গানের প্রতি আগ্রহ আমার ছোটবেলা থেকেই। ক্লাস সিক্স-এ পড়তাম, সেই সময় থেকে আমি দোতারা বাজাই। আমার বাবা নীরেন্দ্রনাথ মণ্ডলের একটা কাঁঠাল কাঠের দোতারা ছিল। বাবা সেটা বাজিয়ে বিষহরি পদ্মাপুরাণের পালায় গান করতো। কোচবিহার জেলার এই বারোকোদালী, বক্সিরহাট, তুফানগঞ্জ এলাকাগুলিতে প্রচুর রাজবংশী মানুষের বাস। তাদের ‘বিয়া-শাদিতে’ এই মনসার গানের প্রচলন ছিল, এখনও আছে। সেই গান শুনেই দোতারা বাজাতে শুরু করি। বাবা অন্য প্রসঙ্গের গান করলেও প্রথম থেকেই ভাওয়াইয়া গান আমায় বেশি টানতো । আর আজ প্রায় চল্লিশ বছর ধরে সেই ভাওয়াইয়া গানই গেয়ে চলছি। চুয়ান্ন বছরে পৌঁছে এখনও ভালোবেসে সেই গানকে ধরে রেখেছি।
আমার পড়ালেখা এইচ এস পর্যন্ত। তুফানগঞ্জ কলেজের পাশে একটা ভাওয়াইয়া শিক্ষাকেন্দ্র ছিল সেসময়। কলেজে ক্লাস করার সময় সেখান থেকে দোতারার আওয়াজ ভেসে আসতো। সেই সুর শুনতে এতটাই ভালো লাগতো যে সেখানে ভর্তি হয়ে গেলাম। পরে জানতে পারি নাটাবাড়ির নরেন অধিকারী সেই দোতারা বাজাতেন। ওনার কাছেও শিখেছি। খুব গুণী শিল্পী, শিলিগুড়ি বেতার কেন্দ্রে গান গাইতেন। ভাওয়াইয়া গান বাদেও সেই একাডেমিতে নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র শেখানো হত। পাঁচ বছর সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে এরপর আস্তে আস্তে বিভিন্ন জায়গায় গান শিখি। সেই তুফানগঞ্জ ভাওয়াইয়া একাডেমি এখন আর নেই। আসামে গিয়েও শিখেছিলাম কিছুদিন।

আজকাল বছরের বিভিন্ন সময়ে এদিক সেদিক ভালোই প্রোগ্রাম হয়। আমায় কেউ গান গাইতে ডাকলে যাই। ওপেন ফাংশানেও ডাকে, আবার কিছু সরকারি অনুষ্ঠানেও ডাক পড়ে। তবে গানবাজনার ক্ষেত্রে আগের আর এখনকার পরিস্থিতি আলাদা। আগে মঞ্চে দর্শকদের সামনে একটা গান গাইতে পারাই অনেক আনন্দের ছিল। এখন সবার আগে টাকা পয়সার বিষয় চলে আসে। তাছাড়া আগে গানবাজনা শেখারও একটা চাহিদা ছিল, আগ্রহ ছিল। গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ছিল অনেক। এখন সেগুলি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে ।
আব্দুল জব্বার আমার খুব প্রিয় একজন ভাওয়াইয়া শিল্পী। আসাম থেকে তিনি একবার বেঙ্গলে প্রোগ্রাম করতে আসেন। তুফানগঞ্জ কলেজের মাঠে সেবার ওপেন ফাংশানে গান শুনে তাঁর প্রতি একটা গভীর শ্রদ্ধা জন্মায়। এরপর থেকে তাঁর গানগুলি নিজে নিজেই গাওয়ার চেষ্টা করতাম। বর্তমানে প্রকৃত অর্থে ওনার গানগুলোই আমি বেশি গাই। সঙ্গীত জগতে আমার এভাবেই ধীরে ধীরে প্রগতি হয়েছে ।
এখন আমার মেয়ে সাগরিকা মণ্ডল আমার কাছেই প্রাথমিকভাবে গান শিখছে। ওর বয়স আঠারো বছর, উচ্চমাধ্যমিক দিচ্ছে এবার। ছেলে, চোদ্দ বছর বয়স, কিশোর মণ্ডল, ক্লাস সেভেনে পড়ে, কিন্তু গানের বিষয়ে তার সেরকম কোনও আগ্রহ নেই। মেয়েকে পরবর্তীতে বারোকোদালীর ভাওয়াইয়া একাডেমিতে ভর্তি করার ইচ্ছা আছে। আগে ওখানে গুণী শিল্পী যুথিকা সরকার গান শেখাতেন। আমি যখন শিখতাম এরকম সঙ্গীত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম থাকলেও ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ছিল প্রচুর। আর এখন প্রতিষ্ঠান বাড়লেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম। শুনেছি ইদানীং কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়েও নাকি ভাওয়াইয়া গানের কোর্স চালু করেছে। আমি কখনও সেখানে যাইনি তাই বিশদে কিছু জানি না।
আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। জায়গাজমিও সেরকম নেই, যতটা ছিল তার মধ্যে বেশ কিছুটা বোনেদের বিয়ের সময় বিক্রি করতে হয়। চাষাবাদও সেরকম হত না। সম্পূর্ণ প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বছরে একবার আউশ ধান ফলানো হত। কোনওরকমে চলে আমাদের। আমি নিজের জমিতেও কাজ করতাম, পরের জমিতেও করেছি। পাশাপাশি গানবাজনা চালিয়ে গেছি। ২০০৬ সাল থেকে আমাদের গ্রাম ভারেয়া-তে পিএইচই (PHE জলের পাম্প)-র ক্যাজুয়াল ডেইলি ওয়েজ কর্মী হিসেবে যুক্ত হই। বর্তমানে মাসের শেষে সেখান থেকে বারো হাজার টাকার মতো পাই। এখন দিনে কাজ করে গানবাজনা করার আর সময় পাইনা। তবে সপ্তাহে দু'সপ্তাহে একবার করে, আমার সঙ্গতকারদের নিয়ে সন্ধ্যা বা রাতের দিকে বসি আরকি। যেহেতু পরিবার-পরিজন আছে, সবদিক ট্যাকেল (সামলাতে) করতে হয়। এখন মাঝে মাঝে ভাবি, যদি প্রথম থেকেই গানের প্রতি আরও একটু বেশি শ্রম আর সময় দিতে পারতাম আজ আরও ভালো জায়গায় পৌঁছতে পারতাম। পাশাপাশি এও জানি, যারা সবসময় গানবাজনা করে বেড়ায় তাদের পরিবেশ পরিস্থিতি আলাদা। আমি যে জায়গায় আছি শুধু গানবাজনা করলে চলবে না। করলে আমার পেছনে (পরিবারে) যারা আছে তারা অনেক ঘাটতিতে থাকবে। প্রোগ্রাম তো সবদিন হবে না, কিন্তু সঙ্গীতের পেছনে লেবারটা আমার সবদিন দেওয়া লাগবে।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
বিশ্বকর্মা বা দুর্গাপূজার পর থেকে মোটামুটি বৈশাখ জৈষ্ঠ্যমাস পর্যন্ত গানের প্রোগ্রাম চলে। আসামে বিহুর সময় মাসে গড়ে তিন চারটে প্রোগ্রাম করি। আমি মূলত একক শিল্পী হলেও প্রোগ্রাম-এ আমার পাঁচজন সহযোগী শিল্পী সঙ্গে থাকে। কেউ বাঁশি, কেউ ঢোল, কেউ দোতারা, আবার কেউ ঝুরি বাজায়। তুফানগঞ্জ ২ ব্লক-এর ভেতরেই আমি সরকারি প্রোগ্রাম করি। আগে মাসে মাসে সরকারি প্রোগ্রাম হলেও আজকাল একটু কম হয়। তবে বিগত দশ বারো বছর থেকে মাসে হাজার টাকা করে শিল্পী ভাতা পাচ্ছি। এখন তো চারপাশে বহু শিল্পী তাই প্রোগ্রামেও আমাদের রোটেশন-এ ডাক পড়ে। সবস্তরের শিল্পী আছে - কামদেব আছে, বিষহরা আছে, ভাওয়াইয়া আছে। একক শিল্পী যেমন আছে দলগত শিল্পীও আছে। সরকারি প্রোগ্রাম-গুলোতে টাকার গণ্ডি ঠিক করাই থাকে। অনেক সময় উন্নয়নমূলক বা সচেতনতামূলক বিষয়ের ওপর গান করতে হয়। বরং বাইরের ওপেন ফাংশান-এ গান করতে গেলে মোটামুটি পনেরো হাজার টাকা মেলে। তার থেকে সঙ্গতকারদের হাজার, দেড় হাজার করে দিতে হয়। একটা গানে বাজাক আর দশটা গানে বাজাক। তাছাড়া যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ তো থাকেই। তবে আমাদের সেরকম কোনও ডিমান্ড থাকে না। যারা প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন তারা মোটামুটি জানেন। টাকা পয়সা যাই হোক এইসব ওপেন প্রোগ্রামে শিল্পীদের আপ্যায়নটা বেশি করে।

আমার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান না থাকলেও কাজের পর দুই একজনকে গান শেখাই। যদিও নিয়মিত সময় বের করতে পারি না।পরিবার-পরিজনের প্রতি লক্ষ রেখে যতটুকু পারি করি। আবার সবসময় পরিস্থিতি বা ইনকাম ভালো হলেই ভালো শিল্পী হওয়া যায় না। সেটা আলাদা বস্তু। পাশাপাশি দুটোই প্রয়োজন।
বর্তমানে পরিস্থিতি আলাদা, মানুষের মধ্যে দলাদলি বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। তবে একমাত্র গানই পারে আমাদের মধ্যেকার সমস্ত বিভেদ ভুলিয়ে দিতে। গানের, সুরের সেই ক্ষমতা আছে- এ আমার বিশ্বাস। গান সম্প্রীতির কথা বলে, মানুষে মানুষে মেলবন্ধনের কথা বলে। আব্দুল জব্বারের একটি গানে যেমন বলেছে – ‘একই দ্যাশে থাকি আমরা, আমরা ভাই ভাই…একই নদীর পানি খায়া বাঁচাই আমরা প্রাণ, আমরা হিন্দু মুসলমান…আমরা এক মায়ের সন্তান।’
মানুষ তো আশাবাদী তাই অনেক কিছু আশা করে। যদিও পরিস্থিতির চাপে সব আশা পূরণ হয় না সবসময়। এখন আমার যা পরিস্থিতি তাতে নতুন করে খুব একটা আশা করি না। তবে বিভিন্ন জায়গায় আরও সঙ্গীতচর্চা কেন্দ্র গড়ে উঠবে, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা লোকগান শিখবে এই আশা করি। আর যেহেতু গানটা আমি নিজে ভালোবাসি, তাই যতদিন আছি গানও আমার সাথে থাকবে। পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মও যাতে গান ভালোবাসে, সেই প্রচেষ্টা করে যাবো ।
[ভাওয়াইয়া উত্তরবঙ্গের মাটির গান। পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দুই দিনাজপুর, আলিপুর জেলায় ও আসামের গোয়ালপাড়া, ধুবড়ি, কোকরাঝাড়ে ভাওয়াইয়া গান বহুল প্রচলিত। এছাড়া পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের রংপুর ও নেপালের কয়েকটি জেলার বিভিন্ন অঞ্চলেও এই গান গাওয়া হয়। এই গানের ভাষা রাজবংশী বা কামরূপী। দোতারা সহযোগে গাওয়া ভাওয়াইয়া গানের ধরন অঞ্চলভেদে পৃথক হলেও এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথাই ফুটে ওঠে। হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতির কথা যেমন কোনও গানে শুনতে পাই, তেমনই চাষীদের জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে বহু গান। আবার দেহতত্ত্বের কথা থেকে গ্রামীণ মানুষের সাংসারিক জীবনের ছবি ফুটে আছে কোনও কোনও গানে। ভাওয়াইয়া গানের শিল্পীদের বলা হয় ‘বাওদিয়া’। গানপাগল বিবাগী স্বভাবের জন্যই সম্ভবত এরকম নামকরণ। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই লোকগানের প্রতি প্রশাসনের যতটা যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। শিল্পী ভাতা দেওয়া হলেও ভাওয়াইয়া গানকে বাঁচাতে হলে সরকারের আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন শিল্প দরদী মানুষেরা। রাজ্য ভাওয়াইয়া উৎসবকে কেন্দ্র করেও রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ। বিগত কয়েকবছর ধরে এই সরকারি অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যস্তরের একটি প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার হিসাবে দেওয়া হয় মাত্র পনেরো হাজার টাকা। শিশু বিভাগ না থাকায় একজন আট নয় বছরের শিল্পীকেও ষাটোর্ধ্ব শিল্পীর সাথে একই বিভাগে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। ফলে নতুন শিল্পীরা এই গানের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্টিফিকেট কোর্সের বদলে পূর্ণ সময়ের কোর্স চালু করারও দাবি রয়েছে।]
অনুলিখন ও ছবি: শুভঙ্কর সরকার
🔍︎পড়ুন আমাদের কথা: —পদ্মার সঙ্গেই ভাঙছে জীবন —শেষ কাজ পেয়েছি চার বছর আগে আষাঢ়ে —ক’বছর বাদে না থাকবে তাঁত, না থাকবে তাঁতি
প্রকাশের তারিখ: ২৪-ডিসেম্বর-২০২৫ |