Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব- ৩)

আর বি মোরে
আমার শৈশব অবধিও কামগাত সম্বৎসর অনুষ্ঠিত হত। এই উপলক্ষ্যে অস্পৃশ্য আর বর্ণহিন্দুরা পাশাপাশি বসত, হাঁটুতে হাঁটু ঘেঁষে। একবাক্যে বলতে গেলে, অস্পৃশ্যতার দরুণ অন্যত্র যে ভয়াবহ নিপীড়নের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হত, দাশগাঁওনিবাসীদের তা পোহাতে হত না।
Memoir of a Dalit Communist Part III

 [কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ। 

প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে।

কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য থেকে জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ]

দ্বিতীয় পর্বের পর...

আমাদের স্কুল, আমাদের বাড়ি এত গুরুত্ব লাভ করল কারণ অস্পৃশ্যতার অতল গহ্বরে চুরমার হয়ে তলিয়ে যাওয়া হাজার হাজার বাড়িঘর, স্কুলের মধ্যে আমাদের ঘর, স্কুল কোনোক্রমে টিকে গিয়েছিল। মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন উপকূলে আমাদের এই জন্মভূমি চিতপাবন ব্রাহ্মণ বা কোবরাদের বসতি বলে সম্যক পরিচিত। এখানেই অস্পৃশ্যতার জন্যে আমাদের ভোগ করতে হয়েছে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা, আমাদের জীবন ছিল শোচনীয়, অমানবিক আচরণ ছিল আমাদের নিত্যকার প্রাপ্তি, বাধ্য হতাম এক মাথা নিচু করে জীবন কাটাতে, আমরা ছিলাম পরাজিত আর এমনভাবে আমাদের আটকে রাখা হয়েছিল যার তুলনা মানবেতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর! অস্পৃশ্যতার ফলে যে দাসজীবনের শুরুয়াত হয় তার বর্ণনা এটুকুতে অসম্ভব যে : রাষ্ট্র মানুষ থেকে দাস বানিয়ে তুলল। অস্পৃশ্যতার চর্চা ঘৃণা ও প্রতিশোধের মনোভাব থেকে জাত। শ্রেণিঘৃণার অনুভূতি এখানে ক্রিয়াশীল। বর্ণগত ঘৃণাজাত শ্রেণি ঔদ্ধত্য থেকে এটি তৈরি হয়। আর্যধর্মের অনুসারীরা এটির লালন করে, ক্রমে যাতে এটি মাথাচাড়া দিতে পারে। বর্ণব্যবস্থা এর শিকড়ে। জাতি বর্ণব্যবস্থা হাত ধরাধরি করে সুনিপুণভাবে এটিকে স্থায়ী এক ধাঁচা দেয় যাতে আপনাআপনি এটি নিজেকে চালিত করতে পারে। ব্রাহ্মণ একটা বর্ণ এবং ব্রাহ্মণ একটা জাতি। এদের একে অপরের থেকে আলাদা করব কীভাবে? যতদিন ‘ব্রাহ্মণ’ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিশেষ খেতাব হিসাবে রয়ে যাবে, তদ্দিন বর্ণ, জাতি আর অস্পৃশ্যতা মুছে যাওয়া সম্ভব না। হিন্দু ধর্মমতের অনুসারীদের বৈষম্য ও পুরোহিতরাজের চর্চা ও মনোভাব ধ্বংস হবার নয়।  

 কোঙ্কনবাসী ব্রাহ্মণ তথা কোঙ্কনস্থ ব্রাহ্মণদের নির্দেশকারী হীনসূচক শব্দ।

আমার অনেক আগেই, কোঙ্কননিবাসী অপরাপর অস্পৃশ্যজাতির তুলনাতেও আমার পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা গ্রামের স্কুলে পড়তে যেত। বহু পাঠকের কাছে এ কথা বাগাড়ম্বর মনে হবে। কেউ অভিযোগ করতে পারেন যে নিজের ঢাক নিজে পেটাচ্ছি। অথচ এটাই বাস্তবতা। কেউ এটা অস্বীকার করতে পারবে না, আমায় ভুল প্রমাণ করতে পারবে না। আমার বাবা স্বল্প সময়ের জন্যে এক ধনী কৃষকের জীবন কাটিয়েছিল; ওঁর মামাতো ভাই দুইতলা বাড়ি বানায়। শিক্ষাবিভাগে আমার বড়োদা একটা চাকরি জোটায়। মাহাদের মার্কেটসহ অন্যত্র ও  নিজের ঘোড়ায় চেপে যাতায়াত করত। পঞ্চাশ বছর আগে মাহাদের অস্পৃশ্য কলোনিতে আট-দশ জন স্কুলশিক্ষকের ঘর ছিল। এটির এবং দাশগাঁওতে যে কিছুজন সামাজিক উন্নতির সুযোগ পেয়েছিলাম তার যাবতীয় কৃতিত্ব মাহার জাতির এক মহান সমাজসংস্কারকের যিনি উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে খ্যাতির শিখরে পৌঁছান।   

এই সমাজ সংস্কারকের নাম গোপালবুভা ওয়ালাঙ্কার। রাওধাল গ্রামনিবাসী এই মানুষটি ছিলেন এক অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তা। সেকালে মিলিটারি স্কুলে পড়ে যারা শিক্ষকতার পরীক্ষায় পাশ করতেন অবসর নেবার পরে তাদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হত। কিন্তু গোপালবুভা সেনা থেকে অবসর নেবার পরে নিজে সরকারি চাকরিতে ফের যোগ দেননি।  

গোপাল বাবা ওয়ালাঙ্কার (১৮৪০-১৯০০), অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন অঞ্চলের দাপোলিনিবাসী। ১৮৯০ সাল নাগাদ অনার্য দোষ পরিহারক মণ্ডল প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেনাতে মাহারদের অন্তর্ভুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা জারির লর্ড কিশেনারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পিটিশন লেখেন। ওয়ালাঙ্কার শুধারক (সংস্কারক) ও দীনবন্ধু সংবাদপত্রদুটির নিয়মিত লেখক ছিলেন।

শাসনের ভিত পোক্ত করতে ব্রিটিশ সরকার মহারাষ্ট্রের বহু জায়গায় সেনাশিবির তৈরি করে; কোঙ্কনের দাপোলির শিবিরটিও একইভাবে তৈরি। পরবর্তীতে, সেনার দৃষ্টিভঙ্গিতে শিবিরের উপযোগিতাই ফুরিয়ে গেল। তাই যে সকল অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের অন্য কোথাও ঘর ছিল না, তারা এখানে পরিবারসমেত থাকতে এল। কোঙ্কনে মূলত চিতপাবন ব্রাহ্মণদেরই প্রভাব ছিল বেশি, অস্পৃশ্যতার চল ছিল বেয়াড়ারকম। এমনকি নিচুজনের ছায়াটুকুও অপবিত্র ভাবা হত। এমতাবস্থায়, কোঙ্কন জুড়ে নানা গ্রামের অস্পৃশ্য মানুষেরা সেনায় যোগদান করে নিজেদের ভিটেমাটির গ্রাম ছেড়ে নানান সেনাশিবিরে চলে এসে বসতি বানায়। স্বাভাবিকভাবেই দাপোলি শিবিরে এরা বড়ো সংখ্যায় ছিল আর এটি ছিল কোঙ্কনে। বাবাসাহেব আম্বেদকরের বাবা সুবেদার রামজি আম্বেদকর, এমনকি গোপাল বাবা ওয়ালাঙ্কার গোড়াতে ওখানই থাকতেন। অস্পৃশ্যতার যন্ত্রণা ওদের কাছে ছিল হৃদয়বিদারক। এই দেশে, যখন মুঘলরাজ এল, তখনও অস্পৃশ্যতা খতম হয়নি। তারপর এল পেশোয়ারা। অস্পৃশ্যতার প্রথাকে ওরা চরম স্তরে নিয়ে যায়। বড়ো আম্বেদকর আর ওয়ালাঙ্কার মহাক্ষিপ্ত ছিল এটা দেখে যে বিদেশি সাদা চামড়ার প্রগতির বুকনিমারা লোকগুলোও অস্পৃশ্যতা মুছে দিতে কুটোটি নাড়াল না।

দাপোলি যাবার পথে পড়ে দাশগাঁও গ্রাম। যেহেতু এটি ছিল মাহার-অধ্যুষিত, বহু মানুষ সেনা থেকে অবসর নেবার পরে চলে আসত দাশগাঁওতে পাকাপাকিভাবে থাকতে। ওয়ালাঙ্কার এটা জানত, প্রায়ই তাই দাশগাঁও ঘুরে যেত। আমাদের বাড়ির গুরুজনদের সঙ্গে ওনার রীতিমত সখ্য তৈরি হয়ে যায়। ওনার স্ত্রী যেহেতু আমাদের দূর সম্পর্কের কুটুম্বই ছিল, দাপোলি ছেড়ে ওয়া চলে আসে রাওধালে। পরবর্তীতে উনি সত্যসেবক আন্দোলনের মহান নেতা মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলের সংস্পর্শে আসেন এবং এই আন্দোলনের নেতা ও প্রচারক হয়ে ওঠেন। বোম্বে প্রেসিডেন্সির তৎকালীন গভর্নর সমাজসংস্কারক হিসাবে ওয়ালাঙ্কারের ভূমিকা দেখে মাহা পৌরসমিতির সদস্য হিসাবে ওনাকে নিযুক্ত করেন। এই মাহাদ পৌরসমিতি ছিল এক শ্বেতাঙ্গচালিত সংস্থা যার পথচলা শুরু তার কিছুকাল আগেই। গোপাল বাবা ওয়ালাঙ্কার ছিলেন গোটা ভারতের অস্পৃশ্যজাতির প্রথম ব্যক্তি যে স্বরাজ বা স্বায়ত্তশাসনের পর্বের গোড়ার দিকে এত গুরুত্ববহ পদের অধিকারী হন। ইংরেজি ভাষার স্কলারশিপে পড়ার সুযোগ পেয়ে উনি সেনাস্কুলে শিক্ষকতা করেন। মারাঠি ভাষাতেও ওনার ব্যুৎপত্তি ছিল গভীর। যেহেতু উনি আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, দুই বছর আমার দাদা, বাবার মামাতো ভাইয়ের চার সন্তান ও ভীর গ্রামের সাওয়াধাকর পরিবারের এক ছেলেকে পড়িয়েওছিলেন। এই ছয়জনের গৃহশিক্ষক ছিলেন উনি। ওনার ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন আমার শ্বশুর তুকারাম ভিত্তাল হাতে যোশী। যোশীবাবু ছিলেন পুরনোকালের পেনশনার স্কুলের শিক্ষক। ওনার আরও একজন ছাত্র হলেন সুবেদার ভিশ্রাম সাওয়াদকার। এই দুইজন বাবসাহেব আম্বেদকরের আন্দোলনে আমার পরেই যোগ দেন। ওনারা গোপাল বাবার অজস্র স্মৃতি আমার সঙ্গে ভাগ করে নেন।   

দাশগাঁওতে আমাদের স্কুল ছিল অনেকটাই পুরানো। আমি যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করি, তখন মাত্র দুইজন শিক্ষক ছিলেন। স্কুলে যারা পড়ুয়া তারা সকলেই বর্ণপ্রথায় শূদ্র। ওদের আসল পদবি নাম ডাকার খাতায় লেখা হত না; বদলে লেখা হত অমুক ভই (জেলে), তমুক বুরুদ (ঝুড়িবানিয়ে), রাম সালি (তাঁতি), শ্যাম পাথারাত (পাথর শ্রমিক), যদু মাহার, মধু পারিত (ধোপা), কুম্ভার (কুমোর), গোসাভি (ভিখারি যাযাবর), সোনার (স্বর্ণকার), ণ্বাভি (নাপিত), তেলি (তৈল পেষণকারী) ইত্যাদি। মাহার বাদে দাশগাঁওয়ের সকলেই যেহেতু পিছিয়ে পড়া হিন্দু জাতিদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারা ব্রাহ্মণদের গুরু মেনে অস্পৃশ্যতার প্রথা অনুসরণ করেই জীবন কাটাত। ‘ভগবানের পেয়ারে’ আর অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের পৃথকভাবে বসতে দেওয়া হত। আদতে আমাকে রোজই কেউ না কেউ ছুঁত। কিন্তু তা নিয়ে গুরুজনেরা ঝামেলা ঝঞ্ঝাট করত না।  

স্কুলটি ছিল আমাদের কলোনি থেকে দুশো মিটার দূরে মাত্র। বর্ষাকালে স্কুলে যাবার রাস্তাটা একটা মাঠ ঘেরা বাঁধ বরাবর ছিল। যদি কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ গ্রামের সংখ্যাগুরু মাহার স্কুলছাত্রদের সামনে চলে আসত বাঁধের রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের সময়ে, তখন বাচ্চারা নেমে বাঁধ থেকে নেমে গিয়ে সরে দাঁড়াত না। বরং প্রাপ্তবয়স্কদেরই কাদায় নেমে দাঁড়াতে বাধ্য করত তারা। আর এই বেচারা বর্ণহিন্দুদের কাদাজলে নেমে দাঁড়াতে হত। আমাদের অপবিত্র স্পর্শ বাঁচিয়ে চলতে এবং কোনোরকম বাগবিতণ্ডার সম্ভাবনা এড়িয়ে যেতে। দাশগাঁওতে অস্পৃশ্যতা ছিল। কিন্তু বর্ণহিন্দুরা এটা অস্পৃশ্যদের উপর চাপিয়ে দিত না। মাহারেরা গ্রামের অনাবাদি জমি রক্ষা করত; কিছু গ্রামদেবতার উপরে মাহারদের অধিকারও ছিল; আর্থিকভাবেও অন্য কারোর উপর তারা নির্ভরশীল ছিল না, সংখ্যার জোর এতটাই ছিল যে কাউকে যুঝে নিতে পারত- ওদের ঘৃণার চোখে দেখবে এই সাহসই বা কার ছিল? দাশগাঁওতে প্রতি শনিবারে এক সাপ্তাহিক হাট বসত সুকাতি আর শুঁটকি মাছের। অস্পৃশ্য আর বর্ণহিন্দুরা মিলেমিশে খোলামেলাভাবে ঘুরে বেড়াত এই হাটে। দাশগাঁওতে যেহেতু এক বড়ো জঙ্গল ছিল, অস্পৃশ্য আর বর্ণহিন্দুরা একত্রে বর্শা আর লাঠিসোঁটা নিয়ে শুওর, খরগোশ শিকার করতে বেরিয়ে পড়ত।

কোঙ্কনে নাচানি (লাল বাজরা) আর ওয়ারি (coix barbata)’র ক্ষেতে যূথশ্রমের অভ্যেস ছিল। একে বলা হত প্রস্থান বা কামগাত। সক্ষম পুরুষেরা আশেপাশের দুই চারটে গ্রাম থেকে এসে জড়ো হত এই কাজের জন্যে। কোন গ্রামে কোন সমর্থ লোকের বাস তার খোঁজ পাবার এ ছিল এক উত্তম উপায়। আমার শৈশব অবধিও কামগাত সম্বৎসর অনুষ্ঠিত হত। এই উপলক্ষ্যে অস্পৃশ্য আর বর্ণহিন্দুরা পাশাপাশি বসত, হাঁটুতে হাঁটু ঘেঁষে। একবাক্যে বলতে গেলে, অস্পৃশ্যতার দরুণ অন্যত্র যে ভয়াবহ নিপীড়নের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হত, দাশগাঁওনিবাসীদের তা পোহাতে হত না।   

উপরে উল্লিখিত দুই স্কুলশিক্ষকের একজন আমাদের পারিবারিক আত্মীয় ছিলেন। ওনার নাম ছিল জয়রাম ভিত্তাল হাতে। আরেকজন ছিলেন এক ব্রাহ্মণ যার নাম রামচন্দ্র কেশব খাড়ে। উনি অবিশ্যি ব্রাহ্মণ্যবাদ আর বেদের সংশয়াকুল কর্তৃত্ব মানতেন না। উনি ছিলেন এক স্পষ্টচিন্তক আর ওনার নামের মতই (খারে’র অর্থ সত্য) এক সত্যিকারের শিক্ষক। স্কুলে অস্পৃশ্যতার চর্চা উনি একেবারেই করতেন না। সমস্ত ছাত্রের প্রিয়জন ছিলেন উনি। আমি যখন অসুস্থ ছিলাম, উনি এক দুইবার আমার বাড়িতে আসেন আমার খোঁজখবর নিতে। আমি ঘুমোতাম যেখানে সেই খাটিয়ার পাশে বসে স্নেহভরে আমার স্বাস্থ্য সম্বন্ধে জেনে নিতেন। ১৯১৪ সালে, উনি আমাকে আলিবাগ পাঠিয়েছিলেন জেলাকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব এগারো হাইস্কুল বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে। দুশো’র বেহি ছাত্র সেই পরীক্ষায় অংশ নেয়, আমি তাদের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করি। প্রতি মাসে পাঁচ টাকা করে সরকারি বৃত্তি ধার্য হয় আমার পড়াশোনার জন্যে। এটি ছিল ওনারই শিক্ষকতার সাফল্য। সেই সময়কালে স্কুলশিক্ষকের মাসমাহিনা ছিল মাত্র এগারো টাকা। সকলেই তাই বুঝবে মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তির তাৎপর্য কী ছিল। ১৯১৪র সেপ্টেম্বর মাসে হাইস্কুল বৃত্তিপরীক্ষা আলিবাগে অনুষ্ঠিত হত। বাবার এক মামাতো ভাই, তুকারাম ভিত্তাল যোশী আমাকে তালে নিয়ে যায় ঠিক তার আগেই। তালে মানগাঁও তহসিলে এক বিরাট গ্রাম, সেখানকার দুর্গের ঠিক পাদস্থলে। আগে, সরকার মাহারদের স্কুল পরিচালনা করত নানা স্থানে। সব স্কুলেই মাহার, ছাম্ভার আর মাঙ্গ জাতের লোক আসত শিক্ষালাভের লক্ষ্যে। শেষদিকে দাশগাঁওয়েও সরকার এক মাহার স্কুল চালু করে, আমার বাড়িতেই। অবশ্য তার আগে থেকেই পঞ্চম শ্রেণির সময় থেকে আমি ইংরেজি স্কুলে পড়া শুরু করে দিয়েছিলাম। তাছাড়াও তদ্দিনে আমাদের গ্রাম থেকেই এক ডজন লোক স্কুলশিক্ষক বনে গিয়েছিল। 

তালে আর দাশগাঁও যথেষ্ট দূরে। এতটা দূরত্ব এই প্রথমবারের জন্যে আমি পেরতে চলেছি। তালে পৌঁছানো মাত্রেই আমার কাকা আলিবাগ যাবার জন্যে একটা নতুন পোশাক কিনে দিল আমায়। ওটা গায়ে চাপিয়েই দাশগাঁও ফিরে যেতে হল। যখন ফিরলাম দাশগাঁও, আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে, একেবারে শয্যাশায়ী। জীবনে প্রথমবার আমি সাদা ধুতি, শার্ট, কোট আর টুপি পরে যখন বাবার সামনে এসে দাঁড়ালাম, বাবা তখন আবেগাপ্লুত, আমায় দেখে বাঁধ ভেঙে কাঁদতে শুরু করে। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে। একবার বাবার দিকে চায় মৃত্যুশয্যায়, আরেকবার চায় আমার দিকে। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। আমিও কাঁদতে শুরু করি। এই করুণ দৃশ্য উপস্থিত গুরুজনদের হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তোলে। সেই মুহূর্তে, বাবা মা আমার জন্যে শুধু কাঁদতেই পারছিলেন, আনন্দে-যন্ত্রণায়।

এইটেই ছিল আমার জীবনের এক গুরুতর সন্ধিক্ষণ। আমি কোনোদিনও ভুলতে পারব না এসময়ের কথা। এক হপ্তা পরেই, বাবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আমার ছোটোবোন আর ভাই স্মলপক্সের মহামারির শিকার হয়েছিল ইতিমধ্যেই। বাবার মৃত্যুকালে, আমার পরিবার ছিল মাত্র ৪ জনের : বাবা, মা, আমি আর এক চার মাস বয়সী বোন। বাবা যখন প্রায় যমের দুয়ারে পৌঁছাচ্ছে, মা তখন সদ্য আঁতুড়ঘর ছেড়ে বেরলো। ঘরে তখন কণামাত্র খাবারও নেই। ছ’খানা লাঙল আছে, জমিজিরাৎ আছে, নিজের পকেটের টাকায় কুনবি, ভই আর মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রায় ২০ জনের বিয়ের বন্দোবস্ত করেছে এমন কারো আর্থিক অবস্থা তার মৃত্যুর সময়ে এত শোচনীয় কীকরে হতে পারে? এর আসল কারণ আমার বাবার চরম নি:স্বার্থ মনোভাব আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মহাজনি ফাঁস। 

আগে আমার বাবা মামাতো-মাসতুতো ভাইদের সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারে থাকতেন। পরে, শরিকি বিবাদ এড়িয়ে যেতে বড়ো দালানবাড়ি চার ভাইয়ের ভরসায় ছেড়ে দিয়ে, পাশেই এক আলাদা গাবদা ঘরে সংসার পাতেন। সংসার ভাগ হবার পরেও আমার খুড়তুতো ভাইয়েদের নিজের সন্তানস্নেহে যত্ন করতেন। ওরাও ওনাকে সাহায্য করেছিল যাতে বাবার সংসার গুছিয়ে তুলতে সমস্যা না হয় কোনো। ওরাও বাবাকে অসম্মান করেনি কখনও। পিতৃসম শ্রদ্ধা করত। এখন, আমার বাবার মৃত্যু যখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, পরিবারটা আবার জুড়ে গিয়ে একান্নবর্তী হয়ে গেল। তালে থেকে ফিরলাম যখন, আমার নিজের খাওয়াদাওয়া বড়োবাড়িতেই হত, বাবা-মায়ের জন্যেও ও বাড়ি থেকেই খাবার আসত। যদিও আমি ছোটো ছিলাম, নিজের বাড়ির উনুন জ্বলতে না দেখলে তখনও মনটা খিঁচিয়ে যেত। খালি ভাবি, তখন বাবা-মায়ের মনের দশা কেমন হত! শুক্রবার পর্যন্ত বাবা তেমন কিছুই খেতে পারছিল না। শনিবার ছিল ওর নিত্যকার উপোস। সেদিনটা কাটে কিচ্ছু না খেয়েই। রবিবারেও এক গরাস খেলেন না। তারপর এল সোমবার। শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার ছিল ওটা। বাড়ির সকলেরই ছিল উপোস। দিনের তিন প্রহর কেটে গেলে উপোস ভাঙার সময় আসে।  

আমি সবেমাত্র দোতলায় এসে এক গরাস খাবার মুখে তুলছি, তখনি কেউ একজন এসে আমায় ডাকল। আমি যত দ্রুত সম্ভব ছুটে গেলাম সাড়া দিয়ে। দেখলাম আমার বাবাকে ঘিরে এক দঙ্গল লোক দাঁড়িয়ে। ওদেরই একজন আমার হাত ধরল। বাবার বালিশের পাশে নিয়ে গিয়ে বসাল। একটা বাটি থেকে সামান্য দুধ বাবার মুখে তুলে দিতে বলল। বাকিরাও দুধ দিয়ে ওঁর মুখস্পর্শ করল। কিন্তু ততক্ষণে উনি মৃত্যুর পা বাড়িয়ে ফেলেছেন। চোখের মণি নড়ছিল না। বুকে কোনো ধড়ফড়ানিও ছিল না। মা মুখ বুঁজে কেঁদে চলেছে। বাকিরা কোনোমতে নিজেদের কান্না আটকাচ্ছিল। কিছু বিচক্ষণ গুরুজন সবাইকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। শান্ত থাকতে অনুরোধ করছিল। সূর্য তখন অস্তাচলে। গোধূলির আলো পড়ছে। আমাদের বাড়িতে রোজকার সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে গিয়েছে ততক্ষণে। বাবার বিছানার দুইপাশে দুইখানা খাঁড়া করে রাখা প্রদীপ জ্বলছিল। ঠিক এমন সময়েই আমার চিরনিদ্রায় গেলেন। বাড়ির সকলে ভেঙে পড়ে। পরের দিন বাবাকে মাটি দিয়ে যায় অনেকেই। মরদেহের সঙ্গে আমাকেও শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আমার মাত্র এগারো বছর বয়েস। এই প্রথম জীবনে কোনো শ্মশানঘাটে যাই।

ভাষান্তর: দেবরাজ দেবনাথ 

 


প্রকাশের তারিখ: ২৬-জানুয়ারি-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

খুব ভালো লাগছে, ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টি গুলোর উচিত শ্রেণী সংগ্রামের সঙ্গে বর্ণ বৈষম্যের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এই সমস্ত দলিত/ মেহনতি মানুষের জীবন সংগ্রামের কথা দেশের মানুষ কে জানাতে হবে। কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে এই অংশের মানুষের সংখ্যা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে পার্টির উচ্চ স্তরের নেতৃত্ব কে দলিত/ মহিলা/ সংখ্যা লঘু মানুষ কে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে পার্টির নেতৃত্বে তুলে আনতে হবে।এই অংশের মানুষ কে গুরুত্ব দিলেই শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন শক্তিশালী হবে।কারণ এরাই শ্রমিক শ্রেণীর ৯৫ % , কাজেই এদের দূরে সরিয়ে রাখলে ভারতে কমিউনিষ্ট দের নেতৃত্বে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম সফল হবে না। কমিউনিষ্ট পার্টির কিছু নেতার মধ্যে এখনো বর্ণবাদী ঝোঁক রয়ে গিয়েছে।তাই পার্টির উচিত যাদের মধ্যে এই ধরনের সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা রয়েছে তাদের পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া। ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টি গুলোর মূল দায়িত্বে এখনো পর্যন্ত কোন দলিত বা পশ্চাৎপদ মানুষের অন্তর্ভুক্তি হয়নি।আর এই জন্যই দেশের ৮৫ % মানুষের স্বাভাবিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ থাকলেও কমিউনিষ্ট পার্টি গুলো পায়নি। ভারতের সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উঠে এসেছেন মূলত বর্ণ হিন্দুসমাজ থেকে।তাদের রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা , নেতৃত্ব বা প্রজ্ঞার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ও বলতে পারি এরা স্বাধীনতার ৮০ বা কমিউনিষ্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ১২৫ বছর পরেও কমিউনিষ্ট পার্টি গুলো এখনো গরীব মেহনতি মানুষ,যারা ৮৫% আসলে দলিত, আদিবাসী ও অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মানুষের সমর্থন আদায় করতে ব্যার্থ হয়েছে।এই ভাবনা চিন্তা করেই আগামী দিনে এই ধরনের দলিত, আদিবাসী, অন্যান্য অনগ্রসর ও গরীব মেহনতি নেতৃত্বের বীরত্বের গাঁথা পার্টির পত্র পত্রিকায় নিয়মিত ভাবে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করতে হবে। আমি কোন পার্টির সদস্য নই, তবে সিপিআইএম এর সব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে চেষ্টা করি। আরেকটি কথা কাকতালীয় হলেও সত্যি গনশক্তি আমার জমজ ভাই, আমার জন্ম ৩/১/১৯৬৭. আমার বিবাহ বার্ষিকী ২১ শে জুন ১৯৯৫ আর পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের জন্মদিন ২১ শেষ জুন ১৯৭৭. পার্টির ভালো কাজের জন্য গর্বিত হই। আবার পার্টির ভূল সিদ্ধান্তের জন্য দুঃখিত হই। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক
- জহর কান্তি দাস , ২৬-জানুয়ারি-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৫৪ টি নিবন্ধ
৩০-মে-২০২৬

২৭-মে-২০২৬

২৬-মে-২০২৬

২৫-মে-২০২৬

২২-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬