সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব- ৪)
আর বি মোরে
আমি দাশগাঁও ফিরলাম বটে, কিন্তু বাড়ি তখনও বন্ধ ছিল। দরজায় তালা দেওয়া ছিল। ক্রমে যেন আমার সম্বিৎ ফিরল: আমি পিতৃহারা এখন! মাকে দেখবার জন্যে প্রাণটা কেঁদে উঠল। এইভাবে এক দুই দিন কেটে গেল। মামা তারপর খবর পেল যে আমি বোম্বে থেকে ফিরে এসেছি। আমাকে নিতেই উনি দাশগাঁওতে এলেন। ওঁর সঙ্গে আমি গেলাম লাডাওয়ালিতে। মা আমাকে দেখামাত্র জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। মামা আর দিদা মাকে সান্ত্বনা দেয়। তখন থেকে আমার মা, বোন আর আমি মামার বাড়ি থাকতে শুরু করি।

[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ।
প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে।
কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য থেকে জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ]
তৃতীয় পর্বের পর...
বাবার মৃত্যুর বারো দিন পরে, আমার মা, চার মাসের ছোট্ট বোন আর আমি সাতসকালে একত্রে রওনা দিলাম ঘর ছেড়ে। মা আর বোনকে আমার মামা নিয়ে গেল লাডাওয়ালিতে। নামদেব দাদার সঙ্গে আমি গেলাম আলিবাগের রাস্তায়। তিনদিন চলবার মতন ভাকারি আর চাটনি পুঁটুলিতে বেঁধে নিয়েছিলাম। নামদেব দাদা ছিল আমার বাবার মামাতো এক ভাইয়ের ছেলে। সে নিজেও ছিল এক স্কুলমাস্টার। এই লম্বা যাত্রাপথে যা যা প্রয়োজন তা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল পুরোদমে: ও জানত আলিবাগ যেতে হলে কোন রাস্তা দিয়ে গেলে কত সময় লাগবে, পরীক্ষা শুরু কখন, শেষ-ই বা কখন। সেকালে পুরো রাস্তাটাই পায়ে হেঁটে যেতে হত। দাশগাঁও থেকে ভোরবেলা রওনা দিয়ে সেদিন রাত্তিরটুকু ইন্দপুরে কাটাই। বহুস্থলেই ধর্মশালা ছিল। গোসাভি জাতি আর ফকিরেরা সেগুলোতে ঠাঁই নিত। ধর্মশালাগুলোতে ‘পবিত্র’-‘অস্পৃশ্যে’র বৈষম্য ছিল প্রবল। মাহার, ছাম্ভার আর মাঙ্গ জাতি ছাড়া, ধর্মশালাগুলিতে বাকিরা একসঙ্গেই থাকত। এরা মাহার আর ছাম্ভারদের ধর্মশালাগুলিতে ঢুকতে অবধি দিত না। কালেভদ্রে বৃষ্টি হলে, এক কোণে কিছুটা জায়গা ছেড়ে দেওয়া হত এদের। আমরা এটা জানতে পারি ইন্দপুরে। আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয় সে রাতে বিশ্রামের জন্যে থামতে গিয়ে। এর আগে অস্পৃশ্যতার জ্বালা কখনও এভাবে পোহাইনি। পরের দিন ইন্দপুর থেকে রওনা দিলাম। কোলহাদের পিছনে সুকেলি খিন্দে এসে পৌঁছালাম। এই সরু পাহাড়ি উপত্যকায় ছিল ডাকাতের উপদ্রব। সেই ভয়ে, এই রাস্তার পথিক যারা তারা বড়ো সংখ্যায় দল বেঁধে যেত। খিন্দ পেরিয়ে আমরা দ্বিতীয় রাত্তিরে এসে থামলাম নাগোথানেতে। অতীতে নাগোথানে থেকে ধরমতারে যাবার ছোটো এক মোটরবোট ছিল। আমরা ধরমতার পৌঁছে বাকি রাস্তাটুক পায়ে হেঁটে পৌঁছালাম আলিবাগ। এই তিনদিনের যাত্রাপথে, আমি বুঝলাম যে মাহার জাতির হবার দরুণ লোকের কাছে আমি ছিলাম ঘৃণার পাত্র। যারপরনাই তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা, অবমাননার মুখোমুখি হলাম। বুঝলাম মানুষ যেন আমাদের শোষণ করতে পারলেই বাঁচে! আমার মন বিষণ্ণ হয়ে উঠল।
আলিবাগ শহরটি কোলাবা জেলার মধ্যে কুখ্যাত ছিল রক্ষণশীলতা ও অমানবিকতার জন্যে। ছায়াটুকুও অপবিত্র হিসাবে ধার্য হত সে শহরে। যখন আমরা পৌঁছে শহরের বাইরে মাহার কলোনিতে এক গেরস্থের ঘরে গিয়ে উঠলাম। নামদেব দাদা ওনাকে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিল আমাদের থাকাখাওয়ার একটা বন্দোবস্ত করে দিতে। উনি সেটা করেওছিলেন। আমরা ইতিমধ্যেই পরীক্ষা হবে যে ভবনে তার সুলুক পেয়েছিলাম। পরীক্ষার তারিখ, নির্ঘণ্টও জেনে নিয়েছিলাম। আমরা নির্দিষ্ট দিনে পরীক্ষাস্থলে পৌঁছালাম সময়ের একঘণ্টা আগেই, যাবতীয় সহযোগী সরঞ্জাম সমেত। ওখানে আমার স্কুল, নামধাম ইত্যাদি বিস্তারে জানতে চাওয়া হল। যে এই প্রশ্নগুলো করছিল সে শিক্ষক নাকি কোনও আধিকারিক তা স্পষ্ট ছিল না। আমরা পরীক্ষা হলের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওই লোকটি কিছুটা দূর থেকে প্রবেশ গেটে দাঁড়িয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল। পরে আমাকে ভিতরে আসতে বলে আর দরজার বাইরে এক কোণে আমাকে বসবার জায়গা দেয়। বাকি পরীক্ষার্থীরা ঘরের ভিতরে বসবার জায়গা পেয়েছিল; একমাত্র আমিই ছিলাম বাইরে। প্রশ্নপত্রটি দূর থেকে আমার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। উত্তর লেখা শেষ করার পরে আমাকে ঠেলে এগিয়ে দিতে হয় উত্তরপত্র। তফাৎ থেকে সেটি সংগ্রহ করে নিয়ে যায় ওরা। এই সমস্তটা সযত্নে ওরা করে যাতে ভুলক্রমেও আমাকে ছুঁয়ে-না-ফেলতে হয়!
সব পরীক্ষা শেষ হলে, আমরা আলিবাগ ছেড়ে বোম্বে আসি নৌকা চেপে। সেই প্রথমবার জীবনে বোম্বের দেওয়ালি উৎসব দেখলাম। বোম্বেতে, চাউলের স্তূপ তৈরি করা হয়েছিল রাস্তার ধার দিয়ে, মুশাফিরখানা আর ক্রফোর্ড বাজারের মধ্যিখানের সে রাস্তা সোজা গিয়ে ওঠে ক্যামাক ব্রিজে। চাউলের এই অঞ্চল পরিবারগড় হিসাবেই সম্যক পরিচিত ছিল। বড়ো সংখ্যায় পেনশনভোগী সেনা ও অন্যান্য মাহার জনজাতির লোকেরা এই অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। আমাদের যে আত্মীয়রা এখানে থাকে, আমরা তাদের কাছে গিয়ে রইলাম কয়েকদিন। অন্য কিছু আত্মীয় কামা হাসপাতালে কাজ করত। আমি মাঝেমধ্যে যেতাম তাদের কাছে।
জীবনে সেই প্রথম আমি দেখলাম রেললাইন, রেলগাড়ি, মোটরগাড়ি, অট্টালিকা আর রাস্তাজুড়ে রাতভর বিদ্যুতের আলো, গাড়িঘোড়া, ট্রামের ঘড়ঘড়ানি, জাহাজ আর কাপড়ের কারখানার সাইরেন, হরেক কিসিমের পোশাক পরিহিত লোকজন, প্রাসাদোপম হোটেল আর রেস্তোরাঁয় পাওয়া যাচ্ছে বিচিত্র কিসিমের পানাহার, চটকদার শুঁড়িখানায় পাওয়া যাচ্ছে মদ, তাড়ি এন্তার, মাছ-মাংস, সব্জি, ফুলের বাজার, কাপড় বিক্রির দোকানহাট, সোনা-রূপোর দোকান। আলিবাগে পরীক্ষা দিতে এলাম বলেই বোম্বে দেখবার সুযোগ হল। বোম্বেতে সেবারে প্রায় পনেরো দিন ছিলাম। তারপর দাশগাঁওতে ফিরে যাই। ফিরতি পথ প্রায় পুরোটাই আসি মোটর বোট চেপে সমুদ্রে, খাঁড়িতে। অস্পৃশ্যতার আগুন আমাদের পোড়াতে পারেনি তাই ফেরার পথে। বোম্বে থেকে হরেশ্বর এলাম একটা বড়ো জাহাজ চেপে। তারপর বাঙ্কোট খাঁড়ি বরাবর ছোটো নৌকা করে এলাম দাশগাঁওতে।
আমি দাশগাঁও ফিরলাম বটে, কিন্তু বাড়ি তখনও বন্ধ ছিল। দরজায় তালা দেওয়া ছিল। ক্রমে যেন আমার সম্বিৎ ফিরল: আমি পিতৃহারা এখন! মাকে দেখবার জন্যে প্রাণটা কেঁদে উঠল। এইভাবে এক দুই দিন কেটে গেল। মামা তারপর খবর পেল যে আমি বোম্বে থেকে ফিরে এসেছি। আমাকে নিতেই উনি দাশগাঁওতে এলেন। ওঁর সঙ্গে আমি গেলাম লাডাওয়ালিতে। মা আমাকে দেখামাত্র জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। মামা আর দিদা মাকে সান্ত্বনা দেয়। তখন থেকে আমার মা, বোন আর আমি মামার বাড়ি থাকতে শুরু করি।
লাডাওয়ালি পৌঁছাবার পরে আমার আর কাপড়ের প্রয়োজন রইল না। তালে আর বোম্বেতে কেনা জামাকাপড়গুলো একটা ট্রাঙ্কে ভর্তি করে সরিয়ে রাখা হল। একটা ধুতি আর উত্তরীয় ছিল লাডাওয়ালিতে থাকবার পক্ষে যথেষ্ট। আমার মামার গবাদি পশুদের দেখভাল করবার জন্যে আমার বয়সী কয়েকজন ছেলে ছিল। আমিও ওদের সঙ্গে যাওয়া শুরু করলাম গরু চরাতে। আমার মামা আমাকে এ-কাজ করতে বাধ্য করেনি, এ-কাজ আমি স্বেচ্ছায় করতাম। গরুর পিছনে ধাওয়া করতে, গান গাইতে, নানা ধরনের খেলা খেলতে, নদীতে গিয়ে সাঁতার কেটে স্নান করতে আমার অত্যন্ত রোমাঞ্চ হত। লাডাওয়ালি থেকে মাঝেমধ্যেই রাওধালের কাছকাছি বিভিন্ন গ্রামে ঘুরতে যেতাম। ঘুরে ঘুরে বয়স্ক মানুষদের থেকে কত রকমের গল্পকথা শুনে বেড়াতাম! এরকমই একখানা গল্প ছিল রায়গড়ের রৈনাককে নিয়ে। রইল তার সারাংশ:
ব্রিটিশরাজের আগে দেশি লোকেদের শাসন ছিল রায়গড় দুর্গে। রায়গড় দুর্গের সেনাধিপতি ছিলেন রৈনাক নামের এক মাহার। সমস্ত প্রাশাসনিক কাজ সামাল দিত এক গোমস্তা, পদটা ছিল বংশানুক্রমিক, কারখানিদের। ব্রিটিশরা প্রথম কব্জা করে মাহাদ। রায়গড় দুর্গের বাজার ছিল এই শহরেই। তারপর ছাম্বার কলোনি দখল করে। সবশেষে হামলা করে রায়গড় দুর্গে। রৈনাক ওর বাহিনীকে আদেশ দেয় বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে। নিজে সামনে থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়। এ-কাজটা কারখানিদের না-পসন্দ ছিল। সে নিজে তো ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করলই, রৈনাককেও বার্তা পাঠাল যাতে সে যুদ্ধ ছেড়ে ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করে আর দুর্গের তালাচাবি ব্রিটিশদের হস্তান্তর করে দেয়। এর জবাবে রৈনাক বলে— ‘আপনি রাইগড় দুর্গের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন, কিন্তু আজন থাকতে রাইনাক কদাপি তা করবে না।’ এই কথা বলে, পনেরো দিন ধরে দুর্গরক্ষা করে যুদ্ধ চালাল রৈনাক। শেষকালে, ছলের আশ্রয়ে ব্রিটিশ বাহিনী দুর্গের অস্ত্রসম্ভারে অগ্নিসংযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়। রৈনাকের প্রতিরোধ চূর্ণ করে ওকে বন্দি বানায়। সে কালের নিয়মমত, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা রৈনাককে ব্রিটিশ আর্মিতেই পদস্থ অফিসার হবার প্রস্তাব দেয়। রৈনাক এই প্রস্তাব ঠুকরে দেয় এমন সৎ হিম্মতের সঙ্গে যা তাকেই মানায়। স্বভাবতই ব্রাহ্মণ আর উঁচু জাতের দেশি ব্রিটিশদের বশংবদ জাতিঘৃণায় ফুঁসতে থাকা সেনা অফিসারেরা দাবি জানায় রৈনাককে পেশোয়ারাজের সময় বহুলপ্রচলিত কাদেলত শাস্তি দিতে হবে। মারাঠিতে এর অর্থ পাহাড়ের চূড়া বা উঁচু স্থান থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়া গভীর খাদে। ফলে, রৈনাককে রায়গড় দুর্গের প্রাচীর থেকে ঠেলে ফেলে খুন করা হল। এই হল রৈনাকের শাস্তি কাদেলত। আর রাজা ছত্রপতি শিবাজীর রাজধানী দুর্গের চূড়োয় উঠল ব্রিটিশ পতাকা। রায়গড় দুর্গের সত্যিকারের রক্ষক রৈনাকের বংশধরেরা আজও বড়ো সংখ্যায় রানি জিজাবাইয়ের প্রাসাদের চারিধারে বসতি করে থাকে। দুর্দম সেনাপতি রৈনাককে উৎসর্গ করে নির্মিত মন্দিরটি আজও সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রমাণ হিসাবে খাঁড়া আছে।
দাশগাঁওতে আমাদের বাড়িতে এখনও হাড়িকড়াই বাসনকোসন রয়ে গিয়েছিল। মায়ের কড়া দৃষ্টি ছিল সেদিকে। প্রায় প্রতিমাসেই মা আমায় নিয়ে দাশগাঁওতে একবার হলেও আসত এটা দেখতে যে কী কী বেঁচে আছে আর কতটুকু সম্পদ খোওয়া গেছে। যখনি মা লক্ষ করত ছাদের কোনও কড়ি-বড়োগা কিম্বা কিছু বানানোর সরঞ্জাম বা মাল-মশলা নেই, তখনি বড়ো বাড়ির লোকেদেরকেই দোষারোপ করত। ও-বাড়ির লোকেরা আমায় স্নেহ করত, কিন্তু মায়ের সঙ্গে বনিবনা হত না। কেউই মায়ের গলা চড়ানো বা অযাচিত জ্ঞানকে বিশেষ পাত্তা দিত না। লাডাওয়ালিতে থাকাকালীন একবার দাশগাঁও থেকে সমন এল। যাওয়া মাত্র খবর পাই যে স্কুল থেকে জানিয়েছে আলিবাগের পরীক্ষায় আমি প্রথম স্থানাধিকারী হয়ে পাশ করেছি। ইংরেজি স্কুলে পড়বার জন্যে সরকার আমাকে মাসিক পাঁচ টাকার স্কলারশিপ দেবে। এ-কথা শোনা ইস্তক বড়ো বাড়ির লোকেরা আমাকে মাথায় তুলে রাখা শুরু করে। আমিও যারপরনাই আনন্দে ছিলাম এটা ভেবে যে জুন মাস থেকে আমি মাহাদে ইংরেজি স্কুলে যাব। মাঝের দুটো মাস কত দ্রুত কাটবে তা ভেবে আমি অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। মাহাদের ইংরেজি স্কুল আমার জন্মের আগে তৈরি। পোস্ট আর টেলিগ্রাফের অফিসের ঠিক উল্টোদিকে একতলা বিল্ডিংয়ে স্কুলটা বসত। বিল্ডিংটার মালিক ছিল ধারাপ নামের এক স্বনামধন্য ব্রাহ্মণ পরিবার। স্কুলকে ভাড়া দেওয়া ছিল বাড়িটি। জুন মাসে স্কুল চালু হলে আমি সেখানে গিয়ে স্কুল মাস্টারকে বলি আমার নামখানি খাতায় তুলবার জন্যে। উনি আমার বিবরণ লিখে নিলেন আর এক হপ্তা পরে ফের আসতে বললেন। এক সপ্তাহ বাদে আমি যখন গেলাম, আমাকে বলা হল স্কুলে আমায় ভর্তি নিতে সকলে প্রস্তুত। কিন্তু স্কুল বাড়ির মালিক ধারাপ স্পষ্ট করে জানিয়েছে ওদের, ‘এক মাহারের বাচ্চাকে যদি স্কুলে ভর্তি নাও তবে আর এই বাড়ি তোমাদের ভাড়া দেব না।’ স্কুলমাস্টার আমায় বলল, ‘আমি যদি এ-অবস্থায় তোমায় ভর্তি নিই, তাহলে স্কুলটাই বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের পরামর্শ তুমি পুণে বোম্বের মতো শহরে যাও পড়া শিখতে। মাহাদে তোমার শিক্ষালাভ অসম্ভব।’
নামদেও দাদা সেখানে আমার সঙ্গে ছিল। ও সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করতে প্রধান শিক্ষককে রাজি করতে। ওখানে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে অন্যান্য শিক্ষকেরাও উপস্থিত ছিল। ওদের মুখ দিয়ে টুঁ-শব্দটি বের হয়নি। প্রধান শিক্ষকের কথায় খালি মাথা নেড়ে সহমতি জানাতে থাকে ওরা। আর আমার দিকে ঘৃণা-চোখে চেয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। স্কুল ছেড়ে বেরিয়ে আমরা দাশগাঁওয়ের দিকে রওনা দিই। স্কুল আমাদের প্রত্যাখ্যান করল। এরপর কী? মাথা খুঁড়েও ভাবতে পারলাম না তখন কোনও উত্তর। পরদিন নামদেওদাদা নিজের স্কুলে চলে যায়। আমিও লাডাওয়ালি ফিরে যাই।
ভাষান্তর: দেবরাজ দেবনাথ
প্রকাশের তারিখ: ০৯-ফেব্রুয়ারি-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
