ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যম (২)

প্রবীর পুরকায়স্থ
একটা নির্দিষ্ট মাধ্যমে যদি দর্শকদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ জারি রাখে কোনো বিজ্ঞাপনী সংস্থা - তাহলে কী ঘটে? ‌উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থাই দেশের সব সিনেমা হল ও টিভি চ্যানেলের মালিক হয়? তাহলে এক্ষেত্রে যারা পণ্যগুলি উৎপাদন করেছে তাদের কাছ থেকে উদ্বৃত্তের পুনর্বণ্টন চলে যাবে ওই একচেটিয়া বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে। কারণ বিজ্ঞাপনী সংস্থাটিকে বাদ দিয়ে উপভোক্তাদের কাছে সরাসরি পৌঁছতে পারবে না পণ্য উৎপাদকেরা। এবং যারা পণ্য উৎপাদক তাদের কাছ থেকে সেই একচেটিয়া বিজ্ঞাপনী সংস্থা বেশি দরও চাইতে পারে।

পর্ব ২

ইন্টারনেটের যুগে মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন

গত দশকে বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের বেশিরভাগটাই কব্জা করেছে একচেটিয়া ডিজিটাল কোম্পানিগুলো। বলা যায়, বিজ্ঞাপন থেকে আয় একচেটিয়া ডিজিটাল কোম্পানিগুলোর দিকে নির্ধারকভাবে সরে যাওয়াটাই একটা প্রবণতা হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে। সারণি ২-এ আমরা দেখতে পাই, ২০১৫ সালে বিজ্ঞাপন থেকে মোট যত আয় হয়েছিল তার প্রায় এক–চতুর্থাংশ পেয়েছিল প্রিন্ট এবং গোড়ার দিকে আয়ের অর্ধেক পেয়েছিল টিভি। ২০২২ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞাপন থেকে আসা মোট আয়ের এক-দশমাংশেরও কম পেয়েছে প্রিন্ট এবং প্রায় এক চতুর্থাংশ পেয়েছে টিভি। মাত্র সাত বছরে প্রিন্ট ও টিভির আয়ে একেবারে নাটকীয় পতন। এর বদলে বেশি বেশি করে লাভের মুখ দেখেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি, যেগুলির ভাগ্যে আগে জুটত বিজ্ঞাপন বাবদ আসা মোট আয়ের মাত্র এক চতুর্থাংশ। অথচ এখন গোটা বিশ্বে বিজ্ঞাপন বাবদ যত আয় হয় তার অর্ধেকের বেশি যায় ডিজিটাল মিডিয়াগুলির ভাণ্ডারে।


সারণি ২ঃ মিডিয়ার বিজ্ঞাপন থেকে আয় ২০১৫-২০২২ (বিলিয়ন ডলারে) 


বিজ্ঞাপন থেকে গুগল এবং ফেসবুক কত আয় করে? ২০২১ সালে গুগলের আয় ছিল ২৫,৮০০ কোটি ডলার। এর ৮১ শতাংশই এসেছিল বিজ্ঞাপন থেকে। মেটা, যার নাম আগে ছিল ফেসবুক, ২০২১ সালে তাদের মোট আয় ছিল ১১,৮০০ কোটি ডলার। এর ৯৭.৪ শতাংশই ছিল বিজ্ঞাপন থেকে আয়। সুতরাং, গুগল ও ফেসবুককে আমাদের মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন জগতের বৃহত্তর চালচিত্রে ফেলেই দেখতে হবে। 

এই নিবন্ধের পরবর্তী অংশে আমি আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব শুধুমাত্র ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির বিষয়ে, এবং দেখানোর চেষ্টা করব এখনকার ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি আগেকার মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির তুলনায় কোন্ কোন্ দিক থেকে একই রকমের এবং কোন্ কোন্ দিক থেকে একই রকমের নয় বা আলাদা। গুগল ও ফেসবুক—  এই দুই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিজনেস মডেল কীরকম, তা আগেই দেখানো হয়েছে। এই দুই সংস্থাই আসলে বিজ্ঞাপন থেকে আসা আয়ের ওপর নির্ভরশীল। মার্ক্সীয় পরিভাষার বিচারে, আমাদের একইসঙ্গে একথাও বুঝতে হবে যে, এই উদ্বৃত্ত কোথা থেকে আসছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের এই যুগে, যেসব কোম্পানি মিডিয়ায় তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, সেই বিজ্ঞাপনদাতাদের একটা মিডিয়া কোম্পানি ঠিক কী দিচ্ছে। একচেটিয়া পুঁজিবাদের অধীনে বিজ্ঞাপনের ভূমিকা বিষয়ের আলোচনাতেও আমি ঢুকব না কারণ এটা আরও বৃহত্তর একটা আলোচনার বিষয়। 

মিডিয়া ও একচেটিয়া বিষয়ে অন্য যেসব গবেষণা হয়েছে সেগুলি থেকে আমি মাত্র দুটি বিষয় স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়ে এগোব। একটা হল, বিভিন্ন কোম্পানিগুলির কাছে দামের প্রতিযোগিতার চেয়ে বিজ্ঞাপনী প্রতিযোগিতা বেশি কাম্য। কারণ বিজ্ঞাপনী প্রতিযোগিতায় বিক্রি থেকে আসা উদ্বৃত্তের মোট পরিমাণটা ধরে রাখা যায় (‌প্রতিযোগী পণ্যগুলির দাম একই থাকার কারণে- অনুবাদক)‌, এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকে শুধু উদ্বৃত্তের পুনর্বণ্টন ঘিরে। (‌অর্থাৎ বিজ্ঞাপনকে কাজে লাগিয়ে একই দামের পণ্যের বাজার কে কতটা দখল করতে পারে- অনুবাদক)‌। এই ধরনের বিখ্যাত প্রতিযোগিতা হল কোকা –কোলা ও পেপসির প্রতিযোগিতা। এই দুই সংস্থা দামের প্রতিযোগিতা এড়িয়ে গিয়ে বিজ্ঞাপনী প্রতিযোগিতাকেই বেছে নিয়েছিল। অন্য বিষয়টি হল, বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলির আয় বলতে যা বোঝায়, সেটা হল উৎপাদন থেকে আসা উদ্বৃত্তের পুনর্বণ্টন। বিজ্ঞাপনদাতারাও বিজ্ঞাপন, কমার্শিয়াল বা বিলবোর্ড ইত্যাদি উৎপাদন করে এবং তাদের নিজস্ব উৎপাদন চক্রও রয়েছে। এই উৎপাদন চক্রে অর্থের যোগানটা আসে অন্যান্য কোম্পানি/‌একচেটিয়াগুলির উদ্বৃত্ত থেকে। 

একটা নির্দিষ্ট মাধ্যমে যদি দর্শকদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ জারি রাখে কোনো বিজ্ঞাপনী সংস্থা - তাহলে কী ঘটে? ‌উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থাই দেশের সব সিনেমা হল ও টিভি চ্যানেলের মালিক হয়? তাহলে এক্ষেত্রে যারা পণ্যগুলি উৎপাদন করেছে তাদের কাছ থেকে উদ্বৃত্তের পুনর্বণ্টন চলে যাবে ওই একচেটিয়া বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে। কারণ বিজ্ঞাপনী সংস্থাটিকে বাদ দিয়ে উপভোক্তাদের কাছে সরাসরি পৌঁছতে পারবে না পণ্য উৎপাদকেরা। এবং যারা পণ্য উৎপাদক তাদের কাছ থেকে সেই একচেটিয়া বিজ্ঞাপনী সংস্থা বেশি দরও চাইতে পারে। 

টেলিভিশন দিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক। কারণ টেলিভিশনের আলোচনা থেকেই সহজে বোঝা যাবে টিভি চ্যানেলে যারা বিজ্ঞাপন দিতে চায় তাদের কাছে মিডিয়া কোম্পানিগুলি ঠিক কী বিক্রি করে। তাঁর দ্য অ্যাটেনশন মার্চেন্ট বইয়ে টিম উ–র যুক্তি দিয়েছেন, আমাদের সকলের কোনো কিছুতে মনোযোগ দেওয়ার একটা ক্ষমতা আছে যেটা আসলে সসীম (‌finite) ক্ষমতা। উ এর নাম দিয়েছেন অ্যাটেনশন ক্যাপিটা। মিডিয়া কোম্পানিগুলির কাজ হল যতটা সম্ভব আমাদের মনোযোগ একেবারে ছিনিয়ে নেওয়া এবং সেই মনোযোগ বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করা। লক্ষ্ করার মতো বিষয় হল, নিউ ইয়র্কের খবরের কাগজগুলোর কথা বলতে গিয়ে টিম উ পাঠককেও প্রডাক্ট বা পণ্য হিসাবে বিবেচনা করেছেন। তবে পাঠকদের তিনি যতটা না পণ্য হিসাবে বিবেচনা করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে পাঠকদের মনোযোগকে পণ্য হিসাবে বিবেচনা করার দিকে জোর দিয়েছেন। অ্যাটেনশন ক্যাপিটালের বিষয়টি টিম উ সূত্রায়িত করার অনেক আগেই সেই ১৯৭৭ সালে ডালাস স্মাইথ আরও যথার্থভাবে চিহ্নিত করেছিলেন যে, আমরা যারা মিডিয়ার উপভোক্তা মিডিয়া কোম্পানিগুলি সেই আমাদেরই বিক্রি করে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে। এই বিষয়টির তিনি নামকরণ করেছেন অডিয়েন্স কমোডিটি। (‌মানে এখানে টিভির দর্শক ও শ্রোতাদেরই পণ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে- অনুবাদক)। তিনি এটাও লিখেছিলেন যে, মিডিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি না বোঝার কারণে এবং মিডিয়া প্রচারের হাতিয়ার শুধুমাত্র এই বিষয়ে নজর দেওয়ার কারণে, কমিউনিকেশনস বা যোগাযোগ বিষয়টা ছিল পশ্চিমী মার্কসবাদের কাছে একটা অজানা এলাকা। মিডিয়ায় কোন্ কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু আনা হচ্ছে, কোন্ মতাদর্শ প্রচার করা হচ্ছে, কোন্ ধরনের আধিপত্যকামী ভূমিকা মিডিয়া পালন করছে — এগুলি বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি। তবে একই সঙ্গে অবশ্যই  মিডিয়ার অর্থনৈতিক ভূমিকারও বিশ্লেষণ করতে হবে। যদি দেখা যায়, বিশ্বায়িত পুঁজির অত্যন্ত সুপরিচিত ও প্রভাবশালী সংস্থাগুলির মধ্যে (‌big hitters) মিডিয়া কোম্পানিগুলিও রয়েছে, এবং তারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করছে, তাহলে সে‌ই দিকটিও আমাদের অবশ্যই বোঝার দরকার রয়েছে। 

মিডিয়া কোম্পানিগুলি বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে যা বিক্রি করে, তা হল, বিভিন্ন ধরনের অডিয়েন্সের এক একটা সেট বা পুঞ্জ। অডিয়েন্স এখানে দর্শক ও শ্রোতারা।  অডিয়েন্সের ক্র‌য়ক্ষমতা কেমন, কোন্ ভৌগোলিক এলাকায় তারা থাকেন, তাদের সম্ভাব্য চাহিদাগুলি কী কী, এছাড়া এধরনের আরো অনেক খুঁটিনাটি তথ্যের ভিত্তিতে অডিয়েন্সদের ছোট ছোট গোষ্ঠীর ছাঁচে ফেলা হয়। এভাবেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি আমাদের সম্পর্কে সংগ্রহ করা তথ্যসমূহ ব্যবহার করে। এই তথ্যগুলি নিজেরা পণ্য নয়। তবে এই সব তথ্য কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলি এমনভাবে আমাদের প্রোফাইল তৈরি করে যাতে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে আমাদের আরো ভাল করে বিক্রি করা যায়। এরপর নানা খোপে সাজানো তথ্যগুলি কোম্পানিগুলির নিজস্ব পণ্য বা পণ্যগুচ্ছের চাহিদা মেটানোর ক্ষমতার সঙ্গে খাপ খাচ্ছে কিনা তা মিলিয়ে দেখা হয়। এবং সেই অনুযায়ী বিজ্ঞাপন কোথায় কীভাবে দেওয়া হবে, তা ঠিক করা হয়। গুগল এবং ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে কীভাবে বিজ্ঞাপন গ্রহণ, ও বিক্রি করা হয় সেই জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা যাব না। তবে একথা ঠিক যে, সব মিডিয়া কোম্পানি মোটের ওপর দুটি কাজ করে থাকে: প্রথমত, কোনো কোম্পানির প্রডাক্টের সম্ভাব্য ক্রেতাদের চিহ্নিত করা, এবং দ্বিতীয়ত, এধরনের বিজ্ঞাপনের কেনাবেচার আসল প্রক্রিয়াটিকে পরিচালিত করা। 


তথ্যসূত্র:
২। হাউ ডাজ গুগল মেক মানি?  https://www.oberlo.in/statistics/how-does-google-make-money
৩। হানা হোল্লেম্যান, ইঙ্গার এল স্টোল, জন বেলামি ফস্টার অ্যান্ড রবার্ট ডব্লিউ ম্যাকচেসনি, দ্য সেলস এফোর্ট অ্যান্ড মোনোপলি ক্যাপিটাল, মান্থলি রিভিউ, এপ্রিল ২০০৯। https://monthlyreview.org/2009/04/01/the-sales-effort-and-monopolycapital/
৪। টিম উ, দ্য অ্যাটেনশন মার্চেন্টস: দ্য এপিক স্ক্র্যাম্বল টু গেট ইনসাইড আওয়ার হেডস, নফ (‌Knopf), ২০১৬।
৫। স্মাইথ ডালাস ডব্লিউ, ১৯৭৭। ‘‌কমিউনিকেশনস: ব্লাইন্ডস্পট অফ ওয়েস্টার্ন মার্ক্সিজম’‌, কানাডিয়ান জার্নাল অফ পলিটিক্যাল অ্যান্ড সোশাল থিয়োরি, ভল্যুম ১, নম্বর ৩। 
৬। লি ম্যাকগুইগান অ্যান্ড ভিনসেন্ট ম্যানজেরোল্লে, দ্য অডিয়েন্স কমোডিটি ইন এ ডিজিটাল এজ: রিভিজিটিং এ ক্রিটিক্যাল থিয়োরি অফ কমার্শিয়াল মিডিয়া, পিটার ল্যাঙ্গ ইনকর্পোরেশন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাডেমিক পাবলিশার্স, ২০১৩।
৭। সিজার বোলানো (‌জানেট ওয়াসকো অনূদিত)‌ দ্য কালচার ইনডাস্ট্রি, ইনফর্মেশেন অ্যান্ড ক্যাপিটালিজম, প্যালগ্রেভ ম্যাকমিলান, ২০১৫।
৮। ডেটা ব্রোকার বা তথ্য দালাল নামে একটা আলাদা শ্রেণি আছে যারা ভোটার তালিকা, ফোন নম্বর, সরকারি প্রকল্পের বেনিফিশিয়ারি তালিকা থেকে ডেটা বিক্রি করে। এরা আর্থিক বিষয় সংক্রান্ত তথ্যও (ফিনান্সিয়াল ডেটা)‌ বিক্রি করে। তবে ডেটা ব্রোকারদের সঙ্গে ডিজিটাল একচেটিয়া কোম্পানিগুলিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। কারণ ডিজিটাল একচেটিয়া কোম্পানিগুলি একেবারে অন্য ধরনের গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। 

সূত্র: মার্কসিস্ট, জুলাই-সেপ্টেম্বর,২০২২


ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
চলবে… চোখ রাখুন আগামী সোমবার

পড়ে দেখুন পর্ব ১


‌‌


প্রকাশের তারিখ: ১৯-জুন-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org