Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব-১০)

আর বি মোরে
আমি যখন সেই সমুদ্রনাবিকের ঘরে কাজ করতাম তখন বাড়িতে যে পয়সা পাঠাতাম তা মায়ের হাতে কখনও পৌঁছাত না। হাজি বন্দরে যখন কাজ করি তখনও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। আমার সবসময় মনে হত বোম্বের পরিবেশ পড়াশোনার জন্যে ঠিক উপযুক্ত না, পুণে না-গেলে আমার পড়াশোনাটা এগোবে না। আমার মায়ের আত্মীয়রা অবাক হয়ে যেত এটা দেখে যে আমার উপার্জন করে পাঠানো টাকা বড়োবাড়ির লোকেরা মাকে বঞ্চিত করে নিজেদের পকেটস্থ করছে। কিন্তু অন্য অনেকে বলত, বড়োবাড়ির লোকেরাই তো ছেলেটাকে লিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছে, তাহলে এখানে অন্যায়টা কী আছে? আদতে আমার পড়াশোনার জন্যে বড়োবাড়ির লোকেদের কানাকড়িও খরচা করতে হয়নি। 
Memoir of a Dalit communist part x

কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট  (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ। 

প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। 

কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের থেকে শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ]

নবম পর্বের পর...

আগেই বলেছি, আমার বন্ধুরা দুষ্কর্ম থেকেই দূরত্ব বজায় রাখত। কারণ ওরা শিক্ষিত ও রুচিবোধসম্পন্ন ছিল। থিয়েটার শিল্পের প্রতি ওদের টান সংস্কৃতিমনস্কতারই লক্ষণ। এর মধ্য দিয়ে ওরা নিচু থেকে উঁচু স্তরে উন্নীত হতে চাইছিল। মনোবিজয় পালা অসংখ্য মহড়ার পরে প্রথম বোম্বে থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়। এত অল্প বয়সে বোম্বের এমন প্রথিতযশা থিয়েটারে অভিনয় করতে পেরে আমার খুশির সীমা ছিল না।

আমি যখন সেই সমুদ্রনাবিকের ঘরে কাজ করতাম তখন বাড়িতে যে পয়সা পাঠাতাম তা মায়ের হাতে কখনও পৌঁছাত না। হাজি বন্দরে যখন কাজ করি তখনও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। আমার সবসময় মনে হত বোম্বের পরিবেশ পড়াশোনার জন্যে ঠিক উপযুক্ত না, পুণে না-গেলে আমার পড়াশোনাটা এগোবে না। আমার মায়ের আত্মীয়রা অবাক হয়ে যেত এটা দেখে যে আমার উপার্জন করে পাঠানো টাকা বড়োবাড়ির লোকেরা মাকে বঞ্চিত করে নিজেদের পকেটস্থ করছে। কিন্তু অন্য অনেকে বলত, বড়োবাড়ির লোকেরাই তো ছেলেটাকে লিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছে, তাহলে এখানে অন্যায়টা কী আছে? আদতে আমার পড়াশোনার জন্যে বড়োবাড়ির লোকেদের কানাকড়িও খরচা করতে হয়নি। আমার প্রাথমিক শিক্ষা মারাঠি স্কুল থেকে সম্পন্ন হয়, তখনও আমার বাবা বেঁচে। আর ইংরেজি স্কুলে আমার পড়াশোনা নিজের স্কলারশিপের টাকার জোরে আর মামাবাড়িতে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত হবার দরুণ সম্ভব হয়েছিল। তবে সে-যুগে যে সামান্য ইংরেজি শিক্ষা আমি পেয়েছিলাম সেটুকুই অনেক বলে মনে করা হত— ‘ইংরেজি শিক্ষা হল বাঘের দুধ’— আর এই কারণে বড়োবাড়ির স্কুলশিক্ষকদের পরিবার অন্যায়ভাবে এই কৃতিত্ব কেড়ে নেয়। ‘ওর স্কুলশিক্ষক আত্মীয়েরাই ওর বিয়ে দিয়েছে। তাইলে ওর মাকে না-দিয়ে নিজেরা ওর টাকা নিলে অসুবিধে কোথায়?’ যারা এইসব যুক্তি পাড়ে, তাদের মুখ বন্ধ কে করবে? আমার অবস্থা ছিল এমন একজনের মতো যার গলা টিপে মুখে ঘুষি মারা হচ্ছে। 

পালাটি মঞ্চস্থ হবার পরে আমি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিই যে পুণে যেতেই হবে। আমি আমার মাইনের অপেক্ষা করছিলাম। আমি আমার বহু বন্ধুকেই কথায় কথায় জানিয়েছি যে আমি এখানে আর কাজ করতে চাই না, বাইরে কোথাও গিয়ে আরও অনেকদূর পড়াশোনা করতে চাই। কিন্তু কখন যাব আর কোথায় যাব তা নিয়ে নির্দিষ্টভাবে কাউকেই বলিনি। আমার আগেকার মাইনে থেকে পাঁচ টাকা রাখতাম দুধওয়ালা আর মিঠাইওয়ালাকে দেবার জন্য, বাকি টাকাটা আক্কার হাতে দিতাম। আমি ঠিক করি এ-মাসের মাইনে থেকে আক্কাকে কিছু দেব না, নিজের কাছেই রাখব। মাইনে পাবার এক দিন আগে আমি আক্কাকে একটা চিঠি লিখে নিজের পকেটে রাখি। আমি লিখি: আমি অনেক দূরে যাচ্ছি, আমার জন্যে দুশ্চিন্তা কোরো না, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার মাইনে পাবার দিনে আমি মিথ্যে বলি যে তার পরদিন আমার মাইনে হবে। তারপর, যখন আশেপাশে কেউ ছিল না, আমি চিঠিটার সঙ্গে পাঁচটা টাকা চালের ডালার উপর রেখে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। আমার পকেটে প্রায় কুড়ি টাকা ছিল। তখন প্রায় মাঝরাত। আমি বোরি বন্দর স্টেশন থেকে পুণে যাবার ট্রেনে চাপি কোনও টিকিট না-কেটেই, ভোর হবার আগেই পুণেতে নেমে যাই। স্টেশনের বাইরে গিয়ে আমি তৃতীয় শ্রেণির যাত্রীদের জন্যে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ বাগানে বসি। ওখানে বোম্বে যাবার জন্যে অপেক্ষারত বহু গ্রাম্য মানুষ ছিল, নারী-পুরুষ। আমি অনেকটা সময় ধরে ওদের চালচলন, কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা লক্ষ করলাম। তারপর এক রেস্তোরাঁয় কিছু খেতে গেলাম। মোদি খানা যাবার রাস্তাটা ধরে। দাশগাঁওয়ের এক মহিলাকে আমি চিনতাম যে এই মোদি খানায় ছিল। আবিতকার নামে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা জওয়ানকে উনি বিয়ে করেছিলেন। মোদি খানা যেহেতু অবসরপ্রাপ্ত সেনাদেরই এক কলোনি আর আবিতকারের নামটাও বহুল পরিচিত তাই ওঁর ঘর খুঁজে পেতে আমার কোনও সমস্যা হল না। মেয়েটার নাম ছিল কালি।১০ উনি ছিলেন ফর্সা, সরল, হাসিখুশি। কিন্তু ওঁর নাম যেহেতু ছিল কালি, আমরা ওঁকে ডাকতাম কালিবাই বলে। কালিবাই আমাকে দেখে খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল। রীতিমতন, দু-হাতের চার আঙুল ভেঙে কপালে ঠেকিয়ে, আদর করে, আমার চারিদিকে লবণ ছড়িয়ে ফের তা উনুনে ছুঁড়ে দেয় যাতে অমঙ্গল ধাওয়া না-করে আমার পিছু। তারপর সকলকে আমার বাবার ব্যাপারে বলে বাড়ির লোকের সামনে নিজের ছেলে হিসাবে পরিচয় দেয়। ওরা জানত না যে আমি বোম্বে থেকে এসেছি, সেখানে থেকেছি এতদিন; ওরা ভেবেছিল আমি দাশগাঁও থেকেই এসেছি সরাসরি। অবশ্য ওরা জানত দাশগাঁও থেকে পুণে আসতে গেলে কাউকে বোম্বে পেরিয়েই আসতে হবে।

কাউকে যদি দাশগাঁও থেকে পুণে যেতে হত তবে আরও একটা রাস্তা ছিল। রায়গড়ের কাছে মধ্যা পাহাড় পেরিয়ে। অতীতে রায়গড় উপত্যকার মানুষজন কাঠের হামনদিস্তা, নোড়া, কাঠাভাড়িস বা ময়দা মাখবার কাঠের বারকোশ মাথায় বয়ে পায়ে হেঁটে পুণে যেত বিক্রি করতে। এখন যেহেতু মোটরবোট, ট্রেন চালু হয়েছে, এই রাস্তায় খুব একটা লোক চলাচল ছিল না আর। সেকালে সরকারি বা নিজস্ব মালিকানায় কোনও মোটরগাড়ি ছিল না। তখনকার সাধারণ গ্রামের মানুষ পঞ্চক্রোশী— মানে গাঁয়ের পাঁচ মাইলের বাইরের জগৎ সম্পর্কে ছিল একেবারে অজ্ঞ। বড়োজোর যদ্দূর আওয়াজ শোনা যেত তদ্দূর অবধি ছিল তাদের দুনিয়া। কিছু মানুষ নিজের গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামেও যেত না কখনও। এমনকি যারা গ্রাম থেকে বোম্বে বা পুণেতে কাজ করতে আসত তারাও নিজের গ্রাম আর বোম্বে-পুণেতে তাদের কাজের জায়গা, থাকার জায়গার বাইরে কী আছে তা জানত না। তাই আমার দাশগাঁও থেকে পুণেতে আসা ছিল তাদের কাছে বিলাত থেকে ভারতে ফেরার সামিল। ওরা যখন আমায় জিগ্যেস করে, ‘তুই অ্যাদ্দূর এলি কীভাবে রে?’ আমি উত্তর দিই, ‘আমি পুণে এসেছি তাবুত দেখতে’। তাবুত ছিল মহরমের সময় মুসলিমদের কর্তৃক পালিত এক বিরাট জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা। ওরা আমার কথা আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বাসও করে নিল। কারণ মহরমের তাবুত যাত্রার আর মাত্র কয়েকদিনই বাকি ছিল। সেই যুগে, বোম্বের দেওয়ালি, পুণের তাবুত আর বরোদার দশেরা ছিল নামকরা। বহু দূর থেকে মানুষ আসত এই আশ্চর্য চমকগুলি দেখতে।

আবিতকার পরিবার আমায় যত্নেই রেখেছিল। নিজের ছেলের মতো করে কালিবাই আমার খেয়াল রাখত। আমার ভয় ছিল যদি আমি ওঁদের জানাই যে আমি পুণেতে এসেছি পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যেতে ওঁরা দাশগাঁওতে খবর দেবেন আর আমার স্কুলশিক্ষক আত্মীয়েরা আমায় এসে ঘাড় ধরে বোম্বে ফেরত নিয়ে যাবে। তাই আমি ব্যাপারটা লুকিয়ে গেলাম। আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম যে কিছুদিন ওদের বাড়িতে অতিথি হিসাবে থাকব, তারপর লুকিয়ে-চুরিয়ে বেড়িয়ে পড়ব। যতদিন আমি ওদের সঙ্গে ছিলাম, ততদিন আমি পুণে সম্বন্ধে আরও জানবার চেষ্টা করলাম। ওঁদের সেনা-সম্বন্ধীয় জায়গার বাইরে আর কোনও জ্ঞান ছিল না, পুণের ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলের বাইরের খবর ওঁরা রাখত না। ওঁরা আমায় পেশোয়ারাজ সম্বন্ধে কিছু শোনা গল্প বলত। ওঁরা বলত, ‘পুণে শহর নিয়ে আমাদের কিচ্ছু আসে যায় না। আমরা কালেভদ্রে ওখানে যাই’। মোদি খানা অঞ্চলের বাচ্চারাও শহরের বাচ্চাদের সঙ্গে একসাথে স্কুলে যেত না। নিজেদের অঞ্চলেই বাচ্চাদের জন্যে আলাদা স্কুল ছিল ওদের। বোম্বেতে ফ্যামিলি লাইন্সে সেনার লোকেদের সঙ্গে আমার থাকবার যা অভিজ্ঞতা, মোদি খানার সেনার মানুষদের সঙ্গে থেকেও আমার একই অভিজ্ঞতা। গ্রামে আমাদের জাতির জন্যে আলাদা জায়গা থাকত। আমি অনুভব করলাম বোম্বে-পুণের মতন শহরেও আমাদের জন্যে আলাদা কলোনি করা হয়েছে, তখনও বুঝিনি এই ভাগাভাগির কাজটা ঠিক কারা করেছে।

মহরমের তাবুত দেখতে দেখতে চলে গেল। আমি ঠিক করলাম যে এইবারে চলে যাব। দাশগাঁওতে ফেরত নিয়ে যাবার জন্যে কালিবাই কিছু পোঁটলা বাঁধতেই যাচ্ছিল। আমি ওকে মানা করে বললাম যে আমি বোম্বে যাচ্ছি কাজ করতে, দাশগাঁও ফিরব না। ওঁর এক ভাইপো আমাকে স্টেশনে ছাড়তে এল। আমার নিষেধ সত্ত্বেও আমার টিকিট কেটে ট্রেনে বসিয়ে দিল আমায়। আমি উপায় খুঁজছিলাম কী করে ওকে ফাঁকি দিয়ে ট্রেন থেকে নামব, কিন্তু ট্রেন চালু হওয়া অবধি ও ঠায় আমার সঙ্গে রয়ে গেল। ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেল আর খাড়কি স্টেশনে কিছুক্ষণ হল্ট করল। এই সুযোগে আমি জলদি প্লাটফর্মে নেমে এলাম আর বাকি লোকেদের দেখাদেখি স্টেশনের বাইরেও চলে এলাম হাঁটতে হাঁটতে। আমার পকেটে মাত্র কয়েক টাকা পড়ে আছে তখন, ভেবে কূল পাচ্ছি না কোথায় যাব, কী করব।

খাড়কি স্টেহন থেকে বেরলাম যখন দিকবিদিকশূন্য হয়ে একখানা কাঁটাওয়ালা বাভালি ঝোপের নিচে বসলাম। বুঝলাম ছেলেবেলা ফুরিয়ে গেছে। এখন আমি এক মদ্দা যুবক। সতেরো-আঠারো বছর বয়স হয়েছে তদ্দিনে। এতদিন অবধি সরাসরি বা ঘুরিয়ে কারও-না-কারও অভিভাবকত্বে দিন কাটিয়েছি। আমি তাদের মধ্যেই দিন কাটিয়েছি যারা ভালো কাজের প্রশংসা করত, দুষ্কর্ম দেখলে গালমন্দ করত, শুধরে দিত। দাশগাঁও আর লাড়াওয়ালিতে আমার বাবা আর মা ছিল। তাছাড়াও ছিল মামা আর মামাতো ভাইয়েদের মতন আপনজন। বোম্বেতে ছিল আক্কা আর পরিজনেরা। পুণেতে চার-পাঁচ দিনের জন্যে হলেও কালিবাই আর ওঁর পরিবারের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু এই কাঁটাময় বাভালি ঝোপের নিচে বসে আমি একজন পৃথক ব্যক্তিমানুষ, যে কারও নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, সম্পূর্ণ আজাদ। বাবা মারা যাবার পর থেকে আমার গোটা জীবনখানা চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমি ভাবছিলাম বোম্বে যে লক্ষ্য নিয়ে ছাড়লাম তা পূরণ করব কী করে, তখনি অন্য এক ভাবনা মাথায় এল। আমি স্থির করি আমার প্রথমে দেহু আর আলান্দি যাওয়া উচিৎ সন্ত তুকারাম আর সন্ত জ্ঞানেশ্বরের সমাধি দর্শন করতে। তারপর একমাত্র আমি আমার করণীয় কোনও কাজ করে উঠতে পারব।

ভাবনাটা মাথায় আসা মাত্র আমি বাভালি ঝোপ থেকে উঠে সোজা স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করি। স্টেশনের বাইরে বসে থাকা লোকেদের থেকে জিগ্যেস করি দেহু আর আলান্দি কোন পথে যাওয়া যাবে। ওখানে এক সমঝদার লোক বসে ছিল যে আমায় নানাবিধ প্রশ্ন জিগ্যেস করে, আমি কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি ইত্যাদি। আমি বলি যে আমি আদমাভলা থেকে এসেছি। বাবা মারা গিয়েছে। দেহু আর আলান্দি ঘুরে আমি সেনাতে যোগ দিতে চাই। আমি স্কুলের বইতে পড়েছিলাম যে খাড়কিতে সেনাবাহিনীর বড়ো শিবির আছে। সেই জানা-বোঝা থেকেই আমি সেনাতে যোগদানের গল্পটা ফাঁদি।

আমার এখন আর ঠিক মনে পড়ে না যে দেহু-আলান্দির তীর্থযাত্রায় কয়দিন সময় লেগেছিল আর সেখানে কী-ই বা দেখেছিলাম। যদিও দেহুতে তুকারামের মন্দির দেখেছিলাম সে-কথা ছবির মতন মনে আছে। ফেরার পরে খাড়কির কাছে দাপোড়ি গ্রামের এক মন্দিরে থাকতে শুরু করি আমি, সেখানকার পূজারি-র সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব বনেছিল। রোজরাতে মন্দিরে তাল-মৃদঙ্গ সহযোগে ভজন গান হত। আমি ওতে অংশ নিতাম। আগে আমি একতারা আর খাঞ্জির, কিম্বা ঝাঁজ আর মৃদঙ্গ সহযোগে ভজন গান গাইতে জানতাম। কিন্তু এইখানকার ভজন গানে নাচ-শারীরিক কসরতও করতে হত। এই ভজন আমার জানা ছিল না। দাপোড়ির মন্দিরে এই বিশেষ রকম ভজন গানের সঙ্গে আমি পরিচিত হলাম, শিখলাম। মন্দিরের সুবাদে এমন কিছু জিনিসের সঙ্গে আমার চেনা পরিচয় হল যা না-হলেই ভালো ছিল। মন্দির আসলে ঠিক থাকবার জায়গা না। দুয়েকদিনের বাদেই পূজারি আমায় বের করে দেয়। যেহেতু আমার থাকবার অন্য কোনও জায়গা ছিল না, আমি রাত্তিরে চুপিচুপি ফিরে মন্দিরের বাইরেটায় শুয়ে রাত কাটাই। এইটা দেখে, মন্দিরের কাছের পাড়ার এক মানুষ করুণা করে আমায় নিয়ে যায় তার ঘরে। ওঁর ঘরের পরিবেশ আমার কাছে আশ্চর্য ঠেকল খানিক। কিন্তু আমার কাছে অন্য কোনও বিকল্প ছিল না। ওঁর ঘর থেকেই আমি কাছাকাছি গোরা সেনাদের ক্যান্টিনে খাটতে যেতাম। কাজটা ছিল দিনমজুরির। রোজই কিছু-না-কিছু কামাই করতাম তাই। তার থেকেই যাদের ঘরে থাকছিলাম তাদের থাকা-খাওয়ার পয়সা দিয়েও নিজের হাতখরচের কিছু পয়সা বেঁচে যেত। কিন্তু ক্রমেই আমি তিতিবিরক্ত হয়ে উঠলাম। গোরা সেনাদের হাতে গরম চা পৌঁছানো কিম্বা যে-ঘরে থাকছিলাম সেই ঘরের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া ক্রমে আমার অসহ্য হয়ে উঠল। আমি ভাবলাম যদি মাস মাইনের কোনও কাজ পাই তাইলে থাকবার একটা সুবন্দোবস্ত করতে পারব। পড়াশোনার ব্যাপারেও খানিক দূর এগোতে পারব। সেই দিকে এগোতে চেয়েই আমি চেষ্টা চালাচ্ছিলাম নিরন্তর।     

(চলবে)   

টীকা 

১০ মারাঠিতে কালা বা কালি শব্দের অর্থ কালো। কালি শব্দের ‘ই’ মারাঠি কণ্ঠ্যধ্বনি ‘ই’, ফলে কালীদেবীর মতন শোনায় না শব্দটা। যদিও কালীদেবীও কৃষ্ণবর্ণের।

অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ 

 


প্রকাশের তারিখ: ১৮-মে-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৫১ টি নিবন্ধ
২৫-মে-২০২৬

২২-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬