সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শেষ কাজ পেয়েছি চার বছর আগে আষাঢ়ে
লক্ষ্মী মুণ্ডা
এখনও যদি নতুন করে কাজ পাই তো ভাল হয়। আর তো বেশিদিন খাটতে পারব না, এখন কাজটা পেয়ে গেলে কিছু রোজগার করতে পারতাম। কাজ পেলে আর কোনও সমস্যা থাকে না সংসারটায়, শরীর বসে গেলে তো কাজও করতে পারব না— এসব নিয়ে মনটা খারাপ হয়ে আছে। তবে আমাদের কথা আর কী, এখানে রোজগার কোথায়? এখন সব ছেলেরা বাইরে চলে যায়। সেখানে রোজগার ভাল।

আমার বিয়ে হয়েছে একটু বেশি বয়সেই। কুড়ি-বাইশ হবে। এখন বাড়িতে আমি আর আমার বর থাকি। ভাই-টাই কেউ নেই, তাই আমার অসুস্থ মাকে নিয়ে এসেছি। বাপের বাড়ি দেবীপুর পানপাড়ায়, এই পাণ্ডুয়া ব্লকেই। মা ছোটবেলায় গ্রামের প্রাথমিক ইস্কুলে আমায় ভর্তি করে দিয়েছিল। পড়তে পারিনি, ওয়ান অবধি পড়েছি। আসলে আমি পেটে থাকতে বাবা মারা গেল। মা একা মাঠে খেটে দুই দিদি আর আমায় মানুষ করেছে। মা যখন খাটত, তখন চার আনা না আট আনা, কত যেন রোজ ছিল। তারপর আমি যখন থেকে খাটতে শুরু করলাম তখন থেকে মায়ের একটু সুখ হয়েছে। আমার বয়স তখন কত হবে— পনেরো কি ষোল। তখন রোজের মজুরি পেতাম ১৪ টাকা। এখনও সেই মাঠেই খেটে খাই— এখন রোজ পাই ২০০ টাকা, সঙ্গে ২ কিলো চাল, আর শুকনো দিলে ২২০ টাকা। রোয়াতে ১৫টা কাজ, নিড়ানোর সময় ১৫টা। সব মাসে তো কাজ না, শুধু সিজনে। কাজ মাঠে ভাল জোটে না আমদের। ধান কাটার মেশিন আসার পর, আরও কম। এ গ্রামে খেটে তারপর যদি সময় গুছোতে পারি বাইরে কাজে যাই, বাসে চেপে, টোটো ভাড়া করে— দূরের গ্রাম।

১০০ দিনের কাজের জব কার্ড হয়েছে শ্বশুর বাড়ি এসেই। প্রথম কাজ পেয়েছি ২০০৮-এ। মাটি কাটার কাজ, পুকুর কাটার কাজ— শুরু থেকেই খেটেছি। শেষটায় পয়সা বাকি ছিল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিল। ভেবেছিলাম, আর কাজে যাব না। পয়সা না পেলে খাটব না। তারপর দিয়ে দিয়েছে সেই পয়সা। চার বছর আগে আষাঢ় মাসে (জুন, ২০২১) শেষ কাজ পেয়েছি। তারপর কাজ দিয়েছে গ্রামে, কিন্তু নাম দেয়নি আমাদের, তাই কাজ পাইনি। আমরা বিডিওতে গেছি। কোনও লাভ হয়নি। তাতে আবার অঞ্চলে বকাবকিও করল। এখন কাজ চাইতে গেলে কীসব বলে, ছবি না কি মিলছে না। কী বলব? যাই ঘুরে চলে আসি। আমাদের চোখ থাকতে অন্ধ, আমরা কি লেখাপড়া জানি যে কিছু বলব! একবার ভাবি আর অঞ্চল অফিসে যাব না। আবার ভাবি, যদি কাজ হয়। আমাদের ভবিষ্যতটার কী হবে? এখনও তো বেকার হইনি যে বেকার ভাতা পাব। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দেয় বলে, চলে। তাছাড়া কিচ্ছু পাই না। বারো মাস অসুখবিসুখ, আমার স্বামীর অপারেশান হল, অসুস্থ মাকে নিয়ে এসেছি। আমারও তো শরীর খারাপ। মণ্ডলাইয়ে সাব-সেন্টার থেকে ওষুধ নিয়ে এসেছি। হাতে পয়সা পেলে ডাক্তার দেখাতে পারতাম। পুরানো কথা ছেড়েই দিলাম, এখনও যদি নতুন করে কাজ পাই তো ভাল হয়। আর তো বেশিদিন খাটতে পারব না, এখন কাজটা পেয়ে গেলে কিছু রোজগার করতে পারতাম। কাজ পেলে আর কোনও সমস্যা থাকে না সংসারটায়, শরীর বসে গেলে তো কাজও করতে পারব না— এসব নিয়ে মনটা খারাপ হয়ে আছে। তবে আমাদের কথা আর কী, এখানে রোজগার কোথায়? এখন সব ছেলেরা বাইরে চলে যায়। সেখানে রোজগার ভাল। পাণ্ডুয়ায় কোনও কারখানা তো নেই।
আমার স্বামী এখন শুধু মাঠে খাটে। তবে মাঠে খেটে তো শুধু হয় না। তাই বাইরে জোগাড়ের কাজও করতে যেত আগে। অনেক কাজ করত। এখন আর শরীরে পারে না। লেখাপড়া জানি না তো আমরা, তাই কাজে মার খেয়ে গেছি। নাইলে কাজে আমাদের হারাতে পারত না কেউ! আগে জোগাড়ের কাজে ৬০/ ৭০ টাকা মজুরি ছিল। হাল্কা বয়স ছিল। বাইরে গিয়ে কাটোয়ার ওদিকে কাজ করত। এক বছর পর পর আসত। এখন বয়স হয়েছে, পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন হবে, তবে এখনও ১০০ দিনের কাজ পেলে করবে, তাছাড়া আর এখন তো উপায়ও নেই, বাইরে গিয়ে খাটতে তো পারবে না— শরীরে জোর নেই।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
আমাদের সংসারে রেশানের দু’ কিলো করে চাল আর দু’ প্যাকেট করে দু’ মানুষের আটা দিয়ে একটু ঠ্যাকনা হয়। ডাল টাল কিছু দেয় না। আগে চিনি দিত, এখন দেয় না। যেদিন পয়সা থাকে একটু সবজি নিয়ে আসে, ডাল হয় সপ্তাহে দুইদিন। মাছ, ডিম কিনতে পারি না। খাওয়া নিয়ে ভেবে কী করব? শরীর অসুস্থ হলে কার্ড দিয়ে গেছে বাবুরা, সেই দিয়েই চলবে। কার্ডের পরেও কিন্তু অনেক খরচা নিজেকে করতে হয় হাসপাতালে। আমাদের সন্তান নেই কোনও। গর্ভপাত হয়ে গেছে অনেকবার, সাত আটবার বাচ্চা নষ্ট হয়েছে। কেন জানি না। চিকিৎসা করাতাম, তবে মাঠে খেটে কাজ করব, না ডাক্তার দেখাব? আর তাছাড়া গরীব মানুষ কি বড় ডাক্তার দেখাতে পারে? টানাটানিতেও কোনওদিন বাইরে থেকে ঋণ নিইনি, আমাদের গ্রামে মেয়েদের যে গ্রুপ আছে সেখান থেকে অবশ্য ঋণ নিয়েছি। সেই দিয়ে ঘরটা প্লাস্টার করেছি। সবাই বলত প্লাস্টার না করলে মাটির দেয়াল ধুয়ে যাবে। এখন সেই ঋণ শুধব খেটে যা পারি তা-ই দিয়ে আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আছে, ওই দিয়ে। বেশি টাকা ধার নিই না, শুধতে পারব না।
আমাদের বেশি কিছু দরকার না। সবাই মিলেমিশে ভাল থাকব। মানুষের স্বাধীনতা বলতে এর বেশি কিছু বুঝি না। কারও সাথে তো ঝগড়াঝাঁটি করি না। তাও কাজ পাই না। কী করে ভাল থাকব!
[৪৮ বছর বয়সী লক্ষ্মী মুণ্ডা, তাঁর বর মধু মুণ্ডার সঙ্গে থাকেন হুগলির পাণ্ডুয়া ব্লকের মণ্ডলাই গ্রামে। গত চার বছর ধরে কাজের অভাব তাঁদের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে কঠিনতর করে তুলছে। গ্রামে সার্বিকভাবে কৃষি-অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় খেতমজুরির কাজও পাওয়া যায় বছরে মাত্র ৩০ দিন মতো। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি গ্রামের মতো মণ্ডলাই গ্রামেও ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসের পর থেকে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশানাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি যোজনার কাজ (১০০ দিনের কাজ) টানা বন্ধ রয়েছে। হাই কোর্ট-এর রায় অনুযায়ী গত ১ অগাস্ট, ২০২৫ থেকে কাজ ফের বন্টন শুরু হওয়ার কথা ছিল। হয়নি। গত ২৭ অক্টোবর ২০২৫ সুপ্রিম কোর্ট-ও হাই কোর্টের সেই রায়কে দ্রুত রূপায়ণের নির্দেশ দিয়েছে। তবু হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের সকল ১০০ দিনের কাজের শ্রমিকদের চার বছর আগের কাজের মজুরি বাবদ যে অর্থ, তা এখনও কেন্দ্রের বিজেপি চালিত এনডিএ সরকার দেয়নি। রাজ্য সরকার কিছু টাকা মেটালেও, বকেয়া রয়েছে খেটে দেওয়া কাজ বাবদ বিপুল পরিমাণ মজুরি। উপরন্তু চারটি অর্থবর্ষের বরাদ্দ কাজের অর্থ কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য ধার্যই হয়নি। তদুপরি রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের সীমাহীন দুর্নীতি— যা কি না এই কেন্দ্রের শাসকের শ্রমিক-মারা নীতির রূপায়ণের বড় অস্ত্র। এই দুর্নীতির নাম করে রাজ্যের শাসকের প্রতি কড়া কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে, কেন্দ্রের শাসক চার বছর ধরে আটকে রেখেছে শ্রমিকের বকেয়া মজুরি আর প্রাপ্য কাজ। দুই শাসকের একটিও এমজিএনরেগা-র বাধ্যতামূলক বিধি মেনে দেয়নি কোনও বেকার ভাতা (আনেমপ্লয়মেন্ট অ্যালাওয়েন্স)। চার বছর আগে কাজ থাকাকালীনও হকদার দরিদ্র শ্রমিককে ন্যায্যভাবে তাঁর প্রাপ্য কাজ দেয়নি রাজ্যের শাসক, উপরন্তু ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে নয়ছয় করেছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকের যৌথ নীতিহীনতা ও দুর্নীতির দ্বারা কার্যত এভাবেই বঞ্চিত ও প্রবঞ্চিত হয়ে চলেছেন লক্ষ্মী ও মধু মুণ্ডারা।]
অনুলিখন: উর্বা চৌধুরী
ছবি: তর্পণ সরকার
প্রকাশের তারিখ: ০৩-ডিসেম্বর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
