Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ফুটবল, পুঁজি ও স্মৃতি

সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়
২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে তাই আমাদের শুধু সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নের নাম ভাবলে চলবে না। আমাদের ভাবতে হবে ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও। আমরা কি এমন এক বিশ্বকাপ দেখতে চলেছি যেখানে বৈশ্বিক পুঁজির শক্তি আরও সুসংহত হবে? নাকি এমন এক মঞ্চ, যেখানে এখনও মরক্কোর মতো দেশের উত্থান, জর্জিয়ার মতো নতুন শক্তির আবির্ভাব কিংবা লাতিন আমেরিকার রাস্তার ফুটবলের স্মৃতি নতুন করে প্রাণ পাবে?
Football Capitalism and Memory

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। ইতিহাসে এই প্রথম ৪৮টি দেশ অংশ নেবে বিশ্বকাপের মূলপর্বে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো জুড়ে আয়োজিত এই বিশ্বকাপ হবে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া-আয়োজন। কিন্তু এই বিশালতার মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে: ফুটবল কি এখনও জনগণের খেলা, নাকি তা ক্রমশ আন্তর্জাতিক পুঁজির নিয়ন্ত্রিত একটি বিনোদন-শিল্পে পরিণত হয়েছে?

এই প্রশ্ন নতুন নয়। উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো, আর্জেন্টিনার ফুটবল-দার্শনিক হোর্হে ভালদানো এবং সমকালীন অর্থনীতিবিদ ব্রাঙ্কো মিলানোভিচ—তিনজন ভিন্ন অবস্থান থেকে একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ভাষা আলাদা, রাজনৈতিক অবস্থান আলাদা, কিন্তু তাঁদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এক: ফুটবলের ক্রমবর্ধমান পণ্যায়ন, মানুষের সৃজনশীলতার সংকোচন এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সংস্কৃতির অবক্ষয়।

ফুটবলকে বিশ্লেষণ করতে গেলে এটিকে কেবল একটি খেলা হিসেবে দেখা যায় না। ফুটবল একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, একটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র এবং একই সঙ্গে ক্ষমতা ও পুঁজির সংগ্রামের মঞ্চ। ফলে বিশ্বকাপের মতো একটি আয়োজনকে বোঝার জন্য মাঠের ভেতরের কৌশল নয়, মাঠের বাইরের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির দিকে তাকানো প্রয়োজন।

মার্কস লিখেছিলেন যে পুঁজিবাদ প্রতিটি মানবিক সম্পর্ককে বিনিময়-মূল্যে রূপান্তরিত করে। আধুনিক ফুটবল সেই তত্ত্বের এক জীবন্ত উদাহরণ। একসময় ক্লাব ছিল পাড়া, শহর বা শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান। আজ ক্লাব হলো একটি ব্র্যান্ড; সমর্থক হলো ভোক্তা; খেলোয়াড় হলো বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ; আর ম্যাচ হলো বিক্রয়যোগ্য কনটেন্ট।

গালেয়ানো তাঁর ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ফুটবল একসময় ছিল আনন্দের খেলা, কিন্তু ধীরে ধীরে তা পরিণত হয়েছে ফলাফলের কারখানায়। তাঁর কাছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বাণিজ্যিকীকরণ। তিনি দেখেছিলেন, কীভাবে লাতিন আমেরিকার বস্তি থেকে উঠে আসা সৃজনশীল ফুটবলাররা ইউরোপীয় বাজারে গিয়ে ক্রমশ যান্ত্রিক খেলোয়াড়ে পরিণত হচ্ছে। যে শিশুটি রাস্তার ধারে খালি পায়ে বল খেলতে খেলতে ফুটবল শিখেছিল, তাকে পরে শেখানো হচ্ছে কোথায় দাঁড়াতে হবে, কতবার পাস দিতে হবে এবং কোন মুহূর্তে ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।

এই পরিবর্তনকে সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের ‘র‌্যাশনালাইজেশন’ ধারণার মাধ্যমে বোঝা যায়। আধুনিক সমাজে দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণের নামে মানবিক সৃজনশীলতা ক্রমশ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বন্দি হয়। ফুটবলও সেই একই পথে হাঁটছে। ডেটা অ্যানালিটিক্স, জিপিএস ট্র্যাকিং, এক্সপেক্টেড গোল (এক্স জি), পজিশনাল প্লে— সবকিছুই খেলাকে আরও দক্ষ করেছে, কিন্তু সেই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে খেলার স্বতঃস্ফূর্ততা কমিয়েছে।

গালেয়ানোর চোখে মারাদোনা ছিলেন শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি ছিলেন বিদ্রোহী কল্পনার প্রতীক। গ্যারিঞ্চা, পেলে, রোমারিও কিংবা ডিডির মধ্যেও তিনি দেখেছিলেন এক ধরনের মুক্ত সৃজনশীলতা। আজকের ফুটবলে সেই চরিত্রগুলো বিরল। কারণ আধুনিক কোচিং দর্শন প্রায়শই ব্যক্তিসত্তাকে সমষ্টিগত ব্যবস্থার অধীন করে দেয়।

হোর্হে ভালদানো এই প্রসঙ্গে আরও সূক্ষ্ম অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসার অস্তিত্ব অস্বীকার করেন না। বরং স্বীকার করেন যে আধুনিক ফুটবল অর্থ ছাড়া টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু তাঁর বিখ্যাত ‘ফুটবলের জঙ্গল’ রূপক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে খেলার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের কল্পনাশক্তি। জঙ্গলের চারপাশে সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে, কিন্তু সভ্যতা যদি জঙ্গলটিকেই ধ্বংস করে দেয়, তবে খেলার আত্মা হারিয়ে যাবে।

ভালদানোর মতে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার অনিশ্চয়তা। যে মুহূর্তে খেলাটি সম্পূর্ণ পূর্বানুমেয় হয়ে যাবে, সে মুহূর্তে তা শিল্পের বদলে প্রকৌশলে পরিণত হবে। তাঁর এই বক্তব্য আসলে গালেয়ানোর উদ্বেগেরই আরেক রূপ। উভয়েই বিশ্বাস করেন যে ফুটবলের সৌন্দর্য কৌশলগত পরিপূর্ণতায় নয়, বরং মানবিক অসম্পূর্ণতায়।

এই আলোচনায় ব্রাঙ্কো মিলানোভিচ নতুন মাত্রা যোগ করেন। তিনি ফুটবলের সাংস্কৃতিক সংকটকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর মতে, আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো "ডির‌্যাসিনেশন"—শিকড়চ্যুতি। ক্লাবগুলো একসময় নির্দিষ্ট সামাজিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছিল। এখন তারা বৈশ্বিক বিনিয়োগের প্ল্যাটফর্ম।

প্যারিস সাঁ-জার্মাঁ, ম্যানচেস্টার সিটি কিংবা অন্য অনেক ধনী ক্লাবের দিকে তাকালে দেখা যায় যে তাদের উত্থান অনেকাংশে বহিরাগত পুঁজির ফল। সমর্থক সম্প্রদায় দল তৈরি করেনি; বরং দল তৈরি হওয়ার পরে সমর্থক সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে। মিলানোভিচ এই ঘটনাকে ‘সামাজিকভাবে ex nihilo সৃষ্টি’ বলে অভিহিত করেন।

এই বিশ্লেষণ আমাদের কার্ল পোলানির ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশন’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। পোলানি দেখিয়েছিলেন যে বাজার যখন সমাজের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তখন সামাজিক সম্পর্কগুলো বাজারের যুক্তির অধীন হয়ে পড়ে। আধুনিক ফুটবলে আমরা ঠিক সেই দৃশ্যই দেখতে পাই। ক্লাব আর সম্প্রদায়ের সম্পদ নয়; বরং বিনিয়োগকারীর সম্পদ।

বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া সক্রিয়। ফিফা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছে যে তারা ফুটবলের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, ফিফা আসলে একটি ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেশনের মতো আচরণ করে, চেম্বার অফ কমার্সের মতো। বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং বিপণন কার্যক্রম থেকে যে বিপুল মুনাফা তৈরি হয়, তার তুলনায় ফুটবলের স্থানীয় পরিকাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত থাকে।

২০২৬ বিশ্বকাপ এই বিতর্ককে আরও তীব্র করবে। কারণ এই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন এক ভূখণ্ডে, যেখানে ক্রীড়া বহুদিন ধরেই বিনোদন শিল্পের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে ম্যাচ শুধু ম্যাচ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযোজনা। আলো, শব্দ, বিশাল স্ক্রিন, কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং এবং বিপণন— সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের "স্পেক্ট্যাকল"।

ফরাসি তাত্ত্বিক গি দ্য বোর্দ তাঁর ‘সোসাইটি অব দি স্পেকটাকেল’ গ্রন্থে লিখেছিলেন যে আধুনিক পুঁজিবাদে বাস্তব সামাজিক অভিজ্ঞতার জায়গা দখল করে নেয় প্রদর্শন। ফুটবলের ক্ষেত্রেও সেই প্রক্রিয়া দৃশ্যমান। খেলা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার টেলিভিশন উপস্থাপন, সামাজিক মাধ্যমের প্রচার এবং বাণিজ্যিক মূল্য ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে এখানেই একটি দ্বান্দ্বিকতা রয়েছে। কারণ বিশ্বকাপ এখনও এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে জাতীয় পরিচয় এবং জনসমষ্টির আবেগ শক্তিশালীভাবে উপস্থিত। ক্লাব ফুটবল যতই বৈশ্বিক বাজারের অধীন হোক না কেন, বিশ্বকাপে মানুষ এখনও দেশ, ইতিহাস এবং স্মৃতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে।

গালেয়ানো যে কারণে মন্তেভিদিওর সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামের কথা লিখেছিলেন, বা মারাকানার নীরবতার মধ্যে ১৯৫০ সালের পরাজয়ের প্রতিধ্বনি শুনেছিলেন, সেই কারণেই বিশ্বকাপ এখনও বিশেষ। এটি কেবল ম্যাচের ফল নয়; এটি স্মৃতির ভাণ্ডার।

ব্রায়ান গ্ল্যানভিলও একই কারণে বিশ্বকাপকে ইতিহাসের আয়না বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, প্রতিটি বিশ্বকাপ আসলে তার সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ১৯৩৪ সালে মুসোলিনির ইতালি, ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসনের আর্জেন্টিনা, ১৯৯৮ সালে বহুসাংস্কৃতিক ফ্রান্স কিংবা ২০২২ সালে মরক্কোর সাফল্য— সবই ফুটবলের বাইরে বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাসের অংশ।

গালেয়ানো যেখানে ফুটবলের আত্মা খুঁজেছেন স্মৃতি, আবেগ ও জনগণের সংস্কৃতিতে, হোর্হে ভালদানো যেখানে ফুটবলকে মানবিক কল্পনার শিল্প হিসেবে দেখেছেন, সেখানে ব্রায়ান গ্ল্যানভিল ফুটবলকে দেখেছেন ইতিহাসের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার মধ্যে। তাঁর কাছে ফুটবল কেবল মাঠের ৯০ মিনিট নয়; এটি একটি সভ্যতার দলিল।

গ্ল্যানভিলের ‘দ্য স্টোরি অব দি ওয়ার্ল্ড কাপ’ বিশ্বকাপ নিয়ে লেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগ্রন্থগুলির অন্যতম। তিনি দেখিয়েছেন যে কোনও বিশ্বকাপই রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়। ১৯৩৪ সালের ইতালি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র ছিল; ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা সামরিক একনায়কত্বের বৈধতা অর্জনের প্রচেষ্টার অংশ ছিল; ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বহুসাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ বিশ্বকাপ কখনও শুধুমাত্র ফুটবল নয়; এটি রাষ্ট্র, জাতি, ক্ষমতা ও মতাদর্শেরও মঞ্চ।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি নিছক বৃহত্তম বিশ্বকাপ নয়; এটি বিশ্বায়নের নতুন যুগের রাজনৈতিক প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—উত্তর আমেরিকার তিন রাষ্ট্রের যৌথ আয়োজন এমন এক বিশ্বব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে পুঁজির প্রবাহ সীমান্ত অতিক্রম করে, কিন্তু মানুষ ও শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতা প্রযোজ্য হয় না। ফলে বিশ্বকাপ এখানে কেবল ক্রীড়া নয়; এটি সমকালীন বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক রূপও।

গ্ল্যানভিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল ফুটবলের জাতীয় শৈলী বা ‘ফুটবলিং কালচারস’ সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ। তাঁর মতে, আর্জেন্টিনার ফুটবল, ব্রাজিলের ফুটবল, ইতালির ফুটবল বা ইংল্যান্ডের ফুটবল কেবল আলাদা কৌশল নয়; এগুলি আলাদা সামাজিক ইতিহাসের ফল। অর্থাৎ খেলার ধরনও সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।

একবিংশ শতাব্দীর কর্পোরেট ফুটবল এই বৈচিত্র্যকে ক্রমশ সংকুচিত করছে। ইউরোপীয় ক্লাব-ব্যবস্থা, বৈশ্বিক স্কাউটিং নেটওয়ার্ক এবং অভিন্ন প্রশিক্ষণ-পদ্ধতি বিভিন্ন দেশের ফুটবলকে একই রকম করে তুলছে।

এখানেই গ্ল্যানভিলের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ফুটবলকে বুঝতে হলে শুধু বর্তমান দেখা যথেষ্ট নয়। একটি মারাদোনা, একটি পেলে, একটি ক্রুয়েফ কিংবা একটি মেসি কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভার ফল নয়; তারা নির্দিষ্ট সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সন্তান। ফলে ফুটবলের ইতিহাস মুছে গেলে ফুটবলের অর্থও আংশিকভাবে হারিয়ে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন ফিফা বিশ্বকাপকে ক্রমশ বৃহত্তর বাজারে রূপান্তরিত করছে, তখন গ্ল্যানভিল আমাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখান—বিশ্বকাপ কি এখনও ইতিহাসের ধারক, নাকি এটি শুধুমাত্র বৈশ্বিক বিনোদন শিল্পের সবচেয়ে বড় পণ্য?

২০২৬ বিশ্বকাপও সেই অর্থে একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত। এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে, জাতীয়তাবাদ নতুনভাবে ফিরে আসছে এবং ডিজিটাল পুঁজিবাদ মানুষের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে রূপান্তরিত করছে। ফলে বিশ্বকাপকে শুধু খেলার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়।

প্রগতিশীল বাম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল প্রশ্ন হলো: ফুটবল কার? কর্পোরেশনের, নাকি জনগণের?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ ফুটবল একই সঙ্গে পণ্য এবং সংস্কৃতি। এটি একদিকে বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্প, অন্যদিকে বস্তির শিশুর স্বপ্ন। এটি একদিকে কর্পোরেট স্পনসরের বিজ্ঞাপন, অন্যদিকে পরাজয়ের পরে কান্নারত সমর্থকের স্মৃতি।

এই দ্বৈততাই ফুটবলের শক্তি।

তবু গালেয়ানো, ভালদানো এবং মিলানোভিচ আমাদের সতর্ক করেন। তাঁরা মনে করিয়ে দেন যে ফুটবল যদি সম্পূর্ণভাবে বাজারের যুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে, তবে তার সামাজিক আত্মা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি খেলোয়াড় কেবল একটি ডেটা-পয়েন্টে পরিণত হয়, সমর্থক কেবল গ্রাহক হয়ে যায় এবং ক্লাব কেবল বিনিয়োগের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে ফুটবল তার ঐতিহাসিক চরিত্র হারাবে।

২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে তাই আমাদের শুধু সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নের নাম ভাবলে চলবে না। আমাদের ভাবতে হবে ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও। আমরা কি এমন এক বিশ্বকাপ দেখতে চলেছি যেখানে বৈশ্বিক পুঁজির শক্তি আরও সুসংহত হবে? নাকি এমন এক মঞ্চ, যেখানে এখনও মরক্কোর মতো দেশের উত্থান, জর্জিয়ার মতো নতুন শক্তির আবির্ভাব কিংবা লাতিন আমেরিকার রাস্তার ফুটবলের স্মৃতি নতুন করে প্রাণ পাবে?

ফুটবলের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে খেলার প্রকৃত শক্তি তার অনিশ্চয়তা, তার মানবিকতা এবং তার স্মৃতিতে। কর্পোরেট পুঁজি সেই শক্তিকে ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

এই কারণেই ফুটবল এখনও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে বাজার এবং সংস্কৃতি, পুঁজি এবং আবেগ, নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীনতা—পরস্পরের সঙ্গে অবিরাম সংঘাতে লিপ্ত।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই সংঘাতেরই নতুন অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়কে বুঝতে গেলে গালেয়ানোর কবিতাময় বেদনা, ভালদানোর মানবতাবাদী রোমান্টিকতা এবং মিলানোভিচের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে একসঙ্গে পড়তে হবে। কারণ ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কেবল খেলার বিতর্ক নয়; এটি মানুষের সমাজ কেমন হবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরই একটি প্রতিফলন। ফুটবলের মাঠে যে সংগ্রাম চলছে, সেটি আসলে স্মৃতি ও বাজার, সম্প্রদায় ও কর্পোরেশন, শিল্প ও পণ্যের মধ্যকার সংগ্রাম। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই সংগ্রামকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে— এবং সম্ভবত আমাদের বাধ্য করবে আবারও প্রশ্ন করতে: ফুটবল কি এখনও জনগণের খেলা? নাকি এটি ইতিমধ্যেই পুঁজির সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সফল সাংস্কৃতিক পণ্য হয়ে উঠেছে?


প্রকাশের তারিখ: ১১-জুন-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০২ টি নিবন্ধ
১১-জুন-২০২৬

১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫