Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

বিড়ি‌ বেঁধেই সন্তানদের মানুষ করছি

সাবিনা বিবি, বিড়ি শ্রমিক
বিড়ি বেঁধে যে টাকাটা রোজগার করি সেটাও জমাতে পারি না। তিনদিন বিড়ি বেঁধে একশো আশি-পঁচাশি টাকা পাই। হাজার বিড়ি যদি বেঁধে দিই তার মধ্যে কিছু বিড়ি নষ্ট হয়ে যায়, ছিঁড়ে যায় বলে বাদ যায়। তখন সেটার টাকা আমরা পাই না। আবার এমনি কিছু বিড়ি নিয়ে নেয়। হাজারের মধ্যে দুশো বিড়ি বাদ গেলে আটশো বিড়ির টাকা পাই। সেই টাকাটাও আর জমে না।
I am bringing up my children by making beedis

আমি বিড়ি বাঁধার কাজ করি। একবারে হাজার পাতা মতো নিয়ে আসি। তারপর সেটাকে ভিজাই, কাটি। কাটার পর আবার ওটাকে বাঁধো, মোড়াও, তারপর মুঠো করো। তারপরে দিয়ে আসা হয়। খুব পরিশ্রম হয়। আমার বাড়িতে আমি একাই কাজটা করি। এক হাজার বিড়ি বাঁধতে লাগে ধরুন অন্তত তিন দিন সময় লাগে। এর সঙ্গে বাড়িতে রান্না-বান্না, বাসন-কোসন মাজা, ঝাড়াঝুড়ি— যা সংসারের কাজ সব-ই করতে হয়। ভোরবেলা উঠে বাড়ির কাজ-কর্ম করি। খাওয়া-দাওয়া সেরে উঠতে উঠতে তিন-চারটে বেজে যায়। তারপর এই কাজটা নিয়ে বসি। রাত অব্দি কাজ করি।

আমার বিয়ে হয়েছে আঠেরো বছর বয়সে। আমি-ও স্কুলে পড়তাম, ফাইভ অব্দি পড়েছি। বিড়ি বাঁধার কাজে খুব কষ্ট। সারা শরীরেই কষ্ট হয়। সারাদিন যে বসে বসে বাঁধছি, কষ্ট হয় না বলুন? মাথায় লাগে, পিঠে লাগে। মাথা ঘোরে। অনেকের চোখে দেখতে অসুবিধে হয়। রাতে চোখে ভালো দেখা যায় না। এসবের জন্য ডাক্তার-টাক্তার কিছু কখনও দেখানো হয় না সেরকম। হসপিটাল আছে অনেক দূরে সাগরদিঘিতে। ওখানে গেলে ফ্রি-তে ওষুধ টষুধ পাওয়া যায়। কিন্তু ওখানে টোটো করে যেতে হয়। ভাড়া একশো টাকা লাগে। এখন আবার এক-এক জনের ষাট টাকা। আসা যাওয়া একশো কুড়ি টাকা। কিন্তু বড় হাসপাতাল ওখানেই। ডেলিভারির জন্য ওখানে যেতে হয়। মেয়েদের কোনও অসুখ বিসুখ হলে-ও ওখানেই যেতে হবে। থানা-ও ওখানে। এদিকে আমাদের রাস্তাটাও ভালো না। একেবারে ভাঙা। রাস্তা ভাঙা বলে অ্যাক্সিডেন্টে মানুষ মরে গেছে এই রাস্তায়। মা আর ছেলে মারা গেছে। ওই মহিলা স্বামীর সঙ্গে যাচ্ছিল মোটর সাইকেলে।  গাড়ি ঢুকতে চায় না রাস্তা এমন বলে। তাও আমাদের এই রাস্তা দিয়েই যাওয়া-আসা করতে হয়, উপায় নেই তাই। এমনি কিছু অসুবিধে হলে গ্রামেই দেখাই, আছে অনেক হাতুড়ে ডাক্তার আশে-পাশে।

মজুরিটা বড্ড কম। মজুরি বাড়াবার জন্য আমরা আন্দোলন করেছিলাম। আন্দোলন করে হাজারে দুশো দুই টাকায় এনেছিলাম। এখন কোম্পানির লোকেরা খরচ করে আসছে যাচ্ছে। গাড়ি ভাড়া টাড়া দিতে হয় ওদের। তাই আমাদের বলা হল একশো নব্বই টাকা করে দেবে। আমাদের গ্রামে প্রায় সব মেয়েরাই বিড়ি বাঁধে। বিড়ি বেঁধে কোনওরকমে সংসারটা চালায়। অনেকের বয়স হয়েছে, আর বাঁধতে পারে না। কিন্তু বিড়ি বেঁধেই তারা ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছে। লক্ষীর ভান্ডারের টাকা কেউ-কেউ নিয়মিত পাচ্ছে, আবার কারওর কারওর বন্ধ হয়ে গেছে। আমার জা, আমার মায়ের বিধবা ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মহিলার বন্ধ হয়ে গেছে। কেন জানি না। ওরাই জানে। বলে কাগজ জমা দাও। কতবার কাগজ জমা দেওয়া হল, কোনও সংবাদ নেই। কোন‌ও উত্তর নেই। 

আবার যারা পাই তারাও কিছুই জমাতে পারি না ওই টাকাটা। একশো-দুশো টাকা নিয়ে সকালে যদি যাই বাজার করতে, মাছ সবজি যাই কিনি ওই টাকাটার কিছুই তো আর বাড়ি ফেরে না। পকেটে করে টাকা নিয়ে বাজারে যায় মানুষ আর ব্যাগটা নিয়ে যায় বাজার নিয়ে আসার জন্য। আর এখন ব্যাগে করে টাকা নিয়ে যেতে হচ্ছে আর পকেটে মাল ভরতে হচ্ছে। দাম কেমন তাহলে বুঝে নিন। সবজি-তে হাত দিতে গেলে হাত পুড়ে যাচ্ছে। গরিব মানুষেরা কী করবে! বেগুন আশি টাকা, শাক বিক্রি হচ্ছে আশি টাকা কি একশো টাকা কেজি। নতুন আলু উঠল পঞ্চাশ টাকা কিলো। ডিম আটশো টাকা কার্টন ছিল, এখন হয়ে গেছে ষোলো শো টাকা। সকলের অবস্থা তো একরকম না। এখানের বেশিরভাগের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় এরকম অবস্থা। বিড়ি বেঁধে সংসারটা কোনও রকমে আমরা চালাই। আড়াইশো দুধের দাম লাগবে পনেরো টাকা। বিড়ি বেঁধে পাই আমরা একশো পঁচাশি টাকা। এক কিলো চাল পঁয়ত্রিশ টাকা। ভালো চাল চল্লিশ। কী করে দুধ কিনে বাচ্চাদের খাওয়াবো আমরা? এই তো অবস্থা এখন।     

আমাদের গ্রামের স্কুলটা ভালোই চলত। কিন্তু শিক্ষক খুব কম। প্রাইমারি আর উচ্চমাধ্যমিক দুটো স্কুল পাশাপাশি। আমার তিনটে ছেলে-মেয়ে। দুই মেয়ে, এক ছেলে। ওরা স্কুলে পড়ে। একটা ছেলে বাইরে গেছে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে।আমার বাচ্চারা বাড়িতেই হয়েছে। তখন কাছাকাছি ডাক্তার ছিল না, দেখানো হয়নি। ছোটটার বয়স ষোলো। এখন অবশ্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ছেলেটাও কাবিলপুর হাই স্কুলে পড়ত। আমরা গরিব, দিন-খাটা মানুষ। পড়াশোনাটা চালাতে পারল না। সামর্থ্য হল না। তিন-চার বছর আগে ওর বাবার টিবি হয়েছিল। চিকিৎসা করে এখন ভালোই আছে। সে-ও রাজমিস্ত্রির কাজ করে বাইরে। মাস গেলে ছেলে পায় বারো হাজার মতো, আর ওর বাবা আঠারো হাজার। বাড়িতে আমরা ছাড়া শাশুড়ি থাকে। আজকাল বেশিরভাগ বাচ্চা ছেলে একটু বড়ো হলেই বাইরে চলে যায় কাজ করতে। তারও কারণ আছে। বাড়িতে হাঁড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভাবছে খাটা-খাটনি করে লেখাপড়া করবে কিন্তু কাজ টাজ পাবে না। চাকরি পাবে না। তখন সংসারটা চলবে না। 

যাদের অবস্থা একটু স্বচ্ছল তারা ছেলে-মেয়েদের বাইরে স্কুলে পড়তে পাঠিয়ে দেয়। জঙ্গিপুরে মিশন স্কুল আছে। কলকাতায় আছে। এই গ্রামেও প্রাইভেট স্কুল আছে। অনেক আছে। গ্রামের সরকারি প্রাইমারি স্কুল-কে তারা ছাড়িয়ে যাবে। মায়েরা অনেকে বিড়ি বাঁধছে আর ছেলে-মেয়েকে একটু ভালো শিক্ষা দীক্ষা দেবে বলে কষ্ট করে প্রাইভেট স্কুলে দিচ্ছে। মাসে দুশো আশি, তিনশো এরকম খরচ প্রাইভেট স্কুলে। সেখানে অনেক টিচার আছে। ভালো টিচার আছে। ম্যাডাম আছে। ওরা পয়সা দিয়ে ভালো ভালো টিচার কিনে আনে। আরবি, ইংরেজি সব শেখায়। সরকারি স্কুলটায় যথেষ্ট শিক্ষকই নেই। চারটা ক্লাস হচ্ছে একসঙ্গে, চারটে শিক্ষক তো লাগবে। শিক্ষকের-ও দোষ নেই। কোন ক্লাসটা সামলাবে। 

এখানে ঋণ দিতে আসে বন্ধন ব্যাংক থেকে। এই বন্ধনে কত জনের বাড়ি চলে গেল। যারা নিয়েছে টাকা কেউ পারছে দিতে, কেউ পারছে না। না দিতে পেরে বাড়ি বিক্রি করে হয়তো চলে গেছে কোনদিকে। তাও নিচ্ছে অনেকেই। বিপদে পড়ে নেয়। ঘর করার জন্য নেয়, মেয়ের বিয়ের জন্য নেয়। সোনার যা দর! ঘরে ঘরে এখানে বন্ধন আছে। ওরা আসে এখানে গ্রামে। হয়তো প্রথমে দশ জনের সঙ্গে কথা বলল। তারপর আবার বাড়িতে বাড়িতে খোঁজ পাঠায়, টাকা ধার নেবে কিনা জিজ্ঞেস করে। আমার পাশের বাড়িতে নিয়েছিল। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা কয়েকজন নিয়েছিলাম। ঘর করার জন্য এই ঋণটা নিতে হল। আমাকে মাসে মাসে তেত্রিশশো টাকা করে কিস্তি দিতে হয়। দু বছর দিতে হবে এখন। কষ্ট করেই দিয়ে যাচ্ছি টাকাটা। 

বিড়ি বেঁধে যে টাকাটা রোজগার করি সেটাও জমাতে পারি না। তিনদিন বিড়ি বেঁধে একশো আশি-পঁচাশি টাকা পাই। হাজার বিড়ি যদি বেঁধে দিই তার মধ্যে কিছু বিড়ি নষ্ট হয়ে যায়, ছিঁড়ে যায় বলে বাদ যায়। তখন সেটার টাকা আমরা পাই না। আবার এমনি কিছু বিড়ি নিয়ে নেয়। হাজারের মধ্যে দুশো বিড়ি বাদ গেলে আটশো বিড়ির টাকা পাই। সেই টাকাটাও আর জমে না। আমি বিড়ি বাঁধার কাজ শুরু করেছি যখন তখনও আমার বিয়ে হয়নি। আমার বাড়িতে আর কেউ বাঁধত না। আমি শিখেছিলাম কাজটা। আমাদের পাড়ায় আরও অনেকে করত তাদের কাছে শিখেছি। যদি কখনও ছেলে ভালো কাজ পায়, কী স্বামীর রোজগার বাড়ে তাহলেও আমি বিড়ি বাঁধার কাজটা ছাড়বো না। এটা চালিয়ে যাবো।   

[ সাবিনা বিবির বয়স তিরিশের কোঠায়। মুর্শিদাবাদ জেলার কাবিলপুর গ্রামে সাবিনা বিবির পাড়ায় বেশিরভাগ মহিলা বিড়ি বাঁধার কাজ করেন। দুপুর গড়ালেই বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা একসঙ্গে বসে পড়েন বিড়ি বাঁধতে। গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষ বাইরের রাজ্যগুলিতে শ্রমিকের কাজ করেন। এ রাজ্যে বিড়ি শ্রমিকদের অধিকাংশই মহিলা। গৃহশ্রম বা দৈনন্দিন পারিবারিক শ্রমের পাশাপাশি মহিলারা এই কাজটা করেন। বেশ কিছু দিন টানা এই কাজ করলে নানা ধরণের শারীরিক সমস্যা ও জটিলতা তৈরি হয়। সরকারি তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার সুযোগ প্রায় কেউই পান না। আবার গোটা দেশে যে জেলাগুলিতে মাইক্রোফিনান্সের সংকট সবচাইতে তীব্র তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলা। দারিদ্র পিছু ছাড়তে চায় না বলে অসংখ্য পরিবার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। মাসে মাসে ঋণের কিস্তি জমা দেবার তাগিদেই অনেক মহিলা বছরের পর বছর অত্যন্ত অল্প মজুরিতে একটানা বিড়ি বাঁধার কাজ করে যান। বিড়ি শ্রমিকদের অনেক দিনের দাবি ২৬৭ টাকা মজুরি। তার সঙ্গে রয়েছে প্রতিটি শ্রমিককে বিড়ির কার্ড প্রদান এবং ৬০০০ টাকা পেনশনের দাবি। আন্দোলন চলছে দীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য রাজ্য সরকার নতুন করে কোনও ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করেনি। ঘোষণা করা হয়েছিল ২৬৭ টাকা ৪৪ পয়সা মজুরি দেওয়া হবে। বিড়ি শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি- অন্তত সেই মজুরিটা মালিকরা দিক। তাদের কথায়, সরকারি মদতপুষ্ট মালিকপক্ষ সেটুকু দিতেও নারাজ।]

অনুলিখন: শিঞ্জিনী সরকার
(লেখক ছবি প্রকাশে অনিচ্ছুক)  


প্রকাশের তারিখ: ২৮-জানুয়ারি-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আমাদের কথা বিভাগে প্রকাশিত ১০ টি নিবন্ধ
১৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

১১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৮-জানুয়ারি-২০২৬

১৪-জানুয়ারি-২০২৬

০৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩১-ডিসেম্বর-২০২৫

২৪-ডিসেম্বর-২০২৫

১৭-ডিসেম্বর-২০২৫

১০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৩-ডিসেম্বর-২০২৫