সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
গ্রামে থেকে রোজগারের উপায় নেই
রাজু দাস, তিরুবনন্তপুরম
প্রথমে এক দুই বছর খুব সমস্যা হয়। ভাষা কীরকম এখানকার জানেনই তো! তবে ভাষাটা শিখে যাওয়ার পর, আর পিছনে ফিরে তাকাইনি। এখন এখানেই কাজ করি, বাড়িতে টাকা পাঠাই।

আমার বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার লোচনপুর গ্রামে। ২০১৬ সালে কেরালায় আসি। এখানে আসি, নয় মাস, এক বছর কাজ করি, তারপর আবার বাড়ি যাই। আমরা খেটে খাওয়া মজদুর মানুষ। আমরা ৬ ভাই; বাড়িতে বাবা, মা, বউ, বাচ্চা আছে। ছয় ভাই মিলেই এখানে থাকি। আমি ২০১০ সালে মাধ্যমিক দি, ২০১২ সালে এইচ এস দিয়ে ইসলামপুর কলেজ ভর্তি হয়েছিলাম। ফার্স্ট ইয়ার শেষ করার পর, বাড়িতে প্রচণ্ড আর্থিক সংকট দেখা যায়। কলকাতায় কাজ করেছিলাম কয়েকদিন। তবে যা মজুরি পেতাম, তা যথেষ্ট মনে হয়নি। সময় মতন পয়সা আসত না। কেরালায় দিনের শেষে মজুরি হাতে দেওয়া হয়। বাড়িতে বাবাকে যথেষ্ট টাকা পাঠাতে পারি।
পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা জানেন-ই তো। কয়েকদিন আগে স্কুল নিয়ে যেটা হলো। কতজন টিচার-এর চাকরি গেল। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ র পরে কোনো উন্নয়ন হয়েছে কি ? আগে কলকাতা দেশের প্রধানতম শহরগুলির মধ্যে ছিল। এখন অনেক পিছিয়ে গেছে। কেরালায় আসল ব্যাপার হলো, কেরালার মানুষ ভালো। আমি এখানে দোকানে কাজ করি। আমরা ছয় ভাই মিলে তিরুভানন্থাপুরামে থাকি। যা রোজগার হয়, তাতে গ্রামে এখন জমি হয়েছে। আগে ছিলনা।
আমাদের গ্রামে অনেক বছর হলো ১০০ দিনের কাজ নেই। তাই গ্রামে থেকে পয়সা করার কোনো উপায় নেই। তাই এক বছর ইসলামপুর কলেজে পড়ার পর, যখন বড়দা বলল, “এখানে আয়, কাজ আছে”, আমি কেরালায় চলে যাই। এখানে অনেক অন্য রাজ্য থেকেও শ্রমিকরা আসে। আমি তাদের ঘর ভাড়া দিই।
আমাদের গ্রামের স্কুল বন্ধ হওয়ার মুখে। ওখানে এখন ঠিক মতন পড়াশুনো হয়না। আমাদের গ্রামের বাচ্চারা শুধুমাত্র মিড ডে মিলের জন্যই যায়। আমরাও আমাদের পরিবারের সন্তানদের বেসরকারি স্কুলেই পড়ানোর চেষ্টা করবো। যত সমস্যা হোক। এই সময় সরকারি ইশকুল ঠিকমতন চালানোর জন্য সরকারকে বাধ্য করা প্রয়োজন। কেরালায় কেউ যদি ১২ ক্লাস অব্দিও পড়তে চায়, তার কোনো বাড়তি খরচা লাগে না। এখানকার ইশকুলে কম্পিউটার থেকে শুরু করে সবকিছু আছে।
শুধু তাই নয়, আমাদের গ্রামে ১০০ দিনের কাজের মাধ্যমে যেই পরিকাঠামো হত, তাও আর হয়না। ধরে নিন বাড়িতে এসে নেতারা বললেন, “ তোর বাড়িতে একটা টিউব ওয়েল করে দেব, আমায় কিছু টাকা দিস”। অর্থাৎ, এমন দেখানো হবে, যেনো কোনো ঘুষ নেওয়া হচ্ছেনা। কিন্তু তা কি আর কেউ শোনে! যদি আপনি টাকা না দেন, তাহলে অন্যের বাড়ির টিউব ওয়েল টা হবে, কিন্তু আপনারটা হবেনা। ধরে নিন, ঢালাই এর কাজ, টিউব ওয়েল বানানো, অথবা ট্যাঙ্ক বানানো। যদি আপনি নেতাদের টাকা দেন, তবেই হবে।
এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আর সে রাজনীতি নেই। এখন বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমি মুসলিম আপনি হিন্দু। পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো জেলায় রাজনীতিবিদরা উন্নয়ন নিয়ে ভাবেনা, শুধু কে মুসলিম, কে হিন্দু কে খ্রিস্টান। খালি মসজিদ আর মন্দির! রাস্তার মতন গুরত্বপূর্ন পরিকাঠামোর কোনো উন্নতি নেই। আমাদের যে শিক্ষা হলনা, রাস্তা হলনা, তা নিয়ে কারোর মাথা ব্যাথা নেই।
গ্রামের রাস্তা গ্রামের ইজ্জত। যদি রাস্তা ভালো হয়, তাহলে একজন রুগিকে নিয়ে সঠিক সময় হাসপাতালে যাওয়া যায়। আমাদের গ্রামের রাস্তার করুন অবস্থা। হাইওয়ে ছাড়া লোকাল রাস্তার কোনো কাজ হচ্ছেনা। আমার গ্রাম থেকে বহরমপুর সিটি হাসপাতাল ৫২ কিলোমিটার দূরে, আর লালবাগ হাসপাতাল ২২ কিলোমিটার দূরে। ভৈরব নদী পার করে যেতে হয়। ওখানে ব্রিজ উন্নত ভাবে তৈরি করার কোনো চিন্তা আমাদের বিধায়ক - সৌমিক হাসানের নেই। রাস্তাটা তো আর আমি চাইতে পারব না! সেটা তো উপযুক্ত জায়গায় বিধায়ককেই চাইতে হবে। আমি চাইব পঞ্চায়েতের কাছে, পঞ্চায়েত চাইবে জেলা পরিষদের কাছে। তারপর তো বিধায়ককেই চাইতে হবে!
গেল মরশুমে বাড়ি গেছিলাম। বর্ষার সময়। কলকাতায় নামলাম দুটোর সময়। তারপর শিয়ালদহ থেকে লালবাগ স্টেশনে পৌঁছলাম রাত আটটায়। সেখান থেকে আমার গ্রামের কাছের ঘাট অব্দি পৌঁছতে আরও এক ঘন্টা লাগল। আমি টোটো কে যেতে বললাম, ১০০ টাকাও দিতে রাজি হলাম, তবুও যেতে চাইল না। কারণ রাস্তাটা খারাপ। রাস্তা ভালো হলে, গাড়ি যেত। ধরুন সরকার ১০০ টাকা বরাদ্দ করল কোনো রাস্তার জন্য। বিধায়ক সেখান থেকে ৩০ টাকা নিল, জেলা পরিষদ নিল ১০ টাকা, পঞ্চায়েত সমিতি নিল ১০ টাকা, আর গ্রামের প্রধান বা মেম্বাররা নিল আরও ১০ টাকা। শেষ পর্যন্ত ৫০ টাকা এসে পৌঁছায় কন্ট্রাক্টরের হাতে। সে তখন ভাবে, 'সবাই তো খেল, আমারও তো সংসার আছে।' সে সেখান থেকে আরও ১০ টাকা নিজের জন্য রেখে দিলে মাত্র ৪০ টাকায় কি ভালো রাস্তা হওয়া সম্ভব? আমাদের মুর্শিদাবাদে গিয়ে দেখবেন, রাস্তা আজ তৈরি হলো তো কাল ভেঙে গেল। কেন ভেঙে গেল? কারণ ওই ১০০ টাকার মধ্যে মাত্র ৩০-৪০ টাকা কাজের পেছনে খরচ হয়েছে। বাকিটা তো সব পকেটে গেছে। বিধায়ক যদি ৩ কোটি টাকাও পায়, তার তো উচিত, অন্তত দু কোটি টাকা উন্নয়নের পেছনে খরচা করার! কিন্ত না। ওরা বেশিরভাগটাই নিজেদের পকেটে রাখতে চাইবে।
পশ্চিম বাংলার বর্তমান সরকার সব দোষ খালি আগের সরকারের ওপর চাপাতে চায়। তবে, আমি আগেরটা কেন দেখব? আমি দেখব এখন কেন উন্নয়ন হচ্ছে না! আগে তো আমি ছিলাম না! আমাদের পশ্চিমবঙ্গে সব জায়গায় দুর্নীতি। কয়েকদিন আগে বাবাকে নিয়ে নীল রতন সরকার মেডিকল কলেজে গেছিলাম। সকাল নটায় কলকাতায় পৌঁছলাম। ওখানে গিয়ে দেখলাম লম্বা লাইন। একটা টিকিট নিতে ১১ টা/ ১২ টা বেজে যাচ্ছে। যখন ওখানকার একজনের থেকে অনলাইন টিকিট নেওয়ার চেষ্টা করলাম, সে ৫০ টাকা চেয়ে বসলো! কেরালার মেডিকল কলেজে কখনও এরকম হবেনা! এখানকার ব্যাবস্থা আর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত।
আমাদের গ্রামে কিছু বছর আগে জলের জন্য পাইপ লাগানো হয়েছিল। তবে অনেকগুলো ভেঙ্গে গেছে; গ্রাম্য এলাকা বলে সারানো- ও হচ্ছেনা। আমাদের খাওয়ার জল অনেকসময় কিনে খেতে হয়। তবে কেরালায় সেরম না। কেরালায় যেই জল পান করা হয়, সেই জল ল্যাবে গিয়ে পরিক্ষা করা বাধ্যতামূলক। কোনো জীবাণু আছে কিনা, পরীক্ষা করা হয়, তারপর সেই জল পান করার জন্য উপযুক্ত বলা হয়।
এখানকার নারীদের নিরাপত্তা আছে। কলকাতায় একটি মেয়ে একা বাসায় থাকতে পারবে না। কোন মেয়ে যদি একা একটা ঘরে থাকে, তাকে কেউ কোনোভাবে উঁকি মেরে দেখতেও যাবেনা, আর হেনস্থাও করবে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেটা সম্ভব না। এখানে লকডাউনের সময়, উল্লুরের সব কটা বাড়িতে গেছি, সবাই আমাকে চেনে। এখানকার মানুষের কোন অহংকার নেই। এখানে আমি ড্রাইভিং লাইসেন্স বানিয়েছি, ২৫ পয়সাও ঘুষ দিতে হয়নি। কিন্ত পশ্চিমবঙ্গে সেটা সম্ভব না। বার বার ঘুষ দিতে হয়।
শুধুমাত্র পয়সা কামানোর জন্য আমাদের গ্রাম থেকে অনেক মানুষ চলে যাচ্ছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে সেরকম কাজ নেই! কেরালায় গ্রুপ ডি সরকারি চাকরি তারাই করে, যাদের আর কোনো উপায় নেই। তবে পশ্চিমবাংলায় এম এ পাশ করে লোকজন গ্রুপ ডি’র চাকরি করতে চাইছে! পশ্চিমবঙ্গের উন্নতি সেদিনই হবে, যেদিন মানুষ বুঝতে পারবে তাদের আসলে কী প্রয়োজন। তাদের উচিত, যেই সরকার কোন উন্নয়ন করেনা, সেই সরকারকে ফেলে দেওয়ার।
কেরালার মুখ্যমন্ত্রী কয়েকদিন আগে ঘোষণা করল এখানে আর চরম দারিদ্রসীমার নীচে কেউ নেই। কিন্ত, পশ্চিমবঙ্গের কথা ভাবুন। হয়ত ৩০ শতাংশই দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে!
[লেখকের বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার লোচনপুর গ্রামে। ২০১২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছিলেন। কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে কেরালায় চলে আসেন ২০১৬ সালে। বর্তমানে তিরুবনন্তপুরমে একটি দোকানে কাজ করেন। লোচনপুর থেকে বহুদূরে তিরুবনন্তপুরমে বসেই বলেছেন নিজের কথা। লেখক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, তাই এই লেখায় তার নাম পরিবর্তন করা হল।]
অনুলিখন: আনন্দরূপা ধর
প্রকাশের তারিখ: ১১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay









