সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভারতের নির্মাণ
আইজাজ আহমেদ
ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বৌদ্ধধর্মের মধ্যকার সেই বিশাল সংঘাতের কাল থেকে ভারতীয় সভ্যতা ও সমাজের ইতিহাসে ‘জাতি’-সংক্রান্ত প্রশ্ন এক বিশাল, অমীমাংসিত এবং অপ্রতিরোধ্য প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে। সহস্রাব্দব্যাপী সংগ্রামের পরেও যে এই প্রশ্নের কোনো সুরাহা হয়নি, তার বড় কারণ ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থা এবং সেই ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ও সম্পত্তির কাঠামোর অদম্য শক্তি। তবে সহস্রাব্দ ধরে এই প্রশ্নটি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে এবং প্রতিনিয়ত ভয়াবহ সামাজিক সংকটের জন্ম দিয়ে চলেছে; বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশবিক শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সেই ব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন বারবারই ভেঙে পড়ে। ফলে, যা-কিছু অবদমিত, তা অবদমিত থাকতে অস্বীকার করেছে, ফিরে ফিরে এসেছে। আর আমাদের সমাজেরই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক প্রগতিশীল অংশগুলোই এই প্রশ্নটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নির্দিষ্ট কিছু পূর্ববর্তী মুহূর্ত নিয়ে ভাববার পাশাপাশি, এখন আমরা ভাবতে পারি একটি আধুনিক জাতি হিসেবে ‘ভারতের গড়ে ওঠা’ নিয়েও। এখানেও চিন্তার ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ব্রিটিশ প্রশাসক এবং পণ্ডিতরা উভয়েই দাবি করতেন, পরস্পরবিরোধী সম্প্রদায়, ধর্ম, মতবাদ ও ‘জাতি’সত্তার এক বিভ্রান্তিকর ও বিশৃঙ্খল সমাহার ভারতের ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসনই সর্বপ্রথম দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কিন্তু আমাদের যুক্তি, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনই একটি প্রাক-আধুনিক সভ্যতার আধুনিক জাতিসত্তায় উত্তরণ ঘটানোর প্রক্রিয়াটিকে সচল করেছিল। ১৮৮০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া সেই জাতীয় আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়টির দিকে তাকালে দেখা যাবে, তখন এই আন্দোলন জাতীয় স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত হওয়া থেকে বহু দূরে এবং মূলত উচ্চবিত্ত শ্রেণির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
প্রথমত, জাতীয় আন্দোলনকে প্রকৃত অর্থেই ‘জাতীয়’ হয়ে উঠতে হলে, তাকে হতে হবে যথাসম্ভব সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক; বিভিন্ন ধর্ম, অঞ্চল ও ভাষাগত পটভূমির মানুষকে এক ছাতার নিচে সমবেত করতে হবে। সেই আদি ও সুদৃঢ় প্রত্যয় থেকেই ঐক্যবদ্ধ জাতীয় আন্দোলনের রূপরেখা ফুটে ওঠে, যা বাহ্যত একীভূত হলেও অভ্যন্তরীণভাবে ছিল পারস্পরিক সহনশীল ও বৈচিত্র্যময়। তখনও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি অঙ্গীকার সুস্পষ্ট ছিল না। তথাপি ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল এই জাতীয়তাবাদের মর্মমূলে। মূল কারণ ছিল এই যে, সমাজটি ধর্ম ও সম্প্রদায়গত দিক থেকে ছিল অত্যন্ত ভিন্নধর্মী। মানুষ প্রায়শই বিস্মৃত হয় যে, বিভাজন-পূর্ব ভারতে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল এবং ভারতের দুটি বৃহত্তম প্রদেশ – বাংলা ও পাঞ্জাবে – তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। জাতীয়তাবাদের আদর্শেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ কিংবা অন্ততপক্ষে বহু-সম্প্রদায়গত সহনশীলতার ধারণা ভারতে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সমাজের অভ্যন্তরে থাকা নানাবিধ সাম্প্রদায়িকতা এবং সেই সঙ্গে ‘বিভক্ত করা ও শাসন করা’র সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে এক মৌলিক প্রতিরক্ষাকবচ হিসেবেও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা গড়ে উঠেছিল। এর প্রয়োজন ছিল বাস্তবে, কোনও নির্দিষ্ট নেতার ব্যক্তিগত ঝোঁক বা পছন্দের ওপর নয় — নাস্তিক ও ‘সমাজতন্ত্রী’ নেহরু হোন কিংবা সনাতনী মহাত্মা গান্ধী, ধর্মপ্রাণ মওলানা আজাদ, অথবা দক্ষিণপন্থী সর্দার প্যাটেল, যাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ঝোঁকের খুব কাছাকাছি ছিল। বলা যেতে পারে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জাতীয় আন্দোলনের সূচনা-লগ্ন থেকে শুরু করে ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’-এর অবক্ষয় শুরু হওয়ার পর্ব ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত, ধর্মনিরপেক্ষতা ও আন্তঃধর্মীয় সহিষ্ণুতার ধারণাগুলো ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আদর্শের এক ক্রমশ অবিচ্ছেদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছিল। এর অর্থ এমনও নয়, ভারতে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ সর্বদা এই আদর্শগুলোর প্রতি বিশ্বস্ত ছিল; কিংবা কংগ্রেসের মতো প্রধান জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো, এমনকি তাদের নেতৃত্বের স্তরেও, সাম্প্রদায়িক উপাদানমুক্ত ছিল। বস্তুত, জাতীয় আন্দোলন দেশভাগ ও পাকিস্তান সৃষ্টি রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল কারণ, আন্দোলনের নিজস্ব বলয়ের মধ্যেই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দক্ষিণপন্থী অংশ বিদ্যমান ছিল যারা নিজেরাও হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় মুসলিম সমাজের একটি বিশাল অংশ তাদের ঠিক এভাবেই দেখত। তবে, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় মূল অংশটি সর্বদা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভারতের আধুনিক জাতিসত্তা গঠনের একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গণ্য করত। এই মূল অংশটি আবার নিজেদেরই অনেকের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার অভাবকে একটি দুর্বলতা হিসেবে এবং সামগ্রিকভাবে আন্দোলনের ক্ষমতা ও বৈধতার ক্ষেত্রে একটি ঘাটতি হিসেবে দেখত।
দ্বিতীয়ত, একইভাবে জাতীয় আন্দোলনের বহুভাষিক ও বহু-আঞ্চলিক চরিত্রটিও বাস্তবিকপক্ষে ভারতের ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত বৈশিষ্ট্য থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল। যেখানে ঔপনিবেশিক শক্তি আফ্রিকা ও আরব বিশ্বকে ছোট-বড় অসংখ্য রাষ্ট্রে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলতে পেরেছিল, সেখানে ভারত সংহত হয়েছিল বহুসংখ্যক ভাষাভাষীর এক বিশাল উপনিবেশ হিসেবে। ব্রিটিশ ভারতের অধিকাংশ প্রদেশই ইউরোপের অধিকাংশ দেশের চেয়ে আয়তনে বড় ছিল। দেশভাগের পূর্ববর্তী ভারতে বাংলাভাষীর সংখ্যা ছিল ইউরোপের ফরাসিভাষীদের মতোই বিপুল; আর তামিল ভাষা তারা ঠিক ততটাই কম বুঝত, যতটা ফরাসিরা হয়ত বুঝত সার্বো-ক্রোয়েশীয় ভাষা। অথচ ইংরেজি ও ফরাসি-সহ আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাগুলোর যে কোনওটির চেয়েই তামিল ভাষা ছিল অনেক বেশি প্রাচীন। সংহত ভাষাগুলোর এই বহুবিধ চেহারা — এবং ফলস্বরূপ, প্রতিটি ভাষার সমান্তরালে বিকশিত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলোর এই বৈচিত্র্য – ভারতীয় সমাজের স্বকীয় প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিকরা আমাদের ভূখণ্ডে পদার্পণ করার বহু আগেই।
📲এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
এই সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, একটি আধুনিক ভারতীয় রাষ্ট্রকে স্বভাবতই মৌলিকভাবে ভিন্ন এবং অভ্যন্তরীণভাবে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হতে হয়েছে ইউরোপ এবং সাধারণভাবে উন্নত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একভাষিক ও একক-সংস্কৃতির রাষ্ট্রকাঠামো থেকে। বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষিত মহলের মধ্যে ইংরেজি নিঃসন্দেহে একটি সংযোগ-ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; অবশ্য পরবর্তীকালে, সমগ্র ভারতের জনগণের ওপর হিন্দি ভাষাকে ‘জাতীয় ভাষা’ বা তথাকথিত ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে সেই অবস্থান টেকেনি। বেশিরভাগ সময় জুড়েই এই সুস্পষ্ট সত্যটি পূর্ণাঙ্গভাবে স্বীকৃত ছিল যে, সেই ‘ভারতীয় জাতি’, তাদের বৃহত্তর পরিসরে অন্তত দু-ডজন ভাষায় এবং বস্তুত সেই বড় পরিসরের বাইরে আরও অসংখ্য উপভাষায় কথা বলতে থাকবে।
বহুভাষিক জাতিসত্তার এই স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণযোগ্যতার মূলে ছিল এক বহু প্রাচীন সভ্যতাগত বাস্তবতা। জাতিরাষ্ট্র-পূর্ববর্তী সেই সুদীর্ঘ সময়ে যখন আমরা অসংখ্য ভাষায় কথা বলে আসছিলাম, এক ধরনের সভ্যতাগত ঐক্য দানা বেঁধে উঠেছিল। অধিকাংশ জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে, বিশেষ করে ইউরোপে, জাতিসত্তা ও ভাষা অত্যন্ত কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ভারত, বিস্ময়করভাবে, কখনও জাতিগত ও ভাষাগত জাতীয়তাবাদের প্রয়োজন মনে করেনি। ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী জাতীয়তাবাদের পুরো সময় জুড়ে ভারতের বুকে সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পরিণতিতে পাকিস্তান সৃষ্টির মতো এমন কোনো শক্তিশালী ভাষাগত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠেনি। আমরা বরং ভারতীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরেই ভাষাগত ভিত্তিতে পৃথক পৃথক রাজ্য গঠন করার দাবিতে অসংখ্য আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছি। বহুবিধ ভাষার বৈচিত্র এবং ফলস্বরূপ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র আমাদের কাছে নিতান্তই স্বাভাবিক বা স্বতঃসিদ্ধ ছিল। কারণ, আমাদের সামাজিক পরিমণ্ডল ও সভ্যতার পরিসর মূলত এই বাস্তবতারই জন্ম দিয়েছে। আমরা এই পরিস্থিতির তুলনা করতে পারি বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের সাথে। সেখানকার নাগরিকরা মূলত অভিবাসী (এবং প্রাক্তন দাসদের বংশধর) নিয়ে গঠিত, যারা আদিতে প্রায় দুশোটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সেখানে তাঁদের বাধ্য করা হয় নিজেদের মাতৃভাষাগুলো ভুলে যেতে এবং ইংরেজি ভাষার একভাষিক একনায়কত্বের কাছে নতি স্বীকার করতে, সেই ‘একভাষিক’ রাষ্ট্রের জনজীবনে অন্য কোনো ভাষাই কোনো সাংবিধানিক মর্যাদা পায়নি।
ধর্ম, সম্প্রদায়, ভাষা এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিপুল বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি ছিল ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী আন্দোলনের একটি অন্যতম প্রধান দিক। একইভাবে, ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রতি গভীর মনোযোগ এবং নানাবিধ সংস্কার আন্দোলনের এক অভাবনীয় জোয়ারও আমাদের সমানভাবে বিস্মিত করে –বাংলার উচ্চবর্ণের সমাজের নিজস্ব সংস্কার প্রচেষ্টা, উত্তর ভারতের মুসলিম সমাজের সংস্কার আন্দোলন, কিংবা মহারাষ্ট্রে নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, বা এমন আরও বহুবিধ উদ্যোগ। ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী আন্দোলনের সূচনার বহু দশক আগেই মূলত সমাজ-সংস্কার আন্দোলনগুলোর সূচনা হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে এক দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব চলেছিল।
কেউ কেউ এমনও ভেবেছিল, ঔপনিবেশিক শাসনশক্তির হাত ধরেই ভারতীয় সমাজের সংস্কার ও আধুনিকায়ন সাধিত হবে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র যখন স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিল যে, উচ্চবর্ণ এবং বিত্তবান শ্রেণিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন কোনো সংস্কার প্রবর্তনে তারা খুব একটা আগ্রহী নয়, তখন মোটামুটিভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ এক-চতুর্থাংশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কালে ‘জাতীয় আন্দোলন’ নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল মূলত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের উপর তাদের নিজস্ব নীতিসমূহ সংস্কারের জন্য চাপ সৃষ্টি করার কাজে, যাতে তারা তাদের শাসনাধীন ভারতীয় সমাজকে আরও কার্যকরভাবে সংস্কার করতে পারে। এদিকে, ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে এবং বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত, আমরা এমন অসংখ্য আন্দোলন ও সংগঠনের উত্থানও দেখেছি, যেগুলি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিবর্তে সমাজ সংস্কার সাধনের কাজে নিবেদিত ছিল।
তবে, সব সামাজিক সংস্কার আন্দোলনই প্রগতিশীল কিংবা আধুনিকতাকামী ছিল না। বহু আন্দোলনই ছিল গভীরভাবে রক্ষণশীল, সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত; কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘আধুনিক’ শিক্ষার সাথে সামাজিক রক্ষণশীলতা, জাতিভেদ প্রথা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ছিল গভীর সংযোগ; বেশ কিছু আন্দোলন নানা ধরনের সাম্প্রদায়িকতার — হিন্দু, মুসলিম ও শিখ — উত্থানে জোরালো ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি আরএসএস-ও নিজেকে একটি সংস্কার আন্দোলন হিসেবেই গণ্য করে। এই প্রসঙ্গে আন্তোনিও গ্রামশির সেই পর্যবেক্ষণের কথা মনে পড়ে যায়, ‘সংস্কার’ বলতে প্রায়শই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইতালির বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী মতাদর্শগুলোর ‘পুনরুদ্ধার’ বোঝানো হতো। তবে দুটো কথা বলা যেতে পারে।
একদিকে, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রাথমিক ইতিহাস, বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ পরিত্যাগ করে তৎকালীন বিকাশমান কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেওয়া অসংখ্য মানুষ। মূল কারণ ছিল, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার আমূল পুনর্বণ্টন, যা প্রকৃতপক্ষেই নিপীড়িত জাতি ও শ্রেণিসমূহের হিতসাধন করতে পারত, এবং জাতীয়তাবাদের সেই অসংগতিগুলো নিয়ে তাঁদের গভীর অসন্তোষ। সংস্কারের এই প্রচেষ্টা ছিল আমূল পরিবর্তনকামী ও তা বিপ্লবী রাজনীতির পথও উন্মুক্ত করেছিল।
দ্বিতীয়ত, ভারতীয় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের অধিকতর প্রগতিশীল অংশের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা – ভারত যদি নিজেকে আমূল পরিবর্তন না করে এবং নিজের অতীতের কিছু নিকৃষ্টতম দিক বর্জন না করে, তবে সে প্রকৃত অর্থে একটি আধুনিক জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। ঔপনিবেশিক শোষকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি ভারতের আধুনিক জাতিসত্তা অর্জনের এই সংগ্রামটি ছিল ভারতের নিজস্ব সামাজিক কাঠামো ও রীতিনীতির বহুবিধ সেকেলে আচারবিচার ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধেও এক সংগ্রাম। প্রগতিশীল সংস্কারের প্রতি এই অঙ্গীকারের একটি ইতিবাচক ফলাফল ছিল এবং তা হল ভারতে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনে পুনরুজ্জীবনবাদী প্রবণতাগুলো কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি, ঔপনিবেশিক শাসকদের ঔদ্ধত্য ও বর্ণবাদের দ্বারা নিগৃহীত বহু উপনিবেশের ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছিল।
জাতিভেদ প্রসঙ্গে সংস্কারবাদী ও জাতীয়তাবাদী বিবেক খুবই অস্বস্তিতে ছিল। অত্যন্ত তীব্র উপলব্ধি ছিল, জাতিভেদের রেখায় এমন গভীরভাবে বিভক্ত কোনো সমাজ নিজেকে ‘জাতি’ (Nation) হিসেবে দাবি করতে পারে না, কেননা ‘জাতি’ ধারণার মূলে অন্ততপক্ষে তার সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের সমান্তরাল সামাজিক সমতার পূর্বশর্ত নিহিত থাকে। এ প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করা যেতে পারে — যে হিন্দুধর্মে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের হিন্দুরা একত্রে বসে আহারটুকুও করতে পারে না, সেই ধর্ম নিছকই একটি ‘রান্নাঘরের ধর্ম’ মাত্র। [অনুবাদকের সংযোজন – কে রান্না করতে পারবে, কে খাবার স্পর্শ করতে পারবে এবং কারা একসাথে খেতে পারবে — এইসব সংকীর্ণ ও বাহ্যিক নিয়মের আড়ালে মূল দর্শনটি হারিয়ে যায়।] কিংবা, ‘ন্যাশনালিজমের উপর বক্তৃতায়’ রবীন্দ্রনাথের সেই পর্যবেক্ষণ – যেখানে মানুষ একে অপরের সাথে একত্রে ভোজন করতে কিংবা অবাধে পরস্পরের পরিবারে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে স্বাধীন নয়, তাকে কোনোভাবেই ‘জাতি (Nation)’ বলে অভিহিত করা চলে না। অথবা, আম্বেদকরের সঙ্গে ‘পুনা চুক্তি’ স্বাক্ষরের প্রাক্কালে গান্ধীর সেই ঘোষণা – জাতিভেদ প্রথা টিকে থাকলে, তিনি বরং চাইবেন হিন্দুধর্মেরই অবসান ঘটুক। [অনুবাদকের সংযোজন – অস্পৃশ্যতা বেঁচে থাকার চেয়ে আমি বরং চাইব হিন্দুধর্মের মৃত্যু হোক।]
ঔপনিবেশিক যুগের অগণিত সংস্কারমূলক উদ্যোগের মাঝে ‘জাতি’ বা ‘বর্ণ’-এর কেন্দ্রীয় অবস্থান অনস্বীকার্য। ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বৌদ্ধধর্মের মধ্যকার সেই বিশাল সংঘাতের কাল থেকে ভারতীয় সভ্যতা ও সমাজের ইতিহাসে ‘জাতি’-সংক্রান্ত প্রশ্ন এক বিশাল, অমীমাংসিত এবং অপ্রতিরোধ্য প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে। সহস্রাব্দব্যাপী সংগ্রামের পরেও যে এই প্রশ্নের কোনো সুরাহা হয়নি, তার বড় কারণ ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থা এবং সেই ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ও সম্পত্তির কাঠামোর অদম্য শক্তি। তবে সহস্রাব্দ ধরে এই প্রশ্নটি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে এবং প্রতিনিয়ত ভয়াবহ সামাজিক সংকটের জন্ম দিয়ে চলেছে; বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশবিক শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সেই ব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন বারবারই ভেঙে পড়ে। ফলে, যা-কিছু অবদমিত, তা অবদমিত থাকতে অস্বীকার করেছে, ফিরে ফিরে এসেছে। আর আমাদের সমাজেরই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক প্রগতিশীল অংশগুলোই এই প্রশ্নটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আমার নিজস্ব অভিমত হলো, ভক্তি-সুফি ঐতিহ্য, যা ভারতের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল ও ভাষার পরিসরে জাতিভেদ-বিরোধী সামাজিক সাম্যের আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছে, তা কর্তৃত্বকারী সামাজিক ব্যবস্থা এবং সেই ব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে আস্থার সংকটকে তীব্রতর করে তুলতে অসামান্য অবদান রেখেছে। এই অতীত ইতিহাসে যেমন রয়েছে নিপীড়নের কাহিনি, তেমনি রয়েছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ইতিহাস; এটা জাতীয় আন্দোলনের প্রধান সংস্কারকদের বিবেককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আর এর পাশাপাশিই উপলব্ধি এসেছিল যে, জাতিভেদ-ভিত্তিক সমাজকাঠামো থেকে একটি প্রকৃত অর্থে ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্তার উদ্ভব হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু সেই যুগের রাজনীতিতে জাতপাতকে এতখানি কেন্দ্রীয় অবস্থানে নিয়ে এসেছিল আধুনিক ধাঁচের জাতপাত-বিরোধী আন্দোলনের উত্থান, যা ‘জাতীয় আন্দোলনের’ অনেক আগেই দানা বেঁধেছিল (মহাত্মা ফুলের ‘সত্যশোধক সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৭৩ সালে, ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রায় এক প্রজন্ম আগেই)। সেটা কোনও প্রতিবাদী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারও নয়, কিংবা জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের অপরাধবোধও নয়। জাতীয়তাবাদীরা চাইলেও এই প্রশ্নটিকে আর এড়িয়ে যেতে পারেনি।
(পরবর্তী পর্ব আগামীকাল)
ভাষান্তর: শ্যামাশীষ ঘোষ
(এনবিএ প্রকাশিত ভারত ও ভারততত্ত্ব – অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ, সুকুমারী ভট্টাচার্য সম্মাননা গ্রন্থ থেকে নেওয়া। বইটির প্রকাশকাল ২০০৪ সাল)
প্রকাশের তারিখ: ২৬-মে-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
