সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীন
অজয় দাশগুপ্ত
শুধু বক্তৃতা-ই নয়, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ভয়ঙ্কর দাঙ্গা পরিস্থিতিতে নারকেলডাঙ্গার শ্রমিক লাইনে নিজে রাতপাহারা দিয়ে বুক আগলে রক্ষা করেছিলেন শ্রমজীবী মানুষকে। পরদিন দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় আটকে পড়া পার্টিনেতা, কর্মীদের উদ্ধার করতে পৌঁছে গিয়েছিলেন সেখানে।

প্রাক-স্বাধীন ভারতের আইনসভায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে ভূমিকা গ্রহণ করার প্রথম লগ্নেই তিনি তাঁর অবস্থান বলিষ্ঠতার সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণায় আমরা দায়বদ্ধ’।
আবার একজন প্রধানমন্ত্রীর মুখের ওপর তাঁর দল যে ‘অসভ্য, বর্বর’, তা বলতেও তিনি দ্বিধা করেননি।
জনপ্রতিনিধিত্ব ও সরকার পরিচালনার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নিরিখেই ‘আপনার রাজ্যে দাঙ্গা কেন হয় না’, সাংবাদিকের এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু নির্ণায়ক উত্তর দিয়েছিলেন: ‘সরকার না চাইলে দাঙ্গা হয় না।’
শুধু বক্তৃতা-ই নয়, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ভয়ঙ্কর দাঙ্গা পরিস্থিতিতে নারকেলডাঙ্গার শ্রমিক লাইনে নিজে রাতপাহারা দিয়ে বুক আগলে রক্ষা করেছিলেন শ্রমজীবী মানুষকে। পরদিন দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় আটকে পড়া পার্টিনেতা, কর্মীদের উদ্ধার করতে পৌঁছে গিয়েছিলেন সেখানে।
আবার ১৯৬৮ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় দাঙ্গা বাঁধলে রাতেই তিনি সোজা হাজির হয়েছিলেন হুগলীর জেলার ভদ্রেশ্বরের তেলেনিপাড়ায়। তেলেনিপাড়াতেই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। তখন রাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার, পুলিশমন্ত্রী জ্যোতি বসু। খবর পেয়ে সেই রাতেই চলে আসেন ঘটনাস্থলে। পুলিশের জিপে চেপে, পুলিশের মাইক হাতে নিয়ে বলতে থাকেন, ‘আমি পুলিশকে অর্ডার দিয়েছি, কাউকে ধর্মস্থানে হামলা করতে দেখলেই কোনও রং না দেখে সোজা মাথায় গুলি করতে’। সেই রাতেই দাঙ্গা থেমে গিয়েছিল।
১৯৭৭ সালে গঠিত হলো বামফ্রন্ট সরকার, মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ৷ তাঁর সময়কালে এই রাজ্য কখনও দাঙ্গা দেখেনি। ১৯৮৪ সালে সারা দেশে শিখ দাঙ্গা, পরবর্তীতে ১৯৯২-তে বাবরি মসজিদ ভাঙার সময়েও সারা দেশে যখন আগুন জ্বলছে, তখনও বাংলার বুকে কোনও আঁচ পড়েনি।
পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মাথা তুলতে দেওয়ার তিনি চরম বিরোধী ছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জির ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর তীক্ষ্ণ সমালোচনা ছিল, ‘তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অপরাধ, ওরা এরাজ্যে বিজেপি’র মতো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ডেকে নিয়ে এসেছে।’
পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অমোঘ উক্তি, ‘এই রাজ্যে দাঙ্গা করতে এলে মাথা ভেঙে দেবো’।
৩৪-বছরের বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রীতির দূর্গ তৈরি করেছিল, যা জ্যোতি বসু বারবার বলতেন। নিজের সারা জীবন দিয়ে জ্যোতি বসু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর কঠিন অবস্থান, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাঁর আপসহীন ভূমিকা প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রমাণ করেছেন।
***
জ্যোতি বসু এমন একটা ক্রান্তিলগ্নে দেশের আইনসভায় পা রেখেছিলেন, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের শাসনব্যবস্থা প্রত্যাহার করার আগে ‘বিভাজন ও শাসন’ করার নীতিকে নির্মমভাবে প্রয়োগ করছে। দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিবেশ। জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মতো প্রধান দলগুলি ক্ষমতার আস্বাদন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ১৯৪৬ সালে ১৬ আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ দিবস’ পালনের ডাক দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ, দাবি ছিল পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন। সেদিন থেকে পরপর অন্তত তিনদিন কলকাতা প্রত্যক্ষ করেছিল জঘন্যতম ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা। ১৯৪৫ সালের নভেম্বরে আইএনএ বন্দিদের মুক্তির দাবিতে উত্তাল কলকাতা, ১৯৪৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আইএনএ দিবস পালন উপলক্ষে সোচ্চার মহানগরী, নৌবিদ্রোহের সেনানীদের প্রতি হিন্দু-মুসলিম মিলিত সংহতির সাক্ষী এই শহর, ১৯৪৬ সালের ২৯ জুলাই অবিস্মরণীয় হরতালের সহমর্মী কলকাতা— শিউরে উঠেছিল ৪৬-এর মধ্য আগস্টের এই রক্তস্নানে। অবিভক্ত বাংলায় তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার। বাংলা প্রদেশের আইনসভায় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। ১২ সেপ্টেম্বর বাংলা বিধানসভায় অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিল কংগ্রেস। বিতর্ক চলেছিল বেশ কয়দিন। ১৯ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার জ্যোতি বসু বক্তব্য রেখেছিলেন।
১৯৪৬ সালের সেই ভয়ঙ্কর দাঙ্গার মূহুর্তে সীমিত শক্তি সত্ত্বেও একজন কমিউনিস্ট বিধায়ক তাঁর বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে সঠিক শত্রুকে চিহ্নিত করে বলেছিলেন: ‘... আমাদের বিরুদ্ধে কাপুরুষোচিত ছলের মূল পাণ্ডা কারা; যাবতীয় ঘৃণার সঙ্গেই আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদই আমাদের পয়লা নম্বর শত্রু। তারা আমাদের অবদমিত করেছে, পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, জনগণকে ভুল পথে চালিত করেছে এবং এখন সগর্বে কলকাতায় নিদারুণ শ্মশানের শান্তি বজায় রাখলেও, যে কোনও সময় তা ভেঙে যেতে পারে।’
‘ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা বন্ধ হোক’— এই আহ্বান জানিয়ে জ্যোতি বসু সেদিন বলেছিলেন, ‘অতীতে যখনই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে তখনই আমরা, সঠিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদকে তার প্রধান উস্কানিদাতা হিসেবে ভৎর্সনা করেছি এবং আমরা দেখেছি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে দেশবাসী কিরকম অসহায় দুর্বল দাবার বোড়েতে পরিণত হয়। এবারেও দাঙ্গা সম্পর্কে আলাদা করে কিছু ভাবনার কোনও কারণ নেই। আমি প্রভাবিত করতে পারি এমন সমস্ত দেশপ্রেমিক শক্তির সঙ্গে আমিও এই দাঙ্গার প্রধান অপরাধীদের অভিযুক্ত করছি। ... সুতোর টানে আমাদের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিকে তাদের পাতা ফাঁদে পা দিতে বাধ্য করছে। গত ছ’মাসে ক্যাবিনেট মন্ত্রী কী নিখুঁত খেলাই না খেললেন। কখনও কংগ্রেস এবং কখনও লীগের কানে অমৃতবাণী বর্ষণ করেছেন। এমন সব প্রস্তাব তারা পেশ করলেন যেগুলিকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। সবশেষে স্বাধীনতাও নয় এমনকি গণতান্ত্রিক অধিকার বা স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেবার পরিবর্তে তারা যা করল, আমাদের দেশবাসীর এক সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্য সম্প্রদায়ের বিরোধকে পরিকল্পিত ভাবে জিইয়ে রাখা ও জনমানসকে বিষিয়ে তোলা এসবের চূড়ান্ত পরিণতি হলো কলকাতার মারাত্মক দাঙ্গা।’
পরে বঙ্গীয় আইনসভার তৎকালীন তিন কমিউনিস্ট বিধায়ক জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মণ ও রূপনারায়ণ রায় এক যৌথ বিবৃতিতে এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন: ‘... আমরা সেই কারণে অনাস্থা প্রস্তাবের এই বিতর্কে কোনও পক্ষেই ভোট দেবে না, কারণ এটা কেবলমাত্র ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে ঘৃতাহুতি দেবে। আমরা হিন্দু, মুসলমান সকল সাধারণ মানুষের কাছে তাদের সকল শক্তি সংগঠিত করতে আবেদন করছি। যাতে তারা বারম্বার না পারস্পরিক খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েন। এতে আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলি ভেঙে যায়, মজুরি বৃদ্ধির এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতির লড়াই ভেঙে পড়ে, আর ইউরোপীয় অশুভ শাসন শক্তিশালী হয়। রশিদ আলি দিবস, নৌবিদ্রোহ, আইএনএ বন্দিদের বিচার বিরোধী আন্দোলন এবং ২৯ জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘটের উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত মানুষ, সংঘবদ্ধ মানুষই নেতাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে বাধ্য করবেন। মানবতার বিভিন্ন আদর্শ অগ্রসর হবে শান্তি এবং স্বাধীনতার পথে। এই মুহূর্ত, তারা বলুন: কখনওই আমরা আর ভাইয়ের বিরুদ্ধে উদ্যত হব না; কখনওই আমরা আর তাদের বরদাস্ত করব না, যারা হিন্দু ও মুসলিম পার্থক্যের ভিত্তিতে কথা বলে এবং আমাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেয়।’
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী হিন্দুত্ববাদীদের হাতে নিহত হওয়ার পর সারা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতেও শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিধানসভায় এবিষয়ে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হলে তরুণ কমিউনিস্ট সদস্য জ্যোতি বসু আলোচনা করতে গিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন: ‘সাম্প্রদায়িকতার অসূয়াপরায়ণ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণায় আমরা দায়বদ্ধ। আমাদের মধ্যে তিক্ততার বীজ বপন করেছে জঘন্য যে শক্তি, তার প্রতি ঘৃণায় আমরা দায়বদ্ধ; সাধারণ মানুষকে নিষ্পেষণের চেষ্টা করছে যারা তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ভেতরে কিংবা বাইরে মানুষের পবিত্র ক্রোধ জাগিয়ে তুলতে আমরা দায়বদ্ধ। তাদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করবো।’
***
পরবর্তী সময়েও তিনি বারবার তাঁর এই অবস্থান দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ‘মার্কসবাদী পথ’ পত্রিকার নভেম্বর, ১৯৮৪ সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্টি সম্পর্কে বলতে পারি, বিরোধী দলগুলির মধ্যে মৈত্রীর প্রশ্নে আমরা এক নীতিসম্মত অবস্থান গ্রহণ করেছি। আমরা কোনও আঞ্চলিকতাবাদী, বিভেদকামী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির সাথে আঁতাত করিনি। এইসব প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রথম সারিতে আমাদের পার্টি স্থান গ্রহণ করেছে। পাঞ্জাব, আসাম ও ত্রিপুরায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে আমাদের অনেক পার্টিকর্মী নির্যাতন ভোগ করেছেন এবং অনেকে শহীদ হয়েছেন।’
কংগ্রেস সরকারের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে শিথিলতা এবং সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে আপসকামী মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন বারেবারে। সাম্প্রদায়িক আরএসএস-বিজেপি’র উত্থানকে তিনিই সবচেয়ে কঠোরভাবে আক্রমণ করেছেন। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ‘বিজেপি একটি অসভ্য, বর্বর দল’, তাঁর এই উক্তি ঐতিহাসিক হয়ে আছে।
১৯৯৯ সালে প্রধনামন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে জ্যোতি বসুকে এবিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। জ্যোতি বসু নিজেই সেকথা তাঁর আত্মজীবনীতে বিশদভাবে লিখেছেন। ‘‘অটলবিহারী বাজপেয়ী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন উনি একবার কলকাতায় এসে আমাকে রাজভবনে ডাকলেন। আমি যেতে অন্যান্য কথার পর উনি আমাকে বললেন, আমার দলের কর্মীরা বলছে, আপনি নাকি জনসভায় আমাদের ‘অসভ্য, বর্বর’ বলছেন। আমি ওঁকে বললাম, আমি তো কাউকে ব্যক্তিগতভাবে বলছি না, কিন্তু আপনার দল যা করছে, দাঙ্গা করছে, গুজরাটে যা হলো, মুসলিমদের খুন করছে, এখন তো খ্রীশ্চানদেরও মারছে, এসব অসভ্যতা, বর্বরতা ছাড়া আর কি? বাজপেয়ীকে আমি বললাম, দিল্লিতে ফিরে আপনি আমাকে এর উত্তর পাঠাবেন। কিন্তু সেই উত্তর আমি আজো পাইনি।’’ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জনসভাতেও তিনি এই ঘটনার কথা বলেছেন।
দেশের প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী, বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি তাঁর লেখা ‘মাই লাইফ, মাই কান্ট্রি’ বইটি সম্পর্কে সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জ্যোতি বসুর সঙ্গে তাঁর এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর ‘গোপন’ বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন। ২০০৯ সালের ২৫ মার্চ আদবানির এই সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করা হয়। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হওয়ার পর এনিয়ে নানারকম বিশ্লেষণ প্রকাশিত হতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই জ্যোতি বসুর কাছে এবিষয়ে ‘গণশক্তি’র পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল। জ্যোতি বসুর সেই একান্ত সাক্ষাৎকার ২০০৯ সালের ৩১ মার্চ ‘গণশক্তি’-তে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এই সাক্ষাৎকারকে উল্লেখ করে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
কী বলেছিলেন জ্যোতি বসু এই সাক্ষাৎকারে, তাঁর বয়ানেই পড়ুন: ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতেই লালকৃষ্ণ আদবানির সঙ্গে বৈঠক করেছিলাম। কিন্তু উনি আমার কথা শোনেননি। আমি ওঁর সঙ্গে একবার বৈঠক করেছিলাম এবং এর মধ্যে কোনও গোপন বিষয় ছিল না। আদবানির বাড়িতেই এই বৈঠক হয়েছিল। ভিপি সিং তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
অয্যোধায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির গড়ার জন্য আদবানি তখন রথযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় ভিপি সিং একদিন আমাকে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা বলে এই রথযাত্রা বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ নিতে বলেন। আমি পার্টির সঙ্গে কথা বলেই লালকৃষ্ণ আদবানির সঙ্গে দেখা করতে যাই। আদবানির বাড়িতেই এই বৈঠক হয়েছিল।
বৈঠকে আমি আদবানিকে বললাম, আপনার রথে তো রামচন্দ্রের ছবি যেমন থাকছে, তেমনি দলের পতাকাও থাকছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা দিয়ে এই রথ যাওয়ার কথা। এর ফলে সেসব জায়গায় একটা অশান্তির পরিবেশ তৈরি হতে পারে, সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে, দাঙ্গা বাঁধতে পারে। এসব করবেন না, বরং আলাপ-আলোচনা করুন। কিন্তু আদবানি আমার কথা শোনেননি। উনি রথযাত্রার তোড়জোড় চালিয়ে যেতে লাগলেন।’
‘‘তখন ভিপি সিং-এর কথা বলে ঠিক হলো কিভাবে ওদের নিরস্ত করা যায়, তার জন্য আবার আলোচনা হবে। আবার বৈঠক হলো, তবে এবার অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে। আদবানি পরের বৈঠকে ছিলেন না। বিজেপি-র সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ছিলেন বীরেন জে শা, পরে উনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালও হয়েছিলেন, ওঁর বাড়িতে এই বৈঠক হয়। ভিপি সিং, বাজপেয়ী এবং আমি এই বৈঠক করি। কিন্তু তাতেও রথযাত্রা থামানো যায়নি। আদবানির ‘রামরথ’ যেখান দিয়ে গেছে, সেখানেই দাঙ্গা হয়েছে, কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আমরা সেটাই ঠেকাতে চেয়েছিলাম।”
‘১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এলকে আদবানি। ওঁর উপস্থিতিতেই বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা ঘটে। আদবানিসহ এনডিএ সরকারের তিনজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে এই মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। আমি এজন্যই বিজেপি-কে অসভ্য, বর্বর বলি।’
‘বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রীদের সভায় আমরাই বলেছিলাম যে প্রয়োজনে সংবিধানের ৩৫৬-ধারাও প্রয়োগ করতে, যদিও আমরা এই ধারা প্রয়োগ পছন্দ করি না। তখন নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরে আমি এবং কমরেড সুরজিৎ, উনি তখন পার্টির সাধারণ সম্পাদক, দুজনেই প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করেও বলি যে খুবই খারাপ খবর আসছে, আপনি দ্রুত ব্যবস্থা নিন। উনি আমাদের বললেন, আমার পার্টির মিটিং আছে, সেখানে আলোচনা করবো। কিন্তু কিছুই করলেন না। বাবরি মসজিদ ভাঙা পড়লো।’
‘পরে এজন্য একটা কমিশন হয়েছিল, লিবেরহান কমিশন, সেখানে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আমাকেও ডেকেছিল। আমি বিচারপতিকে যা বলার বললাম, আর আমি সঙ্গে কিছু ক্যাসেট নিয়ে গিয়েছিলাম। ভাঙার পর কলকাতায় এসে উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং একটা মিটিং করেছিল। সেখানকার বক্তৃতা পুলিশকে রেকর্ড করে রাখতে বলেছিলাম। আমি বিচারপতিকে বললাম, ওরা ভাঙার কথা কিরকম গর্বের সঙ্গে বলছে, আমার কাছে তার ক্যাসেট আছে, সেটা আপনি শুনুন।’
***
লিবেরহান কমিশনে জ্যোতি বসুর সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার খবরটি এক্সক্লুসিভ স্টোরি হয়েছিল গণশক্তিতে। ঘটনাচক্রে সাংবাদিক হিসেবে সেই দায়িত্ব আমার ওপরেই পড়েছিল।
২০০০ সালের ৬ নভেম্বর জ্যোতিবাবু মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর নেওয়ার প্রথমবার উত্তরবঙ্গ সফর করেন ডিসেম্বর মাসে। শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার, তিন জেলার সমাবেশেই উপচে পড়া ভিড়। ১২ ডিসেম্বর কনকনে শীতের রাতে কোচবিহার এয়ারপোর্ট ময়দানে বিশাল জনসমাবেশের কপি পাঠিয়ে অফিসে ফোন করতেই অভীকদা (দত্ত) বললেন, ‘তোমাকে তো কখন থেকে খুঁজছি, তুমি এখনই জ্যোতি বসুর কাছে যাও। উনি একটা বিবৃতি দেবেন।’ কোচবিহার এয়ারপোর্ট ময়দানে সেদিন প্রায় তিন লক্ষ মানুষ এসেছিলেন। কপি লিখতে প্রায় রাত দশটা। তারপর ঠাণ্ডার মধ্যে ফ্যাক্সের জন্য দৌড়ানো। ফ্যাক্স পাঠিয়ে কনফার্ম করার জন্য ফোন করতেই এই বার্তা পেলাম।
জ্যোতিবাবু ছিলেন কোচবিহার সার্কিট হাউসে। দীপকদা (হোড়রায়)’কে নিয়ে দৌড়োলাম সেখানে। পুলিশের বাধা পেরিয়ে জয়কৃষ্ণ ঘোষের কাছে যেতেই বললেন, ‘তোমাকে তো অনেকক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজি হচ্ছে। উনি তো এইমাত্র শুয়ে পড়লেন।’ তারপর কী ভেবে বললেন, ‘দাঁড়াও, এখনও হয়তো শুয়ে পড়েননি।’ তারপর জ্যোতিবাবুর ঘরে গিয়ে ডাকলেন। এক মিনিটের মধ্যেই দরজা খুললেন তিনি। জয়দা বললেন, ‘এই যে গণশক্তি থেকে এসেছে, আপনি খুঁজছিলেন বলে।’ জ্যোতিবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি দিল্লিকে জানিয়ে দিয়েছি। লিবেরহান কমিশনে আমি সাক্ষ্য দিতে যাবো।’ সংবাদসংস্থা মারফত সে খবর পরদিন দেশের সমস্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
***
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনার পরেই তা তদন্তের জন্য গঠিত হয়েছিল বিচারপতি লিবেরহানের নেতৃত্বে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন। কিন্তু তদন্তে অযথা কালক্ষেপ হচ্ছিল। পরে বাজপেয়ী সরকারের আমলে তা আরও বিলম্বিত হয়। ২০০০ সালের ৬ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে এজি নুরানির লেখা একটি বইয়ের উদ্বোধন করতে গিয়ে বসু তাঁর ভাষণে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বলেছিলেন। সেই ভাষণেই তিনি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রসঙ্গ টেনে জানান, তার ঠিক পরে কলকাতায় উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, তখন বিজেপি নেতা কল্যাণ সিংয়ের বক্তৃতার ক্যাসেট তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই লিবেরহান কমিশন ডেকে পাঠায় বসুকে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মাসদুয়েক বাদে ১৯৯৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় একটি সভায় যে ভাষণ দিয়েছিলেন কল্যাণ সিং, ক্যাসেটটিতে তা রেকর্ড করা হয়েছিল। ঐ ভাষণে বাবরি মসজিদ ধ্বংস সম্পর্কে কল্যাণ সিং বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া বিস্ফোরক ব্যবহার না করে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে এতবড় ধ্বংস কাণ্ড সম্পন্ন করা যেত না। ঠিকাদারকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হলে তাঁর অন্তত দেড় মাস সময় লাগতো।’
১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার সময় দিল্লিতে ছিল কংগ্রেসের নরসিমা রাও-র সরকার। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তখন ছিলেন কংগ্রেসের সাংসদ ও দিল্লির মন্ত্রী। যখন বাবরি মসজিদ ভাঙার উন্মত্ত তাণ্ডব টেলিভিশনে সম্প্রচার হচ্ছে, তখন গোটা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা নীরব ও স্থবির হয়ে বসেছিল। পরে অনেক বুলি দিলেও মমতা ব্যানার্জিও টুঁ শব্দটি করেননি। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বারবার নরসিমা রাওকে অনুরোধ করেছিলেন ব্যবস্থা নেবার জন্য। ঘটনার দু’দিন আগেও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন জ্যোতি বসু। সিপিআই(এম) ৩৫৬ ধারা প্রয়োগের বিরোধী হলেও জাতীয় সংহতির স্বার্থে ব্যতিক্রমী হিসেবে তিনি সেদিন ওখানে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করতে বলেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রিসভা ব্যবস্থা নেয়নি। দেশের মানুষ জানতেন মসজিদ ভাঙা হবে, অথচ মন্ত্রিসভা জানতো না!
বাবরি মসজিদ ভাঙার তদন্তে গঠিত লিবেরহান কমিশনে দুদিন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। ২০০১ সালের ২৯ জানুয়ারি এবং ১৫ মার্চ। সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘... বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দু’দিন আগে আমি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেছিলাম, চারদিক দিয়ে উদ্বেগজনক সব খবর আসছে। করসেবকরা প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। তবে উনি আমায় বলেন, কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক আছে, সেখানে পরিস্থিতি আলোচনা করে তবে কেন্দ্রের তরফে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মসজিদের কাঠামো মাটিতে মিশে গেল, মানুষ দেখল তা। জানা গেছে বেশ কয়েকজন বিজেপি শীর্ষনেতা ঘটনাস্থলে ছিলেন। এখন তাঁদের কয়েকজন বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভাতেও রয়েছেন। এরপরে যখন হরকিষেণ সিং সুরজিৎ, তখন সিপিআই(এম)-র সাধারণ সম্পাদক, আর আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম তখন জিজ্ঞাসা করি, কেন মসজিদ রক্ষায় ব্যবস্থা নিলেন না। উনি শুধু বললেন, আমি কী করে একজন মুখ্যমন্ত্রীকে (উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং) অবিশ্বাস করবো। উনি আমায় কথা দিয়েছিলেন সেরকম কিছু হবে না।’’
হয়েছিল ঠিক উলটো।
লিবেরহান কমিশন ৬৮ জন বিজেপি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কর্মকর্তাকে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পিছনে মূল মদতদাতা বলে চিহ্নিত করেছিল। এর মধ্যে ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলীমনোহর যোশী, উমা ভারতী, সাধ্বী ঋতম্ভরা, অশোক সিংঘল, গিরিরাজ কিশোর প্রমুখ। বাজপেয়ী ছাড়া আর সবারই বিরুদ্ধে সিবিআই চার্জশিটও দিয়েছিল।
***
বাবরি মসজিদ-রামমন্দির বিতর্ক নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১৯৯০ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি বলেছিলেন, ‘... ধর্ম ও রাজনীতিকে কখনও মেশাবেন না। এটা মেশালে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমাদের যে সংবিধান আছে তা হলো ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তার জন্য আমরা গর্বিত। এটাই হওয়া উচিত। আমাদের পাশে অনেক প্রতিবেশী রাষ্ট্র আছে এখানটা সেরকম নয়। সেখানে কোনও একটা ধর্ম আছে, সেটা কোনও একটা ধর্মের রাষ্ট্র। এটা আমরা চাই না। ... নানা সংস্থা আছে যারা ধর্ম এবং রাজনীতিকে মিলিয়েছে এবং বিশেষ করে রাম জন্মভূমি এবং বাবরি মসজিদ নিয়ে। আমি অনেক খোলা মিটিং-এ বলেছি যে ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ হতে পারে না, এটা সংরক্ষিত আছে, এই অধিকার সংবিধানে আছে যে, যে যার ধর্ম পালন করবেন। কিন্তু এটা মেশালে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
জ্যোতি বসু আরও বলেছিলেন, ‘রাম জন্মভূমিতে একটা মন্দির হতে পারে, রাম জন্মভূমিতে অনেক রামের মন্দির আছে, আরও একটা মন্দির হলে ক্ষতি কী আছে! আরও একটা মসজিদ হলে ক্ষতি কী আছে! আরও একটা মন্দির বা মসজিদ হলে কেউ কিছু বলতো না। কিন্তু একটা মসজিদ ধ্বংস করে আরও একটা রামমন্দির করা, এটা এখন কী করে হয়!’
***
জাতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতা থেকে দুরে রাখতে তিনি সর্বতোভাবে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং’এর নেতৃত্বে ন্যাশনাল ফ্রন্ট সরকার, ১৯৯৬ সালে এইচডি দেবেগৌড়ার নেতৃত্বে সংযুক্ত মোর্চার সরকার এবং ২০০৪ সালে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার গড়ার পিছনে তাঁর এবং হরকিষেণ সিং সুরজিতের ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য ছিল বিজেপি’কে ক্ষমতা থেকে দুরে রাখা।
২০০২ সালের ১৮ মে নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে দ্য ইনস্টিটিউট অব কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ আয়োজিত সপ্তম জিভি মবলঙ্কর স্মারক বক্তৃতা দিতে গিয়ে জ্যোতি বসু এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন: ‘... ১৯৫৭সালে কেরালায় প্রথম কমিউনিস্ট পরিচালিত সরকার গঠনের পর, গণতান্ত্রিক পার্টিগুলির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে বামপন্থী পার্টিগুলির দ্বারা রাজ্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা আমাদের পার্টি-কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। তবে সেসময় কেন্দ্রে প্রথম সরকার গঠন ছিলো আমাদের চিন্তাভাবনার বাইরে। পরবর্তীতে এমন সব পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো যখন আমরা বাইরে থেকে তিনবার কেন্দ্রে অ-কংগ্রেস সরকারগুলিকে সমর্থন জানিয়েছিলাম। আর একবার যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে, যখন বিজেপি-র বিপদ মূর্ত হয়ে উঠলো, যে সরকার কিছু সময়ের জন্য, এমনকি, কংগ্রেসের সমর্থন লাভ করেছিল। পরবর্তীকালে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে কংগ্রেস সেই সমর্থন তুলে নেয় এবং সুবিধা করে দেয় বিজেপি-কে।’
***
তাঁর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার শুধু জনমুখী উন্নয়নের বিকল্প মডেলই তৈরি করেনি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় ক্ষেত্রেও দেশের সামনে জ্যোতি বসুর পশ্চিমবাংলা উদাহরণ তৈরি করেছিল। একটি রাজ্যের সফল ও জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কখনও প্রাদেশিকতার গন্ডির মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ না থাকায় জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর সর্বজনগ্রাহ্যতা ও নেতৃত্বের আসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশের অখণ্ডতা, সংসদীয় গণতন্ত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাঁর ঋজু ও দৃঢ় অবস্থান সমগ্র ভারতেই দল-মত-নির্বিশেষে উচ্চপ্রশংসিত হতো। শ্রীনগর, কলকাতা ও বিজয়ওয়াড়ায় বিরোধী দলগুলির কনক্লেভের নেতৃত্ব দেন তিনিই। কংগ্রেসের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার লক্ষ্যে কোয়ালিশন রাজনীতির সূচনা এভাবেই তাঁর নেতৃত্বে ভারতে শুরু হয়েছিল। ১৯৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল দিল্লির অন্ধ্র হলে বিরোধী দলগুলির মুখ্যমন্ত্রীদের সম্মেলনে জ্যোতি বসু যে অসাধারণ বক্তব্য রেখেছিলেন, তার পরদিন সেই সময় তাঁর কট্টর সমালোচক আনন্দবাজার পত্রিকাও লিখতে বাধ্য হয়েছিল, ‘রাষ্ট্রনায়কের মতো বক্তব্য করেছেন জ্যোতি বসু।’
জ্যোতি বসু ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র রক্ষার যে আদর্শের জন্য সারা জীবন লড়াই করে গেছেন, বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলে তা আক্রমণের মুখে। ফ্যাসিবাদী সংগঠন আরএসএস’র মতাদর্শে চালিত বিজেপি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে ভেঙে ফেলতে চাইছে। অসামান্য দূরদর্শিতায় এই বিপদকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন বলেই তিনি এবং হরকিষেণ সিং সুরজিৎ ২০০৪ সালে বিজেপি’কে ক্ষমতা থেকে দুরে রাখতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং সফল হয়েছিলেন। এরাজ্যেও তৃণমূল সরকারের অপদার্থতা এবং আরএসএস’কে অবাধে ডালপালা বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়ার ফলশ্রুতিতে বিজেপি ক্ষমতাসীন হতে পেরেছে।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর নির্মম অবস্থান এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীন ভূমিকার কথা মনে রেখেই আমাদের আগামীদিনে দেশের সংবিধান, সংসদীয় গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার শপথ গ্রহণ করতে হবে।
প্রকাশের তারিখ: ০৮-জুলাই-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
