Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

রাখিগড়ি সভ্যতার জিনতাত্ত্বিক প্রমাণ কি আর্য পরিযান তত্ত্ব নস্যাৎ করেছে?

অরুণাভ মিশ্র
এই গবেষণা থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে রাখিগড়ির প্রাপ্ত কঙ্কাল থেকে ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে এবং তা স্তেপভূমি (মুখ্যত রাশিয়া), বা আনাতোলিয় (অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়া বা এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগভূমি, বা এশিয়া মাইনর) অথবা ইরানি কৃষকদের ডিএনএ র সঙ্গে সাদৃশ্য হীন বা সম্পর্ক হীন। এই অংশটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফসল। তাই এ নিয়ে সন্দেহ অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এই তথ্যটুকুই কি পশ্চিমা পরিযান বা আর্যদের ভারতে আগমন ও অভিবাসন তত্ত্বকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট? এককথায় এর উত্তর হবে, না। কেন না তা বুঝতে হলে আরও তথ্য দেখতে হবে।
Have the genetic findings from Rakhigarhi disproved the Aryan Migration Theory

সম্প্রতি রাজ্যের ও রাষ্ট্রের কিছু নেতার বক্তব্যে রাখিগড়ির কথা আসছে। স্পষ্ট বলা হচ্ছে, ‘আমাদের শেখানো হয়েছে, আমরা সভ্য ছিলাম না। বাইরে থেকে আর্যরা এসে আমাদের শিক্ষিত করে গেছে। কিন্তু আজ রাখিগড়ি এক্সকাভেশনের পর প্রমাণিত হয়ে গেছে এরিয়ান ইনভেশন থিওরি ইজ এ মিথ!’

এখন যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করে দেখতে হবে, এই কথা কতটা সঠিক।

রাখিগড়ি ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের হিসার জেলায় অবস্থিত একটি গ্রাম। আজ অবশ্য এটি সিন্ধু সভ্যতার বা হরপ্পান সভ্যতার অন্যতম বড় এবং সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। সিন্ধু সভ্যতার অপর দুটি প্রত্নতাত্ত্বিক শহর হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো আজকের পাকিস্তানে অবস্থিত। কিন্তু রাখিগড়ির অবস্থিতি শুধু ভারতে যে তাই নয়, এটির বিস্তৃতি ৩০০ থেকে ৩৫০ হেক্টারেরও বেশি। তাই এটি হরপ্পা বা মহেঞ্জোদারো শহরের চেয়ে বড়। ১৯৬০ সালে সুরজ ভান প্রথম এই স্থানটিকে চিহ্নিত করেন, এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্বিক সর্বেক্ষণ তারপর এখানে খননকাজ শুরু করে পুরাতত্ত্ববিদ অমরেন্দ্র নাথের নেতৃত্বে। রাখিগড়ির গুরুত্ব এই জায়গায় যে এখানে প্রাক-হরপ্পান সভ্যতা এবং পরিণত হরপ্পান সভ্যতা উভয়েরই নিদর্শন পাওয়া যায়। স্থানটি দিল্লি থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে এবং ঘাগ্গর নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। নদী থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে এই  স্থানের বর্তমান স্থিতি।

ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ রাখিগড়ির বিভিন্ন সাইটের রেডিও কার্বন ডেটিং করে দেখেছেন এর এক অংশের সময় আজ থেকে ৫৬৪০-৫৪৪০ বছর আগের। এই সময়কালকে তাঁরা প্রাক হরপ্পান সভ্যতার সময় বলেছেন। আবার কিছু জায়গায় আজ থেকে ৫২০০-৪৫৭০ বছর আগে সময়কাল চিহ্নিত হয়েছে। একে তারা প্রাথমিক হরপ্পান সভ্যতার সময় বলছেন। তেমনি ৪০৪০-৩৯০০ বছর আগের পরিপক্ব হরপ্পান সভ্যতার সময়কালও দেখা গেছে এখানকার কয়েকটি জায়গায়। এইসব তথ্য বিবেচনা করে প্রাক হরপ্পান সভ্যতার সময় ৬৪২০(±)১১০ থেকে ৬২৩০(±)৩২০ বছর আগে বা প্রায় ৫৯০০-৬৫০০ বছর আগের অথবা ৪৪৭০(±)১১০ থেকে ৪২৮০(±)৩২০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দের বা প্রায় ৪৬০০-৪০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের পুরোনো বলা যায়।

২০১৯ সালে ডিএনএ টেস্টের ফলাফল সম্বলিত এক প্রতিবেদন বসন্ত শিল্ডের নেতৃত্বে ভি এম নরসিংহ, নীরজ রাই, ডেভিড রিখ ইত্যাদি একদল গবেষক বিখ্যাত cell জার্নালে প্রকাশ করেন। সেখানে তারা দেখান স্তেপভূমির মানুষদের প্রাপ্ত ডিএনএ র সঙ্গে রাখিগড়ির প্রাক হরপ্পান ডিএনএ র কোন মিল নেই। তখন থেকেই কেউ কেউ দাবী  করতে শুরু করেছেন এইতো, দেখো, আর্য পরিযান তত্ত্ব ভুল! ডিএনএ প্রমাণ তাই বলছে! ২০১৯ সালে বসন্ত শিন্ডে ও ভি এম নরসিংহ, নীরজ রাই ও ডেভিড রিখ দের বিখ্যাত পেপারটিতে (Cell 179,1-7, 2019) মূল বক্তব্যের সংক্ষিপ্তরূপ হিসেবে যা উপস্থাপিত হয়েছিল তা হল, 

“A genome from the Indus Valley Civilization is from a population that is the largest source for South Asians. The population has no detectable ancestry from Steppe pastoralists or from Anatolian and Iranian farmers, suggesting farming in South Asia arose from local foragers rather than from large-scale migration from the West.”

এর বাংলা হতে পারে, 

“সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতায় বসবাসকারীদের একটি জিনোম দেখায় এটি আদপে এমন একটি জনগোষ্ঠীর, যারা দক্ষিণ এশীয়দের বৃহত্তম উৎস। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্তেপ অঞ্চলের পশুপালক অথবা আনাতোলিয় ও ইরানি কৃষকদের কোনো শনাক্তযোগ্য পূর্বপুরুষের ধারা নেই, যা থেকে বোঝা যায় দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষিকাজের উদ্ভব হয়েছিল স্থানীয় সংগ্রহকারীদের মাধ্যমে, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বড় আকারের অভিবাসনের ফলে নয়।” (অনুবাদ লেখকের)

এই গবেষণা থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে রাখিগড়ির প্রাপ্ত কঙ্কাল থেকে ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে এবং তা স্তেপভূমি (মুখ্যত রাশিয়া), বা আনাতোলিয় (অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়া বা এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগভূমি, বা এশিয়া মাইনর) অথবা ইরানি কৃষকদের ডিএনএ র সঙ্গে সাদৃশ্য হীন বা সম্পর্ক হীন। এই অংশটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফসল। তাই এ নিয়ে সন্দেহ অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এই তথ্যটুকুই কি পশ্চিমা পরিযান বা আর্যদের ভারতে আগমন ও অভিবাসন তত্ত্বকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট? এককথায় এর উত্তর হবে, না। কেন না তা বুঝতে হলে আরও তথ্য দেখতে হবে।

প্রথম দেখতে হবে রাখিগড়ির এই যে কঙ্কাল, যার ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে, সেটি ঠিক কত বছরের পুরনো। এর উত্তরে বলি, রাখিগড়ির ৬১ টি কঙ্কাল থেকে অবশেষ সংগ্রহ করতে পারলেও, মাত্র একজনের ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে বলে উপরোক্ত পেপারে বলা হয়েছে (‘The individual we sequenced..’)। রাখিগড়িতে পরিপক্ব হরপ্পান সভ্যতার সময়কালে চিহ্নিতকরা কবরে ২৮০০-২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি কঙ্কাল থেকে পাওয়া ডিএনএ র সিকোয়েনসিং বা ডিএনএ ম্যাপিং সম্ভব হয়েছে (শিন্ডে ও অন্যান্য দের গবেষণাপত্র, PLOS,২০১৮)। তাতেই এই সময়কাল নির্দিষ্ট করা আছে। সুবিধার্থে আমরা এর সময়কাল ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলতে পারি। এই ডিএনএ দেখা গেছে একটি নারীর, যার মধ্যে U2b2 হ্যাপ্লোগ্রুপ রয়েছে। এটি সুনির্দিষ্ট ভাবে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের বসবাসকারীদের হ্যাপ্লোগ্রুপ। মধ্য এশীয়দের মধ্যে এই হ্যাপ্লোগ্রুপ দেখা যায় না।  

দু-দুবার হ্যাপ্লোগ্রুপ কথাটা ব্যবহার করলাম। হ্যাপ্লোগ্রুপ বলতে বোঝায়, একটি এমন জনগোষ্ঠী যারা বাবার দিক থেকে বা মায়ের দিক থেকে সম্পর্কিত। মায়ের দিক থেকে সম্পর্কিত হতে হলে তাদের মায়ের মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ-গত মিল পরবর্তী প্রজন্মের পুত্র বা কন্যায় থাকবে। বাবার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র পুত্রে ওয়াই ক্রোমোজোমের ডিএনএ-গত নির্দিষ্ট জীনগত মিল দেখা যাবে। এই জিনগুলিকে সাধারণত ইংরেজি অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এভাবেই জীনগত সম্পর্কের শাখা, বা হ্যাপ্লোগ্রুপ তৈরি হয়। প্রশাখা বোঝাতে মূল অক্ষরের সঙ্গে অন্য অক্ষরও যুক্ত করা হয়। আশাকরি হ্যাপ্লোগ্রুপ সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হয়েছে।

সিন্ধু সভ্যতার মধ্যেকার নয় কিন্তু তার সঙ্গে সংযোগযুক্ত মধ্য এশিয়ার দুটি জায়গা থেকে ১১ জন ব্যক্তির ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করা গেছে। এদের মধ্যে তিনজন ‘গণুর’ এর, যা বর্তমানে তুর্কমেনিস্থান এর অন্তর্গত এবং ৪৫০০-৩৭০০ বছর আগের। বাকি আট জন ‘শেহর-ই-শোখতা’র, যা ইরানের একেবারে পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এবং ৫২০০- ৪১০০ বছর আগের। এদের ডিএনএ বিশ্লেষণ দেখায় যে এদের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের জীনগত সম্পর্ক রয়েছে। এদের জিনোম প্রোফাইলে আদি ও প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বড়রকম মিল। সেই সঙ্গে আছে প্রাচীন ইরানি জনগোষ্ঠীর জীন । এই আদি ইরানি জনগোষ্ঠী কিন্তু অনেক পরে এদেশে এসেছে ধারণা করা হয়। আর সময়টা আদি সিন্ধু সভ্যতার যুগ বা পরিপক্ব সিন্ধু সভ্যতার যুগ।

কিন্তু রাখিগড়ির নারীর ডিএনএ অথবা তুর্কমেনিস্থান ও ‘শেহর ই শোখতা’ য় প্রাপ্ত দেহাবশেষ গুলির ডিএনএ র কোথাও স্তেপভূমির মানুষদের ডিএনএর যোগ নেই। বরং রাখিগড়ির নারীর ডিএনএ র সঙ্গে ১১ জন প্রাচীন ইরানি মানুষ ও আদি এবং প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মানুষদের, ডিএনএ মিশ্রণের সঙ্গে প্রভূত মিল পাওয়া গেছে। আবার কপার যুগের (৬৫০০-৫০০০ বছর আগের) তুর্কমেনিস্থান বা ‘শেহর ই শোখতা’য় প্রাপ্ত দেহাবশেষগুলোর ডিএনএ র মধ্যে কোথাও আদি এবং প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর জিন পাওয়া যায় নি। তেমনি নানা সময়ের ইরানীয় উপত্যকায় পাওয়া বহু দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত ডিএনএর সমন্বিত বিশ্লেষণ দেখায়, সিন্ধু সভ্যতার এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে প্রাচীন ইরানীয় অধিবাসীদের জীনের বিস্তর মিল রয়েছে, কিন্তু পশ্চিম এশীয়দের জীন নেই। পশ্চিম এশীয়দের যে জীন এখন দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে দেখা যায় তার মূল উৎস হল স্তেপভূমির পশুচারণকারীদের মাধ্যমে, যারা ভারতে এসেছে ২০০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে (ভি এম নরসিংহ, নিক প্যাটারসন,  ডেভিড রিখ ও অন্যান্যরা, Science, ২০১৯)। সুতরাং আর্যদের আগমন এখানে স্বীকৃত। সময়কাল ও আমাদের আগের সম্ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। তা হল, ২০০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

জেনেটিক বিশ্লেষণে এও দেখা যায়, রাখিগড়ির নারীর সময়কালের মাত্র ১০০০ বছর পরে পাকিস্তানের সোয়াট উপত্যকার প্রত্নস্থলগুলি থেকে পাওয়া দেহাবশেষের যে সমস্ত ডিএনএ সিকোয়েনসিং হয়েছে, তাতে পরিষ্কার ইন্দো-ইউরোপীয় জেনমিক প্রোফাইল দেখতে পাওয়া গেছে। তাছাড়া আজকের দক্ষিণ এশিয়ার অধিবাসীদের মধ্যেও ইন্দো- ইউরোপীয় জেনোমিক প্রোফাইল মেলে। তবে তা এলো কোথা থেকে? এই বৈজ্ঞানিক তথ্য সুনির্দিষ্ট ভাবে বলে, ইন্দো-ইউরোপীয়দের পরিযান বা অভিবাসন ভারতবর্ষে ঘটেছিল। আর্যরা এসেছিল এখানে। তবে তার সময়কালটা ঠিক কি, তা নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে। সুনিশ্চিত ভাবে তারা ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বব্দে আসেনি, আবার ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে নিশ্চিত ভাবেই এসেছে, ও এখানকার মানুষদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। সময়টা তবে নির্ঘাত ২৫০০-১৫০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের মধ্যে। তার কি নিশ্চিত কোনো নিদর্শন আছে? চলুন, তা খুঁজে দেখি।

এই খুঁজে দেখার পর্বে আমাদের জানা দরকার আধুনিক মানুষের পরিযানের বিষয়টি। আফ্রিকাতে হোমো সেপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষ হোমো-হেবিলিস থেকে হোমো-ইরেকটাসের পথ বেয়ে হোমো-হাইডেলবারগেনসিস হয়ে লক্ষ লক্ষ বছরের ক্রম বিবর্তনের ফল। এই আধুনিক মানুষ বা হোমো-সেপিয়েন্সের সঙ্গে নিয়ানডার্থাল আর ডেনিসোভানদেরও উদ্ভব ঘটেছিল। এদের বলা যায় হোমো-সেপিয়েনসের তুতো ভাই। হোমো-হাইডেলবারগেনসিস হয়ে যে শাখা আফ্রিকা থেকে উত্তর-পশ্চিমামুখী পথে ইউরোপে চলে আসে তারা বিবর্তিত হয়ে হয় নিয়ানডার্থাল। আর আফ্রিকা থেকে হোমো-হাইডেলবারগেনসিস এর পূর্ব এশিয়াতে আসা শাখা থেকে উদ্ভব হয় ডেনিসোভান দের। আফ্রিকাতে থাকা শাখাটি থেকে জন্ম নেয় আধুনিক মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্স। এই বক্তব্যের পক্ষে নানা প্রত্নতাত্ত্বিক ও জিনবিদ্যাগত প্রমাণ আছে (মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাগিতিহাস, ২০২৩)। এই আধুনিক মানুষ প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে পরিযান শুরু করে প্রতিকূল আবহাওয়া ও খাবারের সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে। এই পরিযানের পথে তারা তুতো ভাই বোনদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে নানা জায়গায়। তারও জীনগত প্রমাণ আছে। তবে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে শেষমেশ টিকে থেকেছে হোমো-সেপিয়েন্সরা। হারিয়ে গেছে নিয়ানডার্থাল আর ডেনিসোভানরা। এই হোমো-সেপিয়েন্সরা আফ্রিকা থেকে ইয়েমেন হয়ে চলে আসে আরব দেশে। সেখান থেকে ইরান হয়ে অবিভক্ত ভারতে পৌঁছে যায় তাদের একটা অংশ। এক অংশ থেকে যায় আরবভূমিতে, ছড়িয়ে পড়ে ইসরায়েলে, ইসরায়েল থেকে ইউরোপ। এগুলো কোনোটাই এক প্রজন্মে নয়। বহু প্রজন্ম ধরে ধীরে ধীরে পায়ে হেঁটে এগিয়েছে তারা। ভারতভূমিতে আসা আধুনিক মানুষের একটা অংশ স্থায়ীভাবে থেকে যায় ভারতে। একদল চলে যায় মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া। প্রমাণ পাওয়া গেছে, ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই অস্ট্রেলিয়া পৌঁছেছিল আধুনিক মানুষ। 

তবে আধুনিক মানুষ ভারতভূমিতে আসার আগে এদেশে প্রাচীন মানব ছিল। তা সম্ভবতঃ হোমো ইরেক্টাস। নর্মদা-ম্যান এর প্রাপ্ত খুলি থেকে এ ধারণা করা যায় (অরুণ সোনাকিয়া ও অন্যান্যরা, Current Science, ৭৫[৪], ১৯৯৮)। তবে তারা একসময় লুপ্ত হয়ে যায়। ফলে একচ্ছত্র হয় ভারত ভূমিতে ইরান হয়ে আসা আফ্রিকার আদি আধুনিক মানুষ। তাদেরকে আমরা বলছি আদি ও প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় জনগোষ্ঠী। আজও তারা আছে কিছুটা পরিব্যক্তি সহ আন্দামান ও নিকোবরে।

এরাই যে থেকে গেছে তার প্রমাণ কি? আফ্রিকা থেকে পরিযান করে আসা দলটির মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ হ্যাপ্লোগ্রুপ ছিল L3 । আদি L3 হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে M ও N হ্যাপ্লোগ্রুপের উদ্ভব আর বিকাশ হয়েছে পরিব্যক্তির ফলে। আবার N হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে সরাসরি এসেছে R হ্যাপ্লোগ্রুপ। আজ আফ্রিকার বাইরে থাকা সমস্ত মানুষের মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ M, N ও R হ্যাপ্লোগ্রুপের। তাই পৃথিবীর সমস্ত মানুষই আফ্রিকার ওই পরিযানের ফসল। আমাদের ভারতে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপের অধিবাসীদের মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ দেখা গেছে এক বিশেষ ধরনের M হ্যাপ্লোগ্রুপ। সেগুলি M31 এবং M32। এই হ্যাপ্লোগ্রুপ গুলির উদ্ভবকাল ৬৫০০০ বছর আগে। এই হ্যাপ্লোগ্রুপ কেবল ওই দুটি দ্বীপে সীমাবদ্ধ। কারণ দ্বীপের বাইরে আর কোন মানুষের সঙ্গে তাদের মিলন হয়নি। এ থেকে আরও বোঝা যায় ৬৫০০০ বছর আগেই আফ্রিকা থেকে ভারতে পরিযান হয়েছিল (কুমারস্বামী থঙ্গরাজ ও অন্যান্যরা, BMC Genetics, ৫[২৬], ২০০৪)।

তবে এটাই ভারতে একমাত্র পরিযান নয়। প্রাচীন ইরান থেকেও ভারতে তুষার যুগের পরে পরিযান হয়েছে। তাই সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত এলাকায় এবং সিন্ধু সভ্যতার ক্ষয়ের পর হরপ্পা সংলগ্ন অঞ্চল থেকে পাওয়া প্রত্নস্থলসমূহে এই আদি ইরানি জনগোষ্ঠীর জীন পাওয়া গেছে বেশী মাত্রায়। এ থেকে ধারণা হয়, মুখ্যত ওই জনগোষ্ঠীই এই সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। তারা এসে মিলেছিল আদি ও প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। উভয়ের জীন শতাংশ ৪৫ থেকে ৮২ আর ১১ থেকে ৫০। 

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন রাখিগড়িকে ঘিরে। রাখিগড়ির নারীর শরীরে ইন্দো ইউরোপীয় জীন পাওয়া যায়নি। তা পাওয়ার কথাও নয়। কারণ রাশিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে পশ্চিম এশীয় পশুপালকদের পরিযান হয়েছে আরও পরে, ২০০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্ট পূর্বব্দে। মাতৃধারার মতো আমাদের পিতৃধারায় ওয়াই ক্রোমোজোমের ডিএনএ থেকে R, H, L ও J চারটি হ্যাপ্লোগ্রুপ দেখা যায়। R স্তেপভূমির পিতার, H ও L মধ্য এশিয়ার বা ইরাণীয় পিতার আর J হল মধ্য প্রাচ্যের উর্বর অর্ধ চন্দ্রাকৃতি অঞ্চল যা আদপে আধুনিক ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল, প্যালেস্তাইন, জর্ডান, পূর্ব তুরস্ক ও পশ্চিম ইরান (ডেভিড জি মহাল ও অন্যান্যরা Front Genet, ৯[৪], ২০১৮)।

ইন্দো ইউরোপীয়রা এদেশে এসেছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে। তারপর তারা মিলিত হয়েছিল এদেশীয় নারীদের সঙ্গে। তখন সিন্ধু সভ্যতার শেষ লগ্ন। তাই রাখিগড়ি, যা সিন্ধু সভ্যতার আদি বা পরিপক্বলগ্নের নিদর্শন, তখন ইন্দো ইউরোপীয় জীন না পাওয়া আর্য পরিযান তত্ত্বকে নস্যাৎ করে না। বরং তার ঠিক পরবর্তী সময় থেকে ভারত ভূমিতে R হ্যাপ্লোগ্রুপের অস্তিত্ব স্তেপভূমির পশুপালক বা ইউরেশিয়দের পরিয়ানকে বাস্তব বলে স্বীকৃতি দেয়।

তাই রাখিগড়ি সভ্যতার আবিষ্কার, যা আদপে আদি বা পরিপক্ব সিন্ধু সভ্যতার অঙ্গ, তা কোনমতেই আর্য পরিযান তত্ত্বকে নস্যাৎ করে না। বরং তার সময়কালকে সুনিশ্চিত ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।


প্রকাশের তারিখ: ০৭-সেপ্টেম্বর-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস ও দর্শন বিভাগে প্রকাশিত ১৬৯ টি নিবন্ধ
০৭-সেপ্টেম্বর-২০২৬

০৩-সেপ্টেম্বর-২০২৬

০২-সেপ্টেম্বর-২০২৬

২৭-আগস্ট-২০২৬

১৫-আগস্ট-২০২৬

০৭-আগস্ট-২০২৬

০৬-আগস্ট-২০২৬

০৫-আগস্ট-২০২৬

০৪-আগস্ট-২০২৬

০৩-আগস্ট-২০২৬