Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

সমাজতন্ত্র কী?

প্রভাত পট্টনায়েক

তারা জানে যে, তা না করলে তাদের চাকরি চলে যাবে— অর্থাৎ তারা উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়বে। আর এই ধরনের শাস্তি কার্যকর করার জন্যই ব্যবস্থার বাইরে এমন একটি ক্ষেত্র থাকা অপরিহার্য, যেখানে বহিষ্কৃত শ্রমিকদের ঠেলে দেওয়া সম্ভব। সেই ‘বাইরের ক্ষেত্র’ই হলো বেকার শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত ‘শ্রমের মজুদ বাহিনী’।

What is socialism

আজকের দিনে বুর্জোয়া মতাদর্শের প্রভাব এতটাই সর্বব্যাপী যে, সমাজতন্ত্রের আদর্শে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসী অনেক মানুষের মধ্যেও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে নিতান্তই ভ্রান্ত ধারণা দেখা যায়। তাই এই মৌলিক প্রশ্নটিতে আবার ফিরে আসা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো, এটি এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের উপকরণের ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত থাকে। এই সামাজিক মালিকানার প্রতীক বা কার্যকর রূপ হিসেবে সাধারণত রাষ্ট্রীয় মালিকানাকেই ধরা হয়। কিন্তু এটি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত হলেও, একে যথেষ্ট শর্ত বলা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, পূর্বতন যুগোস্লাভিয়ায় উৎপাদনের উপকরণের ওপর প্রধানত রাষ্ট্রীয় মালিকানা ছিল। তবুও সেখানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বহু বৈশিষ্ট্য দেখা গিয়েছিল—যেমন বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক বৈষম্য (যদিও সেগুলি আজকের নবউদারবাদী পুঁজিবাদ যে চরম মাত্রার বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, সেসময়ে তার ধারেকাছেও পৌঁছায়নি)। আবার অন্যদিকে, ফ্রান্সের মতো বহু পুঁজিবাদী দেশেও অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত। কিন্তু শুধু এই কারণে ফ্রান্সকে সমাজতান্ত্রিক দেশ বলা যায় না। অতএব, সমাজতন্ত্র বলতে কেবল উৎপাদনের উপকরণের ওপর সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাকেই বোঝায় না; এর অর্থ এর চেয়েও অনেক বিস্তৃত ও গভীর।

পুঁজিবাদ মূলত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করে। একদিকে পুঁজিপতিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে, যা তাদের নিরন্তর পুঁজি সঞ্চয়ে বাধ্য করে, যাতে তারা উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পণ্যের সর্বাধুনিক উদ্ভাবন গ্রহণ করতে পারে। অন্যথায় তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না এবং বাজার থেকে ছিটকে পড়বে। অন্যদিকে শ্রমিকদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা হয়। অবশ্য শ্রমিকরা এই প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, মার্কসের ভাষায়, ‘সম্মিলিত’ (কম্বিনেশন) বা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করে— যা ভাঙতে বা দুর্বল করতে পুঁজিপতিরা সর্বদাই সচেষ্ট থাকে।

অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা। উৎপাদনের উপকরণের ওপর যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হলে এবং পুঁজিপতি শ্রেণির বিলুপ্তি না ঘটলে এই সহযোগিতা সম্ভব নয়। তাই সমাজতন্ত্রের অর্থ হলো শ্রমিকদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠা, অর্থাৎ পারস্পরিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। আগেই উল্লিখিত যুগোস্লাভিয়ার উদাহরণে দেখা যায়, সেখানে ‘বাজার সমাজতন্ত্র’ (Market Socialism)-এর নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। এর অর্থ ছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি বাজারে ঠিক সেইভাবে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, যেমন পুঁজিবাদে বেসরকারি মালিকানাধীন সংস্থাগুলি করে থাকে। এই কারণেই যুগোস্লাভিয়ার অর্থনীতিতে পুঁজিবাদের কিছু বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছিল।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি যেহেতু প্রতিযোগিতা, তাই এই প্রতিযোগিতায় যারা পরাজিত হয়, তাদের কোনো না কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতেই হয়। সেই শাস্তি হলো উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে তাদের ‘ছিটকে পড়া’ বা বহিষ্কৃত হওয়া। অর্থাৎ, ব্যবস্থার এমন একটি ‘বাইরের জগৎ’ থাকতে হবে, যেখানে এই ব্যর্থ মানুষদের ঠেলে দেওয়া যাবে। মার্কস ও এঙ্গেলস এই বাইরের ক্ষেত্রটিকেই বলেছিলেন ‘শ্রমের মজুদ বাহিনী’ (Reserve Army of Labour)। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এই মজুদ বাহিনীর ভূমিকা আরও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রত্যেক উৎপাদন ব্যবস্থাকেই শ্রমিকদের কাজে উৎসাহিত করা এবং শ্রমশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়। দাসপ্রথার সমাজে দাস নিজেই ছিল তার প্রভুর সম্পত্তি। ফলে প্রভু শারীরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাকে কাজ করতে বাধ্য করতে পারত এবং শ্রমশৃঙ্খলা বজায় রাখত।

একইভাবে সামন্ততান্ত্রিক সমাজেও শারীরিক বলপ্রয়োগ—অর্থাৎ সামন্তপ্রভুর চাবুক— ছিল শ্রমে উৎসাহ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান উপায়। কিন্তু পুঁজিবাদে, অন্তত আদর্শগতভাবে, শ্রমিকদের ওপর এ ধরনের প্রত্যক্ষ শারীরিক বলপ্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। তাহলে তারা কেন নিয়ম মেনে ও শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজ করে?

এর উত্তর হলো, তারা জানে যে, তা না করলে তাদের চাকরি চলে যাবে— অর্থাৎ তারা উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়বে। আর এই ধরনের শাস্তি কার্যকর করার জন্যই ব্যবস্থার বাইরে এমন একটি ক্ষেত্র থাকা অপরিহার্য, যেখানে বহিষ্কৃত শ্রমিকদের ঠেলে দেওয়া সম্ভব। সেই ‘বাইরের ক্ষেত্র’ই হলো বেকার শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত ‘শ্রমের মজুদ বাহিনী’।

এই ‘বাইরের ক্ষেত্র’ বা ‘মজুদ বাহিনী’-র আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রথমত, এটি নিশ্চিত করে যে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি (real wages) যেন শ্রম উৎপাদনশীলতার তুলনায় নিয়ন্ত্রিত থাকে। এর ফলে পুঁজিপতিরা ধারাবাহিকভাবে শ্রমিকদের সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্য (surplus value) আত্মসাৎ করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয়ত, এটি শ্রমিকদের অর্থমূল্যভিত্তিক মজুরি বৃদ্ধির দাবি (money wage claims) নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, যার ওপরই অর্থের মূল্যস্থিতি (stability in the value of money) অনেকাংশে নির্ভর করে।

অতএব, পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিকে কেবল তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ভিত্তিতে বোঝা যায় না। এটি এমন একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা, যার দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ রয়েছে—একটি ‘ভিতরের ক্ষেত্র’ (inside) এবং অন্যটি ‘বাইরের ক্ষেত্র’ (outside)। এই ‘বাইরের ক্ষেত্র’ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কোনো আকস্মিক বা গৌণ উপাদান নয়; বরং এটি এই ব্যবস্থার একটি যৌক্তিক ও অপরিহার্য উপাদান। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে যেমন ‘ভিতরের ক্ষেত্র’ অপরিহার্য, তেমনি ‘বাইরের ক্ষেত্র’ও সমানভাবে অপরিহার্য।

একমাত্র মার্কসবাদই এই মৌলিক সত্যকে উপলব্ধি করে; মার্কসবাদের বাইরে অর্থনীতির অন্য কোনো ধারাই তা করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে অর্থনীতির সবচেয়ে প্রচলিত ধারা—ওয়ালরাসীয় (Walrasian) অর্থনীতি— ধরা যেতে পারে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বাজারে এমন একটি ভারসাম্য (equilibrium) প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রতিটি বাজারেই চাহিদা ও যোগান সমান হয়ে যায়। এর অর্থ হলো শ্রমবাজারেও চাহিদা ও যোগান সমান থাকে। অন্য কথায়, এই ব্যবস্থায় প্রতিটি সময়পর্বেই পূর্ণ কর্মসংস্থান (full employment) বিরাজ করে। সেখানে শ্রমের কোনো ‘মজুদ বাহিনী’ (reserve army) নেই, অনিচ্ছাকৃত বেকারত্ব (involuntary unemployment) নেই, অর্থাৎ কোনো ‘বাইরের ক্ষেত্র’ (outside) নেই— আছে শুধু ‘ভিতরের ক্ষেত্র’ (inside)।

কিন্তু এমন একটি ব্যবস্থায় শ্রমিকদের কাজ করার প্রেরণা এবং শ্রমশৃঙ্খলা কীভাবে বজায় থাকে, সে প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা এই তত্ত্ব দিতে পারে না। অর্থাৎ, কার্যত এই তত্ত্বে উৎপাদন প্রক্রিয়ারই কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

এমনকি ধ্রুপদি রাজনৈতিক অর্থনীতিও (Classical Political Economy) উৎপাদনের প্রকৃত ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম নয়। কারণ, শ্রমিকদের কাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং শ্রমশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে এখানে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। অথচ মার্কস একসময় অসাধারণ উদারতার পরিচয় দিয়ে ধ্রুপদি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ ডেভিড রিকার্ডোকে ‘উৎপাদন তত্ত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক’ (theorist of production par excellence) বলে অভিহিত করেছিলেন।

আসলে এখানেই পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের বিষয় নিহিত। পুঁজিবাদ মানুষকে কাজ করানোর জন্য প্রত্যক্ষ শারীরিক বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর না করলেও, ‘চাকরি হারানোর ভয়’ বা ‘বরখাস্ত হওয়ার আতঙ্ক’-এর মাধ্যমে এক ধরনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, মানুষকে উৎপাদন ব্যবস্থার ‘ভিতরের ক্ষেত্র’ (inside) থেকে ছুড়ে ফেলে ‘বাইরের ক্ষেত্র’ (outside) —অর্থাৎ বেকারত্বের জগতে— নিক্ষেপ করার ভয়ই সেখানে শ্রমের প্রেরণা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান উপায়। কিন্তু সমাজতন্ত্রে এমন কোনো ‘বাইরের ক্ষেত্র’ নেই। সেখানে মানুষ কোনো ভয় বা জবরদস্তির কারণে কাজ করে না; বরং যে সমাজের তারা সদস্য, যে সমাজের সম্মিলিত মালিকানায় উৎপাদনের উপকরণ রয়েছে, সেই সমাজের কল্যাণের জন্যই তারা কাজ করে। এই ধরনের একটি সামাজিক সম্প্রদায় গড়ে তোলার জন্য উৎপাদনের উপকরণের ওপর সামাজিক মালিকানা অপরিহার্য। অবশ্য শুধু সামাজিক মালিকানাই সমাজতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করে না; তবে সমাজতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য এটি একটি অপরিহার্য শর্ত।

পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের এই মৌলিক পার্থক্য থেকেই আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের উদ্ভব হয়। পুঁজিবাদ একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—এবং তার প্রবৃত্তির কারণেই তাকে এমন হতে হয়। এই ব্যবস্থায় যারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, তাদের শাস্তি দেওয়াই তার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। বিপরীতে, সমাজতন্ত্রের মূল ভিত্তি যেহেতু সহযোগিতা, তাই তা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হতে পারে না।

পুঁজিবাদের এই শাস্তিমূলক চরিত্র কোনো ব্যক্তির নিষ্ঠুরতা বা খারাপ মানসিকতার ফল নয়; বরং এটি এই ব্যবস্থার কার্যপ্রণালীর মধ্যেই অন্তর্নিহিত। যে পুঁজিপতিরা পর্যাপ্ত পুঁজি সঞ্চয় করতে পারেন না এবং সেই কারণে নতুন প্রযুক্তি, নতুন উৎপাদনপ্রক্রিয়া বা নতুন পণ্য প্রবর্তনের সামর্থ্য হারান, তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন না এবং উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়েন। তাদের স্থান দখল করে আরও বেশি পুঁজি সঞ্চয়কারী এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে সক্ষম বৃহত্তর পুঁজিপতিরা। মার্কস এই প্রক্রিয়াকেই পুঁজির ‘কেন্দ্রীভবন’ (centralization of capital) নামে অভিহিত করেছিলেন।

একইভাবে, যেসব শ্রমিক পুঁজিপতিদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারেন না, তাদেরও শাস্তি দেওয়া হয়। তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ‘ভিতরের ক্ষেত্র’ থেকে সরিয়ে বেকারদের সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে এই ‘বাইরের ক্ষেত্র’, অর্থাৎ ‘শ্রমের মজুদ বাহিনী’ (reserve army of labour), একদিকে যেমন শাস্তিপ্রাপ্ত মানুষদের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে, তেমনি অন্যদিকে শ্রমের ওপর পুঁজির কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে।

এখান থেকে অবিলম্বে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়।

প্রথমত, ‘কল্যাণমূলক পুঁজিবাদ’ (welfare capitalism)-এর দিকে যে কোনো অগ্রগতি— অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ও সামগ্রিক অবস্থার উন্নতির উদ্দেশে গৃহীত যে কোনো পদক্ষেপ— একই সঙ্গে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শাস্তি প্রদানের ক্ষমতাকে হ্রাস করে এবং তার ফলে শ্রমের ওপর পুঁজির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই বিষয়টিই জন মেনার্ড কেইনস উপলব্ধি করতে পারেননি। তিনি ওয়ালরাসীয় অর্থনীতির কল্পিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি শনাক্ত করলেও, সামগ্রিকভাবে তিনি পুঁজিবাদকে ওয়ালরাসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখেছিলেন। অর্থাৎ, তাঁর ধারণায় পুঁজিবাদ কেবল একটি ‘ভিতরের ক্ষেত্র’ নিয়ে গঠিত; সেখানে কোনো ‘বাইরের ক্ষেত্র’ বা ‘শ্রমের মজুদ বাহিনী’-র অস্তিত্ব নেই।

কেইনস মনে করেছিলেন, পূর্ণ কর্মসংস্থান ও অন্যান্য কেইনসীয় নীতির বিরুদ্ধে পুঁজির আপত্তি মূলত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রকৃত কার্যপ্রণালী সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির ফল। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভুল ধারণা দূর হবে এবং আপত্তিও মিলিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে পুঁজির এই আপত্তির ভিত্তি ছিল অনেক গভীর ও সুদৃঢ়। কারণ, পুঁজিবাদের অধীনে শুধু পূর্ণ কর্মসংস্থানই কার্যত অসম্ভব নয়; বরং পূর্ণ কর্মসংস্থানের দিকে যে কোনো অগ্রগতি শ্রমের ওপর পুঁজির ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দেয়। (অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে পুঁজি কখনোই এমন কোনো পদক্ষেপ মেনে নেবে না।)

এই কারণেই আজকের বিশ্বে পুঁজিবাদকে স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্য প্রণীত কেইনসীয় নীতিগুলি ক্রমশ গুরুত্ব হারিয়েছে— এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, ‘সংস্কারকৃত পুঁজিবাদ’ (reformed capitalism) কিংবা ‘কল্যাণমূলক পুঁজিবাদ’ (welfare capitalism)-এর ধারণা শেষ পর্যন্ত এক মরীচিকা মাত্র। এই ধারণাগুলি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এই মৌলিক সত্যটিকে উপেক্ষা করে— যে পুঁজিবাদ স্বভাবগতভাবেই একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

দ্বিতীয়ত, সমাজতন্ত্র তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। তাই সমাজতান্ত্রিক সমাজের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত পূর্ণ কর্মসংস্থান। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যদি কখনও শাস্তিমূলক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়— তা সে পূর্ণ কর্মসংস্থানের অভাবের আকারেই হোক, অথবা শ্রমিকদের কাজে উদ্বুদ্ধ করা ও শ্রমশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আরও প্রত্যক্ষ জবরদস্তিমূলক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমেই হোক—তবে তাকে সর্বোচ্চ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উত্তরণপর্বের একটি সাময়িক বৈশিষ্ট্য হিসেবেই দেখা যেতে পারে। কিন্তু তা কখনোই সমাজতন্ত্রের অন্তর্নিহিত বা স্থায়ী বৈশিষ্ট্য নয়; বরং সমাজতন্ত্রের মৌলিক চেতনার সঙ্গেই এর বিরোধ রয়েছে।

তাই আধুনিক যুগে একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতেই পূর্ণ কর্মসংস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখা গিয়েছিল— এতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

সেখানে সমাজতন্ত্রের পতনের পর আবার সেই সমাজগুলিতে ব্যাপক বেকারত্ব ফিরে এসেছে। কিন্তু সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন বিচ্যুতি, সীমাবদ্ধতা বা বিকৃতি দেখা দিতে পারে বলেই সেগুলিকেই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থায়ী ও অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এক গুরুতর তাত্ত্বিক ভ্রান্তি।

ভাষান্তর: শংকর মুখার্জি 


প্রকাশের তারিখ: ৩০-জুলাই-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ৯৯ টি নিবন্ধ
৩০-জুলাই-২০২৬

১১-জুন-২০২৬

১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪

২৯-নভেম্বর-২০২৪