Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মানুষের মার্কস (পর্ব ৪)

জুলিয়ান বোরচার্ডট
শ্রমশক্তির মালিক নশ্বর। শ্রমের বাজারে যাতে তারা স্থায়ীভাবে আবির্ভূত হতে থাকে, পুঁজির অবিরাম চাহিদা তেমনটিই দাবি করে। সুতরাং ঐ শক্তির ক্ষয় বা মৃত্যুর ফলে বাজার থেকে যতটুকু শ্রমশক্তি বিলুপ্ত হল তা কমপক্ষে সমপরিমাণ নতুন শক্তি দ্বারা ক্রমাগত প্রতিস্থাপিত হতে হবে। শ্রমশক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনধারণের মোট সামগ্রীতে তাই ভবিষ্যৎ (প্রতিস্থাপন) শক্তির জন্য অর্থাৎ শ্রমিকের সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
Peoples Marx Part IV

মুখবন্ধ
সাধারণ অর্থে যাকে পাঠকমহল বলে সেখানে তো বটেই, এমনকি মার্কসবাদীদের মধ্যেও মার্কসের লেখা ‘পুঁজি’-র কদর যতটা, সচেতন চর্চা তার তুলনায় কিছুটা কমই। রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনায় মার্কসের কলমে মানবসমাজের ইতিহাস, চিরায়ত সাহিত্য, সমকালীন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং আইনের বহুবিধ প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব যেমন ঐ বইটিকে যত্ন করে ঘরের তাকে সাজিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি, তেমন না পড়ে ফেলে রাখার অজুহাতও। অনেকেই সে বাধা পেরিয়ে সকলের সুবিধার্থে মার্কসের লেখা’কে সহজ করে লিখতে চেয়েছেন। কার্ল কাউটস্কি’র মতো মার্কসবাদী পণ্ডিত’ও সে কাজে হাত দিয়েছিলেন, পুঁজির প্রথম খণ্ডের সরল সংস্করণ (পিপল’স এডিশন অফ মার্কস’স ক্যাপিটাল) করতে গিয়ে তিনি এবং এক্সটাইন জার্মান ভাষায় ৭০০ পৃষ্ঠার একটি বইও লিখে ফেলেন। ‘পুঁজি’র তিনটি খণ্ডকে একত্রে সরল ভাষায় করার কাজে তাদের দু হাজার পৃষ্ঠা প্রয়োজন বলে স্বীকার করে নেন। সেই ইতিহাস মাথায় রেখেই জার্মান লেখক জুলিয়ান বোরচার্ডট নিজেকে কুড়ি বছর সময় দিয়েছিলেন, তারই ফলশ্রুতি পিপল’স মার্কস। মূল বইটি ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বইটি, ১৯২১ সালে তারই ইংরেজি অনুবাদ প্রকশিত হয় লন্ডন থেকে, অনুবাদ করেন স্টিফেন এল ট্রাস্ক। বাংলা ভাষান্তরের জন্য আমরা সেই ইংরেজি সংস্করণটিকেই ব্যবহার করছি।

তৃতীয় পর্বের পর...

চতুর্থ অধ্যায়

শ্রমশক্তির কেনা-বেচা

ইতিমধ্যে জানা গেছে যে পণ্যসমূহের মূল্য কেবলমাত্র তাদের মধ্যে নিহিত মানবিক শ্রম দ্বারাই নির্ধারিত হয়। এবার সেই প্রশ্নে ফিরে আসা যাক, একজন উৎপাদক নিজের পণ্যে বিনিয়োগকৃত মূল্যের চাইতে অধিক মূল্য অর্জন করতে কীভাবে সক্ষম হন? 

বিষয়টি আরও একবার স্পষ্ট করে তুলে ধরা যাক: একজন পুঁজিপতি কোনও একটি পণ্য উৎপাদনের জন্য কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, ধরা যাক ৫ পাউন্ড ব্যয় করেন। পরবর্তীকালে তিনি সম্পূর্ণ পণ্যটি ৫ পাউন্ড ১০ শিলিংয়ে বিক্রি করেন। আমাদের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে যে ১০ শিলিং’এর এই উদ্বৃত্ত মূল্য পণ্য বিনিময় প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ লেনদেনের মধ্যে উদ্ভূত হতে পারে না। সুতরাং এর উৎস অবশ্যই উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভেতরে নিহিত রয়েছে। আমাদের দেখতে হবে এমনটি কীভাবে সম্ভব হয়। 

অবশ্য এ সমস্যার আংশিকভাবে সমাধান তখনই হয়ে যায় যখন আমরা জানি যে পণ্যের মূল্য সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম দ্বারাই সৃষ্টি হয়। সুতো কারখানায় তুলো ও সুতো তৈরির জন্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলি ব্যবহার করেই শ্রম সম্পাদিত হয়। এ শ্রমের যতটুকু সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় সেটিই নতুন মূল্য সৃষ্টি করে। উৎপাদনের উপকরণ— এক্ষেত্রে কাঁচা তুলো’তে সেই শ্রম এক নতুন মূল্যকে সংযুক্ত করে। একই সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত যন্ত্রপাতির মূল্যকেও সুতোয় স্থানান্তরিত করে। কিন্তু এখনও কিছু অসুবিধা রয়ে যায়- পুঁজিপতিও নিজের উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে শ্রমের মজুরিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলেই মনে হয়, কারণ যন্ত্রপাতি, উৎপাদনের জায়গা (কারখানা ইত্যাদি), কাঁচামাল ও অন্যান্য আবশ্যকীয় সামগ্রীর মূল্যের পাশাপাশি মজুরিও উৎপাদন ব্যয়ের অন্তর্গত বলেই বিবেচিত হয়। আর ঐ মজুরি ঠিক সেই পরিমাণ শ্রমের বিনিময়েই মেলে যা সুতো কাটার কাজের ফলে ব্যয় হয়েছে। ফলে এমন মনে হতে পারে যেন উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরে যে সকল মূল্যগুলিকে পাওয়া গেল, তার সবকটি আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এটুকু তো স্পষ্ট যে সুতো কাটার শ্রমের দ্বারা নতুন সৃষ্ট মূল্য তা পুঁজিপতি কর্তৃক মজুরি হিসাবে দেওয়া মূল্যের সমান হওয়া আবশ্যিক নয়। এটি তার চাইতে বেশিও হতে পারে, কমও হতে পারে। যদি বেশি হয় তাহলেই আমরা উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎস আবিষ্কার করে ফেলব।

কিন্তু আমরা কি এমন অনুমান থেকেই অনুসন্ধান শুরু করিনি যে যাবতীয় কেনা-বেচায় সঠিক মূল্যই পরিশোধ করা হয়? আমরা কি সন্তুষ্ট হইনি যে পণ্যের দাম প্রায়শই তার মূল্য থেকে আলাদা হয়, কিন্তু ঐ বিচ্যুতি কিছুই ব্যাখ্যা করে না? এই কারণে পুঁজিপতি শ্রমিককে তার শ্রমের মূল্যের চেয়ে কম প্রদান করেন এমন ঘটনা যতই ঘটুক না কেন— ব্যতিক্রম হিসাবেই বিবেচনা করতে হবে। উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎস সেই স্বাভাবিক ক্ষেত্রেও ব্যাখ্যা করতে হবে যেখানে পুঁজিপতি শ্রমের জন্য কেনা দ্রব্যের পূর্ণ মূল্যই মিটিয়ে দেন। সুতরাং পুঁজিপতি ও শ্রমিকের মধ্যে এই বিশেষ কেনা-বেচার লেনদেনকে আমাদের আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

শ্রমিকের মজুরি মিটিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুঁজিপতি নিজে যা অর্জন করেন অর্থাৎ শ্রমিকের কাছ থেকে যা কিনে নেন তা হল শ্রমিকের কাজ করার সামর্থ্য বা শক্তি। কিন্তু শ্রমশক্তি কিনতে সমর্থ হওয়ার জন্য পুঁজিপতিকে বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হবে। শ্রমশক্তি তখনই বাজারে পণ্য হিসাবে আবির্ভূত হতে পারে, যখন শ্রমিক অর্থাৎ শ্রমের মালিক তা বিক্রির জন্য প্রস্তুত। একে পণ্য হিসাবে বেচতে সক্ষম হওয়ার জন্য শ্রমশক্তির মালিককে অবশ্যই এর উপর নিজের অধিকার রাখতে হবে অর্থাৎ তাকে (শ্রমিককে) এমন এক স্বাধীন ব্যক্তি হতে হবে যে নিজের শ্রম সামর্থ্যেরও স্বাধীন মালিক। সে এবং পুঁজিপতি বাজারে পরস্পরের সাথে সমান অধিকারের পণ্যের মালিক হিসাবে মুখোমুখি হবে। দুই পক্ষ হিসাবে তারা একে অন্যের থেকে শুধু একটি বিষয়েই আলাদা হবে যে একজন ক্রেতা ও অপরজন বিক্রেতা — ফলে বাজারের আইনে দুই সমান ব্যক্তি। এমন সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য শ্রমিককে নিজের শ্রমশক্তিলে কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই বেচতে হবে। কারণ সে যদি একসাথে, চিরতরে নিজের সামর্থ্য (শ্রমশক্তি) বিক্রি করে, তবে সে তিনি নিজেকেই বিক্রয় করবে। তেমনটি হলে সে নিজেকে একজন স্বাধীন মানুষ থেকে ক্রীতদাসে পরিণত করবে। আর তখন সে আর নিজের পণ্যের মালিক থাকবে না বরং নিজেই এক পণ্যে পরিণত হবে।

বাজারে শ্রমশক্তিকে পণ্য হিসাবে খুঁজে পাওয়ার দ্বিতীয় অপরিহার্য শর্ত হল সেই অবস্থা যখন শ্রমিককে নিজের শ্রমশক্তিই বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয় যা কেবলমাত্র তার জীবন্ত শরীরেই রয়েছে। এমনটি ঘটে যখন তার কাছে পণ্য উৎপাদনের জন্য আবশ্যকীয় কোনো উৎপাদন উপকরণ নেই (যেমন কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি) এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও পণ্য বিক্রয় হওয়া পর্যন্ত জীবন ধারণের জন্য অন্য কোনও খাদ্যসামগ্রীও তার কাছে নেই।

অতএব পুঁজিপতিকে বাজারে এমন এক মুক্ত শ্রমিককে খুঁজে বের করতে হবে যিনি দু অর্থেই মুক্ত। একদিকে তিনি স্বাধীন, যিনি নিজের শ্রমশক্তিকে নিজের পণ্য হিসেবে বিক্রি করতে পারেন এবং অন্যদিকে এমন একজন যার কাছে বিক্রয় করার মতো অন্য কোনও পণ্য নেই, কোনও বন্ধন নেই। নিজের শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু থেকেই তিনি মুক্ত।

এমন মুক্ত শ্রমিক পণ্যের বাজারে কেন তার সাথে মুখোমুখি হতে বাধ্য হলেন সে প্রশ্নে পুঁজিপতির কোনও আগ্রহ নেই। এই মুহূর্তে তেমন কোনও ইচ্ছা সম্ভবত আমাদেরও নেই। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, একদিকে পুঁজিপতি ও পণ্যের মালিক এবং অন্যদিকে কেবল নিজের শ্রমশক্তির মালিক প্রকৃতি কখনও এভাবে সৃষ্টি করে না। এমন অবস্থা প্রাকৃতিক নয়, সামাজিকও নয়- সামাজিক না হওয়ার অর্থ এই যে ইতিহাসের সকল যুগের জন্য এমনটি কোনও সাধারণ বৈশিষ্ট না। পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক বিকাশই এমন ঘটার কারণ— অসংখ্য অর্থনৈতিক বিপ্লবের ফলে, অতীতের বহু সামাজিক উৎপাদনের বহু রূপের বিলুপ্তির ফলেই এমন সৃষ্টি হয়েছে।

এবার ঐ বিশেষ পণ্য অর্থাৎ শ্রমশক্তিকে আরও নিবিড়ভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিটি অন্যান্য পণ্যের মতো এরও মূল্য রয়েছে। সে মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হয়? অন্যান্য প্রতিটি পণ্যের মতোই শ্রমশক্তির মূল্য তার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় (নির্মাণকাল) দ্বারাই নির্ধারিত হয়, ফলে এর পুনরুৎপাদনের জন্যও তারই প্রয়োজন পড়ে। শ্রমশক্তি কেবলমাত্র একজন জীবন্ত মানুষের গুণ হিসাবেই লভ্য আর তাই এর অস্তিত্ব ঐ মানুষটির অস্তিত্বকেই অনুমান করে। একজন জীবন্ত মানুষ নিজেকে জীবিত রাখার জন্য কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণ জীবনধারণের সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। শ্রমশক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় (নির্মাণকাল) সুতরাং এই জীবনধারণের সামগ্রী উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজের সময়ে পর্যবসিত হয়। অন্যভাবে বলা যায় শ্রমশক্তির মূল্য হল তার মালিককে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জীবনধারণের সামগ্রীসমূহের মোট মূল্য।

জীবনধারণের জন্য জরুরী সামগ্রীর পরিমাণ কর্মরত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক অবস্থায় বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত হতে হবে। খাদ্য, পোশাক, উত্তাপ, আবাসন ইত্যাদির মতো প্রাকৃতিক চাহিদাগুলি প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী আলাদা হয়। অন্যদিকে তথাকথিত প্রাকৃতিক চাহিদার পরিধি এবং সেসব পূরণের পদ্ধতি বহুলাংশেই যে কোনো দেশের অর্জিত সভ্যতার মাত্রার উপরই নির্ভর করে। বিশেষত (অন্যান্য কারণের মধ্যে) যে পরিস্থিতিতে মুক্ত শ্রমিকের শ্রেণি গঠিত হয়েছে, তারা যে জীবনমান অর্জন করেছে তার উপর নির্ভর করে। তাই শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারণের সময় একটি ঐতিহাসিক ও নৈতিক উপাদানও বিবেচনায় রাখতে হয় যা অন্যান্য সমস্ত পণ্যের ক্ষেত্রে করতে হয় না। অথচ যে কোনও দেশেই নির্দিষ্ট কোনও সময়ে জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য সামগ্রীর গড় পরিমাণ বাস্তবে জ্ঞাত থাকে।

শ্রমশক্তির মালিক নশ্বর। শ্রমের বাজারে যাতে তারা স্থায়ীভাবে আবির্ভূত হতে থাকে, পুঁজির অবিরাম চাহিদা তেমনটিই দাবি করে। সুতরাং ঐ শক্তির ক্ষয় বা মৃত্যুর ফলে বাজার থেকে যতটুকু শ্রমশক্তি বিলুপ্ত হল তা কমপক্ষে সমপরিমাণ নতুন শক্তি দ্বারা ক্রমাগত প্রতিস্থাপিত হতে হবে। শ্রমশক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনধারণের মোট সামগ্রীতে তাই ভবিষ্যৎ (প্রতিস্থাপন) শক্তির জন্য অর্থাৎ শ্রমিকের সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও অন্তর্ভুক্ত থাকে। কোনো নির্দিষ্ট শাখার শ্রমের জন্য আবশ্যক দক্ষতা ও পারদর্শিতা শেখার ব্যয়ও সেই মোট পরিমাণে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়— যদিও সাধারণ শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে ঐ ব্যয় নগণ্যই।

শ্রমশক্তির মূল্য জীবনধারণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সামগ্রীর মূল্যের দ্বারাই নির্ধারিত হয়। ঐ সামগ্রীর পরিবর্তনের সাথেই এর পরিবর্তন হয়— অর্থাৎ সেগুলি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের (নির্মাণকাল) দৈর্ঘ্য অনুযায়ী। জীবনধারণের সামগ্রীর একটি অংশ (যেমন খাদ্য, জ্বালানি ইত্যাদি) প্রতিদিন ব্যবহৃত হয় এবং প্রতিদিনই তাদের প্রতিস্থাপিত হতে হয়। অন্যান্য সামগ্রী (যেমন পোশাক, আসবাবপত্র ইত্যাদি) ক্ষয় হতে বেশি সময় লাগে আর তাই দীর্ঘ বিরতিতে প্রতিস্থাপিত হতে হয়। এক ধরনের পণ্য প্রতিদিন কিনতে বা পরিশোধ করতে হয়, অন্যগুলি সাপ্তাহিক, ত্রৈমাসিক ইত্যাদি ভিত্তিতে কেনা-বেচা চলে। কিন্তু এ সমস্ত ব্যয়ের মোট পরিমাণ সারা বছরের মধ্যে যেভাবেই বন্টিত হোক না কেন, একদিনের সাথে অন্যদিন মিলিয়ে গড় আয় দ্বারাই তার হিসাব পূরণ করতে হয়।

সারা বছর ধরে শ্রমিকের প্রয়োজনীয় সমস্ত জীবনধারণের সামগ্রীর মূল্য হিসাব করে সেই যোগফলকে ৩৬৫ দ্বারা ভাগ করে শ্রমশক্তির প্রকৃত দৈনিক মূল্য এভাবে নির্ধারিত হয়। যদি আমরা ধরে নিই যে একটি গড় দিনের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যে ছ-ঘণ্টার সামাজিক শ্রম নিহিত আছে তবে প্রতিদিন সেই শ্রমশক্তি অর্ধেক দিনের গড় সামাজিক কাজকে প্রতিনিধিত্ব করে। অন্য কথায়, শ্রমশক্তির দৈনিক উৎপাদনের জন্য অর্ধেক কর্মদিবসের প্রয়োজন। শ্রমশক্তির দৈনিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় এই পরিমাণ শ্রমই সে শক্তির দৈনিক মূল্য নির্ধারণ করে। দৈনিক পুনরুৎপাদিত শক্তির মূল্যও ঐ হিসাব থেকে পাওয়া যাবে। যদি ৩ শিলিং মূল্যের সোনার পরিমাণে অর্ধেক দিনের গড় সামাজিক শ্রমও সন্নিহিত থাকে, তাহলে ঐ পরিমাণই শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি শ্রমশক্তির মালিক দিনে তিন শিলিংয়ে তা মিটিয়ে দেন, তবে বিক্রয়মূল্যও সে শক্তির মূল্যের সমান এবং আমরা অনুমান করেছি যে পুঁজিপতি ঐ মূল্যই চুকিয়ে দেন।

পণ্য হিসাবে শ্রমশক্তির বিশেষ প্রকৃতির কারণেই, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কেনা-বেচার চুক্তি সম্পন্ন হলেও ঐ পণ্যের ব্যবহার-মূল্য প্রকৃতপক্ষে ক্রেতার কাছে হস্তান্তরিত হয় না। শ্রমশক্তির ব্যবহার-মূল্য পরবর্তীকালে শক্তি প্রয়োগের মধ্যে নিহিত থাকে। শ্রমশক্তির বিক্রয় ও তার প্রয়োগ এভাবেই সময়ের নিরিখে পরস্পর পরস্পরের থেকে আলাদা। কিন্তু সাধারণভাবে অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে, যেখানে ব্যবহার-মূল্যের বিক্রয় এবং ক্রেতার কাছে কার্যকর হস্তান্তর সময়গতভাবে আলাদা, যার পরিশোধ সাধারণত পরবর্তীকালে হয়। পুঁজিবাদী উৎপাদনপ্রক্রিয়া রয়েছে এমন সকল দেশে শ্রমশক্তির মূল্য কেবল তা প্রয়োগের পরেই পরিশোধ করা হয়, যেমন সপ্তাহের শেষে। এভাবে শ্রমিক সর্বত্র পুঁজিপতিকে নিজেদের শ্রমশক্তির ব্যবহার-মূল্যটি অগ্রিম প্রদান করে; তার মূল্য গ্রহণের আগেই তিনি ক্রেতাকে তা ভোগ করতে দেন। তাই শ্রমিক সর্বত্রই পুঁজিপতিদের ঋণ দেয়।

(পুঁজি, ১ম খণ্ড থেকে সংকলিত)

মূল ইংরেজি, জুলিয়ান বোরচার্ডট
বাংলা ভাষান্তর – সৌভিক ঘোষ

 

 


প্রকাশের তারিখ: ১১-জুন-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শ্রমিক কৃষক বিভাগে প্রকাশিত ৫৭ টি নিবন্ধ
১১-জুন-২০২৬

২০-মে-২০২৬

১৭-মে-২০২৬

১৫-মে-২০২৬

০৭-মার্চ-২০২৬

০১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৯-ডিসেম্বর-২০২৫

০২-ডিসেম্বর-২০২৫

০১-ডিসেম্বর-২০২৫

৩০-নভেম্বর-২০২৫