সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভারতের স্বাধীনতাই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান
লক্ষ্মী সায়গল
তিনি বললেন, বিজয়ীর বেশে যদি নাও পারি, পরাজিতর বেশেই দেশে ঢুকতে হবে যাতে দেশবাসী বুঝতে পারেন কেন এবং কিসের জন্য তাঁরা লড়াই করেছেন। নেতাজি নিশ্চিত ছিলেন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় সৈনিকরা যখন জানবেন ভাড়াটে সেনা হিসেবে নয়, দেশের স্বাধীনতা অর্জনে বিপ্লবী সেনা হিসেবেই আইএনএ'র জওয়ানদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ, তখন ভারতীয় সেনারা প্রভাবিত না হয়ে থাকতে পারবেন না। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশদের এটা বুঝতে আদৌ দেরি হয়নি যে, এরপর তাঁরা কখনোই আর ভারতীয় সেনাদের আনুগত্যের ওপর নির্ভর করতে পারবে না।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্রের চূড়ান্ত সংগ্রামের সঙ্গে আমার সংযোগ ছিল নিবিড়। আমি এখানে নেতাজির এমন কিছু ভূমিকাকে তুলে ধরব যেটা আমাদের কমরেডদের মন থেকে তাঁর সম্পর্কে এখনও কিছু ভুল ধারণা থেকে থাকলে পরিষ্কার করে দেবে। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সামরিক প্রশাসন আমাকে বার্মা থেকে দেশে ফিরিয়ে দেয়। আমার স্থির সিদ্ধান্ত ছিল আমি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকেই সমর্থন ও শক্তিশালী করতে চাই। আমি পার্টির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা কিন্তু আমাকে বলেন, তাঁরা আই এন এ'র কাউকে নেবেন না, কারণ সুভাষচন্দ্র বসুকে তাঁরা ফ্যাসিস্ত বলে মনে করেন। তাঁর নেতৃত্বে যে সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে তা ছিল গণতন্ত্র-বিরোধী।
সৌভাগ্যবশত, ১৯৬৪ সালে পার্টি ভাগ হবার পরে সি পি আই (এম) নেতাজি সম্পর্কে তাঁদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে। পার্টি উপলবদ্ধি করে যে, যাবতীয় মতাদর্শের ঊর্ধ্বে সুভাষচন্দ্রের কাছে প্রথম ও প্রধান বিষয় ছিল জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন। ঐ লক্ষ্য অর্জনে নেতাজির আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার মধ্যে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না। একটা কথা মনে রাখতে হবে, নেতাজি প্রথমেই যান রাশিয়াতে। সেখানে তিনি স্তালিনের সাহায্য পাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু সে-সময় যুদ্ধ একটা সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছিল। স্তালিন যে কোনো মুহূর্তে হিটলার বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা করছিলেন। তাঁর পক্ষে নেতাজির সঙ্গে দেখা করা বা সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেখান থেকে নেতাজি যান ইতালিতে। কিন্তু মরুযুদ্ধে ইতালির বিপর্যয়ের কারণ সেখানেও কোনো সাহায্য পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত জার্মানির কাছে হাত পাতা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। এর আগেই জার্মানির বিদেশ দপ্তরের লোকজনের সঙ্গে নেতাজির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। জার্মানিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের সঙ্গেও একই রকম সম্পর্ক ছিল। তিনি সাহায্যের আশ্বাস পেলেন। প্রথমে, ভারতের উদ্দেশ্যে প্রচারের জন্য নেতাজিকে জার্মান বেতারে ভাষণ দেবার সুযোগ দেওয়া হয়। জার্মানিতে তখন বেশ কিছু ভারতীয় যুদ্ধবন্দি হিসাবে ছিলেন।
নেতাজির সাথে
জেনারেল রোমেল তাঁদের বন্দি করেছিলেন। নেতাজিকে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করতেও সুযোগ দেওয়া হয়। সেই যুদ্ধবন্দিদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত হয় স্বাধীন ভারত বাহিনী। তাঁদের মধ্যে কোনো অফিসার না থাকায় জার্মান অফিসাররাই তাঁদের প্রশিক্ষণ দেন। অবশ্য ঐ অফিসাররা হিটলারের চেয়ে নেতাজিরই বেশি অনুগত ছিলেন। নেতাজি বেশ কয়েকবার হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কিন্তু কখনোই তিনি হীনমন্যতায় ভোগেননি। বরং তিনি হিটলারকে স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, হিটলারের নীতি এবং বিশেষ করে ইহুদিদের ও অধিকৃত এলাকার মানুষদের প্রতি তাঁর আচরণ নেতাজি মোটেই সমর্থন করেন না। হিটলারের সঙ্গে নেতাজির আলোচনার দলিলপত্র জার্মান বিদেশ দপ্তরে রাখা আছে। ভারত স্বাধীন হবার পর আমরা জার্মানি থেকে ঐ সব দলিলপত্র নিয়ে আসার জন্য ভারত সরকারকে বলি। ঐ সব দলিলপত্র থেকেই ভারতের মানুষ জানতে পারতেন যে, নেতাজি প্রকৃতপক্ষে নাৎসিবাদের বিরোধীই ছিলেন। কিন্তু সে সব কাগজপত্র আনাই হয়নি। ১৯৪২ সালের জুন মাসে হিটলার যখন রাশিয়া আক্রমণ করল তখন নেতাজি তার নিন্দা করলেন এবং জার্মানির পরাজয় অনিবার্য বলে ভবিষ্যদ্বাণীও করলেন। সিঙ্গাপুরের পতনের পর জাপানিরা বার্মায় প্রবেশ করে। ক্যাপ্টেন (জেনারেল) মোহন সিংয়ের নেতৃত্বে আই এন এ গঠিত হয়। নেতাজি বুঝতে পারলেন জার্মানিতে বসে বসে অযথা সময় নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, তাঁকে অবিলম্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে পাঠাবার ব্যবস্থা করা হোক।
সৌভাগ্যবশত, জার্মানিতে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে রাসবিহারী বসুও এই গুরুত্ব অনুধাবন করলেন। হিটলার কিন্তু রাজি ছিল না কারণ সে চেয়েছিল নেতাজিকে প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে। কিন্তু নেতাজিও নাছোড়বান্দা। সমস্ত বিপদ অগ্রাহ্য করে তিনি একটি জার্মান ডুবোজাহাজে চেপে আফ্রিকার দক্ষিণে হাজির হলেন এবং সেখান থেকে একটি জাপানি ডুবোজাহাজে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। আই এন এ'র দায়িত্ব তুলে নেবার আগে তিনি গেলেন টোকিও-তে প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তোজোর সঙ্গে দেখা করে সাহায্যের আশ্বাস আদায় করতে। জেনারেল তোজো নেতাজির আন্তরিকতা ও সাহস দেখে চমকিত হন এবং নেতাজির সকল প্রস্তাব মেনে নেন। আই এন এ হবে স্বাধীন মিত্রবাহিনী এবং ভারতে প্রবেশ করার পর আর জাপানিদের অগ্রসর হতে দেওয়া হবে না। নেতাজির সব পরিকল্পনাই খেটে গেল। খাটল না শুধু তাঁর নিজের দেশবাসীর সমর্থন পাবার ব্যাপারটা। ব্রিটিশ সরকার অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে আই এন এ সংক্রান্ত যাবতীয় সংবাদ চাপা দিয়ে দিল। এমনকি, তখনকার যুদ্ধকে জনযুদ্ধ আখ্যা দিয়ে বামপন্থীরাও ব্রিটিশের সঙ্গে সহযোগিতাই করছিলেন। আই এন এ যাঁদের ভারতে পাঠিয়েছিল সেইসব দুঃসাহসী যুবকদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো। ব্রিটিশরা তাঁদের অনেককে ফাঁসিকাঠে ঝোলালো। অনেকে জেলে পচতে থাকলেন।
এমনকি, জাপানিরা হারছে জেনেও নেতাজি আই এন এ'র সৈনিকদের লড়াই চালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকলেন। তিনি বললেন, বিজয়ীর বেশে যদি নাও পারি, পরাজিতর বেশেই দেশে ঢুকতে হবে যাতে দেশবাসী বুঝতে পারেন কেন এবং কিসের জন্য তাঁরা লড়াই করেছেন। নেতাজি নিশ্চিত ছিলেন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় সৈনিকরা যখন জানবেন ভাড়াটে সেনা হিসেবে নয়, দেশের স্বাধীনতা অর্জনে বিপ্লবী সেনা হিসেবেই আই এন এ'র জওয়ানদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ, তখন ভারতীয় সেনারা প্রভাবিত না হয়ে থাকতে পারবেন না। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশদের এটা বুঝতে আদৌ দেরি হয়নি যে, এরপর তাঁরা কখনোই আর ভারতীয় সেনাদের আনুগত্যের ওপর নির্ভর করতে পারবে না। ভারতীয় নৌবাহিনীতে এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে বিদ্রোহ এই সত্যই প্রমাণ করে। এরপরই ব্রিটিশরা ভারতকে স্বাধীনতা দানের সিদ্ধান্ত নেয়, অবশ্য তার আগে ভারতীয় উপমহাদেশকে খণ্ডিত করে। এই আশঙ্কাটা নেতাজি আগেই করেছিলেন এবং সম্ভাব্য বিপর্যয় সম্পর্কে হিন্দু এবং মুসলিম নেতাদের সতর্কিতও করেছিলেন। আই এন এ'র সাহায্যে তিনি প্রমাণ করে দেন যে, সমস্ত ধর্ম ও জাতির সমান অধিকার স্বীকার করে নেবার মাধ্যমেই ধর্ম ও জাতপাতের বিভেদ অতিক্রম করা সম্ভব। সময়সীমা বেঁধে দিয়ে মহিলা, সংখ্যালঘু এবং দুর্বল অংশকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে এবং তারপর তাঁদের মূল স্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেতাজির ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিন বৃহৎশক্তিতে পরিণত হবে এবং রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটবে। নেতাজি মনে করতেন এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলিকে জোট বাঁধতে হবে এবং ভারতকে সেখানে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বা মার্কিন বাহিনীর হাতে ধরা পড়াটা এড়াবার জন্য তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি কারণ সোভিয়েত তখন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
নেতাজির মৃত্যুকে ঘিরে জমে থাকা রহস্য উদঘাটন করার সময় হয়েছে। একমাত্র ইতিবাচক প্রমাণ বলতে জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রাখা নেতাজির ভস্মাধার যার প্রতি জাপানিরা এবং জাপান সফররত ভারতীয়রা সকলেই গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকেন। নেতাজির মৃত্যু নিয়ে বাকি সমস্ত কাহিনিগুলি নিছক কল্পনা মাত্র, কোনো বাস্তব প্রমাণ কিছু নেই। নেতাজির ঐ ভস্মাধারটি ভারতে নিয়ে এসে লালকেল্লায় স্থাপন করা উচিত।
প্রকাশের তারিখ: ২৩-জানুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
