সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আলোছায়ার ফুটবল
দীপ্তজিৎ দাস
এডুয়ার্ডো গ্যালিয়ানোর কথায় কোনো দলের ফুটবল সংজ্ঞায়িত করে নির্দিষ্ট সংস্কৃতিকে। নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ফুটবল জাতির পরিচায়ক।... দৃষ্টিনন্দন ফুটবল দেখে মুগ্ধ হতেন তিনি। তার ভাষায় তিনি আসলে 'সুন্দর ফুটবলের ভিক্ষুক'। ফুটবল পায়ে যে আবেগ তিনি প্রকাশ করতে পারেননি তাকেই কলমে জীবন দিয়েছেন 'সকার ইন দ্যা সান এন্ড শ্যাডো' বইতে।

বিশ্বকাপের ছাড়পত্র নিশ্চিত হওয়ার পর বুবিস্তা মিডিয়াকে বলেছিলেন, বিশ্বকে দেখাতে চাই আমরা কি এবং কেন? ফুটবলের থেকেও আমরা বেশি করে একটা সঙ্গীত। একটা সংস্কৃতি। বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে ইউরো জয়ী স্পেনকে আটকে দিয়ে চমকে দিয়েছে কোচ বুবিস্তার কাবো ভার্দে। ম্যাচের নায়ক চল্লিশ ছোঁয়া গোলকিপার ভোজিনহা ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ার সংখ্যায় ছাপিয়ে গেছেন কিংবদন্তি কিপাার ম্যানুয়াল ন্যুয়ারকে। অপ্রত্যাশিতের জাদুতে ফুটবল নিজেই বিস্ময়। নব্বই মিনিট, সবুজ ঘাস, চামড়ার গোলক মানেই রোমহর্ষক কাহিনীর জন্ম। যেমন ২০০২ এর সিওল দেখেছিল আফ্রিকান সিংহ সেনেগালের হাতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের পরাজয়ের রাত। ক্রুয়েফের ডাচ বাহিনী 'ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ' টোটাল ফুটবলের যে ঝলক দেখিয়েছিল তার সুর মূর্ছনা টেক্কা দিতে পারে শ্রেষ্ঠ অর্কেস্ট্রাকে। পায়ের ছোঁয়ায় বিশ্বকে যে আনন্দ দিয়েছেন পোলিওবিদ্ধ গ্যারিঞ্চা তার তুলনা বিরল। এডুয়ার্ডো গ্যালিয়ানোর কথায় কোনো দলের ফুটবল সংজ্ঞায়িত করে নির্দিষ্ট সংস্কৃতিকে। নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ফুটবল জাতির পরিচায়ক। বিখ্যাত সাংবাদিক, লেখক নিজেকে দাবি করেছেন লেখক হিসেবে তিনি লাতিন আমেরিকার স্মৃতিচারণায় মগ্ন। তারই স্বাক্ষর উঠে এসেছিল 'ওপেন ভেইন্স অফ লাতিন আমেরিকা'য়। উরুগুয়ের রাজধানী মন্টিভিডিওয় জন্মানো আর পাঁচজন শিশুর মতন তিনিও ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। নাসিওনালের ফ্যান হিসেবে পেনারোলের হারায় তিনি উচ্ছ্বসিত হতেন। তার মনপ্রাণ জুড়ে ছিল ফুটবল। সেই টানেই ছুটে গেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। দৃষ্টিনন্দন ফুটবল দেখে মুগ্ধ হতেন তিনি। তার ভাষায় তিনি আসলে 'সুন্দর ফুটবলের ভিক্ষুক'। ফুটবল পায়ে যে আবেগ তিনি প্রকাশ করতে পারেননি তাকেই কলমে জীবন দিয়েছেন 'সকার ইন দ্যা সান এন্ড শ্যাডো' বইতে।
প্রায় ৫০০০ বছর আগে চীনে চামড়ার গোলক নিয়ে শুরু হয়েছিল খেলা। জাগলিং করে মাঠের মাঝে রাখা গোলে যে দল বেশি বল ঢোকাতে পারবে তারাই হবে জয়ী। দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে গেছে ফুটবল। নিয়েছে নিজের ভাষা। প্রাচীন সভ্যতা মিশর থেকে মেসোপটেমিয়া সর্বত্র রয়েছে তার ছাপ। গ্রীক, রোমান সভ্যতার পাতাতেও রয়েছে ফুটবলের বিবরণ। তবে তখনও ফুটবল ছিল দুই শহরের খেলা। তাতে উন্মাদনা ছিল। ছিল না আবেগ, ছিল না জীবন। ১৮৪৮ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবলের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম প্রচলন করে। ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডের ১২ টি ক্লাব একসাথে সেই নিয়ম মানতে সম্মত হলে নির্দিষ্ট আকৃতিতে আসে ফুটবল খেলা। ১৮৭০ সালে স্কটল্যান্ডে শুরু হয় এগারো জনের খেলা। সেই সময় থেকে সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ; বারবার বদলেছে ফুটবলের বিভিন্ন নিয়ম তবে প্রাথমিক কাঠামোকে বজায় রেখেই। উপনিবেশ আর বাণিজ্যের সাথে সাথেই ফুটবল এসে পৌঁছায় লাতিন আমেরিকায়। মন্টেভিডিও, বুয়েনস আয়ার্স, রিও ডি জেনিরোর সৈকতে বদলাতে থাকে ফুটবলের ঘরানা। চামড়ার গোলকে লাথির সাথেই জুড়ে যায় বডি ফেইন্ট,ড্রিবল,স্কিলের ঝলক। নতুন প্রাণের ছোঁয়ায় ডানা মেলে ফুটবল। পরবর্তীতে বিভিন্ন মহাদেশের চ্যাম্পিয়নশিপ,অলিম্পিক,ফুটবল বিশ্বকাপে বদলেছে খেলার ধরন। যে ফুটবল একসময় ছিল নিখাদ আনন্দের খোঁজ; পুঁজি, প্রযুক্তির হস্তক্ষেপে তা হয়েছে ফলাফল সর্বস্ব। এক সময় যে খেলায় আক্রমণ শানাতো পাঁচ স্ট্রাইকার আজ সেখানে 'ফলস নাইনের' ছোঁয়া। প্রাচীন সময় থেকে মডার্ন ফুটবল; ফুটবলের এই পরিচলনের এক জীবন্ত ধারাভাষ্য 'সকার ইন দ্যা সান এন্ড শ্যাডো'। ১৯৫৪ থেকে ১৯৯৪ এর বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যাওয়া হতাশ করে লেখক এডুয়ার্দো গালিয়ানোকে। পেলে - গ্যারিঞ্চা - ডিডির ব্রাজিলের ম্যাজিক, স্ট্র্যাটেজির চাপে হারিয়ে গেলে আহত হন লেখক।
সমগ্র রচনা জুড়ে আধিপত্য রেখেছে লেখকের দর্শক স্বত্ত্বা। প্রিয় দলের ম্যাচ মানে সমর্থকের কাছে 'আমাদের ম্যাচ'। বিখ্যাত স্কটিশ ফুটবল ম্যানেজার ম্যাট বুসবির কথায়,' সমর্থক ছাড়া ফুটবল কিছুই নয়।' সেই কথারই প্রতিধ্বনি উঠে এসেছে লেখকের কথায়। আজও ওয়েম্বলি থেকে ভেসে আসে ৬৬'র ইংল্যান্ডের জেতার উল্লাস, ৫০-এর ব্রাজিলের হারার পর মারকানার কান্না, ৭৪-এর ফাইনালে জার্মানির বিজয়ের পর মিউনিখের অলিম্পিক স্টেডিয়ামের উচ্ছ্বাস মোহিত করে রাখে লেখকের স্মৃতি স্বত্ত্বাকে। ফুটবলের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক ফ্যানেরাই। তারাই দলের দ্বাদশ যোদ্ধা। তাকে স্বীকৃতি দিয়েই ১২ নম্বর জার্সি তুলে রাখে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। দর্শকের চোখে গোলকিপার ফুটবলে আনন্দের মাঝে বিছিয়ে দেওয়া কাঁটা। আর রেফারির সিদ্ধান্ত যেন একনায়কতন্ত্রের আগ্রাসন। ফুটবলার দল বদলাতে পারে। কিন্তু সমর্থকের কাছে দলই তার অস্তিত্ব, তার পরিচয়। প্রিয় তারকাকে অন্য দলের জার্সিতে দেখা তার কাছে বিভীষিকা। সেই তাড়নাতেই ফ্ল্যামেঙ্গো ছেড়ে ভাস্কো ডা গামায় যোগ দেওয়া বেবেতোকে টিটিকিরি করে বেড়ায় লাল কালোর দর্শকরা। নিজের প্রিয় দলের জন্য জীবন বাজি রাখে সমর্থকরা। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের লিভারপুল বনাম জুভেন্টাস খেলায় তুরিনের দলের সমর্থকদের মৃত্যু, পেরু বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচে রেফারির ভুল সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পরা অশান্তি থেকে পেরুর ৩০০ র বেশি সমর্থকদের মৃত্যুর মর্মস্পর্শী বিবরণ ফুটে উঠেছে লেখকের লেখায়।
ফুটবল বরাবরই আদ্যন্ত রাজনৈতিক। ফুটবলের সাথে মিশে থাকা সেই রাজনৈতিক সংগ্রামের দর্পণ হয়েছে এডুয়ার্ডো গ্যালিয়ানোর লেখনী। গ্রামসির ভাষায় ফুটবল 'খোলা আকাশের নীচের রাজত্বের প্রতি মানুষের আনুগত্য'। শোষিত মানুষ লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে ফুটবলকে। তেমন ভাবেই প্রবল জনপ্রিয়তার জন্য নিজেদের রাজনীতির প্রচারের কাজে ফুটবলকেই হাতিয়ার করেছে স্বৈরাচারী শাসকরা। আবার ফুটবল মাঠেই ছড়িয়ে আছে তাদের বর্বরতার সাক্ষ্য। ১৯৩৪ এবং ১৯৩৮ এর বিশ্বকাপকে ইতালির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন মুসোলিনি। ১৯৩৪ এর প্রতিটি ম্যাচেই হাজির থাকতেন তিনি। ১৯৩৮ সালের ম্যাচের আগে ফুটবলারদের কাছে পৌঁছে গেছিল তার হুমকি চিঠি, 'হয় জয় নয় মৃত্যু!' হিটলারের জার্মানি সোভিয়েত আক্রমণ করলে বিখ্যাত ক্লাব ডায়নামো কিয়েভের সাথে অনুষ্ঠিত হয় জার্মানির এক দলের ম্যাচ। ম্যাচে ডায়নামো কিয়েভ জয়ী হওয়ায় ফুটবলারদের হত্যা করা হয়। তাদের মূর্তি আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ক্লাবের স্টেডিয়ামের সামনে। জেনারেল ফ্র্যাঙ্কো তার স্বৈরাচারের বৈধতার জন্য ব্যবহার করতেন রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবকে। সরাসরিভাবে ফ্যাসিবাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে জাতির শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে সওয়াল করতেন ক্লবকর্তা সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। সময় বদলালেও বদলায়নি শাসকের ইতিহাস। ব্রাজিলের সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা হলে বিশ্বজয়ী ব্রাজিল দল এবং ফুটবল সম্রাট পেলের ছবি ব্যবহার করে নিজের প্রচার করেন জেনারেল মেডিচি। জুন্টা শাসনে আর্জেন্টিনার ভিডেলা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিলেন দেশজুড়ে ঘটে চলা দমন পীড়নের বৈধতার উপায় হিসেবে। মিলান ক্লাবকে ঋণ থেকে মুক্ত করে তাকে ব্যবহার করেই ইতালির ক্ষমতায় এসেছিলেন বার্লুসকোনি। লেখকের লেখায় বারবার ফিরে এসেছে সেই দগদগে স্মৃতি গুলোর কথা। স্বৈরতন্ত্রের আস্ফালনেই কুৎসিত হয়েছে 'মানুষের ফুটবল'।
যুদ্ধের বিরুদ্ধে,আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও সেই ফুটবল। ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে মেহনতির জবাবও ফুটবল। বুয়েন্স আয়ার্সের ক্ষত বিক্ষত বুভুক্ষু মানুষের কথা বলতেই পথ চলেছিল বোকা জুনিয়ার্স। রোসারিওতে রেলওয়ে শ্রমিকরাই গড়ে তুলেছিলেন রোসারিও সেন্ট্রাল ক্লাব। ফ্রাঙ্কোর জমানায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পোস্টার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিল বার্সেলোনা এবং আথলেটিক বিলবাও। কাতালোনিয়ার লড়াইয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বার্সেলোনার লড়াই। বাস্ক উপত্যকার জাত্যভিমান আজও বহন করে আথলেটিক বিলবাও। ১৯৫০ এর দশকে পরাধীন আলজেরিয়ার স্বাধীনতার স্বপ্ন বিশ্বজুড়ে ফেরি করেছিল তাদের বিদ্রোহী ফুটবল দল। আবার যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে ফুটবল জুড়েছে মানুষকে,নিভিয়েছে যুদ্ধের আগুন। ফুটবলের সেই অসীম ক্ষমতা বারবার মনে করিয়েছেন লেখক। ফুটবল সম্রাট পেলেকে দেখার জন্য থেমে গিয়েছিল নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বলকানে মেক্সিকান সাংবাদিক নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছিলেন। যোদ্ধা বাহিনীর কাছে তার বেঁচে থাকার একমাত্র অধিকার তিনি ফুটবলার হুগো স্যাঞ্চেজের দেশের লোক। আইভরি কোস্টের দীর্ঘ সময়ের গৃহযুদ্ধ থেমে গিয়েছিল দ্রোগবার নেতৃত্বে দেশ বিশ্বকাপে যোগ্যতার্জনের পর। এডুয়ার্ডো গ্যালিয়ানোর ভাষায় দিয়েগো মারাদোনা আসলে বিদ্রোহের আইকন। অসাধারণ ফুটবল নৈপুণ্যের সাথে সাথে একরোখা মারাদোনা সবসময় সোচ্চার ছিলেন শোষিত মানুষের জন্য। আবার পুঁজিবাদ ফুটবলকে গিলে খেতে এলে কেন ফুটবলাররা শ্রমিকের মর্যাদা পাবেন না প্রশ্ন ছুঁড়তেও ভোলেন না মারাদোনা।
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ বারবার কলঙ্কিত হয়েছে নব্য ফ্যাসিস্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে। আমেরিকার ন্যক্কারজনক অভিবাসন নীতির শিকার হয়েছে আফ্রিকার দলগুলি। বহু সমর্থক বঞ্চিত হয়েছেন প্রিয় দলের খেলা চাক্ষুষ করা থেকে। সব থেকে লজ্জাজনক মুহূর্ত এসেছে যখন সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আর্তানকে বাতিল করা হয় ম্যাচ পরিচালনা থেকে। ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে বর্ণবৈষম্যের সমস্যা। তার ব্যাথাতুর দলিল হয় উঠেছে এই বই। ১৯১৬ সালে উরুগুয়ে লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেলে শুরু হয় বর্ণবৈষম্যের অধ্যায়। দুই কৃষ্ণাঙ্গ গ্রেডিন এবং দেলগাডো ম্যাচে খেলায় জেতার পরও তাদের শিরোপা বাতিলের দাবি তোলে ব্রাজিল। এরপর জাতির মর্যাদার প্রশ্ন তুলে ফুটবল দলে কৃষ্ণাঙ্গদের খেলানো নিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ব্রাজিল। ফলে ১৯২০ সালের লাতিন আমেরিকার চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা হয়নি সেই সময়ের সেরা ফুটবলার ফ্রেইডেনরিচের। উপনিবেশবাদের কালোছায়া থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আসেন অজস্র কালো চামড়ার মানুষ। প্রতিনিয়ত অপমান সহ্য করেই ফুটবল তুলে নিতে হতো তাদের।ফ্রান্সের বিখ্যাত ফুটবলার কোপা থেকে পর্তুগালের ইউসেবিও বারবার শিকার হয়েছেন বর্ণবৈষম্যের। নেদারল্যান্ডসের ইউরোজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গুলিট, রাইকার্ডকেও অসম্মান হজম করতে হয়েছে কালো চামড়ার জন্য। পরবর্তী সময়ে বর্ণবৈষম্য বিরোধী কনসার্টে গিটার হাতে গান গেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন গুলিট। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্স দলের বেশিরভাগ সদস্যই ছিলেন বংশগত ভাবে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নিবাসী। অথচ কাপ জেতার পথে তাদের নিয়েই বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস দেখায় ফরাসি জনতা। আবার ২০০২ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিদায়ের পর কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দেরই কাঠগড়ায় তোলেন উগ্র দক্ষিণপন্থীরা। আসলে বর্তমান সিস্টেম কেবল জয়ীকে সেলিব্রেট করতে চায়। এই কথাই ফুটে উঠেছিল জার্মান তারকা মেসুট ওজিলের আক্ষেপে,' জিতলে আমি জার্মান,হারলেই আমি তুর্কি'। আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কেবল মাত্র গায়ের রঙের জন্য হেনস্তার শিকার হতে হয় ফুটবলারদের। এমবাপ্পে থেকে সাদিও মানে সকলেই এই সমস্যার শিকার। তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে ক্যাপ্টেনদের আর্ম ব্যান্ডে প্রচার করা হয়,' নো রুম ফর রেসিজেম'।
ফুটবলের প্রসারের সাথেই ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফা। বিভিন্ন সময়ে ফুটবলের প্রসারের তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ । আবার একাধিক বিষয়ে স্ক্যানারের নীচে এসেছে তার ভূমিকা। প্রশ্ন উঠেছে নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালে হঠাৎ করেই আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। এমনকি সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ বিভিন্ন বিতর্কের ক্ষেত্রে ফিফা কার্যত আত্মসমর্পণ করেছে আমেরিকার কাছে। প্যালেস্টাইনে হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করা যার মদতে,ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করে তুলে আনতে উদ্যত হন যে ফ্যাসিস্ট তাকে শান্তির পতাকাবাহক হিসেবে ফিফার তুলে ধরা এক লজ্জাজনক পদক্ষেপ। বিগত সময়েও একই ভাবে ফিফা মাথা নীচু করেছে মুসোলিনি থেকে আর্জেন্টিনার স্বৈরাচারী ভিডেলার কাছে। ১৯৭৪ সালে হাভেলাগনে সভাপতি হওয়ার পর ফিফা হয়ে ওঠে পুঁজিবাদের আজ্ঞাবহ। হাভেগলানের কথায়,' ফুটবলকে বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করাই তার কাজ'। ব্রাজিলের ফুটবল ঘরানার বিপরীতে হেঁটে তার কাছে ফুটবলের সবথেকে আকর্ষণীয় বিষয় শৃঙ্খলা। হাভেগলানের হাত ধরে ১৬ দলের বিশ্বকাপ ১৯৯৮ সালে হয়ে ওঠে ৩২ দলের। কিন্তু যে এশিয়া ,আফ্রিকার দেশগুলো তার পাশে দাঁড়ায় তারাই ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয় হাভেগলানের দ্বারা। সম্প্রচার,বিজ্ঞাপন থেকে সরঞ্জাম নির্মাণ সর্বত্র তিনি প্রণয়ন করেন ফেলো কড়ি মাখো তেলের বিডিং ফর্মুলা। এর কদর্যরূপ ফুটে ওঠে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সময়। মেক্সিকোর ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় দুপুরবেলায় খেলা নির্ধারিত হয় কেবল সম্প্রচারের সুবিধার জন্য। মারাদোনা,ভালদানো, শুমাখাররা প্রতিবাদ করলে হাভেগলানে তাদের খেলায় মন দেওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তী সময়ে হাভেগালানের একান্ত সহযোগী শেপ ব্লাটার ফিফার সভাপতি হলেও বার বার বিতর্কে জড়ান।
২০১৭ সালে প্রীতি ম্যাচে প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের মুখোমুখি হওয়ার আগে তিউনিশিয়ার ক্লাব আফ্রিশিয়ানের সমর্থকরা এক বিশাল টিফো নিয়ে হাজির হয় যাতে লেখা ছিল, 'Created by poor, stolen by rich.' ২০২১ সালে ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোকে নিয়ে সুপার লিগ আয়োজনের চেষ্টা হয়। এর প্রধান ইনভেস্টর ছিল জেপি মরগান ব্যাংক,উদ্যোক্তা ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট পেরেজ। সমর্থকদের জোরালো প্রতিবাদের পর সেই প্রকল্প বাতিল হয়। কলকাতায় মেসির সফরকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অব্যবস্থা থেকে আমরা স্বচক্ষে দেখেছি পুঁজিবাদ এবং ক্ষমতার ককটেল কিভাবে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিটের ন্যূনতম দাম বর্তমানে ভারতীয় মূল্যে আড়াই লক্ষেরও বেশি। পুঁজিবাদ নষ্ট করছে ফুটবলের সর্বজনীনতা। এডুয়ার্ডো গ্যালিয়ানোর ভাষায় ফুটবলের যাত্রাপথ আসলে 'বিউটি থেকে ডিউটিতে'। সবুজ ঘাসে ফুটবলের যে শিল্প ফুল ফোটায় তাকে কেড়ে নেয় পুঁজিবাদ। ১৯৫০ এর দশকে উরুগুয়ের ক্লাব পেনারোল প্রথম জার্সিতে স্পন্সরের লোগো ব্যবহার করে। পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। বর্তমান সময়ের একজন পেশাদার ফুটবলার লেখকের চোখে, 'বিজ্ঞাপনের চলমান বিলবোর্ড!' একজন ফুটবলারের জার্সিতে তার দেশের থেকেও বড় করে দেখা যায় অ্যাডিডাস বা নাইকির লোগো। ৯০ এর দশকে মিলান দলের জার্সি স্পন্সর হিসেবে মোত্তা কোম্পানি ৪.৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। বিনিময়ে তাদের মুনাফা ১৫ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পায়। পারমালাট কোম্পানি পার্মা, পালমেইরাস,বোকা জুনিয়র্স ,পেনারলের জার্সি স্পন্সর হওয়ার পর লাতিন আমেরিকার বাজারে তাদের জনপ্রিয়তা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এর সাথে সাথেই বিভিন্ন সংস্থা ক্লাবের দখল নিতে থাকে। বর্তমান বিশ্বে বেশিরভাগ বড় ক্লাবই কোনো কোম্পানির মালিকাধীন। তাদের কাছে ক্লাবের পারফরম্যান্সের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা বৃদ্ধি। বিশেষ করে বিভিন্ন আরব কোম্পানি ফুটবল বাজারে অনুপ্রবেশের পর ফুটবলের ট্র্যাডিশনাল ঘরানার অনেকটাই বদল হয়েছে। ফিফার সাথে চুক্তির মাধ্যমেই এডিডাস তাদের ব্যবসায় ব্যাপক অগ্রগতি ঘটিয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও। ভারতে ২০২৬ বিশ্বকাপের সম্প্রচার নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই বাজারে এসেছে জি গ্রুপের চ্যানেল ইউনাইট৮ স্পোর্টস।
পুঁজিবাদী আগ্রাসনের ফলেই ফুটবলে আজ আনন্দের বদলে ফলাফলের গুরুত্ব বেশি। এই ঘটনায় অনুতপ্ত লেখক। ফলাফলের জন্যই চলছে প্রযুক্তির দাপট।স্কিলের বদলে প্রাধান্য পাচ্ছে শক্তি,গতি। ফুটবলাররা বাধ্য মালিকের জন্য ফলাফল আনতে। তাই তাদের জীবন হয়ে গেছে শেকল বাঁধা। বিভিন্ন ওষুধের ব্যবহার দীর্ঘ সময়ে ক্ষতি করছে ফুটবলারদের শরীরে। আধুনিক ফুটবলে বৈচিত্র্য কম,বৈষম্য বেশি। বেশিরভাগ দলের খেলার ধরণ কাছাকাছি অথচ ফুটবলারদের বেতনের ব্যাপক পার্থক্য। মুসোলিনির ইতালিতেই প্রথম মোটা অংকের টাকা দেওয়া হতো ফুটবলারদের। ধীরে ধীরে এই টাকার অঙ্কই লাতিনের ফুটবলারদের টেনে আনে ইতালিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতেই পেশাদার ফুটবল শুরু করে আর্জেন্টিনা,উরুগুয়ে,ব্রাজিল। চুক্তিতে আবদ্ধ ফুটবলার হয়ে যায় ক্লাবের সম্পত্তি। এর বহর বহুগুণ বেড়ে গেছে কর্পোরেটের অনুপ্রবেশের পর। লেখক বর্তমানের লিগ সিস্টেম এবং ট্রান্সফার মার্কেটকে চিহ্নিত করেছেন 'এক্সপোর্ট ইন্ডাস্ট্রি' হিসেবে।ছোট ক্লাব থেকে বড় ক্লাব,তারপর ইউরোপের বড় ক্লাব; এটাই কোনো ফুটবলারের যাত্রাপথ বর্তমানে। তাদের কেনার জন্য ব্যবহার হচ্ছে করা বড় অংকের টাকা। ক্লাব ফুটবলের চাপে পরিশ্রান্ত ফুটবলার মানিয়ে নিতে পারছে না আন্তর্জাতিক ফুটবলে। আলাদা দলের হয়ে ক্লাবে খেলা ফুটবলাররা এক সাথে মাঠে নামলেও একাত্ম হয়ে উঠতে পারছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব, আমেরিকা, কাতার, চীনের লিগের দলগুলোর মালিকদের অর্থের বৈভব আরও ভারসাম্যহীনতার জন্ম দিয়েছে।
ফুটবল আসলে এক অনবদ্য অনুভূতির প্রকাশ। যেখানে লেগে থাকে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বিষাদ, উত্থান, পতনের গল্প। ফুটবল বুঝতে হলে চলে যেতে হবে বাগদাদের সেই ঝলসে যাওয়া গ্রামে যেখানে মেসি লেখা জার্সি পরে প্রতি বিকেলে ধ্বংসস্তূপের উপর স্বপ্ন মাখা চোখ নিয়ে খেলতে নামে পঙ্গু শিশু। চলে যেতে হবে পোল্যান্ডের সেই হাসপাতালে যেখানে বিজ্ঞানকে চমকে দিয়ে কোমায় থাকায় কিশোর জেগে ওঠে রোনাল্ডোর গোলের ধারাভাষ্য শুনে।ফুটবল আসলে বেঁচে থাকার গান। যে জাদুকর সবুজ ঘাসে ছবি আঁকে তার কাছে ফুটবলই জীবনের যুদ্ধ। আর ফুটবলে বাঁচা দর্শকের কাছে ফুটবলই জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার রসদ। আন্দিজ থেকে আল্পস, কলকাতা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া; মুহূর্তে জুড়ে যায় ফুটবলের জাদুতে। তাই ফুটবলই হাতিয়ার পুঁজির লুঠের। আবার ফুটবলেই আজ প্রতিঘাতের মন্ত্র। ব্রাজিলের মতন বৈষম্য বিধ্বস্ত দেশে ফুটবল মানে 'রেসিয়াল ডেমোক্রেসি'। জীবন আর আবেগের সাপেক্ষে ফুটবলকে তুলে ধরেছেন এডুয়ার্ডো গ্যালিয়ানো তার কলমের ছোঁয়ায়। তবে এশিয়া এবং আফ্রিকার ফুটবল সম্পর্কে উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে বইটিতে। যে বৈষম্যের কথায় তিনি বিদ্ধ করেছেন পুঁজিবাদকে অজান্তে নিজেও তার শিকার হয়েছেন হয়তো তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণেই। নিজের বিশুদ্ধ আবেগকে তুলে আনতে গিয়েই হয়তো লাতিন আমেরিকা বনাম ইউরোপ ব্যাটলে তিনি লাতিন আমেরিকার পক্ষে। প্রযুক্তি এবং স্পোর্টস সায়েন্সের কাটাছেঁড়া করলেও তার ইতিবাচক প্রভাব কিছুটা এড়িয়ে গেছেন তিনি। তবুও সার্বিকভাবে বইটি আঁকড়ে ধরে রাখে পাঠককে,দেয় এক টানটান ম্যাচের থ্রিল। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে ফুটবলের বিবর্তন এবং তাকে কেন্দ্র করে সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতির আবর্তনের এক অসামান্য উপস্থাপন 'সকার ইন দ্যা সান এন্ড শ্যাডো' বইটি।
প্রকাশের তারিখ: ২৪-জুন-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
