|
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব-১১)আর বি মোরে |
এই পরিবেশে থাকতে গিয়ে আমার যেন দমবন্ধ হয়ে আসত ক্রমে। তবে একটা ব্যাপার ছিল নিশ্চিত: আমি স্থির বুঝেছি যে আমি এক জঘন্য আবহে আছি। আমি সবসময় কীকরে এই অন্ধকার কাটিয়ে বেরিয়ে আসা যায় তার জন্যে ছটফট করতাম। কোনও মানুষ যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে জীবন কাটাচ্ছে এটা জেনে যে সে মহাপাপী, তখন সে-পাপের শাস্তি পেতে পেতে সে অনুতপ্ত হয় আর সেই পাপের জীবন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু সে যদি নিজের পাপ সম্পর্কে অবগতই না-থাকে, তখন পাপের শাস্তি পেলেও সে বুঝে উঠতে পারে না, সেই পাপজগত ছেড়ে বেরিয়ে আসতে কোনও চেষ্টাও করে না। আমি যখন দাপোড়ির অস্বাস্থ্যকর জীবন ত্যাগ করে খাড়কিতে আসি, তখন হলফ করে বুঝি যে আমি ঠিক রাস্তাতে আছি। |
[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ। প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের থেকে শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ] একদিন ক্যান্টিনে একজন তার এক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করায় যিনি খাড়কির অস্ত্রাগারে কর্মরত ছিলেন। উনি আমায় চেনালেন অস্ত্রাগারের মূল হর্তাকর্তা কে, এ-ও জানালেন কীভাবে তার সঙ্গে আলাপ করা সম্ভব। সেই মতন, আমি অস্ত্রাগারের গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকি যখন সাহেবের আসবার সময় ছিল। সাহেব কাছে এলে আমি বলি, ‘জনাব, আমি ইংরেজি জানি। আমি চাকরি করতে চাই’। উনি বললেন, ‘আয়’। আমি ওঁর পিছুপিছু এগোই। গেট দিয়ে ঢুকে এক সার্জেন্টের হাতে আমায় সঁপে দিয়ে উনি বেরিয়ে যান ওঁর কাজে। সার্জেন্ট আমায় দেখামাত্রই নিজের অসম্মতি প্রকাশ করতে লাগলেন ভ্রূ কুঁচকিয়ে। তারপর উনি কিছু বললেন। কিন্তু আমি আমার সীমিত ইংরেজি আর ওঁর কিম্ভূত উচ্চারণের দৌলতে যার বিন্দুবিসর্গ বুঝি না। উনি আমার নাম জানতে চান। ওটুকু ইংরেজি আমার জানা ছিল। আমি আমার নাম বললে উনি সেটা টুকে রাখেন। তারপর একখানা ডিপোতে আমায় নিয়ে যান। সেখানে একখানা জলে ডোবা জায়গায় রাশি রাশি কাঠের বাক্স ভর্তি কাঁচের জিনিসপত্র ছিল। ইয়েরাওয়াড়া জেলের প্রায় জনা কুড়ি বন্দি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। সার্জেন্ট আমায় বললেন যাতে আমি বন্দিদের বুঝিয়ে দিই যে কাঠের বাক্সগুলো বয়ে এনে শুকনো জায়গায় কিছু দূরে রেখে দিতে হবে পরপর। ওঁর অঙ্গভঙ্গি আর হাত চালানো দেখে আমি বুঝতে পারি যে উনি কী চাইছেন আর কারাপাল-কে বোঝাতে সক্ষম হই সেই কথাটাই বাজারি হিন্দিতে। বাক্সগুলো সরাবার কাজটা এভাবে শুরু করা গেল। সার্জেন্ট এ-জিনিস দেখে খুশি হলেন আর আমার প্রশংসা করলেন। উনি ছিলেন রসিক মানুষ। সবসময় আমায় কিছু-না-কিছু বলতেন মজাচ্ছলে। উনি ঠিক বুঝতে পারেন যে আমাকে ওঁর কথা যথেষ্ট কসরত করে বুঝতে হয়, তাই কোনও কথা উনি দু-তিন বার করে বলতেন হাত মুখ নাড়িয়ে যাতে আমি বুঝতে পারি। আমি ওঁকে স্যার বলে ডাকলে উনি আমায় ধমক দিতেন। উনি আমায় বলতেন, ‘আমি স্যার নই। স্যার ভালো নয়’। তিনটে নাগাদ কারাপাল বন্দিদের জেলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়ে অনুমতি চান। সার্জেন্ট রাজি হলে বন্দিরা বেরিয়ে যায়। সেদিনের মতন আমাদের কাজ মিটল এভাবেই। পরের দিন উনি আমায় কী করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যান। ওই ডিপোর অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে আমার সেদিন পরিচয় ঘটে। ওদের সঙ্গে মিশবার সুযোগ পাই আর বিরতির সময় গেটের সামনে আসি। গেটের পাহারাদার বাইরে বেরনো প্রতিজনের তল্লাশি করত, স্বভাবতই আমারও তল্লাশি হয়। আমি বাইরে বেরিয়ে শর্টকাটে অস্ত্রাগার থেকে চলে আসি সোজা খাড়কি বাজারে। অনেকখানি সময় সেখানে কাটিয়ে আমি দাপোড়িতে আমার ঘরে ফিরি। রাতে আমার ক্যান্টিনের সহকর্মীদের সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয়। আমি ওদের বলি কী ঝামেলা পুহিয়ে আমাকে একখানা কাজ জোগাড় করতে হল! ওরা তো আমার কথা শুনতে চমকে গেল। ওরা বলল, ‘ওদের নিজেদের নিয়োগের বাইরে কোনও বহিরাগত কখনও দু-পয়সা ঘুষ না-দিয়ে ওখানে আজ অবধি কাজ জোটাতে পারেনি। তুই তো তাক লাগিয়ে দিলি’। এই বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করার সময় থেকেই আমার মন্দিরে গিয়ে ভজন গাইবার সময় হয়ে উঠছিল না তেমন। অস্ত্রাগারের চাকরিতে লাগা ইস্তক মন্দির যাবার সময়টুকুও পাচ্ছিলাম না মোটে। মন্দির-জীবনের পাট চুকে গেল বলতে হয়। কয়েকমাস বাদে মন্দিরের কল্যাণে যে মাথার উপরের ছাদটুকু পেয়েছিলাম সেটাও হারাতে হল আমায়। তখন খাড়কি বাজারের কাছেই একটা চালায় থাকতে শুরু করি। কোঙ্কনের এক ভদ্রলোক ওঁর পুণের স্ত্রীয়ের সঙ্গে এক ঘরভাড়া করে থাকতেন। উনি সেনাবাহিনীর খেচর (খচ্চর) বিভাগ থেকে অবসর নেন। ওঁরা ছিলেন নিঃসন্তান। নিজেদের গাঁও মানে গ্রাম সম্পর্কেও ওঁরা ছিলেন নাদান। আমি ওঁদের সঙ্গে মিশি। ওঁদের সম্বন্ধে সবটুকু জানবার চেষ্টা করি। মোদি খানা ছাড়বার পর থেকে একটা ব্যাপারে আমি অত্যন্ত যত্নবান ছিলাম: সকলের হাঁড়ির খবর সম্বন্ধেও আমি ওয়াকিবহাল থাকতাম, কিন্তু নিজের ব্যাপারে খাঁটি সত্যটুকু প্রকাশ করতাম না। এই দম্পতির সঙ্গেও আমি একই রকমভাবে মিশি। ওঁরা দেখলেন আমি শিক্ষিত, চাকরি করি, থাকার জায়গা নেই কোথাও, তখন সকরুণ মনে ওঁদের সঙ্গে থাকবার জন্যে আমায় বলেন। সেই থেকে আমি ওই চালায় থাকতে শুরু করি। অস্ত্রাগারের এই কাজখানা জোটাবার পর থেকে আমি একরকম থিতু হতে পারলাম। বোম্বে ছাড়বার পর থেকে, বিশেষ করে আবিতকারের ঘর ছাড়বার পর থেকে আমি বোকা বাচ্চাদের মতন আন্তাবড়ি কত কী বলতাম! অস্ত্রাগারে কাজ শুরু করবার পরও এমন আবোল-তাবোল বকতাম মাঝেমধ্যেই। দেড়-দুই মাস যাবৎ আমি অস্ত্রাগারে প্রথম দিনকার কাজের মতো একই ধরনের কাজকম্মোই করতাম। মাঝেমধ্যে আলাদা সার্জেন্ট আসত। আলাদা আলাদা কুলিরা ভারবহনের কাজ করত। কখনও নানা ওয়ার্ডের বন্দিরা, কখনও মিলিটারিতে চাকরিরত কুলিরা। আমার কাজ ছিল সার্জেন্টের নির্দেশ মোতাবেক ওদের দিয়ে কাজটা করিয়ে নেওয়া। আমি কুলিদের সুপারভাইজারের পদে বহাল হয়েছিলাম, আমার স্বল্প ইংরেজি জ্ঞানের দৌলতে। যদিও আমি কুলিদের সমান মাইনে পেতাম। এই চাকরির সুবাদে কিছু সেনা জওয়ান আমার কাছের হয়ে ওঠে। আমি কাজ মিটিয়ে ওদের ক্যাম্পে যেতাম দেখা করতে যদি ওরা আসতে বলত। ওদের ক্যাম্পে গেলে আমি নানা কিসিমের খানাপিনা, সিগ্রেট আর এটা-সেটা পেতে পারতাম। পরে আমি বলব কীভাবে সেনা জওয়ানদের সঙ্গে আমার এই বন্ধুত্ব আমার কাজে লেগেছিল। আমি এখন বলতে চাইছি অস্ত্রাগারে আর কোন কোন কাজ আমায় করতে হত। মুকাদাম হিসাবে আমার কাজ ফুরিয়ে গেলে আমাকে মার্কামারার কাজে নিযুক্ত করা হল। বস্তা বন্দি বাক্সের উপরে ব্রাশ বুলিয়ে আমায় লিখতে হত। দিনদুয়েকের মধ্যে আমি এই কাজ ভালো মতো শিখে গেলাম। বাকি মার্কামারার লোকেদের সঙ্গে তারপরে আমিও একযোগে কাজে লেগে গেলাম। পরে পদোন্নতি হয়ে প্যাকিং বিভাগে বাক্সবন্দি করবার কাজে নিযুক্ত হলাম। প্যাকারের কাজ অনেকটাই কেরানিবৃত্তি। তাছাড়া গুদামের মালপত্তর ছিল প্যাকারের অধীনে। অস্ত্রাগারের এই গুদামে মিলিটারির উপযুক্ত মালপত্র রাখা থাকত। গেটে ভালোমতন তালা দেওয়া থাকলেও, কড়া পাহারা থাকলেও জিনিসপত্র হামেশাই গুদামঘর থেকে খোয়া যেত, চুরি হত। প্যাকার হিসাবে কাজ শুরু করবার কিছু সময় পরে আমাকে রশিদ বানানোর কেরানি করা হল আর তার কয়েকমাসের মধ্যে আমি হিসাবের খাতা দেখতে শুরু করলাম। এই সমস্ত কাজই গোরা অফিসারদের তত্ত্বাবধানে হত। যে-কেরানি হিসাবের খাতা সামলাচ্ছে, যে-রশিদ বানাচ্ছে আর যে-চালান কাটছে সবার মাইনে ছিল সমান। বুরুশের এক টানেই সবাইকে আঁকা হচ্ছে! একজন কুলি আর একজন কেরানির কাজের তফাৎ শুধুমাত্র কায়িক শ্রমের হেরফের মাত্র। কেরানিকে কুলিদের মতো ঘাম ঝরাতে হত না ঠিকই। বাস্তবে এই দুই কাজেই মাথা খাটাতে হত না বিশেষ! তাই আমার কাজের ধরন পালটে গেলেও, আমার জীবনে তা খুব একটা অদলবদল আনলো না। মোদি খানায় কালিবাইয়ের বাড়ি ছেড়ে আসবার পর থেকে আমি যে ধরনের পরিবেশে বাস করছিলাম তা খানিক ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত যোগতিন আর মুরালির মতো। একদিকে গোরা সৈন্য আর ওদের বন্ধুদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন আর অন্যদিকে আর্মিতে কর্মরত গরিব মজদুরদের দুর্দশা-ভোগান্তির জীবন। এই পরিবেশে থাকতে গিয়ে আমার যেন দমবন্ধ হয়ে আসত ক্রমে। তবে একটা ব্যাপার ছিল নিশ্চিত: আমি স্থির বুঝেছি যে আমি এক জঘন্য আবহে আছি। আমি সবসময় কীকরে এই অন্ধকার কাটিয়ে বেরিয়ে আসা যায় তার জন্যে ছটফট করতাম। কোনও মানুষ যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে জীবন কাটাচ্ছে এটা জেনে যে সে মহাপাপী, তখন সে-পাপের শাস্তি পেতে পেতে সে অনুতপ্ত হয় আর সেই পাপের জীবন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু সে যদি নিজের পাপ সম্পর্কে অবগতই না-থাকে, তখন পাপের শাস্তি পেলেও সে বুঝে উঠতে পারে না, সেই পাপজগত ছেড়ে বেরিয়ে আসতে কোনও চেষ্টাও করে না। আমি যখন দাপোড়ির অস্বাস্থ্যকর জীবন ত্যাগ করে খাড়কিতে আসি, তখন হলফ করে বুঝি যে আমি ঠিক রাস্তাতে আছি। খাড়কি আসবার কিছুদিনের মধ্যেই আমার ডান পায়ে একটা ছোট্ট সার্জারি করতে হল। আমার ভারতীয় সেনাবন্ধুদের বদান্যতায় আমি অস্ত্রোপচার করাতে খাড়কি সেনা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারলাম। ওই হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপচার হল আর আমার ডান-পা সেরে উঠল। অস্ত্রোপচারের পরে আমি আরও দুই মাস টানা কাজ করি। তারপর জানতে পারি সদ্য চালু হওয়া এক নৈশ স্কুলের ব্যাপারে। এই নৈশ স্কুল চালু করে লোকমান্য তিলকের অনুগামী আলেগাঁওকার ভাইয়েরা১১। স্কুলের নাম ছিল ‘আলেগাঁওকার নৈশ স্কুল’। আমি স্কুলের ব্যাপারে জানামাত্র সেইখানে গিয়ে নিজের নাম নথিভুক্ত করি। যেহেতু আমি একখানা চাকরি করছিলাম তাই স্কুলের ফিজ মেটাতে আর বই কিনতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। নৈশ স্কুলে ভর্তি হতে পেরে আমি অনুভব করি যেন নতুন জীবন পেলাম। আবারও পড়াশোনায় যুক্ত হতে পেরে আমার খুশির সীমা ছিল না। নতুন রুটিনে জীবন কাটাতে লাগি এখন। দিনের বেলায় চাকরি আর রাত্তিরে জ্ঞানার্জনের জন্যে স্কুল। অস্ত্রাগারে আমার কিছু সহকর্মী আমার বন্ধুও হয়ে ওঠে। এখন বন্ধুদের তালিকায় আলেগাঁওকার স্কুলের ছাত্ররাও যুক্ত হল। এখানকার কিছু বন্ধুরা তামাশা-নাটক দেখতে ভালবাসত। কেউ ভজন গাইতে ভালবাসত, কেউ তাস-জুয়া পছন্দ করত, কেউ আবার শারীরিক কসরত, দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা পছন্দ করত। আমি সকলের সঙ্গেই কিছু-না-কিছু সময় কাটাতাম। সবাই আমার কাছের হয়ে উঠেছিল। এই সঙ্গদোষে আমিও কিছু বদভ্যাসের অধিকারী হই। তবে আমার কোনও নেশা হয়নি। আমার জীবনভর পড়াশোনার চর্চা, সন্তমানুষদের সংসর্গ আমায় খানিক স্থিতধী হতে শিখিয়েছে। যৌবনের উদ্দামতায় কখনও ভুল লাইনে পা বাড়িয়ে ফেললেও, আমার নিজের কৃতকর্ম নিয়ে অনুশোচনা হলে আমি ফের সঠিক লাইনে চলে আসতাম। আমি নৈশ স্কুলে যাওয়া শুরু করার পর থেকে, আমি এমন বন্ধুদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কাটাতাম না যারা তামাশা, নাটক, তাস-জুয়া নিয়েই দিন কাবার করত। আমি এই সব কিছু থেকেই নিজেকে দূরে সরিয়ে ফেলি। কিন্তু বন্ধুরা তা নিয়ে আমার সঙ্গে রাগারাগি করেনি কখনও। আমি চেনাজানা লোকেদের দূরে ঠেলে দিতাম না। একবার বন্ধু বানিয়ে ফেললে তাদের ছেড়ে চলে যেতাম না। সারাজীবনেও কারও সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ঝুটঝামেলা হয়নি কখনও। দড়াবাজিকরদের মতো ডিগবাজি খেতে বা বহুরূপীর মতো দৌড় লাগাতে, মোদ্দায় খেলাধুলোয় আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল ছোটো থেকে। এর পরের গল্পতে বোঝা যাবে আমার এই আগ্রহ কীভাবে আমার উপকারে আসে। একবার স্কুলে রটে গেল যে ২৭ মাইল লম্বা রেস হতে চলেছে। যারাই এতে অংশ নেবে, সাফল্য পাবে, খ্যাতিযশ, পুরস্কার তাদের বাঁধা। আমরা কিছু বন্ধুরা মিলে ঠিক করি যে আমরা এতে অংশ নেব। আমরা খোলা মাঠে বাভালি ঝোপ দিয়ে চুন মাখিয়ে গোল দাগ টেনে দৌড়ানোর অনুশীলন শুরু করি রীতিমতো। আমরা জেনে নিয়েছিলাম দৌড়ানোর সময় কী পোশাক পরতে হবে, কীভাবে দৌড়াতে হবে, কীভাবে শ্বাস নিতে হবে, তারপর ভোর চারটেয় উঠে মাঠে গিয়ে অনুশীলনে লেগে পড়তাম। এমনিতে এক মাইল দৌড়াতে প্রায় ছ-মিনিট লাগত। প্রথম দিন আমরা দশ মিনিট দৌড়াই, তার পরের দিন বারো মিনিট, তারপর পনেরো, তারপর কুড়ি। এইভাবে আমরা আগের দিনের থেকে বেশি সময় জুড়ে দৌড়াতে থাকি রোজ। এইভাবে আমরা একদিনে আড়াই ঘণ্টা টানা দৌড়াতে শিখে গেলাম। অন্যভাবে বললে, আমরা রোজ পঁচিশ মাইল দৌড়াতে পারতাম। আড়াই ঘণ্টা ধরে খাড়কি থেকে দৌড়িয়ে চিচঁওয়াড়ে পৌঁছে যেতাম আর আবার সেইখান থেকে ফিরে আসতাম দৌড়ে খাড়কির মাঠে। আমরা সাতাশ মাইলের দৌড়ে অংশ নেব ভেবে অনুশীলন শুরু করেছিলাম। সেইজন্যে আমাদের ত্রিশ মাইল দৌড়ানোর অভ্যেস করতে হত। কিন্তু আমরা পঁচিশ মাইলের কাঁটা পেরতে পারছিলাম না। তাছাড়াও, প্রতিযোগিতায় নাম নথিভুক্ত করার সময়ও তদ্দিনে পেরিয়ে গেছিল। ফলে আমরা হাল ছেড়ে দিই বিফল মনোরথে। এই কথা স্বীকার করতেই হবে যে আড়াই ঘণ্টায় পঁচিশ মাইল অনায়াসে পেরতে শেখাটা ছিল আমাদের কাছে পরম তৃপ্তিকর। আজকাল দেখি, গাঁয়ের লোক হোক বা শহরের, পায়ে হেঁটে কেউ বেশি দূর যাতায়াত করে না। তাই এইটা তাদের কাছে অত আশ্চর্য ঠেকবে না। তবে ব্যাপারটা এভাবে বললে খানিক বিস্ময় জাগতে পারে তাদের: এক সুস্থ সবল মানুষ দিনভর পায়ে হেঁটে পঁচিশ মাইলের বেশি পথ পেরতে পারত না। সেখানে আমি হামেশায় সেই পথ আড়াই ঘণ্টা দৌড়িয় পেরিয়ে যেতে পারতাম। আমি যখন পরে খাড়কি থেকে দাশগাঁও ফিরি, আমি মাহাদের স্কুলে আবার ছাত্র হিসাবে ভর্তি হই। আমি দাশগাঁও থেকে মাহাদ বা ফিরতি পথ পায়ে হেঁটে মাত্র আধা ঘণ্টায় পেরিয়ে যেতে পারতাম। পরে, কোঙ্কনের খোতি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় বা বোম্বেতে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির সংঘর্ষের সময়ে আমি রোজ যত ইচ্ছে মাইল পথ পেরতে পারতাম নির্দ্বিধায়।১২ আমার দৌড়ানোর অভ্যেস থাকায়, আমার লম্বা পথ হেঁটে পেরতেও সমস্যা হত না। যতই হাঁটি না-কেন, আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম না। দৌড়ানো আর হাঁটবার এই অভ্যেস আমাকে সুস্থ-সবল রাখতে সাহায্য করেছে।
টীকা ১১ আলেগাঁওকার ভাইয়েরা পুণের খাড়কিতে অস্ত্র কারখানায় কাজ করতেন। পান্ধারিনাথ আলেগাঁওকার (কোষাধ্যক্ষ), ভিষ্ণুপন্ত আলেগাঁওকার (প্রধান শিক্ষক), একনাথ আলেগাঁওকার (ম্যানেজার) আর মহাদেও আলেগাঁওকার (সুপারিন্টিন্ডেন্ট) খাড়কি এডুকেশন সোসাইটি তৈরি করেন ১৯১৩ সালে পুণেতে। ওঁরা প্রত্যক্ষ করেন মজুরদের অজ্ঞানতাই ওদের শোষণের বড়ো কারণ। এই সোসাইটির তৈরি করা প্রথম স্কুল ছিল এইখানে আলোচ্য আলেগাঁওকার স্কুল। ১২ খোতি ব্যবস্থা হল একধরনের জমিদারি ব্যবস্থা যা ব্রিটিশরা চালু করে কোঙ্কনে। বংশপরম্পরায় যারা জমিদার বা খোত ছিল, তাদেরকেই চাষিদের থেকে খাজনা আদায়ের ভার দেওয়া হত। এরা ছিল হয় ব্রাহ্মণ বা মুসলমান। কোঙ্কনের কৃষকদের উপর প্রবল শোষণ চলত এই ব্যবস্থায়। ১৯৩৭ সালে আম্বেদকর খোতি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের ডাক দেন। বিধানসভায় বিল পেশ করেন। পরে বোম্বে কাউন্সিল হল অবধি প্রতিবাদী মিছিল করেন। এর আগেও, এস.কে. বোলে ১৯২২ সালে বোম্বে বিধানসভায় খোতি প্রথ রদ করতে চেয়ে প্রস্তাব আনেন। সীতারাম কেশব বোলে (১৮৬৯-১৯৬১) ছিলেন বোম্বের এক সচ্ছল ভাণ্ডারী (তাড়ি প্রস্তুতকারী) জাতের পরিবারের সন্তান। পরে উনি সত্যশোধক আদর্শের অনুগামী হয়ে পড়েন। বোলে বি.আর. আম্বেদকরের সঙ্গে দেখা করেন ১৯০৭ সালে প্রথম বারের জন্যে। সেই সময় প্রথম মাহার হিসাবে ম্যাট্রিক পাস করবার জন্যে আম্বেদকর পুরস্কৃত হচ্ছিলেন। বোম্বে বিধানসভায় ১৯২০ সালে অব্রাহ্মণ পার্টির হয়ে নির্বাচিত হন বোলে। ১৯২৩ সালে এস.কে. বোলে একখানা বিল পেশ করেন যাতে তিনি সরকারি খরচে তৈরি সমস্ত জলসত্র, কুয়ো আর ধর্মশালা যাতে অচ্ছুৎ জাতিরাও ব্যবহার করতে পারে তার হয়ে সওয়াল করেন।
অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ
প্রকাশের তারিখ: ২৫-মে-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |