আজ উদ্বৃত্ত আহরণ কেবল উৎপাদনক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; বেসরকারিকরণ, আর্থিকীকরণ, ঋণব্যবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্যিকীকরণ, নগরায়ণের নামে ভূমি অধিগ্রহণ, তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মেধাস্বত্বের সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েও পুঁজি নতুন সঞ্চয়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত পুঁজির পুনরুৎপাদনের অবকাঠামোয় পরিণত হয়।

এই বাস্তবতা স্মিথ ও মার্কস— উভয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতিকেই নতুনভাবে পাঠ করার আহ্বান জানায়। স্মিথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে একচেটিয়া ক্ষমতার বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য; আর মার্কস দেখান যে পুঁজিবাদ তার বিকাশের মধ্য দিয়েই নতুন ধরনের কেন্দ্রীভবন, বৈষম্য এবং সংকট সৃষ্টি করে। এই দুই অন্তর্দৃষ্টিকে একত্রে বিবেচনা করলেই একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি গভীরতরভাবে অনুধাবন করা সম্ভব।

ভারতীয় বাস্তবতা: রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নে প্রত্যাবর্তন

ভারতের তিন দশকের উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কর্মসংস্থানহীন বৃদ্ধি, অনানুষ্ঠানিক শ্রমের বিস্তার, কৃষির দীর্ঘস্থায়ী সংকট, কর্পোরেট পুঁজির ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন এবং আয় ও সম্পদের বৈষম্যের তীব্রতা এই মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—বাজারের সম্প্রসারণ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক সমৃদ্ধি, ন্যায়সঙ্গত বণ্টন এবং মানবকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই রাজনৈতিক অর্থনীতির ধ্রুপদী ঐতিহ্য নতুন তাৎপর্য লাভ করে।

এই প্রেক্ষাপটে অ্যাডাম স্মিথ এবং কার্ল মার্কস—উভয়েই প্রাসঙ্গিক, যদিও ভিন্ন বিশ্লেষণাত্মক স্তরে। স্মিথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে বাজার তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন প্রতিযোগিতা বাস্তব, একচেটিয়া ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত এবং রাষ্ট্র ন্যায়বিচার, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য জনপণ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করে। অন্যদিকে মার্কস দেখান যে বাজারে আইনি সমতা (formal equality) উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শ্রেণিগত অসমতা ও উদ্বৃত্ত আত্মসাতের সম্পর্ককে বিলুপ্ত করে না; বরং প্রায়শই তাকে আড়াল করে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়— এই দুই প্রশ্নকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।

ভারতীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির সমকালীন আলোচনায় এই দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিই নতুনভাবে বিকশিত হয়েছে। প্রভাত পট্টনায়ক দেখিয়েছেন, বিশ্বায়িত আর্থিক পুঁজির যুগে রাষ্ট্রের নীতিগত স্বায়ত্তশাসন ক্রমশ সংকুচিত হয় এবং তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও কল্যাণনীতির উপর। উৎসা পট্টনায়ক ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে সমকালীন বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা পর্যন্ত উদ্বৃত্ত আহরণের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে বিশ্বায়ন ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের বহু বৈশিষ্ট্যকে নতুন রূপে পুনর্গঠিত করেছে। অমিয় কুমার বাগচী রাষ্ট্র, উন্নয়ন ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের সম্পর্ককে রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোকে পুনর্বিবেচনা করে দেখিয়েছেন যে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ইতিহাস, রাষ্ট্র ও সামাজিক শক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যাখ্যা করা যায় না।

এই আলোচনাগুলি স্পষ্ট করে যে স্মিথ ও মার্কসকে পুনঃপাঠ করা কেবল ইউরোপীয় বৌদ্ধিক ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ নয়; বরং ভারতের সমকালীন উন্নয়ন, শ্রম, কৃষি, রাষ্ট্র এবং বৈষম্যের প্রশ্ন বোঝারও একটি অপরিহার্য পদ্ধতিগত শর্ত। দ্য ওয়েলথ অব নেশনস-এর ২৫০ বছর পূর্তির তাৎপর্য এখানেই—এটি আমাদের বাজারের সাফল্যের ভাষ্য অতিক্রম করে রাজনৈতিক অর্থনীতির মৌলিক প্রশ্নে, অর্থাৎ শ্রম, ক্ষমতা, রাষ্ট্র এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে, পুনরায় প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানায়।

উপসংহার

নবউদারবাদ অ্যাডাম স্মিথকে মূলত বাজারের দার্শনিক হিসেবে আত্মস্থ করেছে; কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতির ঐতিহ্যে স্মিথ তার চেয়ে অনেক বেশি—তিনি আধুনিক সমাজে সম্পদ, শ্রম, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের প্রথম সুসংবদ্ধ বিশ্লেষক। দ্য ওয়েলথ অব নেশনস-এর ২৫০ বছর পূর্তি আমাদের এই মৌলিক সত্যটিই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক অর্থনীতি কখনও কেবল সম্পদ সৃষ্টির বিজ্ঞান ছিল না; এটি ছিল ক্ষমতা, ইতিহাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান। পরবর্তী মূলধারার অর্থনীতি এই ঐতিহ্য থেকে সরে এসে বাজারকে বিশ্লেষণের স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও, স্মিথ এবং বিশেষত মার্কস দেখিয়েছেন যে অর্থনীতিকে তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা যায় না। এই অর্থেই মার্কসের সমালোচনা স্মিথের প্রত্যাখ্যান নয়; ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার দ্বান্দ্বিক উন্মোচন।

অমর্ত্য সেন যথার্থই স্মরণ করিয়ে দেন যে অ্যাডাম স্মিথের প্রয়োজন আজও ফুরিয়ে যায়নি; বরং তাঁর চিন্তার যথার্থ পাঠ আজ আগের চেয়ে আরও জরুরি। স্মিথের ভাবনার মূল্য নিহিত কেবল তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বে নয়, সমকালীন অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান এবং ন্যায়বিচার-সংক্রান্ত বিতর্কে তাঁর স্থায়ী প্রাসঙ্গিকতায়। আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্ল্যাটফর্ম পুঁজিবাদ, আর্থিকীকরণ, জলবায়ু সংকট এবং ক্রমবর্ধমান সম্পদ-বৈষম্য রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে, তখন স্মিথকে পুনরুদ্ধার করার অর্থ তাঁকে নবউদারবাদের প্রতীকে পরিণত করা নয়, বরং তাঁকে ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পুনঃস্থাপন করা। একইভাবে, মার্কসকে পুনঃপাঠ করার অর্থ উনিশ শতকের সিদ্ধান্ত পুনরাবৃত্তি করা নয়; বরং তাঁর সমালোচনামূলক পদ্ধতির সাহায্যে একবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদের নতুন রূপ, নতুন সংকট এবং নতুন শোষণ-প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করা। দ্য ওয়েলথ অব নেশনস-এর দ্বিশতপঞ্চাশবর্ষ তাই অতীতের এক স্মারক উদ্‌যাপন নয়; বরং রাজনৈতিক অর্থনীতিকে পুনরায় সামাজিক সমালোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার এক বৌদ্ধিক আহ্বান।

তথ্যসূত্র

  • Marx, Karl. Capital: A Critique of Political Economy. Vol. I. Translated by Ben Fowkes. London: Penguin Books/New Left Review, 1976 [1867]
  • Sen, Amartya. "Uses and Abuses of Adam Smith." History of Political Economy, vol. 43, no. 2, 2011, pp. 257–271.
  • Smith, Adam. দ্য ওয়েলথ অব নেশনস. Fingerprint! Classics, 2023 (Original work published 1776)

 


প্রকাশের তারিখ: ০২-সেপ্টেম্বর-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস ও দর্শন বিভাগে প্রকাশিত ১৬৭ টি নিবন্ধ
০২-সেপ্টেম্বর-২০২৬

২৭-আগস্ট-২০২৬

১৫-আগস্ট-২০২৬

০৭-আগস্ট-২০২৬

০৬-আগস্ট-২০২৬

০৫-আগস্ট-২০২৬

০৪-আগস্ট-২০২৬

০৩-আগস্ট-২০২৬

২০-জুলাই-২০২৬

০৯-জুলাই-২০২৬