|
ক’বছর বাদে না থাকবে তাঁত, না থাকবে তাঁতিঅসিত প্রামাণিক |
আগে মজুরি পেতাম একেকটা শাড়ি পিছু অন্তত চারশো টাকার মতো। এখন সেটা নেমে এসেছে দুশো টাকায়। আমার একটা শাড়ি বুনতে দুটো দিন লাগে। তাহলে দিনে হল একশো টাকা। একশো টাকায় কী হয়? জিনিসের দাম তো বাড়ছে। কিন্তু আমাদের তাঁতিদের আয় কমছে।... একটা সময়ে আমাদের পাড়া গমগম করত তাঁতের শব্দে। প্রত্যেকের বাড়িতে দুটো একটা করে তাঁত। এখন সন্ধ্যেবেলা মনে হয় পাড়াটা মরে গেছে। পুরো শান্তিপুরের অবস্থাই তাই। |
এখন আর তাঁত বুনে চলে না। ক্লাস ফাইভের পর থেকেই তাঁতের কাজ করছি। বয়স এখন বাষট্টি। এই এতবছর তাঁত বুনছি, আগে ভালোই চলত। এখন আর একদমই চলে না। আমরা চার ভাইবোন। আমার বাবা তো তাঁত বুনেই আমাদের মানুষ করেছে। একটু কষ্ট করে হোক, তাও সংসার তো চালিয়েছে। আর এখন মজুরি-ই নেই। তাঁতি বাড়ি বাদেও অন্য অন্য লোকেরাও তাঁতের মধ্যে এসেছিল, তারাও আর থাকছে না। তাঁতই প্রায় নেই। তাঁতি বাড়িতে ছোট থেকে বড়— সবাই মিলেই কাজ করে। আমি ছোটবেলায় তাঁতের কাজ শুরু করেছিলাম তানা হাটা দিয়ে। তাঁতে সুতো চাপানোর আগে তানায় সেটা জড়াতে হয়। সেই তানার কাজ প্রথমে করতাম। কিন্তু থিয়েটার করব বলে শখ হল। নাটকের দলে যাওয়া আসা শুরু করলাম। একটা দুটো নাটকে পার্টও পেয়ে গেলাম। তখন দেখলাম যে তানা হাটলে হবে না। নিজের টাইম মতো তাঁত বুনতে পারব। তাতে রিহার্সালে বা শো-তে যেতে অসুবিধা হবেনা। বাড়িতেই তাঁত ছিল। বাবা কাকারা সবাই তাঁতই বুনত। ওদের কাজ দেখতে দেখতেই শিখে ফেললাম। তাঁতি বাড়িতে এটাই হয়। বাবা, কাকা, জ্যাঠার থেকে সেই বাড়ির ছোটরা শিখে নেয়। সেইভাবে তখন থেকেই চলছে। আমি আর আমার দাদা— দুজনেই বাড়িতে তাঁত বুনি। দুজন মিলে সারাদিন খেটেও দিনকেদিন সংসার টানা অসম্ভব হয়ে উঠছে। আগে মজুরি পেতাম একেকটা শাড়ি পিছু অন্তত চারশো টাকার মতো। এখন সেটা নেমে এসেছে দুশো টাকায়। আমার একটা শাড়ি বুনতে দুটো দিন লাগে। তাহলে দিনে হল একশো টাকা। একশো টাকায় কী হয়? জিনিসের দাম তো বাড়ছে। কিন্তু আমাদের তাঁতিদের আয় কমছে। আর কেউ তাই আসছেও না তাঁত বোনার কাজে। একটা সময় ছিল। খুব বেশিদিন আগেও না; বছর পনেরো হবে। আমাদের এখানে অন্য লোকে আসত তাঁত বুনতে। এমনকি ব্রাহ্মণ বাড়ির ছেলেরাও তাঁত বুনে খেয়েছে, এমন সময় ছিল। আমারই এক চেনা লোক, সে তাঁত বোনা ছেড়ে ইদানিং পুরোহিত হয়েছে। কী করবে? ওতে ঠিকঠাক রোজগার হচ্ছে। একটা সময়ে আমাদের পাড়া গমগম করত তাঁতের শব্দে। প্রত্যেকের বাড়িতে দুটো একটা করে তাঁত। এখন সন্ধ্যেবেলা মনে হয় পাড়াটা মরে গেছে। পুরো শান্তিপুরের অবস্থাই তাই। একটা পাড়া দেখলেই বাকি সব বোঝা যাবে। এমনকি বাইরে থেকে, বাসে করে সকালে কৃষ্ণনগর, কালনা থেকে লোকে আসত আবার বেলায় চলে যেত। তাহলে বাস ভাড়া দিয়েও তাদের পোষাতো বলেই তো কাজ করত। এখন আর সেসব নেই। আমরা বুনছি। কী করব? বয়স যা হয়েছে অন্য কাজেও নেবে না। আর কিছু শিখিওনি। তাও অনেকে বাইরে কাজে চলে যাচ্ছে। আমাদের পাশের পাড়া থেকেই সব ছেলেপিলে রাজমিস্তিরির কাজে চলে গেল। আমাদের বাড়িতে মেয়েরাও কাজ করত। সব তাঁতি বাড়িতেই তাই হয়। নলি পাকানো, সানাবোয়া, পাড়ি করা— এইসব কাজ বড়ির মেয়েরাই করত। সেই অবস্থাটাও পাল্টে গেছে। আগে বাড়ির মেয়েদের কিছু কিনতে বর বা ছেলের কাছে হাত পাততে হত না। আমার মা’কেই দেখেছি, পুজোর আগে ভোর তিনটেয় উঠে ঝিল্লি কাটত, সুতো পাড়ি করত, চরকা পাকাতো। এইসব কাজ করে সারাবছরই হাতে পয়সা থাকত। এখন চরকা, নলি সব ডাঁই হয়ে পড়ে আছে। উইয়ে খাচ্ছে। ইঁদুরের বাসা হচ্ছে দিনদিন। কেজি দরে বেচেও দিতে পারছি না। হ্যান্ডলুম অফিস থেকে বছর ছয় সাত আগে তাঁত দিল। আমিও পেয়েছিলাম। সে যাচ্ছেতাই নরম কাঠ, তুলোর মতন। ও তাঁত জুততে পারিনি। কিছু উইয়ে খেল। আর এখনও একটু পড়ে আছে। আর নরজগুলো এমন যে টিপলেই জল বেরোচ্ছিল। সরকার থেকে নাকি তাঁতঘর সারানোর জন্য পাঁচ হাজার করে টাকা দেবে। তার জন্য টিন, নাটবল্টু এইসবের বিল করে জমা দিতে হবে। সেসব বিল বানাতে গিয়ে তো একে-ওকে দিতেই কয়েকশো টাকা বেরিয়ে গেল। তারপর কাগজ জমা দিলাম। আজ তা প্রায় ন-দশ মাস হচ্ছে। ও টাকা কবে পাবো, আদেও পাবো কিনা, কেজানে। আমাদের জন্য সরকার কোনও সুরাহা করে না। মাঝে পাওয়ারলুম উঠেছিল। সেইসময় আমাদের হাতে বোনা তাঁতের মজুরি আরও কমে গেল। তখন পাওয়ারলুমে কিছু ছেলে কাজ করতে শুরু করল। ভালোই মজুরি পাচ্ছিল। সেও এখন উঠে গেল। র্যাপিয়ার এল। তাতে তো কারখানার মতো দু-শিফটে কাজ। মাস মাইনে। প্রথমে পনেরো হাজার করে পাচ্ছিল। এখন ওটাও কমে গেছে। পাঁচ ছ’ হাজার টাকা পায় খুব বেশি হলে। আর পাওয়ারলুমের মেশিন বেচে দিয়ে সব টোটো কিনছে। কোনোরকমে যেটুকু রোজগার হয় আর কী। আগে আমরা টিসু কাপড় বুনতাম। সেই কাপড় মাড় দিয়ে বুনলে মহাজন চারশো তিরিশ-পঁয়তিরিশ টাকা মজুরি দিত। তার এতই চাহিদা ছিল যে বাড়িতে মহাজন চলে আসত। এমনকি মহাজন অষ্টমীর দিনও বাড়ি চলে এসেছে, কাপড় দাও! আমি, দাদা, আমার অন্য চেনাপরিচিতরা অনেকেই টিসু কাপড় বুনত। আমরা তো ভেবেছিলাম সারাজীবন এই কাপড়ই বুনব, একই রঙের কাপড়ই বুনব। আর এখন মাসে রোজ কাজ নেই। যেকদিন কাজ পাই, তাতে গড়ে দিনে একশো টাকা হয় টেনেটুনে। কমিশনারের কাছে ইনকাম সার্টিফিকেট আনতে গেলে সে বলছে তোমার মাসে তিনহাজার আয় দেখানো যাবে না। বলে লিখে দিল, মাসে আট হাজার, বছরে ছিয়ানব্বই হাজার টাকা আয়। কাগজে কলমে তো তাহলে হয়ে থাকল ওটাই।
আমার পায়ের সমস্যা। ডাক্তার বলল হাঁটু পাল্টাতে হবে। কিন্তু কীকরে করব? অত টাকা খরচ। আমাদের যা অবস্থা তাতে সেটা করার কথা ভাবতেও পারব না। এইভাবেই সমস্যা নিয়েই চালাচ্ছি। হাঁটু ঠিক নেই বলে অনেক নাটকেও এখন পার্ট করতে পারি না। আমার ভাইপো পড়ালেখা করেছে। ওর বয়সীরা কেউ তাঁতের দিকে আসেনি, আসবেও না। ও ছোট একটা ক্যাজুয়াল পোস্টে চাকরি করে। সেখানেও চারমাস মাইনে নেই। চারিদিকেই তো এই অবস্থা। কষ্ট করে দিন চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের কষ্ট জানানোর মতোও কেউ নেই। কোনও সরকারের সাহায্যও নেই। ওই যে প্রচার করে দিল যে তাঁতিদের ঘর বাবদ পাঁচ হাজার করে দেবে। আজও দিল না। এদিকে প্রচার হয়ে গেল। ভোটের সময় দু-চারজনকে হয়ত দেবে। ব্যাস, হয়ে গেল! এইভাবেই চলছে। টেনেটুনে। আমরা তাও টিমটিম করে টিকে আছি। কিন্তু আর ক’বছর বাদে না থাকবে তাঁত না থাকবে তাঁতি। [তাঁত শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে শান্তিপুরের ইতিহাস সুপ্রাচীন। এখানকার তাঁত শ্রমিকেরা মূলত উজ্জ্বল, টেকসই রঙের কাপড় বোনার জন্যই প্রসিদ্ধ ছিলেন। ভাগীরথী তীরবর্তী ও সপ্তগ্রাম বন্দরের নিকটস্থ হওয়ায় এখানকার কাপড় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েও যেত। ইংল্যান্ডের মিলের কাপড় বিশ্বজুড়ে বিক্রির জন্য যেভাবে বাংলার আর সমস্ত বয়নশিল্পের কেন্দ্রগুলিকে ধ্বংস করা হয়, সেই আঁচ শান্তিপুরেও লাগে। তারপরে দেশভাগের ফলে সুতোর আমদানির পথটি বাধাপ্রাপ্ত হয়। পরবর্তীতে মঞ্জুষা-র মতো প্রতিষ্ঠান ও সমবায়গুলির মাধ্যমে ৮০ ও ৯০-এর দশক জুড়ে তাঁত শ্রমিক ও তাঁত শিল্পের অনেকটাই মানোন্নয়ন ঘটে। যদিও শেষ দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের সমবায় ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। হ্যান্ডলুমের বদলে পাওয়ারলুমে এসে ছেদ ঘটিয়েছে তাঁতিদের পারম্পরিক দক্ষতার চলনে। পাওয়ারলুমের অতি উৎপাদনে হু হু করে দাম কমেছে। তাঁতি পরিবার ঘিরে যে চিরাচরিত অর্থনীতির চক্রটি ছিল সেটিও অস্তগত। পুরো দেশেই তাঁতিদের অবস্থা সংকটজনক। ২০২০ সালের সেনসাস রিপোর্ট অনুযায়ী এদেশের ৬৬% তাঁতিদের মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকার কম। মূলত মহারাষ্ট্র ও গুজরাট থেকে আসা সস্তা, মোটা সুতোয় বাজার ছেয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সুতোর বাজারও কমে গেছে, মোটা সুতোয় তৈরি হ্যান্ডলুমের শাড়ি হারিয়েছে তার গৌরব। তাই এখন অসিত প্রামাণিকের মতো কিছুমাত্র তাঁত শ্রমিকই টিকে আছেন, বাকি বেশিরভাগ তাঁত শিল্পীই এখন— হয় পরিযায়ী শ্রমিক না হয় অন্য কোনও পেশায় চলে গেছেন।] অনুলিখন ও ছবি: তর্পণ সরকার 🔍︎পড়ুন আমাদের কথা:
প্রকাশের তারিখ: ১৭-ডিসেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |