সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মার্কসবাদ ও আমাদের অনুশীলনের প্রাসঙ্গিকতা
জ্যোতি বসু
মার্কসবাদী হিসাবে আমি মার্কসকে কখনো দেবতারূপে পূজা করিনি, অথবা তাকে কোনো বেদীর ওপর প্রতিষ্ঠা করিনি। আমাদের মতো মার্কসবাদীদের কাছে কার্ল মার্কস কোনো দেবতা নন। তিনি ছিলেন এক প্রতিভা, কিন্তু রক্ত-মাংসের মানুষ। মার্কস হামবুর্গে, ডবলিউ ব্লস-র কাছে লিখেছিলেন, "যখন এঙ্গেলস্ এবং আমি গোপন কমিউনিস্ট সোস্যাইটিতে যোগ দিয়েছিলাম, আমরা একটা শর্ত করেছিলাম যে, কর্তৃত্বের মধ্যে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসে উৎসাহ প্রদানকারী সমস্ত বিষয়কেই কার্যবিধি থেকে নির্মূল করতে হবে।"

আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আলোচনা এবং প্রদর্শনীসহ পাঁচদিনের এক কর্মসূচীর মাধ্যমে কার্ল মার্কসের মৃত্যুশতবার্ষিকী পালন করছে। কার্ল মার্কস কেবল এ যাবৎকালের বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ মনীষীই নন, তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত বিপ্লবী। ঊনবিংশ শতকে শ্রমিকশ্রেণীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক আন্দোলনের তিনি সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন এবং এইসব আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণও করেছিলেন। আমি এ বিষয়ে সজাগ যে, তাঁর চিন্তাধারা সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত আছে, কেউ কেউ তাঁর মতামত সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করেন, কেউ কেউ আংশিকভাবে গ্রহণ করেন এবং অনেকে বলিষ্ঠভাবে তাঁর সিদ্ধান্তসমূহের বিরোধিতা করেন। যাই হোক, তাঁর বিশ্লেষণ এবং শিক্ষা অবজ্ঞা করা সম্ভব হয়নি, এখনো সম্ভব নয়। মানবজাতির এক-তৃতীয়াংশ এখন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের ব্যাপক সংখ্যক মানুষ তাঁর রচনা থেকে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এবং নিজেদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার কাছে খবর আছে, এমনকি ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলির অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, দর্শন এবং সাহিত্যের পাঠ্যসূচীর মধ্যে মার্কসবাদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কার্ল মার্কসের ধ্যানধারণা এবং মতামত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ব্যতিরেকে ঐসব বিষয় পঠন-পাঠন অসম্পূর্ণ এবং এক দেশদর্শী হতে বাধ্য। আমি বিশ্বাস করি এই আলোচনা সভার মাধ্যমে শিক্ষক, ছাত্র, রাজনীতিবিদ এবং অন্যান্য মানুষ নির্ধারিত বিষয়সমূহের ওপর নিজেদের মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ পাবেন। তাদের আলোচনা মার্কসের শিক্ষার বিষয়ে এবং আমাদের দেশের ক্ষেত্রে ঐ শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে আমাদের অনুধাবনকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে।
মার্কসবাদ আমাদের মতো মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি মার্কসবাদ একটি বিজ্ঞান এবং কার্য পরিচালনার পথপ্রদর্শক। মার্কস নিজেই জোরের সঙ্গে এই মতামত ব্যক্ত করেছেন যে, দার্শনিকেরা বিশ্বের ব্যাখ্যা করেছেন কিন্তু প্রশ্ন হলো তাকে পরিবর্তন করা। বৈজ্ঞানিক বৈপ্লবিক তত্ত্বের আয়ুধে শক্তিশালী হয়ে আমরা সেই নতুন সমাজব্যবস্থার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি, যে সমাজব্যবস্থা শোষণ, নিষ্পেষণ এবং শ্রেণীশাসন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হবে। তাঁর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, সেই অভ্রান্ত প্রমাণকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল যে সাম্যবাদ কোনো কল্পরাজ্য নয়, একটা নিছক স্বপ্ন বা ধর্মীয় কল্পনার বিলাস নয়। সাম্যবাদ হলো একটা অবশ্যম্ভাবী ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া যা মানব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের বিকাশের মাধ্যমে উদ্ভুত হয়।
মার্কসবাদের একান্ত লক্ষণীয় দিক হলো তত্ত্বের সঙ্গে প্রয়োগের সমন্বয়। ক্যাপিটালের মতো মার্কসের অন্যান্য রচনাবলীতেও প্রত্যেকটি শব্দ তার পূর্ববর্তী শব্দাবলীকে যুক্তিপারস্পর্যে অনুসরণ করে, প্রত্যেকটি বাক্য একটি নির্দিষ্ট যুক্তির ধারা অনুসরণ করে, এবং প্রধান নিবন্ধ অত্যন্ত অনড় যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর সঙ্গে অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার-র মতো রচনাবলীর উল্লেখ করা যায় যেখানে মার্কস একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে পর্যালোচনা করেছেন অর্থাৎ ঊনবিংশ শতকের মধ্যবর্তী পর্যায়ের ফ্রান্স সম্পর্কে আলোচনা বিভিন্ন শ্রেণী এবং গোষ্ঠীর বিশ্লেষণ, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা ও পারস্পরিক সম্পর্ক, একটি বিশেষ সামাজিক বিন্যাসের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন প্রণালীর পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া, রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর তাদের প্রভাব এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসন হিসাবে লুই নেপোলিয়নের উদ্ভব ইত্যাদি বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করা হয়েছে। কার্ল মার্কস সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গজদন্তমিনারে বসে বিশ্ব সমীক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেননি। তাঁর তত্ত্বের মধ্যে সব সময়ই একটা দৃঢ় অভিজ্ঞতা-ভিত্তি লক্ষ্য করা গেছে এবং প্রত্যেকটি ঘটনার পর্যালোচনা অথবা বিশেষ পরিস্থিতির পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও একটা তত্ত্বগত ভিত্তি পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রত্যেক বাস্তববাদী বিপ্লবীর ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার যে, ঘটনার সাময়িক চাপ যেন আমাদের বিভ্রান্ত করতে না পারে। আমরা যেন আমাদের মূল লক্ষ্যের চেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনার ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ না করি। আমাদের মনে রাখতে হবে, বৃক্ষের আড়ালে যেন অরণ্য ঢাকা না পড়ে। আমাদের দৃষ্টিকোণ খুব স্বচ্ছ হওয়া দরকার এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে তত্ত্বকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।
আমি কার্ল মার্কসের পঠন-পাঠন এবং রচনাবলীর আর একটি দিকের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আমাদের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি বিষয়কে অপরাপর বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলা। প্রত্যেকটি বিষয়কেই জ্ঞানের স্বয়ংসম্পূর্ণ একক হিসাবে শিক্ষা দেওয়া হয়। যেন এটাই আমাদের একমাত্র শিক্ষণীয় বিষয় এবং অন্য কোনো বিষয়ের আদৌ কোনো গুরুত্ব নেই। মার্কসের পদ্ধতি ছিল আলাদা। কখনোই তিনি কোনো বিশেষ বিষয়-সীমানার মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন না এবং তাঁকে কোনো বিশেষ বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ রাখাও সম্ভব নয়। তাঁর মহান ব্রত ছিল সত্যের অনুসন্ধান এবং মানব সমাজের বিকাশের বিধি অনুধাবন এবং তাকে বাস্তবায়িত করা। তাঁর অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ের এই সীমানা ছিল একান্ত অপ্রাসঙ্গিক। সত্যের অনুসন্ধানকে তিনি সমাজে সামগ্রিক অবস্থা নিরূপণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিলেন, কোনো টুকরো অংশের ক্ষেত্রে নয়। সত্যের অনুসন্ধানের জন্য তিনি এক-এক করে বিভিন্ন বিষয় অনুশীলন করেছেন। তিনি আইন থেকে দর্শন, ইতিহাস এবং অর্থনীতি এবং এইভাবে অন্যান্য বিষয়ও চর্চা করেছেন। এটাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, সব বিষয়ে তিনি চর্চা করেছেন সকল ক্ষেত্রেই তিনি মৌলিক অবদানের স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রকৃত ঘটনা হলো- তিনি পরস্পর বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন উপাদানকে একত্রিত করে একটা সুসংহত সমগ্র রূপ দিয়েছিলেন এবং তার মাধ্যমে মানব সমাজের বিকাশের যে সাধারণ বিধি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, সেই বিধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখনকার অতিবিশেষীকরণের যুগে এবং কোনো নির্দিষ্ট বিষয়-সীমানার বাইরে বিশ্লেষণের প্রতি বিমুখ মনোভাবের দিনে কার্ল মার্কস প্রদর্শিত বিভিন্ন বিষয়ের সুসংবদ্ধ বিশ্লেষণভঙ্গি খুবই জোরের সঙ্গে তুলে ধরা দরকার।
তাঁর পদ্ধতির আর একটা দিক হলো তথ্যের প্রতি তাঁর আপসহীন মনোভাব। মার্কস কখনো তথ্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বক্তব্যকে অস্বীকার করে নিজের লালিত ধ্যান-ধারণার মধ্যে নিজেকে বন্দী রাখেননি। যদি বাস্তব ঘটনা তাঁর তত্ত্ব অথবা অনুমোদন দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব না হতো, তা হলে তিনি সেই তত্ত্বকে বর্জন করতেন অথবা তাঁর তত্ত্বকে তথ্যের অনুগামী করে উন্নত করতেন। তাঁর জগৎটা নিছক সাদা-কালো অথবা ভালো-মন্দের দ্বিধাবিভক্ত সহজ জগৎ ছিল না। তিনি ছিলেন একটা দ্বান্দ্বিক জগতের চিন্তায় মগ্ন। এই দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণভঙ্গি তাঁকে বাস্তববাদী এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্ববীক্ষায় সমৃদ্ধ করেছিল এবং এর ফলেই মার্কসবাদ এমন একটি শক্তিশালী মননশীল ধারার জন্ম দিয়েছিল। এভাবে আমরা কার্ল মার্কসের মধ্যে লক্ষ্য করি পুঁজিবাদের সর্বাপেক্ষা কঠোর সমালোচককে, সেই সব উপাদানের একটি বাস্তব-সম্মত বিশ্লেষণ, যে সব উপাদান সামন্ত-ব্যবস্থার ধ্বংসসাধনে এবং প্রগতিশীল শক্তি হিসাবে পুঁজিবাদের উন্মেষের সাহায্যকারী উৎপাদনের বিপুল পরিবর্ধনে উৎপাদন প্রণালীর বিকাশের ভূমিকা এবং এই ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ। তিনি পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী অবক্ষয় সম্পর্কে রূপরেখা উপস্থিত করেছিলেন, কীভাবে পুঁজিবাদের দ্বারা গড়ে তোলা উৎপাদন ব্যবস্থার সার্বিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, কীভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক এবং নতুন উৎপাদিকা শক্তির দ্বন্দ্বের মাধ্যমে পুঁজিবাদ ধ্বসে পড়ে এবং শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বাধীনে একটা নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠে, তিনি তারও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। একইভাবে ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে তিনি ভারতের সাবেকী গ্রামীণ অর্থনীতির ধ্বংসসাধন, কৃষক এবং কারিগরদের শোষণ, ভারতের সম্পদ লুন্ঠন ও যেভাবে এই দেশের সম্পদকে ব্রিটেনের শিল্পের বিকাশের কাজে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ প্রয়োগ করেছিল, মার্কস কঠোরভাবে তার সমালোচনা করেছেন। ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, "বুর্জোয়া সভ্যতার চরম ভণ্ডামি এবং অন্তর্নিহিত বর্বরতা আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইংরেজ-সাম্রাজ্যবাদ নিজের দেশে একটা সম্মানজনক অবস্থায় থাকলেও উপনিবেশের ক্ষেত্রে সে নগ্নরূপ গ্রহণ করে।" কিন্তু একই সঙ্গে, তিনি ইংরেজ শাসনের অন্য দিকটিও তুলে ধরতে ভুল করেননি- ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ একান্তপক্ষে নিজের স্বার্থে সব কিছু পরিচালনা করলেও একই সঙ্গে 'ইতিহাসের অচেতন হাতিয়ারের' ভূমিকা পালন করেছে। ভারতের সাবেকী কাঠামোর ধ্বংসসাধনের মধ্যে অবশ্যই একটা ভালোর দিক ছিল। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাধ্য হয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল তাতে আরও উন্নত সমাজব্যবস্থায় উত্তরণের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। এইভাবে মার্কস তাঁর বিশ্লেষণধারাকে প্রয়োগ করেছেন - ধনাত্মক এবং ঋণাত্বক দিকগুলো সনাক্ত করে, একই সঙ্গে ঐক্য এবং বিরোধের দিক তুলে ধরে এবং একটা নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয় বিশ্লেষণ করার কাঠামোগত প্রাসঙ্গিকতা উপস্থিত করে বৈজ্ঞানিক আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁর ধারণা অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসন চিরন্তনকালে ধরে অব্যাহত থাকবে না। তিনি লিখেছিলেন, "ইংরেজ-বুর্জোয়া কর্তৃক যে নতুন সমাজের উপাদান ভারতে অসংলগ্নভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, ভারতবাসী তার সুফল ভোগ করতে পারবে না যদি ব্রিটেনে শাসকশ্রেণীসমূহ শিল্পে নিয়োজিত সর্বহারাদের দ্বারা পদানত না হয় অথবা হিন্দুরা নিজেরাই ইংরেজদের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলার মতো ক্ষমতাশালী হয়ে না ওঠে।"
কার্ল মার্কস সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে প্রত্যেকেই সবিস্ময়ে এবং প্রশংসার সঙ্গে স্মরণ করেন যে, একজন মনীষী হিসাবে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে কার্ল মার্কস কত বিচার বিবেচনা করতেন এবং কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন, তিনি কতো বিশাল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং তাত্ত্বিক কাঠামোকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর জন্য তাঁকে কত কঠোর অনুশীলন করতে হয়েছিল। কার্ল মার্কসের সময়কার যোগাযোগ সাধনের অসুবিধাকে যখন কেউ বিবেচনা করেন, সেই সময় তথ্য সংগ্রহ এবং তাকে প্রক্রিয়াবদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অনগ্রসরতা সম্পর্কে কেউ চিন্তা করেন তখন সত্যি মনে হয় যে কত কঠোর পরিশ্রম করে তিনি ভারত এবং চীনের মতো বহু দূরবর্তী দেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং তাকে প্রক্রিয়াবদ্ধ করেছিলেন। আজকের দিনে তথ্যের অনেক ব্যাপকতর আদান-প্রদানের ফলে তাঁর সংগৃহীত তথ্যের এখানে-ওখানে কিছু ত্রুটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু তা সত্ত্বেও সকলকে স্বীকার করতেই হবে যে, মার্কস বিশাল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং তার সাহায্যে যে বিশ্লেষণ উপস্থিত করেছেন তার মধ্যে ভুল থাকা সম্ভব নয়। মার্কস বিশেষভাবে ইংরেজদের সর্ববৃহৎ উপনিবেশ ভারতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলেন। ভারতের অবস্থা তিনি 'ভারতে ইংরেজ শাসন', 'ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং তার ইতিহাস ও ফলাফল', 'ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল', ইত্যাদি প্রবন্ধের মাধ্যমে পর্যালোচনা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি চীনের ঘটনাবলী সম্পর্কেও নিয়মিত খবরাখবর রাখতেন। ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান এবং ব্রহ্মদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ইউরোপের আক্রমণকারীদের মুখোশ তিনি উন্মোচিত করেছিলেন।
কার্ল মার্কসের প্রয়াণের পর এক শত বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। মানবজাতির ইতিহাসে এই একশত বছর সর্বাপেক্ষা উল্লেখনীয়। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, আজকে বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ আর কোনো কল্প-রাজ্য নয়। আমরা যে জগতে বাস করছি, বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ তার বাস্তবতার একটি অংশে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশের মানুষ সমাজতান্ত্রিক দেশে বাস করেছেন। উন্নত এবং অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশে যে আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস করেন তারাও সমাজতান্ত্রিক সমাজগঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং মার্কস- এঙ্গেলস্ এবং লেনিনের চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ। সমাজতন্ত্র কোনো একটি মহাদেশ বা দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আর আবদ্ধ নেই। সমাজতন্ত্র সকল মহাদেশে- আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া এবং ইউরোপসহ বিশ্বের সকল অংশে প্রসার লাভ করেছে। সমাজতন্ত্রের আকর্ষণ মানুষের কাছে এত বেশি যে আজকের দিনে বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদেরও নিজেদের লক্ষ্য হিসাবে সমাজতন্ত্রের কথা ঘোষণা করতে হচ্ছে যদিও তারা পুঁজিবাদই গড়ছেন। পুঁজিবাদী দুনিয়ার সঙ্কটকে আর কোনোক্রমেই সস্তা কমিউনিস্ট প্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অথবা কিছু লোক যেমন ভাবছেন যে এটা কেবলমাত্র একটা অতীতের প্রচারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এভাবেও বিচার করা চলে না। প্রত্যেকে নিজের চোখেই পুঁজিবাদী দুনিয়ার এই সঙ্কট লক্ষ্য করছেন। এখন একমাত্র পশ্চিম ইউরোপেই তিন কোটি শ্রমিক কর্মহীন অবস্থার আছেন- ব্রিটেনেই বেকারের সংখ্যা হলো ত্রিশ লক্ষের মতো। কার্ল মার্কসের জীবৎকালে যে শ্রমিকশ্রেণী একটি সামান্য শক্তি ছিল সেই শ্রেণী এখন একটি বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অংশে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের নেতৃত্বদানে এবং বিপুল সংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজের সামর্থের প্রমাণ রেখেছে। কাজের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার এবং এই ধরনের আরো-অধিকার সমাজতান্ত্রিক দেশের সংবিধানে সংযোজিত আছে। এসব অধিকারের মাধ্যমে আরও ব্যাপক সচেতনতা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় সমৃদ্ধ শ্রমজীবী মানুষ একটা নতুন ধরনের গণতন্ত্র গড়ে তুলেছে। এই গণতন্ত্র হলো প্রকৃত গণতন্ত্র, কথার ফুলঝুরি নয়। কখনো কখনো সমাজতন্ত্রের শত্রুতা বারংবার এই ধারণার পুনরাবৃত্তি করে চলে, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থারও সমস্যা এবং নানা ধরনের বিকৃতির উদ্ভব ঘটে। কিন্তু এই সব সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থার মধ্যে গৃহীত পদ্ধতির মাধ্যমেই সমাধান করা হয় এবং প্রয়োজনবোধে ভুলগুলো শুধরে নেওয়া হয়। নিজস্ব বিকাশের বিধি অনুযায়ী পুঁজিবাদ অবশ্যম্ভাবীরূপে সঙ্কটে নিমজ্জিত হয় কিন্তু এই ধরনের কোনো সঙ্কট সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিকে কাঁপিয়ে তোলে না।
মার্কসবাদী হিসাবে আমি মার্কসকে কখনো দেবতারূপে পূজা করিনি, অথবা তাকে কোনো বেদীর ওপর প্রতিষ্ঠা করিনি। আমাদের মতো মার্কসবাদীদের কাছে কার্ল মার্কস কোনো দেবতা নন। তিনি ছিলেন এক প্রতিভা, কিন্তু রক্ত-মাংসের মানুষ। মার্কস হামবুর্গে, ডবলিউ ব্লস-র কাছে লিখেছিলেন, "যখন এঙ্গেলস্ এবং আমি গোপন কমিউনিস্ট সোস্যাইটিতে যোগ দিয়েছিলাম, আমরা একটা শর্ত করেছিলাম যে, কর্তৃত্বের মধ্যে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসে উৎসাহ প্রদানকারী সমস্ত বিষয়কেই কার্যবিধি থেকে নির্মূল করতে হবে।"
এটা সত্যি বিস্ময়ের ব্যাপার যে মার্কস পুঁজিবাদের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তার খুব অল্প বৈশিষ্ট্যই দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তার প্রধান প্রধান দিকগুলোকে সনাক্ত করে তার গুরুত্বপূর্ণ ধারা এবং প্রবাহকে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। তিনি ইতিহাসের বস্তুতান্ত্রিক ব্যাখ্যার কাঠামোয় পুঁজিবাদকে সংস্থাপিত করে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এমনকি এই অনুমানের শক্তি তাঁকে কঠোর দৈহিক এবং মানসিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়েছিল। মার্কস জন্মসূত্রেই মার্কসবাদী ছিলেন না। একটা জটিল বহুমুখী বাস্তবতার নির্যাসটুকু গ্রহণ করার শিক্ষার জন্য তাঁকে চেষ্টা করতে হয়েছিল, তাঁকে বহু বিষয় পড়তে হয়েছিল এবং তার ফলে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল আমাদের পরিচিত মার্কসবাদ নামে বিশ্ববীক্ষা। কিন্তু যে বিষয়টিকে কম উল্লেখযোগ্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না তা হলো - সত্যকে অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে তাঁর কঠিন নিষ্ঠা, একাগ্রতা এবং আত্মত্যাগ। এর ফলেই তাঁর বহুব্যাপ্ত মনস্বীতা বিকশিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা আইন ব্যবসায়ী বা লেখক হিসাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীসুলভ একটা আরামদায়ক জীবনের পরিবর্তে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বিপ্লবীর একটা জীবনধারা। তিনি স্বেচ্ছায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ এবং বঞ্চনাকে স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি কখনো স্বীকৃতি অথবা নাম কেনার পেছনে ছোটেননি। বৈষয়িক আরাম অথবা বিদ্বৎজন হিসাবে স্বীকৃতির অর্থ ছিল তাঁর কাছে অর্থহীন। তাঁর কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নিষ্পেষণ ও শোষণহীন সাম্যবাদের একটা নতুন জগৎ; যেখানে মানুষ কাজ করবেন, কারণ তাঁরা কাজকে ভালোবাসেন, যেখানে ব্যক্তিগত উন্নতি অথবা অর্থের জন্য স্বার্থান্ধ প্রচেষ্টার পরিবর্তে সামগ্রিকভাবে সমাজের স্বার্থেই সকলে কাজ করেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- তাঁর অভীপ্সা কি - তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন, যা মানবিক তার কোনো কিছুই তাঁর কাছে অপরিচিত নয়। তিনি একজন মানুষ ছিলেন। কিন্তু কি অসাধারণ মানুষ!
নিছক পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে মার্কসকে অনুধাবন করার প্রচেষ্টা, তার উপর দেবত্ব আরোপ করা আর একটা প্রচেষ্টা। কার্ল মার্কস নিজেই যে বিশ্লেষণ পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলেন তার চেয়ে কোনো বিশ্লেষণভঙ্গি বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে না। আমাদের ভোলা উচিত নয় যে মার্কস বিভিন্ন গুরুত্ব আরোপ করে অনেক প্রবন্ধ এবং বই লিখেছিলেন এবং অনেক দলিলও রচনা করেছিলেন। তিনি তাঁর সমকালের ঘটনাবলীর ওপর দৈনিক সংবাদপত্রে এবং অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিক সমস্যাবলীর ওপর প্রচুর বিতর্কমূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল কঠোর গবেষণামূলক প্রচেষ্টার মাধ্যমে 'ক্যাপিটাল'-র মতো গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাছাড়া তাঁর ধ্যান-ধারণা এবং অনুধাবনকে কোনোভাবে অনড় বলা চলে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে তাঁর চিন্তাধারা অনেক বেশি প্রগাঢ়তা এবং ব্যাপকতা অর্জন করেছে। এই কারণে খুব যান্ত্রিকভাবে মার্কসবাদকে অধ্যয়ন করা এবং যে পরিপ্রেক্ষিতে এবং সময়ে তিনি কোনো মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন তার প্রাসঙ্গিকতা বর্জন করে তাঁর জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়, বিভিন্ন ধরনের গুরুত্ব সহকারে রচিত গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার অর্থ হচ্ছে মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণের মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করা। আরও বলা প্রয়োজন যে, আমাদের প্রত্যেক দিনের সংগ্রামে আমরা যে সব সমস্যার মুখোমুখি হই, তার প্রত্যেকটি বিষয় সমাধানের জন্য মার্কসের মুখাপেক্ষী হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাঁর তুলনায় আরও গঠনমূলক দৃষ্টিকোণ হলো তাঁর পদ্ধতিকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা এবং সাম্প্রতিকালের ঘটনাবলী সম্পর্কে আমাদের অনুধাবনের ক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করে মূল ধারাটিকে তুলে ধরা। মার্কসের এই পদ্ধতি হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং দ্বন্দ্বতত্ত্ব।
প্রায়শই লক্ষ্য করা যায় যে, এমন একটা প্রচেষ্টা কোনো কোনো তরফ থেকে শুরু করা হয় যে মার্কস একজন মহান চিন্তানায়ক হলেও এবং তাঁর শিক্ষা ইউরোপীয় সমাজের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হলেও আমাদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পটভূমিকায় তা আদৌ প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, মার্কসবাদ একটি বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান বলেই কোনো দেশের দরজা তার কাছে বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। ভারতের বাইরে অভারতীয়গণ কর্তৃক আবিষ্কৃত হওয়ার অজুহাতে আমরা কি নিউটনের 'ল অফ মোশান' অথবা আইনস্টাইনের 'আপেক্ষিকতাবাদ'-র তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি: শূন্যে ছুঁড়ে দেওয়া আপেল কি একমাত্র ব্রিটেনেই মাধ্যাকর্ষণের বিধিকে অনুসরণ করে, ভারতে নয়? ভারতে আপেলকে শূন্যে ছেড়ে দিলে উপরের দিকে উঠতে থাকবে?
একইভাবে ডারউইন এবং ফ্রয়েড সম্পর্কে কোনো ব্যক্তির মতামত যাই হোক না কেন- তাঁদের জাতিগত সত্তার জন্যই কি তাঁদের ধ্যান-ধারণাকে বর্জন করা হবে? আমি কোনোক্রমেই একথা বলছি না যে তাঁদের ধ্যান-ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা যায় না। বস্তুতপক্ষে অনেক মনীষীই এর মধ্যে এই দু'জন চিন্তাবিদের প্রধান তত্ত্বের বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন। কিন্তু মতাদর্শগত অথবা তত্ত্বগত পরিপ্রেক্ষিত থেকেই তাঁদের ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে হবে। নিছক ভাবাবেগ এবং অকিঞ্চিৎকর তুচ্ছ কারণে তাঁদের এড়িয়ে চলা ঠিক হবে না। ধ্যান-ধ্যারণার কোনো নিজস্ব ভৌগলিক সীমানা নেই। মার্কসের চিন্তাধারা কেবলমাত্র ইউরোপের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি। এশিয়ার মধ্যে পূর্ব-সোভিয়েত, চীন, ভিয়েতনাম, কাম্পুচিয়া, লাওস, মঙ্গোলিয়া এবং অন্যান্য অনেক দেশে মার্কসীয় চিন্তাধারা গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। লাতিন আমেরিকার কিউবা ছাড়াও নিকারাগুয়ার সান্দানিস্তা সরকার মার্কসবাদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। আফ্রিকার অনেক দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন মার্কসবাদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ব্যক্তিদের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। ওইসব দেশের জনসাধারণ বিশ্বাস করেন যে, তাঁদের সমাজের ক্ষেত্রে মার্কসবাদ সম্পূর্ণরূপেই প্রাসঙ্গিক।
ভারতের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আমরা কি বলতে পারি যে কার্ল মার্কস ইতিহাসের বিকাশের যে বিধি উপস্থাপিত করেছিলেন তা এখানে প্রযোজ্য নয়? একথা অনেকেই বলেন, এই দেশের মানুষের জীবনে জাতপাত এবং ধর্মের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও দেশের মুক্তির জন্য সকল জাতপাত, ধর্ম এবং জাতিভুক্ত মানুষের ঐক্যবদ্ধ বিপুল সংগ্রামকে প্রতিহত করা যায়নি। রাশিয়া সহ সামন্ততান্ত্রিক ইউরোপে ধর্ম জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। শিল্পকলা, স্থাপত্য এবং সাহিত্যের বিভিন্ন দিকে তার প্রতিফলন ঘটেছিল। কিন্তু এর ফলে বৈপ্লবিক আন্দোলন স্তব্ধ করা সম্ভব হয়নি। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে মার্কসীয় পদ্ধতি এবং শিক্ষার সাহায্যে আমাদের সমাজের ঐতিহ্য, প্রথা, রাজনৈতিক আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট পঠন-পাঠনের অবশ্যই ব্যবস্থা করা উচিত। সকল সমস্যা ও অসুবিধা থেকে উত্তরণের জন্য এবং জনসাধারণকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কসবাদের সাধারণ শিক্ষাকে আমাদের দেশের অবস্থায় প্রয়োগ করা কর্তব্য। বস্তুতপক্ষে এখন পর্যন্ত কমিউনিস্ট এবং প্রগতিশীল শক্তির অগ্রগতি মোটেই অকিঞ্চিৎকর নয়। পুরোনো ব্যবস্থার ভাঙন এবং পুঁজিবাদী সম্পর্কের বিকাশের ফলে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য পরিচালিত আন্দোলন উত্তরোত্তর গভীরতা এবং ব্যাপকতা অর্জন করবে।
এর অর্থ এই নয় যে একটা পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সর্বত্রই একইভাবে সকল ঘটনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের মূল ভিত্তির সম্পূর্ণ বিরোধী। প্রত্যেক দেশে মার্কসবাদীদের মূল কাজ হওয়া উচিত নিজেদের সমাজের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসমূহকে অনুধাবনের জন্য সচেষ্ট হওয়া, তার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রকৃতি এবং পরিবেশ এবং মানুষের উপর তাদের প্রভাব সম্পর্কে অবহিত হওয়া। এর ফলে মার্কসবাদের ব্যাপক নীতিসমূহকে সঠিকভাবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। লেনিন সোভিয়েত ইউনিয়নে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অন্যান্য দেশে সমাজতন্ত্র গঠনের জন্য যাঁরা সাফল্যের সঙ্গে সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন তাঁরা নিজের দেশে ওই একই দায়িত্ব পালন করেছেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁরা মার্কসবাদের দিগন্তকে সাফল্যের সঙ্গে প্রসারিত করেছেন। মার্কসবাদ এখন আর কেবলমাত্র মার্কসের রচনাবলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ক্ষেত্রে তাঁর মৌলিক শিক্ষাকে প্রয়োগ করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেসব তত্ত্বগত এবং বাস্তব সমস্যার উদ্ভব ঘটেছে তাদেরও মার্কসবাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমি সতর্ক করে দিতে চাই যে, মার্কসবাদের সৃজনশীল প্রয়োগকে কোনো অবস্থাতেই যেন সংশোধনবাদের সমগোত্রীয় গণ্য করা না হয়। তাদের মধ্যে তফাৎ হলো এই যে, মার্কসের নামে শপথ গ্রহণ করেও সংশোধনবাদীরা মার্কসীয় চিন্তাধারার মূলে কুঠারাঘাত করে। সংশোধনবাদীদের এই প্রচেষ্টা সমাজের রূপান্তরের শ্রেণী সংগ্রামের ভূমিকা, কোনো সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বের প্রশ্ন, উৎপাদনের উপকরণের উপর জনসাধারণের মালিকানা, কোনো শ্রেণী কর্তৃক শোষণের অবসান ঘটানো এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপট নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়। সংশোধনবাদ নানাভাবে, নানা আকারে, নানা বর্ণে আত্মপ্রকাশ করে। তারা দক্ষিণপন্থী অথবা বামপন্থী- যে ধরনেরই হোক না কেন, তাদের উদ্দেশ্য একই। অর্থাৎ মার্কসবাদের মূল ভিত্তিকে অস্বীকার করা এবং শোষণহীন, নিষ্পেষণহীন নতুন সমাজ গঠনের বিরোধীদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া।
ভারতে আমরা নিজেদের পদ্ধতি অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের লক্ষ্যের দিকে পৌঁছনোর জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করেছি এবং আমাদের চারিদিকের বাস্তব সমস্যার ক্ষেত্রে মার্কসবাদের শিক্ষাকে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি। আমরা কখনো যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করিনি। বিভিন্ন বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের অংশীদার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমরা অনেক শিক্ষা গ্রহণ করেছি। বিগত তিন দশকের ওপর যে সব সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে, তারই প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি হলো পশ্চিমবঙ্গে এবং ত্রিপুরার বামফ্রন্ট সরকার। কেরালার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। যেখানে প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়েছিল। আমাদের দল, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র কর্মসূচীতে কেন্দ্রে বুর্জোয়া জমিদার শাসিত সরকার থাকা সত্ত্বেও রাজ্যে এই ধরনের বিকল্প সরকারের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। একটা বুর্জোয়া সংবিধানের গণ্ডীর এবং কেন্দ্রে একটা বুর্জোয়া জমিদার শাসিত সরকার থাকা সত্ত্বেও রাজ্যে এ ধরনের সরকার পরিচালনার দৃষ্টান্ত আমাদের নতুন অভিজ্ঞতার বিষয়। আমাদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। আমাদের আর্থিক সম্পদ অপ্রতুল এবং বিদ্যমান সংবিধান এবং সমাজ ব্যবস্থা একটা সমাজতান্ত্রিক দেশের মতো মানবিক এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে আমাদের কোনোভাবেই সাহায্য করবে না। আমরা স্বীকার করি যে, রাজ্যের সমস্যার কোনো মৌলিক সমাধান সম্ভব নয়। এই রাজ্যের সরকার পরিচালনায় আমরা নেতৃত্ব দিলেও শ্রেণীশাসন অব্যাহত আছে এবং ভারতে সামন্তবাদের সঙ্গে আপোষের মাধ্যমে পুঁজিবাদ গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা সমানভাবেই চলছে। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারী, মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, ভারতীয় এবং বিদেশী- একচেটিয়া পুঁজির বিকাশ এবং প্রকট দারিদ্র্য আমাদের জীবন দুর্বিসহ করে চলবেই। ঐ পরিবর্তনের ও বিকাশের আওতা থেকে পশ্চিমবঙ্গকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা সম্ভব নয়। আমরা জনসাধারণের কাছে এই সব সীমাবদ্ধতাকে গোপন রাখবার চেষ্টা করিনি। প্রকৃতপক্ষে আমরা শুরু থেকেই জনসাধারণকে এ বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করছি এবং তাদের কাছে এটা স্পষ্টভাবেই বার বার বলেছি যে, জাতীয় স্তরে কোনো পরিবর্তন ছাড়া রাজ্যস্তরে কোনো মৌলিক সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। রাজ্য সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সরকার পরিচালনা করা, প্রশাসনকে বিকেন্দ্রিত করা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধ্যমত সংস্কারের ব্যবস্থা করা, বিশেষভাবে সমাজের দুর্বলতর অংশের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা এবং জনসাধারণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সুরক্ষিত করা। আমরা ভারতের বিভিন্ন অংশের নির্যাতিত মানুষের কাছে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছি এবং জনসাধারণকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা মনে করি এর মাধ্যমে জনগণ মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যেসব বাধা বিপত্তি আছে তা অনুধাবন করতে পারবেন এবং সমাজতন্ত্রে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্য পূরণের জন্য তাঁরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন। আমরা বিশ্বাস করি, যখন তাঁরা নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবেন, একবার যখন তাঁরা বর্তমান ব্যবস্থাকে মেনে নিতে অস্বীকার করবেন অথবা ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করবেন, তখন তাঁরা পুরোপুরি স্বতন্ত্র মানুষে পরিণত হবেন।
পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ সংগঠিত যৌথ প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি লক্ষ্য করেছেন এবং তাঁরা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের একটা সরকার গঠনে সফল হয়েছেন। এই রাজ্য সরকার তাঁদের সংগ্রামে নিত্যসঙ্গী। কিন্তু আমরা জানি, দিল্লীর ক্ষমতাসীন একটা বুর্জোয়া সরকার থাকাকালীন আমরা আমাদের সাফল্য নিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। জনসাধারণের সঙ্গে আমাদের সংযোগকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী করতে হবে এবং বুর্জোয়াদের হাত থেকে গরিব মানুষকে সরিয়ে আনার জন্য আমাদের উদ্যোগকে অব্যাহত রাখতে হবে।
আমরা এই রাজ্য সরকারকে এবং সরকারে আমাদের ভূমিকাকে একটা পরীক্ষামূলক বিষয়, মার্কসবাদের সৃজনশীল প্রয়োগ বলে মনে করি। অন্যান্য সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মতো আমরা এই সরকার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছি। জনসাধারণকে সকল সমস্যা এবং বর্তমান পর্যায়ে আমাদের সংগ্রামের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষিত করে এবং এই অভিজ্ঞতার আলোকে জনসাধারণের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমরা নিজেদের শিক্ষিত করে তুলছি। আমরা কখনো মনে করি না, এই রাজ্য সরকারই আমাদের সমস্ত লক্ষ্য এবং সংগ্রামের শেষ কথা! আমরা এই সরকারকে অগ্রগতির একটা হাতিয়ার, সংগ্রামের একটা ধাপ হিসাবে মনে করি। আমরা স্বীকার করি সরকারে থাকা সত্ত্বেও মার্কসীয় অর্থে রাষ্ট্রক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। রাষ্ট্রক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা এখন আর তত্ত্বের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। রাষ্ট্রক্ষমতা কি, তার অর্থ কি এবং রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে আমাদের বিরোধ বাধলে তার ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সে বিষয়ে আমরা এখন সচেতন। সরকারে থেকে রাষ্ট্রের নিষ্পেষণী ক্ষমতাকে আমরা কিছুটা সংযত করতে সফল হয়েছি এবং খেটে-খাওয়া মানুষ ও কৃষকদের জমি অথবা শ্রমবিরোধের ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে এবং জমিদার শিল্পপতিদের পক্ষে পুলিস আমলাতন্ত্রকে আমরা ব্যবহার করতে দিইনি। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের ওপর বাধা-নিষেধ অরোপকারী কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগ করতে আমরা অস্বীকার করেছি। আমরা ঐ সব অধিকার প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে এবং এমন কি রাজনৈতিক অর্থে আমাদের বিরোধীদের ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেছি। আমরা সামগ্রিকভাবে এই রাজ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে পুনরুজ্জীবিত করেছি। এর ফলে ব্যাপকভাবে জনসাধারণের সংগ্রামী কার্যকলাপে ব্যাপক সংখ্যায় যৌথ উদ্যোগে জনসাধারণের অংশগ্রহণের অনুকূল পরিস্থিতি গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে সরকার ও জনসাধারণের মধ্যে সম্পর্কের বাঁধনটা আরও জোরদার হয়েছে।
সরকারে থেকে আমরা নতুন মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। আমরা জনসাধারণকে স্পষ্ট ও খোলাখুলিভাবে বলেছি- আমরা কি পারবো- আর কোন্টা পারবো না। আমরা কখনো আত্মসমালোচনার কুণ্ঠা বোধ করিনি। আমাদের খেটে-খাওয়া বন্ধু, কর্মচারী এবং সমর্থকদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও কখনো পিছু হটিনি। আমাদের সাফল্য সম্পর্কে যে মতামতই ব্যক্ত করা হোক না কেন, একথা কেউ বলবে না যে আমরা লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছি অথবা জনসাধারণকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে যে কাজ করা সম্ভব আমরা তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছি। যারা গরিব মানুষের পক্ষে বলে নিজেদের জাহির করেন, তাদের শঠতার মুখোশ আমরা খুলে দিয়েছি। আমাদের পূর্ববর্তী সরকার যেসব আইন নিছক আইনের বইতে সংযোজিত করার জন্য প্রণয়ন করেছিলেন এবং কখনো তাঁদের বাস্তবায়িত করেননি, আমরা সেই সব আইন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলবৎ করেছি। সংবিধানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমাদের আন্দোলনকে কোনো অবস্থাতেই কর্মবিমুখতার অজুহাত হিসাবে চিহ্নিত করতে চাই না। পক্ষান্তরে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমরা আমাদের সাধ্যমতো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
জাতীয় সংহতি সাধনের ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য সম্পর্কে আমরা গর্বিত। আমি যখন "আমরা" শব্দটি ব্যবহার করি তখন কেবল রাজ্য সরকারের কথাই বলি না, এই রাজ্যের সমগ্র জনসাধারণের কথাই উচ্চারণ করি। আমাদের পরিপ্রেক্ষিত জাতীয় এবং দীর্ঘমেয়াদী কোনো সঙ্কীর্ণতাবাদী অথবা তুচ্ছ-বিচার-বিবেচনা দ্বারা এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রিত নয়। আমরা ধর্মীয়, ভাষাগত, সংখ্যালঘু, হরিজন এবং তফসিলী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অন্ধ সংস্কারবাদী অথবা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী প্রচারাভিযান অথবা দাঙ্গার বিরুদ্ধে সর্বদাই সোচ্চার। এই রাজ্যের জনগণ এই ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে সর্বদাই সচেতন। আমাদের এই সাফল্যকে বজায় রাখার জন্য আমরা বদ্ধপরিকর। কিন্তু এটাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে - দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাচ্ছে এবং ভাবনা-চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত হচ্ছে। অন্যান্য ধরনের আনুগত্যের পরিবর্তে শ্রেণী আনুগত্যই উত্তরোত্তর বেশি গুরুত্ব অর্জন করেছে। একজন ভূমিহীন মজুর অথবা একজন শ্রমিক অথবা মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত কর্মচারীর অন্যান্য আনুগত্য যাই হোক না কেন ক্রমান্বয়ে নিজের শ্রেণীর সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করার শিক্ষা গ্রহণ করছেন। আমরা মার্কসবাদীরা মনে করি, আমরা রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্বলতর অংশের জন্য যে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পেরেছি তার পরিসংখ্যানের তুলনায় এই শ্রেণীগত দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে আমি এই আশা প্রকাশ করছি, এই সেমিনারে মার্কসবাদের বিভিন্ন দিক ও বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে এবং সেই আলোচনার ফলে আমাদের অনুধাবনের ক্ষমতা আরও বেশি সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। আমি আশা করি এই সেমিনার একটা রুটিন মাফিক বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না, মার্কস, এঙ্গেলস্, লেনিন এবং অন্যেরা যেসব প্রশ্ন সামনে তুলে ধরেছেন এই সেমিনার তার উপর আরও ব্যাপক এবং বিস্তৃত আলোচনার সূত্রপাত ঘটাবে। আমি এই সেমিনারের সাফল্য কামনা করছি।
কার্ল মার্কসের মৃত্যুশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। ১৯৮৩ সালের অক্টোবরে পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজিত সেমিনারে ২ অক্টোবর ভাষণ দেন বসু। সেই ভাষণেরই বঙ্গানুবাদ সংকলিত হয়েছে। বঙ্গানুবাদ সংগ্রহ করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সাবঅর্ডিনেট ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপত্র 'সংযোগ' পত্রিকার মার্চ ১৯৮৪ বিশেষ সংখ্যা (পৃষ্ঠা ৯-১৭) থেকে। উল্লেখ্য, বসু-র মূল পেপারটি দেবকুমার ব্যানার্জি সম্পাদিত 'Marx and His Legacy: A Centennial Appraisal' গ্রন্থেও (কে পি বাকচি অ্যান্ড কোম্পানি, কলকাতা, ১৯৮৮; পৃষ্ঠা: ১-৯) সংকলিত হয়েছিল। বঙ্গানুবাদটি ২০০৩ সালে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি কর্তৃক প্রকাশিত ‘জ্যোতি বসুর নির্বাচিত রচনাসংগ্রহ – তৃতীয় খণ্ড’ -তে প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশের তারিখ: ০৮-জুলাই-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
