ভারতীয় গণতন্ত্র ও বামপন্থীদের অভিজ্ঞতা

জ্যোতি বসু
গুজরাটের ঘটনাবলীর ওপর দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিনিধিদলের বক্তব্য এবং পার্লামেন্টের উভয় সভায় বিতর্কে যে সমস্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে সেগুলির ভিত্তিতে আমার কিছু মন্তব্য করার রয়েছে। আমি দুঃখিত, লজ্জিত এবং ক্ষুব্ধও; কিন্তু বিমূঢ় নই অন্ধকারের এই শক্তিগুলিতে। গোধরায় করসেবকদের ওপর কিছু সংখ্যক অপরাধী ব্যক্তির নারকীয় আক্রমণের পরবর্তীকালে, রাজ্য বিজেপি সরকারের মদতে এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের মৌন সম্মতিতে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর যে বর্বর অভিযান চালানো হয় সেই নৃশংসতার বিরুদ্ধে ঐকমত্য গড়ে ওঠার ঘটনা অবশ্যই আশাপ্রদ। গণতন্ত্র ও সভ্যতার জয় হবে নিশ্চয়।

লোকসভার প্রথম স্পিকার শ্রী মবলঙ্করের নামাঙ্কিত বক্তৃতামালায় ‘ভারতীয় গণতন্ত্রে বামপন্থীদের অভিজ্ঞতা’-র ওপর বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ পেয়ে আমি সম্মানিতবোধ করছি। শ্রী মবলঙ্করের নেতৃত্বে এমন সমস্ত স্বাস্থ্যকর রীতিনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ-নির্মাণে আমাদের সাহায্য করেছে। গোড়ার সেই দিনগুলিতে আমাদের গণতন্ত্রকে একটা সঠিক আদল দেবার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি।

এমন বলতে পারি না যে, আমি সমস্ত বামপন্থীদের হয়ে ভাষণ দিচ্ছি। কারণ স্বাধীনোত্তরকালে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে কাজকর্মের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে বামপন্থী শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু আমার বক্তব্য বহুলাংশেই ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির ও পার্টি ভাগ হয়ে যাবার পর ১৯৬৪ সাল থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র মতামত তুলে ধরবে।

স্বাধীনতা লাভের পূর্বে বাংলায় মুসলিম লিগের শাসনকালে আরও দুই সহকর্মীর সাথে আমিও বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হ‍‌য়েছিলাম। আমরা বিরোধীদল হিসাবে বিধানসভায় আসন গ্রহণ করেছিলাম এবং আইনসভায় অংশগ্রহণ ও পাশাপাশি তার বাইরে জনগণের মধ্যে থেকে কাজ করে যাওয়া সংক্রান্ত আমাদের যে সুপরিচিত নীতি তা রূপায়িত করেছিলাম। এখনও পর্যন্ত আমরা যে সমস্ত আইনসভায় বিরোধী দল হিসাবে অবস্থান করি, সেখানে আমরা পরিচালিত হই একই দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতির দ্বারা। সেই কালপর্বে আমি অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলাম যা পরবর্তীকালে আমাকে প্রভূত পরিমাণে সাহায্য করেছে। স্বাধীনতালাভের পর, ভারত ওয়েস্টমিনিস্টার ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্র এবং ধনতান্ত্রিক পথে উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। আমাদের পার্টি সিদ্ধান্ত নিল, আইনসভাগুলিতে অংশগ্রহণের সাথে সাথে আইনসভার বাইরে কাজকর্ম চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের কথা বলতে গেলে, বিগত বছরগুলিতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক নানাবিধ অভিজ্ঞতাই আমরা অর্জন করেছি। স্বাধীনতা লাভের পরপরই ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবাংলা ও ভারতের আরও কিছু জায়গায় আমাদের পার্টি বেআইনী ঘোষিত হল। তখন আমি বিধানসভার সদস্য, তবুও অনেকের সঙ্গে আমাকেও স্বাধীন দেশে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়েছিল।

সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর, কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে আমাদের পার্টি আইনী স্বীকৃতি অর্জন করে এবং আমাদের বেশ কয়েকজন মুক্তি পায়; যদিও বিনা বিচারে আটক রাখার ব্যবস্থা সংবিধানে রাখা হয়েছিল। স্বাধীন ভারতে ট্রেড ইউনিয়ন ও অন্যান্য রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালানোর পাশাপাশি আমি ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচন থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলাম। বহু বছর ছিলাম বিরোধী দলনেতা। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯-৭০সালে— দু’বার উপমুখ্যমন্ত্রী। ১৯৭৭ সাল থেকে টানা সাড়ে তেইশ বছর আমি বামফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্বপদে আসীন ছিলাম। সংসদীয় গণতন্ত্রে এটি এক রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঘটনা। ধারাবাহিকভাবে ষষ্ঠবার বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসীন হয় আগের বারের মতোই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। ২৫ বছর ধরে বামফ্রন্ট সরকার রয়েছে। রাজ্যগুলির সীমিত ক্ষমতা, বেশিরভাগ সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কিছুসংখ্যক বৃহৎ সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে অসত্য ও অর্ধসত্যকে ভিত্তি করে আমাদের পার্টি ও সরকারকে কলঙ্কিত করার চেষ্টার প্রেক্ষিতে এই সাফল্য আদৌ ছোটো-খাটো বিষয় নয়।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণিগুলি তাঁদের ন্যায়সঙ্গত দাবিদাওয়া ও গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য যে-লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন, সেগুলিকে শ্বাসরুদ্ধ করার জন্য, স্বাধীনতালাভের পরবর্তী দীর্ঘ সময়কাল ধরে আমাদের পার্টির সদস্য ও সমর্থকদের সঙ্গে আমাকে বহুবার বিনা বিচারে কারারুদ্ধ এবং বিভিন্ন অভিযোগে আরও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমাদের কী ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তা অবহিত করতে উদাহরণ হিসাবে পশ্চিমবাংলার কয়েকটি মাত্র ঘটনার উল্লেখ করছি। ১৯৬৭ সালে কংগ্রেসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা একটি নতুন পার্টি তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেস দল নির্বাচনে পরাজিত হয় এবং অন্যান্য পার্টির সঙ্গে মিলে আমাদের পার্টি এক ন্যূনতম সাধারণ কর্মসূচির ভিত্তিতে সর্বপ্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে। সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে, গরিষ্ঠসংখ্যক বিধায়ক আমাদের পার্টির হওয়া সত্ত্বেও, আমাদের পার্টি পূর্বতন কংগ্রেস নেতা শ্রী অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মেনে নেয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক ও জনস্বার্থবাহী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, প্রাক্তন কংগ্রেসীদের মধ্যে মতদ্বৈধতা নয় মাসের মধ্যে সরকারকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী শ্রী অজয় মুখোপাধ্যায় তা সত্ত্বেও সরকার বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন। একারণে তিনি সরকারের টিকে থাকার অধিকার আছে কিনা তা যাচাই করার জন্য বিধানসভার অধিবেশন ডাকার দিন স্থির করেন। কিন্তু, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না-করে রাজ্যপাল আমাদের নির্দিষ্ট করা তারিখের আগেই বিধানসভা অধিবেশন ডাকার নির্দেশ দেন। স্বাভাবিকভাবেই আমরা তাতে অসম্মত হই। এই কারণে তিনি আমাদের সরকার বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করেন। সৌভাগ্যের বিষয় হল, রাজ্যপালের অগণতান্ত্রিক কাজের জন্য জনগণের মধ্যে পুঞ্জিভূত উষ্মা ও বিরক্তি ১৯৬৯ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টকে ব্যাপকভাবে জিততে সাহায্য করেছিল। কিন্তু সরকারে আসীন হওয়ার তেরো মাস পর আমরা শরিকী বিবাদে জড়িয়ে পড়ি, মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের সঙ্গে সরকার ভেঙে যায়। রাজ্যপালের পক্ষ থেকে এক সংখ্যালঘু সরকারকে মদত দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতির শাসন রুজু হয়।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থন দেওয়ার পটভূমিতে ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই বিষয়ে তাঁকে পরিপূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল আমাদের পার্টি। আমাদের পার্টি নির্বাচনে গরিষ্ঠতম দল হওয়া সত্ত্বেও রাজ্যপাল আমাদের পার্টিকে সরকার গঠন করতে ও বিধানসভায় শক্তি পরীক্ষা করতে দিতে অসম্মত হন। বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি দ্বিতীয় বৃহত্তম পার্টি কংগ্রেসকে সরকার গঠন করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকেই সরকার গড়তে দেন। কিন্তু সেই সরকারের স্থায়িত্ব ছিল তিন মাস। এরপর জারি করা হয় রাষ্ট্রপতির শাসন।

১৯৭২ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপর জঘন্য ধরনের আঘাত হানা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে চক্রান্ত করে, ব্যাপকভাবে কারচুপি ও সন্ত্রাস চালানোর ফলে এ-নির্বাচন পরিণত হয় প্রহসনে। ১৯৭১ সালের মতো এবারেও পথে টহল দেওয়ার জন্য সেনা তলব করা হয়। জনগণের কাছে এটা ছিল এক অদৃষ্টপূর্ব অভিজ্ঞতা এবং আমাদের দলগত বিধায়ক সংখ্যা ১১১ থেকে নেমে দাঁড়ায় ১৪জনে। সকাল থেকেই আতঙ্কের সৃষ্টি ও মানুষ ভোট দিতে না-পারার ঘটনা প্রত্যক্ষ করে। আমি বেলা এগারোটা নাগাদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। আমাদের আশঙ্কা মতো বহুসংখ্যক নির্বাচন ক্ষেত্রে একই ধরনের পদ্ধতি অবলম্বিত হয়েছিল। আমাদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে অক্ষমতার কথা জানায় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের পূর্বে যখন আমরা শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম বিষয়টি নিয়ে সে-সময় তিনি আমাদের এবং বিধি-আশঙ্কা‍‌কে খারিজ করে দিয়েছিলেন।

১৯৭২ সালের নির্বাচনোত্তরকালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলি এমনভাবে পর্যদুস্ত করা হয়েছিল যার ফলে আমাদের হাজার হাজার সমর্থক ও পার্টি সদস্যকে আটক ও আমাদের পার্টির ১১০০জন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আমরা পাঁচ বছর ধরে বিধানসভা বয়কট করার দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং আরও বেশি করে জনসাধারণের কাছে যাই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬— এই কালপর্বে পশ্চিমবঙ্গ সম্মুখীন হল এমন এক পরিস্থিতির যাকে আমরা অভিহিত করেছিলাম আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাস বলে। এই সন্ত্রাস অধিকতর মাত্রা পেয়েছিল শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থায় যখন জীবনের অধিকারসহ সব ধরনের স্বাধীনতার বিলোপ সাধন ঘটানো হয়। তবে আমরা কখনই হার স্বীকার করিনি জনগণের শত্রুদের কাছে। আমরা মানুষের ওপর বিশ্বাসে অটুট ছিলাম। ১৯৭৭ সালে যখন জরুরি অবস্থার অবসান ঘটলো, জনগণ কেন্দ্রের এবং প‍‌শ্চিমবঙ্গসহ বহু রাজ্যের স্বৈরাচারী শাসকবর্গকে সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন।

যাই হোক, পরবর্তীকালে আমরা দেখলাম যাঁরা গণতন্ত্র ধ্বংস করেছিলেন তাঁরাই আবার জনগণের রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত সচেতনতার অভাবে কেন্দ্রে ক্ষমতায় ফিরে এলেন। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে যা প্রয়োজন, বেশিরভাগ রাজ্যে সেই নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিলাম আমরা অর্থাৎ বামপন্থী ‍‌ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি।

এবার আমি বলতে চাইছি, কেরালাকে ঘিরে আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে, যেখানে ১৯৫৭ সালে প্রথম কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হয়েছিল। বিধানসভায় আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও ১৯৫৯ সালে প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু সেই সরকারকে বরখাস্ত করেছিলেন। তারপর থেকে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের আশঙ্কার কারণ আপনারা সহজেই বুঝতে পারছেন। কিন্তু আমরা আশা ছেড়ে না-দিয়ে এই চরম অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগ্রত করতে গণ-বিক্ষোভের কাজ চালিয়ে গিয়েছিলাম। ১৯৬৪ সালে ভারত সরকারের আদেশবলে আমি এবং ইএমএস বাদে তামিলনাডুর ত্রিচিতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় উপস্থিত সমস্ত কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্যকে গ্রেপ্তার ও বিনা বিচারে আটক করে রাখা হয়। রাজ্য জুড়ে ব্যাপক মাত্রায় গ্রেপ্তার চালানোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের পার্টির বিরুদ্ধে কুৎসা ও মিথ্যা কলঙ্ক রটানো হয়। কেরালায় ১৯৬৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আমাদের জয়কে প্রতিহত করার উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল এক মরিয়া চেষ্টা। গণতন্ত্র রক্ষা নিয়ে তেমন কো‍নো উদ্বেগ ছিল না কেন্দ্রের শাসককুলের। এইরকম পরিস্থিতিতেও, নির্বাচিত বিধায়কদের সর্বাধিক সংখ্যা ছিল আমাদের পার্টির, এঁদের মধ্যে কয়েকজন জেল থেকেই নির্বাচিত হন; আমাদের পার্টি বিধানসভায় গরিষ্ঠতম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এটি ছিল গণতন্ত্রের প্রতি কেরালার মানুষদের এক তাৎপর্যপূর্ণ অবদান। কিন্তু সরকার গঠিত হতে না-পারার কারণে বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয় এবং জারি করা হয় রাষ্ট্রপতি শাসন। ১৯৬৭ সালে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং কংগ্রেস পার্টিকে পরাজিত করে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট সরকার।

উত্তর-পূর্ব ভারতের ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তুদের প্রবেশের ফলে সেখানকার উপজাতিরা সংখ্যালঘু হ‍‌য়ে পড়েন; গুরুতর রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। যাই হোক, প্রধানত বাঙালিভিত্তিক কংগ্রেস পার্টি উদ্ধত মনোভাব গ্রহণ করে এবং হরণ করে সংখ্যালঘুদের অধিকার, যার ফলে বড়ো ধরনের বিভাজন ঘটে যায়। আরও কিছু বামপন্থী পার্টির সঙ্গে মিলে আমাদের পার্টি দুই অংশকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। আমাদের বামফ্রন্ট সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়। উভয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় নজর দেয়। কংগ্রেস পার্টি ও কেন্দ্রে অবস্থানকারী ওই পার্টির সরকার গণতন্ত্রের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাশীল না-হয়ে উপজাতিদের সশস্ত্র এক অংশকে উসকানি দিতে থাকে এবং তাদের ব্যবহার করে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে। একবার নির্বাচনের প্রাক্কালে, যখন বাঙালিদের নিধন যজ্ঞ ঘটে যায়, সে-সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলায় পুলিস নামায় এই কথা বোঝাতে যে, কেবলমাত্র কংগ্রেস সরকারই পারে ত্রিপুরাকে বাঁচাতে। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীকে সশস্ত্র উগ্রপন্থীদের লেখা এক চিঠির বক্তব্যে প্রকাশিত হয়েছিল যে, যদি উপজা‍‌তিদের অধিকতর অংশের প্রতিনিধিত্বকারী কমিউনিস্টদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তবে তারা প্রতিশ্রুতি দেবে কংগ্রেসকে সাহায্য করার। কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি আমাদের বিরুদ্ধে গিয়েছিল এবং পরাজিত হয়েছিলাম আমরা। কিন্তু পরবর্তীকালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল এবং এর কর্মসূচি মাফিক উপজাতি-প্রধান এলাকায় স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করে আমরা আমাদের অবস্থানের পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হই এবং সমর্থ হই বাঙালি ও উপজা‍‌তিদের মধ্যে একতা ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত জঙ্গি কার্যকলাপ রয়ে গেছে এবং কংগ্রেস পার্টি চেষ্টা চা‍‌লিয়ে যাচ্ছে যা‍‌তে তাঁরা ব্যবহার করতে পারেন অস্ত্রধারী উপজা‍‌তিদের আমাদের সরকারের বিরুদ্ধে, যে-সরকার আত্মসমর্পণকারী উগ্রপন্থীদের পুনর্বাসন করে চলেছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকলাপ সম্পর্কিত আমাদের অভিজ্ঞতাই হল আমার প্রধান আলোচ্য বিষয়। নিজেদের দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে জনগণের ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনগুলি কেন্দ্রীয় ও কিছু রাজ্য সরকার কীভাবে দমনমূলক পদ্ধতিতে ও দানবীয় আইন প্রয়োগ করে অবদমন করার চেষ্টা করেছিল— সে-অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলিকে বাধা দিতে কী কী চেষ্টা চালানো হয়েছিল সেই অভিজ্ঞতায় খুঁটিনাটি বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন এখানে আছে বলে মনে করছি না। যতদূর স্মরণে আসছে, তাতে যে সমস্ত রাজ্য এই বিষয়ে বিশিষ্টতা অর্জন করেছে সেগুলি হল অন্ধ্র প্রদেশ, বিহার এবং জম্মু ও কাশ্মীর।

এই সুযোগে আমি আপনাদের বলতে চা‍‌ইছি কীভাবে আমরা কার্যক্ষেত্রে গণতন্ত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি এবং এদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের নীতিগুলি সাযুজ্যপূর্ণ করে তুলেছি। স্বাধীনতালাভের শুরুর কাল থেকেই আমরা সন্দিহান ছিলাম কেন্দ্রে তো বটেই রাজ্যগুলিতেও বামপন্থী শক্তি ও পার্টিগুলির সরকার গঠনের অধিকার থাকবে কিনা। কিন্তু ১৯৫৭ সালে কেরালায় প্রথম কমিউনিস্ট পরিচালিত সরকার গঠনের পর, গণতান্ত্রিক পার্টিগুলির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে বামপন্থী পার্টিগুলির দ্বারা রাজ্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা আমাদের পার্টি কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। তবে সে-সময় কেন্দ্রে প্রথম সরকার গঠন ছিল আমাদের চিন্তাভাবনার বাইরে। পরবর্তীতে এমন সব পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যখন আমরা বাইরে থেকে তিনবার কেন্দ্রে অ-কংগ্রেস সরকারগুলিকে সমর্থন জানিয়েছিলাম। আর একবার যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে, যখন বিজেপি-র বিপদ মূর্ত হয়ে উঠল, যে সরকার কিছু সময়ের জন্য, এমনকি, কংগ্রেসের সমর্থন লাভ করেছিল। পরবর্তীকালে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে কংগ্রেস সেই সমর্থন তু‍‌‍‌লে নেয় এবং সুবিধা করে দেয় বিজেপি-কে। বাস্তবতা বিবেচনায় আমাদের পার্টির কর্মসূচিকে সময়োপযোগী করতে গিয়ে আমরা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছি যে, কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আমাদের পার্টি কেন্দ্রের সরকারে অংশগ্রহণ করার বিষয়টি বিবেচনা করবে। দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে মঙ্গলজনক হবার প্রসঙ্গ বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবশ্য এক রণকৌশলগত প্রশ্ন। বাস্তবে এক অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে বামপন্থী ও কয়েকটি গণতান্ত্রিক পার্টিকে নিয়ে উদ্ভব ঘটেছে তৃতীয় ফ্রন্টের। কিন্তু একে শক্তিশালী করা প্রয়োজন যাতে এটি এক যথার্থ বিকল্প হিসাবে দেখানো যে‍‌তে পারে।

আমরা কর্মসূচিতে পুনরায় ব্যক্ত করেছি যে আমাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হল জনগণতন্ত্র, যা শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাবে সমাজতন্ত্রের দিকে অর্থাৎ শ্রেণিহীন, শোষণহীন সমাজব্যবস্থায়। সেই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন হল আমাদের সংবিধান ও সংসদীয় গণতন্ত্রের আওতায় থাকা সুযোগগুলির সদ্ব্যবহার করে শ্রেণি শক্তিগুলির ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটানো। আমাদের সংবিধানে যে সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে এবং ধর্মনিরপেক্ষতাসহ সংবিধানে বর্ণিত বুনিয়াদি উপাদানগুলি রয়েছে সেগুলি রক্ষায় সদাজাগ্রত থাকার জন্য আমরা আহ্বান জানিয়েছি জনসাধারণকে। সুপ্রিম কোর্টের কয়েকটি সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে। আমরা কয়েকটি সংশোধনীর প্রস্তাবনা করে চলেছি যেগুলি কার্যকর হলে জনসাধারণের অধিকারের পরিধি বিস্তৃত হবে এবং রাজ্যগুলির হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পিত হলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পরিবর্তিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী হবে ভারতীয় ঐক্য। ৩৫৬ ধারা ও জরুরি অবস্থা জারি করার মতো নেতিবাচক ব্যবস্থাগুলি খারিজ করা বা পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমরা মনে করি। উদাহরণ হিসাবে এগুলি উল্লেখ করা হল, এ কোনো বিশদ আলোচনা নয়।

আমরা বিশ্বাস করি, যে মানুষই ইতিহাস রচনা করেন। তাঁদের ওপর আমাদের দৃঢ় আস্থা। তাঁরা কখনো কখনো ভুল করলেও শেষ পর্যন্ত সঠিক পথ বেছে নেবেন। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সংগ্রাম আন্দোলনের পাশাপাশি, আমাদের অভিমত হল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, অগণতান্ত্রিক এবং সাম্রাজ্যবাদপন্থী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম জরুরি।

আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, আমরা বিশ্বাস রাখি, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনগণের অগ্রগতির ক্ষেত্রে আমাদের সংবিধানের বিরাট প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা ও দাবি-দাওয়ার দিকে দৃষ্টি রেখে এতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

আমাদের পার্টির সময়োপযোগী কর্মসূচিতে আমরা আবার পরে বলেছি যে, শ্রমজীবী মানুষ ও তাঁদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল‍‌গুলির পক্ষ থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের কো‍‌নো বিপদাশঙ্কা আসে না। তা আসে শোষক শ্রেণি ও যে পার্টিগুলি তাঁদের স্বার্থরক্ষা করে সেগুলির থেকে। আমরা একথাও বলি যে, জনগণের স্বার্থে এই সব বিপদের বিরোধিতা করে সংসদীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রক্ষা করা ও সংসদের বাইরের কাজকর্মকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্নীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন যেগুলি ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রাণবস্তুকে ক্ষ‌য়প্রাপ্ত করছে সে-সব বিষয়ে আমি কিছু বলিনি কারণ এটি অন্যবিধ বিষয়। কিন্তু আমি মনে করি যে সঠিক মনোভাবাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বিষয়টি নি‍য়ে অত্যন্ত বিচলিত বোধ করে থাকেন। নানাবিধ টানাপড়েন সত্ত্বেও গণতন্ত্র, তাতে যতই অসম্পূর্ণতা থাকুক-না-কেন, টিকে আছে— এটাই সন্তুষ্টির বিষয়। কংগ্রেস রাজত্বকালে নির্বাচনী সংস্কার আলোচ্য বিষয় হিসাবে পরিগণিত হলেও তাকে হিমঘরে রেখে দেওয়া হয়েছে। পার্লামেন্টে বিষয়টি আনা ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজনীয়তা আছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই বিবেচ্য সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ মতামত।

আমার মনে হয় যে, আমাদের পদক্ষেপ সম্পর্কে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা হাজির করা প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে। কেন-না রাজ্যে ও কেন্দ্রে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতিতে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। সে-রকম একটি সরকার গঠিত হলে আমাদের পার্টি তাতে অংশগ্রহণ বা তাকে বাইরে থেকে সমর্থন দেবার কথা বিবেচনা করবে। উভয় ক্ষেত্রেই আমরা যেমন এক অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি রূপায়ণে সহযোগিতা দেব, পাশাপাশি আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজনী‌য় পরিবর্তন আনার কথাও বলব। যখন আমরা কেন্দ্রের বা রাজ্যগুলির সরকারকে সমর্থন জানাই না সে-সময় আমাদের পার্টি জনগণের স্বার্থে কাজ করে থাকে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসাবে।

আগে যা বলেছি, অর্থাৎ, সংসদের বাইরের কাজকর্মসহ সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা জনসাধারণের চেতনা উন্নত করার চেষ্টা করি, যাতে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মৌলিক পরিবর্তনের এবং জনগণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র, এক শোষণহীন ও শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।

পরিশেষে, যে-বিষয়ের ওপর আমি বক্তব্য রাখছি তার সঙ্গে সম্পর্কিত আর কিছু ভাবনা উপস্থিত করতে চাইছি।

১৯৪০ সালে লন্ডন থেকে ফিরে এসে যখন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করি সেই সময় থেকে ৬৪ বৎসর ধরে রাজনীতিতে থেকে, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমি খুশি কারণ জনগণ প্রতিক্রিয়ার শক্তির বিরুদ্ধে ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জারি রাখতে বারে বারে এগিয়ে এসেছেন, যদিও এর ধারাবাহিকতায় মাঝে মাঝে ছেদ পড়েছে। আমি বিশেষত উদ্বিগ্ন বোধ করছি, সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার যেখানে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণাকে নস্যাৎ করতে চাইছে, আমাদের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ও তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে ধ্বংস করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যেসব শক্তি এখন কেন্দ্রে সরকার চালাচ্ছে, তারা বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ-র নির্দেশ অন্ধভাবে মেনে নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল এবং প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দাগিরির ক্ষেত্রে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাদের দেশকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলি বিশেষ করে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। আজ আমাদের দেশের জোট নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতি বিদায় জানানো হচ্ছে, যার ফলে ভারত তার নিজস্ব সত্তা হারাচ্ছে। এসব সত্ত্বেও আমার নিশ্চিত ধারণা হল এ‌মন সর্বনাশা পরিস্থিতি সাময়িক প্রকৃতির।

যে কংগ্রেস দল তার নানাবিধ নীতির জন্য জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, অথচ এখনও সংসদে সবচেয়ে বড়ো বিরোধী দল এবং এখনও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অনুসরণ করে চলেছে, সেই দলটি তবুও রাজ‍‌নৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তার ভুল নীতির কারণে দেশের ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও আত্মসমালোচনার পথে গেল না— তা দেখে আমি বিস্মিত।

খেদের বিষয়, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মোকাবিলায় বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি এগিয়ে এলেও প্রয়োজনের তুলনায় তাদের শক্তি কম। তবে উপযুক্ত বিকল্প গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চ‍‌লেছে। আনন্দের কথা, জনসাধারণের বিভিন্ন অংশ এখন গণ-আন্দোলনে শামিল হচ্ছেন। এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে উপযুক্ত অভিমুখ ও সঠিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত তাঁদের সামনে তুলে ধরা।

গুজরাটের ঘটনাবলীর ওপর দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিনিধিদলের বক্তব্য এবং পার্লামেন্টের উভয় সভায় বিতর্কে যে সমস্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে সেগুলির ভিত্তিতে আমার কিছু মন্তব্য করার বিষয় রয়েছে। আমি দুঃখিত, লজ্জিত এবং ক্ষুব্ধও; কিন্তু বিমূঢ় নই অন্ধকারের এই শক্তিগুলিতে। গোধরায় করসেবকদের ওপর কিছু সংখ্যক অপরাধী ব্যক্তির নারকীয় আক্রমণের পরবর্তীকালে, রাজ্য বিজেপি সরকারের মদতে এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের মৌন সম্মতিতে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর যে বর্বর অভিযান চালানো হয় সেই নৃশংসতার বিরুদ্ধে ঐকমত্য গড়ে ওঠার ঘটনা অবশ্যই আশাপ্রদ। গণতন্ত্র ও সভ্যতার জয় হবে নিশ্চয়।

[২০০২ সালের ১৮ই মে নয়াদি‍‌ল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে সপ্তম জি ভি মবলঙ্কর স্মারক বক্তৃতা সভা আ‍‌য়োজন করে দ্য ইনস্টিটিউট অব কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ। ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার রবি রায় ও শিবরাজ পাতিল, বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা রামনিবাস মির্ধা, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি জাস্টিস এ বি ওয়াধেয়া ভাষণ দেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন সাংসদ, বিভিন্ন গণ-সংগঠনের নেতৃত্ব, মন্ত্রী, বুদ্ধিজীবী ও আরও অনেকে।]

🔍︎ জ্যোতি বসুর অন্যান্য লেখাগুলি পড়ুন: 
কারো হাতে ছাড়বেন না ধর্মঘটের অধিকার
কমিউনিস্টদের লক্ষ্য ও পথ
মার্কসবাদ ও আমাদের অনুশীলনের প্রাসঙ্গিকতা
ধর্ম ও রাজনীতি মেলাবেন না
ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা বন্ধ হোক


প্রকাশের তারিখ: ১৭-জানুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org