Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

স্কোপ্‌সের বিচার, আজও প্রাসঙ্গিক

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
...ডারউইন ও আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস আলাদা আলাদা ভাবে একই সময়ে বলেছিলেন যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন হয়, সঠিক অর্থে তাই এটি দুজনেরই তত্ত্ব। এমন নয় যে বিবর্তনের কথা আগে কেউ বলেননি; লামার্কের বিবর্তন তত্ত্বের কথা আমরা সবাই জানি। ডারউইনের ঠাকুর্দা বিজ্ঞানী ইরাসমাস ডারউইনও বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু বিবর্তনের পিছনের কারণ ডারউইন ও ওয়ালেসের আগে কেউ বুঝতে পারেননি। তবে ডারউইন বিবর্তনবাদের সমর্থনে বিপুল পরিমাণ তথ্য জোগাড় করেছিলেন, এবং ওয়ালেস কখনো কখনো তাঁর নিজের তত্ত্বের বৈপ্লবিক তাৎপর্য থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন। তাই অনেক সময়েই বিবর্তনতত্ত্বকে ডারউইনবাদও বলা হয়।
Scopes trial, still relevant today
একশো বছর আগের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক কাহিনির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে আমাদের দেশে। ১৯২৫ সালে টেনেসি প্রদেশের ডেইটন শহরের এক স্কুলশিক্ষক জন স্কোপ্‌সকে আইনভঙ্গের দায়ে আদালতে হাজির হতে হয়। সেই বছর ২৩ মার্চ টেনেসির আইনসভা বিপুল গরিষ্ঠতাতে এক আইন পাস করেছিল। বাইবেলে লেখা আছে ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আইন হল যে তার বিরোধী কোনো তত্ত্ব স্কুলে পড়ানোকে অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। স্পষ্টতই লক্ষ্য ছিল ডারউইনের বিবর্তনবাদ। 

সকলেই অবশ্য মুখ বুজে এই আইন মেনে নেননি। তাঁরা বুঝেছিলেন যে শুধু বিবর্তনবাদ নয়, এ হল আধুনিক বৈজ্ঞানিক মনোবৃত্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপরে আক্রমণ। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন শিক্ষকদের কাছে এই আইন ভাঙার আহ্বান জানায়; তার জন্য আদালতে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা তারা দেবে। স্কোপ্‌স রাজি হন, তিনি ঘোষণা করেন তিনি স্কুলে বিবর্তনের ক্লাস নিয়েছেন। আইন ভাঙার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। স্কোপ্‌সের পক্ষে দাঁড়ান আমেরিকার সব থেকে বিখ্যাত উকিলদের একজন, ক্ল্যারেন্স ড্যারো। ড্যারো ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন প্রগতিশীল, তিনি সানন্দে এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। রাজনীতিবিদ উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদে তিনবার ডেমোক্রেটিক দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন; তিনি সরকারপক্ষের উকিলদের সঙ্গে যোগ দেন।

আমেরিকাতে মৌলবাদী খ্রিস্টানমহল ১৯২০র দশকের শুরু থেকেই বিবর্তন তত্ত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ১৯২০ থেকে ১৯২৫-এর মধ্যে অনেকগুলি রাজ্যেই বাইবেল বিরোধী যে কোনো শিক্ষার উপর বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা এই সমস্ত আইনের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছিলেন। সেই কারণে স্কোপ্‌স মামলা সারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এটিই আমেরিকার প্রথম মামলা যা রেডিওতে সারা দেশে সম্প্রচারিত হয়েছিল। কোর্টের মধ্যে জায়গা হবে না বলে বাইরে এমন এক তাবুতে বিচারের ব্যবস্থা করা হয় যেখানে কুড়ি হাজার লোক বসতে পারত। সারা দেশ থেকে সাংবাদিকরা ডেইটন শহরে মামলা খবর করতে এসেছিলেন। 



স্কোপ্‌স যে আইন ভেঙেছিলেন তা তিনি অস্বীকার করেননি, কাজেই সেদিক দিয়ে বিচারের বিশেষ কিছু ছিল না। ড্যারোরা আদালত নয়, মানুষের কাছে নিজেদের যুক্তি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার পক্ষ ড্যারোকে সেই সুযোগ দিচ্ছিলেন না। ড্যারো তখন এক অভাবনীয় কাজ করেছিলেন, তিনি বিপক্ষের উকিল ব্রায়ানকে বাইবেল বিশেষজ্ঞ হিসাবে সাক্ষ্য দিতে ডেকেছিলেন, এবং বাইবেল থেকে নানা উদাহরণ দেখিয়ে বলতে বাধ্য করেছিলেন যে বাইবেলে যা লেখা আছে তার সবটাই আক্ষরিক সত্যি নয়, কিছু কথা রূপক বলে ধরতে হবে। ড্যারোর এক বিখ্যাত প্রশ্ন ছিল, বাইবেলে লেখা আছে সৃষ্টির চতুর্থ দিনে ঈশ্বর সূর্য চন্দ্র সৃষ্টি করেছিলেন, তাহলে তার আগের তিন দিন রাত কেমন করে হয়েছিল? স্কোপ্‌সের পক্ষে সাক্ষী প্রাণীবিজ্ঞানী মেইনার্ড মেটকাফ বলেন বিবর্তনতত্ত্ব বিজ্ঞানী মহলে সাধারণভাবে স্বীকৃত। বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী সরাসরি সাক্ষ্য না দিলেও বিবর্তন তত্ত্বের পক্ষে তাঁদের মত লিখিতভাবে কোর্টের কাছে পেশ করেন। 

কিন্তু বিচারক এই সমস্ত সাক্ষ্যকে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করে শুধুমাত্র স্কোপ্‌স আইন ভেঙেছেন কিনা তা দেখার জন্য জুরিদের নির্দেশ দেন। আটদিনের বিচারের শেষে জুরিরা ন'মিনিট আলোচনা করে স্কোপ্‌সকে সেই অপরাধে দোষী বলে ঘোষণা করেন। স্কোপ্‌সের একশো ডলার ফাইন হয়, তবে পরে টেনেসি সুপ্রিম কোর্ট একটা নিয়মগত ভুল দেখিয়ে তা বাতিল করে দেয়। অবশ্য সেই সুপ্রিম কোর্টই একই সঙ্গে আবার আইনটিকে সাংবিধানিক বলে রায় দেয়। ১৯২৮ সালে আমেরিকার আরকানসাস ও মিসিসিপি রাজ্যও বিবর্তনতত্ত্ব পড়ানোকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল। টেনেসির আইনটি ১৯৬৫ সালের আগে বাতিল হয়নি, তবে তা আর কখনোই প্রয়োগ করা হয়নি। টেনেসির পরে অন্য রাজ্যগুলিও তাদের বিবর্তনবিরোধী আইনগুলি বাতিল করে। পরে স্কোপ্‌সের বিচার মঞ্চে ও চলচ্চিত্রের পর্দায় স্থান পেয়েছিল। 


আমেরিকাতে বিবর্তনবাদ প্রচারের কাজ করেছিল এই বিচার যা ইতিহাসে স্কোপ্‌স মাঙ্কি ট্রায়াল নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। ডারউইনের মতবাদের বিরোধিতাতে বাঁদরের কথা আসা নতুন কিছু নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত বিতর্ক হয়েছিল ১৮৬০ সালে অক্সফোর্ডে; বিষয় ছিল বিবর্তনবাদ। ঠিক আগের বছর ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে চার্লস ডারউইনের সেই কালজয়ী গ্রন্থ যাকে 'অরিজিন অফ স্পিসিস' এই সংক্ষিপ্ত নামে আমরা সবাই চিনি। আলোচনাতে অনেকে অংশ নিলেও মূল তর্ক হয়েছিল দুজনের মধ্যে। একদিকে ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত বক্তা বিবর্তনবাদের তীব্র বিরোধী বিশপ স্যামুয়েল উইলবারফোর্স; অন্যদিকে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী টমাস হাক্সলি যিনি নিজেকে বলতেন ডারউইনের বুলডগ। তর্কটা বেঁধেছিল বিবর্তনবাদের পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ নিয়ে, কিন্তু উইলবারফোর্স যুক্তির পরিবর্তে কথার কারিকুরিতে হাক্সলিকে পরাজিত করার চেষ্টা করছিলেন। একসময় হাক্সলিকে ব্যাঙ্গ করে জিজ্ঞাসা করেন তাঁর ঠাকুর্দা না ঠাকুমা, কে বাঁদর ছিলেন। হাক্সলি উত্তরে বলেন যে পূর্বপুরুষ বাঁদর বলে তাঁর কোনো লজ্জা নেই, তিনি লজ্জিত হতেন যদি তিনি জানতেন যে তাঁর পূর্বপুরুষ সত্যকে সুবিধামতো বিকৃত করেছিলেন। স্পষ্টতই ইঙ্গিতের লক্ষ্য ছিলেন উইলবারফোর্স। 

এখানে বলে রাখি যে ডারউইন ও আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস আলাদা আলাদা ভাবে একই সময়ে বলেছিলেন যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন হয়, সঠিক অর্থে তাই এটি দুজনেরই তত্ত্ব। এমন নয় যে বিবর্তনের কথা আগে কেউ বলেননি; লামার্কের বিবর্তন তত্ত্বের কথা আমরা সবাই জানি। ডারউইনের ঠাকুর্দা বিজ্ঞানী ইরাসমাস ডারউইনও বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু বিবর্তনের পিছনের কারণ ডারউইন ও ওয়ালেসের আগে কেউ বুঝতে পারেননি। তবে ডারউইন বিবর্তনবাদের সমর্থনে বিপুল পরিমাণ তথ্য জোগাড় করেছিলেন, এবং ওয়ালেস কখনো কখনো তাঁর নিজের তত্ত্বের বৈপ্লবিক তাৎপর্য থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন। তাই অনেক সময়েই বিবর্তনতত্ত্বকে ডারউইনবাদও বলা হয়। 

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতো পরিচিত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজন এই লেখাতে নেই। সংক্ষেপে বলা যায় যে, যে কোনো প্রজাতির জীবদের মধ্যে বিভিন্ন কারণে নতুন চরিত্রের প্রকাশ ঘটে। জীবজগতে যে নতুন চরিত্রগুলি পরিবেশে ঐ জীবের বংশবৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে কোনো সুবিধা দেয়, সেগুলি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে যেগুলি বংশবৃদ্ধিতে জীবকে অসুবিধাজনক অবস্থানে ফেলে, সেই পরিব্যক্তিগুলি লুপ্ত হয়ে যায়। এই পদ্ধতিকে বলে অভিযোজন; এর মাধ্যমে নতুন চরিত্র পুঞ্জীভূত হতে হতে শেষ পর্যন্ত নতুন প্রজাতির জন্ম হয়। একেই বলে প্রাকৃতিক নির্বাচন। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতির উদ্ভব আমাদের পৃথিবীর এই বৈচিত্রময় জীবজগৎ কেমনভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা বুঝতে সাহায্য করেছে।

সেই পুরানো গল্প আবার প্রাসঙ্গিক হয়েছে। কয়েকবছর আগে আমাদের দেশের সেই সময়ের কেন্দ্রীয় উচ্চশিক্ষামন্ত্রী সত্যপাল সিং মশাই বলেছিলেন যে কেউ তো বাঁদর থেকে মানুষ হতে দেখেনি, সুতরাং বিবর্তন তত্ত্বটাই ভুল। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বোঝা কমানোর নামে জীববিজ্ঞানের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বিবর্তনবাদকে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচী থেকে বাদ দিয়েছে। রসায়নে পর্যায়সারণী বা পদার্থবিদ্যাতে তড়িৎচৌম্বক আবেশ বা শক্তির উৎসের মতো বিষয়ও বাদ দেওয়া হচ্ছে, তবে তারা সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্রের রিপোর্টের ভাষায় কোল্যাটারাল ড্যামেজ। শুধু জীববিজ্ঞান পাঠক্রমের বোঝা হালকা করলে অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সহজেই বোঝা যাবে, তাই অন্য বিজ্ঞানেও হাত পড়েছে। পর্যায়সারণী না পড়িয়ে রসায়ন শেখানো যায় সে কথা যাঁরা ভাবতে পেরেছেন, তাঁদের চিন্তাপদ্ধতি বুদ্ধির অগম্য। রসায়নে পর্যায় সারণীর যেখানে স্থান, জীববিজ্ঞানে বিবর্তন তত্ত্ব তার থেকে কম কেন্দ্রীয় অবস্থানে নেই। আমাদের চারদিকের জীবজগতের বৈচিত্রকে বোঝার অন্য কোনো উপায় নেই। মনোবিদ্যা, ভাষাতত্ত্ব, এমনকি পদার্থবিজ্ঞানেও বিবর্তনবাদ নতুন পথ দেখাচ্ছে। পরিবেশ, অতিমারী, ওষুধ ও তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি মৌলিক সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে বিবর্তনবাদের মধ্যে। তাই দেশের আঠারোশোর বেশি বিজ্ঞানী এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, তবে তাতে বড়কর্তাদের মত পাল্টায়নি।


বিজ্ঞানে এত নানা বিষয় থাকা সত্ত্বেও কেন ডারউইনের তত্ত্বই বারবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে? উইলিয়াম ব্রায়ান কেন বিবর্তনবাদের বিরোধিতা করেছিলেন? বাইবেলে লেখা আছে ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশাল অংশের মানুষ বিবর্তন তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না। ব্রায়ানের মনে হয়েছিল যে সেই তত্ত্ব স্কুলে পড়লে বাইবেল ও খ্রিস্টধর্ম থেকে ছাত্রছাত্রীদের বিশ্বাস চলে যাবে। বিদ্যালয়ের পাঠক্রম থেকে যাঁরা ডারউইনবাদকে বাদ দিচ্ছেন, তাঁদের আশঙ্কার কারণ বুঝতে আগের বাক্যটাতে খ্রিস্টধর্মের জায়গায় যে কোনো ধর্ম এবং বাইবেলের জায়গায় তার ধর্মগ্রন্থের কথা বসিয়ে নিতে পারেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের এক স্কুলে ডারউইনের তত্ত্বের কথা বলাতে এক শিক্ষকের হেনস্থার খবর এখনো খুব পুরানো হয়নি। 

মৌলবাদ যুক্তিপ্রমাণের ধার ধারে না, সেখানে ধর্মগ্রন্থই যথেষ্ট। প্রাচীন ও মধ্যযুগে তাকে কেউ প্রশ্ন করার কথা ভাবতে পারত না। কিন্তু আধুনিক জগৎ অনেকটা এগিয়ে গেছে, বিজ্ঞান হল এই যুগের মন্ত্র। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মও এখন অনেক সময়েই নিজেকে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ করতে চায়; নানা ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির সমর্থনে বিজ্ঞান থেকে যুক্তি খোঁজা হয়, যদিও প্রায় সব ক্ষেত্রেই তা অপযুক্তি। তাই বিজ্ঞানের অন্য বিষয়ের উপর মৌলবাদীদের বিদ্বেষ খুব প্রবল নয়। কিন্তু বিবর্তনবাদ সম্পর্কে তারা সবাই খড়্গহস্ত, কারণ সেখানে ঈশ্বরের কোনো স্থান নেই। বিবর্তনবাদ পুরোপুরি বস্তুবাদসম্মত যুক্তিতে জীবজগতের উদ্ভবের ব্যাখ্যা দেয়; এবং সেই কারণেই তা সকলের অবশ্যপাঠ্য। 

একটা কথা বলতেই হবে; পাঠক্রম রচয়িতারা অন্তত বিবর্তনবাদকে ভুল বলেননি, উঁচু ক্লাসের পাঠক্রমে রেখে দিয়েছেন। পুরোটাই বাদ দিয়ে দিতে পারতেন; মন্ত্রী তো সেই দাবীই তুলেছিলেন। আমরা যে সায়েন্টিফিক টেম্পার বা বৈজ্ঞানিক মনোবৃত্তির কথা বলি, এমন তো নয় যে একমাত্র বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্যই তা প্রযোজ্য; আধুনিক সমাজে সকলেরই সেই মনোবৃত্তি থাকা প্রয়োজন। বিবর্তনবাদ তা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাই দশম শ্রেণির পরে যারা ইতিহাস বা শিক্ষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়বে, বা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে, তাদেরও বিবর্তনবাদ শেখাটা জরুরি।

বিবর্তন তত্ত্বের বিরোধিতার নানা রূপ আছে। একটা হল যা আমাদের মন্ত্রীমশাই বলতে চেয়েছিলেন, অর্থাৎ বিবর্তন তত্ত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। প্রমাণ আছে, যথেষ্টই আছে, বিবর্তন তত্ত্ব এখন জীববিজ্ঞানে সব থেকে বেশি প্রমাণিত তত্ত্বদের অন্যতম। তার মানে এই নয় যে সেই তত্ত্বে কখনো কোনো সামান্য পরিবর্তন হবে না, কিন্তু মোটের উপর কাঠামো যে এক থাকবে তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। বিজ্ঞান কি পাল্টায় না? বিজ্ঞানের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল যে সে শেষ কথা বলতে পারে না। প্রতিনিয়ত নতুন উদ্ভাবন নতুন পর্যবেক্ষণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হচ্ছে, বিজ্ঞান নিজেকে পরিবর্তন করছে। এই আত্মসংশোধন ও আত্মোন্নতি একান্তভাবেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অঙ্গ। বিজ্ঞানীরা এই পরিবর্তন বিষয়ে সচেতন, তাই তাঁরা খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো মতকে নিশ্চিত বলে ঘোষণা করেন। তার অর্থ কিন্তু এই নয় যে আজ যা জানি তা কাল একেবারে ভুল প্রমাণিত হবেই। একেবারে যে তা হয় না এমন নয়, কিন্তু সেই উদাহরণ খুবই কম; এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তা আরও দ্রুত কমে আসছে। কিন্তু মৌলবাদীরা এই সুযোগ নেয় এবং বলার চেষ্টা করে যে বিবর্তন এখনো প্রমাণিত নয়। 

বিজ্ঞানে ব্যবহৃত শব্দগুলি প্রতিদিনের ভাষা থেকেই নেওয়া, কিন্তু তার অর্থ অনেক সময় আলাদা। যেমন ত্রুটি বা সম্ভাবনা, এই দুটি শব্দের অভিধানে যে অর্থ পাওয়া যায়, বিজ্ঞানীরা সেই অর্থে তাদের ব্যবহার করেন না। ইংরাজিতে কথাটা হল থিওরি অফ ইভলিউশন, তাই এমন কথা শোনার দুর্ভাগ্য হয়েছে, ও তো থিওরি, প্রমাণিত সত্য নয়। সাধারণ ভাষাতে আমরা অনেক সময় বলেই থাকি, ‘এটা তোমার থিওরি,’ অর্থাৎ তোমার বিশ্বাস, কিন্তু তা সত্যি নাও হতে পারে। বিজ্ঞানে ব্যাপারটা অনেকটা আলাদা। প্রথম যখন ডারউইন ও ওয়ালেস বিবর্তনের কথা বলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার নাম দেয়া হয়েছিল তত্ত্ব বা থিওরি। তারপরে গত দেড় শতাব্দীতে তার পক্ষে এত প্রমাণ জড়ো হয়েছে যে আর তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও তার নামটা থিওরিই রয়ে গেছে, যেমন ভৌতবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম তত্ত্ব বা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের পক্ষে অসংখ্য প্রমাণ সত্ত্বেও তাদের আমরা থিওরিই বলে থাকি।

 
বিজ্ঞানের পোশাক পরা অবিজ্ঞানের থেকে দ্বিতীয় ধরনের বিরোধিতা আসে। ঈশ্বর প্রাণ বা মানুষের সৃষ্টি করেছেন, এই ধারণার পোশাকি নাম ছিল ক্রিয়েশনিজম। এখন সেটা বিজ্ঞানী মহলে উপহাসের পাত্র, তাই তার নতুন নাম হয়েছে ইন্টালিজেন্ট ডিজাইন, কিন্তু সেটা একই রকম অবিজ্ঞান। আমেরিকাতে কয়েকটি রাজ্যে মৌলবাদীরা এই অবিজ্ঞানকে পাঠক্রমে ঢোকানোর চেষ্টায় কিছুটা সফল হয়েছে। ইন্টালিজেন্ট ডিজাইনের প্রবক্তাদের বক্তব্যও ক্রিয়েশনিস্টদের থেকে উন্নত কিছু নয়। তাঁরা ফিরে যেতে চান যেই যুগে, যখন ঈশ্বরের ইচ্ছায় জগৎ চলত। বিবর্তন তত্ত্ব প্রকাশের পরে তা আর হওয়ার নয়, তাই ডারউইনের উপরে রাগ স্বাভাবিক।

তৃতীয় এক পক্ষ আছেন যাঁরা ডারউইনের তত্ত্বসহ সব নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনকেই ধর্মগ্রন্থে বা পুরাণে খুঁজে পান। অবশ্য কেন জানি না বিজ্ঞানীরা আবিষ্কারটি করার আগে ধর্মগ্রন্থে তার উল্লেখ সবসময়েই তাঁদের সকলের চোখ এড়িয়ে যায়। পুরাণের দশাবতারের কাহিনিকে উল্লেখ করে প্রাচীন মুনিঋষিরা বিবর্তন তত্ত্ব জানতেন বলে দাবি করা হয়েছে। প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান থাকলে এই হাস্যকর দাবি আসত না। এই বিষয়ে আরো জানতে আগ্রহীরা ভারতবর্ষ পত্রিকার পাতায় মেঘনাদ সাহা ও অনিলবরণ রায়ের মধ্যে যে বিতর্ক হয়েছিল, সেই প্রবন্ধগুলি পড়ে নিতে পারেন। 

বিজ্ঞানের উপর মৌলবাদী আক্রমণ প্রতিহত করতে বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব আছে। গজদন্ত মিনারে বসে গবেষণার দিন আর নেই। তেমনি দায়িত্ব আছে সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রগতিশীল মানুষের। বিবর্তনতত্ত্ব না পড়ালে তা মিথ্যা হয়ে যাবে না। কিন্তু ক্ষতি হবে আমাদের সমাজের, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। প্রকৃতিকে চেনার বোঝার সব থেকে বড় হাতিয়ার হল বিবর্তন তত্ত্ব, তাকে ছাড়া বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। 


প্রকাশের তারিখ: ২১-ডিসেম্বর-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

খুব ভালো লাগলো অনেক ধন্যবাদ।
- DHRUBA MONDAL, ২৭-ডিসেম্বর-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪