Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক শিক্ষার সামনে বিপদ

কে এন পানিক্কর
সঙ্ঘ পরিবার যে দ্রুততার সাথে শিক্ষার বিষয়গত পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হয়েছে তা আরও উদ্বেগের। বহু ত্রুটি বিচ্যুতি সত্ত্বেও গত পঞ্চাশ বছর ধরে এদেশে যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা টিকে ছিল সঙ্ঘ পরিবার সাম্প্রদায়িক রঙে রাঙিয়ে সেই ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে উদ্যত। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান ও দিল্লির সরকারগুলি একটি হিন্দু পাঠক্রম চালু করার তাগিদে বিশেষ করে ইতিহাস ও সাহিত্যের পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন এনেছে। ওইসব পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে শিশুমনে সাম্প্রদায়িক ভাবের সঞ্চার ঘটাবার চেষ্টা হয়েছে। এন সি ই আর টি নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির মতে এর প্রত্যেকটি বই নিশ্চিতভাবে ক্ষতিকারক।
dhormoniropekhho gonotantrik shikhar samne bipod

সদ্য প্রয়াত হয়েছেন মার্কসবাদী ঐতিহাসিক কে এন পানিক্কর। অধ্যাপক পানিক্কর দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। মার্কসবাদী পথ পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। তাঁরই একটি লেখা আমরা আবার প্রকাশ করছি। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৯ সালের মে সংখ্যায়। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া বাতুলতা। তবুও উল্লেখ্য, সে-সময় থেকেই ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার গৈরিকীকরণের প্রক্রিয়ার সরকারি প্রচেষ্টার শুরুয়াৎ। লেখাটি প্রকাশের কিছুদিন আগেই পতন হয়েছে ১৩ মাসের বাজপেয়ী সরকারের এবং লেখাটি প্রকাশের কয়েকমাস পরে আবারও গঠন হবে বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন আরএসএস নিয়ন্ত্রিত বিজেপি সরকারের। সেই প্রেক্ষাপটটি মনে রাখা জরুরি। এবং আজও, লেখাটি অপ্রাসঙ্গিক নয় একেবারেই।
— মার্কসবাদী পথ

ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠনে শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণের গুরুত্ব সর্বজনস্বীকৃত। শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণের মর্মকথা নিয়ে যদিও বিস্তর মতপার্থক্য আছে। একটি মতানুসারে শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ আর সার্বজনিক শিক্ষা এক ও অভিন্ন। এই মতের সীমাবদ্ধতার কথা বলাই বাহুল্য। শিক্ষাকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক করে তুলতে হলে তার কাঠামো ও বিষয়বস্তু উভয় নিয়েই চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। কেবলমাত্র শিক্ষার অধিকার সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা পঞ্চাশ বছর ধরে কায়েম থাকার পরও শিক্ষার ক্ষেত্রে এমন সর্বাঙ্গীণ চিন্তাভাবনার অভাব তত্ত্ব ও প্রয়োগ উভয়ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম আবশ্যিক দিক ধর্মনিরপেক্ষতা। উদ্বেগের বিষয় এই যে, সাম্প্রতিককালে সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের হেতু সেই দিকটির ওপরও চরম আঘাত আসছে। 

শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শিক্ষা রাষ্ট্রের হাতে একটি অন্যতম আদর্শগত হাতিয়ার। সুতরাং সে অবস্থায় শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণের আন্দোলন বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অঙ্গ। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব গণতন্ত্রীকরণের পক্ষে একান্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু এ ধরনের প্রতিনিধিত্ব বারেবারেই বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। তার অন্যতম কারণ এই যে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ শ্রেণিস্বার্থ থেকে ভিন্ন বা তার ঊর্ধ্বে নয়। একমাত্র স্বাধিকারই গণতান্ত্রিকতা সুনিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকারই এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। প্রধানত: প্রতিষ্ঠানগুলির সদস্যদের স্বাধিকার থাকা জরুরি। অর্থাৎ জ্ঞানচর্চার জন্য একটি স্বশাসিত ক্ষেত্র রচিত হওয়া দরকার যেখানে উদ্ভাবনী ক্রিয়া ও সৃজনশীলতা জায়গা করে নিতে পারে। 

স্বাধীন ভারতে শিক্ষার সংস্কারকে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করতে হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার ভিন দেশীয় ও অতি সংকীর্ণ চরিত্র সম্বন্ধে সংস্কারকরা বরাবরই সচেতন ছিলেন। বস্তুত শিক্ষা সংক্রান্ত সবকটি রিপোর্টই ওই ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু মূলত দু'টি কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রথম কারণটি হলো এই যে এলিট সম্প্রদায় এখনো রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার শীর্ষে। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিকভাবে ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি ঘটে থাকলেও মানসিক মুক্তি এখনো অনেকেরই ঘটেনি। ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা ঔপনিবেশিক মননের আবর্ত থেকে আজও বেরিয়ে আসতে পারেননি বলেই তাঁরা অতি সহজে নয়া ঔপনিবেশিক তত্ত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার শিকার হন। কাজেই শিক্ষার উপাদানে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনার উপযুক্ত বুদ্ধিজীবী নেতৃত্বের অভাব দূর করা যায়নি। 

গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য তিনটি বিষয় জরুরি : শিক্ষার অধিকার, স্বাধিকার ও যোগ্য নেতৃত্ব। এই তিনটির ওপর নির্ভর করে একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ। দু'টি নির্দিষ্ট দিক থেকে আজ আক্রান্ত - সাম্প্রদায়িকতা ও বিশ্বায়ন। 

ভারতীয় জনগোষ্ঠী ও তার সাংস্কৃতিক চরিত্রের কথা স্মরণে রেখে একথা বলা যায় যে, এখানে একটি গণতান্ত্রিক ও জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক। ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সামান্য বিচ্যুতি এই সাধারণতন্ত্রের পক্ষে ভয়ঙ্কর অমঙ্গলের কারণ হতে পারে। সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক শক্তি যে শিক্ষার গৈরিকীকরণে প্রয়াসী হয়েছে তা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সমাজের সামনে একটি বড় বিপদ। 

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তার সূচনাকাল থেকেই শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতি বিশেষ মনোযোগী। শারীরশিক্ষা দান ও আদর্শগত প্রচারের সাহায্যে কমবয়সীদের মধ্য থেকে কর্মী তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়ে তারা চলে। 'We and Our Students' নামক একটি রচনায় এম. এস. গোলওয়ালকর শিক্ষা বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছেন। গোলওয়ালকর এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রস্তাব করেছেন যার চরিত্র হবে মূলত ধৰ্মীয়। এই শিক্ষাক্রম ঐতিহ্য, নিয়মানুবর্তিতা ও সামরিক শিক্ষার ওপর জোর দেবে। দু'টি উপায়ে আর.এস.এস এই কাজে অগ্রসর হয়েছে- প্রথমত, বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অনুপ্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত, নিজেদের বিদ্যালয় স্থাপন করে।

গত দু'দশকে সঙ্ঘ পরিবার একাজে বহুদূর অবধি অগ্রসর হয়েছে। কয়েকটি রাজ্য ও কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসীন হওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়ন্ত্রণ করা ও হিন্দুত্বের সাথে সঙ্গতি রেখে পাঠক্রম পরিবর্তন করার সুযোগ তাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থানে বি জে পি ক্ষমতাসীন হয়ে সেখানে সব স্কুল ও কলেজে তাদের নিজেদের কর্মী নিয়োগ করার চেষ্টা করেছে। সম্প্রতি মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী মূরলী মনোহর যোশী দেশের বিভিন্ন গবেষণাকেন্দ্রগুলির পরিচালন সমিতিতে গৈরিক বসনধারী বুদ্ধিজীবীদের নিয়োগ করেছেন সব প্রচলিত নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে। দিও ওই বুদ্ধিজীবীরা খুব বেশিদিন ও পথের পথিক নন। 

সঙ্ঘ পরিবার যে দ্রুততার সাথে শিক্ষার বিষয়গত পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হয়েছে তা আরও উদ্বেগের। বহু ত্রুটি বিচ্যুতি সত্ত্বেও গত পঞ্চাশ বছর ধরে এদেশে যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা টিকে ছিল সঙ্ঘ পরিবার সাম্প্রদায়িক রঙে রাঙিয়ে সেই ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে উদ্যত। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান ও দিল্লির সরকারগুলি একটি হিন্দু পাঠক্রম চালু করার তাগিদে বিশেষ করে ইতিহাস ও সাহিত্যের পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন এনেছে। ওইসব পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে শিশুমনে সাম্প্রদায়িক ভাবের সঞ্চার ঘটাবার চেষ্টা হয়েছে। এন সি ই আর টি নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির মতে এর প্রত্যেকটি বই নিশ্চিতভাবে ক্ষতিকারক। উত্তর প্রদেশের গণিত বইতে বৈদিক গণিত অঙ্গীভূত করা হয়েছে। এর সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ কমিটির মন্তব্য এইরকম : “কমিটি বিষয়টি পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, এর মাধ্যমে গণিত বিদ্যার ইতিহাস সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হবে এবং জ্ঞানের এই মৌলিক শাখাটিতে ভারতের অবদান সম্বন্ধেও সঠিক ধারণা তৈরি হবে না। কেবল তাই নয় এর দ্বারা ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি বিষয়ে সঙ্কীর্ণ ধারণাও তৈরি হবে যা ভারতে বিজ্ঞানের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।” 

যেহেতু ইতিহাসকে ব্যবহার করে হিন্দুদের একটি জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে মুসলমান, খ্রিস্টানদের জাতীয়তাবিরোধী প্রমাণ করার অপচেষ্টা করা সম্ভব তাই ইতিহাস গ্রন্থগুলির প্রতি সবিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে বিন্দুমাত্র সঙ্গতি না রেখে ভারতের অতীতকে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে কোনো নতুন ব্যাখ্যা উপস্থিত করা হয়নি, কেবল প্রচুর ভুল ঐতিহাসিক তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। যেমন, বলা হয়েছে যে আর্যরা ভারতে আদিবাসিন্দা। আরও বলা হয়েছে যে, ভারতের সভ্যতা সংস্কৃতি আর্যদের হাতেই গড়ে উঠেছে এবং প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিই প্রকৃত ভারতীয় সংস্কৃতি যা নাকি অন্য যে কোনো সভ্যতা অপেক্ষা অধিকতর উন্নত। শুধু তাই নয়, এও বলা হয়েছে যে, বিজ্ঞান-গণিত ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় প্রাচীন ভারতের যে অবদান তাকে আজ অবধি অন্য কোনো সভ্যতা অতিক্রম করতে পারেনি।

যা রাজস্থান, দিল্লি ও মধ্যপ্রদেশে বি জে পি সরকারগুলি আঞ্চলিক স্তরে করতে সচেষ্ট হয়েছিল তাই কেন্দ্রের বি জে পি সরকার জাতীয় স্তরে করতে প্রয়াসী। আর.এস.এস'র শিক্ষা সেল বিদ্যাভারতীর কিছু বিশেষজ্ঞ দ্বারা প্রস্তুত একটি শিক্ষা বিষয়ক প্রস্তাব মূরলী মনোহর যোশী ১৯৯৮ সালে অনুষ্ঠিত রাজ্য শিক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে পেশ করেন। ঐ প্রস্তাবের কতগুলি উল্লেখযোগ্য সুপারিশ উল্লেখ করা হলো

প্রাথমিক থেকে শিক্ষার উচ্চতম স্তর অবধি পাঠক্রমকে জাতীয়, ভারতীয় ও আধ্যাত্মিক হতে হবে। ভারতীয় সংস্কৃতির মৌলিক দিকগুলি শিক্ষার সমস্ত স্তরে এবং সকল ক্ষেত্রে — এমন কি বৃত্তিমূলক শিক্ষাক্ষেত্রেরও পাঠক্রমে ১০-২৫ শতাংশ থাকতে হবে। 

ভারতীয় সমস্ত ভাষায় এবং জাতীয় ঐক্য ও প্রাচীন জ্ঞানে সংস্কৃত ভাষার বৈশিষ্টপূর্ণ অবদানের কথা স্মরণে রেখে তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি অবধি এই ভাষাকে আবশ্যিক করা উচিত। 

চরিত্র গঠন এবং বাঞ্ছিত জাতীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার স্বার্থে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত স্তরে নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রবর্তিত হওয়া উচিত। 

দেশের চারটি আঞ্চলিক ক্ষেত্রে সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা উচিত এবং সংস্কৃত বিষয়ক উল্লেখযোগ্য গবেষণাকে উৎসাহিত করা দরকার। 

সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই হিন্দুত্বকে একটি ধর্ম হিসেবে নয় বরং জীবনচর্যার একটি ধরন রূপে চিহ্নিত করেছে। এই ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে ওই বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিক থেকে শিক্ষার উচ্চতর স্তর অবধি পাঠক্রমে বেদ ও উপনিষদের মুখ্য দিকগুলি অন্তর্গত করার কথা বলেছে। এক্ষেত্রে বৃত্তিমুলক শিক্ষার শাখাকেও কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। 

যা কিছু জাতীয় তাই হিন্দু – এই কথাই ওপরের বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। সহজেই বোঝা যায় সঙ্ঘ পরিবার যখনই সম্ভব হবে তখনই একটি হিন্দু পাঠক্রম চালু করবে। বলাই বাহুল্য যে এভাবে তারা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে ও একটি প্রাচীনপন্থী ধর্মমূলক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করতে প্রয়াসী হবে। 

সঙ্ঘ পরিবার কেবল সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই কাজ করার চেষ্টা করছে তাই নয়। ১৯৪২ থেকে সঙ্ঘ পরিবার নিজস্ব জাল বিস্তারেও সদা সচেষ্ট। নিজেদের শিক্ষাসংক্রান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ ও প্রয়োগের স্বার্থে ১৯৭৮-এ বিদ্যাভারতী শিক্ষা সংস্থান নামের একটি সংগঠন তারা গড়ে তোলে। সংস্থানের দাবি অনুসারে ১৯৯২ সালেই ১,২০০,০০০ ছাত্র ও ৪০,০০০ শিক্ষক সম্বলিত ৬০০০ বিদ্যালয় দেশে চালু ছিল। বর্তমানে প্রায় ২০,০০০ বিদ্যালয় পঞ্চাশ লক্ষ ছাত্রকে 'শিক্ষা' দানে রত বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূরলীমনোহর যোশীর বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম এই বিদ্যালয়গুলিতে অনুসৃত হয়। 

হিন্দু ধর্ম বিষয়ে সচেতনতা ও অহংবোধ গড়ে তোলবার পক্ষে উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তক এই বিদ্যালয়গুলি ব্যবহার করে। এই উদ্দেশ্যে ভূগোল ও ইতিহাসকে ব্যবহার করা হয়। এই পাঠ্যবইগুলিতে ভারতের যে মানচিত্র আঁকা আছে তা 'অখণ্ড ভারতের'। তাতে পাকিস্তান, বাংলাদেশ তো বটেই, এমনকি নেপাল, ভুটান, তিব্বত ও মায়ানমারকেও ভারতের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। হিন্দুত্বের স্বার্থে অতি পরিচিত ভৌগোলিক নামগুলিকেও পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন, ভারত মহাসাগরের নাম দেওয়া হয়েছে হিন্দু মহাসাগর, আরবসাগরকে বলা হয়েছে সিন্ধুসাগর ও এইভাবে বঙ্গোপসাগরের নাম হয়েছে গঙ্গাসাগর।

এই বিদ্যালয়গুলিতে যে ইতিহাস বইগুলি পড়ান হয় সেগুলি সম্বন্ধে এন সি ই আর টি কমিটির বক্তব্য: “এই বইগুলিতে ঐতিহাসিক সত্যতা কমই আছে। বস্তুত ঐতিহাসিক সত্যতা লঙ্ঘনে এই বইগুলির সমকক্ষ খুব কম বই-ই হতে পারে। অত্যন্ত উস্কানিমূলক ভাষা ও ভঙ্গিতে এগুলি ভারতীয় ইতিহাসকে অত্যন্ত বিষ ছড়ানো 'দেশপ্রেমিক' দৃষ্টিভঙ্গিতে পেশ করেছে।” ভি.ডি. সাভারকারের Six Glorious Epochs of Indian History অনুসরণে এই বইগুলিতে ভারতের ইতিহাসকে বৈদেশিক আক্রমণের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। ঐতিহাসিক বাস্তবতার কোনো তোয়াক্কা না করে দেখানো হয়েছে যে, একের পর এক সংগ্রামের মাধ্যমে কিভাবে হিন্দুরা বৈদেশিক আক্রমণকে পরাস্ত করে দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। এদের দেওয়া মহম্মদ ঘোরীর ভারত আক্রমণের বর্ণনাকে উদাহরণ হিসেবে দেখান যেতে পারে : 'মহম্মদ ঘোরী লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে বিশ্বনাথ মন্দির ও ভগবান কৃষ্ণের জন্মস্থানকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। তিনি পৃথ্বীরাজকে গজনীতে নিয়ে যান, কিন্তু সেখানে গিয়ে মাত্র একটি তীরের আঘাতেই তিনি মহম্মদ ঘোরীকে হত্যা করতে সক্ষম হন। পৃথ্বীরাজের চরণতলে পড়ে থাকা ওই মৃতদেহ যেন তার নিজের পাপ কবুল করছিল।” এমনকি ঔপনিবেশিকতা-বিরুদ্ধে সংগ্রামকেও এখানে ইংরেজের বিরুদ্ধে হিন্দুদের সংগ্রামরূপে চিত্রিত করা হয়েছে।

রাম জন্মভূমি আন্দোলন চলার সময় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ 'অযোধ্যার রক্তরঞ্জিত ইতিহাস' নামে এক গ্রন্থ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে যে ১৫২৮ সাল থেকে হিন্দুরা ৭৮ বার রামমন্দির উদ্ধারে সচেষ্ট হয়েছে। উত্তরভারতে বহুল প্রচারিত এই কল্পকাহিনীটি এখন বিদ্যাভারতীর পরিচালনাধীন নানা পাঠ্যপুস্তকেও অন্তর্গত করা হয়েছে। 'সংস্কৃত জ্ঞান পরীক্ষা প্রশ্নোত্তরী' নামক গ্রন্থে বিষয়টি এইভাবে হাজির করা হয়েছে : 

১৫২৮ থেকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কতজন রামভক্ত রামমন্দির উদ্ধারের স্বার্থে প্রাণ দিয়েছে? তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার। বিদেশীরা কতবার শ্রীরাম জন্মভূমি আক্রমণ করেছে? সাতাত্তর বার। ১৯৯০-এর ৩০ অক্টোবর রাম জন্মভূমি মুক্ত করার কল্পে যে সংগ্রাম সংগঠিত হয় তা ঐ লক্ষ্যে সংগঠিত কততম সংগ্রাম ? 

৭৮ তম সংগ্রাম। 

এই প্রশ্নোত্তরগুলি ছাত্রদের মুখস্থ করার কথা। 

সঙ্ঘ পরিবার একটি বিকল্প শিক্ষাপ্রকল্প চালু করতে চায়। সংবিধানের ২৯ ও ৩০ ধারা অনুসারে সংখ্যালঘুরা যে অধিকার ভোগ করে তা অন্য সবাইকে দিতে চাওয়ার মধ্যদিয়ে মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী আসলে ঐ প্রকল্পকে সহায়তা করার চেষ্টা করছেন। বহুসংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খ্রীষ্টানরা পরিচালনা করে বলেই তাদের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। 

কয়েকটি ইসলামী সংগঠনের পরিচালনাধীন বিদ্যালয়গুলিতেও একইরকম সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সম্বলিত ইতিহাস ও সমাজ বিষয়ক পাঠ দেওয়া হয়। দিল্লির হারকাজী হকতবা ইসলামী দ্বারা প্রকাশিত পাঠ্যবইগুলিই এর উদাহরণ। এই বইগুলি উত্তরপ্রদেশের কতগুলি বিদ্যালয় পড়ানো হয়। সঙ্ঘ পরিবারের পাঠ্য বইগুলির মত এই বইগুলিতেও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। এন সি ই আর টি কমিটির মতে “যে কোনো বিষয়েই এই বইগুলিতে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামী ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার নামে এই পাঠ্যবইগুলি নানা অযৌক্তিক, প্রাচীনপন্থী, সংকীর্ণ ও বহুক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করে।” দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতিগত দিক থেকে সাম্প্রদায়িক শক্তির মধ্যে আশ্চর্য মিল লক্ষ্য করা যায়— তা সে সাম্প্রদায়িকতা হিন্দু বা মুসলিম যাইহোক না কেন। 

সঙ্ঘ পরিবারের শিক্ষাপ্রকল্প কেবলমাত্র বিদ্যালয়ের মাধ্যম শিক্ষাদানের চেয়ে আরও অতিরিক্ত কিছু। সাম্প্রদায়িক জ্ঞানকে সামাজিক মর্যাদা দানে নানাভাবে এর মাধ্যমে চেষ্টা চালান হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সাধারণ জ্ঞান দ্বারা ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ জ্ঞানকে উচ্ছেদ করার জন্য তারা নানা উপায় অবলম্বন করেছে। সাধারণ মানুষের কাছে তাদের নিজেদের জ্ঞানকে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রচার পুস্তিকা ছাড়াও আরও নানা পথ তারা ধরেছে। আর.এস.এস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি সংগঠন যে জেলাভিত্তিক ইতিহাস রচনায় ব্রতী হয়েছে তা এই উপায়গুলির অন্যতম। একবার যদি এই সাম্প্রদায়িকভাব সম্বলিত ইতিহাস বহুল প্রচার পায় তাহলে ভারতীয় জনগণের প্রকৃত ইতিহাস চাপা পড়ে যাওয়া অসম্ভব নয়।

সাম্প্রদায়িক শক্তি ও বি জে পি সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তাকে স্মরণে রেখে বলা যায় যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষার আন্দোলন বিশেষ করে আশু গুরুত্ব লাভ করেছে। সাম্প্রদায়িকতার ও বিশ্বায়নের সমস্যাকে বিবেচনায় রেখে শিক্ষা গণতন্ত্রীকরণের লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রাম এ অবস্থায় অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষার্থে কেরালায় যে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়েছে তাকে একটি শুভ সূচনা বলা যেতে পারে। একে একটি আন্দোলনে রূপ দেওয়া যেতে পারে যাতে সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাবিষয়ক কমিটি গড়ে তোলা যায় নজরদারির উদ্দেশ্যে। এই প্রয়াস প্রগতিশীল শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনগুলিকেই গ্রহণ করতে হবে।


প্রকাশের তারিখ: ১০-মার্চ-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫