Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ভিয়েতনাম: সংগ্রামের এক উদ্দীপ্ত প্রেরণা

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
মার্কসবাদ-লেনিনবাদই ভিয়েতনামের জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের মূলমন্ত্র। দেশের পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার নিরিখে তারা মার্কসবাদের মূল সূত্রগুলি প্রয়োগ করেছে। মার্কসবাদের আদর্শে বিশ্লেষণ করেছে বিশ্ব দুনিয়াকে। শত্রু ও মিত্রকে চিহ্নিত করেছে সঠিকভাবে এবং সঠিকভাবেই মিত্র শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে ও শত্রুর বিরুদ্ধে আঘাতের পর আঘাত হেনেছে।
Vietnam inspiration for struggle

ইন্দোচীনের অন্তর্গত ছোট একটি দেশ ভিয়েতনাম। আয়তন মাত্র ১ লক্ষ ২৯ হাজার বর্গমাইল। লোকসংখ্যাও অত্যন্ত কম, প্রায় সাড়ে তিন কোটি। এদের শতকরা ৯০ ভাগই কৃষক। অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর এই দেশে শিল্প বলতে তেমন কিছুই নেই। অর্থনীতির মূল ভিত্তিই কৃষি। ১৮৫৯ সাল থেকে শুরু করে একের পর এক- ফরাসী সাম্রাজ্যবাদ, জাপানী সাম্রাজ্যবাদ, আবার ফরাসী সাম্রাজ্যবাদ এবং সবশেষে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ শাসন-শোষণ-লুণ্ঠন করে ভিয়েতনামকে শুধু জর্জরিত-বিপর্যস্ত-বিধ্বস্ত করে নি, ভিয়েতনামের মুক্তিকামী জনগণকে 'উচিত শিক্ষা' দিতে বছরের পর বছর জলে-স্থলে-আকাশে যুদ্ধ চালিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন করেছে, দেশের মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে। তাদের ন্যূনতম সম্পদ লুট করেছে। রাসায়নিক অস্ত্রশস্ত্র-সহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহার করে দেশের শহর-নগর-বন্দর, জনপদ, শিল্পাঞ্চল, বনাঞ্চল, শস্যক্ষেত্র ধ্বংস করেছে। গোটা দেশকে ঠেলে দিয়েছে দুর্ভিক্ষ আর মহামারীর করাল গ্রাসে। কিন্তু পারে নি ভিয়েতনামের জনগণের মাথা নত করাতে। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের পাণ্ডা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ১০ লক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যবাহিনী ও অত্যাধুনিক অস্ত্রের মুখে প্রায় অস্ত্রহীন ভিয়েতনামের মানুষ অমিত বিক্রমে লড়াই করে গেছে এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শক্তিধর সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করে দেশের মাটিতে মুক্তির বিজয় কেতন উড়িয়েছে এবং এগিয়ে চলেছে দেশগঠন ও সমাজবাদ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্যে। ভিয়েতনামের জনগণের এই বিজয় সাধারণভাবে অবিশ্বাস্য ও অভাবনীয় মনে হলেও ভিয়েতনামের জনগণই তাকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। এই অভাবনীয় শক্তির উৎস নিহিত আছে সব অংশের মানুষের ঐক্যে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে কমরেড হো চি মিনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট পার্টি এই ঐক্যের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। সংশোধনবাদ ও সঙ্কীর্ণতাবাদের গাড্ডায় না পড়ে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করে, অন্ধ অনুকরণকে বিসর্জন দিয়ে, দেশের অবস্থার প্রকৃত বিশ্লেষণ করে মার্কসবাদ প্রয়োগ করেছে ভিয়েতনামের মানুষ। একাজে পথ দেখিয়েছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন কমরেড হো চি মিন। তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে গোটা দেশ উদ্বুদ্ধ হয়েছে। মার্কসবাদী আদর্শে এবং তাঁরই আহ্বানে দেশের মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে গোটা দেশের মানুষ। কমরেড হো চি মিনের মৃত্যুর পরও মুক্তিযুদ্ধ থেকে সরে আসেনি ভিয়েতনামের মানুষ। তাঁর প্রদর্শিত পথে তারই নির্দেশ পালন করেছে। শত্রুকে মোকাবিলা করেছে। শত্রুর সব ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বানচাল করে দেশকে মুক্ত করেছে এবং আজও এগিয়ে চলেছে।

ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য বিস্তার

ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের পর কাঁচামাল ও বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় ১৮৫৮ সালে ইন্দোচীনে প্রথম অবতরণ করে ফরাসী সাম্রাজ্যবাদ। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদীদের মত দেশ দখলের কৌশলে ফরাসীদের বিশেষ পার্থক্য নেই। শুরুতে ক্যাথলিক ধর্মরক্ষা, চুক্তি স্বাক্ষর, চুক্তিভঙ্গ, নতুন এলাকা দখল, আবার চুক্তি, আবার নতুন এলাকা দখল, নতুন নতুন সুযোগ-সুবিধা আদায় ইত্যাদি কৌশলে চলতে থাকে আধিপত্য বিস্তার। জনগণ কর্তৃক ঘৃণিত তৎকালীন রাজতন্ত্রের ফরাসীদের শক্তি ও কৌশলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি ছিল না। লুট ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ১৮৮৪ সালে ইন্দোচীনে ফরাসীরা দখলদারী নিলো।

দেশের এই সময়কার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি হো চি মিনের ভাষায়: "ফ্রান্স যখন অধিকার করলো এই উপনিবেশকে, শুরু হলো যুদ্ধ, যুদ্ধ কৃষককে বিতাড়িত করল গ্রাম থেকে। যারা ফিরে এলো, দেখলো উপনিবেশবাদীরা বিজয়ী সৈন্যবাহিনীর পেছনে এসে তাদের জমি দখল করেছে। যে জমি কৃষকরা বংশ পরম্পরায় চাষ করে আসছে তা চলে গেল এদের হাতে। আন্নামী কৃষকেরা ভূমিদাসে পরিণত হলো। নিজেদের জমিতে চাষ করতে হলো বিদেশী প্রভুদের জন্য। আর অসংখ্য হতভাগ্য যারা এই দখলদার বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া অত্যাচার সহ্য করতে পারছিল না, তারা জমিছাড়া ঘরছাড়া হয়ে দেশের এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতে লাগল।"

দেশের জনসংখ্যার ৯০ ভাগই কৃষক। কিন্তু এদের হাতে আছে মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ জমি। অন্যদিকে জমিদার ও সামন্তশ্রেণি মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ হয়েও তারা ও উপনিবেশবাদীরা দখল করেছে ৭০ ভাগ জমি। আবার কৃষক সমাজের শতকরা ৯০ ভাগই মধ্য, গরিব ও জমিহীন কৃষক। কৃষকরা সারা বছর পরিশ্রম করে, দারিদ্র্য তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় সারাজীবন।

এই অবস্থার মধ্যেই জন্ম নেয় শ্রমিকশ্রেণি, যদিও সংখ্যায় তারা খুবই কম। জন্মের পর থেকেই শোষণ-নির্যাতনের শুরু। দুর্বিষহ জীবন, বেকারীর অন্ধকার। ফরাসী প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া কারবারে সদ্যজাত জাতীয় বুর্জোয়াদের অগ্রগতি স্তব্ধ হয়ে যায়। শহরের পাতি বুর্জোয়া, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কুটির শিল্পী সকলেই কঠিন সঙ্কটের মুখোমুখি।

মানুষের হাতে অর্থ নেই, ঘরে খাবার নেই। দারিদ্র্যে, দুর্ভিক্ষে ছেয়ে গেছে দেশ। সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণে-আক্রমণে অস্থিরতা-অসন্তোষ বাড়তে থাকে। এই অসন্তোষ কঠোরভাবে দমন করা হতে থাকে। এই শোষণ-অত্যাচারের মধ্যেই তৈরি হতে থাকে সংগ্রামের ক্ষেত্র। কিন্তু কোন্ পথে কার নেতৃত্বে এই সংগ্রাম পরিচালিত হবে এবং কিভাবে গড়ে উঠবে সংগঠন তা তখন কারো জানা ছিল না।

সংগ্রামের আলোকবর্তিকা

ঠিক এই সময় দেশপ্রেমিক ভিয়েতনামীদের নতুন পথের সন্ধান দিল ইন্দোচীনের কমিউনিস্ট পার্টি। সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র নিরূপণ, জাতীয় সমস্যাগুলি বোঝা, শত্রুর বিরুদ্ধে সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ করতে এই পার্টি জনগণকে সাহায্য করল। তাদের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সন্ধান দিল। ১৯৩০ সালে কমরেড হো চি মিনের নেতৃত্বে গঠিত হলো এই পার্টি। কমরেড হো চি মিন রচনা করলেন পার্টির কর্মসূচী ও প্রস্তাব। গঠিত হলো অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি। কর্মসূচীতে বলা হলো: “ইন্দোচীনের বিপ্লব হবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। কারণ তা, এখনও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমস্যা সাক্ষাৎভাবে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম নয়। দেশটি অর্থনৈতিক দিক থেকে এখনও খুবই দর্বল, অনেক সামন্ততান্ত্রিক অবশেষ এখনও বর্তমান, শ্রেণি শক্তির ভারসাম্য এখনও নিরঙ্কুশভাবে সর্বহারার শ্রেণির পক্ষে নয়। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদের এখনো নির্যাতন করার ক্ষমতা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবের চরিত্র হবে কৃষি-বিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। ..... বিপ্লবে সর্বহারাশ্রেণি ও কৃষক হলো মূল সক্রিয় শক্তি। কিন্তু নেতৃত্ব যখন একমাত্র শ্রমিক শ্রেণির হাতে থাকবে তখনই বিপ্লব জয়যুক্ত হবে।”

অন্যত্র কৃষকের ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কমরেড হো চি মিন বলেছেন: “কেবলমাত্র ভূমিসংস্কারকে কার্যকরী করে কৃষকদের হাতে জমি দিয়ে, সামন্তবাদের বন্ধন থেকে গ্রামাঞ্চলের উৎপাদিকা শক্তিকে মুক্ত করেই আমরা পারি দারিদ্র্য ও পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে।..... আমাদের শক্তি লক্ষ লক্ষ কৃষকের মধ্যে। তারা অপেক্ষা করছে আমাদের পার্টির নেতৃত্বে সংগঠিত হয় সামন্তবাদ ও উপনিবেশবাদকে প্রবল উৎসাহ নিয়ে আঘাত করে ধ্বংস করতে। সুসংগঠিত নেতৃত্ব পেয়ে এই বিরাট শক্তি পৃথিবী ও স্বর্গকে কাঁপিয়ে দেবে, সমস্ত উপনিবেশবাদী ও সামন্ত প্রভুদের নিশ্চিহ্ন করবে।”


কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশিত পথ জনগণের মধ্যে নতুন শক্তির সঞ্চার করল। জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম নতুন নীতি ও রণকৌশলে চঞ্চল হয়ে উঠলো। বর্বর দমন পীড়নকে উপেক্ষা করে প্রতিরোধে এগিয়ে চলার শক্তি গোটা দেশকে উদ্বুদ্ধ করল। ফরাসী সাম্রাজ্যবাদ এই প্রথম টের পেল ভিয়েতনামের জনগণের শক্তি। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধে দুর্বল ফরাসীরা ভিয়েতনামকে তুলে দিল জাপানী ফ্যাসিস্তদের হাতে। নতুন শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চললো। ১৯৪১ সালে কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় প্রতিরোধের নতুন নীতি গ্রহণ করল। কমরেড হো চি মিনের নেতৃত্বে গঠিত হলো 'লীগ ফর দি ইন্ডিপেন্ডেন্স অব ভিয়েতনাম', সংক্ষেপে ভিয়েতমিন। গোটা দেশের জনগণ ভিয়েতমিন ফ্রন্টের নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন। শুরু হলো জাপানী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিস্ত শক্তির পরাজয়ের ফলে এক ঐতিহাসিক যুগ সন্ধিক্ষণে ভিয়েতনামের জনগণের সংগ্রাম জয়যুক্ত হলো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বুকে প্রথম শ্রমিক কৃষক রাষ্ট্রের জন্ম হলো। দেশের ইতিহাসে নবযুগের সূচনা হলো। ১৯৪৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর হো চি মিন ভিয়েতনামের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে গোটা দুনিয়াকে জানিয়ে দিলেন: "ভিয়েতনামের অধিকার আছে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বেঁচে থাকার। গোটা ভিয়েতনামের জনগণ তাদের সর্বপ্রকার শারীরিক ও মানসিক শক্তি দিয়ে, জীবন দিয়ে ভিয়েতনামের স্বাধীনতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বদ্ধপরিকর।"

এরপরই ফরাসী সাম্রাজ্যবাদ ভিয়েতনামে তাদের সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে সমরশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ১৯৪৫ সালে গোটা দক্ষিণাঞ্চলে অত্যাচার শুরু হলো। ১৯৪৭ সালে তারা হ্যানয় দখলে নামল। পিতৃভূমি রক্ষার জন্য গোটা জাতিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন কমরেড হো চি মিন। শুরু আধুনিক সমরাস্ত্রের সঙ্গে প্রায় নিরস্ত্র জনগণের মরণপণ সংগ্রাম। গোটা বিশ্বের মানুষ তাকিয়ে রইলো ভিয়েতনামের দিকে। কমরেড হো চি মিন বললেন: "আমাদের শক্তি ও শত্রুর ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য এত বিরাট যে, কিছু লোকের মনে হয়েছিল এই প্রতিরোধ সংগ্রাম যেন পোকা লড়াই করছে হাতির সঙ্গে। খোলা চোখে সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে তাই। আমাদের তখন বাঁশের লাঠি দিয়েই লড়তে হচ্ছিল কামানের গোলা আর উড়োজাহাজের বিরুদ্ধে। কিন্তু মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আদর্শে বলীয়ান আমাদের পার্টি শুধু বর্তমানের দিকেই তাকিয়ে থাকে নি, ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়ে দেখেছে। দেশের ও জনগণের মধ্য যে বিরাট শক্তি ও প্রবল আশাবাদ ছিল তারই ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেছে।"

এই যুদ্ধে একাধিক ফ্রন্টে পরাজিত হয়ে ফরাসীদের কোণঠাসা অবস্থা। ১৯৫০ সালে তারা আবার নতুন করে আক্রমণ শুরু করে। এই সময় থেকেই ফরাসী অভিযানের ৮০ ভাগ অর্থ ও পরিকল্পনা দিচ্ছিল মার্কিনীরা। এই সময়েই চীনে (১৯৪৯ সালে) জনগণের বিজয় বিরাট আলোড়ন তুলল ভিয়েতনামেও। নব উদ্দীপনায় ঝাঁপিয়ে পড়ল মুক্তিযোদ্ধারা। ১৯৫১ সালে নতুন পরিস্থিতিতে পার্টির নাম পাল্টে ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টি করা হলো। নতুন রাজনৈতিক দলিলে বলা হলঃ "বর্তমান ভিয়েতনাম বিপ্লবের মৌলিক কর্তব্য হলো আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদীদের তাড়িয়ে দেওয়া, জাতির জন্য প্রকৃত স্বাধীনতা ও ঐক্য অর্জন করা, সামন্তবাদী অবশেষ মুছে ফেলা, জনগণতান্ত্রিক শাসন উন্নত করা এবং সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা।"

📲এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

১৯৫৪ সালে হ্যানয় থেকে ২০০ মাইল দূরে পাহাড় জঙ্গল ঘেরা উপত্যকা দিয়েন বিয়েন ফু-তে আধুনিক অস্ত্র নিয়ে প্যারাসুটে নামে ২০ হাজার ফরাসী সৈন্য। জেনারেল গিয়াপের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারাও তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। পেছনে অস্ত্র ও খাদ্য নিয়ে সাহায্য করে ৮০ হাজার মানুষ। ৭ই মে মুক্তিযোদ্ধারা প্রমাণ করল সাম্রাজ্যবাদের থেকেও ভিয়েতনামের জনগণ বেশি শক্তিধর। এটা আর এক গৌরবময় অধ্যায়। এই যুদ্ধের পরই জেনেভা চুক্তি হয়। ভিয়েতনামের জনগণের মুক্তি সংগ্রাম, বীরত্ব ও আত্মত্যাগ, বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গেছে এই চুক্তির ফলে। এই চুক্তির পরই হো চি মিন সতর্ক করিয়ে দেন: "...... আমাদের জনগণের প্রধান শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের তাঁবেদাররা দেশের অর্ধেক জুড়ে বসে আছে। যুদ্ধের প্রস্তুতি চালাচ্ছে। অতএব আমাদের কর্তব্য, শান্তির পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা আর সেই সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি সতর্ক হয়ে চলা।"

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন

কমরেড হো চি মিনের সতর্কবাণী বাস্তবে দেখা গেল চুক্তির কিছুদিন পর থেকেই। আড়াল থেকে সামনে এলো মার্কিনীরা। সায়গনে দিয়েমের পুতুল সরকারকে সামনে রেখে শুরু হলো দক্ষিণ ভিয়েতনামে ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাস। হাজার হাজার দেশপ্রেমিক গ্রেপ্তার হন। মৃত্যু হয় অনেকের। নির্মম সন্ত্রাসের মধ্যে শোচনীয় হয় আর্থিক অবস্থা। জনসংখ্যার দু'ভাগের হাতে চলে যায় ৪৫ ভাগ জমি। শহরের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। শিল্পাঞ্চলে অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যায়। ১১ ঘন্টা কাজের পরও ছুটি নেই। বস্তির নরকে নির্মম শ্রমিক জীবন। ক্ষয় রোগে অনিবার্য মৃত্যু। নারী ও কিশোর শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ। নিষিদ্ধ ধর্মঘট আন্দোলন। ১৯৫৫ সালে ৫৬ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। কয়েক মাসের মধ্যেই এই সংখ্যা এক লক্ষে পৌঁছায়। বেকারী বাড়তেই থাকে। ১৯৬২ সালে দেখা যায় দেশের ৪০ ভাগ মানুষই বেকার। ১৯৬৩ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাগানগুলি থেকে ৩৬ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়। এরা মোট শ্রমিকের ৩০ ভাগ।

এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৯৬০ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামে তৈরি হয় জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট। গোটা দেশের জনগণ যেন এই ফ্রন্টের অপেক্ষায় ছিলেন। সর্বশক্তি নিয়ে এই ফ্রন্ট ঝাঁপিয়ে পড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে। মার্কিন সরকারও মুক্তিফ্রন্টের বিরুদ্ধে সামগ্রিক অভিযান শুরু করে। গেরিলা যুদ্ধের মোকাবিলায় আসে মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা। শুরু হয় স্ট্র্যাটেজিক হামলেট গঠনের কাজ। বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিক দ্রব্যের সাহায্যে জঙ্গল ও শস্যখেত ধ্বংস শুরু হয়। প্রথমে বিশেষ যুদ্ধ, পরে সীমাবদ্ধ যুদ্ধ এবং শেষে সমস্ত সমরশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মার্কিনীরা। একের পর এক আক্রমণে গোটা দেশকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে চায়। ১৯৬৫ সালের গোড়া থেকে উত্তর ভিয়েতনামের উপর আক্রমণ সম্প্রসারিত হয়। হ্যানয়, হাইফঙ বন্দর, শিল্পাঞ্চল, হাসপাতাল, শিক্ষায়তন, সেচ বাঁধ, জনবহুল এলাকায় বেপরোয়া বোমাবর্ষণ শুরু করে। ইতিহাসের জঘন্যতম ও নারকীয় আঘাত সংগঠিত করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা মরণপণ সংগ্রামে তাদের সব কৌশলকে ব্যর্থ করে একের পর এক জয়ের পথে এগিয়ে যায়।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে কমরেড হো চি মিন লিখে যান: "ছোট্ট দেশ হিসেবে আমাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মাধ্যমে দু'টি বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদকে পরাস্ত করার এবং বিশ্বের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে যোগ্য অবদান সৃষ্টি করার মহান গৌরব অর্জন করতে হবে।" তিনি আরও লেখেন: "জাতীয় মুক্তির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক অভিযানের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রামকে যদি আরও বেশি দুঃখ কষ্ট ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তবুও আমরা সম্পূর্ণভাবে বিজয়ী হবো। এই বিজয় সম্বন্ধে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সামনে যতই বাধা বিপত্তি, যত দুঃখ কষ্ট থাকুক না কেন, আমাদের জনগণ পূর্ণ বিজয় লাভ করবেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এদেশ ছেড়ে চলে যেতে হবেই।"

কমরেড হো চি মিনের আশা ও ভবিষ্যতবাণী ব্যর্থ হয় নি। প্রতি পদে পদে যুদ্ধবিধ্বস্ত মার্কিনীরা বুঝতে পেরেছিল আর বেশিদিন ভিয়েতনামের বীরযোদ্ধাদের ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। ধনতান্ত্রিক সঙ্কটে আবন্ধ, ভিয়েতনামের যুদ্ধ ক্ষেত্রে পর্যুদস্ত, বিশ্বের গণতান্ত্রিক জনমত ও নিজের দেশের জনগণের বিক্ষোভের মুখে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৬৮ সালে বাধ্য হয়ে আলোচনার টেবিলে বসে চুক্তি করতে। ভিয়েতনামের প্রতিটি মানুষের রক্তে বইছে কমরেড হো চি মিনের শেষ নির্দেশ: "স্বাধীনতা এবং মুক্তির চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই।" মার্কিনীরাও এটা অনুভব করেছিল। তাই ১৯৭৩ সালে ২৭শে জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সূচিত হয় ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় সাফল্য।

দুর্দমনীয় বিপ্লবী শক্তির উৎস কি?

ভিয়েতনামের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের বিজয় এবং দেশের মাটিতে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা বিশ্বের দেশে দেশে মুক্তি সংগ্রাম ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ছোট এবং অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর একটি দেশ ভিয়েতনাম। যুগ যুগ ধরে বিদেশী শক্তির আক্রমণ, দেশীয় জমিদার ও সামন্ত প্রভুদের শোষণ, সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণ-শাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এখানকার মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে দেশের স্বাধীনতা ও দেশবাসীর মুক্তি ছিনিয়ে আনতে। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের খলনায়ক মার্কিনীদের বিরুদ্ধে এবং তারও আগে ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছে। অনেক রক্ত অনেক জীবন তাঁদের দিতে হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদীদের ধ্বংসলীলার শিকার হয়ে দেশটা পৌঁছে গিয়েছিল ধ্বংসের প্রায় শেষসীমায়। তবুও সর্বগ্রাসী এই আক্রমণের কাছ মাথা নত করেনি ভিয়েতনাম। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছে। মার্কিনীদের বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত ও পরাস্ত করে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ধ্বংসের মধ্যে গড়ে তুলেছে নতুন সমাজ, সমাজতান্ত্রিক সমাজ।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে ভিয়েতনামের জনগণের এই দুর্দমনীয় বিপ্লবী শক্তির উৎস কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় পাওয়া যাবে না। এর উত্তর নিহিত আছে ভিয়েতনামের মানুষের অর্ধ শতাব্দীকালের সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায় পাতায়। কমরেড হো চি মিনের নেতৃত্বে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সঠিক প্রয়োগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে বিপ্লবী কর্মসূচী ও আদর্শ, জনগণের ঐক্য, জনযুদ্ধের রণকৌশল আর বিশ্বের শান্তি ও মুক্তিকামী জনগণের সংহতিই ভিয়েতনামের জনগণের শক্তির প্রধান উৎস। কমরেড হো চি মিনের নেতৃত্বে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক আদর্শে গঠিত ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টির সঠিক ও স্বাধীন কর্মসূচী নিয়ে পরিচালনা করেছে বিপ্লবী সংগ্রাম। মার্কসবাদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির আলোকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণের সাথে সাথে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে এক সূত্রে গেঁথেছে। মার্কসবাদ তাদের শিখিয়েছে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের উর্ধে বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের সাথী হতে।

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টির সঠিক বিশ্লেষণ এবং সংগ্রামে সঠিক বিপ্লবী লাইন-ই তাদের বিজয়ের অন্যতম গ্যারান্টি। মার্কসবাদের প্রতি অবিচল আস্থা যেকোন পরিস্থিতির সঠিক বিশ্লেষণের শক্তি জুগিয়েছে। মার্কিন শত্রুদের চরিত্র চিহ্নিত করে প্রতি পদক্ষেপে সঠিক রণকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এটাই বিজয়ের সোপান। সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে লে দুয়ান বলেছেন: "শান্তিকে রক্ষন করার জন্য আমরা অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ হানব এবং এই আক্রমণ চালিয়েই একমাত্র শান্তিকে অর্জন করতে পারি।..... সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র পরিবর্তিত হয় নি। এই বিশ্বাসের উপরও এই নীতি দাঁড়িয়ে আছে। সাম্রাজ্যবাদ যত দুর্বল হবে তার হিংসার প্রবণতা তত বাড়বে। যুদ্ধই সাম্রাজ্যবাদের প্রধান নীতি। যেহেতু তারা যুদ্ধবাজ এবং শান্তি চায় না সেজন্য তাদের খানিকটা ছাড় দিয়ে দিয়ে শান্তি খোঁজা অথবা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তি রক্ষণকেই প্রধান উপায় বলে মনে করা কারো উচিত নয়। যদিও শান্তির জন্য সংগ্রামে আলাপ আলোচনার প্রয়োজন আছে। তথাপি সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে তৎপরতা চালিয়ে তাকে ব্যর্থ করে দেওয়াই একান্ত প্রয়োজন। যুদ্ধ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির অনিবার্য ফল। কেবলমাত্র শক্তির সাহায্যেই একে ধ্বংস করে আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এ শক্তি অনিবার্যভাবেই জনগণের শক্তি। সমাজতান্ত্রিক শিবির, সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিক ও মেহনতী মানুষ এবং দুনিয়ার দেশে দেশে শোষিত মানুষ-এই তিন শক্তিই হচ্ছে মূল ও প্রধান শক্তি।" 

পার্টিকে সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী লাইনে অবিচল রাখা প্রসঙ্গে লে দুয়ান বলেছেন: "আমাদের অবশ্যই আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে কারণ এটি হচ্ছে বিপ্লবী সংগ্রামের ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতিকারক। একবার যদি সে আমাদের পার্টির মধ্যে অনুপ্রবেশ করে, তাহলে আমাদের পার্টিকে ও জনগণের বিপ্লবী চেতনাকে কুরে কুরে খেয়ে নেবে। আমাদের শত্রুশ্রেণিগুলির সুযোগ্য দালাল হিসেবে সে কাজ করবে এবং প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদের দোসরে পরিণত হবে। যতই আমরা সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃণা করব ততই আমরা ঘৃণা করব সংশোধনবাদকে।"

ভিয়েতনামের মানুষ ভুলে যান নি কমরেড হো চি মিনের নির্দেশ ও সতর্কবাণী বরং অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। কমরেড হো চি মিন বলেছিলেন: "আমাদের পার্টি দক্ষতার সঙ্গে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে আমাদের দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলাতে পেরেছে বলে আমরা অনেক সাফল্য অর্জন করেছি।..... বর্তমানে সমাজতন্ত্র তৈরি করতে গিয়ে যদিও ধাত্রীসুলভ দেশগুলির সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রয়েছে, তথাপি আমরা সেগুলিকে যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করতে পারি না। কারণ আমাদের দেশের রয়েছে নিজস্ব বিশেষ বৈশিষ্ট্য। নিজের দেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলিকে অগ্রাহ্য করা এবং কেবলমাত্র ভ্রাতৃসুলভদেশগুলির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া মারাত্মক ভুল এবং একে আমরা বলতে পারি মতান্ধতা। অপরদিকে নিজের দেশের বৈশিষ্ট্যগুলির উপরই অযৌক্তিক গুরুত্ব আরোপ করে ভ্রাতৃসুলভ দেশগুলির মহান ও মৌলিক অভিজ্ঞতার বিশ্বব্যাপী তাৎপর্যকে বাতিল করাও মারাত্মক সংশোধনবাদী বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দেবে। আমাদের মতান্ধতাকেও জয়যুক্ত করতে হবে এবং সংশোধনবাদের থেকেও মুক্ত থাকতে হবে।"


মার্কসবাদ-লেনিনবাদই ভিয়েতনামের জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের মূলমন্ত্র। দেশের পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার নিরিখে তারা মার্কসবাদের মূল সূত্রগুলি প্রয়োগ করেছে। মার্কসবাদের আদর্শে বিশ্লেষণ করেছে বিশ্ব দুনিয়াকে। শত্রু ও মিত্রকে চিহ্নিত করেছে সঠিকভাবে এবং সঠিকভাবেই মিত্র শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে ও শত্রুর বিরুদ্ধে আঘাতের পর আঘাত হেনেছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করতে হলে সঠিক বিপ্লবী লাইনই যথেষ্ট ছিল না। তার সঙ্গে জরুরী প্রয়োজন ছিল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শে জনগণের বিপ্লবী চেতনার বিকাশ ঘটানো, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে দেশের সমস্ত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা ও শামিল করা। বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ ভিয়েতনামের সমস্ত জনগণের ঐক্যই হলো এই সংগ্রামের প্রধান শক্তি, যা শুধু সব আঘাতকে প্রতিহত করেনি, পাল্টা প্রত্যাঘাতও করেছে। কমরেড হো চি মিনের নেতৃত্বে গঠিত ও তাঁরই নির্দেশিত পথে পরিচালিত ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টি দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল। ঐক্যের ঐতিহ্য ভিয়েতনামে অতীতেও ছিল। কিন্তু সব ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিয়ে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে ওঠে। দক্ষিণ ভিয়েতনামে জাতীয় মুক্তিফ্রন্টই এই ঐক্যের প্রতীক। গোটা দেশ লৌহদৃঢ় মানসিকতা নিয়ে এই ফ্রন্টে শামিল হয়। সব বিভেদের বাধা অতিক্রম করে গ্রামে-শহরে-বন্দরে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষ, বুদ্ধিজীবী, শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় সম্প্রদায়, যুবক-যুবতী ছাত্র-ছাত্রী, জ্ঞানী-গুনী, অফিসার-সৈনিক সকলেই যোগ দিয়েছে এই মুক্তিফ্রন্টে। এই মুক্তিফ্রন্টের অভাবনীয় ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে ভেঙে পড়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ইমারত।

জনযুদ্ধের রণকৌশল ভিয়েতনামের জয়ের আর এক বলিষ্ঠ হাতিয়ার। এই হাতিয়ারই একটি ছোট্ট দেশকে সীমিত সামরিক ও জনশক্তি নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করেছে। ১৯৩০ সালে পার্টির জন্মের সময় থেকেই বিপ্লবী কর্মসূচীর সার্থক প্রয়োগ হয় জনযুদ্ধের বিকাশের মধ্য দিয়ে। পদে পদে প্রতিবিপ্লবী শক্তির ঘৃণ্য আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে পার্টিকে। তাই গোড়া থেকেই ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছে শ্রমিক-কৃষক আত্মরক্ষাবাহিনী, শ্রমিক-কৃষকের সৈন্যবাহিনী এবং শ্রমিক-কৃষকের আত্মরক্ষা বাহিনীর লালফৌজ। বিপ্লবী বীর যোদ্ধা জেনারেল ভো নগুয়েন গিয়াপ এই প্রসঙ্গে বলেছেন: "বর্তমান দুনিয়ায় সামরিক ক্ষেত্রে অ্যাটম বোমার চেয়েও যদিও অন্য একটি বিষয় আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে থাকে তা হলো জনযুদ্ধ। এই জনযুদ্ধের ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের জনগণ সার্থকভাবেই তাদের অবদান রেখেছে, এই অস্ত্রকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং শক্ত মুঠিতে তারা এই অস্ত্রকে হাতে ধরে আছে।"

এই জনযুদ্ধের শক্তি একদিনে গড়ে ওঠে নি বা বাইরে থেকে আমদানিও করা হয় নি। এই শক্তির উত্থান ও বিকাশ ঘটেছে ভিয়েতনামের মাটিতেই। ভিয়েতনামের জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রামের ক্রমবিকাশের মধ্যেই জনযুদ্ধের শক্তি গড়ে উঠেছে। বস্তুত দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং একে অপরকে সাহায্য করতে থাকে। রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত থেকেই গেরিলা যুদ্ধ ও সীমাবদ্ধ যুদ্ধের সূত্রপাত। গ্রামাঞ্চলে বিচ্ছিন্ন ও পরিকল্পিত কৃষক অভ্যুত্থান, 'স্ট্র্যাটেজিক হ্যামলেটের' বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর মধ্য দিয়েই জনযুদ্ধের বিকাশ ঘটেছে। জেনারেল গিয়াপ আরও বলেছেন: "আমরা যদি পরিষ্কারভাবে না বুঝতে পারতাম যে, শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, যুদ্ধক্ষেত্রের মৌলিক বিষয়ে আমরাই শক্তিশালী তাহলে আমাদের রণনীতি সার্থকভাবে চালিয়ে যেতে পারতাম না। আমরা যদি ভিয়েতনামের বাস্তব পরিস্থিতি, আমাদের জনগণের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন না করতাম, যদি যন্ত্রের মত প্রতিষ্ঠিত সূত্র ধরেই এগোতাম অথবা অন্যদেশের পদ্ধতি বাদ-বিচার না করেই প্রয়োগ করতাম, তাবে আমরা আমাদের সমস্যারও সমাধান করতে পারতাম না এবং বিপ্লবের পক্ষে অনেক ক্ষতিও করে ফেলতাম।"

ভিয়েতনামের বিজয়ে জনগণের বিপ্লবী মানসিকতায় অতিরিক্ত শক্তির জোগান দিয়েছে বিশ্বজনমতের সংহতি। সমাজতান্ত্রিক দেশের জনগণ, পুঁজিবাদী দেশের শ্রমিকশ্রেণি ও মেহনতী জনগণ বিশ্বের শান্তি ও মুক্তিকামী জনগণ, এমন কি মার্কিন দেশের জনগণ এই সংগ্রামে ভিয়েতনামের জনগণের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিশ্ব জনমতের এই সমর্থনই ভিয়েতনামের জয়কে ত্বরান্বিত করেছে। তাই এই জয় বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণের জয়; তাদের আগামী দিনের বিপ্লবী সংগ্রামের প্রেরণার উৎস, অভিজ্ঞতার সম্পদ ভান্ডার। 

(১৯৭৫ সালের ৩০শে এপ্রিল দক্ষিণ ভিয়েতনাম মুক্ত হয়। ১৯৭৬ সালে বিশ্বব্যাপী ভিয়েতনামের জনগণের সংহতিতে কর্মসূচী পালিত হয়। দেশে দেশে ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের তাৎপর্য পর্যালোচিত হয়। সেই সময় ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের নানা গৌরবজনক দিকের যে পর্যালোচনা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য করেছিলেন। এটি তারই সংক্ষিপ্তসার – সম্পাদক গণশক্তি) 

লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে গণশক্তির হো চি মিন জন্মশতবার্ষিকী সংখ্যায়। 


প্রকাশের তারিখ: ১৯-মে-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৯ টি নিবন্ধ
১৯-মে-২০২৬

০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫